সূরা আল-ফাতিহা (আয়াত: 6)
হরকত ছাড়া:
اهدنا الصراط المستقيم ﴿٦﴾
হরকত সহ:
اِهْدِ نَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِیْمَ ۙ﴿۶﴾
উচ্চারণ: ইহদিনাসসিরা-তাল মুছতাকীম।
আল বায়ান: আমাদেরকে সরল পথ দেখান। পথের হিদায়াত দিন।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৬. আমাদেরকে সরল পথের হিদায়াত দিন। (১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: আমাদেরকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন কর ও তার প্রতি অটুট থাকার তাওফীক দান কর।
আহসানুল বায়ান: (৬) আমাদেরকে সরল পথ দেখাও;
মুজিবুর রহমান: আমাদেরকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করুন।
ফযলুর রহমান: আমাদেরকে সঠিক পথ দেখাও;
মুহিউদ্দিন খান: আমাদেরকে সরল পথ দেখাও,
জহুরুল হক: “আমাদের তুমি সহজ-সঠিক পথে পরিচালিত করো, --”
Sahih International: Guide us to the straight path -
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৬. আমাদেরকে সরল পথের হিদায়াত দিন। (১)
তাফসীর:
১. স্নেহ ও করুণা এবং কল্যাণ কামনাসহ কাউকে মঙ্গলময় পথ দেখিয়ে দেয়া ও মনজিলে পৌছিয়ে দেয়াকে আরবী পরিভাষায় ‘হেদায়াত’ বলে। হেদায়াত’ শব্দটির দুইটি অর্থ। একটি পথ প্রদর্শন করা, আর দ্বিতীয়টি লক্ষ্য স্থলে পৌছিয়ে দেয়া। যেখানে এই শব্দের পর দুইটি object থাকবে إلى থাকবে না, সেখানে এর অর্থ হবে লক্ষ্যস্থলে পৌছিয়ে দেয়া। আর যেখানে এ শব্দের পর إلى শব্দ আসবে, সেখানে অর্থ হবে পথ-প্রদর্শন। যেমন আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে সম্বোধন করে বলেছেন, إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ “নিশ্চয়ই আপনি লক্ষ্যস্থলে—মনজিলে পৌঁছিয়ে দিতে পারবেন না যাকে আপনি পৌছাতে চাইবেন। বরং আল্লাহই লক্ষ্যস্থলে পৌছিয়ে দেন যাকে তিনি ইচ্ছা করেন [সূরা আল-কাসাস ৫৬] এ আয়াতে হেদায়েত শব্দের পর إلى ব্যবহৃত হয়নি বলে লক্ষ্যস্থলে পৌছিয়ে দেয়া অর্থ হয়েছে এবং তা করা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাধ্যায়ত্ত নয় বলে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। পক্ষান্তরে পথ প্রদর্শন রাসূলে করীমের সাধ্যায়ত্ত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَىٰ صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ “হে নবী। আর আপনি অবশ্যই সরল সঠিক দৃঢ় ঋজু পথ প্রদর্শন করেন [সূরা আশ-শূরা: ৫২]
কিন্তু লক্ষ্যস্থলে পৌছিয়ে দেয়ার কাজ কেবলমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট। তাই তিনি নিজেই ঘোষণা করেছেন, وَلَهَدَيْنَاهُمْ صِرَاطًا مُسْتَقِيمًا “আর অবশ্যই আমরা তাদেরকে সরল সোজা সুদৃঢ় পথে পৌছিয়ে দিতাম।[সূরা আন-নিসা: ৬৮] সূরা আল-ফাতিহা’র আলোচ্য আয়াতে হেদায়েত শব্দের পর إلى শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি। ফলে এর অর্থ হবে সোজা সুদৃঢ় পথে মনজিলের দিকে চালনা করা। অর্থাৎ যেখানে বান্দাহ আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে শুধু এতটুকু বলে না যে, হে আল্লাহ্! আপনি আমাদেরকে সোজা সুদৃঢ় পথের সন্ধান দিন। বরং বলে, হে আল্লাহ, আপনি আমাদেরকে সরল সুদৃঢ় পথে চলবার তাওফীক দিয়ে মনজিলে পৌছিয়ে দিন। কেননা শুধু পথের সন্ধান পাইলেই যে সে পথ পাওয়া ও তাতে চলে মনজিলে পোঁছা সম্ভবপর হবে তা নিশ্চিত নয়। কিন্তু সিরাতে মুস্তাকীম কি? সিরাত শব্দের অর্থ হচ্ছে, রাস্তা বা পথ। আর মুস্তাকীম হচ্ছে, সরল সোজা। সে হিসেবে সিরাতে মুসতাকীম হচ্ছে, এমন পথ, যা একেবারে সোজা ও ঋজু, প্রশস্ত ও সুগম; যা পথিককে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌছিয়ে দেয়; যে পথ দিয়ে লক্ষ্যস্থল অতি নিকটবর্তী এবং মনযিলে মাকছুদে পৌছার জন্য যা একমাত্র পথ, যে পথ ছাড়া লক্ষ্যে পৌছার অন্য কোন পথই হতে পারে না।
আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ আমারও রব তোমাদেরও রব, অতএব একমাত্র তারই দাস হয়ে থাক। এটাই হচ্ছে সিরাতুম মুস্তাকীম-সঠিক ও সুদৃঢ় ঋজু পথ [সূরা মারইয়াম: ৩৬] অর্থাৎ আল্লাহকে রব স্বীকার করে ও কেবল তারই বান্দাহ হয়ে জীবন যাপন করলেই সিরাতুম মুস্তাকীম অনুসরণ করা হবে। অন্যত্র ইসলামের জরুরী বিধি-বিধান বর্ণনা করার পর আল্লাহ তা'আলা বলেন, “আর এটাই আমার সঠিক দৃঢ় পথ, অতএব তোমরা এই পথ অনুসরণ করে চল। এছাড়া আরও যত পথ আছে, তাহার একটিতেও পা দিও না; কেননা তা করলে সে পথগুলো তোমাদেরকে আল্লাহর পথ হতে বিচ্ছিন্ন করে দিবে-ভিন্ন দিকে নিয়ে যাবে। আল্লাহ তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন এ উদ্দেশ্যে, যেন তোমরা ধ্বংসের পথ হতে আত্মরক্ষা করতে পার [সূরা আল-আনআমঃ ১৫৩] একমাত্র আল্লাহর নিকট থেকে যে পথ ও বিধি-বিধান পাওয়া যাবে, তাই মানুষের জন্য সঠিক পথ। আল্লাহ বলেন, “প্রকৃত সত্য-সঠিক-ঋজু-সরল পথ প্রদর্শন করার দায়িত্ব আল্লাহর উপর, যদিও আরও অনেক বাঁকা পথও রয়েছে। আর আল্লাহ চাইলে তিনি সব মানুষকেই হেদায়াতের পথে পরিচালিত করতেন [সূরা আন-নাহ্ল: ৯]
সিরাতে মুসতাকীমের তাফসীর কোন কোন মুফাসসির করেছেন, ইসলাম। আবার কারও কারও মতে, কুরআন। [আত-তাফসীরুস সহীহ] বস্তুত: আল্লাহর প্রদত্ত বিশ্বজনীন দ্বীনের অন্তর্নিহিত প্রকৃত রূপ ‘সিরাতুল মুস্তাকীম’ শব্দ হতে ফুটে উঠেছে। আল্লাহ্ তা'আলার দাসত্ব কবুল করে তারই বিধান অনুসারে জীবন যাপন করার পথই হচ্ছে সিরাতুল মুস্তাকীম এবং একমাত্র এই পথে চলার ফলেই মানুষ আল্লাহর নিয়ামত ও সন্তোষ লাভ করতে পারে। সে একমাত্র পথই মানব জীবনের প্রকৃত ও চূড়ান্ত সাফল্যের জন্য একান্ত অপরিহার্য। তাই সে একমাত্র পথে চলার তওফীক প্রার্থনা করার শিক্ষা দেয়া হয়েছে এই আয়াতটিতে। কিন্তু আল্লাহর নিকট হতে এই পথ কিরূপে পাওয়া যেতে পারে? সে পথ ও পন্থা নির্দেশ করতে গিয়ে আল্লাহ এর তিনটি সুস্পষ্ট পরিচয় উল্লেখ করেছেনঃ
১. এই জীবন কিভাবে যাপন করতে হবে তা তাদের নিকট হতে গ্রহণ করতে হবে, যারা উক্ত বিধান অনুযায়ী জীবন যাপন করে আল্লাহর নিকট হতে নিয়ামত ও অসীম অনুগ্রহ লাভ করেছে।
২. এই পথের পথিকদের উপর আল্লাহর গজব নাযিল হয় নি, অভিশপ্তও তারা নয়।
৩, তারা পথভ্রান্ত লক্ষ্যভ্রষ্টও নয়। পরবর্তী আয়াতসমূহে এ কথা কয়টির বিস্তারিত আলোচনা আসছে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৬) আমাদেরকে সরল পথ দেখাও;
তাফসীর:
اهدِنَا (হিদায়াত) শব্দটি কয়েকটি অর্থে ব্যবহার হয়। যেমন, পথের দিক নির্দেশ করা, পথে পরিচালনা করা এবং গন্তব্যস্থানে পৌঁছিয়ে দেওয়া। আরবীতে এটাকে ‘ইরশাদ’, ‘তাওফীক্ব’, ‘ইলহাম’ এবং ‘দালালাহ’ ইত্যাদি শব্দে আখ্যায়িত করা হয়। অর্থ হল, আমাদেরকে সঠিক পথের দিকে দিক নির্দেশ কর, এ পথে চলার তাওফীক্ব দাও এবং এর উপর প্রতিষ্ঠিত রাখ, যাতে আমরা (আমাদের অভীষ্ট) তোমার সন্তুষ্টি লাভ করতে পারি। পক্ষান্তরে সরল-সঠিক পথ কেবল জ্ঞান-বুদ্ধি দ্বারা অর্জিত হয় না। এই সরল-সঠিক পথ হল সেই ‘ইসলাম’ যা নবী করীম (সাঃ) বিশ্ববাসীর সামনে পেশ করেছেন এবং যা বর্তমানে ক্বুরআন ও সহীহ হাদীসের মধ্যে সুরক্ষিত।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৬-৭ নং আয়াতের তাফসীর:
‘আমাদেরকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করুন।’অর্থাৎ আমাদেরকে সরল পথ প্রদর্শন করত আপনার সাথে সাক্ষাত পর্যন্ত তার ওপর বহাল থাকার তাওফীক দান করুন। (তাফসীর মুয়াসসার, অত্র আয়াতের তাফসীর)
হিদায়াত (هِدَايَةٌ) দুই প্রকার:
১. هِدَايَةُ الْاِرْشَادِ وَالْدَّلَالَةِ
