আল কুরআন


সূরা আল-ফাতিহা (আয়াত: 1)

সূরা আল-ফাতিহা (আয়াত: 1)



হরকত ছাড়া:

بسم الله الرحمن الرحيم ﴿١﴾




হরকত সহ:

بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ ﴿۱﴾




উচ্চারণ: বিছমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।




আল বায়ান: পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১. রহমান, রহীম(১) আল্লাহর নামে।(২)




তাইসীরুল ক্বুরআন: (আরম্ভ করছি) পরম করুণাময় অসীম দয়াময় আল্লাহর নামে।




আহসানুল বায়ান: (১) অনন্ত করুণাময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে (আরম্ভ করছি)।



মুজিবুর রহমান: পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)।



ফযলুর রহমান: করুণাময় ও পরম দয়ালু আল্লাহর নামে



মুহিউদ্দিন খান: শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।



জহুরুল হক: আল্লাহর নাম নিয়ে (আরম্ভ করছি), (যিনি) রহমান (--পরম করুণাময়, যিনি অসীম করুণা ও দয়া বশতঃ বিশ্বজগতের সমস্ত সৃষ্টির সহাবস্থানের প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা অগ্রিম করে রেখেছেন), (যিনি) রহীম (--অফুরন্ত ফলদাতা, যাঁর অপার করুণা ও দয়ার ফলে প্রত্যেকের ক্ষুদ্রতম শুভ-প্রচেষ্টাও বিপুলভাবে সাফল্যমণ্ডিত ও পুরস্কৃত হয়ে থাকে)।



Sahih International: In the name of Allah, the Entirely Merciful, the Especially Merciful.



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১. রহমান, রহীম(১) আল্লাহর নামে।(২)


তাফসীর:

১. সাধারণত আয়াতের অনুবাদে বলা হয়ে থাকে, পরম করুণাময়, দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। এ অনুবাদ বিশুদ্ধ হলেও এর মাধ্যমে এ আয়াতখানির পূর্ণভাব প্রকাশিত হয় না। কারণ, আয়াতটি আরও বিস্তারিত বর্ণনার দাবী রাখে। প্রথমে লক্ষণীয় যে, আয়াতে আল্লাহর নিজস্ব গুণবাচক নামসমূহের মধ্য হতে ‘আর-রাহমান ও আর-রাহীম’ এ দু'টি নামই এক স্থানে উল্লিখিত হয়েছে। ‘রহম’ শব্দের অর্থ হচ্ছে দয়া, অনুগ্রহ। এই ‘রহম’ ধাতু হতেই ‘রহমান’ ও ‘রহীম' শব্দদ্বয় নির্গত ও গঠিত হয়েছে। রহমান শব্দটি মহান আল্লাহর এমন একটি গুণবাচক নাম যা অন্য কারও জন্য ব্যবহার করা জায়েয নেই। (তাবারী) কুরআন ও হাদীসে এমনকি আরবদের সাহিত্যেও এটি আল্লাহ ছাড়া আর কারও গুণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি। পক্ষান্তরে ‘রহীম’ শব্দটি আল্লাহর গুণ হলেও এটি অন্যান্য সৃষ্টজগতের কারও কারও গুণ হতে পারে। তবে আল্লাহর গুণ হলে সেটা যে অর্থে হবে অন্য কারও গুণ হলে সেটা সে একই অর্থে হতে হবে এমন কোন কথা নেই। প্রত্যেক সত্তা অনুসারে তার গুণাগুণ নির্দিষ্ট হয়ে থাকে। এখানে একই স্থানে এ দুটি গুণবাচক নাম উল্লেখ করার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। কোন কোন তাফসীরকার বলেছেন যে, আল্লাহ ‘রহমান’ হচ্ছেন এই দুনিয়ার ক্ষেত্রে, আর ‘রাহীম’ হচ্ছেন আখেরাতের হিসেবে। [বাগভী]


২. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি সর্বপ্রথম ‘ইকরা বিসমে’ বা সূরা আল-আলাক এর প্রাথমিক কয়েকটি আয়াত নাযিল হয়েছিল। এতে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর নাম নিয়ে পাঠ শুরু করতে বলা হয়েছিল। সম্ভবত এজন্যই আল্লাহর এই প্রাথমিক আদেশ অনুযায়ী কুরআনের প্রত্যেক সূরার প্রথমেই তা স্থাপন করে সেটাকে রীতিমত পাঠ করার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে। বস্তুতঃ বিসমিল্লাহ প্রত্যেকটি সূরার উপরিভাগে অর্থ ও বাহ্যিক আঙ্গিকতার দিক দিয়ে একটি স্বর্ণমুকুটের ন্যায় স্থাপিত রয়েছে। বিশেষ করে এর সাহায্যে প্রত্যেক দু’টি সূরার মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করাও অতীব সহজ হয়েছে। হাদীসেও এসেছে, “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সূরার শেষ তখনই বুঝতে পারতেন যখন বিসমিল্লাহ নাযিল করা হতো” [আবু দাউদ: ৭৮৮] তবে প্রত্যেক সূরার প্রথমে ও কুরআন পাঠের পূর্বে এ বাক্য পাঠ করার অর্থ শুধু এ নয় যে, এর দ্বারা আল্লাহর নাম নিয়ে কুরআন তিলাওয়াতে শুরু করার সংবাদ দেয়া হচ্ছে। বরং এর দ্বারা স্পষ্ট কণ্ঠে স্বীকার করা হয় যে, দুনিয়া জাহানের সমস্ত নিয়ামত আল্লাহর তরফ হতে প্রাপ্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে এ কথাও মেনে নেয়া হয় যে, আল্লাহ তা'আলা আমাদের প্রতি যে দয়া ও অনুগ্রহ করেছেন বিশেষ করে দ্বীন ও শরীয়াতের যে অপূর্ব ও অতুলনীয় নিয়ামত আমাদের প্রতি নাযিল করেছেন, তা আমাদের জন্মগত কোন অধিকারের ফল নয়। বরং তা হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার নিজস্ব বিশেষ মেহেরবানীর ফল।

তাছাড়া এই বাক্য দ্বারা আল্লাহর নিকট এই প্রার্থনাও করা হয় যে, তিনি যেন অনুগ্রহপূর্বক তার কালামে-পাক বুঝবার ও তদনুযায়ী জীবন যাপন করার তওফীক দান করেন। এ ছোট্ট বাক্যটির অন্তর্নিহিত ভাবধারা এটাই। তাই শুধু কুরআন তিলাওয়াত শুরু করার পূর্বেই নয় প্রত্যেক জায়েয কাজ আরম্ভ করার সময়ই এটি পাঠ করার জন্য ইসলামী শরীয়াতে নির্দেশ করা হয়েছে। কারণ প্রত্যেক কাজের পূর্বে এটি উচ্চারণ না করলে উহার মঙ্গলময় পরিণাম লাভে সমর্থ হওয়ার কোন সম্ভাবনাই থাকে না। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার বিভিন্ন কথা ও কাজে এই কথাই ঘোষণা করেছেন। যেমন, তিনি প্রতিদিন সকাল বিকাল বলতেন, بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ “আমি সে আল্লাহর নামে শুরু করছি যার নামে শুরু করলে যমীন ও আসমানে কেউ কোন ক্ষতি করতে পারে না, আর আল্লাহ তো সব কিছু শুনেন ও সবকিছু দেখেন।” [আবু দাউদ: ৫০৮৮, ইবনে মাজাহ: ৩৮৬৯]

অনুরূপভাবে যখন তিনি রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে চিঠি লিখেন তাতে বিসমিল্লাহ লিখেছিলেন [বুখারী, ৭]

তাছাড়া তিনি যে কোন ভাল কাজে বিসমিল্লাহ বলার জন্য নির্দেশ দিতেন। যেমন, খাবার খেতে, [বুখারী ৫৩৭৬, মুসলিম: ২০১৭, ২০২২]

দরজা বন্ধ করতে, আলো নিভাতে, পাত্র ঢাকতে, পান-পাত্র বন্ধ করতে [বুখারী ৩২৮০]

কাপড় খুলতে [ইবনে মাজাহ ২৯৭, তিরমিযী: ৬০৬)

স্ত্রী সহবাসের পূর্বে [বুখারী: ৬৩৮৮, মুসলিম: ১৪৩৪],

ঘুমানোর সময় [আবু দাউদ: ৫০৫৪],

ঘর থেকে বের হতে [আবু দাউদ: ৫০৯৫],

চুক্তিপত্র/ বেচা-কেনা লিখার সময় [সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকী: ৫/৩২৮],

চলার সময় হোঁচট খেলে [মুসনাদে আহমাদ: ৫/৫৯],

বাহনে উঠতে [আবু দাউদ: ২৬০২]

মসজিদে ঢুকতে [ইবনে মাজাহ: ৭৭১, মুসনাদে আহমাদ: ৬/২৮৩],

বাথরুমে প্রবেশ করতে [ইবনে আবি শাইবাহ: ১/১১],

হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করতে [সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকী: ৫/৭৯]

যুদ্ধ শুরু করার সময় [তিরমিযী: ১৭১৫]

শক্র দ্বারা আক্রান্ত হয়ে ব্যাথা পেলে বা কেটে গেলে [নাসায়ী: ৩১৪৯]

ব্যাথার স্থানে ঝাড়-ফুঁক দিতে [মুসলিম: ২২০২]

মৃতকে কবরে দিতে তিরমিযী: ১০৪৬]।

এ ব্যাপারে আরও বহু সহীহ হাদীস এসেছে। আবার কোথাও কোথাও ‘বিসমিল্লাহ’ বলা ওয়াজিবও বটে যেমন, যবাই করতে [বুখারী: ৯৮৫, মুসলিম: ১৯৬০]

যেহেতু মানুষের শক্তি অত্যন্ত সীমাবদ্ধ, সে যে কাজই শুরু করুক না কেন, তা যে সে নিজে আশানুরূপে সাফল্যজনকভাবে সম্পন্ন করতে পারবে, এমন কথা জোর করে বলা যায় না। এমতাবস্থায় সে যদি আল্লাহর নাম নিয়ে কাজ শুরু করে এবং আল্লাহর অসীম দয়া ও অনুগ্রহের প্রতি হৃদয়-মনে অকুণ্ঠ বিশ্বাস জাগরুক রেখে তার রহমত কামনা করে, তবে এর অর্থ এ-ই হয় যে, সংশ্লিষ্ট কাজ সুষ্ঠুরূপে সম্পন্ন করার ব্যাপারে সে নিজের ক্ষমতা যোগ্যতা ও তদবীর অপেক্ষা আল্লাহর অসীম অনুগ্রহের উপরই অধিক নির্ভর ও ভরসা করে এবং তা লাভ করার জন্য তারই নিকট প্রার্থনা করে।


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১) অনন্ত করুণাময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে (আরম্ভ করছি)।


তাফসীর:

‘বিসমিল্লাহ’র পূর্বে ‘আক্বরাউ’ ‘আবদাউ’ অথবা ‘আতলু’ ফে’ল (ক্রিয়া) উহ্য আছে। অর্থাৎ, আল্লাহর নাম নিয়ে পড়ছি অথবা শুরু করছি কিংবা তেলাঅত আরম্ভ করছি। প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আরম্ভ করার পূর্বে ‘বিসমিল্লাহ’ পড়ার প্রতি তাকীদ করা হয়েছে। সুতরাং নির্দেশ করা হয়েছে যে, খাওয়া, যবেহ করা, ওযু করা এবং সহবাস করার পূর্বে ‘বিসমিল্লাহ’ পড়। অবশ্য ক্বুরআনে করীম তেলাঅত করার সময় ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ পড়ার পূর্বে ‘আউযু বিল্লাহি মিনাশ্শায়ত্বানির রাজীম’ পড়াও অত্যাবশ্যক। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘‘অতএব যখন তুমি ক্বুরআন পাঠ করবে, তখন বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা কর।’’ (সূরা নাহল ৯৮ আয়াত)।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: أَعُوْذُ بِاللّٰهِ (আঊযুবিল্লাহ)-এর প্রাসঙ্গিক আলোচনা



কুমন্ত্রণাদানকারী শয়তান হতে মহান আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাওয়া প্রতিটি মু’মিন-মুসলিমের একান্ত কর্তব্য। কারণ আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করার পর হতে শয়তান মানুষের অনিষ্ট করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।



এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন:



(لَأَقْعُدَنَّ لَهُمْ صِرَاطَكَ الْمُسْتَقِيْمَ)



(শয়তান বলল:) “আমি (বানী আদমকে বিভ্রান্ত করার জন্য) আপনার সরল পথে অবশ্যই বসে থাকব।”(সূরা আ‘রাফ ৭:১৬) তাই শয়তানের অনিষ্ট থেকে বেঁচে থাকার জন্য الاستعاذة বা আঊযুবিল্লাহ পাঠ করার গুরুত্ব অপরিসীম।



