সূরা মারইয়াম (আয়াত: 72)
হরকত ছাড়া:
ثم ننجي الذين اتقوا ونذر الظالمين فيها جثيا ﴿٧٢﴾
হরকত সহ:
ثُمَّ نُنَجِّی الَّذِیْنَ اتَّقَوْا وَّ نَذَرُ الظّٰلِمِیْنَ فِیْهَا جِثِیًّا ﴿۷۲﴾
উচ্চারণ: ছু ম্মা নুনাজজিল্লাযীনাততাকাওঁ ওয়া নাযারুজ্জা-লিমীনা ফীহা-জিছিইইয়া-।
আল বায়ান: তারপর আমি এদেরকে মুক্তি দেব যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে। আর যালিমদেরকে আমি সেখানে রেখে দেব নতজানু অবস্থায়।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৭২. পরে আমরা উদ্ধার করব তাদেরকে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে এবং যালেমদেরকে সেখানে নতজানু অবস্থায় রেখে দেব।
তাইসীরুল ক্বুরআন: অতঃপর মুত্তাকীদেরকে আমি রক্ষা করব আর যালিমদেরকে তার মধ্যে নতজানু অবস্থায় রেখে দেব।
আহসানুল বায়ান: (৭২) পরে আমি সাবধানীদেরকে উদ্ধার করব এবং সীমালংঘনকারীদেরকে সেথায় নতজানু অবস্থায় বর্জন করব। [1]
মুজিবুর রহমান: পরে আমি মুত্তাকীদেরকে উদ্ধার করব এবং যালিমদের সেখানে নতজানু অবস্থায় রেখে দিব।
ফযলুর রহমান: অতঃপর যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছিল আমি তাদেরকে উদ্ধার করব এবং জালেমদেরকে হাঁটুতে ভর-করা অবস্থায় সেখানে রেখে দেব।
মুহিউদ্দিন খান: অতঃপর আমি পরহেযগারদেরকে উদ্ধার করব এবং জালেমদেরকে সেখানে নতজানু অবস্থায় ছেড়ে দেব।
জহুরুল হক: আর আমরা উদ্ধার করব তাদের যারা ধর্মপরায়ণতা অবলন্বন করে, আর অন্যায়কারীদের সেখানে রেখে দেব নতজানু অবস্থায়।
Sahih International: Then We will save those who feared Allah and leave the wrongdoers within it, on their knees.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৭২. পরে আমরা উদ্ধার করব তাদেরকে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে এবং যালেমদেরকে সেখানে নতজানু অবস্থায় রেখে দেব।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৭২) পরে আমি সাবধানীদেরকে উদ্ধার করব এবং সীমালংঘনকারীদেরকে সেথায় নতজানু অবস্থায় বর্জন করব। [1]
তাফসীর:
[1] এর ব্যাখ্যা সহীহ হাদীসে এইভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, জাহান্নামের উপর সেতু (পুলসিরাত) স্থাপন করা হবে যার উপর দিয়ে প্রত্যেক মুমিন ও মুনাফিককে পার হতে হবে। মুমিনরা নিজ নিজ আমল অনুসারে দ্রুত ও ধীর গতিতে পার হয়ে যাবে; কেউ চোখের পাতা ফেলার গতিতে (পলকের মধ্যে), কেউ বিদ্যুতের গতিতে, কেউ হাওয়ার গতিতে, কেউ উড়ন্ত পাখির গতিতে, কেউ দ্রুতগামী ঘোড়ার গতিতে, কেউ বা অন্যান্য যানবাহনের গতিতে, কেউ বা পূর্ণ নিরাপদে, কেউ যখম হয়েও পার হয়ে যাবে। আবার কিছু জাহান্নামে পড়েও যাবে পরে তাদেরকে সুপারিশ দ্বারা বের করে নেওয়া হবে। কিন্তু মুনাফিকদল ঐ পুল পার হতে সফল বা সক্ষম হবে না। বরং সকলেই জাহান্নামে পড়ে যাবে। এর সমর্থন ঐ হাদীস দ্বারাও হয়, যাতে বলা হয়েছে যে, ‘‘যার তিন তিনটি সন্তান সাবালক হওয়ার আগে মৃত্যুবরণ করবে তাকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না; কিন্তু প্রতিজ্ঞা পালনের জন্য (জাহান্নামের উপর বেয়ে অতিক্রম করবে)।’’ (বুখারী, মুসলিম) আর সেই প্রতিজ্ঞা, যা উক্ত আয়াতে ‘‘এটা তোমার প্রতিপালকের অনিবার্য সিদ্ধান্ত’’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং জাহান্নামে প্রবেশ করার অর্থ হবে, শুধুমাত্র পুলসিরাতের উপর বেয়ে পার হওয়া। (বিস্তৃত জানার জন্য দ্রষ্টব্যঃ ইবনে কাসীর, আইসারুত্ তাফাসীর)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৬৬-৭২ নং আয়াতের তাফসীর:
কিছু কিছু লোক কিয়ামত সংঘটিত হওয়া ও পুনরুত্থান দিবসকে অসম্ভব মনে করে। তাদের বিশ্বাস এটা হতে পারে না, আমরা মরে পচে গলে যাব, অতঃপর কিভাবে আমাদেরকে জীবিত করা হবে? তাই আল্লাহ তা‘আলা তাদের এরূপ বিশ্বাস ও চিন্তার জবাব দিয়ে বলেন, এটা আল্লাহ তা‘আলার নিকট অধিক সহজ। কারণ তিনি প্রথমবার নমুনা ছাড়াই অস্তিত্বহীন থেকে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। প্রথমবার সৃষ্টি করা কঠিন, নাকি দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করা কঠিন? অবশ্যই প্রথমবার সৃষ্টি করা কঠিন। তাহলে যে আল্লাহ প্রথমবার সৃষ্টি করতে পারলেন তিনি কি দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করতে পারবেন না!
নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
كَانَ رَجُلٌ يُسْرِفُ عَلَي نَفْسِهِ فَلَمَّا حَضَرَهُ المَوْتُ قَالَ لِبَنِيهِ: إِذَا أَنَا مُتُّ فَأَحْرِقُونِي، ثُمَّ اطْحَنُونِي، ثُمَّ ذَرُّونِي فِي الرِّيحِ، فَوَاللّٰهِ لَئِنْ قَدَرَ عَلَيَّ رَبِّي لَيُعَذِّبَنِّي عَذَابًا مَا عَذَّبَهُ أَحَدًا، فَلَمَّا مَاتَ فُعِلَ بِهِ ذَلِكَ، فَأَمَرَ اللّٰهُ الأَرْضَ فَقَالَ: اجْمَعِي مَا فِيكِ مِنْهُ، فَفَعَلَتْ، فَإِذَا هُوَ قَائِمٌ، فَقَالَ: مَا حَمَلَكَ عَلَي مَا صَنَعْتَ؟ قَالَ: يَا رَبِّ خَشْيَتُكَ، فَغَفَرَ لَهُ
তোমাদের পূর্বে জনৈক ব্যক্তি ছিল যে নিজের প্রতি জুলুম করেছে, যখন তার মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলো তখন সে তার ছেলেদেরকে বলল: আমি যখন মারা যাব তখন আমাকে পুড়িয়ে ছাই করে ফেলবে, তারপর তা পিষে বাতাসে উড়িয়ে দেবে। আল্লাহর শপথ, আমার রব আমাকে যদি ধরতে সক্ষম হন তাহলে আমাকে এমন শাস্তি দেবেন যা অন্য কাউকে দেয়া হয়নি। যখন সে মারা গেল তা-ই করা হল। অতঃপর আল্লাহ জমিনকে আদেশ দিলেন, তোমার মাঝে তার দেহের যা আছে একত্রিত কর, সে তাই করল। অতঃপর লোকটি জীবিত হয়ে গেল। আল্লাহ বললেন: তুমি কেন এ কাজ করলে? সে বলল: হে রব! আপনাকে ভয় করে এ কাজ করেছি। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিলেন। (সহীহ বুখারী হা: ৩৪৮১) লোকটির বিশ্বাস ছিল আমাকে পুড়িয়ে ছাই করে দিলে আল্লাহ আমাকে ধরতে পারবে না। আল্লাহ তাকে একত্রিত করে দেখালেন। তাই আল্লাহ পরের আয়াতে শপথ করে বলেছেন: ‘সুতরাং শপথ তোমার প্রতিপালকের! আমি তাদেরকে এবং শয়তানদেরকেসহ একত্রে সমবেত করবই’
(لَنُحْضِرَنَّهُمْ حَوْلَ جَهَنَّمَ جِثِيًّا)