(হিদায়াতুল ইরশাদ ওয়াদ দালালাহ): পথ প্রদর্শন ও নির্দেশনামূলক হিদায়াত। নাবী-রাসূলসহ সকল মানুষ এ প্রকার হিদায়াত বা পথপ্রদর্শন করতে পারে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَإِنَّكَ لَتَهْدِيْ إِلٰي صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ)
“তুমি অবশ্যই সরল পথের পথ প্রদর্শন করবে।”(সূরা শুরা ৪২:৫২) অর্থাৎ সরল পথের পথ নির্দেশনা দিবে।
২. هِدَايَةُ التَّوْفِيْقِ
(হিদায়াতুত্ তাওফীক): সরল সঠিক পথ গ্রহণ ও তাতে প্রতিষ্ঠিত থাকার তাওফীক দান করা। এ প্রকার হিদায়াত শুধু আল্লাহ তা‘আলার হাতে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(إِنَّكَ لَا تَهْدِيْ مَنْ أَحْبَبْتَ وَلٰكِنَّ اللّٰهَ يَهْدِيْ مَنْ يَّشَا۬ءُ)
“তুমি যাকে ভালবাস, ইচ্ছা করলেই তাকে সৎপথে হিদায়াত দিতে পারবে না। তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সৎপথে হিদায়াত দেন। (সূরা কাসাস ২৮:৫৬)
সিরাতুল মুস্তাকীম
(اَلصِّرَاطُ الْمُسْتَقِيْمُ)
সম্পর্কে ইমাম সাওরী (রহঃ) বলেন: সিরাতুল মুস্তাকীম হল আল্লাহ তা‘আলার কিতাব। কেউ বলেছেন: ইসলাম, বিশিষ্ট তাবিঈ মুজাহিদ (রহঃ) বলেন: সিরাতুল মুস্তাকীম দ্বারা উদ্দেশ্য হল اَلْحَقُّ বা সত্য। তাবিঈ মুজাহিদের মতটিই অন্যান্য মুফাসসিরদের মতামতকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং পূর্বের মতামতের সাথেও এর কোন বিরোধ নেই। (তাফসীর ইবনে কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)
তবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত-
(اَلصِّرَاطُ الْمُسْتَقِيْمُ)
(সিরাতুল মুস্তাকীম) হল اَلْإِسْلَامُ (ইসলাম)। (তাফসীর মুয়াসসার পৃঃ ১) সুতরাং বলা যেতে পারে যে, ওয়াহী তথা কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে পূর্ণভাবে ইসলামের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার নামই হল সিরাতুল মুস্তাকীমে থাকা।
সিরাতুল মুস্তাকীমের বর্ণনা দিতে একদা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজ হাতে একটি লম্বা রেখা টানলেন এবং বললেন, এটা হল আল্লাহ তা‘আলার সরল পথ। আরো কিছু রেখা তাঁর ডান ও বাম পাশে টানলেন এবং বললেন, এগুলো হল এমন পথ যার ওপর শয়তান বসে আছে এবং সে এ পথগুলোর দিকে মানুষকে আহ্বান করে। তারপর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তিলায়ওয়াত করলেন
(وَأَنَّ هٰذَا صِرَاطِيْ مُسْتَقِيْمًا)
‘আর নিশ্চয়ই এ পথই আমার সহজ-সরল পথ’- আয়াত । (মুসনাদ আহমাদ হা: ৪১৪২, সহীহ) এ সিরাতে মুস্তাকীম হল, মুসলিম উম্মাহর মূল ভিত্তি। এ সরল পথ থেকে দূরে সরে পড়ার কারণে উম্মত বিভিন্ন দলে উপদলে বিভক্ত। অতএব সেই সরল পথে ফিরে আসতে হলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নির্দেশ মত সকল পথ, মত ও তরীকা বর্জন করে কুরআন ও সহীহ হাদীসের মাধ্যমে ইসলাম মেনে চলতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا كِتَابَ اللّٰهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ
আমি তোমাদের মাঝে দু’টি বিষয় রেখে যাচ্ছি, যতদিন তা আকড়ে ধরে থাকবে ততদিন পথভ্রষ্ট হবে না। সে দু’টি বিষয় হল, আল্লাহ তা‘আলার কিতাব কুরআন ও তাঁর নাবীর সুন্নাত (হাদীস)। (মুয়াত্তা মালিক হা: ৩৩৩৮, হাকীস, সহীহ হা: ২৯১)
(صِرَاطَ الَّذِیْنَ اَنْعَمْتَ...)
-যাদের প্রতি আল্লাহ তা‘আলা অনুগ্রহ করেছেন তাদের বর্ণনা এ আয়াতে না থাকলেও সূরা নিসার ৬৯ নং আয়াতে এসেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَمَنْ يُّطِعِ اللّٰهَ وَالرَّسُوْلَ فَأُولٰٓئِكَ مَعَ الَّذِيْنَ أَنْعَمَ اللّٰهُ عَلَيْهِمْ مِّنَ النَّبِيِّيْنَ وَالصِّدِّيْقِيْنَ وَالشُّهَدَآءِ وَالصّٰلِحِيْنَ ج وَحَسُنَ أُولٰ۬ئِكَ رَفِيْقًا)
“আর যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং রাসূলের আনুগত্য করবে সে নাবী, সিদ্দীক, শহীদ ও সৎ কর্মশীল- যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন- তাদের সঙ্গী হবে এবং তারা কতই না উত্তম সঙ্গী!” (সূরা নিসা ৪:৬৯) অর্থাৎ আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্তরা চার শ্রেণির: নাবী-রাসূল, সিদ্দীক, শহীদ ও সালিহ বা সৎ কর্মশীলগণ।
(غَيْرِ الْمَغْضُوْبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّا۬لِّيْنَ)
‘তাদের পথ নয় যারা গযবপ্রাপ্ত এবং তাদের পথও নয় যারা পথভ্রষ্ট’আদি বিন হাতেম (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: গযবপ্রাপ্ত (الْمَغْضُوبِ) হল ইয়াহূদীগণ, আর পথভ্রষ্ট (الضَّا۬لِّيْنَ) হল খ্রিস্টানগণ। (তিরমিযী হা: ২৯৫৪, সহীহ, ইবনে হিব্বান ৮/৪৮)
এরূপ আরো অনেক মত রয়েছে। যাতে ইয়াহূদীদেরকে গযবপ্রাপ্ত ও খ্রিস্টানদেরকে পথভ্রষ্ট বলা হয়েছে। (তাফসীরে তাবারী ১/১৪৬) ইয়াহূদীগণ গযবপ্রাপ্ত, কারণ তারা জানত কিন্তু মানত না, আর খ্রিস্টানগণ পথভ্রষ্ট কারণ তারা না জেনেশুনেই আমল করত। (আযওয়াউল বায়ান ১/৬০)
ইয়াহূদীদের ব্যাপারেই আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
(فَبَا۬ءُوْا بِغَضَبٍ عَلٰی غَضَبٍ)
“অতঃপর তারা গযবের পর গযবে পতিত হয়েছে।”(সূরা বাকারাহ ২:৯০) আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(قُلْ ھَلْ اُنَبِّئُکُمْ بِشَرٍّ مِّنْ ذٰلِکَ مَثُوْبَةً عِنْدَ اللہِﺚ مَنْ لَّعَنَھُ اللہُ وَغَضِبَ عَلَیْھِ)
“আমি কি তোমাদেরকে এর চেয়ে নিকৃষ্ট পরিণামের সংবাদ দেব যা আল্লাহর নিকট আছে? যাকে আল্লাহ লা‘নত করেছেন এবং যার ওপর তিনি গযব দিয়েছেন (এরা প্রতিদানের দিক দিয়ে কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট)।”(সূরা মায়িদাহ ৫:৬০)
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:
(إِنَّ الَّذِينَ اتَّخَذُوا الْعِجْلَ سَيَنَالُهُمْ غَضَبٌ مِّنْ رَّبِّهِمْ وَذِلَّةٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا)
“নিশ্চয়ই যারা গো-বৎসকে মা‘বূদরূপে গ্রহণ করেছে, পার্থিব জীবনে তাদের ওপর তাদের প্রতিপালকের গযব ও লাঞ্ছনা পতিত হবেই।”(সূরা আরাফ ৭:১৫২)
আর পথভ্রষ্ট খ্রিস্টানদের ব্যাপারে মু’মিনদেরকে সতর্ক করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(لَا تَغْلُوْا فِیْ دِیْنِکُمْ غَیْرَ الْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعُوْٓا اَھْوَا۬ئَ قَوْمٍ قَدْ ضَلُّوْا مِنْ قَبْلُ وَاَضَلُّوْا کَثِیْرًا وَّضَلُّوْا عَنْ سَوَا۬ئِ السَّبِیْلِ)
“তোমরা তোমাদের দীন সম্বন্ধে অন্যায়ভাবে বাড়াবাড়ি কর না এবং যে সম্প্রদায় ইতোপূর্বে পথভ্রষ্ট হয়েছে, অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে ও সরল পথ হতে বিচ্যুত হয়েছে, তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ কর না।”(সূরা মায়িদাহ ৫:৭৭)
অতএব আমরা প্রত্যহ সালাতে আল্লাহ তা‘আলার কাছে নাবী রাসূলদের পথে চলার এবং ইয়াহূদ খ্রিস্টানদের পথে না চলার বিনীত আবেদন করি, কিন্তু বাস্তব জীবনে যদি সচেতন না হই তাহলে এ আবেদন ফলপ্রসূ হবে না। সুতরাং বাস্তবে সেভাবে চলা প্রতিটি মু’মিনের একান্ত কর্তব্য এবং মনে রাখতে হবে যে, খ্রিস্টানদের স্বভাব হল না জেনে অন্ধ ও অজ্ঞের মত ইবাদত করা। আর ইয়াহূদীদের স্বভাব হল জানার পরও সে অনুযায়ী আমল না করা। সুতরাং খাঁটি মুসলিমের পথ হল কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে জেনে-শুনে ইবাদত করা এবং কুরআন ও সহীহ হাদীস জানতে পারলে মাযহাব, তরীকা ও দাপ-দাদার দোহাই না দিয়ে আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে সে অনুযায়ী আমল করা। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের তাওফীক দান করুন। আমীন!
