আল কুরআন


সূরা আল-আম্বিয়া (আয়াত: 35)

সূরা আল-আম্বিয়া (আয়াত: 35)



হরকত ছাড়া:

كل نفس ذائقة الموت ونبلوكم بالشر والخير فتنة وإلينا ترجعون ﴿٣٥﴾




হরকত সহ:

کُلُّ نَفْسٍ ذَآئِقَۃُ الْمَوْتِ ؕ وَ نَبْلُوْکُمْ بِالشَّرِّ وَ الْخَیْرِ فِتْنَۃً ؕ وَ اِلَیْنَا تُرْجَعُوْنَ ﴿۳۵﴾




উচ্চারণ: কুল্লুনাফছিন যাইকাতুল মাওতি ওয়া নাবলূকুম বিশশাররি ওয়াল খাইরি ফিতনাতাও ওয়া ইলাইনা-তুর জা‘ঊন ।




আল বায়ান: প্রতিটি প্রাণ মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে; আর ভাল ও মন্দ দ্বারা আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করে থাকি এবং আমার কাছেই তোমাদেরকে ফিরে আসতে হবে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৫. জীবমাত্ৰই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে(১); আমরা তোমাদেরকে মন্দ ও ভাল দ্বারা বিশেষভাবে পরীক্ষা করে থাকি(২) এবং আমাদেরই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।




তাইসীরুল ক্বুরআন: প্রত্যেক আত্মাকে মৃত্যু আস্বাদন করত হবে। আমি তোমাদেরকে ভাল ও মন্দ (উভয়টি দিয়ে এবং উভয় অবস্থায় ফেলে এর) দ্বারা পরীক্ষা করি। আমার কাছেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে আনা হবে।




আহসানুল বায়ান: (৩৫) জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে; আমি তোমাদেরকে মন্দ ও ভাল দ্বারা বিশেষভাবে পরীক্ষা করে থাকি।[1] আর আমারই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। [2]



মুজিবুর রহমান: জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে; আমি তোমাদেরকে মন্দ ও ভাল দ্বারা বিশেষভাবে পরীক্ষা করি এবং আমারই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।



ফযলুর রহমান: প্রত্যেকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আমি তোমাদেরকে মন্দ ও ভাল দ্বারা বিশেষভাবে পরীক্ষা করে থাকি। আর আমার কাছেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে আনা হবে।



মুহিউদ্দিন খান: প্রত্যেককে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। আমি তোমাদেরকে মন্দ ও ভাল দ্বারা পরীক্ষা করে থাকি এবং আমারই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।



জহুরুল হক: প্রত্যেক সত্ত্বাকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতেই হবে। আর আমরা তোমাদের পরীক্ষা করি মন্দ ও ভাল দিয়ে যাচাই ক’রে। আর আমাদের কাছেই তোমাদের ফিরিয়ে আনা হবে।



Sahih International: Every soul will taste death. And We test you with evil and with good as trial; and to Us you will be returned.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৩৫. জীবমাত্ৰই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে(১); আমরা তোমাদেরকে মন্দ ও ভাল দ্বারা বিশেষভাবে পরীক্ষা করে থাকি(২) এবং আমাদেরই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।


তাফসীর:

(১) আলেমদের সর্বসম্মত মতে আত্মার দেহপিঞ্জর ত্যাগ করাই মৃত্যু। [ফাতহুল কাদীর] একটি গতিশীল, প্রাণবিশিষ্ট, সূক্ষ ও নূরানী দেহকে আত্মা বলা হয়। এই আত্মা মানুষের সমগ্র দেহে সঞ্চারিত থাকে, যেমন গোলাপজল গোলাপ ফুলের মধ্যে বিরাজমান। [ইবনুল কাইয়্যেম, আর-রূহ: ১৭৮]


(২) অর্থাৎ আমি মন্দ ও ভালো উভয়ের মাধ্যমে মানুষকে পরীক্ষা করি। প্রত্যেক স্বভাব বিরুদ্ধ বিষয় যেমন- অসুখ-বিসুখ, দুঃখ-কষ্ট ইত্যাদিকে মন্দ বলে অপরদিকে ভাল বলে প্রত্যেক পছন্দনীয় ও কাম্য বিষয় যেমন-সুস্থতা, নিরাপত্তা ইত্যাদি বোঝানো হয়েছে। দুঃখ-আনন্দ, দারিদ্র-ধনাঢ্যতা, জয়-পরাজয়, শক্তিমত্তা-দুর্বলতা, সুস্থতা-রুগ্নতা ইত্যাদি সকল অবস্থায় তোমাদেরকে পরীক্ষা করা হচ্ছে। অনুরূপভাবে হালাল, হারাম, আনুগত্য, অবাধ্যতা, হেদায়াত ও পথভ্রষ্টতা এ সবই পরীক্ষার সামগ্ৰী। [দেখুন, ইবন কাসীর]