আঊযুবিল্লাহ পাঠ: আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَقُلْ رَّبِّ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ هَمَزٰتِ الشَّيٰطِيْنِ وَأَعُوْذُ بِكَ رَبِّ أَنْ يَّحْضُرُوْنِ) ‏



“বল:‎ হে আমার প্রতিপালক! আমি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি সকল শয়তানের প্ররোচনা হতে, আর হে আমার প্রতিপালক! আমি তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করি আমার নিকট তাদের উপস্থিতি হতে।”(সূরা মু’মিনুন ২৩:৯৭-৯৮)



আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:



(وَإِمَّا يَنْزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطٰنِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللّٰهِ ط إِنَّه۫ هُوَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْمُ)



“যদি শয়তানের কুমন্ত্রণা তোমাকে প্ররোচিত করে তবে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা কর। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”(সূরা হা-মীম সিজদাহ ৪১:৩৬)



উপরোক্ত আয়াতগুলোর আলোকে বলা যায়: সাধারণত আঊযুবিল্লাহ পাঠ করা মুস্তাহাব। ইমাম ইবনু কাসীর (রহঃ) বলেন: কুরআন তেলাওয়াতের শুরুতে আঊযুবিল্লাহ পাঠ করা ওয়াজিব। তিনি দলীলস্বরূপ নিম্নোক্ত আয়াতটি পেশ করেছেন:



(فَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْاٰنَ فَاسْتَعِذْ بِاللّٰهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ)



“যখন কুরআন পাঠ করবে তখন অভিশপ্ত শয়তান হতে আল্লাহর আশ্রয় চাও।”(সূরা নাহল ১৬:৯৮)



উক্ত আয়াতে فَاسْتَعِذْ (আশ্রয় চাও) আদেশসূচক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে যা আবশ্যকের অর্থ প্রদান করে। অতএব কুরআন পাঠের সময় আঊযুবিল্লাহ পাঠ করা ওয়াজিব।



সালাতে আঊযুবিল্লাহ পাঠ: সালাতের মধ্যে ছানা পাঠের পর কিরাআত পড়ার আগে আ‘ঊযুবিল্লাহ পড়া ওয়াজিব। (তাফসীর ইবনে কাসীর)



সাহাবী আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সালাতে দাঁড়িয়ে ইসতিফতাহ (ছানা) পড়ার পর পড়তেন:



(أَعُوذُ بِاللّٰهِ السَّمِيْعِ الْعَلِيْمِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ مِنْ هَمْزِهِ، وَنَفْخِهِ، وَنَفْثِهِ)



অর্থাৎ সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ আল্লাহর নিকট শয়তানের খোঁচা, ফুৎকার ও প্ররোচনা হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। (আবূ দাঊদ হা: ৭৭৫, সহীহ)



ইমাম তিরমিযী (রহঃ) বলেন: এ ব্যাপারে এই হাদীসটি অধিক প্রসিদ্ধ। ইমাম শাওকানী (রহঃ) বলেন: এটি সালাতের প্রথম রাকাতে কিরাআতের পূর্বে বলতে হবে। (নাইলুল আওতার: ২/১৯৭-১৯৮)



উল্লেখ্য যে, ফরয-সুন্নাত ও নফল যে কোন সালাতে শুধু প্রথম রাকাতে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছানা ও আঊযুবিল্লাহ পড়তেন, আর বাকি রাকাতগুলোতে পড়তেন না। (সহীহ মুসলিম হা: ১৩৮২, মিশকাত পৃঃ ৭৮)



আঊযুবিল্লাহ-কে বিসমিল্লাহ-এর মতই চুপে চুপে পড়তে হবে। কারণ সরবে পড়ার স্বপক্ষে কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও সাহাবীগণ কখনো সরবে পড়েননি।



আঊযুবিল্লাহ পাঠের ফযীলত: সুলাইমান বিন সূরাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, দু’ব্যক্তি নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকটে গালাগালি করছিল। এতে একজন খুব রেগে গেল এবং তাঁর চেহারা লাল হয়ে গেল, শিরা-উপশিরাগুলো মোটা হয়ে গেল। অতঃপর নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন:



(إِنِّيْ لَأَعْلَمُ كَلِمَةً لَوْ قَالَهَا لَذَهَبَ عَنْهُ مَا بِهِ؛ أعُوذُ باللّٰهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ)



নিশ্চয়ই আমি এমন একটি বাক্য জানি, যদি সে ঐ বাক্যটি পড়ে তাহলে তার হতে ঐ জিনিস চলে যাবে যা তার সাথে আছে (অর্থাৎ রাগ চলে যাবে)। আর সেই বাক্যটি হল,



أعُوْذُ باللّٰهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ



(সহীহ বুখারী হা: ৬১১৫, ৬০৪৮, ৩২৮২, সহীহ মুসলিম হা: ২৬১০ )



অন্য এক হাদীসে উসমান বিন আবুল আস সাকাফী (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, তিনি নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! নিশ্চয়ই শয়তান আমার মাঝে এবং আমার সালাতের মাঝে অন্তরাল সৃষ্টি করে দেয়। অর্থাৎ আমাকে সন্দেহে ফেলে দেয় (এতে আমার করণীয় কী?)। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঐ লোকটিকে বললেন,



ذَاكَ شَيْطَانٌ يُقَالُ لَهُ خِنْزَبٌ فَإِذَا أَحْسَسْتَهُ فَتَعَوَّذْ بِاللّٰهِ مِنْهُ وَاتْفِلْ عَلَي يَسَارِكَ ثَلاَثًا



এ হলো ঐ শয়তান যার নাম “খিনজাব”। অতএব যখন তাকে অনুভব করবে তখন আল্লাহ তা‘আলার নিকট তার হতে আশ্রয় প্রার্থনা করবে এবং বাম দিকে তিনবার হালকা থুথু ফেলবে। সাহাবী বলেন, আমি তা-ই করলাম। ফলে আল্লাহ তা‘আলা আমার হতে ঐ শয়তানকে দূরে সরিয়ে নিলেন। (সহীহ মুসলিম হা: ২২০, মুসনাদ আহমাদ হা: ১৭৪৪০)



নামকরণ:



اَلْفَاتِحَةُ (আল-ফাতিহা) অর্থ সূচনা, ভূমিকা, প্রারম্ভিকা ইত্যাদি। পবিত্র কুরআনুল কারীম এ সূরা দ্বারা শুরু করা হয়েছে বিধায় এর নামকরণ করা হয়েছে সূরা আল ফাতিহা, অনুরূপভাবে সালাতের কিরাআতও শুরু হয় এ সূরা দ্বারা।



এ সূরার আরো অনেক নাম রয়েছে- তন্মধ্যে কয়েকটি নিম্নরূপ:



১. اَلسَّبْعُ الْمَثَانِيُّ



আস্সাবউল মাসানী বা সাতটি অধিক পঠিতব্য আয়াত: (তিরমিযী হা: ৩১২৪, আবূ দাঊদ হা: ১৪৫৭, সহীহ) আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَلَقَدْ اٰتَيْنٰكَ سَبْعًا مِّنَ الْمَثَانِيْ)



“আমি তোমাকে সাবআ মাসানি (বারবার পঠিত সাতটি আয়াত) প্রদান করেছি।”(সূরা হিজর ১৫:৮৭)



২. اَلصَّلَاةُ আস্ সালাত: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



قَسَمْتُ الصَّلَاةَ بَيْنِيْ وَبَيْنَ عَبْدِيْ نِصْفَيْنِ



আমি সালাতকে (সূরা ফাতিহাকে) আমার ও আমার বান্দার মাঝে দু’ভাগে ভাগ করেছি। (সহীহ মুসলিম হা: ৯০৪, ৯০৬)



৩. اَلرُّقْيَةُ আর রুক্ইয়াহ বা ঝাড়ফুঁক: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবীদের কৃত সূরা ফাতিহার মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক সমর্থন করে বলেন:



وَمَا يُدْرِيْكَ أَنَّهَا رُقْيَةٌ



তুমি কী করে জানলে এটি ঝাড়ফুঁকের সূরা? (সহীহ বুখারী হা: ২২৭৬)



৪. أُمُّ الْقُرْاٰنِ উম্মুল কুরআন বা কুরআনের মা/মূল: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: যে ব্যক্তি সালাত আদায় করল অথচ উম্মুল কুরআন (সূরা ফাতিহা) পাঠ করল না তা অসম্পূর্ণ। (সহীহ মুসলিম হা: ৩৯৫)



৫. فَاتِحَةُ الْكِتَابِ ফাতিহাতুল কিতাব বা কুরআনের ভূমিকা: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: যে ব্যক্তি ফাতিহাতুল কিতাব (সূরা ফাতিহা) পাঠ করবে না তার সালাত হবে না। (সহীহ বুখারী হা: ৭৫৬, সহীহ মুসলিম হা: ৩৯৪) এছাড়াও এ সূরাকে سُوْرَةُ الْحَمْدِ (সূরাতুল হাম্দ বা প্রশংসার সূরা), سُوْرَةُ الْمَسْأَلَةِ (সূরাতুল মাসআলাহ বা আবেদনের সূরা), اَلْقُرْاٰنُ الْعَظِيْمُ (আল কুরআনুল আযীম), سُوْرَةُ الشِّفَاءِ (সূরাতুশ শিফা বা আরোগ্যের সূরা) ইত্যাদি বলা হয়ে থাকে।



অবতরণের সময়কাল:



সূরা ফাতিহাহ অবতরণের সময়কাল সম্পর্কে ইবনু আব্বাস (রাঃ) ও কাতাদাহ (রহঃ) বলেন- এটি মক্কায় অবতীর্ণ, আবূ হুরায়রা (রাঃ) ও মুজাহিদ (রহঃ) বলেন- মদীনায় অবতীর্ণ, আবার কেউ বলেন- দু’বার অবতীর্ণ হয়েছে; একবার মক্কায় এবং আরেকবার মদীনায়।



তবে সবচেয়ে বেশি বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য মত হল এ সূরা মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। কারণ আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَلَقَدْ اٰتَيْنٰكَ سَبْعًا مِّنَ الْمَثَانِيْ)



“আমি তোমাকে সাবআ মাসানি (বারবার পঠিত সাতটি আয়াত) প্রদান করেছি।”(সূরা হিজর ১৫:৮৭) এ আয়াতে সাবাআ মাসানী দ্বারা সূরা ফাতিহাকে বুঝানো হয়েছে। আর এ আয়াতটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। সুতরাং সূরা ফাতিহা মক্কায় অবতীর্ণ হওয়াটাই অধিক যুক্তিযুক্ত। (আল্লাহ তা‘আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)



সূরা ফাতিহার গুরুত্ব ও তাৎপর্য:



সূরা ফাতিহার গুরুত্বের ব্যাপারে অসংখ্য সহীহ হাদীস পাওয়া যায়, সাহাবী উবাদা বিন সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:



لَا صَلَاةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ



যে ব্যক্তি সালাতে সূরা ফাতিহা পড়ল না তার সালাত হল না। (সহীহ বুখারী হা: ৭৫৬, সহীহ মুসলিম হা: ৩৯৪)



অনুরূপ বিশিষ্ট সাহাবী আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: “যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা ছাড়াই সালাত আদায় করল তার সালাত অসম্পূর্ণ।”তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ অসম্পূর্ণ কথাটি তিন বার বললেন। আবূ হুরায়রা (রাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করা হল যে, আমরা তো ইমামের পেছনেও সালাত আদায় করি, তখন আমরা কী করব? তিনি বললেন: তোমরা তা (সূরা ফাতিহা) ইমামের পেছনে মনে মনে পাঠ করবে। (সহীহ মুসলিম হা: ৩৯৫)



উবাদা বিন সামিত (রাঃ) বলেন: একদা আমরা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর পিছনে ফজরের সালাত পড়লাম। সালাতে তাঁর কিরাআত ভারী মনে হল, সালাত শেষে জিজ্ঞাসা করলেন: মনে হয় তোমরা ইমামের পেছনে থাকা অবস্থায় কিরাআত পাঠ কর? আমরা বললাম: হ্যাঁ, পাঠ করি। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: তোমরা সূরা ফাতিহা ব্যতীত আর অন্য কিছু পাঠ কর না, কেননা যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পাঠ করে না তার সালাত হয় না। (আবূ দাঊদ হা: ৮২৩, তিরমিযী হা: ৩১১, নাসাঈ হা: ৯২১, হাসান)