আমীন বলার ফযীলত ও তাৎপর্য:
(آمِيْن) আমীন অর্থ- হে আল্লাহ! তুমি কবূল কর। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন সালাতে সূরা ফাতিহা পড়া শেষ করতেন, তখন আমীন বলতেন। যদি তাঁর কিরাআত আওয়াজের সাথে হতো তাহলে আমীনও সেরূপ আওয়াজের সাথে হতো এবং পেছনে যারা থাকতেন তারাও আমীন বলতেন।
সাহাবী ওয়ায়েল ইবনু হুজর (রাঃ) বলেন:
سَمِعْتُ النَّبِيَّ صلي اللّٰه عليه و سلم قَرَأَ ( غَيْرِ الْمَغْضُوْبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّيْنْ) فَقَالَ آمِيْن وَمَدَّ بِهَا صَوْتَهُ
আমি নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে “গাইরিল মাগযূবি ‘আলাইহিম ওয়ালায-যল্লীন” পড়ার পর সরবে আমীন বলতে শুনেছি। (তিরমিযী হা: ২৪৮, মিশকাত হা: ৮৪৫, সহীহ)
আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
إِذَا أَمَّنَ الإِمَامُ فَأَمِّنُوا فَإِنَّهُ مَنْ وَافَقَ تَأْمِينُهُ تَأْمِيْنَ الْمَلاَئِكَةِ غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
ইমাম যখন আমীন বলবে তখন তোমরাও আমীন বল। কেননা যার আমীন বলা ফেরেশতাদের আমীনের সাথে মিলে যাবে তার পূর্বের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেয়া হয়। (সহীহ বুখারী হা: ৭৮০, সহীহ মুসলিম হা: ৯৪২)
সাহাবী ওয়ায়েল ইবনু হুজর (রাঃ) হতে আরো বর্ণিত আছে, তিনি বলেন:
كَانَ رَسُولُ اللّٰهِ -صلي اللّٰه عليه وسلم- إِذَا قَرَأَ ( وَلاَ الضَّالِّينَ) قَالَ آمِين وَرَفَعَ بِهَا صَوْتَهُ
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন “ওয়ালায-যল্লীন”বলতেন তখন আমীন বলতেন। তিনি আমীনের আওয়াজটা জোরে করতেন। (আবূ দাউদ হা: ৯৩২, সহীহ) ইমাম বুখারী বলেন:
بَاب جَهْرِ الْإِمَامِ بِالتَّأْمِينِ وَقَالَ عَطَاءٌ آمِينَ دُعَاءٌ أَمَّنَ ابْنُ الزُّبَيْرِ وَمَنْ وَرَاءَهُ حَتّٰي إِنَّ لِلْمَسْجِدِ لَلَجَّةً....
“অনুচ্ছেদ: ইমামের উচ্চৈঃস্বরে আমীন বলা সম্পর্কে, তাবেয়ী আত্বা (রহঃ) বলেন: আমীন হল দু‘আ। সাহাবী ইবনু যুবাইর (রাঃ) ও তাঁর পেছনের মুক্তাদীরা এমন জোরে আমীন বলতেন যাতে মসজিদ আওয়াজে গমগম করে উঠত...।” (সহীহ বুখারী ১/১০৭, কিতাবুল আযান, অনুচ্ছেদ: ইমামের উচ্চৈঃস্বরে আমীন বলা সম্পর্কে) তখন থেকে আজও পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলার ঘর কা‘বা এবং নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর মাসজিদ আমীনের আওয়াজে গমগম করছে। আমীন সরবে বলার স্বপক্ষে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে
رَفَعَ ، مَدَّ ، جَهَرَ ، اِرْ تَجَّ
এ চারটি শব্দ বর্ণিত হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সরব কিরাআতে আমীন কখনও নিরবে ছিল না। (আবূ দাউদ হা: ৯৩২, ৯৩৪, তিরমিযী হা: ২৪৮, সহীহ) এটাই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাত।
আয়িশাহ (রাঃ) ও ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: তোমাদের সালাম করা ও সালাতে উঁচু আওয়াজে আমীন বলাতে ইয়াহূদীদের যত হিংসা হয় আর কোন জিনিসে ওদের এত হিংসা হয় না। অতএব তোমরা খুব বেশি বেশি করে আমীন বলো। (সহীহ ইবনু খুযাইমাহ হা: ১৫৮৫, ইবনু মাযাহ হা: ৮৫৬) তাই ইয়াহূদীদের পথে না গিয়ে সহীহ হাদীসের ওপর আমল করা কর্তব্য। আমীন বলার ফযীলত যে কত বড় তা গভীরভাবে অনুধাবন করা উচিত। কিন্তু নিয়ম হলো ইমামের আমীন শুনে মুক্তাদীরা আমীন বলবে, ইমামের আগে নয় এবং পৃথকভাবে পরেও নয়। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সঠিকভাবে আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন!