অর্থাৎ হাশরের ময়দানে প্রাথমিক অবস্থায় মু’মিন, কাফির সবাই জাহান্নামের চারদিকে সমবেত হয়ে থাকবে। সবাই ভীতবিহ্বল নতজানু অবস্থায় পড়ে থাকবে। এরপর মু’মিন মুত্তাকিদেরকে জাহান্নাম অতিক্রম করিয়ে জান্নাতে নিয়ে যাওয়া হবে। ফলে জাহান্নামের ভয়াবহ দৃশ্য দেখে আল্লাহ তা‘আলার বেশি বেশি প্রশংসা করবে।
(وَإِنْ مِّنْكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا)
“এবং তোমাদের প্রত্যেকেই তা (পুলসিরাত) অতিক্রম করবে” হাসান বাসরী ও কাতাদাহ (রহঃ) বলেন: জাহান্নামের ওপর যে পুলসিরাত রয়েছে সেটা অতিক্রম না করে কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। এখানে যে ব্যক্তি পার হওয়ার অনুমতিসহ আসবে, সে ব্যক্তি অতিক্রম করবে। আর যে ব্যক্তি সেটা নিয়ে আসতে পারবেনা সে আটকে যাবে। (তাফসীর কুরতুবী, অত্র আয়াতের তাফসীর)।
এ পুলসিরাত অতি সূক্ষè ও অতীব ধারালো। জাহান্নামী ব্যক্তি পার হতে গিয়ে আটকে যাবে এবং জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। পক্ষান্তরে জান্নাতীগণ স্বাচ্ছন্দে চোখের পলকে পার হয়ে যাবে এবং কোনরূপ অগ্নিতাপ অনুভব করবে না যেমন পরের আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন। (সহীহ বুখারী হা: ৭৪৩৯, সহীহ মুসলিম হা: ১৮৩) আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে সহজভাবে পুলসিরাত পার হওয়ার তাওফীক দান করুন! আমীন।
৮ম হিজরীর জুমাদাল উলা মাসে রোমকদের বিরুদ্ধে মুতার যুদ্ধে রওনা দেয়ার সময় প্রথম সেনাপতি আবব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রাঃ) কেঁদে ফেললেন। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কাদঁছেন কেন? উত্তরে তিনি বললেন: দেখ! আল্লাহ তা‘আলার শপথ! এর কারণ পৃথিবীর মায়া-মহব্বত কিংবা তোমাদের সঙ্গে আমার মধুর সম্পর্ক নয়, বরং আমি রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে আল্লাহ তা‘আলার কিতাবের একটি আয়াত পড়তে শুনেছি যাতে জাহান্নামের কথা উল্লেখ রয়েছে। তা হল এ আয়াত। আমি জানিনা জাহান্নামের নিকট আগমনের পর কেমন করে ফিরে আসতে পারব? (আর রাহিকুল মাখতূম, পৃ: ৪৪৬)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে অস্তিত্বহীন থেকে সৃষ্টি করেছেন।
২. মানুষকে কিয়ামতের দিন পুনরুত্থিত করা হবে এবং শয়তানকেও।
৩. মানুষকে নতজানু অবস্থায় জাহান্নামের সামনে উপস্থিত করা হবে। এবং জাহান্নামে দেয়া হবে।
৪. যারা জাহান্নামী ও যারা জান্নাতী সবাইকে পুলসিরাত অতিক্রম করতে হবে। তবে যারা মুত্তাকি তারা চোখের পলকে তা পার হয়ে যাবে। পার হওয়ার গতি ঈমান ও আমলের তারতম্য অনুপাতে হবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৭১-৭২ নং আয়াতের তাফসীর:
আবু সামিয়্যা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “এই আয়াতে যে (আরবী) বা অতিক্রমকরণ সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে এ ব্যাপারে আমাদের মধ্যে মতানৈক্য হয়েছে। কেউ কেউ বলতেন যে, মুমিন তাতে প্রবেশ করবে। আবার অন্য কেউ বলতেন যে, মু'মিন তাতে প্রবেশ করবে বটে, কিন্তু তাদের তাকওয়ার কারণে তারা তার থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে। আমি