সূরা আল-আম্বিয়া (আয়াত: 106)
হরকত ছাড়া:
إن في هذا لبلاغا لقوم عابدين ﴿١٠٦﴾
হরকত সহ:
اِنَّ فِیْ هٰذَا لَبَلٰغًا لِّقَوْمٍ عٰبِدِیْنَ ﴿۱۰۶﴾ؕ
উচ্চারণ: ইন্না ফী হা-যা-লাবালা-গাল লিকাওমিন ‘আ-বিদীন।
আল বায়ান: নিশ্চয় এতে ইবাদাতকারী সম্প্রদায়ের জন্য উপদেশ বাণী রয়েছে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১০৬. নিশ্চয় এতে রয়েছে ইবাদতকারী সম্প্রদায়ের জন্য পর্যাপ্ত বিষয়বস্তু।
তাইসীরুল ক্বুরআন: নিশ্চয়ই এতে (অর্থাৎ এই কুরআনে) উপদেশবাণী রয়েছে ‘ইবাদাতকারী লোকেদের জন্য।
আহসানুল বায়ান: (১০৬) উপাসনাকারী সম্প্রদায়ের জন্য এতে রয়েছে পয়গাম। [1]
মুজিবুর রহমান: এতে রয়েছে বাণী, সেই সম্প্রদায়ের জন্য, যারা ইবাদাত করে।
ফযলুর রহমান: নিশ্চয়ই এতে (এই কোরআনে) ধর্মপ্রাণ লোকদের জন্য একটি বাণী রয়েছে।
মুহিউদ্দিন খান: এতে এবাদতকারী সম্প্রদায়ের জন্যে পর্যাপ্ত বিষয়বস্তু আছে।
জহুরুল হক: বস্তুতঃ এতে রয়েছে বাণী উপাসনাকারী লোকদের জন্য।
Sahih International: Indeed, in this [Qur'an] is notification for a worshipping people.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১০৬. নিশ্চয় এতে রয়েছে ইবাদতকারী সম্প্রদায়ের জন্য পর্যাপ্ত বিষয়বস্তু।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১০৬) উপাসনাকারী সম্প্রদায়ের জন্য এতে রয়েছে পয়গাম। [1]
তাফসীর:
[1] ‘এতে’ বলতে ঐ উপদেশ ও সতর্কবাণী যা এই সূরায় বিভিন্ন ভঙ্গিমায় বর্ণিত হয়েছে। ‘পয়গাম’-এর উদ্দেশ্যঃ যথেষ্টতা ও উপকারিতা। অথবা ‘এতে’ বলতে কুরআন মাজীদকে বুঝানো হয়েছে, যা মুসলিমদের জন্য উপকারী ও যথেষ্ট। উপাসনাকারী বা আবেদ বলতে বিনয় নম্রতার সাথে আল্লার ইবাদতকারী এবং শয়তান ও খেয়াল-খুশীর উপর আল্লাহর আনুগত্যকে প্রাধান্যদানকারী। আর ইবাদত ও আনুগত্যের মস্তক হল, নামায।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১০৫-১০৭ নং আয়াতের তাফসীর:
الزَّبُوْرِ দ্বারা উদ্দেশ্য হল সকল নাযিলকৃত আসমানী কিতাব, যেমন তাওরাত, ইঞ্জিল ইত্যাদি। الذِّكْرِ দ্বারা উদ্দেশ্য হল লাওহে মাহফুজ যা সকল কিতাবের মূল। অর্থাৎ লাওহে মাহফুজে লিখার পর সকল আসমানি কিতাবে এ মর্মে লিখা হয়েছে যে, আমার সৎ বান্দারা জান্নাতের অধিকারী হবে।
(الْأَرْضَ يَرِثُهَا عِبَادِيَ الصّٰلِحُوْنَ)
‘আমার সৎ কর্মশীল বান্দাগণ পৃথিবীর অধিকারী হবে’ দ্বারা উদ্দেশ্য কী তা নিয়ে দুটি মত পাওয়া যায় ১. তা হল জান্নাতের জায়গা বা জমিন কিয়ামতের দিন মু’মিন বান্দারা যার উত্তরাধিকারী হবে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَقَالُوا الْحَمْدُ لِلّٰهِ الَّذِيْ صَدَقَنَا وَعْدَه۫ وَأَوْرَثَنَا الْأَرْضَ نَتَبَوَّأُ مِنَ الْجَنَّةِ حَيْثُ نَشَا۬ءُ ج فَنِعْمَ أَجْرُ الْعٰمِلِيْنَ)
“যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের প্রতি তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন এবং আমাদেরকে অধিকারী করেছেন এই ভূমির, আমরা জান্নাতে যেখানে ইচ্ছা বসবাস করব। সুতরাং (সৎ) আমলকারীদের বিনিময় কতই না উত্তম!” (সূরা যুমার ৩৯:৭৪)
