সূরা মারইয়াম (আয়াত: 74)
হরকত ছাড়া:
وكم أهلكنا قبلهم من قرن هم أحسن أثاثا ورئيا ﴿٧٤﴾
হরকত সহ:
وَ کَمْ اَهْلَکْنَا قَبْلَهُمْ مِّنْ قَرْنٍ هُمْ اَحْسَنُ اَثَاثًا وَّ رِءْیًا ﴿۷۴﴾
উচ্চারণ: ওয়াকাম আহলাকনা-কাবলাহুম মিন কারনিনহুম আহছানুআছা-ছাওঁ ওয়ারি’য়া-।
আল বায়ান: আর তাদের পূর্বে আমি কত প্রজন্ম ধ্বংস করে দিয়েছি যারা সাজ-সরঞ্জাম ও বাহ্যদৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠ ছিল!
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৭৪. আর তাদের আগে আমরা বহু মানবগোষ্ঠীকে বিনাশ করেছি—যারা তাদের চেয়ে সম্পদ ও বাহ্যদৃষ্টিতে শ্রেষ্ট ছিল।
তাইসীরুল ক্বুরআন: আমি তাদের পূর্বে বহু মানব বংশকে ধ্বংস করেছি যারা উপায় উপকরণে আর বাইরের চাকচিক্যে তাদের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ছিল।
আহসানুল বায়ান: (৭৪) তাদের পূর্বে কত জাতিকে আমি বিনাশ করেছি, যারা তাদের অপেক্ষা সাজ-সরঞ্জাম ও বাহ্য দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠ ছিল। [1]
মুজিবুর রহমান: তাদের পূর্বে কত মানবগোষ্ঠীকে আমি ধ্বংস করেছি যারা তাদের অপেক্ষা সম্পদ ও বাহ্য দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠ ছিল।
ফযলুর রহমান: তাদের পূর্বে আমি কত প্রজন্মকে ধ্বংস করে দিয়েছি! তারা সম্পদে ও সৌন্দর্যে (তাদের তুলনায়) শ্রেষ্ঠতর ছিল।
মুহিউদ্দিন খান: তাদের পূর্বে কত মানব গোষ্ঠীকে আমি বিনাশ করেছি, তারা তাদের চাইতে সম্পদে ও জাঁক-জমকে শ্রেষ্ঠ ছিল।
জহুরুল হক: আর তাদের আগে কত মানবগোষ্ঠীকে আমরা ধ্বংস করেছি যারা ধনসম্পদে ও বাগাড়ন্বরে জমজমাট ছিল!
Sahih International: And how many a generation have We destroyed before them who were better in possessions and [outward] appearance?
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৭৪. আর তাদের আগে আমরা বহু মানবগোষ্ঠীকে বিনাশ করেছি—যারা তাদের চেয়ে সম্পদ ও বাহ্যদৃষ্টিতে শ্রেষ্ট ছিল।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৭৪) তাদের পূর্বে কত জাতিকে আমি বিনাশ করেছি, যারা তাদের অপেক্ষা সাজ-সরঞ্জাম ও বাহ্য দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠ ছিল। [1]
তাফসীর:
[1] আল্লাহ তাআলা বলেন, দুনিয়ার এই সমস্ত জিনিস এমন নয় যা নিয়ে গর্ব করা যেতে পারে বা হক ও বাতিল (সত্য ও অসত্য) এর মধ্যে পার্থক্য করা যেতে পারে। এসব তো পূর্ববর্তী উম্মতের কাছেও ছিল, তা সত্ত্বেও সত্যকে অস্বীকার করার ফলে তাদেরকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। পৃথিবীর এই ধন-সম্পদ তাদেরকে আল্লাহর আযাব হতে বাঁচাতে পারেনি।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৭৩-৮০ নং আয়াতের তাফসীর:
(أَيُّ الْفَرِيْقَيْنِ خَيْرٌ)
কোন দল বলতে মু’মিন ও কাফিরদের দুটি দলকে বুঝানো হয়েছে। কাফিররা দুনিয়ায় স্বাচ্ছন্দ্যে ও আরাম-আয়েশে জীবন যাপন করে থাকে আর মু’মিনরা কষ্টে বসবাস করে থাকে, যার ফলে কাফিররা মু’মিনদেরকে বলত, আমরাই (কাফিররা) শ্রেষ্ঠ দল। যদি তাই না হত তাহলে আমরা দুনিয়ায় আনন্দে থাকতাম না।
তারা বলত:
