সূরা আল-আম্বিয়া (আয়াত: 27)
হরকত ছাড়া:
لا يسبقونه بالقول وهم بأمره يعملون ﴿٢٧﴾
হরকত সহ:
لَا یَسْبِقُوْنَهٗ بِالْقَوْلِ وَ هُمْ بِاَمْرِهٖ یَعْمَلُوْنَ ﴿۲۷﴾
উচ্চারণ: লা-ইয়াছবিকূ নাহূবিলকাওলি ওয়া হুম বিআমরিহী ইয়া‘মালূন।
আল বায়ান: তারা তাঁর আগ বাড়িয়ে কোন কথা বলে না, তাঁর নির্দেশেই তো তারা কাজ করে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৭. তারা তাঁর আগে বেড়ে কথা বলে না(১); তারা তো তাঁর আদেশ অনুসারেই কাজ করে থাকে।
তাইসীরুল ক্বুরআন: তিনি কথা বলার আগেই তারা (অর্থাৎ সম্মানিত বান্দারা) কথা বলে না, তারা তাঁর নির্দেশেই কাজ করে।
আহসানুল বায়ান: (২৭) তারা তাঁর আগে বেড়ে কথা বলে না এবং তারা তো তাঁর আদেশ অনুসারেই কাজ করে। [1]
মুজিবুর রহমান: তারা তাঁর আগে বেড়ে কথা বলে না; তারা তো তাঁর আদেশ অনুসারেই কাজ করে।
ফযলুর রহমান: তারা তাঁর আগে কথা বলে না এবং তারা তাঁর আদেশে কাজ করে।
মুহিউদ্দিন খান: তারা আগে বেড়ে কথা বলতে পারে না এবং তারা তাঁর আদেশেই কাজ করে।
জহুরুল হক: তাঁরা কথা বলতে তাঁর আগে বেড়ে যান না, আর তাঁরই আদেশ মোতাবেক তাঁরা কাজ করেন।
Sahih International: They cannot precede Him in word, and they act by His command.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২৭. তারা তাঁর আগে বেড়ে কথা বলে না(১); তারা তো তাঁর আদেশ অনুসারেই কাজ করে থাকে।
তাফসীর:
(১) অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, এখানে ফেরেশতাদের কথাই বলা হয়েছে। আরবের মুশরিকরা তাদেরকে আল্লাহর মেয়ে গণ্য করতো। আর মনে করতো যে, এরা আল্লাহর দরবারে এদের জন্য সুপারিশ করবে। [কুরতুবী; ইবন কাসীর] পরবর্তী ভাষণ থেকে একথা স্বতস্ফূৰ্তভাবে প্রকাশ হয়ে যায়। বলা হচ্ছে, ফেরেশতারা আল্লাহর সন্তান হওয়া তো দূরের কথা, তারা আল্লাহর সামনে এমন ভীত ও বিনীত থাকে যে, আগে বেড়ে কোন কথাও বলে না এবং তার আদেশের খেলাফ কখনও কোন কাজ করে না। কথায় আগে না বাড়ার অর্থ এই যে, যে পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে কোন কথা না বলা হয় তারা নিজেরা আগে বেড়ে কথা বলার সাহস করে না।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২৭) তারা তাঁর আগে বেড়ে কথা বলে না এবং তারা তো তাঁর আদেশ অনুসারেই কাজ করে। [1]
তাফসীর:
[1] এখানে মুশরিকদের এক ধারণার খন্ডন করা হয়েছে। তাদের ধারণা, ফিরিশতারা আল্লাহর কন্যা। কিন্তু আল্লাহ বলেন, তারা আমার কন্যা নয়; বরং তারা আমার সম্মানিত ও আজ্ঞাবহ দাস। তাছাড়া পুত্র-কন্যার প্রয়োজন তখন পড়ে, যখন কেউ বৃদ্ধ বয়সে পৌঁছে দুর্বল হয়ে পড়ে। তখনই সন্তান সাহারা ও সাহায্যকারী হয়। আর এই কারণেই সন্তানদেরকে ‘বার্ধক্যের লাঠি’ বলা হয়। কিন্তু বার্ধক্য, দুর্বলতা, স্থবিরতা এ সব এমন জিনিস, যা মানুষের সাথে সম্পর্কিত, আল্লাহর সত্তা এ সকল দুর্বলতা ও ত্রুটি হতে পাক ও পবিত্র। সেই জন্য তাঁর সন্তান বা কোন প্রকার সাহারার প্রয়োজন নেই। আর ঠিক এই কারণেই কুরআনে বারবার এ বিষয়টিকে পরিষ্কার করা হয়েছে যে, তাঁর কোন সন্তানাদি নেই।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২৬-২৯ নং আয়াতের তাফসীর:
এখানে কাফির-মুশরিকদের একটি ভ্রান্ত ধারণা খণ্ডন করা হয়েছে। তাদের বিশ্বাস, ফেরেশতারা আল্লাহ তা‘আলার কন্যা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: তারা আমার কন্যা নয়, বরং তারা শুধু আমার সম্মানিত বান্দা। তারা নিজে থেকে কোন কথা বলে না, তারা শুধুমাত্র আল্লাহ তা‘আলার আদেশের অনুসরণ করে। আল্লাহ তা‘আলার অনুমতি ছাড়া তাদের কোন কিছুই করার ক্ষমতা নেই, আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশের ব্যতিক্রম করে না, বরং যা নির্দেশ করা হয় তাই করে থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(لَّا يَعْصُوْنَ اللّٰهَ مَآ أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُوْنَ مَا يُؤْمَرُوْنَ)
“যারা অমান্য করে না আল্লাহ যা তাদেরকে আদেশ করেন তা এবং তারা যা করতে আদিষ্ট হয় তা-ই করে।” (সূরা তাহরীম ৬৬:৬)
(يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيْهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ)
অর্থাৎ অতীত, ভবিষ্যত সব কিছুই আল্লাহ জানেন, তাঁর জ্ঞানের বাইরে কিছুই নেই। এমনকি ফেরেশতাসহ কারো এতটুকু ক্ষমতা নেই যে, আল্লাহর নিকট কারো জন্য শাফাআত করবে। তবে তিনি যার জন্য যাকে অনুমতি দেবেন তার জন্য সে সুপারিশ করতে পারবে। আল্লাহ কেবল ঐ ব্যক্তির জন্য অনুমতি দেবেন যার কথা ও কাজে তিনি সন্তুষ্ট। এ সম্পর্কে সূরা বাকারার আয়াতুল কুরসীতে আলোচনা করা হয়েছে।
শুধু তাই নয়, তাদের মধ্য থেকে কেউ যদি আল্লাহকে ছেড়ে নিজেকে প্রভু বলে দাবী করে তাহলে তাদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করানো হবে। আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُوْنَنَّ مِنَ الْخٰسِرِيْنَ)
“যদি তুমি আল্লাহর সাথে শরীক স্থির কর তবে নিঃসন্দেহে তোমার কর্ম তো নিষ্ফল হবেই এবং অবশ্যই তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (সূরা যুমার ৩৯:৬৫)
যদি তারা আল্লাহর সন্তান হত তাহলে তাদেরকে বলতেন না যে, প্রভু দাবী করলে কেন, তোমাদেরকে জাহান্নামে দিব। কারণ সাধারণ নিয়ম অনুসারে তারা যদি আল্লাহর সন্তানই হত তাহলে পিতার পরে তারাই প্রভু হওয়ার অধিকার রাখে। জাহান্নামে দেয়ার প্রশ্নই আসত না, আর আল্লাহ তা‘আলার জন্য এটি সমীচীনও নয় যে, তিনি সন্তান গ্রহণ করবেন। সুতরাং এতে বুঝা যায় যে, আল্লাহ তা‘আলা কোন সন্তান গ্রহণ করেন না। তিনি এসব থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(قُلْ ھُوَ اللہُ اَحَدٌﭐﺆ اَللہُ الصَّمَدُﭑﺆ لَمْ یَلِدْﺃ وَلَمْ یُوْلَدْﭒﺫ) (وَلَمْ یَکُنْ لَّھ۫ کُفُوًا اَحَدٌﭓﺟ)
“বল: তিনিই আল্লাহ একক। তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি। আর তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।” (সূরা ইখলাস ১১২:১-৪)