২. জমিন দ্বারা উদ্দেশ্য শত্র“দের জমিন মুসলিমরা দুনিয়াতে যার উত্তরাধিকারী হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَعَدَ اللّٰهُ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِهِمْ ص وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِيْنَهُمُ الَّذِي ارْتَضٰي لَهُمْ)
“তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎ কর্ম করে আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি অবশ্যই তাদেরকে পৃথিবীতে খেলাফত (প্রতিনিধিত্ব) দান করবেন, যেমন তিনি খেলাফত (প্রতিনিধিত্ব) দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই তাদের জন্য প্রতিষ্ঠিত করবেন তাদের দীনকে যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন।” (সূরা নুর ২৪:৫৫) অধিকাংশ আলেম প্রথমটাকেই বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করেন।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা কুরআনের প্রশংসা করে বলেন: নিশ্চয়ই এ কুরআন ইবাদতকারীদের জন্য যথেষ্ট। তারা এ কুরআন অনুসরণ করে ইবাদত করার মাধ্যমে কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছতে পারবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(أَوَلَمْ يَكْفِهِمْ أَنَّآ أَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ يُتْلٰي عَلَيْهِمْ ط إِنَّ فِيْ ذٰلِكَ لَرَحْمَةً وَّذِكْرٰي لِقَوْمٍ يُّؤْمِنُوْنَ)
“এটা কি তাদের জন্য যথেষ্ট নয় যে, আমি তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছি, যা তাদের নিকট পাঠ করা হয়। তাতে অবশ্যই অনুগ্রহ ও উপদেশ রয়েছে সে কওমের জন্য যারা ঈমান আনে।” (সূরা আনকাবুত ২৯:৫১)
তারপর আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রশংসা করে বলেন: আমি তোমাকে পৃথিবীবাসীর জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি। এর অর্থ হল যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর রিসালাতের ওপর ঈমান আনবে সে আসলে উক্ত করুণা ও রহমতকে গ্রহণ করবে। ফলে সে দুনিয়া ও আখেরাতে সুখ ও শান্তিতে থাকবে। আর যেহেতু রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর রিসালাত বিশ্বজগতের জন্য, সেহেতু তিনি বিশ্বজগতের রহমতরূপে অর্থাৎ নিজের শিক্ষা দ্বারা বিশ্ববাসীকে ইহ-আখিরাতের সুখের সন্ধান দিতে প্রেরিত হয়েছিলেন। কোন কোন বিদ্বান বলেছেন: তাঁকে এ অর্থে বিশ্ববাসীর রহমত বলা হয়েছে যে, তাঁর কারণেই এ উম্মত সমূলে ধ্বংস হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। যেভাবে পূর্ববর্তী বহু জাতিকে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে, উম্মাতে মুহাম্মাদীকে সেভাবে সমূলে ধ্বংস করা হবে না। হাদীসে এসেছে আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলা হল, হে আল্লাহ তা‘আলার রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! মুশরিকদের ওপর বদদু‘আ করুন। রাসুল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, আমি বদদু‘আ করার জন্য প্রেরিত হইনি, বরং আমি রহমতস্বরূপ প্রেরিত হয়েছি। (সহীহ মুসলিম হা: ২০০৬, ২০০৭)
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَمَا كُنْتَ تَرْجُوْآ أَنْ يُّلْقٰٓي إِلَيْكَ الْكِتٰبُ إِلَّا رَحْمَةً مِّنْ رَّبِّكَ فَلَا تَكُوْنَنَّ ظَهِيْرًا لِّلْكٰفِرِيْنَ)