(وَقَالُوْا نَحْنُ أَكْثَرُ أَمْوَالًا وَّأَوْلَادًا لا وَّمَا نَحْنُ بِمُعَذَّبِيْنَ)
“তারা বলত: আমরা ধনে-জনে সমৃদ্ধশালী; সুতরাং আমাদেরকে কিছুতেই শাস্তি দেয়া হবে না।” (সূরা সাবা ৩৪:৩৫)
তাদের এ কথার জবাবে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, সম্পদে ও ক্ষমতায় অধিক হলেই তারা শ্রেষ্ঠ নয়। বরং এরূপ অনেক সম্পদশালী জাতিকে আল্লাহ তা‘আলা ধ্বংস করে দিয়েছেন। সুতরাং এরাও যখন শাস্তি প্রাপ্ত হবে তখন বুঝতে পারবে কারা ছিল মান-মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ ও কাদের প্রতিদান উত্তম। দুনিয়াতে তাদেরকে অপরাধ করার জন্য অবকাশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِيْنَ كَفَرُوْآ أَنَّمَا نُمْلِيْ لَهُمْ خَيْرٌ لِّأَنْفُسِهِمْ ط إِنَّمَا نُمْلِيْ لَهُمْ لِيَزْدَادُوْآ إِثْمًا ج وَلَهُمْ عَذَابٌ مُّهِيْنٌ)
“যারা কুফরী করেছে তারা যেন এটা ধারণা না করে যে, আমি তাদেরকে যে সুযোগ দিয়েছি, তা তাদের জীবনের জন্য কল্যাণকর; বরং এ জন্যই আমি তাদেরকে অবকাশ প্রদান করি যাতে তাদের পাপ বৃদ্ধি পায় এবং তাদের জন্য অপমানকর শাস্তি রয়েছে।” (সূরা আলি-ইমরান ৩:১৭৮)
(وَالْبٰقِيٰتُ الصّٰلِحٰتُ)
অর্থাৎ দুনিয়ার সকল বস্তু শেষ হয়ে যাবে শুধু অবশিষ্ট থাকবে মানুষের সৎ আমল। যেমনটি সূরা কাহফের ৪৬ নং আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে।
আর এখানে সৎ আমল বলতে বুঝানো হয়েছে সালাত, সিয়াম, হাজ্জ, যাকাত যাবতীয় ভাল কাজগুলোকে।
(عَهْدًا..... أَفَرَأَيْتَ الَّذِيْ) শানে নুযূল:
সাহাবী খাব্বাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, জাহেলি যুগে আমি একজন কর্মকার (কামার) ছিলাম। ‘আস বিন অয়েলের নিকট আমার কিছু ঋণ পাওনা ছিল। আমি তার নিকট আসলাম তা নেয়ার জন্য। সে বলল: তুমি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে অস্বীকার না করা পর্যন্ত আমি এ পাওনা শোধ করব না। তখন আমি বললাম: আমি অস্বীকার করব না আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে মৃত্যু দিয়ে পুনরায় জীবিত না করা পর্যন্ত। তখন সে বলল: আমাকে ছেড়ে দাও মৃত্যুর পর জীবিত না হওয়া পর্যন্ত। তখন আমাকে সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দেয়া হবে আর তা দিয়ে তোমার পাওনা শোধ করব। তখন এ আয়াতদ্বয় নাযিল হয়। (সহীহ বুখারী: ২০৯১, ২২৭৫, সহীহ মুসলিম: ২৭৯৫)
তাদের এ কথার জবাবে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, এটা মোটেও সত্য নয়। বরং তারা কিয়ামতের দিনে আমার নিকট একা একা আসবে। সেখানে তাদের কোন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি থাকবে না।
সুতরাং যারা এরূপ বিশ্বাস রাখবে বুঝতে হবে তাদের ধারণা বা বিশ্বাস ভুল। তাই আমাদেরকে এরূপ বিশ্বাস করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. দুনিয়াতে আরাম-আয়েশে থাকা মানে এ নয় যে, সে-ই শ্রেষ্ঠ।
২. আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদের জন্য হিদায়াত আরো বৃদ্ধি করে দেন।