তাই আমাদের উচিত, আল্লাহ তা‘আলার শানে এমন কথা না বলা যাতে তাঁর সম্মান ও মর্যাদা ক্ষুণত্ন হয়।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. ফেরেশতাগণ আল্লাহ তা‘আলার কন্যা নন, বরং আল্লাহ তা‘আলার বান্দা।
৩. যে ব্যক্তি শিরক করবে তাকেই জাহান্নামে যেতে হবে ।
৩. আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত কেউ কারো জন্যে সুপারিশ করতে পারবে না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ২৬-২৯ নং আয়াতের তাফসীর:
মক্কার কাফিরদের ধারণা ছিল যে, ফেরেশতারা আল্লাহর কন্যা (নাউযুবিল্লাহ)। তাদের এই ধারণা খণ্ডন করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। ফেরেশতারা তার সম্মানিত বান্দা। তারা বড়ই মর্যাদা সম্পন্ন। কথায় ও কাজে তারা সদা আল্লাহর আনুগত্যের কাজে নিমগ্ন রয়েছে। কোন সময়েই তারা আগে বেড়ে কথা বলে না, কোন কাজে তারা তাঁর আদেশের বিপরীতও করে না। বরং যা তিনি আদেশ করেন তা-ই তারা পালন করে। তারা আল্লাহর জ্ঞানের মধ্যে পরিবেষ্টিত। তাঁর কাছে কোন কিছুই গোপন নেই সামনের পিছনের ডানের ও বামের খবর তিনি রাখেন। অণু-পরমাণুর জ্ঞানও তার রয়েছে। এই পবিত্র ফেরেশতারাও এই সাহস রাখেন না যে, আল্লাহর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া কোন অপরাধীর জন্যে সুপারিশ করেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কে সে, যে তাঁর অনুমতি ব্যতীত তাঁর নিকট সুপারিশ করবে?” (২৪ ২৫৫) অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যাকে তিনি অনুমতি দিবেন তার শাফাআত ছাড়া তাঁর কাছে আর কারো শাফাআত চলবে না।` (৩৪:২৩) এই বিষয়েই আরো বহু আয়াত কুরআন কারীমের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। ফেরেশতা মণ্ডলী এবং আল্লাহর নৈকট্যলাভকারী বান্দারা সবাই তার ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় কাঁপতে থাকবেন। তাদের মধ্যে যে কেউই নিজে মা’বৃদ বলে দাবী করবে তাকে আল্লাহ প্রতিফল দিবেন জাহান্নাম। যালিমদেরকে তিনি এভাবেই শাস্তি দিয়ে থাকেন। মহান আল্লাহর একথাটি শর্ত সাপেক্ষ। আর শর্তের জন্যে ওটা সংঘটিত হওয়া জরুরী নয়। এটা জরুরী নয় যে, আল্লাহর বিশিষ্ট বান্দাদের মধ্যে কেউ এই ঘৃণ্য দাবী করে ও এইরূপ কঠিন শাস্তি ভোগ করে। যেমন কুরআন কারীমে ঘোষিত হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাওঃ যদি আল্লাহর সন্তান হতো তবে আমিই হতাম প্রথম সেই বান্দা।` (৪৩:৮১) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী (সঃ)!) যদি তুমি শিরু কর তবে অবশ্যই তোমার আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে এবং অবশ্যই তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।` (৩৯:৬৫) সুতরাং আল্লাহ তাআলার সন্তান হওয়াও যেমন সম্ভব নয় তেমনই রাসূলুল্লাহর (সঃ) শিকও অসম্ভ।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।