সূরা থেকে শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ:
১. ‘বিসমিল্লাহ...’সূরা ফাতিহার প্রথম আয়াত। তবে সালাতে তা নিরবে পড়তে হবে।
২. সূরা ফাতিহার একাধিক নাম ও ফযীলত অবগত হলাম।
৩. সালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা অপরিহার্য, কারণ সূরা ফাতিহা ছাড়া কোন ব্যক্তির কোন সালাত হবে না।
৪. তাওহীদ এর সঠিক পরিচয় এবং তাওহীদ তিন প্রকার- এ সম্পর্কে অবগত হলাম।
৫. সূরা ফাতিহায় আমরা দু‘আর পদ্ধতি অবগত হই, প্রথমে আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করতে হবে তারপর তাঁর কাছে চাইতে হবে।
৫. আল্লাহ তা‘আলা প্রতিফল দিবসের মালিক, তিনি মানুষের পার্থিব জীবনের প্রতিটি ভাল-মন্দ কর্মের প্রতিফল দেবেন। সেজন্য প্রত্যেক মানুষকে মৃত্যুর পর পুনরুত্থান করাবেন।
৬. সিজদা, সালাত, সিয়াম ও দু‘আসহ সকল প্রকার ইবাদত পাওয়ার একমাত্র হকদার আল্লাহ তা‘আলা এবং সকল প্রকার আবেদন ও নিবেদন একমাত্র তাঁরই কাছে হতে হবে।
৭. জানা ও মানা দু’টিই আবশ্যক। জানার পর না মানলে যেমন নিন্দনীয় ও অমার্জনীয় তেমনি না জেনে আমল করাও নিন্দনীয়।
৮. এ সূরায় আল্লাহ তা‘আলার তাওহীদ এর বিষয়টি পূর্ণাঙ্গভাবে আলোচিত হয়েছে।
৯. সরবে কিরাআতবিশিষ্ট সালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ শেষে ইমাম মুক্তাদি সকলের সরবে আমীন বলা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও সাহাবীদের সুন্নাত।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৬-৭ নং আয়াতের তাফসীর
এর বর্ণনা পূর্বেই গত হয়েছে যে, বান্দার এ কথার উপর মহান আল্লাহ বলেন, এটা আমার বান্দার জন্যে এবং আমার বান্দার জন্যে ঐ সব কিছুই রয়েছে যা সে চাইবে।' এ আয়াতটি সীরাতে মুসতাকীমের তাফসীর এবং ব্যাকরণবিদ বা নাহ্বীদের নিকট এটা ‘সীরাতে মুসতাকীম' হতে বদল হয়েছে এবং আত বায়ানও হতে পারে। আল্লাহ তা'আলাই এ সম্পর্কে সবচাইতে ভাল জানেন। আর যারা আল্লাহর পুরস্কার লাভ করেছে তাদের বর্ণনা সূরা-ই-নিসার মধ্যে এসেছে। ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবি)
অর্থাৎ ‘এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও রাসূলের অনুগত হয়, এরূপ ব্যক্তিগণও ঐ মহান ব্যক্তিগণের সহচর হবেন যাদের প্রতি আল্লাহ তা'আলা অনুগ্রহ করেছেন, অর্থাৎ নবীগণ, সিদ্দীকগণ, শহীদগণ ও নেক্কারগণ। আর ঐ মহাপুরুষগণ উত্তম সহচর। এ অনুগ্রহ আল্লাহর পক্ষ হতে এবং সর্বজ্ঞ হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট।' (৪:৬৯-৭০)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে ঐ সব ফেরেশতা, নবী, সিদ্দীক, শহীদ এবং সৎলোকের পথে পরিচালিত করুন যাদেরকে আপনি আপনার আনুগত্য ও ইবাদতের কারণে পুরস্কৃত করেছেন।” উল্লিখিত আয়াতটি নিম্ন বর্ণিত আয়াতের মত। (৪:৬৯) (আরবি)
হযরত রাবী' বিন আনাস (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে নবীগণ। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত মুজাহিদ (রঃ) এর অর্থ নিয়েছেন মুমিনগণ’ এবং হযরত অকী (রঃ) নিয়েছেন মুসলমানগণ।' আবদুর রহমান (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও তাঁর সহচরবর্গ (রাঃ)। হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) কথাই বেশী ব্যাপক। আল্লাহ তা'আলাই এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল জানেন (আরবি) এই নামক শব্দটিতে জমহুরের পঠনে (আরবি) (গাইরি) আছে অর্থাৎ (আরবি) অক্ষরের নীচে ‘যের ' এবং তা বিশেষণ করা হয়েছে। আল্লামা যামাখশারী বলেছেন যে, (আরবি) কে যবরের সঙ্গে পড়া হয়েছে এবং তা ‘হাল হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং হযরত উমার বিন খাত্তাবের (রাঃ) পঠন এটাই (আরবি) এর সর্বনামটি ওর (আরবি) এবং হচ্ছে (আরবি), তাহলে অর্থ হচ্ছেঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে সরল সোজা পথ প্রদর্শন করুন, ঐ সব লোকের পথ যাদেরকে আপনি পুরস্কৃত করেছেন, যারা হিদায়াত বা সুপথ প্রাপ্ত এবং অটল অবিচলিত ছিলেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) অনুগত ছিলেন। যারা আল্লাহর নির্দেশ পালনকারী ও নিষিদ্ধ কাজ হতে দূরে-বহুদূরে অবস্থানকারী ছিলেন। আর ঐ সব লোকের পথ হতে রক্ষা করুন যাদের উপর আপনার ধূমায়িত ক্রোধ ও অভিশাপ বর্ষিত হয়েছে, যারা সত্যকে জেনে শুনেও তা থেকে দূরে সরে গেছে এবং পথভ্রষ্ট লোকেদের পথ হতেও আমাদেরকে বাঁচিয়ে রাখুন যাদের সঠিক পথ সম্পর্কে কোন ধারণা ও জ্ঞানই নেই, যারা পথভ্রষ্ট হয়ে লক্ষ্যহীনভাবে ইতস্ততঃ ঘুরে বেড়ায় এবং তাদেরকে সরল, সঠিক পুণ্য পথ দেখানো হয় না।
কথার মধ্যে খুব বেশী গুরুত্ব আনয়নের জন্যে (আরবি) অক্ষরটিকে (আরবি) এর পরে আনা হয়েছে, যেন জানতে পারা যায় যে, এখানে ভুলপথ দুইটি। একটি ইয়াহূদীদের পথ এবং অপরটি খৃষ্টানদের পথ। কোন কোন নাবী বা ব্যাকরণবিদ বলেছেন যে, এখানে (আরবি) শব্দটি (আরবি) বা প্রভেদ সৃষ্টির জন্যে এসেছে। তা হলে এটা (আরবি) হতে পারে। কেননা যাদের উপর অনুগ্রহ করা হয়েছে তাদের মধ্য হতে এ (আরবি) হচ্ছে অথচ এরা তাদের অন্তর্ভুক্তই ছিল না। কিন্তু আমরা যে তাফসীর করেছি এটাই বেশী উত্তম। আরব কবিদের কবিতায় এরূপ দেখা যায় যে, তারা বিশেষ্যকে লোপ করে শুধুমাত্র বিশেষণের বর্ণনা দিয়ে থাকেন। যেমন নিম্নের কবিতায় রয়েছেঃ (আরবি)
এখানে (আরবি) শব্দের আগে (আরবি) নামক বিশেষ্যটিকে সোপ করা হয়েছে এবং পরবর্তী পর্যায়ের বিশেষণকে যথেষ্ট মনে করা হয়েছে। এভাবেই আয়াতেও বিশেষণের বর্ণনা রয়েছে এবং (আরবি)-নামক বিশেষ্যকে লোপ করা হয়েছে (আরবি) এর ভাবার্থ হচ্ছে (আরবি) অর্থাৎ অভিশপ্তদের পথে নয় (আরবি) এর উল্লেখ না করে (আরবি) এর উল্লেখই যথেষ্ট মনে করা হয়েছে। পূর্ব শব্দগুলিই এটা প্রমাণ করছে। পূর্বে এ শব্দটি দুইবার এসেছে। কেউ কেউ বলেন যে (আরবি) এর শব্দটি অতিরিক্ত। তাদের মতে বাক্যটি হবে নিম্নরূপঃ (আরবি) এবং আরব কবিদের কবিতাতেও এর সাক্ষ্য রয়েছে। যেমন কবি আজ্জাজ বলেনঃ (আরবি)
এখানে (আরবি) শব্দটি অতিরিক্ত। কিন্তু সঠিক কথা সেইটাই যা আমরা ইতিপূর্বে লিখেছি। হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) হতে সহীহ সনদে (আরবি) পড়াও বর্ণিত আছে। আবু উবাইদ আল কাসেম বিন সাল্লাম “কিতাবু ফাযাইলিল কুরআন' এর মধ্যে একথা বর্ণনা করেছেন। হযরত উবাই বিন কা'ব (রাঃ) হতেও এরূপ বর্ণিত আছে। এ মহান ব্যক্তিদ্বয় হতে যদি এটা ব্যাখ্যাদান রূপেও প্রকাশ পেয়ে থাকে তবে তো এটা আমাদের মতেরই সহায়ক হবে। তা হলো এই যে, (আরবি) কে (আরবি) এর জন্যে আনা হয়েছে, যাতে এ সন্দেহ না থাকে যে, এটা (আরবি) এর (আরবি) উপর হয়েছে এবং এ জন্যেও যে, যাতে দুইটি পথের পার্থক্য অনুধাবন করা যায়, যেন প্রত্যেকেই এ দুটো পথ থেকে বেঁচে থাকে। ঈমানদারদের পন্থা তো এটাই যে, সত্যের জ্ঞানও থাকতে, হবে এবং তার আমলও থাকতে হবে। ইয়াহূদীদের আমল নেই এবং খৃষ্টানদের জ্ঞান নেই। এজন্যেই ইয়াহূদীরা অভিশপ্ত হলো এবং খৃষ্টানেরা হলো পথভ্রষ্ট। কেননা, জেনে শুনে ইচ্ছাকৃতভাবে আমল পরিত্যাগ করা লা'নত বা অভিশাপের কারণ হয়ে দাড়ায়। খৃষ্টানেরা যদিও একটা জিনিসের ইচ্ছে করে, কিন্তু তার সঠিক পথ তারা পায় না। কেননা, তাদের কর্মপন্থা ভুল এবং তারা সত্যের অনুসরণ হতে দূরে সরে পড়েছে। অভিশাপ ও পথভ্রষ্টতা এই দুই দলের তো রয়েছেই কিন্তু ইয়াহুদী অভিশাপের অংশে একধাপ এগিয়ে রয়েছে। যেমন কুরআন কারীমে রয়েছেঃ (আরবি)