উল্লিখিত হাদীসগুলো থেকে এ কথা পরিষ্কার হয় যে, কুরআন পাঠের সময় মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করা ও চুপ থাকার নির্দেশ (সূরা আ’রাফ ৭:২০৪)-এর সাথে হাদীসগুলোর কোন বিরোধ নেই। কারণ, জাহরী (সরবে কিরাআত বিশিষ্ট) সালাতগুলোতে মুক্তাদী ইমামের কুরআন পাঠ মনোযোগসহকারে শুনবে এবং সূরা ফাতিহা ব্যতীত ইমামের সাথে কুরআন পাঠ করবে না। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যেখানে নিজে ইমাম, সাহাবীগণ মুক্তাদী, আর তাঁরা এমন সালাত আদায় করলেন যার কিরাআত ছিল সরবে সে অবস্থাকে কেন্দ্র করে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ফায়সালা হল সূরা ফাতিহা পাঠ ছাড়া সালাতই হবে না। অতএব এ বিষয়ে কোন অস্পষ্টতা ও দ্বিমতের অবকাশ নেই। এছাড়াও সূরা আরাফের ২০৪ নং আয়াত অবতীর্ণ হয় মক্কায় আর সূরা ফাতিহা পাঠের নির্দেশ হয় মদীনায় সুতরাং শরীয়তের নীতিমালা অনুযায়ী পরবর্তী নির্দেশ অবশ্যই প্রাধান্য পায়। আরো বলা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর সূরা আরাফের উক্ত আয়াত নাযিল হয়েছে আর তিনিই ইমামের পেছনে সূরা ফাতিহা পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন, সুতরাং এর পর আর কোন অস্পষ্টতা ও বিরোধ থাকতে পারে না।



সূরা ফাতিহার ফযীলত:



সূরা আল-ফাতিহা পবিত্র কুরআনুল কারীমের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এবং সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ অবতীর্ণ হওয়া একটি সূরা। এর ফযীলত সম্পর্কে অনেক বর্ণনা রয়েছে। যেমন,



১. প্রসিদ্ধ সাহাবী আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: আল্লাহ তা‘আলা বলেন, সূরা ফাতিহাকে আমার ও আমার বান্দার মধ্যে দু’ভাগে ভাগ করেছি এবং বান্দা যা চায় তা তার জন্য। যখন বান্দা বলে:



(الْحَمْدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ)



তখন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, আমার বান্দা আমার প্রশংসা করছে। যখন বান্দা বলে:



(الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ)



তখন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, আমার বান্দা আমার গুণগান করছে। যখন বান্দা বলে:



(مَالِكِ يَوْمِ الدِّيْنِ)



তখন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, আমার বান্দা আমার মর্যাদা বর্ণনা করছে। যখন বান্দা বলে:



(إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِيْنُ)



আল্লাহ তা‘আলা বলেন, এটি আমার ও বান্দার মধ্যে সমান এবং বান্দা যা চায় তা তার জন্য। যখন বান্দা বলে:



(اِھْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِیْمَﭕﺫ صِرَاطَ الَّذِیْنَ اَنْعَمْتَ عَلَیْھِمْﺃ غَیْرِ الْمَغْضُوْبِ عَلَیْھِمْ وَلَا الضَّا۬لِّیْنَﭖﺟ)



তখন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, এটি আমার ও বান্দার মধ্যে সমান এবং বান্দা যা চায় তা তা জন্য। (সহীহ মুসলিম হা: ৯০৪, ৯০৬)



২. অন্য হাদীসে বলা হয়েছে জিবরীল (আঃ) একদা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বললেন: আপনি এমন দু’টি নূরের (আলোর) সুসংবাদ গ্রহণ করুন যে দু’টি নূর আপনি ব্যতীত পূর্ববর্তী কোন নাবীকে দেয়া হয়নি। একটি সূরাতুল ফাতিহাহ এবং অন্যটি সূরাতুল বাকারাহ-এর শেষ দু’টি আয়াত। (সহীহ মুসলিম হা: ১৯১৩, নাসাঈ হা: ৯১২)



৩. সাহাবী আবূ সাঈদ বিন মুয়াল্লা (রাঃ) বলেন, একদা আমি সালাতে ছিলাম, আমাকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ডাকলেন। আমি তাঁর ডাকে সাড়া দিলাম না। আমি সালাত শেষ করে তাঁর কাছে এলাম। তিনি বললেন: আমি যখন তোমাকে ডাকলাম তখন কিসে তোমাকে আমার ডাকে সাড়া দিতে বাধা দিয়েছে? তিনি (আবূ সাঈদ) বলেন, আমি বললাম- হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমি সালাতে ছিলাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, আল্লাহ তা‘আলা কি একথা বলেননি:



(یٰٓاَیُّھَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوا اسْتَجِیْبُوْا لِلہِ وَلِلرَّسُوْلِ اِذَا دَعَاکُمْ لِمَا یُحْیِیْکُمْﺆ),



“হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ডাকে সাড়া দাও যখন তোমাদের তিনি জীবন সঞ্চারক বস্তুর দিকে ডাকেন।”(সূরা আনফাল ৮:২৪) অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে বললেন, আমি তোমাকে মাসজিদ থেকে বের হবার পূর্বেই কুরআনের সবচেয়ে বড় সূরা শিক্ষা দেব। সাহাবী বললেন- এ বলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার হাত ধরলেন। যখন তিনি মাসজিদ থেকে বের হতে যাচ্ছিলেন, তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল আপনি তো বলেছিলেন, আমাকে কুরআনের সবচেয়ে বড় সূরা শিক্ষা দেবেন? তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন হ্যাঁ। তা হল-



(الْحَمْدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ)



“সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য যিনি জগতসমূহের প্রতিপালক।”এটি সাবআ মাসানি, কুরআনুল আযীম যা আমাকে দেয়া হয়েছে। (সহীহ বুখারী হা: ৪৪৭৪)



৪. সাহাবী আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর একদল সাহাবী কোন এক সফরে যাত্রা করেন। তারা এক আরব গোত্রে পৌঁছে তাদের মেহমান হতে চাইলেন। কিন্তু তারা তাদের মেহমানদারী করতে অস্বীকার করল। সে গোত্রের সরদার সাপে দংশিত হল। লোকেরা তার আরোগ্যের জন্য সব ধরনের চেষ্টা করল। কিন্তু কিছুতেই কোন উপকার হল না। তখন তাদের কেউ বলল, ঐ কাফেলা যারা এখানে অবতরণ করেছে হয়তো তাদের কাছে কিছু পাওয়া যেতে পারে। তারা তাদের নিকট গেল এবং বলল, হে যাত্রীদল! আমাদের সরদারকে সাপ দংশন করেছে, আমরা সবরকমের চেষ্টা করেছি, কিন্তু কোন উপকার হচ্ছে না। তোমাদের কারো নিকট কিছু আছে কি? তাদের (সাহাবীদের) একজন বলল, হ্যাঁ। আল্লাহ তা‘আলার শপথ! আমি ঝাড়ফুঁক করতে পারি। আমরা তোমাদের মেহমানদারী কামনা করেছিলাম, কিন্তু তোমরা আমাদের মেহমানদারী করনি। কাজেই আমি তোমাদের ঝাড়ফুঁক করব না, যে পর্যন্ত না তোমরা আমাদের জন্য পারিশ্রমিক নির্ধারণ কর। তখন তারা একপাল বকরী প্রদানের শর্তে তাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হল। তারপর তিনি গিয়ে



(الْحَمْدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ)



সূরা ফাতিহা পড়ে তার চিকিৎসা করলেন। ফলে আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছায় সে বন্ধনমুক্ত হল এবং সে এমনভাবে চলতে লাগল যেন তার কোন কষ্টই ছিল না......হাদীসের শেষ পর্যন্ত। (সহীহ বুখারী হা: ২২৭৬, ৫০০৭, ৫৭৩৬, ৫৭৪৯, সহীহ মুসলিম হা: ২২০১, আহমাদ হা: ১১৩৯৯)



৫. উবাই বিন কাব (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: উম্মুল কুরআনের (সূরা ফাতিহার) ন্যায় তাওরাত ও ইঞ্জিলে আল্লাহ তা‘আলা কোন কিছুই অবতীর্ণ করেননি। এ উম্মুল কুরআন সাবআ মাসানি। (তিরমিযী হা: ৩১২৫, নাসায়ী হা: ৯১৪, আল-জামি আল-সহীহ হা: ৫৫৬০, শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন)



কেউ কেউ সূরা ফাতিহাকে কবর যিয়ারত করতে মৃত ব্যক্তির পাশে বসে ও কবরে মৃত ব্যক্তির মাথার দিকে দাঁড়িয়ে পাঠ করে থাকে। এগুলো তাদের মনগড়া কাজ, যা বিদ‘আত। সুতরাং তা অবশ্যই বর্জনীয়।



১-২ নং আয়াতের তাফসীর:



বিসমিল্লাহর পূর্বে أَقْرَأُ (আক্রাউ) বা أَبْدَأُ (আব্দাউ) এমন একটি ক্রিয়া গোপন রয়েছে যার অর্থ আল্লাহ তা‘আলার নামে শুরু করছি বা তেলাওয়াত করছি।



“বিসমিল্লাহ” এর প্রাসঙ্গিক আলোচনা: ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম’প্রত্যেক সূরার স্বতন্ত্র একটি আয়াত, নাকি প্রত্যেক সূরার আয়াতের অংশ, না কেবল সূরা ফাতিহার একটি আয়াত, না কোন সূরারই স্বতন্ত্র আয়াত নয়; বরং এক সূরা থেকে অন্য সূরাকে পৃথক করার জন্য প্রত্যেক সূরার শুরুতে লেখা হয়েছে? এ বিষয়ে কিছু মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। তবে “বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম” সূরা নামলের ৩০ নং আয়াতের অংশ এ ব্যাপারে সকলে একমত।



১. সাহাবী আলী (রাঃ), ইবনু আব্বাস (রাঃ), সাঈদ বিন যুবাইর (রাঃ) প্রমুখের মতে এটি সূরা তাওবাহ ব্যতীত প্রত্যেক সূরার শুরুতে একটি পৃথক আয়াত। তাবেয়ী আব্দুল্লাহ বিন মুবারক এবং ইসহাকও এ মত পোষণ করেছেন।



২. ইমাম শাফিঈ (রহঃ) এর মতে, এটি শুধু সূরা ফাতিহার আয়াত অন্য সূরার আয়াত নয়।



৩. আবূ হানিফা ও ইমাম মালেক (রহঃ) এর মতে, এটি সূরা ফাতিহার আয়াত তো নয়ই এমনকি অন্য সূরারও আয়াত নয়। (ইবনে কাসীর, বিসমিল্লাহর তাফসীর)



তবে সঠিক কথা হলো “বিসমিল্লাহির রাহমানি রাহীম” সূরা নামলের মতই সূরা ফাতিহার একটি আয়াত। আর অন্যান্য সূরার শুরুতে লেখা হয়েছে বরকত হাসিল ও এক সূরা থেকে অপর সূরাকে পৃথক করার জন্য।



প্রথম দলীল: সাহাবী আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:



إِذَا قَرَأْتُمُ الْحَمْدَ لِلّٰهِ فَاقْرَءُوا (بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ) إِنَّهَا أُمُّ الْقُرْآنِ وَأُمُّ الْكِتَابِ وَالسَّبْعُ الْمَثَانِيْ وَ (بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ) إِحْدَاهَا



যখন তোমরা আল-হামদুল্লিাহ বা সূরা ফাতিহা পাঠ শুরু কর তখন ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম’পাঠ কর। কেননা সূরা ফাতিহা কুরআনের মূল, কিতাবের মূল এবং সালাতের মধ্যে বার বার তেলাওয়াত করা সাত আয়াতবিশিষ্ট সূরা। আর ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম’তার একটি আয়াত। (দারাকুতনী হা: ৩৬, সিলসিলা সহীহাহ হা: ১১৮৩)



দ্বিতীয় দলীল: বিষয় হল বর্তমান বিশ্বে কুরআনুল কারীমের নির্ভরযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য লিখিত কপি হল মদীনা মুনাওয়ারায় বাদশাহ ফাহাদ প্রিন্টিং প্রেস হতে মুদ্রিত কুরআনুল কারীম যা খলীফা উসমান (রাঃ) কর্তৃক সংকলিত কপির আদলে করা হয়েছে। সেখানেও বিসমিল্লাহ সূরা ফাতিহার প্রথম আয়াত হিসেবে রয়েছে। অতএব প্রমাণিত হয় “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” সূরা ফাতিহার প্রথম আয়াত। আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন।



“বিসমিল্লাহ” কিভাবে পড়তে হবে? সালাতে “বিসমিল্লাহ...” সশব্দে পড়ার স্বপক্ষে বিশুদ্ধ দলীল না থাকায় সঠিক নিয়ম হল “বিসমিল্লাহির রাহমানির রহীম” নিরবে পড়বে।



