সূরা মারইয়াম (আয়াত: 37)
হরকত ছাড়া:
فاختلف الأحزاب من بينهم فويل للذين كفروا من مشهد يوم عظيم ﴿٣٧﴾
হরকত সহ:
فَاخْتَلَفَ الْاَحْزَابُ مِنْۢ بَیْنِهِمْ ۚ فَوَیْلٌ لِّلَّذِیْنَ کَفَرُوْا مِنْ مَّشْهَدِ یَوْمٍ عَظِیْمٍ ﴿۳۷﴾
উচ্চারণ: ফাখতালাফাল আহযা-বুমিম বাইনিহিম ফাওয়াইলুল লিল্লাযীনা কাফারূমিম মাশহাদি ইয়াওমিন ‘আজীম।
আল বায়ান: এরপর তাদের মধ্য থেকে বিভিন্ন দল মতভেদ করল। কাজেই মহাদিবস প্রত্যক্ষকালে কাফিরদের ধ্বংস অনিবার্য।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৭. অতঃপর দলগুলো নিজেদের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি করল(১), কাজেই দুর্ভোগ কাফেরদের জন্য মহাদিবস প্ৰত্যক্ষকালে।(২)
তাইসীরুল ক্বুরআন: অতঃপর দলগুলো তাদের মধ্যে মতভেদ করল। কাজেই সেই ভয়াবহ দিনের উপস্থিতকালে কাফিরদের জন্য ধ্বংস অনিবার্য।
আহসানুল বায়ান: (৩৭) অতঃপর দলগুলি নিজেদের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি করল।[1] সুতরাং এক মহান দিবসের আগমনে অবিশ্বাসীদের ভীষণ দুর্দশা রয়েছে। [2]
মুজিবুর রহমান: অতঃপর দলগুলি নিজেদের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি করল; সুতরাং এই কাফিরদের মহা দিনের আগমনে ভীষণ দুর্দশা রয়েছে।
ফযলুর রহমান: অতঃপর তাদের মধ্য থেকে দলগুলো মতভেদ করল। (ঈসার ব্যাপারে খ্রিষ্টানরা ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হল।) অতএব, এক ভয়ানক দিনের (কেয়ামতের) উপস্থিতিকালে অবিশ্বাসীদের জন্য বড়ই দুর্ভোগ রয়েছে!
মুহিউদ্দিন খান: অতঃপর তাদের মধ্যে দলগুলো পৃথক পৃথক পথ অবলম্বন করল। সুতরাং মহাদিবস আগমনকালে কাফেরদের জন্যে ধবংস।
জহুরুল হক: কিন্তু গোত্রেরা তাদের পরস্পরের মধ্য মতানৈক্য সৃষ্টি করল, সুতরাং ধিক্ তাদের প্রতি যারা অবিশ্বাস পোষণ করে সেই ভয়ঙ্কর দিনে হাজিরাদানের কারণে।
Sahih International: Then the factions differed [concerning Jesus] from among them, so woe to those who disbelieved - from the scene of a tremendous Day.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩৭. অতঃপর দলগুলো নিজেদের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি করল(১), কাজেই দুর্ভোগ কাফেরদের জন্য মহাদিবস প্ৰত্যক্ষকালে।(২)
তাফসীর:
(১) অর্থাৎ নাসারাগণ ঈসা আলাইহিস সালামের ব্যাপারে বিভিন্ন মত ও পথে বিভক্ত হয়ে গেল। তাদের মধ্যে কেউ বলল, তিনি জারজ সন্তান। তাদের উপর আল্লাহর লা'নত হোক। তারা বলল যে, তার বাণীসমূহ জাদু। অপর দল বলল, তিনি আল্লাহর পুত্র। আরেকদল বলল, তিনি তিনজনের একজন। অন্যরা বলল, তিনি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। এটাই হচ্ছে সত্য ও সঠিক কথা, আল্লাহ যেটার প্রতি মুমিনদেরকে হেদায়াত করেছেন। [ইবন কাসীর]
(২) এ হচ্ছে যারা আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করে তার জন্য সন্তান সাব্যস্ত করে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের জন্য সুস্পষ্ট ভীতি-প্রদর্শন। তিনি ইচ্ছে করলে দুনিয়াতেই তাৎক্ষনিক তাদেরকে পাকড়াও করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তাদেরকে কিছু সময় অবকাশ দিয়ে তাওবাহ ও ইস্তেগফারের সুযোগ দিয়ে সংশোধনের সুযোগ দিতে চান। কিন্তু তারা তাদের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত না হলে তিনি অবশ্যই তাদেরকে পাকড়াও করবেন। [ইবন কাসীর]