অর্থাৎ এরা পূর্ব হতেই পথভ্রষ্ট এবং অনেককেই পথভ্রষ্ট করেছে এবং তারা সোজা পথ হতে ভ্রষ্ট রয়েছে। (৫:৭৭) একথার সমর্থনে বহু হাদীস ও বর্ণনা পেশ করা যেতে পারে। মুসনাদ-ই-আহমাদে আছে যে, হযরত আদী বিন হাতিম (রাঃ) বলেছেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সেনাবাহিনী একদা আমার ফুফুকে এবং কতকগুলো লোককে বন্দী করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এনে হাজির করেন। আমার ফুফু তখন বলেনঃ “আমাকে দেখা শোনা করার লোক দূরে সরে রয়েছে এবং আমি একজন অধিক বয়স্কা অচলা বৃদ্ধা। আমি কোন খিদমতের যোগ্য নই। সুতরাং দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিন। আল্লাহ আপনার উপরও দয়া করবেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “যে তোমার খবরাখবর নিয়ে থাকে সে ব্যক্তিটি কে?' তিনি বললেন-আদী বিন হাতিম।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “সে কি ঐ ব্যক্তি যে আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ) হতে এদিক ওদিক পালিয়ে বেড়াচ্ছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বিনা শর্তে মুক্তি দিয়ে দেন। তারপর যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফিরে আসেন তখন তার সাথে আর একটি লোক ছিলেন। খুব সম্ভব তিনি হযরত আলীই (রাঃ) ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ যাও, তার কাছে গিয়ে সোয়ারীর প্রার্থনা কর।' আমার ফুফু তাঁর কাছে প্রার্থনা জানালে সঙ্গে সঙ্গে তা মঞ্জুর হয় এবং তিনি সোয়ারী পেয়ে যান। তিনি এখান হতে মুক্তি লাভ করে সোজা আমার নিকট চলে আসেন এবং বলেনঃ রাসূলুল্লাহর (সঃ) দানশীলতা তোমার পিতা হাতিমকেও ছাড়িয়ে গেছে। তার কাছে একবার কেউ গেলে আর শূন্য হস্তে ফিরে আসে না।' একথা শুনে আমিও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাজির হই। আমি দেখি যে, ছোট ছেলে ও বৃদ্ধা স্ত্রীলোকেরা তাঁর কাছে অবাধে যাতায়াত করছে এবং তিনি তাদের সাথে অকুণ্ঠচিত্তে অকৃত্রিমভাবে আলাপ আলোচনা করছেন। এ দেখে আমার বিশ্বাস হলো যে, তিনি কাইসার ও কিসরার মত বিশাল রাজত্ব ও সম্মানের অভিলাষী নন। তিনি আমাকে দেখে বলেনঃ ‘আদী! (আরবি) বলা হতে পালিয়ে বেড়াচ্ছ কেন? আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ উপাসনার যোগ্য আছে কি? (আরবি) বলা হতে এখন তুমি মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ কেন? মহা সম্মানিত আল্লাহ পাক থেকে বড় আর কেউ আছে কি? (তার এই কথাগুলো এবং তাঁর সরলতা ও অকৃত্রিমতা আমার উপর এমনভাবে দাগ কাটলো ও ক্রিয়াশীল হলো যে,) আমি তৎক্ষণাৎ কালেমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেলাম। তাতে তিনি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন এবং বলেনঃ (আরবি) দ্বারা ইয়াহূদকে বুঝানো হয়েছে এবং (আরবি) দ্বারা খৃষ্টানগণকে বুঝানো হয়েছে। আরও একটি হাদীসে আছে যে, হযরত আদীর (রাঃ) প্রশ্নের উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই তাফসীরই করেছিলেন। এ হাদীসের অনেক সনদ আছে এবং বিভিন্ন শব্দে সে সব বর্ণিত হয়েছে।
বানূ কাইনের একটি লোক 'ওয়াদীউল কুরায়' রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে এটাই প্রশ্ন করেছিলেন এবং উত্তরে তিনি একথাই বলেছিলেন। কোন কোন বর্ণনায় তাঁর নাম দেয়া হয়েছে আবদুল্লাহ বিন আমর (রাঃ)। আল্লাহ তাআলাই এ সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জানেন। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)- এর তাফসীরে হযরত আবু যার (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) এবং আরও বহু সাহাবী (রাঃ) হতেও এ তাফসীর মকল করা হয়েছে। হযরত রাবী' বিন আনাস (রাঃ) এবং হযরত আবদুর রহমান বিন যায়েদ বিন আসলাম (রঃ) প্রভৃতি মনীষীগণও একথাই বলেন। বরং ইবনে আবি হাতিম (রঃ) তো বলেন যে, মুফাসসিরগণের মধ্যে এ ব্যাপারে কোন মতভেদ নেই। এই ইমামগণের এতোফসীরের একটি দলীল হচ্ছে ঐ হাদীসটি যা ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে। দ্বিতীয় দলীল হচ্ছে সূরা-ই-বাকারার এ আয়াতটি যাতে বানী ইসরাঈলগণকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে। (২:৯০) (আরবি)
এ আয়াতের মধ্যে আছে যে, তাদের উপর অভিশাপের পর অভিশাপ অবতীর্ণ। হয়েছে এবং সূরা-ই-মায়েদার (আরবি) (৫৪৬০) এই আয়াতের মধ্যেও রয়েছে যে, তাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ অবতীর্ণ হয়েছে। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)
অর্থাৎ বানী ইসরাঈলদের মধ্যে যারা কুফরী করেছে তাদের উপর দাউদ (আঃ) ও হযরত ঈসা (আঃ) এর কথায় অভিশাপ দেয়া হয়েছে; কারণ তারা অবাধ্য হয়েছিল ও সীমা অতিক্রম করেছিল। এসব লোক কোন খারাপ কাজ হতে একে অপরকে বাধা দিতো না। নিশ্চয়ই তাদের কাজ ছিল অত্যন্ত জঘন্য। (৫:৭৮-৭৯)
ইতিহাসের পুস্তকসমূহে বর্ণিত আছে যে, যায়েদ বিন আমর বিন নোফাইল যখন খাঁটি ধর্মের অনুসন্ধানে স্বীয় বন্ধুবান্ধব ও সাথী-সঙ্গীসহ বেরিয়ে পড়লেন এবং এদিক ওদিক বিচরণের পর শেষে সিরিয়ায় আসলেন, তখন ইয়াহূদীরা তাদেরকে বললোঃ “আল্লাহর অভিশাপের কিছু অংশ না নেয়া পর্যন্ত আপনারা আমাদের ধর্মে আসতেই পারবেন না। তারা উত্তরে বললেনঃ তা হতে বাঁচার উদ্দেশ্যেই তো আমরা সত্য ধর্মের অনুসন্ধানে বের হয়েছি, কাজেই কিরূপে তা গ্রহণ করতে পারি? তারা খৃষ্টানদের সাথে সাক্ষাৎ করলে তারা বললোঃ “আল্লাহ তা'আলার লা'নত ও অসন্তুষ্টির কিছু অংশ না নেয়া পর্যন্ত আপনারা আমাদের ধর্মেও আসতে পারবেন না। তারা বললেনঃ আমরা এটাও করতে পারি না। তারপর হযরত যায়েদ বিন আমর বিন নোফাইল স্বাভাবিক ধর্মের উপরই রয়ে গেলেন। তিনি মুর্তি পূজা ও স্বগোত্রীয় ধর্মত্যাগ করলেন, কিন্তু ইয়াহুদী ও খৃষ্টান ধর্ম কোন ক্রমেই গ্রহণ করলেন না। তবে তার সঙ্গী সাথীরা খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করলো, কেননা ইয়াহূদীদের ধর্মের সঙ্গে এর অনেকটা মিল ছিল। যায়েদের ধর্মেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন অরাকা বিন নাওফিল। তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নবুওতের যুগ পেয়েছিলেন এবং আল্লাহর হিদায়াত তাঁকে সুপথ প্রদর্শন করেছিল। তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর উপর ঈমান এনেছিলেন ও সেই সময় পর্যন্ত যে ওয়াহী অবতীর্ণ হয়েছিল তিনি তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হউন।
জিজ্ঞাস্যঃ