এটাই নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম), চার খলিফা ও সালাফদের থেকে প্রমাণিত। আনাস (রাঃ) বলেন: আমি নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম), আবূ বকর, উমার ও উসমান (রাঃ)-এর পেছনে সালাত আদায় করেছি। তাঁরা কিরাআতের আওয়াজ শুরু করতেন “আল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন” দ্বারা। (সহীহ বুখারী হা: ৭৪৩)



অর্থাৎ কোন অবস্থাতেই “বিসমিল্লাহির রাহমানির রহীম” সরবে পড়তেন না। (সহীহ মুসলিম হা: ৩৯৯)



“বিসমিল্লাহ” এর ফযীলত:



১. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: যখন তোমাদের কোন ব্যক্তি বাড়িতে প্রবেশকালে ও খাবার গ্রহণ করার সময় আল্লাহ তা‘আলাকে স্মরণ করে অর্থাৎ “বিসমিল্লাহ” বলে, তখন শয়তান (তার সঙ্গীদের) বলে তোমাদের রাত্রি যাপন ও খাবার নেই। আর বাড়িতে প্রবেশকালে আল্লাহ তা‘আলাকে স্মরণ করলে অর্থাৎ “বিসমিল্লাহ” না বললে শয়তান (তার সঙ্গীদের) বলে তোমরা রাত্রি যাপনের স্থান পেয়েছ এবং খাবার গ্রহণ করার সময় আল্লাহ তা‘আলাকে স্মরণ না করলে অর্থাৎ “বিসমিল্লাহ” না বললে শয়তান (তার সঙ্গীদের) বলে, রাত্রি যাপন ও খাবার উভয়টাই পেয়েছ। (আদাবুল মুফরাদ: ১/৪৩৩, সহীহ ইবনু মাযাহ হা: ৩৮৭৭, ইবনে হিব্বান হা: ৮১৯, সহীহ)। সুতরাং প্রত্যেক ভাল কাজের পূর্বে ‘বিসমিল্লাহ’বলা উচিত।



২. জাবের (রাঃ) হতে বর্ণিত, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: ‘বিসমিল্লাহ’বলে তুমি তোমার দরজা বন্ধ কর। কারণ শয়তান বন্ধ দরজা খুলতে পারবে না। ‘বিসমিল্লাহ’বলে বাতি নিভিয়ে দাও, একটু কাঠখণ্ড দিয়ে হলেও ‘বিসমিল্লাহ’বলে পাত্রের মুখ ঢেকে দাও। (সহীহ বুখারী হা: ৩২৮০, সহীহ মুসলিম হা: ২০১২)

৩. আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: যে ব্যক্তি ওযূ করার সময় بِسْمِ اللّٰهِ (বিসমিল্লাহ) পাঠ করে না, তার ওযূ হয় না। (আবূ দাঊদ হা: ১০১, ইবনু মাযাহ হা: ৩৯৭, সহীহ)



৪. কোন গুরুত্বপূর্ণ লেখনি, পত্র বা বাণীর শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম’লেখা উচিত, কারণ এটা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিয়ম ছিল। তিনি যখন রোমের বাদশাহ হিরাক্লিয়াসের কাছে ইসলামের দাওয়াত পত্র লেখেন তখন শুরুতেই লেখেন



بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ مِنْ مُحَمَّدٍ عَبْدِ اللّٰهِ وَرَسُوْلِهِ



‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম’আল্লাহ তা‘আলার বান্দা ও রাসূল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পক্ষ থেকে। (সহীহ বুখারী হা: ৭, সহীহ মুসলিম হা: ৪৫৮)



উল্লেখ্য যে, “বিসমিল্লাহ” এর পরিবর্তে ৭৮৬ লেখা অমুসলিমদের আবিষ্কার। তাই ৭৮৬ লেখা ও বলা বৈধ নয় বরং হারাম ও গুনাহের কাজ।



(اَلْحَمْدُ لِلہِ رَبِّ الْعٰلَمِیْنَ)



‘সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য যিনি জগতসমূহের প্রতিপালক।’কুরআনের শুরুতেই আল্লাহ তা‘আলা নিজেই নিজের প্রশংসা করেছেন। আর এরূপ নিজেই নিজের প্রশংসা করা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার জন্যই সীমাবদ্ধ। প্রশংসা করা একটি ইবাদত যা শুধু আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির জন্য করতে হবে। এর অনেক ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:



أَفْضَلُ الدُّعَاءِ اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ



সর্বোত্তম দু‘আ ‘আল-হামদুলিল্লাহ।’আল্লাহর প্রশংসা করা (তিরমিযী হা: ৩৩৪৩, সহীহ)



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরো বলেন:



اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ تَمْلَأُ الْمِيْزَانِ



‘আল হামদুলিল্লাহ (সওয়াবের) পাল্লা পূর্ণ করবে।’(সহীহ মুসলিম হা: ২২৩) বিশ্বজগতের সবাই আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَلَهُ الْحَمْدُ فِي السَّمٰوٰتِ وَالْأَرْضِ)



‘আকাশ ও জমিনে তাঁর জন্যই সকল প্রশংসা।’(সূরা রূম ৩০:১৮)



আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:



(لَهُ الْحَمْدُ فِي الْأُوْلٰي وَالْاٰخِرَةِ)



‘দুনিয়াতে ও আখেরাতে তাঁর জন্যই সকল প্রশংসা।’(সূরা কাসাস ২৮:৭০)



اللّٰهُ (আল্লাহ) হলেন বিশ্বজাহানের প্রতিপালক। “আল্লাহ” তাঁর সত্তাগত নাম। যাকে ‘ইসমে আযম’বলা হয়। তাঁর অন্যান্য নামগুলো এ নামের অনুগামী ও গুণবাচক নাম। এ নাম বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কারো জন্য প্রযোজ্য নয়। এ নামের কোন ভাষায় কোন প্রতিশব্দ ও কোন পরিবর্তন নেই এবং এ নামের কোন দ্বিবচন বা বহুবচন নেই। সুতরাং ‘আল্লাহ’নামের অনুবাদ হিসেবে গড, ইশ্বর, ভগবান, খোদা ইত্যাদি বলা বা আল্লাহ তা‘আলাকে ঐ সব নামে নামকরণ করা বা ডাকা যাবে না।



আজকাল অনেককে দেখা যায় বিভিন্ন মাসজিদে, মাদরাসায়, বাড়িতে, গাড়িতে ইত্যাদি জায়গায় বরকতের জন্য এক পাশে আল্লাহ (اللّٰهُ) অপর পাশে মুহাম্মাদ (مُحَمَّد) লিখে রাখে। এটা নিঃসন্দেহে বিদ‘আত ও আল্লাহ তা‘আলার শানে বেআদবী। কেননা এরূপ পাশাপাশি ‘আল্লাহ ও মুহাম্মাদ’লেখা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে আল্লাহ তা‘আলার সমান মর্যাদায় স্থান দেয়ার শামিল, যা এক প্রকার শির্ক। সুতরাং এরূপ কখনো বৈধ নয়। রাসূলুল্লাহ বলেন:



لاَ تُطْرُونِي، كَمَا أَطْرَتْ النَّصَارَي ابْنَ مَرْيَمَ، فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ، فَقُولُوا عَبْدُ اللّٰهِ، وَرَسُولُهُ



খ্রিস্টানরা ইবনু মারইয়াম (ঈসা (আঃ))-কে নিয়ে যেমন বাড়াবাড়ি করেছে তোমরা আমাকে নিয়ে তেমন বাড়াবাড়ি করো না। আমি কেবল একজন আল্লাহর বান্দা। সুতরাং তোমরা আমাকে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল হিসেবেই সম্বোধন কর। (সহীহ বুখারী হা: ৩৪৪৫)



কারো জিজ্ঞাসা হতে পারে



أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللّٰهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ



এখানে একই লাইনে اللّٰهُ ও مُحَمَّد নাম দু’টি রয়েছে তাহলে কি কালিমা শাহাদাতও ভুল?



উত্তর: আসলে কালিমা শাহাদাত বা আরো কোন কালিমায় একই লাইনে নাম দু’টি থাকলেও অর্থগত ও ভাবগত কোন সমস্যা নেই, বরং অর্থই স্পষ্ট করে দেয় যে, اللّٰهُ হলেন মা‘বূদ, আর মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হলেন আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। এমনকি দেখার সাথে সাথে দর্শক ও পাঠকের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। পক্ষান্তরে শুধু اللّٰهُ ও مُحَمَّد নাম দু’টি যখন উর্ধ্বে সমানভাবে লেখা হয়, তখন ভাবটা যেন এরূপ প্রকাশ হয় যে, আল্লাহ ও মুহাম্মাদ সমান স্থানের, সমান স্তরের এবং সমান মর্যাদার। এমনকি পাঠক ও দর্শক একইভাবে মনে করে ও পাঠ করে। কেউ কারো ঊর্ধ্বে নয়, দু’জনই সমান, নাউযুবিল্লাহ। সুতরাং এ ধরণের চিন্তা ও বিশ্বাস রাখা শির্ক। অতএব তা অবশ্যই বর্জনীয়। আমরা রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে অবশ্যই সকল মানুষের ঊর্ধ্বে স্থান দেব কিন্তু এর অর্থ এ নয় যে, তিনি আল্লাহর সমপর্যায়, নাউযুবিল্লাহ। আল্লাহ তা‘আলা হলেন সকলের ঊর্ধ্বে, তাঁর কোন সমকক্ষ নেই, তিনি এক ও অদ্বিতীয়। আর মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হলেন তাঁর বান্দা ও রাসূল, তাঁর সৃষ্টি জীব। তিনি মানুষের মাঝে শ্রেষ্ঠ কিন্তু কখনও আল্লাহ তা‘আলার সমপর্যায় নয়। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে সঠিক অবস্থানে থাকার তাওফীক দান করুন, আমীন।



“رَبِّ الْعَالَمِيْنَ”



রব্বিল আলামীন- এটি আল্লাহ তা‘আলার গুণবাচক নাম:



رب শব্দের অর্থ: লালন পালন করা, কোন বস্তুর সকল কল্যাণের প্রতি লক্ষ রেখে পর্যায়ক্রমে সামনে এগিয়ে নিয়ে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দেয়া।



আল্লাহ তা‘আলা যখন মূসা (আঃ)-কে ফির‘আউনের কাছে রবের দাওয়াত দেয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন, মূসা (আঃ) তার কাছে দাওয়াত পেশ করলে ফির‘আউন বলল:



(فَمَنْ رَّبُّكُمَا يٰمُوْسٰي)



‘হে মূসা তোমাদের প্রতিপালক কে?’(সূরা ত্বহা ২০:৪৯)



কারণ ফির‘আউন জানত আমিই মূসাকে লালন-পালন করেছি, ছোট থেকে বড় করেছি। তখন মূসা (আঃ) জবাবে বললেন:



(قَالَ رَبُّنَا الَّذِيْ أَعْطٰي كُلَّ شَيْءٍ خَلْقَه۫ ثُمَّ هَدٰي)



‘‘আমাদের প্রতিপালক তিনি যিনি সকল বস্তুকে সৃষ্টি করেছেন অতঃপর পথপ্রদর্শন করেছেন।’’(সূরা ত্ব-হা ২০:৫০)



আর اَلْعَالَمِيْنَ শব্দটি عَالَمٌ এর বহুবচন, এতে সপ্ত আকাশ, সপ্ত জমিন ও উভয়ের মাঝে যা কিছু আছে সবই অন্তর্ভুক্ত। ফির‘আউন বলল:



(وَمَا رَبُّ الْعٰلَمِيْنَ)



‘‘রব্বুল আলামীন কে?’’জবাবে মূসা (আঃ) বলেন:



(قَالَ رَبُّ السَّمٰوٰتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا)



‘‘আকাশ, জমিন ও উভয়ের মাঝে যা কিছু আছে সব কিছুর প্রতিপালক।’(সূরা শুয়ারা ২৬:২৩, ২৪) সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা আকাশ, জমিন ও মানবসহ সব কিছুর প্রতিপালক। তিনিই সব কিছুর একক স্রষ্টা, একক পালনকারী, একক পরিচালক ও একক অধিকারী, অন্য কেউ নয়।



এ আয়াত থেকেই আল্লাহ তা‘আলা তাঁর তাওহীদের পরিচয় তুলে ধরেছেন। তাই তাওহীদ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরা জরুরী।



তাওহীদের পরিচয়ঃ



তাওহীদ শব্দটি মুসলিম সমাজে একটি সুপরিচিত শব্দ হলেও এর সঠিক পরিচয় অনেকের কাছে অজানা। এজন্য বহু মুসলিম ব্যক্তি তাওহীদের বাণীর স্বীকৃতি দেয়া সত্ত্বেও তাওহীদ পরিপন্থী কর্মকান্ডে হাবুডুবু খাচ্ছে। আবার অনেকে তাওহীদের নামে সাধারণ মুসলিমদেরকে ধোঁকা দিচ্ছে।