৩. কিয়ামতের মাঠে মানুষ একা একা আসবে, কেউ তার সঙ্গে থাকবে না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৭৩-৭৪ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তাআলা কাফিরদের সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন যে, তারা আল্লাহর স্পষ্ট আয়াতসমূহ এবং দলীল প্রমাণাদি বিশিষ্ট কালাম দ্বারা কোন উপকার লাভ করে না। তারা এগুলো হতে মুখ ফিরিয়ে নেয় ও চক্ষু ঘুরিয়ে থাকে। তারা তাদের বাহ্যিক শান শওকত ও জাকজমক দ্বারা মু'মিনদেরকে প্রভাবিত করতে চায়। মু'মিনদেরকে তারা বলেঃ “বল তো, ঘরবাড়ী সুন্দর ও জাকজমক পূর্ণ কাদের? কাদের মজলিসগুলি গুল্যার? সুতরাং আমরা যখন ধন দৌলতে, শান শওকতে, ও মান মর্যাদায় তোমাদের চেয়ে উন্নত, তখন আমরাই আল্লাহর প্রিয় বান্দা, না তোমরা? তোমরা তো বাস করছো কুঁড়ে ঘরে। তোমরা ভাল ভাল খাবার খেতে, উত্তম পানীয় পান করতে পাও না। কখনো তোমরা আরকাম ইবনু আবি আরকামের ঘরে লুকিয়ে থাকো এবং কখনো কখনো এদিক ওদিক পালিয়ে থাকে। যেমন অন্য আয়াতে আছে। যে, কাফিররা বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি এই দ্বীন ভাল হতো তবে এরা (মু'মিনরা) এটা মানার ব্যাপারে আমাদের অগ্রগামী হতো না।` (৪৬:১১) হযরত নূহের (আঃ) কওমও একথাই বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমরা কি তোমার উপর এমন অবস্থায় ঈমান আনতে পারি যে, হীন প্রকৃতির লোকেরা তোমার অনুসরণ করেছে?” (২৬:১১১) আর একটি আয়াতে রয়েছেঃ “এভাবেই তারা প্রতারিত হয়েছে এবং বলছেঃ এরাই কি ওরাই যাদের উপর আমাদের মধ্য হতে আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন? কৃতজ্ঞ বান্দাদেরকে কি আল্লাহ অবগত নন?` কাফিরদের একথার প্রতিবাদে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “তাদের পূর্বে আমি কত মানব গোষ্ঠীকে বিনাশ করেছি, যারা তাদের অপেক্ষা সম্পদ ও বাহ্য দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠ ছিল।” অর্থাৎ তাদের দুঙ্কার্যের দরুণ তাদেরকে আমি ধ্বংস ও তচনচ করে দিয়েছি। তারা এই কাফিরদের তুলনায় বেশী সম্পদের অধিকারী ছিল। তারা ধন দৌলত, গাড়ীবাড়ী এবং শক্তি সামর্থে এদের চেয়ে বহু গুণে বেড়ে ছিল। কিন্তু তাদের অহংকার ও ঔদ্ধত্যের কারণে তাদের মূলোৎপাটন করে দিয়েছি। ফিরআউন এবং তার লোকদের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করো, তাদের বাগান, প্রস্রবণ, জমিজমা, আঁকজমক পূর্ণ অট্টালিকা এবং সুউচ্চ প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ আজও বিদ্যমান রয়েছে। তাদের অন্যায়াচরণের কারণে তাদের ঐ সব কিছুই আমি ধ্বংস করে দিয়েছিলাম। মাছ সমূহ তাদেরকে গ্রাস করে ফেলেছে।
(আরবী) দ্বারা বাসভূমি ও নিয়ামত রাজিকে বুঝানো হয়েছে। (আরবী) দ্বারা মজলিস ও বৈঠককে বুঝানো হয়েছে। আরবে বৈঠক ও লোকদের একত্রিত। হওয়ার জায়গাকে (আরবী) এবং (আরবী) বলা হয়। যেমন একটি আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা তোমাদের অপছন্দনীয় মজলিসে এসে থাকো।` (২৯:২৯)। মুশরিকরা বলতোঃ “পার্থিব দিক দিয়ে আমরা তোমাদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছি। পোষাক পরিচ্ছদে, ধনে, মালে এবং রূপ ও আকারে আমরা তোমাদের (মু'মিনদের) চেয়ে উত্তম।”
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।