(আরবি) এবং (আরবি)-এর মধ্যে অতি সামান্য পার্থক্য রয়েছে। এজন্যে উলামা-ই-কিরামের সহীহ মাযহাৰ এই যে, এ পার্থক্য ক্ষমার্হ (আরবি) এর সহীহ মাখরাজ হচ্ছে জিহবার প্রথম প্রান্ত এবং ওর পার্শ্বের চোয়াল। আর (আরবি) এর মাখরাজ হচ্ছে জিহবার এক দিক এবং সম্মুখের উপরের দুই দাঁতের প্রান্ত। দ্বিতীয় কথা এই যে, এই দুটি অক্ষর হচ্ছে (আরবি) এবং (আরবি) সুতরাং যে ব্যক্তির পক্ষে এই দুইটি অক্ষরের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হবে সে যদি কে (আরবি) এর মত পড়ে ফেলে তবে তার অপরাধ অমার্জনীয় নয়, বরং তাকে ক্ষমা সুন্দর চোখে দেখা হবে। একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবি) কে সবচেয়ে সঠিকভাবে পড়তে আমিই পারি। কিন্তু হাদীসটি সম্পূর্ণরূপে ভিত্তিহীন ও দুর্বল।
পরিচ্ছেদ
এই কল্যাণময় ও বরকতপূর্ণ সূরাটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলীর সমষ্টি। এই সাতটি আয়াতে আল্লাহ তা'আলার যোগ্য প্রশংসা, তার শ্রেষ্ঠত্ব, পবিত্র নামসমূহ এবং উচ্চতম বিশেষণের সুন্দর বর্ণনা রয়েছে। সঙ্গে সঙ্গেই রোজ কিয়ামতের বর্ণনা দেয়া হয়েছে এবং বান্দাদের প্রতি নির্দেশ রয়েছে যে, তারা যেন সেই মহান প্রভুর নিকট অত্যন্ত বিনীতভাবে যাচ্ঞা করে, যেন তার কাছে নিজের দারিদ্র ও অসহায়ত্বের কথা অকপটে স্বীকার করে, তাকে সব সময় অংশীবিহীন ও তুলনাবিহীন মনে করে, খাটি অন্তরে তাঁর ইবাদত; তাঁর অহদানিয়াত বা একত্ববাদে বিশ্বাস করে, তার কাছে সরল সোজা পথ ও তার উপর সুদৃঢ় ও অটল থাকার জন্যে নিশিদিন আকুল প্রার্থনা জানায়। এই অবিসম্বাদিত পথই একদিন তাকে রোজ কিয়ামতের পুলসিরাত পার করাবে এবং নবী, সিদ্দীক, শহীদ এবং নেককারদের পার্শ্বে জান্নাতুল ফিরদাউসের নন্দন কাননে স্থান দেবে। সাথে সাথে আলোচ্য সূরাটির মধ্যে যাবতীয় সকার্যাবলী সম্পাদনের প্রতি নিরন্তর উৎসাহ দেয়া হয়েছে যাতে কিয়ামতের দিন বান্দা আত্মকৃত নেকী ও পুন্যসমূহ সঙ্গে নিয়ে যেতে পারে এবং মিথ্যা ও অন্যায় পথে চলা থেকে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে, যাতে কিয়ামতের দিনেও সে বাতিলপন্থীদের দল থেকে দূরে থাকতে পারে। এই বাতিলপন্থী দল হচ্ছে ইয়াহূদী এবং খৃষ্টান।
ধীরস্থির ও সূক্ষ্মভাবে জাগ্রত মস্তিষ্ক নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে দেখলে অতি সহজেই অনুধাবন করা যাবে যে, আল্লাহ তা'আলার বর্ণনারীতি কি সুন্দর! আলোচ্য সূরায় (আরবি) নামক বাক্যাংশে দানের ইসনাদ বা সম্পর্ক আল্লাহর দিকে করা হয়েছে এবং (আরবি) বলা হয়েছে (আরবি) কিন্তু এর ইসনাদ করা হয়নি; বরং এখানে কর্তাকেই লোপ করা হয়েছে এবং (আরবি) বলা হয়েছে। এখানে বিশ্ব প্রভুর মহান মর্যাদার প্রতি যথাযোগ্য লক্ষ্য রাখা হয়েছে। অবশ্য প্রকৃতপক্ষে মূল কর্তা আল্লাহ তা'লাই। যেমন অন্যস্থানে বলা হয়েছে (আরবি) এরূপভাবেই ভ্রষ্টতার ইসনাদ পথভ্রষ্টের দিকেই করা হয়েছে। অথচ অন্য এক জায়গায় আছেঃ (আরবি)
অর্থাৎ আল্লাহ যাকে সুপথ প্রদর্শন করেন সে সুপথ প্রাপ্ত এবং যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন তার কোন বন্ধু ও পথ প্রদর্শক নেই।' (১৮:১৭) আর এক জায়গায় আছে, (আরবি) অর্থাৎ আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার জন্যে কোন পথ প্রদর্শক নেই এবং সে তো স্বীয় অবাধ্যতার মধ্যে বিভ্রান্ত হয়ে ফিরছে?' (৭:১৮৬) এ রকমই আরও বহু আয়াত রয়েছে যদ্দ্বারা একথা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হচ্ছে যে, পথ প্রদর্শনকারী ও পথ বিভ্রান্তকারী হচ্ছেন একমাত্র মহান আল্লাহ।
কাদরিয়্যাহ দল, যারা কতকগুলো অস্পষ্ট আয়াতকে দলীলরূপে গ্রহণ করে বলে থাকে যে, বান্দা তার ইচ্ছাধীন ও মুক্ত স্বাধীন, সে নিজেই পছন্দ করে এবং নিজেই সম্পাদন করে। কিন্তু তাদের একথা ভ্রমাত্মক ও প্রমাদপূর্ণ। এটা খণ্ডনের জন্যে ভূরি ভূরি স্পষ্ট আয়াতসমূহ বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু বাতিল পন্থীদের এটাই রীতি যে, তারা স্পষ্ট আয়াতকে পরিহার করে অস্পষ্ট আয়াতের পিছনে লেগে থাকে। বিশুদ্ধ হাদীসে আছেঃ “যখন তোমরা ঐ লোকদেরকে দেখ যারা অস্পষ্ট আয়াতসমূহের পিছনে লেগে থাকে তখন বুঝে নিও যে, তারা ওই যাদের নাম স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা নিয়েছেন এবং স্বীয় কিতাবে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং তোমরা তাদের থেকে সতর্ক থাক। এ নির্দেশনামায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর ইঙ্গিত এই আয়াতের প্রতি রয়েছেঃ (আরবি)
অর্থাৎ সুতরাং যাদের অন্তরে বঞতা রয়েছে তারা গোলযোগ সৃষ্টি এবং এর (মনগড়া) ব্যাখ্যা অন্বেষণের উদ্দেশ্যে এর ঐ অংশের পিছনে পড়ে থাকে যা দুর্বোধ্য ও অস্পষ্ট মর্ম বিশিষ্ট। সুতরাং আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত যে, বিদআতীদের অনুকূলে কুরআন পাকের মধ্যে সঠিক ও অকাট্য দলীল একটিও নেই। কুরআন মাজীদের আগমন সূচিত হয়েছে সত্য ও মিথ্যা, হিদায়াত ও গুমরাহীর মধ্যে পার্থক্য প্রদর্শনের জন্যেই। বৈপরীত্ব ও মতবিরোধের জন্যে অসেনি বা তার অবকাশও এতে নেই। এতে মহাবিজ্ঞ ও প্রশংসিত আল্লাহ কর্তৃক অবতীর্ণ হয়েছে লাওহে মাহফু’ বা রক্ষিত ফলক থেকে।`
পরিচ্ছেদ
সূরা ফাতিহা শেষ করে আমীন বলা মুসতাহাব (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দটির মত এবং এটা (আরবি) ও পড়া হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছেঃ “ হে আল্লাহ! আপনি কবুল করুন। আমীন বলা মুসতাহাব হওয়ার দলীল হলো ঐ হাদীসটি যা মুসনাদ-ই-আহমদ, সুনান-ই-আবি দাউদ এবং জামে তিরমিযীতে হযরত অয়েল বিন হুজর (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে (আরবি) পড়ে আমীন বলতে শুনেছি। তিনি স্বর দীর্ঘ করতেন।” সুনান-ই- আবি দাউদে আছে যে, তিনি স্বর উচ্চ করতেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) প্রমুখ সাহাবীগণ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সশব্দ আমীন তার নিকটবর্তী প্রথম সারির লোকেরা স্পষ্টতঃই শুনতে পেতেন। সুনান-ই-আবি দাউদ ও সুনান-ই-ইবনে মাজায় এ হাদীসটি আছে। সুনান-ই-ইবনে মাজায় এও আছে যে, আমীনের শব্দে গোটা মসজিদ প্রতিধ্বনিত হয়ে বেজে উঠতো।' ইমাম দারে-কুতনীও (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং একে 'হাসান' বলে মন্তব্য করেছেন।
হযরত বেলাল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “আমার পূর্বে ‘আমীন' বলবে না।`হযরত হাসান বসরী (রঃ) এবং হযরত জাফর সাদিক (রঃ) হতে 'আমীন' বলা বর্ণিত আছে। যেমন কুরআন মজীদের মধ্যে (আরবি) (৫:২) রয়েছে। আমাদের সহচরেরা বলেন যে, নামাযের বাইরে থাকলেও ‘আমীন' বলতে হবে। তবে যে ব্যক্তি নামাযে থাকবে তার জন্যে বেশী জোর দেয়া হয়েছে। নামাযী একাকী হোক বা মুকতাদী হোক বা ইমাম হোক, সর্বাবস্থায় তাকে আমীন বলতেই হবে। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন ইমাম ‘আমীন' বলেন তখন তোমরাও আমীন বল। যার আমীন বলার শব্দ ফেরেশতাদের আমীনের সঙ্গে মিলিত হয় তার পূর্বেকার সমস্ত পাপ মোচন হয়ে যায়।