তাওহীদ এর শাব্দিক অর্থ হলঃ



(جَعْلُ الشَّيْئِ وَاحِدًا)



অর্থাৎ কোন কিছুকে এক করে দেয়া। আল্লাহ তা‘আলাকে যাবতীয় শরীক হতে মুক্ত করে স্বীয় কর্তৃত্ব, গুণাবলী ও অধিকার এক করার নামই হল তাওহীদ।



তাওহীদ এর পারিভাষিক অর্থঃ নিম্ন বর্ণিত তিনটি বিষয় মনে-প্রাণে বিশ্বাস করা, মৌখিক স্বীকৃতি প্রদান করা এবং বাস্তবে পালন করার নাম তাওহীদ:



১। সমগ্র বিশ্বের স্রষ্টা, প্রতিপালক, মালিক ও পরিচালক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা, অন্য কেউ নয়।



২। সৃষ্টি জীবের যাবতীয় ইবাদত বা উপাসনা একনিষ্ঠভাবে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার জন্যই সম্পাদন করা এবং অন্য সকল ব্যক্তি ও বস্তুকে ইবাদাতে আল্লাহ তা‘আলার শরীক না করা এবং সে সবের ইবাদত বা উপাসনা সম্পূর্ণরূপে বর্জন করা।



৩। পবিত্র কুরআন এবং সহীহ হাদীসে আল্লাহ তা‘আলার যেসব সুন্দর নাম ও পবিত্র গুণাবলী বর্ণিত হয়েছে সেগুলিকে কোন অপব্যাখ্যা, অস্বীকৃতি, বিকৃতি ও সাদৃশ্য স্থাপন ছাড়াই একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার জন্যই খাসভাবে সাব্যস্ত করা। (সাবীলুল হুদা ওয়ার রাশাদঃ ১২ পৃষ্ঠা)



তাওহীদ নামে ধোঁকাঃ



তাওহীদ শব্দটি মুসলিম সমাজে একটি সুপরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ শব্দ। পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীসে যে তাওহীদের বর্ণনা এসেছে বা রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে তাওহীদ শিক্ষা দিয়েছেন উক্ত বর্ণনাই হলো সেই তাওহীদের আসল বর্ণনা। কিন্তু দুঃখের বিষয় মুসলিম নামধারী বিভিন্ন দল ও মত “তাওহীদ” শব্দটি ব্যবহার করে নিজেদের বাতিল মত ও পথ প্রচার করে যাচ্ছে। অতএব একজন সত্যাগ্রহী মুসলিম ব্যক্তিকে এ সকল ধোঁকা হতে সতর্ক থাকা অতি জরুরী। নিম্নে সংক্ষিপ্তভাবে কয়েকটি দলের তাওহীদী মতবাদ তুলে ধরা হলোঃ



১। জাহমিয়া সম্প্রদায়ের তাওহীদঃ এ সম্প্রদায়ের নিকট তাওহীদ হল আল্লাহ তা‘আলার নাম, গুণাবলী ও অস্তিত্বকে অস্বীকার করা, শুধুমাত্র স্মৃতিতে আল্লাহ তা‘আলাকে মনে করাই হলো তাদের তাওহীদ।



২। চরমপন্থী সুফীবাদের তাওহীদঃ এ সম্প্রদায়ের নিকট তাওহীদ হল ওয়াহদাতুল উজুদ অর্থাৎ পৃথিবীর বুকে অস্তিত্বে যা পাওয়া যায় তা সবই আল্লাহ তা‘আলা। আকৃতিতে জিন, ইনসান, শুকুর ও কুকুর যাই হোক না কেন তা মূলত আল্লাহ তা‘আলারই উপস্থিতি। (নাউযুবিল্লাহ)



৩। মুতাযিলাদের তাওহীদঃ এ সম্প্রদায়ের নিকট আল্লাহ তা‘আলার যাবতীয় গুণাবলীকে অস্বীকার করার নামই হল তাওহীদ। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলার গুণাবলীকে স্বীকার করে সে তাদের নিকট মুশরিক।



৪। আরেক দল মনে করে আল্লাহ তা‘আলাকে শুধু সৃষ্টিকর্তা হিসাবে স্বীকার করার নামই তাওহীদ।



৫। অপর আরেক দল মনে করে আল্লাহ তা‘আলাকে শুধু বিধানদাতা হিসেবে স্বীকার করার নামই তাওহীদ।



অতএব ইসলামের দাবীদার সকল দলই তাওহীদ এর দাওয়াত দেয় এবং তাওহীদ এর কথা বলে। কিন্তু নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর তাওহীদ কতক দলের নিকট শির্ক, যেমনঃ জাহমিয়া, মুতাযিলা ও চরমপন্থী সুফীবাদের নিকট, আবার নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর শির্ক হল তাদের নিকট তাওহীদ। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সকলকে কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর তাওহীদ বুঝার ও মেনে চলার তাওফীক দান করুন, আমীন।



তাওহীদের প্রকারভেদঃ



কুরআন বা হাদীসে তাওহীদ কত প্রকার ও কী কী তা সংখ্যায় উল্লেখ হয়নি। তবে কুরআনের আয়াতগুলোতে তাওহীদের অনুসন্ধান করে দেখলে পাওয়া যায় তাওহীদ তিন প্রকার। নিম্নে সংক্ষেপে প্রকারসমূহ প্রদত্ত হলঃ



১। تَوْحِيْدُ الرُّبُوْبِيَّةِ



তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ (প্রতিপালনে আল্লাহ তা‘আলার এককত্ব) : “সমগ্র সৃষ্টি জগতের স্রষ্টা, প্রতিপালক, পরিচালক, পূর্ণ ক্ষমতাশীল ও সার্বভৌমত্বের মালিক হিসেবে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাকে স


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: এই সূরাটির নাম ‘সূরা-ই-আল ফাতিহাহ্। কোন কিছু আরম্ভ করার নাম ‘ফাতিহাহ’ বা উদ্ঘাটিকা। কুরআন কারীমের মধ্যে প্রথম এই সূরাটি লিখিত হয়েছে বলে একে সূরা-ই-আল ফাতিহাহ্ বলা হয়। তাছাড়া নামাযের মধ্যে এর দ্বারাই কিরাআত আরম্ভ করা হয় বলেও একে এই নামে অভিহিত করা হয়েছে। উম্মুল কিতাব’ও এর অপর একটি নাম। জমহুর বা অধিকাংশ ইমামগণ এ মতই পোষণ করে থাকেন। কিন্তু হাসান বসরী (রঃ) এবং ইবনে সীরীন (রঃ) একথা স্বীকার করেন না। তাঁরা বলেন যে, ‘লাও-হি মাহফুয বা সুরক্ষিত ফলকের নামও উম্মুল কিতাব। হাসানের উক্তি এই যে, প্রকাশ্য আয়াতগুলোকে উম্মুল কিতাব বলা হয়। জামেউত তিরমিযীর একটি বিশুদ্ধ হাদীসে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী) এই সূরাটি হলো উম্মুল কুরআন, উম্মুল কিতাব, সাবআ মাসানী এবং কুরআন আযীম'। এই সূরাটির নাম ‘সূরাতুল হামদ’ এবং সূরাতুস্ সালাত'ও বটে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি সালাতকে (অর্থাৎ সূরা-ই-ফাতিহাকে আমার মধ্যে এবং আমার বান্দাদের মধ্যে অর্ধেক অর্ধেক করে ভাগ করে দিয়েছি। যখন বান্দা বলে (আরবী) তখন আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে। এই হাদীস দ্বারা জানা যায় যে, সূরা-ই-ফাতিহার নাম সূরা- ই-সালাতও বটে। কেননা এই সূরাটি নামাযের মধ্যে পাঠ করা শর্ত রয়েছে। এই সূরার আর একটি নাম সূরাতুশ শিফা। দারিমীর মধ্যে হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে মারফু রূপে বর্ণিত আছে যে, সূরা-ই-ফাতিহা প্রত্যেক বিষ ক্রিয়ায় আঁরেগ্যিদানকারী। এর আর একটি নাম সূরাতুর রকিয়্যাহ'। হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) সাপে কাটা রুগীর উপর ফু দিলে সে ভাল হয়ে যায়। এ দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ এটা যে রকিয়্যাহ (অর্থাৎ পড়ে ফুঁ দেয়ার সূরা) তা তুমি কেমন করে জানলে?'

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ সূরাকে আসাসুল কুরআন বলতেন। অর্থাৎ কুরআনের মূল বা ভিত্তি। আর এই সূরার ভিত্তি হলো (আরবী) সুফইয়ান বিন উয়াইনাহ (রঃ) বলেন যে, এই সূরার নাম অফিয়াহ্। ইয়াহ্ইয়া বিন কাসীর (রাঃ) বলেন যে, এর নাম কাফিয়াও বটে। কেননা, এটা অন্যান্য সূরাকে বাদ দিয়েও একাই যথেষ্ট হয়ে থাকে। কিন্তু অন্য কোন সূরা একে বাদ দিয়ে যথেষ্ট হয় না। কোন কোন মুরসাল (যে হাদীসের সনদের ইনকিতা' শেষের দিকে হয়েছে অর্থাৎ সাহাবীর নামই বাদ পড়েছে এবং তাবেঈ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নাম করে হাদীস বর্ণনা করেছেন তাকে হাদীসে’ মুরসাল বলে) হাদীসের মধ্যেও একথা এসেছে যে, উম্মুল কুরআন সবারই স্থলাভিষিক্ত হতে পারে, কিন্তু অন্যান্য সূরাগুলো উম্মুল কুরআনের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে না। (আল্লামা যামাখশারীর তাফসীর-ই-কাশশাফ দ্রব্য)

একে সূরাতুস সালাত এবং সূরাতুল কাজও বলা হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), কাতাদাহ (রঃ) এবং আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে, এই সূরাটি মাক্কী। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ), আতা’ বিন ইয়াসার (রঃ) এবং ইমাম যুহরী (রঃ) বলেন যে, এই সূরাটি মাদানী। এটাও একটি অভিমত যে, এই সূরাটি দুইবার অবতীর্ণ হয়েছে। একবার মক্কায় এবং অন্যবার মদীনায়। কিন্তু প্রথমটিই বেশী সঠিক ও অভ্রান্ত। কেননা অন্য আয়াতে আছে (আরবী) অর্থাৎ ‘আমি তোমাকে সাবআ মাসানী (বারবার আবৃত্ত সাতটি আয়াত) প্রদান করেছি'।' (১৫:৮৭) আল্লাহ তা'আলাই এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী জানেন।

আবু লাইস সমরকন্দীর (রঃ) একটি অভিমত কুরতুবী (রঃ) এও নকল করেছেন যে, এই সূরাটির প্রথম অর্ধাংশ মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে এবং শেষ অর্ধাংশ মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু হাদীসের পরিভাষায় এই কথাটিও সম্পূর্ণ গারীব বা দুর্বল। এ সূরার আয়াত সম্পর্কে সবাই একমত যে ওগুলি ৭টা। কিন্তু আমর বিন উবায়েদ ৮টা এবং হুসাইন যফী ৬টাও বলেছেন। এ দুটো মতই সাধারণ মতের বহির্ভূত ও পরিপন্থী (আরবী) এই সূরাটির পৃথক আয়াত কিনা তাতে মতভেদ রয়েছে। সমস্ত কারী, সাহাবী (রাঃ) এবং তাবেঈর (রঃ) একটি বিরাট দল এবং পরবর্তী যুগের অনেক বয়োবৃদ্ধ মুরব্বী একে সূরা -ই-ফাতিহার প্রথম, পূর্ণ একটি পৃথক আয়াত বলে থাকেন। কেউ কেউ একে সূরা-ই-ফাতিহারই অংশ বিশেষ বলে মনে করেন। আর কেউ কেউ একে এর প্রথমে মানতে বা স্বীকার করতেই চান না। যেমন মদীনা শরীফের কারী ও ফকীহগণের এই তিনটিই অভিমত। ইনশাআল্লাহ পূর্ণ বিবরণ সামনে প্রদত্ত হবে। এই সূরাটির শব্দ হলো পঁচিশটি এবং অক্ষর হলো একশো তেরটি। ইমাম বুখারী (রঃ) সহীহ বুখারীর কিতাবুত তাফসীরের মধ্যে লিখেছেনঃ “এই সূরাটির নাম উম্মুল কিতাব' রাখার কারণ এই যে, কুরআন মাজীদের লিখন এ সূরা হতেই আরম্ভ হয়ে থাকে এবং নামাযের কিরআতও এ থেকেই শুরু হয়।