“তুমি আশা করনি যে, তোমার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করা হবে। এটা কেবল তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ। সুতরাং তুমি কখনও কাফিরদের সহায় হয়ো না।” (সূরা ক্বাসাস ২৮:৮৬)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. মু’মিনরা যদি সঠিক ঈমান ও আমলে ফিরে আসে তাহলে অবশ্যই আল্লাহ তা‘আলার ওয়াদা অনুসারে জান্নাত পাওয়ার সাথে সাথে দুনিয়ার উত্তরাধিকারী হবেই।
২. কুরআন এমন একটি কিতাব যা মু’মিনদের জন্য সকল দিক থেকে যথেষ্ট।
৩. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সারা বিশ্বের জন্য রহমত, তাঁর দু‘আয় উম্মতে মুহাম্মাদীকে সমূলে ধ্বংস করে দেয়া হবে না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১০৫-১০৭ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তাআলা খবর দিচ্ছেন যে, তিনি তাঁর সবান্দাদেরকের যেমন আখেরাতে ভাগ্যবান করে থাকেন তেমনই দুনিয়াতেও তাদেরকে রাজ্য ও ধনমাল দান করেন। এটা আল্লাহর নিশ্চিত ওয়াদা এবং সত্য ফায়সালা। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয় যমীন আল্লাহর অধিকারভুক্ত। তিনি তাঁর বান্দাদের যাকে চান ওর ওয়ারিস বানিয়ে দেন, আর উত্তম পরিণাম তো খোদাভীরুদের জন্যেই।” (৭:১২৮) অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদেরকে ও মু'মিনদেরকে পার্থিব জীবনেও সাহায্য করবো এবং যেই দিন সাক্ষীরা দণ্ডায়মান হবে সেই দিনও (অর্থাৎ আখেরাতেও) সাহায্য করবো।” (৪০:৫১) অন্যত্র বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে ও সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করেছে তাদের সঙ্গে আল্লাহ ওয়াদা করেছেন যে, তিনি তাদেরকে ভূ-পৃষ্ঠে বিজয়ী ও শক্তিমান করবেন যেমন বিজয়ী ও শক্তিমান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে আর তিনি তাদের জন্যে তাদের দ্বীনকে সদঢ় করবেন যা তিনি তাদের জন্যে পছন্দ করেন ও যাতে তিনি সন্তুষ্ট হন।” (২৪:৫৫)
আল্লাহ তাআলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, এটা শারইয়্যাহ ও কাদরিয়্যাহ কিতাব সমূহে লিপিবদ্ধ রয়েছে এবং এটা অবশ্য অবশ্যই হবে। তাই, তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘আমি উপদেশের পর কিতাবে লিখে দিয়েছি।'
হযরত সাঈদ ইবনু জুবাইর (রঃ) বলেন যে, 'যাকূর' দ্বারা তাওরাত, ইঞ্জীল ও কুরআনকে বুঝানো হয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, ‘যাবুর দ্বারা বুঝানো হয়েছে কিতাবকে। কেউ কেউ বলেন যে, যাবুর হলো ঐ কিতাবের নাম যা হযরত দাউদের (আঃ) উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। এখানে ‘যি দ্বারা উদ্দেশ্য হলো তাওরাত। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, “যি দ্বারা কুরআন কারীমকে বুঝানো হয়েছে। হযরত সাঈদ ইবনু জুবাইর (রঃ) বলেন যে, যি হলো ওটাই যা আকাশে রয়েছে। অর্থাৎ যা আল্লাহর নিকট বিদ্যমান উম্মুল কিতাব, যা সর্বপ্রথম কিতাব। অর্থাৎ লাওহে মাহ। এটাও বর্ণিত আছে যে, যাবুর' হলো ঐ আসমানী কিতাবসমূহ যে গুলি নবীদের (আঃ) উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। আর যি হলো প্রথম কিতাব অর্থাৎ লাওহে মাহফুয।
হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তাআলা তাওরাত ও যাবুরে এবং আসমান ও যমীন সৃষ্ট হওয়ার পূর্বে তার সাবেক জ্ঞানে খবর দিয়েছেন যে, হযরত মুহাম্মদের (সাঃ) উম্মত যমীনের বাদশাহ হয়ে যাবে এবং সৎকর্মশীল হয়ে বেহেশতে প্রবেশ করবে। একথাও বলা হয়েছে যে, যমীন দ্বারা এখানে জান্নাতের যমীন বুঝানো হয়েছে। হযরত আবু দারদা (রাঃ) বলেনঃ “সৎকর্মশীল লোক আমরাই।” সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা মুমিন লোকদেরকে বুঝানো হয়েছে।
মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ শেষ নবী হযরত মুহাম্মদের (সঃ) উপর অবতারিত পূর্ণ উপদেশ বাণী রয়েছে ঐ সম্প্রদায়ের জন্যে যারা ইবাদত করে। যারা আমাকে মেনে চলে এবং আমার নামে নিজেদের প্রবৃত্তিকে দমন করে।
অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ হে নবী (সঃ)! আমি তোমাকে বিশ্ব জগতের প্রতি শুধু রহমত বা করুণী রূপেই প্রেরণ করেছি। সুতরাং যারা এই রহমতের কারণে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে তারা হবে দুনিয়া ও আখেরাতে সফলকাম। পক্ষান্তরে, যারা অকৃতজ্ঞ হবে তারা উভয় জগতে হবে ধ্বংস প্রাপ্ত। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী (সঃ)! তুমি কি তাদের প্রতি লক্ষ্য কর না যারা আল্লাহর অনুগ্রহের বদলে অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং তারা তাদের সম্প্রদায়কে নামিয়ে আনে ধ্বংসের ক্ষেত্র জাহান্নামে যার মধ্যে তারা প্রবেশ করবে, কত নিকৃষ্ট এই আবাস স্থল!” (১৪:২৮-২৯)
কুরআন কারীমের গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাওঃ মু'মিনদের জন্যে এটা (কুরআন) পথ-নির্দেশ ও ব্যাধির প্রতিকার। কিন্তু যারা অবিশ্বাসী তাদের কর্ণে রয়েছে। বধিরতা এবং কুরআন হবে তাদের জন্যে অন্ধত্ব। তারা এমন যে, যেন তাদেরকে আহ্বান করা হয় বহু দূর হতে!` (৪১:৪৪)।
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলা হয়ঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি মুশরিকদের উপর বদ দুআ করুন!” তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি লানতকারীরূপে প্রেরিত হই নাই, বরং রহমত রূপে প্রেরিত হয়েছি।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছে) অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি তো শুধু রহমত ও হিদায়াত।` অন্য রিওয়াইয়াতে এর সাথে এটাও রয়েছেঃ “আমাকে এক কওমের উত্থান ও অন্য কওমের পতনের সাথে প্রেরণ করা হয়েছে।”
বর্ণিত আছে যে, আবৃ জাল একদা বলেঃ “হে কুরায়েশের দল! মুহাম্মদ (সঃ) ইয়াসরিবে (মদীনায়) চলে গেছে এবং পরিভ্রমণকারী প্রহরী সে এদিকে ওদিকে তোমাদের অনুসন্ধানে পাঠিয়ে দিয়েছে। দেখো, তোমরা সদা সতর্ক থাকো। সে ক্ষুধার্ত সিংহের ন্যায় ওৎ পেতে রয়েছে। কেননা, তোমরা তাকে দেশ হতে বিতাড়িত করেছে। আল্লাহর শপথ! তার যাদু অতুলনীয়। আমি যখনই তাকে বা তার যে কোন সঙ্গীকে দেখি তখনই তার সাথে শয়তানি আমার দৃষ্টি গোচর হয়। তোমরা তো জান যে, (মদীনার) আউস ও খাযরাজ গোত্র আমাদের শত্রু। আমাদের এই শত্রুকে ঐ শত্রুরা আশ্রয় দিয়েছে। তার এই কথার জবাবে মুতইম ইবনু আ’দী তাকে বলেনঃ “হে আবুল হাকাম! আল্লাহর