আলেমগণ বলেন, বিপদাপদে সবর করার তুলনায় বিলাসব্যসন ও আরাম-আয়েশে হক আদায়ে দৃঢ়পদ থাকা অধিক কঠিন। তাই আব্দুর রহমান ইবন আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ “আমরা যখন বিপদে পতিত হলাম, তখন তো সবার করলাম, কিন্তু যখন সুখ ও আরাম আয়েশে লিপ্ত হলাম, তখন সবর করতে পারলাম না। অর্থাৎ এর হক আদায়ে দৃঢ়পদ থাকতে পারলাম না। [ইবনুল কাইয়্যেম, উদাতুস সাবেরীন: ৬৪]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৩৫) জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে; আমি তোমাদেরকে মন্দ ও ভাল দ্বারা বিশেষভাবে পরীক্ষা করে থাকি।[1] আর আমারই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। [2]


তাফসীর:

[1] কখনো দুঃখ-দুর্দশা দিয়ে, কখনো পার্থিব সুখ-শান্তি দিয়ে, কখনো সুস্বাস্থ্য ও প্রশস্ততা দিয়ে, কখনো অসুস্থতা ও সংকীর্ণতা দিয়ে, কখনো ধনবত্তা ও বিলাস-সামগ্রী দিয়ে, কখনো দরিদ্রতা ও অভাব দিয়ে পরীক্ষা করে থাকি। যাতে কে কৃতজ্ঞ ও কে অকৃতজ্ঞ, কে ধৈর্যশীল ও কে অধৈর্য তা আমি পরীক্ষা করি। কৃতজ্ঞতা ও ধৈর্য আল্লাহর সন্তুষ্টির এবং অকৃতজ্ঞতা ও ধৈর্যহীনতা আল্লাহর অসন্তুষ্টির বড় কারণ।

[2] ওখানে তোমাদের কর্মানুসারে ভাল-মন্দ প্রতিদান দেওয়া হবে। যারা সৎকর্মশীল তাদের জন্য উত্তম এবং যারা অসৎকর্মশীল তাদের জন্য মন্দ বিনিময় দেওয়া হবে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৩৪-৩৫ নং আয়াতের তাফসীর:



মক্কার কাফিররা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ব্যাপারে বলত যে, সে তো একদিন মারাই যাবে। এ আয়াত তারই উত্তর। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: মৃত্যু তো প্রত্যেক মানুষের জন্যই অবধারিত। মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-ও এ নিয়ম বহির্ভূত নয়। কারণ সেও একজন মানুষ। আর আমি কোন মানুষকে অমরত্ব দান করিনি। কিন্তু যারা একথা বলে তারা কি মরবে না? এ হতে মুশরিকদের মতবাদের খণ্ডন হয়ে যায় যারা দেবতা, আম্বিয়া ও আওলিয়াগণের চিরজীবী হওয়ার ধারণা পোষণ করে থাকে। আর সে ভিত্তিতেই তারা তাদেরকে নিজেদের সাহায্যকারী মনে করে। অত্র সূরার ৮ নং আয়াতে বলা হয়েছে ইতোপূর্বে যত রাসূল এসেছিল তারা সবাই খাবার খেতেন এবং তারা চিরস্থায়ী ছিলেন না। সুতরাং প্রত্যেক আত্মা মারা যাবে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-ও মারা যাবেন এটাই স্বাভাবিক।



আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(إِنَّكَ مَيِّتٌ وَّإِنَّهُمْ مَّيِّتُوْنَ)



“নিশ্চয়ই তুমিও মৃত্যুবরণ করবে আর তারাও মৃত্যুবরণ করবে।” (সূরা যুমার ৩৯:৩০)



আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:



(كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ -‏ وَّيَبْقٰي وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ)



“ভূ-পৃষ্ঠে যা কিছু আছে সমস্তই ধ্বংসশীল। অবশিষ্ট থাকবে শুধু তোমার প্রতিপালকের চেহারা (চেহারাবিশিষ্ট সত্তা), যা মহিমাময়, মহানুভব।” (সূরা আর রাহমান-৫৫ঃ২৬-২৭)



(وَنَبْلُوْكُمْ بِالشَّرِّ وَالْخَيْرِ)