একটি অভিমত এও আছে যে, যেহেতু পূর্ণ কুরআন কারীমের বিষয়াবলী সংক্ষিপ্তভাবে এর মধ্যে নিহিত রয়েছে, সেহেতু এর নাম উম্মুল কিতাব হয়েছে। কারণ, আরব দেশের মধ্যে এ প্রথা চালু আছে যে, তারা একটি ব্যাপক কাজ বা কাজের মূলকে ওর অধীনস্থ শাখাগুলির ‘উম্ম’ বা ‘মা’ বলে থাকে। যেমন (আরবী) তারা ঐ চামড়াকে বলে যা সম্পূর্ণ মাথাকে ঘিরে রয়েছে এবং সামরিক বাহিনীর পতাকাকেও তারা (আরবী) বলে থাকে যার নীচে জনগণ একত্রিত হয়। কবিদের কবিতার মধ্যেও একথার ভুরি ভুরি প্রমাণ পাওয়া যায়। মক্কা শরীফকেও উম্মুল কুরা বলার কারণ এই যে, ওটাই সারা বিশ্ব জাহানের প্রথম ঘর। পৃথিবী সেখান হতেই ব্যাপ্তি ও বিস্তার লাভ করেছে। নামাযের কিরআত ওটা হতেই শুরু হয় এবং সাহাবীগণ কুরআন কারীম লিখার সময় একেই প্রথমে লিখেছিলেন বলে একে ফাতিহাও বলা হয়। এর আর একটি সঠিক নাম ‘সাবআ মাসানীও রয়েছে, কেননা এটা নামাযের মধ্যে বারবার পঠিত হয়। একে প্রতি রাকাতেই পাঠ করা হয়। মাসানীর অর্থ আরও আছে যা ইনশাআল্লাহ যথাস্থানে বর্ণিত হবে। মুসনাদে-ই-আহমাদের মধ্যে হযরত আবু হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) উম্মুল কুরা' সম্পর্কে বলেছেনঃ 'এটাই উম্মুল কুরআন এটাই সাবআ মাসানী এবং এটাই কুরআনে আযীম। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘এটাই ‘উম্মুল কুরআন, এটাই 'ফাতিহাতুল কিতাব’ এবং এটাই সাবআ মাসানী।

তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াইতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী)-এর সাতটি আয়াত। (আরবী) ও ওগুলোর মধ্যে একটি আয়াত। এরই নাম সাবআ মাসানী’, এটাই, কুরআনে আযীম, এটাই ‘উম্মুল কিতাব, এটাই ‘ফাতিহাতুল কিতাব’ এবং এটাই কুরআনে আযীম।

ইমাম দারকুতনীও (রঃ) স্বীয় হাদীস গ্রন্থে এরূপ একটি হাদীস এনেছেন এবং তিনি তার সমস্ত বর্ণনাকারীদেরই নির্ভরযোগ্য বলেছেন। বায়হাকীতে রয়েছে যে, হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত আবু হুরায়রাহ (রাঃ) সাবআ মাসানী’র ব্যাখ্যায় বলেছেনঃ ‘এটা সূরা-ই-ফাতিহা এবং -এর সপ্তম আয়াত। (আরবী)-এর আলোচনায় (আরবী)-এর বর্ণনা পূর্ণভাবে দেওয়া হবে।

হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলঃ আপনার লিখিত কুরআন কারীমের প্রারম্ভে আপনি সূরা-ই-ফাতিহা লিখেননি কেন? তিনি উত্তরে বলেছিলেনঃ যদি আমি লিখতাম তবে প্রত্যেক সূরারই প্রথমে ওটাকে লিখতাম। আবু বকর বিন আবি দাউদ (রঃ) বলেনঃ একথার ভাবার্থ এই যে, . নামাযের মধ্যে তা পাঠ করা হয় এবং সমস্ত মুসলমানের এটা মুখস্থ আছে বলে তা’ লিখার আর প্রয়োজন হয় না। দালাইলুন নবুওয়াত’ এ ইমাম বায়হাকী (রঃ) একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাতে রয়েছে যে, এই সুরাটি সর্বপ্রথম অবর্তীণ হয়েছে। বাকিলানীর (রঃ) তিনটি উক্তি বর্ণিত হয়েছেঃ (১) সূরা-ই-ফাতিহা সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে। (২) (আরবী) সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে। (৩) (আরবী) সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে। শেষ উক্তিটিই সঠিক। এর পূর্ণ বিবরণ ইনশাআল্লাহ যথাস্থানে আসবে।

সূরা-ই-ফাতিহার ফযীলত ও মাহাত্ম্যঃ

মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আবু সাইদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “আমি নামায পড়ছিলাম, এমন সময়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে ডাক দিলেন, আমি কোন উত্তর দিলাম না। নামায শেষ করে আমি তাঁর নিকট উপস্থিত হলাম। তিনি আমাকে বললেনঃ এতক্ষণ তুমি কি কাজ করছিলে? আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি নামাযে ছিলাম। তিনি বললেনঃ আল্লাহ তা'আলার এই নির্দেশ কি তুমি শুননি? (আরবী)

অর্থাৎ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের (সঃ) ডাকে সাড়া দাও যখন তাঁরা তোমাদেরকে আহ্বান করেন। (৮:২৪) জেনে রেখো, মসজিদ হতে যাবার পূর্বেই আমি তোমাদেরকেই বলে দিচ্ছি, পবিত্র কুরআনের মধ্যে সবচেয়ে বড় সূরা কোটি। অতঃপর তিনি আমার হাত ধরে মসজিদ হতে চলে যাবার ইচ্ছে করলে আমি তাকে তার অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিলাম। তিনি বললেনঃ ‘ঐ সূরাটি হলো (আরবী) এটাই সাবআ’ মাসানী এবং এটাই কুরআন আযীম যা আমাকে দেয়া হয়েছে। এভাবেই এই বর্ণনাটি সহীহ বুখারী শরীফ, সুনান-ই আবি দাউদ এবং সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যেও অন্য সনদে বর্ণিত হয়েছে। ওয়াকেদী (রঃ) এই ঘটনাটি হযরত উবাই ইবনে কা'বের (রাঃ) বলে বর্ণনা করেছেন। মুআত্তা-ই-ইমাম মালিকে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) কে ডাক দিলেন। তিনি নামায পড়ছিলেন। নামায শেষ করে তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাত করেন। তিনি বলেনঃ তিনি (নবী সঃ) স্বীয় হাতখানা আমার হাতের উপর রাখলেন। মসজিদ হতে বের হতে হতেই বললেনঃ আমি চাচ্ছি যে, মসজিদ হতে বের হওয়ার পূর্বেই তোমাকে এমন একটি সূরার কথা বলবো যার মত সূরা তাওরাত, ইঞ্জীল ও কুরআনে নেই। এখন আমি এই আশায় আস্তে আস্তে চলতে লাগলাম এবং জিজ্ঞেস করলাম-“হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সেই সূরাটি কি? তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ নামাযের প্রারম্ভে তোমরা কি পাঠ কর?' আমি বললাম (আরবী) তিনি বললেনঃ “এই সূরা সেটি। সাবআ’ মাসানী এবং কুরআন আযীম যা আমাকে দেয়া হয়েছে তাও এই সূৱাই বটে। এই হাদীসটির শেষ বর্ণনাকারী হলেন আবু সাঈদ (রঃ)। এর উপর ভিত্তি করে ইবনে আসীর এবং তাঁর সঙ্গীগণ প্রতারিত হয়েছেন এবং তাঁকে আবু সাঈদ বিন মুআল্লা মনে করেছেন। এ আবু সাঈদ অন্য লোক, ইনি খাসাইর কৃতদাস এবং তাবেঈগণের অন্তর্ভুক্ত। আর উক্ত আবু সাঈদ আনসারী (রাঃ) একজন সাহাবী। তার হাদীস মুত্তাসিল (যে হাদীসের সনদের মধ্যে কোন স্তরে কোন রাবী বাদ না পড়ে অর্থাৎ সকল রাবীর নামই যথাস্থানে উল্লেখ থাকে তাকে হাদীসে মুত্তাসিল বলে) এবং বিশুদ্ধ। পক্ষান্তরে এই হাদীসটি বাহ্যতঃ পরিত্যাজ্য যদি আবু সাঈদ তাবেঈর হযরত উবাই (রাঃ) হতে শুনা সাব্যস্ত না হয়। আর যদি শুনা সাব্যস্ত হয় তবে হাদীসটি যথার্থতার শর্তের উপর নির্ভরশীল। আল্লাহ তাআলাই এ সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জানেন। এই হাদীসটির আরও অনেক সূত্র রয়েছে। মুসনাদ-ই- আহমাদে রয়েছে, হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উবাই বিন কা'বের (রাঃ) নিকট যান যখন তিনি নামায পড়ছিলেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ “হে উবাই (রাঃ)! এতে তিনি (তার ডাকের প্রতি মনোযোগ দেন কিন্তু কোন উত্তর দেন নি। আবার তিনি বলেনঃ “হে উবাই (রাঃ)!' তিনি বলেনঃ ‘আস্সালামু আলাইকা।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘ওয়াআলাইকাস সালাম। তারপর বলেনঃ “হে উবাই (রাঃ)! আমি তোমাকে ডাক দিলে উত্তর দাওনি কেন?' তিনি বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি নামাযে ছিলাম।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন উপরোক্ত আয়াতটিই পাঠ করে বলেনঃ তুমি কি এই আয়াতটি শুননি? তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হাঁ (আমি শুনেছি) এরূপ কাজ আর আমার দ্বারা হবে না।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ তুমি কি চাও যে, তোমাকে আমি এমন একটি সূরার কথা বলে দেই যার মত কোন সূরা তাওরাত, ইঞ্জীল এবং কুরআনের মধ্যেই নেই? তিনি বলেনঃ হ্যা অবশ্যই বলুন।' তিনি বলেনঃ এখান থেকে যাবার পূর্বেই আমি তোমাকে তা বলে দেবো।' অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার হাত ধরে চলতে চলতে অন্য কথা বলতে থাকেন, আর আমি ধীর গতিতে চলতে থাকি। এই ভয়ে যে না জানি কথা থেকে যায় আর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বাড়ীতে পৌছে যান। অবশেষে দরজার নিকট পৌছে আমি তাঁকে তাঁর অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেই।' তিনি বলেনঃ নামাযে কি পড়’ আমি উম্মুল কুরা’ পড়ে শুনিয়ে দেই।' তিনি বলেনঃ “সেই আল্লাহর শপথ যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, এরূপ কোন সূরা তাওরাত, ইঞ্জীল, জবুর এবং কুরআনের মধ্যে নেই। এটাই হলো ‘সাবআ মাসানী'। জামেউত তিরমিযীর মধ্যে আরও একটু বেশী আছে। তা হলো এই যে, এটাই বড় কুরআন যা আমাকে দান করা হয়েছে। এই হাদীসটি সংজ্ঞা ও পরিভাষা অনুযায়ী হাসান ও সহীহ। হযরত আনাস (রাঃ) হতেও এ অধ্যায়ে একটি হাদীস বর্ণিত আছে। মুসনাদ-ই-আহমাদেও এইভাবে বর্ণিত আছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) একে পরিভাষার প্রেক্ষিতে হাসান গারীব বলে থাকেন। মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আবদুল্লাহ বিন জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করি। সে সময় সবেমাত্র তিনি সৌচ ক্রিয়া সম্পাদন করেছেন। আমি তিনবার সালাম দেই কিন্তু তিনি উত্তর দিলেন না। তিনি তো বাড়ীর মধ্যেই চলে গেলেন, আমি দুঃখিত, ও মর্মাহত অবস্থায় মসজিদে প্রবেশ করি। অল্পক্ষণ পরেই পবিত্র হয়ে তিনি আগমন করেন এবং তিনবার সালামের জওয়াব দেন। অতঃপর বলেন, “হে আবদুল্লাহ বিন জাবির (রাঃ)! জেনে রেখো, সম্পূর্ণ কুরআনের মধ্যে সর্বোত্তম সূরা হলো (আরবী) এই সূরাটি। এর ইসনাদ খুব চমক্কার। এর বর্ণনাকারী ইবনে আকীলের হাদীস বড় বড় ইমামগণ বর্ণনা করে থাকেন। এই আবদুল্লাহ বিন জাবির বলতে আবদী সাহাবীকে (রাঃ) বুঝানো হয়েছে। ইবনুল জাওযীর কথা এটাই। আল্লাহ তাআলা এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল জানেন। হাফিয ইবনে আসাকীরের (রঃ) অভিমত এই যে, ইনি হলেন আবদুল্লাহ বিন জাবির আনসারী বিয়াযী (রাঃ)।