হযরত জাবিরের (রাঃ) সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “অতিক্রম তো সবাই করবে।” অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, তিনি বলেনঃ “ভাল লোক ও মন্দলোক সবাই ওটা অতিক্রম করবে, কিন্তু মু'মিনদের উপর ঐ আগুন ঠাণ্ডা ও শান্তিদায়ক হয়ে যাবে। যেমন হযরত ইবরাহীমের (আঃ) উপর হয়েছিল। এমন কি স্বয়ং ঐ আগুন ঠাণ্ডার অভিযোগ করবে। তারপর মুত্তাকীদের সেখান থেকে পরিত্রাণ দেয়া হবে।” (এটা ইমাম আহমাদ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসটি গারীব বা দুর্বল।)
খালেদ ইবনু মা’দান (রঃ) বলেন যে, জান্নাতীরা জান্নাতে পৌঁছে যাওয়ার পর বলবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি তো ওয়াদা করেছিলেন যে, প্রত্যেককেই জাহান্নাম অতিক্রম করতে হবে। কিন্তু আমরা তো তা অতিক্রম করলাম না।` উত্তরে তাদেরকে বলা হবেঃ “তোমরা ওটা অতিক্রম করেই এসেছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা ঐ সময় আগুনকে ঠাণ্ডা করে দিয়েছিলেন।
হযরত কায়েস ইবনু আবি হাযিম (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, একদা হযরত আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রাঃ) তার স্ত্রীর জানুর উপর মাথ রেখে শুয়েছিলেন এবং ঐ অবস্থায় তিনি কঁদতে শুরু করেন। তাকে কাঁদতে দেখে তাঁর স্ত্রীও কেঁদে ফেলেন। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) স্ত্রীকে কঁাদার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “আপনাকে কাঁদতে দেখেই আমার কান্না এসে গেছে।” তিনি তখন বলেনঃ “মহামহিমান্বিত আল্লাহর (আরবী) এই উক্তিটি আমার স্মরণ হয়েছে এবং একারণেই আমি কেঁদেছি। কারণ আমি জানি না যে, তার থেকে আমি মুক্তি পাবো কি না। ঐ সময় তিনি রুগ্ন ছিলেন। (এটা আবদুর রাযযাক (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)
হযরত আবু ইসহাক (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু মায়সারা (রঃ) রাত্রে যখন বিছানায় শয়ন করতে যেতেন, তখন তিনি কঁদতে শুরু করতেন এবং হঠাৎ করে তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে যেতোঃ হায়! আমার যদি জন্মই না হতো (তবে কতই না ভাল হতো।` তাকে একবার এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ (আরবী) আল্লাহ পাকের এই উক্তিটিই আমার ক্রন্দনের কারণ। এটাতো প্রমাণিত হচ্ছে যে, সেখানে যেতে হবে। আর সেখানে গিয়ে (জাহান্নামের আগুন হতে) পরিত্রাণ পাবো কি না তা আমার জানা নেই (তাই, আমার কান্না এসে যায়)।” (এটা ইমাম ইবন জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত হাসান বসরী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক তার ভাইকে বলেনঃ “আমাদেরকে জাহান্নাম অতিক্রম করতে হবে এটা আপনার জানা আছে কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “হুঁ, অবশ্যই এটা আমার জানা আছে। আবার তিনি প্রশ্ন করেনঃ “ওটা আপনি পার হয়ে যাবেন এটাও কি আপনার জানা আছে?” জবাবে তিনি বলেনঃ “না, এটা আমি বলতে পারি না।” তখন তিনি বলেনঃ “তাহলে আমাদের এই হাসি খুশী কেমন?` একথা শোনার পর মৃত্যু পর্যন্ত তার মুখে আর কখনো হাসি দেখা যায় নাই।
বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনু আব্বাসের (রাঃ) মতে এখানে (আরবী) অতিক্রম দ্বারা (আরবী) বা প্রবেশ বুঝানো হয়েছে। কিন্তু নাফে আযরাক তার এই মতের বিরোধী ছিল। একবার হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) তাঁর এই মতের স্বপক্ষে দলীল দেখাতে গিয়ে না’ফেকে বলেনঃ “দেখো, কুরআন কারীমে রয়েছেঃ (আরবী) (২১:৯৮) এখানে (আরবী) দ্বারা (আরবী) উদ্দেশ্য নয় কি? তিনি আর একটি আয়াত তিলাওয়াত করেনঃ (আরবী) (১১:৯৮)
এটা পাঠ করে তিনি নাফেকে জিজ্ঞেস করেনঃ আচ্ছা বলতো, ফিরাউন তার কওমকে জাহান্নামে নিয়ে যাবে কি না? সুতরাং তুমি চিন্তা করে দেখো যে, আমরা জাহান্নামে অবশ্যই প্রবেশ করবো। তবে আমরা তার থেকে বের হবে কি না এটাই প্রশ্ন। কিন্তু তোমার ব্যাপারে নিশ্চিত করে বলা যায় যে, আল্লাহ তাআলা তোমাকে জাহান্নাম হতে বের করবেন না। কেননা, তুমি এটা অস্বীকারকারী।” তাঁর একথা শুনে নাফে' হেসে ওঠে। এই নাফে একজন খারেজী ছিল। (এটা আবদুর রাযযাক (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন) তার কুনিয়াত (পিতৃ পদবীযুক্ত নাম) ছিল আবু রাশেদ।
অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) তাকে বুঝাতে গিয়ে (আরবী) এই আয়াতটিও পাঠ করেছিলেন এবং একথাও বলেছিলেন যে, পূর্ব যুগীয় বুযুর্গ ব্যক্তিগণ তাদের প্রার্থনায় বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমাকে নিরাপদে জাহান্নাম হতে বের করুন এবং খুশী ও আনন্দের সাথে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিন।” আবু দাউদ তায়ালেসী (রঃ) হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে এটাও বর্ণনা করেছেন যে, এর দ্বারা কাফিরদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এরা হচ্ছে যালিম লোক। তিনি বলেনঃ “আমরা এভাবেই এই আয়াত পাঠ করতাম।” হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ভাল ও মন্দ সবলোকই জাহান্নাম অতিক্রম করবে। তিনি বলেনঃ দেখো, ফিরাউন, তার কওম এবং গুনাহগারদের জন্যেও (আরবী) শব্দটি (আরবী) এর অর্থে স্বয়ং কুরআন কারীমের দুটি আয়াতে এসেছে।
জামে তিরমিযী প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অতিক্রম তো সবাই করবে, কিন্তু তাদের ঐ অতিক্রম তাদের আমল অনুযায়ী হবে।
হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, সবকেই পুলসিরাত অতিক্রম করতে হবে। এটাই হচ্ছে আগুনের পার্শ্বে দাড়ানো। কিছু লোক বিদ্যুৎগতিতে পার হয়ে যাবে, কেউ পার হবে বায়ুর গতিতে, কেউ পাখীর গতিতে, কেউ দ্রুতগামী ঘোড়ার গতিতে, কেউ দ্রুতগামী উটের গতিতে এবং কেউ দ্রুতগামী মানুষের চলার গতিতে পার হয়ে যাবে। সর্বশেষে যে মুসলমান ওটা অতিক্রম করবে সে হবে ঐ ব্যক্তি যার শুধু পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলির উপর নূর (আলো) থাকবে। সে পড়ে উঠে পার হয়ে যাবে। পুলসিরাত হলো পিচ্ছিল জিনিস, যার উপর বাবলা গাছের কাটার মত কাটা রয়েছে। ওর দুধারে ফেরেশতাদের সারি