কসম! তোমাদের যে ভাইটিকে তোমরা দেশ থেকে বিতাড়িত করেছো তাঁর চেয়ে তো অধিক সত্যবাদী ও প্রতিশ্রুতি পালনকারী আর কাউকেও আমি দেখি নাই! যখন তোমরা এই ভাল লোকটির সাথে দুর্ব্যবহার করেছে তখন তাকে ছেড়ে দাও। তোমাদের এখন উচিত তার থেকে সম্পূর্ণ পৃথক থাকা।” তখন আবু সুফিয়ান ইবনু হারিস বললোঃ “না, না। বরং তার উপর কঠোরতা অবলম্বন করা উচিত। জেনে রেখো যে, যদি তার পক্ষের লোকেরা তোমাদের উপর জয়যুক্ত হয় তবে তোমাদের কোথাও ঠাঁই মিলবে না। তোমাদের আত্মীয় স্বজনই তোমাদেরকে আশ্রয় দেবে না। সুতরাং তোমাদের উচিত মদীনাবাসীদের উপর এই চাপ সৃষ্টি করা যে, তারা যেন মুহাম্মদকে (সঃ) পরিত্যাগ করে, যাতে সে একাকী হয়ে যায়। যদি তারা এটা অস্বীকার করে তবে তাদের উপর আক্রমণ চালাতে হবে। যদি তোমরা এতে সম্মত হও তবে আমি মদীনার প্রান্তে প্রান্তে সৈন্য মোতায়েন করে দেবো এবং তাদেরকে সমুচিত শিক্ষা প্রদান করবো।` যখন রাসূলুল্লাহর (সঃ) কানে এ সংবাদ পৌঁছলো তখন তিনি বললেনঃ “যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! আমি তাদেরকে হত্যা ও ধ্বংস করবো এবং কতকগুলিকে বন্দী করার পর অনুগ্রহ করে ছেড়ে দেবো। আমি হলাম রহমত স্বরূপ। আমাকে দুনিয়া হতে উঠিয়ে নিবেন না, যে পর্যন্ত না তিনি তার দ্বীনকে সারা দুনিয়ার উপর বিজয়ী না করবেন। আমার পাঁচটি নাম রয়েছে। সেগুলি হলোঃ মুহাম্মদ (সঃ), আহমাদ (সঃ), মাহী, কেননা আমার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা কুফরীকে নিশ্চিহ্ন করবেন। আমার চতুর্থ নাম হাশির। কেননা, আমার পায়ের উপর লোকদেরকে একত্রিত করা হবে। আর আমার পঞ্চম নাম হলো আকিব।` (এ হাদীসটি আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। আহমাদ ইবনু সালিহ বলেন: “আমি আশা করি হাদীসটি বিশুদ্ধ)
বর্ণিত আছে যে, হযরত হুযাইফা (রাঃ) মাদায়েনে অবস্থান করছিলেন। মাঝে মাঝে তিনি এমন কিছু আলোচনা করতেন যা রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন। একদা হযরত হুযাইফা (রাঃ) সালমান ফারসীর (রাঃ) নিকট আগমন করেন। তখন হযরত সালমান (রাঃ) বলেনঃ হে হুযাইফা (রাঃ)! একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় ভাষণে বলেছিলেনঃ “ক্রোধের সময় যদি আমি কাউকেও ভাল মন্দ কিছু বলে দিই বা লানত করি তবে জেনে রেখো যে, আমিও তোমাদের মতই একজন মানুষ। তোমাদের মত আমারও রাগ হয়। হাঁ, তবে যেহেতু আমি সারা বিশ্বের জন্যে রহমত স্বরূপ, সেহেতু আমার প্রার্থনা এই যে, আল্লাহ যেন আমার এই শব্দগুলিকেও মানুষের জন্যে করুণার কারণ বানিয়ে দেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এখন বাকী থাকলো এই কথা যে, কাফিরদের জন্যে কি করে তিনি রহমত হতে পারেন? এই উত্তরে বলা যেতে পারেঃ হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে এই আয়াতেরই তাফসীরে বর্ণিত আছে যে, মু'মিনদের জন্যে তো তিনি দুনিয়া ও আখেরাতে রহমত স্বরূপ ছিলেন। কিন্তু যারা মুমিন নয় তাদের জন্যে তিনি দুনিয়াতেই রহমত স্বরূপ ছিলেন। তারা তাঁরই র হমতের বদৌলতে যমীনে ধ্বসে যাওয়া হতে, আকাশ হতে পাথর বর্ষণ হতে রক্ষা পেয়ে যায়। পূর্ববর্তী অবাধ্য উম্মতদের উপর এই শাস্তি এসেছিল। (এটা ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।