কুরআনের আয়াত ও সূরাসমূহ এবং ওগুলোর পারস্পরিক মর্যাদা

এই হাদীস এবং এ ধরনের অন্যান্য হাদীসসমূহ দ্বারা প্রমাণ বের করে ইবনে রাহ্ইয়াহ, আবু বকর বিন আরবী, ইবনুল হাযার (রঃ) প্রমুখ অধিকাংশ আলেমগণ বলেছেন যে, কোন আয়াত এবং কোন সূরা অপর কোন আয়াত ও সূরার চেয়ে বেশী মর্যাদার অধিকারী। আবার অন্য একদলের ধারণা এই যে, আল্লাহর কালাম সবই সমান। একের উপর অন্যের প্রাধান্য দিলে যে অসুবিধার সৃষ্টি হবে তা হলো অন্য আয়াত ও সূরাগুলি কম মর্যাদা সম্পন্ন রূপে পরিগণিত ও প্রতিপন্ন হবে। অথচ আল্লাহপাকের সমস্ত কালামই সমমর্যাদাপূর্ণ। কুরতুবী এটাই নকল করেছেন আশআরী, আবু বকর বাকিল্লানী, আবু হাতিম ইবনে হাব্বান কূসতী, আবু হাব্বান এবং ইয়াহইয়া বিন ইয়াহইয়া হতে। ইমাম মালিক (রঃ) হতেও এই মর্মের অন্য একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে।

সূরা-ই-ফাতিহার মর্যাদার ব্যাপারে উপরোল্লিখিত হাদীসসমূহ ছাড়াও আরও হাদীস রয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফের ফাযায়িলুল কুরআন অধ্যায়ে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “একবার আমরা সফরে ছিলাম। এক স্থানে আমরা অবতরণ করি। হঠাৎ একটি দাসী এসে বললোঃ “এ জায়গার গোত্রের নেতাকে সাপে কেটেছে। আমাদের লোকেরা এখন সবাই অনুপস্থিত। ঝাড় ফুক দিতে পারে এমন কেউ আপনাদের মধ্যে আছে কি? আমাদের মধ্য হতে একটি লোক তার সাথে গেল। সে যে ঝাড় ফুকও জানতো তা আমরা জানতাম না। তথায় গিয়ে সে কিছু ঝাড় ফুক করলো। আল্লাহর অপার মহিমায় তৎক্ষণাৎ সে সম্পূর্ণরূপে আরোগ্য লাভ করলো। অনন্তর সে ৩০টি ছাগী দিল এবং আমাদের আতিথেয়তায় অনেক দুধও পাঠিয়ে দিল। সে ফিরে আসলে আমরা তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ “তোমার কি এ বিদ্যা জানা ছিল?' সে বললোঃ 'আমিতো শুধু সূরা-ই-ফাতিহা পড়ে ফুক দিয়েছি। আমরা বললামঃ “তাহলে এ প্রাপ্ত মাল এখনও স্পর্শ করো না। প্রথমে ক্লাসূলুল্লাহ (সঃ) কে জিজ্ঞেস করো।' মদীনায় আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এ ঘটনা আনুপূর্বিক বর্ণনা করলাম। তিনি বললেনঃ “এটা যে ফুক দেয়ার সূরা তা সে কি করে জানলো? এ মাল ভাগ করো। আমার জন্যেও একভাগ রেখো।' সহীহ মুসলিম ও সুনান-ই আবি দাউদেও এ হাদীসটি রয়েছে। সহীহ মুসলিমের কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, ফুক দাতা হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) ছিলেন।

সহীহ মুসলিম ও সুনান-ই নাসাঈর মধ্যে হাদীস আছে যে, একদা হযরত জিব্রাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকটে বসেছিলেন, এমন সময়ে উপর হতে এক বিকট শব্দ আসলো। হযরত জিব্রাঈল (আঃ) উপরের দিকে তাকিয়ে বললেনঃ আজ আকাশের ঐ দরজাটি খুলে গেছে যা ইতিপূর্বে কখনও খুলেনি। অতঃপর সেখান হতে একজন ফেরেশতা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বললেন, আপনি খুশি হোন! এমন দুটি নূর আপনাকে দেয়া হলো যা ইতিপূর্বে কাউকেও দেয়া হয়নি। তা হলো সূরা-ই-ফাতিহা ও সূরা-ই- বাকারার শেষ আয়াতগুলো। ওর এক একটি অক্ষরের উপর নূর রয়েছে। এটা সুনান-ই-নাসাঈর শব্দ। সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি নামাযে উম্মুল কুরআন পড়লো না তার নামায অসম্পূর্ণ, অসম্পূর্ণ, অসম্পূর্ণ পূর্ণ নয়। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “আমরা যদি ইমামের পিছনে থাকি তা হলে? তিনি বললেনঃ “তাহলেও চুপে চুপে পড়ে নিও। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শুনেছি, তিনি বলতেন যে, আল্লাহ ঘোষণা করেনঃ “আমি নামাযকে আমার এবং আমার বান্দার মধ্যে অর্ধ-অর্ধ করে ভাগ করেছি এবং আমার বান্দা আমার কাছে যা চায়। তা আমি তাকে দিয়ে থাকি। যখন বান্দা বলে, (আরবী) তখন আল্লাহ বলেনঃ (আরবী)

অর্থাৎ আমার বান্দা আমার প্রশংসা করলো’ বান্দা যখন বলে, (আরবী) তখন আল্লাহ বলেনঃ অর্থাৎ বান্দা আমার গুণাগুণ বর্ণনা করলো। বান্দা যখন বলে, (আরবী) তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আমার বান্দা আমার মাহাত্ম্য বর্ণনা করলো।' কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলেন (আরবী) অর্থাৎ ‘বান্দা আমার উপর (সবকিছু) সর্মপণ করলো। যখন বান্দা বলে (আরবী) তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “এটা আমার ও আমার বান্দার মধ্যেকার কথা এবং আমার বান্দা আমার নিকট যা চাইবে আমি তাকে তাই দেবো' অতঃপর বান্দা শেষ পর্যন্ত পড়ে। তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “এসব আমার বান্দার জন্যে এবং সে যা কিছু চাইলো তা সবই তার জন্য।' সুনান-ই নাসাঈর মধ্যে এই বর্ণনাটি আছে। কোন কোন বর্ণনার শব্দগুলির মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এই হাদীসটিকে পরিভাষা অনুযায়ী হাসান বলেছেন। আবু জারাআ' একে সঠিক বলেছেন। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যেও এ হাদীসটি লম্বা ও চওড়াভাবে রয়েছে। ওর বর্ণনাকারী হচ্ছেন হযরত উবাই বিন কা'ব (রাঃ)। ইবনে জারীরের একটি বর্ণনায় এ হাদীসটির মধ্যে এই শব্দগুলিও রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘এটা আমার জন্য যা অবশিষ্ট রয়েছে তা আমার বান্দার জন্য।' অবশ্য এ হাদীসটি এর উসূল বা মূলনীতির পরিভাষা অনুসারে গারীব বা দুর্বল।

আলোচ্য হাদীসের উপকার সমূহ, তৎসম্পর্কিত আলোচনা ও ফাতিহার অন্যান্য বৈশিষ্ট্য।

এখন এই হাদীসের উপকারিতা ও লাভালাভ লক্ষ্যণীয় বিষয়। প্রথমতঃ এই হাদীসের মধ্যে (আরবী) অর্থাৎ নামাযের সংযোজন রয়েছে এবং তার তাৎপর্যও ভাবার্থ হচ্ছে কিরআত। যেমন কুরআনের মধ্যে অন্যান্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ স্বীয় নামায (কিরআত) কে খুব উচ্চৈঃস্বরে পড়ো না আর খুব নিম্ন স্বরেও না, বরং মধ্যম স্বরে পড়।' (১৭:১১০) এর তাফসীরে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে প্রকাশ্যভাবে বর্ণিত আছে যে, এখানে (আরবী) এর অর্থ হলো কিরাআত বা কুরআন পঠন। এভাবে উপরোক্ত হাদীসে কিরাআতকে সালাত বলা হয়েছে। এতে নামাযের মধ্যে কিরাআতের যে গুরুত্ব রয়েছে তা বিলক্ষণ জানা যাচ্ছে। আরও প্রকাশ থাকে যে, কিরআত নামাযের একটি মস্তবড় স্তম্ভ (এ জন্যেই এককভাবে ইবাদতের নাম নিয়ে ওর একটি অংশ অর্থাৎ কিরা'আতকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। অপরপক্ষে এমনও হয়েছে যে, এককভাবে কিরাআতের নাম নিয়ে তার অর্থ নামায নেয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলার কথাঃ (আরবী)

অর্থাৎ ‘ফজরের কুরআনের সময় ফেরেশতাকে উপস্থিত করা হয়।' (১৭:৭৮) এখানে কুরআনের ভাবার্থ হলো নামায। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের হাদীসে রয়েছে যে, ফজরের নামাযের সময় রাত্রি ও দিনের ফেরেশতাগণ একত্রিত হন। এই আয়াত ও হাদীসসমূহ দ্বারা বিলক্ষণ জানা গেল যে, নামাযে কিরাআত পাঠ খুবই জরুরী এবং আলেমগণও এ বিষয়ে একমত। দ্বিতীয়তঃ নামাযে সূরা-ই ফাতিহা পড়াই জরুরী কি না এবং কুরআনের মধ্য হতে যা কিছু পড়ে নেওয়াই যথেষ্ট কি না এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং তাঁর সহচরগণ বলেন যে, নির্ধারিতভাবে যে সূরা ফাতিহাই পড়তে হবে এটা জরুরী নয়। বরং কুরআনের মধ্য হতে যা কিছু পড়ে নেবে তাই যথেষ্ট। তাঁর দলীল হলো (আরবী) (৭৩:২০) এই আয়াতটি। অর্থাৎ কুরআনের মধ্য হতে যা কিছু সহজ হয় তাই পড়ে নাও।' সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে যে হাদীস আছে তাতে উল্লেখ আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাড়াতাড়ি নামায আদায়কারী এক ব্যক্তিকে বললেনঃ যখন তুমি নামাযের জন্যে দাঁড়াবে তখন তাকবীর বলবে এবং কুরআনের মধ্য হতে যা তোমার নিকট সহজ বোধ হবে তাই পড়বে।' তারা বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোকটিকে সূরা ফাতিহা পড়ার কথা নির্দিষ্টভাবে বলেন না এবং যে কোন কিছু পড়াকেই যথেষ্ট বলে মনে করলেন। দ্বিতীয় মত এই যে, সূরা ফাতিহা পড়াই জরুরী এবং অপরিহার্য এবং তা পড়া ছাড়া নামায হয় না। অন্যান্য সমস্ত ইমামের এটাই মত। ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রঃ) এবং তাঁদের ছাত্র ও জমহুর উলামা সবারই এটাই অভিমত। এই হাদীসটি তাঁদের দলীল যা রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি যে কোন নামায পড়লো এবং তাতে উম্মুল কুরআন পাঠ করলো না, ঐ নামায অসম্পূর্ণ, অসম্পূর্ণ অসম্পূর্ণ-পূর্ণ নয়। এরকমই ঐসব বুযুর্গ ব্যক্তিদের এটাও দলীল যা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি সূরা-ই ফাতিহা পড়ে না তার নামায হয় না।' সহীহ ইবনে খুযাইমাহ্ ও সহীহ ইবনে হিব্বানের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ নামায হয় না যার মধ্যে উম্মুল কুরআন পড়া না হয়। এ ছাড়া আরও বহু হাদীস রয়েছে। এখানে আমাদের বিতর্কমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনার তেমন প্রয়োজন নেই। কারণ এ আলোচনা অতি ব্যাপক ও দীর্ঘ। আমরা তো সংক্ষিপ্তভাবে শুধু উপরোক্ত মনীষীর দলীলসমূহ এখানে বর্ণনা করে। দিলাম। এখন এটাও স্মরণীয় বিষয় যে, ইমাম শাফিঈ (রঃ) প্রভৃতি মহান আলেমদের একটি দলের মাযহাব এটাই যে, প্রতি রাকাআতে সূরা-ই-ফাতিহা পড়া ওয়াজিব এবং অন্যান্য লোকের মতে অধিকাংশ রাকআতে পড়া ওয়াজিব। হযরত হাসান বসরী (রঃ) এবং বসরার অধিকাংশ লোকেই বলেন যে, নামাযসমূহের মধ্যে কোন এক রাকাআতে সূরা ফাতিহা পড়ে নেয়া ওয়াজিব। কেননা হাদীসের মধ্যে সাধারণভাবে নামাযের উল্লেখ করা হয়েছে। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং তাঁর অনুসারী সুফিয়ান সাওরী (রঃ) ও আওযায়ী (রঃ) বলেন যে, ফাতিহাকেই নির্দিষ্টভাবে পড়ার কোন কথা নেই বরং অন্য কিছু পড়লেই যথেষ্ট হবে। কারণ পবিত্র কুরআনের মধ্যে (আরবী) শব্দটি রয়েছে। আল্লাহ তাআলাই এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল জানেন। কিন্তু এটা স্মরণ রাখা উচিত যে, সুনান-ই-ইবনে মাজায় রয়েছেঃ 'যে ব্যক্তি ফরয ইত্যাদি নামাযে সূরা-ই-ফাতিহা এবং অন্য সূরা পড়লো না তার নামায হলো না। তবে অবশ্যই এ হাদীসটির বিশুদ্ধতার ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। এসব কথার বিস্তারিত আলোচনার জন্যে শরীয়তের আহকামের বড় বড় কিতাব রয়েছে। আল্লাহ তা'আলাই এসব ব্যাপারে সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ জ্ঞানের অধিকারী।