সহীহ মুসলিম শরীফে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমাদের মধ্যে কেউ নামাযে ‘আমীন' বলে এবং ফেরেশতারাও আকাশে ‘আমীন বলেন, আর একের আমীনের সঙ্গে অন্যের ‘আমীন মিলিত হয় তখন তার পূর্বেকার সমস্ত গোনাহ মাফ হয়ে যায়। এর ভাবার্থ এই যে, তার আমীন ও ফেরেশতাদের ‘আমীন' বলার সময় একই হয় বা কবুল হওয়া হিসেবে অনুরূপ হয় অথবা আন্তরিকতায় অনুরূপ হয়। সহীহ মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু মূসা আশ'আরী (রাঃ) হতে মারফু রূপে বর্ণিত আছেঃ “যখন ইমাম (আরবি) বলেন তখন তোমরা ‘আমীন' বল, আলাহ কবুল করবেন।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন, 'আমীনের অর্থ কি' তিনি বললেনঃ হে আল্লাহ! আপনি কবুল করুন। জওহারী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ ‘যেন এরূপই হয়।' ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে আমাদের আশা ভঙ্গ করবেন না। অধিকাংশ আলেম বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাদের প্রার্থনা কবুল করুন।' মুজাহিদ (রঃ), জাফর সাদিক (রঃ) এবং হিলাল বিন সিয়াফ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাআলার নাম সমূহের মধ্যে আমীনও একটি নাম। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে মার’ রূপে এ হাদীসটি বর্ণিত আছে। কিন্তু তা বিশুদ্ধ নয়।
ইমাম মালিকের (রঃ) সহচরগণের মাযহাব এই যে, ইমাম ‘আমীন’ বলবেন , শুধু মুকতাদীগণ ‘আমীন’ বলবেন। কেননা ইমাম মালিকের (রঃ) মুআত্তার হাদীসে আছে :যখন ইমাম (আরবি) বলে তখন তোমরা আমীন’ বল। এ রকমই তার দলীলের সমর্থনে সহীহ মুসলিমে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হতেও একটি হাদীস বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যখন ইমাম (আরবি) বলে তখন তোমরা আমীন বল।' কিন্তু সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদীস ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে-'যখন ইমাম আমীন বলে তখন তোমরাও আমীন’ বল।' হাদীসে এটাও আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি) বলে ‘আমীন’ বলতেন। উচ্চৈস্বরে পঠিত নামাযে মুকতাদী উচ্চৈস্বরে আমীন বলবে কিনা সে বিষয়ে আমাদের সহচরদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এর ব্যাখ্যা এই যে, যদি ইমাম ‘আমীন' বলতে ভুলে যান তবে মুকতাদীগণ জোরে আমীন বলবে। যদি ইমাম নিজেই উচ্চৈস্বরে আমীন বলেন তবে নতুন কথা মতে মুকতাদী জোরে আমীন বলবে না। ইমাম আবু হানীফার (রঃ) এটাই মাযহাব। ইমাম মালিক হতেও এরূপ একটি বর্ণনা রয়েছে। কেননা, নামাযের অন্যান্য যিকরের মত এটাও একটা যি। সুতরাং অন্যান্য যি যেমন উচ্চ শব্দে হয়, তেমনই এটাও উচ্চ শব্দে পড়া হবে না। কিন্তু পূর্ব যুগীয় মনীষীদের কথা এই যে, “আমীন’ উচ্চ শব্দেও পড়া যায়। ইমাম আহমদ বিন হাম্বলেরও (রঃ) মাযহাব এটাই এবং দ্বিতীয় বর্ণনা অনুসারে ইমাম মালিকের (রঃ) এটাই মাযহাব। এর দলীল ঐ হাদীসটি যা ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, আমীনের শব্দে মসজিদের মধ্যে গুঞ্জন ধ্বনির রব উঠতো। এখানে আমাদের তৃতীয় আরও ইমাম।
একটি মত আছে, তা এই যে, যদি মসজিদ ছোট হয় তবে মুকতাদী জোরে আমীন বলবে না। কেননা। তারা ইমামের কিরাআত শুনছে। আর যদি মসজিদ বড় হয় তবে আমীন জোরে বলবে, যেন মসজিদের প্রান্তে প্রান্তে ‘আমীনের’ শব্দ পৌছে যায়। আল্লাহই এ সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জানেন।
মুসনাদ-ই- আহমাদে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট ইয়াহুদীদের আলোচনা হলে তিনি বলেনঃ “আমাদের তিনটা জিনিসের উপর ইয়াহুদীদের যতটা হিংসা বিদ্বেষ আছে ততোটা হিংসা অন্য কোন বস্তুর উপর নেই। (১) জুমআ, আল্লাহ আমাদেরকে তার প্রতি হিদায়াত করেছেন ও পথ দেখিয়েছেন এবং তারা এ থেকে ভ্রষ্ট রয়েছে। (২) কিবলাহ্ এবং (৩) ইমামের পিছনে আমাদের আমীন বলা।
সুনান-ই-ইবনে মাজার হাদীসে রয়েছেঃ সালাম’ ও ‘আমীন’ ইয়াহুদীদের যতোটা বিরক্তি উৎপাদন করে অন্য কোন জিনিস তা করে না। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাসের (রাঃ) বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ইয়াহূদীরা তোমাদের আমীনের উপর যত হিংসা করে অন্য কাজে ততোটা করে। তোমরা আমীন খুব বেশী বেশী বল।' এর সনদে বর্ণনাকারী তালহা বিন আমর উসূলে হাদীসের পরিভাষা অনুযায়ী দুর্বল। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আমীন, আল্লাহর মুমিন বান্দাদের উপর তার মোহর। হ্যরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “নামাযে ‘আমীন' বলা এবং প্রার্থনায় আমীন’ বলা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে আমার প্রতি একটি বিশেষ দান, যা আমার পূর্বে অন্য কাউকে দান করা হয়নি। হাঁ, তবে এটুকু বর্ণিত আছে যে, হযরত মূসার (আঃ) বিশেষ প্রার্থনার উপর হযরত হারুন (আঃ) আমীন বলতেন। তোমরা তোমাদের প্রার্থনা আমীনের উপর শেষ কর। তাহলে তোমাদের পক্ষেও আল্লাহ তা কবুল করবেন।” এ হাদীসটিকে সামনে রেখে কুরআন মাজীদের ঐ শব্দগুলো লক্ষ্য করুন যা হযরত মূসার (আঃ) প্রার্থনায় বলা হয়েছেঃ (আরবি)
অর্থাৎ এবং মূসা বললো -হে আমাদের প্রভু! আপনি ফিরআউনকে ও তার সভাসদবর্গকে ইহলৌকিক জীবনে সৌন্দর্য ও সম্পদ দান করেছেন যার ফলে সে অন্যদেরকে আপনার পথ হতে সরিয়ে নিয়ে বিপথে চালিত করছে; হে আমাদের প্রভু! আপনি তাদের ধন মাল ধ্বংস করুন এবং তাদের অন্তরকে কঠোর করে দিন, সুতরাং তারা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেখার পূর্ব পর্যন্ত ঈমান আনবে না।' (১০:৮৮) হযরত মূসার (আঃ) এ দু'আ ককূলের ঘোষণা নিম্নের এসব শব্দ দ্বারা করা হচ্ছেঃ (আরবি) অর্থাৎ তিনি বললেন তোমাদের দু'জনের প্রার্থনা মঞ্জুর করা হলো সুতরাং তোমরা দৃঢ় থাক এবং মুখদের পথে যেয়ো না।' (১০:৮৯)
দু'আ শুধু হযরত মূসা (আঃ) করেছিলেন এবং হযরত হারূণ (আঃ) শুধু ‘আমীন’ বলেছিলেন। কিন্তু কুরআনে এই দু'আর সংযোগ দু’জনের দিকেই করা হয়েছে। কতগুলো লোক একে প্রমাণ রূপে গ্রহণ করে বলে থাকেন যে, যে ব্যক্তি কোন দু'আর উপর আমীন বলে সে যেন নিজেই দু'আ করলো। এখন এ প্রমাণকে সামনে রেখে আবার তাঁরা কিয়াস করেন যে, মুকতাদীকে কিরাআত পড়তে হবে না। কেননা, তার সূরা ফাতিহার উপর আমীন’ বলাই কিরাআতের স্থলাভিষিক্ত হবে। তারা এ হাদীসটিকেও দলীল রূপে পেশ করেনঃ যার ইমাম থাকে, ইমামের কিরাআতই তার কিরাআত। (মুসনাদ-ই- আহমাদ)
হযরত বেলাল (রাঃ) বলতেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমীনে' আমার অগ্রবর্তী হবেন, না।' এঁরা এটা টেনে এনে যেহুরী নামাযে ইমামের পিছনে মুকতাদীর সূরা-ই-ফাতিহা না পড়া সাব্যস্ত করতে চান। আল্লাহ তাআলাই এসব বিষয়ে সবচেয়ে ভাল জানেন।
হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ইমাম যখ (আরবি) বলার পর আমীন বলে এবং যমীনবাসীদের আমীনের সঙ্গে আসমান বাসীদের ‘আমীন' বলার শব্দও মিলিত হয়, তখন আল্লাহ বান্দার পূর্বের সমস্ত গোনাহ মাফ করে দেন। আমীন বলার দৃষ্টান্ত এরূপ যেমন, এক ব্যক্তি এক গোত্রের সঙ্গে মিলিত হয়ে যুদ্ধ করলো ও জয় লাভ করলো। অতঃপর যুদ্ধলব্ধ মাল জমা করলো। এখন সে অংশ নেয়ার জন্যে নির্বাচনের গুটিকা নিক্ষেপ করলো। কিন্তু তার নাম বেরই হলো না এবং সে কোন অংশও পেলো না। এতে সে বিস্মিত হয়ে বললো -এ কেন হবে? তখন সে উত্তর পেলো তোমার আমীন’ না বলার কারণে।”