থাকবে, যাদের হাতে জাহান্নামের অংকুশ থাকবে। ওটা দিয়ে ধরে ধরে তারা লোকদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন যে, ঐ পুলসিরাত তরবারীর ধার অপেক্ষা তীক্ষ্ণতর হবে। প্রথম দল বিদ্যুৎ গতিতে মুহূর্তের মধ্যে পার হয়ে যাবে। দ্বিতীয় দল বায়ুর গতিতে যাবে। তৃতীয় দল যাবে দ্রুত গামী ঘোড়ার গতিতে। চতুর্থ দল দ্রুতগামী জন্তুর গতিতে যাবে। ফেরেশতামণ্ডলী সব দিক থেকে প্রার্থনা করতে থাকবেন। তারা বলবেনঃ “হে আল্লাহ! এদেরকে বাচিয়ে নিন।” সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের বহু মারফু হাদীসেও এই বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে। হযরত কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জাহান্নাম স্বীয় পৃষ্ঠের উপর সমস্ত মানুষকে একত্রিত করবে। যখন সমস্ত পুণ্যবান ও পাপী লোক একত্রিত হবে তখন আল্লাহ তাআলা ওকে নির্দেশ দিবেনঃ “তুমি তোমার নিজের লোকদেরকে পাকড়াও করো এবং জান্নাতীদেরকে ছেড়ে দাও।` তখন জাহান্নাম সমস্ত খারাপ লোককে গ্রাস করে ফেলবে। জাহান্নাম খারাপ লোকদেরকে এমনই চিনতে পারবে যেমন মানুষ নিজেদের সন্তানদেরকে চিনে থাকে বা তার চেয়েও বেশী চিনবে।
জাহান্নামের দারোগাদের দেহ হবে এক শ' বছরের পথের সমান। তাদের প্রত্যেকের হাতে লৌহ নির্মিত গদা থাকবে। ঐ গদার একটি মাত্র আঘাতে সাতলক্ষ মানুষ চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাবে।
মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার প্রতিপালকের পবিত্র সত্তার কাছে আমি এই আশা রাখি যে, বদর ও হুদাইবিয়ার যুদ্ধে যে সব মুমিন শরীক ছিল তাদের একজনও জাহান্নামে যাবে না।” তাঁর একথা শুনে হযরত হাফসা (রাঃ) বলেনঃ “এটা কি রূপে সম্ব? কুরআন কারীমে তো ঘোষিত হয়েছেঃ “তোমাদের ওটা (জাহান্নাম) অতিক্রম করতে হবে?” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর পরবর্তী আয়াতটি পাঠ করেনঃ “মুত্তাকীরা তার থেকে পরিত্রাণ পেয়ে যাবে এবং যালিমরা ওরই মধ্যে রয়ে যাবে।”
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘যার তিনটি সন্তান মারা গেছে তাকে আগুন স্পর্শ করবে না, কিন্তু শুধু কসম পুরো করা হিসেবে (আগুন স্পর্শ করবে)।”এর দ্বারা এই আয়াতই উদ্দেশ্য।
বর্ণিত আছে যে, একজন সাহাবী রোগাক্রান্ত হন। তাকে দেখবার জন্যে সাহাবীগণ সমভিব্যাহারে রাসূলুল্লাহ (সঃ) গমন করেন। তিনি বলেন যে, আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ “এই জ্বরও একপ্রকার আগুন। এর মধ্যে আমি আমার মুমিন বান্দাদেরকে এজন্যেই জড়িয়ে ফেলি যে, যাতে এটা জাহান্নামের আগুনের বদলা হয়ে যায়।` (এ হাদীসটি ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা গারীব বা দুর্বল হাদীস) হযরত মুজাহিদও (রঃ) এটাই বর্ণনা করে এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেন।