তৃতীয়তঃ মুকতাদীগণের উপর সূরা-ই-ফাতিহা পাঠ ওয়াজিব হওয়ার প্রশ্নে আলেমদের তিনটি অভিমত রয়েছে।

(১) সূরা ফাতিহা পাঠ ইমামের উপর যেমন ওয়াজিব, মুকতাদির উপরও তেমনই ওয়াজিব।

(২) মুকতাদির উপর কিরাআত একবারেই ওয়াজিব নয়। সূরা ফাতিহাও নয় এবং অন্য সূরাও নয়। তাদের দলীল-প্রমাণ মুসনাদ-ই-আহমাদের সেই হাদীসটি, যার মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যার জন্যে ইমাম রয়েছে, ইমামের কিরাআতই তার কিরাআত। কিন্তু বর্ণনাটি হাদীসের পরিভাষায় একান্ত দুর্বল এবং স্বয়ং এটা হযরত জাবিরের (রাঃ) কথা দ্বারা বর্ণিত আছে। যদিও এই মারফু (যে হাদীসের সনদ রাসূলুল্লাহ (সঃ) পর্যন্ত পৌছেছে অর্থাৎ স্বয়ং তাঁর হাদীস বলে সাব্যস্ত হয়েছে তাকে মারফু হাদীস বলে) হাদীসটির অন্যান্য সনদও রয়েছে, কিন্তু কোন সনদই অভ্রান্ত ও সঠিক নয়। অবশ্য আল্লাহই এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী জানেন।

(৩) যে নামাযে ইমাম আস্তে কিরাআত পড়েন তাতে তো মুকতাদির উপর কিরাআত পাঠ ওয়াজিব, কিন্তু যে নামাযে উচ্চৈঃস্বরে কিরআত পড়া হয় তাতে ওয়াজিব নয়। তাদের দলীল প্রমাণ হচ্ছে সহীহ মুসলিমের হাদীসটি। তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অনুসরণ করার জন্যে ইমাম নির্ধারণ করা হয়েছে। তাঁর তাকবীরের পরে তাকবীর বল এবং যখন তিনি পাঠ করেন তখন তোমরা চুপ থাক।' সুনানের মধ্যেও এই হাদীসটি রয়েছে। ইমাম মুসলিম (রঃ) এর বিশুদ্ধতা স্বীকার করেছেন। ইমাম শাফিঈরও (রঃ) প্রথম মত এটাই এবং ইমাম আহমদ (রঃ) হতেও এরূপ একটি বর্ণনা রয়েছে।

এই সব মাসয়ালা এখানে বর্ণনা করার আমাদের উদ্দেশ্য এই যে, সূরা-ই ফাতিহার সঙ্গে শরীয়তের নির্দেশাবলীর যতটা সম্পর্ক রয়েছে অন্য কোন সূরার সঙ্গে ততটা সম্পর্ক নেই। মুসনাদ-ই-বাজ্জাজের মধ্যে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ 'যখন তোমরা বিছানায় শয়ন কর তখন যদি সূরা-ই-ফাতিহা এবং (আরবী) সূরা পড়ে নাও, তাহলে মৃত্যু ছাড়া প্রত্যেক জিনিস হতে নিরাপদে থাকবে।'

ইসতি‘আযাহ বা (আরবী) ‘আউযুবিল্লাহ’-এর তাফসীর এবং তার আহকাম ও নির্দেশাবলী

পবিত্র কুরআনে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ক্ষমা করে দেয়ার অভ্যাস কর, ভাল কাজের নির্দেশ দাও এবং মূর্খদের দিক হতে মুখ ফিরিয়ে নাও, যদি শয়তানের কোন কুমন্ত্রণা এসে যায় তবে সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞাতা আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর।' (৭:১৯৯-২০০) অন্য এক জায়গায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘অমঙ্গলকে মঙ্গলের দ্বারা প্রতিহত কর, তারা যা কিছু বর্ণনা করছে তা আমি খুব ভালভাবে জানি। বলতে থাক-হে আল্লাহ! শয়তানের কুমন্ত্রণা এবং তাদের উপস্থিতি হতে আমরা আপনার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।' (২৩:৯৬-৯৮)

অন্য এক জায়গায় ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘অমঙ্গলকে মঙ্গল দ্বারা পতিহত কর, তাহলে তোমার এবং অন্যের মধ্যে শক্রতা রয়েছে তা এমন হবে যে, যেন সে অকৃত্রিম সাহায্যকারী বন্ধু'। (৪১:৩৪) এ কাজটি ধৈর্যশীল ও ভাগ্যবান ব্যক্তিদের জন্যে। অর্থাৎ যখন কুমন্ত্রণা এসে পড়ে তখন সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞাতা আল্লাহ তা'আলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর।

এই মর্মে এই তিনটিই আয়াত আছে এবং এই অর্থের অন্য কোন আয়াত নেই। আল্লাহ তা'আলা এই আয়াতসমূহের মাধ্যমে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, মানুষের শক্রতার সবচাইতে ভাল ঔষুধ হলো প্রতিদানে তাদের সঙ্গে সৎ ব্যবহার করা। এরূপ করলে তারা তখন শত্রুতা করা থেকেই বিরত থাকবেন না, বরং অকৃত্রিম বন্ধুতে পরিণত হবে। আর শয়তানদের শত্রুতা হতে নিরাপত্তার জন্যে আল্লাহ তারই নিকট আশ্রয় চাইতে বলছেন। কেননা এই শয়তানরূপী অপবিত্র শক্রদেরকে উত্তম ব্যবহারের দ্বারাও আয়ত্তে আনা কখনো সম্ভব নয়। কারণ সে। মানুষের বিনাশ ও ধ্বংসের মধ্যে আমোদ পায় এবং তার পুরাতন শক্রতা হযরত হাওয়া ও হযরত আদম (আঃ)-এর সময় হতেই অব্যাহত রয়েছে। কুরআন ঘোষণা করছেঃ “হে আদমের সন্তানেরা! তোমাদেরকে যেন এই শয়তান পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত না করে ফেলে, যেমন তোমাদের বাপ-মাকে পথভ্রষ্ট করে। চির সুখের জান্নাত হতে বের করে দিয়েছিল। অন্য স্থানে বলা হচ্ছেঃ ‘শয়তান তোমাদের শত্রু, তাকে শত্রুই মনে কর। তার দলের তো এটাই কামনা যে তোমরা দোযখবাসী হয়ে যাও। কি! আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানের সঙ্গে এবং তার সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করছো? তারা তো তোমাদের পরম শত্রু। জেনে রেখো যে, অত্যাচারীদের জন্যে জঘন্য প্রতিদান রয়েছে। এতো সেই শয়তান যে আমাদের আদি পিতা হযরত আদম (আঃ)কে বলেছিলঃ “আমি তোমার একান্ত শুভাকাংখী। তা হলে চিন্তার বিষয় যে, আমাদের সঙ্গে তার চালচলন কি হতে পারে? আমাদের জন্যেই তো সে শপথ করে বলেছিলঃ মহা সম্মানিত আল্লাহর শপথ! আমি তাদেরকে বিপথে নিয়ে যাবো। তবে হ্যা, যারা তার খাটি বান্দা তারা নিরাপদে থাকবে। এ জন্যে মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী)

অর্থাৎ তোমরা কুরআন পাঠের সময় বিতাড়িত শয়তান হতে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা কর।' (১৬:৯৮) ঈমানদারগণ ও প্রভুর উপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের উপরে তার কোন ক্ষমতাই নেই। আর ক্ষমতা তো শুধু তাদের উপরই রয়েছে যারা তার সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করে এবং আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে শিরক করে থাকে।

কারীদের একটি দল ও অন্যেরা বলে থাকেন যে, কুরআন পাঠের পর (আরবী) পড়া উচিত। এতে দু'টি উপকার রয়েছে। এক তো হলোঃ কুরআনের বর্ণনারীতির উপর আমল এবং দ্বিতীয় হলোঃ ইবাদত শেষে অহংকার দমন। আবু হাতিম সিজিসতানী এবং ইবনে ফাল্ফা হামযার এই নীতিই নকল করেছেন। যেমন আরুল কাসিম ইউসুফ বিন আলী বিন জানাদাহ (রঃ) স্বীয় কিতাব “আল ইবাদাতুল কামিল’-এর মধ্যে বর্ণনা করেছেন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। কিন্তু হাদীসের পরিভাষায় এর ইসনাদ গারীব। ইমাম যারী (রঃ) স্বীয় তাফসীরের মধ্যে এটা নকল করেছেন এবং বলেছেন যে, ইবরাহীম নাখয়ী (রঃ) ও দাউদ যাহেরীরও (রঃ) এই অভিমত। কুরতুবী (রঃ) ইমাম মালিকের (রঃ) মাযহাবও এটাই বর্ণনা করেছেন। কিন্তু ইবনুল আরাবী একে গারীব বলে থাকেন। একটি মাযহাব এরূপ আছে যে, প্রথমে ও শেষে এই দু’বার (আরবী) পড়া উচিত। তাহলে দুটি দলীলই একত্রিত হয়ে যাবে। জমহুর উলামার প্রসিদ্ধ মাযহাব এই যে, কুরআন পাঠের পূর্বে (আরবি) পাঠ করা উচিত, তাহলে কুমন্ত্রণা হতে রক্ষা পাওয়া যাবে। সুতরাং ঐ বুযুর্গদের নিকট আয়াতের অর্থ হবেঃ “যখন তুমি পড়বে অর্থাৎ তুমি পড়ার ইচ্ছা করবে। যেমন নিম্নের আয়াতটিঃ (আরবী)

অর্থাৎ যখন তুমি নামায পড়ার জন্যে দাঁড়াও` (তবে ওযু করে নাও)-এর অর্থ হলোঃ যখন তুমি নামাযের জন্য দাঁড়াবার ইচ্ছা কর।' হাদীসগুলোর ধারা অনুসারে এই অর্থটিই সঠিক বলে মনে হয়। মুসনাদ-ই-আহমাদের হাদীসে আছে যে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মামাযের জন্য দাঁড়াতেন তখন (আরবী) বলে নামায আরম্ভ করতেন অতঃপর, (আরবী) তিনবার পড়ে (আরবী) ‘লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ’ পড়তেন। তারপর পড়তেনঃ (আরবী) সুনান-ই-আরবার মধ্যেও এ হাদীসটি রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, এই অধ্যায়ে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ-হাদীস এটাই। (আরবী) শব্দের অর্থ হলো গলা টিপে ধরা, (আরবী) শব্দের অর্থ হলো অহংকার এবং (আরবী) শব্দের অর্থ হলো কবিতা পাঠ। ইবনে মাজা (রঃ) স্বীয় সুনানে এই অর্থ বর্ণনা করেছেন। তাতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামাযে প্রবেশ করেই তিনবার। (আরবী) তিনবার এবং তিনবার (আরবী) পাঠ করতেন। অতঃপর (আরবী) পড়তেন।

সুনান-ই-ইবনে মাজাতেও অন্য সনদে এই হাদীসটি সংক্ষিপ্তভাবে এসেছে। মুসনাদ-ই- আহমাদের হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তিনবার (আরবী) তাকবীর বলতেন। অতঃপর (আরবী) তিনবার বলতেন। অতঃপর (আরবী) শেষ পর্যন্ত পড়তেন। মুসনাদে-ই-আবি ইয়ালার মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সামনে দুটি লোকের ঝগড়া বেধে যায়। ক্রোধে একজনের নাসারন্ধ্র ফুলে উঠে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যদি লোকটি (আরবী) পড়ে নেয় তবে তার ক্রোধ এখনই ঠাণ্ডা ও স্তিমিত হয়ে যাবে।' ইমাম নাসাঈ (রঃ) স্বীয় কিতাব (আরবী)-এর মধ্যেও হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। মুসনাদ-ই-আহমাদ, সুনান-ই-আবি দাউদ এবং জামেউত তিরমিযীর মধ্যেও হাদীসটি রয়েছে; একটি বর্ণনায় আরও একটু বেশী আছে, তা এই যে, হযরত মুআয (রাঃ) লোকটাকে তা পড়তে বলেন। কিন্তু সে তা পড়লো না এবং ক্রোধ উত্তরোত্তর বেড়েই চললো। ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, এই বৃদ্ধি যুক্ত বর্ণ





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।