________________________________________
সূরা-ই-বাকারাহ এবং তার মাহাত্ম্য ও গুণাবলী
হযরত মা'কাল বিন ইয়াসার (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ সূরা-ই-বাকারাহ্ কুরআনের কুঁজ এবং তার চূড়া। এর এক একটি আয়াতের সঙ্গে ৮০ জন ফেরেশতা উর্ধগগন থেকে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। বিশেষ করে আয়াতুল কুরসী তো খাস আরশ হতে অবতীর্ণ হয়েছে এবং এই সূরার সঙ্গে মিলানো হয়েছে। সূরা-ই-ইয়াসীন কুরআনের অন্তর বিশেষ। যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জন ও পরকাল লাভের জন্যে তা পড়ে, তাকে ক্ষমা করে দেয়া হয়। এ সূরাটিকে মরণোন্মুখ ব্যক্তির সম্মুখে পাঠ কর।' (মুসনাদ-ইআহমদ)
এ হাদীসের সনদের এক স্থানে (আরবি) আছে, যার ফলে উদ্দিষ্ট ব্যক্তির নাম অজানা ছিল। কিন্তু মুসনাদ-ই আহমাদেরই অপর একটি বর্ণনায় তার নাম আবু উসমান এসেছে। এ হাদীসটি এভাবেই সুনান-ই আবি দাউদ, সুনান-ই-নাসাঈ এবং সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যেও রয়েছে। জামে তিরমিযীর একটি দুর্বল সনদ বিশিষ্ট হাদীসে আছেঃ প্রত্যেক জিনিসেরই একটা উচ্চতা থাকে। কুরআন মাজীদের উচ্চতা হচ্ছে সূরা-ই-বাকারাহ্। এই সূরার মধ্যে এমন একটি আয়াত আছে যা সমস্ত আসমানের নেতা এবং সেটি হচ্ছে ‘আয়াতুল কুরসী'। মুসনাদ-ই-আহমাদ, সহীহ মুসলিম, জামে তিরমিযী এবং সুনান-ই- নাসাঈর মধ্যে বর্ণিত হাদীসে আছেঃ
‘তোমরা নিজেদের ঘরকে কবরে পরিণত করো না, যে ঘরে সূরা-ই বাকারাহ পাঠ করা হয় তথায় শয়তান প্রবেশ করতে পারে না।' ইমাম তিরমিযী (রঃ) একে হাসান সহীহ বলেছেন। অন্য একটি হাদীসে আছে যে, যে ঘরে সূরা-ই-বাকারাহ পড়া হয় সেখান হতে শয়তান পলায়ন করে। এ হাদীসের একজন বর্ণনাকারীকে ইয়াহইয়া বিন মুঈন তো নির্ভরযোগ্য বলেছেন বটে, কিন্তু ইমাম আহমাদ প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ তার হাদীসকে অস্বীকার্য বলেছেন। হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) হতেও এরূপ কথাই বর্ণিত আছে। হাদীসটি ইমাম নাসাঈ (রঃ) তার ‘আল ইয়াওমু ওয়াল লাইলাতু’ নামক পুস্তকের মধ্যে এবং ইমাম হাকিম স্বীয় গ্রন্থ মুসতাদরাক’ এর মধ্যে বর্ণনা করেছেন। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই’ এ আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে কাউকেও যেন, এরূপ না পাই যে, সে এক পায়ের উপর অন্য পা চড়িয়ে পড়তে থাকে; কিন্তু সূরা-ই-বাকারাহ পড়ে না। জেনে ব্রেখো, যে ঘরে এই বরকতময় সূরাটি পাঠ করা হয় সেখান হতে শয়তান ছুটে পালিয়ে যায়। সবচেয়ে জঘন্য ও লাঞ্ছিত সেই ঘর যে ঘরে আল্লাহর কিতাব পাঠ করা হয় না।'
ইমাম নাসাঈ (রঃ) স্বীয় ‘আল-ইয়াওমু ওয়াল লাইলাতু' গ্রন্থে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। মুসনাদ-ই- দারিমীর মধ্যে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যে ঘরে সূরা-ই-বাকারাহ পড়া হয় সেই ঘর থেকে শয়তান গুহ্যদ্বার দিয়ে বায়ু নিঃসরণ করতে করতে পলায়ন করে। প্রত্যেক জিনিসেরই উচ্চতা থাকে এবং কুরআন কারীমের উচ্চতা হচ্ছে সূরা-ই-বাকারাহ। প্রত্যেক বস্তুরই সারাংশ আছে এবং কুরআনের সারাংশ হচ্ছে বড় সূরাগুলি।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের (রাঃ) উক্তি আছে যে, যে ঘরে সূরা ই-বাকারার প্রথম চারটি আয়াত, আয়াতুল কুরসী, তার পরবর্তী দু’টি আয়াত এবং সব শেষের তিনটি আয়াত, একুনে দশটি আয়াত পাঠ করা হয়, শয়তান। সেই ঘরে ঐ রাত্রে যেতে পারে না এবং সেইদিন ঐ বাড়ীর লোকদের শয়তান অথবা কোন খারাপ জিনিস কোন ক্ষতি সাধন করতে পারে না। এ আয়াতগুলি পাগলের উপর পড়লে তার পাগলামীও দূর হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘যেমন প্রত্যেক জিনিসের উচ্চতা থাকে তেমনই কুরআনের উচ্চতা হচ্ছে সূরা-ই- বাকারাহ। যে ব্যক্তি রাত্রিকালের নীরব ক্ষণে নিজের নিভৃত কক্ষে তা পাঠ করে, তিন রাত্রি পর্যন্ত শয়তান সেই ঘরে যেতে পারে না। আর দিনের বেলায় যদি ঘরে পড়ে তবে তিন দিন পর্যন্ত সেই ঘরে শয়তান পা দিতে পারে না (তাবরানী, ইবনে হিব্বান ও ইবনে মিরদুওয়াই)।
জামে তিরমিযী, সুনান-ই-নাসাঈ এবং সুনান-ই-ইবনে মাজায় রয়েছে যে, একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটা ছোট্ট সেনাবাহিনী এক জায়গায় পাঠালেন এবং তিনি তার নেতৃত্বভার এমন ব্যক্তির উপর অর্পণ করলেন যিনি বলেছিলেনঃ ‘আমার সূরা-ই-বাকারাহ মুখস্থ আছে। সে সময় একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি বললেনঃ ‘আমিও তা মুখস্ত করতাম। কিন্তু পরে আমি এই ভয় করেছিলাম যে, না জানি আমি তার উপর আমল করতে পারবে কি না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ কুরআন শিক্ষা কর, কুরআন পাঠ কর। যে ব্যক্তি তা শিখে ও পাঠ করে, অতঃপর তার উপর আমলও করে, তার উপমা এরকম যেমন মিশক পরিপূর্ণ পাত্র, যার সুগন্ধি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। আর যে ব্যক্তি তা শিক্ষা করলো, অতঃপর ঘুমিয়ে পড়লে তার দৃষ্টান্ত সেই পাত্রের মত যার মধ্যে মিশক তো ভরা রয়েছে, কিন্তু উপর হতে মুখ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) একে হাসান বলেছেন এবং মুরসাল বর্ণনাও রয়েছে। আল্লাহই এ সম্পর্কে ভাল জানেন।
সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, হযরত উসাইদ বিন হুজাইর (রাঃ) একদা রাত্রে সূরা-ই-বাকারার পাঠ আরম্ভ করেন। তাঁর ঘোড়াটি, যা তার পার্শ্বেই বাঁধা ছিল, হঠাৎ করে লাফাতে শুরু করে। তিনি পাঠ বন্ধ করলে ঘোড়া সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। আবার তিনি পড়তে আরম্ভ করেন এবং ঘোড়াও লাফাতে শুরু করে। তিনি পুনরায় পড়া বন্ধ করেন এবং ঘোড়াটিও স্তব্ধ হয়ে থেমে যায়। তৃতীয় বারও এরূপই ঘটে। তার শিশু পুত্র ইয়াহইয়া ঘোড়ার পার্শ্বেই শুয়ে ছিল। কাজেই তিনি ভয় করলেন যে, না জানি ছেলের আঘাত লেগে যায়। সুতরাং তিনি পড়া বন্ধ করে ছেলেকে উঠিয়ে নেন। অতঃপর তিনি আকাশের দিকে দৃষ্টিপাত করেন যে, ঘোড়ার চমকে উঠার কারণ কি? সকালে তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর দরবারে হাজির হয়ে ঘটনাটি আনুপূর্বিক বর্ণনা করেন। তিনি শুনতে থাকেন ও বলতে থাকেনঃ ‘উসাইদ! তুমি পড়েই যেতে!' হযরত উসাইদ (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল! তৃতীয় বারের পরে প্রিয় পুত্র ইয়াহইয়ার কারণে আমি পড়া সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিয়েছিলাম। অতঃপর আমি মাথা আকাশের দিকে উঠালে ছায়ার ন্যায় একটা জ্যোতির্ময় জিনিস দেখতে পাই এবং দেখতে দেখতেই তা উপরের দিকে উথিত হয়ে শূন্যমার্গে মিলিয়ে যায়। রাসললাহ (সঃ) তখন বললেনঃ তুমি কি জান সেটা কি ছিল? তারা ছিলেন গগন বিহারী অগণিত জ্যোতির্ময় ফেরেশতা। তোমার (পড়ার শব্দ শুনে তারা একপদে নিকটে এসেছিলেন। যদি তুমি পাঠ বন্
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।