হযরত আনাস আল জুহানী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি সূরায়ে (আরবী) দশবার পড়ে নেয় তার জন্যে জান্নাতে একটি ঘর নির্মিত হয়।” একথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “তা হলে তো আমরা বহু ঘর নির্মাণ করিয়ে নিবো।” জবাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআলার কাছে কোন কিছুরই ঘাটতি নেই। তিনি উত্তম হতে উত্তমতম এবং বহু হতে আরো বহু প্রদানকারী। যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে এক হাজার আয়াত পাঠ করে নেয়, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তার নামটি নবী, সিদ্দীক ও শহীদদের তালিকায় লিপিবদ্ধ করবেন এবং তাঁরা হলেন সর্বোত্তম সঙ্গী। আর যে ব্যক্তি বেতন ভোগী হিসেবে নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে মুসলিম সেনাবাহিনীকে হিফাজত করার জন্যে পিছন থেকে পাহারা দেয়, সে তার চোখে জাহান্নামের। আগুন দেখবেও না, শুধু কসম পুরো করার জন্যেই তাকে দেখতে হবে। কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ “তোমাদের সকলকেই ওটা (জাহান্নাম) অতিক্রম করতে হবে। আল্লাহর পথে তার যিক্র করা তাঁর পথে খরচ করা। হতেও সাতশগুণ বেশী মর্যাদা রাখে। কাতাদা (রাঃ) বলেন যে, এই আয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে পার হওয়া বা অতিক্রম করা। আবদুর রহমান (রঃ) বলেন যে, মুসলমান পুলসিরাত পার হয়ে যাবে, আর মুশরিক জাহান্নামে পড়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, ঐ দিন বহু পুরুষ ও নারী পুলসিরাতের উপর থেকে পিছলিয়ে পড়ে যাবে। ওর দুপার্শ্বে ফেরেশতাদের সারি থাকবে যারা নিরাপত্তার প্রার্থনা জানাতে থাকবেন। এটা তো আল্লাহর কসম যা পুরো হবেই। এর ফায়সালা হয়ে গেছে এবং আল্লাহ তাআলা ওটা নিজের দায়িত্বে নিয়ে নিয়েছেন। পুলসিরাতের উপর যাওয়ার পর খোদাভীরু লোকেরা পার হয়ে যাবে। আর পাপীরা তাদের আমল অনুযায়ী জাহান্নামে গড়ে গড়ে পড়তে থাকবে। মু'মিনরাও নিজ নিজ আমল অনুযায়ী মুক্তি পাবে। যে পরিমাণ আমল হবে সেই পরিমাণ সেখানে বিলম্ব হবে। তারপর যারা মুক্তি পাবে তারা তাদের মুসলমান ভাইদের জন্যে সুপারিশ করবে। ফেরেশতামণ্ডলী ও রাসূলগণও শাফাআত করবেন। অতঃপর কতকগুলি লোক এমন অবস্থায় জাহান্নাম হতে বের হবে যে, আগুন তাদেরকে খেয়ে ফেলবে। শুধু চেহারায় সিজদার জায়গাটুকু বাকী থাকবে। তারপর নিজনিজ বাকী ঈমানের পরিমাণ হিসেবে জাহান্নাম থেকে বেরিয়ে আসবে। যাদের অন্তরে দীনার (স্বর্ণ মুদ্রা) পরিমাণ ঈমান থাকবে তারা প্রথমে বের হবে। তারপর বের হবে তাদের চেয়ে কম ঈমানের অধিকারী লোকেরা। এরপর বের হবে ঐ লোকেরা যাদের ঈমান এদের চেয়ে কম হবে। তারপর যাদের ঈমনি হবে সরিষার দানার পরিমাণ তারা বের হবে, এরপরে এরচেয়ে কম ঈমানের অধিকারীদেরকে বের করা। হবে। তারপর ঐ ব্যক্তিকে বের করা হবে যে সারা জীবনে একবার লাইলাহা ইল্লাল্লাহ বলেছে। যদিও তার অন্য কোন পুণ্য নাও থাকে। এরপর জাহান্নামে শুধু তারাই থাকবে যাদের ভাগ্যে জাহান্নামে চিরস্থায়ী অবস্থান লিখিত আছে। এসবগুলি হচ্ছে ঐ হাদীসসমূহের সারমর্ম যেগুলি সঠিকতার সাথে এসেছে। অতএব, বুঝা গেল যে, পুলসিরাতের উপর যাওয়ার পর পুণ্যবান লোকেরা ওটা পার হয়ে যাবে এবং পাপী লোকেরা কেটে কেটে জাহান্নামে পড়ে যাবে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।