কখনো দুঃখ-দুর্দশা দিয়ে, কখনো পার্থিব সুখ-শান্তি দিয়ে, কখনো সুস্বাস্থ্য ও প্রশস্ততা দিয়ে, কখনো অসুস্থতা ও সংকীর্ণতা দিয়ে, কখনো বিলাস-সামগ্রী দিয়ে, কখনো দরিদ্রতা ও অভাব দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা পরীক্ষা করে থাকেন, যাতে কে কৃতজ্ঞ ও কে অকৃতজ্ঞ হয়, কে ধৈর্যশীল হয়, কে অধৈর্য হয়ে যায় তা নির্ণয় করা যায়। অতঃপর দুনিয়ার জীবন অতীত করে প্রত্যেককেই আল্লাহ তা‘আলার নিকট ফিরে যেতে হবে। আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(كُلُّ نَفْسٍ ذَا۬ئِقَةُ الْمَوْتِ قف ثُمَّ إِلَيْنَا تُرْجَعُوْنَ)



“প্রতিটি প্রাণ মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে; অতঃপর তোমরা আমারই দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে।” (সূরা অনকাবুত ২৯:৫৭)



সুতরাং কেউই পৃথিবীতে চিরস্থায়ী হবে না, প্রত্যেককেই একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আর মৃত্যুর পর সকলকেই আল্লাহ তা‘আলার নিকট ফিরে যেতে হবে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হায়াতুন্নাবী নন, বরং তিনি মারা গেছেন।

২. দুনিয়ার জীবন পরীক্ষার হল, যারা ভাল আমল করতে পারবে তারাই সফলকাম।

৩. আল্লাহ বিভিন্ন সময় ভাল-মন্দ দ্বারা পরীক্ষা করবেন, যারা ধৈর্য ধারণ করবে তারাই সলফকাম।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৩৪-৩৫ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তাআলা বলেনঃ হে মুহাম্মদ (সঃ)! তোমার পূর্বেও আমি কোন মানুষকে দুনিয়ায় অনন্ত জীবন দান করি নাই। বরং ভূ-পৃষ্ঠে যা কিছু আছে সমস্তই নশ্বর, অবিনশ্বর শুধু তোমার প্রতিপালকের সত্তা, যিনি মহিমময়, মহানুভব। এই আয়াত দ্বারাই আলেমগণ দলীল গ্রহণ করেছেন যে, হযরত খিযর (আঃ) মারা গেছেন। তিনি আজ পর্যন্ত জীবিত আছেন এটা ভুল কথা। কেননা, তিনিও মানুষই ছিলেন। হোন তিনি ওয়ালী বা নবী অথবা রাসূল, কিন্তু ছিলেন তো মানুষই।

মহান আল্লাহ বলেনঃ হে মুহাম্মদ (সাঃ)! তুমি যদি মৃত্যুবরণ কর তবে তারা কি চিরজীবি হয়ে থাকবে? অর্থাৎ তারা কি আশা করছে যে, তোমার মৃত্যুর পর তারা দুনিয়ায় চিরদিন বেঁচে থাকবে? না, এটা হতে পারে না, বরং প্রত্যেকেই ধ্বংস হয়ে যাবে। এজন্যেই আল্লাহ তাআলা বলেনঃ জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। ইমাম শাফিয়ী (রঃ) বলতেনঃ “লোকেরা আমার মৃত্যুর কামনা করে, আমি যদি মারা যাই তবে এই পথে কি আমি একাই রয়েছি? এমন কেউই নেই যে এর স্বাদ গ্রহণ করবে না।”

এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি তোমাদেরকে মন্দ ও ভাল দ্বারা বিশেষভাবে পরীক্ষা করে থাকি। অর্থাৎ আমি তোমাদেরকে ভাল ও মন্দ দ্বারা, সুখ ও দুঃখ দ্বারা, মিষ্ট ও তিক্ত দ্বারা এবং প্রশস্ততা ও সংকীর্ণতা দ্বারা পরীক্ষা করে থাকি, যাতে কৃতজ্ঞ ও অকৃতজ্ঞ এবং ধৈর্যশীল ও হতাশা গ্রস্ত ব্যক্তি প্রকাশ হয়ে পড়ে। ঐশ্বর্য ও দারিদ্র, কঠোরত ও কোমলতা, হালাল ও হারাম, হিদায়াত ও গুমরাহী এবং আনুগত্য ও অবাধ্যতা এ সবগুলিই পরীক্ষামূলক। এর দ্বারা ভাল ও মন্দ প্রকাশ পেয়ে থাকে।

তোমাদের সবারই প্রত্যাবর্তন আমারই কাছে। ঐ সময় যে যেমন ছিল তা প্রকাশ হয়ে পড়বে। পাপীরা শাস্তি এবং পুণ্যবারা পুরস্কার লাভ করবে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।