হাদীসে এসেছে, “আল্লাহ যালেমকে ছাড় দিতেই থাকেন তারপর যখন তাকে পাকড়াও করেন তখন তার আর পালাবার কোন পথ অবশিষ্ট থাকে না।” [বুখারী: ৪৬৮৬, মুসলিম: ২৫৮৩] আর ঐ ব্যক্তির চেয়ে বড় যালেম আর কে হতে পারে যে, মহান আল্লাহর জন্য সন্তান ও পরিবার সাব্যস্ত করে? হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “কষ্টদায়ক কিছু শুনার পরে আল্লাহর চেয়ে বেশী ধৈর্যশীল আর কেউ নেই, তারা তার জন্য সন্তান সাব্যস্ত করছে অথচ তিনি তাদেরকে জীবিকা ও নিরাপত্তা দিয়েই যাচ্ছেন।” [বুখারী: ৬০৯৯, মুসলিম: ২৮০৪]
পক্ষান্তরে যারা এর বিপরীত কাজ করবে তাদের জন্য উত্তম পুরস্কার রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “কেউ যদি এ সাক্ষ্য দেয় যে, একমাত্র আল্লাহ যার কোন শরীক নেই তিনি ব্যতীত হক কোন মা’বুদ নেই, মুহাম্মদ তাঁর বান্দা ও রাসূল, ঈসাও আল্লাহর বান্দা, রাসূল ও এমন এক বাণী যা তিনি মারইয়ামের কাছে ঢেলে দিয়েছিলেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে প্রেরিত একটি আত্মা। আর এও সাক্ষ্য দেয় যে, জান্নাত বাস্তব, জাহান্নাম বাস্তব। আল্লাহ তাকে তার আমল কম-বেশ যা-ই থাকুক না কেন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।” [বুখারী: ৩৪৩৫, মুসলিম: ২৮]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩৭) অতঃপর দলগুলি নিজেদের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি করল।[1] সুতরাং এক মহান দিবসের আগমনে অবিশ্বাসীদের ভীষণ দুর্দশা রয়েছে। [2]
তাফসীর:
[1] এখানে الأَحزَاب (দলগুলি) বলতে খ্রিষ্টান ও ইয়াহুদীদের দলকে বুঝানো হয়েছে; যারা ঈসার ব্যাপারে মতভেদ করেছিল। ইয়াহুদীরা বলেছিল, তিনি জাদুকর ও জারজ সন্তান; অর্থাৎ ইউসুফ (যোসেফ) নাজ্জারের অবৈধ সন্তান। খ্রিষ্টানদের মধ্যে প্রোটেষ্ট্যান্টদের বক্তব্য ঈসা আল্লাহর পুত্র। ক্যাথলিকরা বলে, তিনি তিন আল্লাহর তৃতীয়জন। অর্থোডক্সরা বলে তিনি স্বয়ং আল্লাহ। এভাবে ইয়াহুদীরা তাঁকে হীন জ্ঞান করে, আর খ্রিষ্টানরা তাঁর ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে।
(আইসারুত তাফাসীর, ফাতহুল কাদীর)
[2] ঐ সমস্ত কাফেরদের জন্য ভীষণ দুর্দশা রয়েছে, যারা ঈসা (আঃ)-এর ব্যাপারে মতভেদ এবং অতিরঞ্জন ও অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছে। কিয়ামতের দিন যখন উপস্থিত হবে, তখন তারা ধ্বংস হবে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৬-৪০ নং আয়াতের তাফসীর:
উক্ত আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা ঈসা (عليه السلام)-এর মা মারইয়াম (عليه السلام) সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।
আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এ কুরআনে মারইয়ামের কথা বর্ণনা করার নির্দেশ প্রদান করেছেন।
انْتَبَذَتْ এর আসল অর্থ: দূরে নিক্ষেপ করা। انتباذ এর অর্থ লোকালয় থেকে নিরালায় চলে আসা। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতের উদ্দেশ্যে পরিবার ও লোকালয় থেকে আলাদা হয়ে বায়তুল মুকাদদাসের পূর্ব দিকে পর্দা টাঙ্গিয়ে নিরালায় অবস্থান নিলেন।
এমন সময় আল্লাহ জিবরীল (عليه السلام)-কে পূর্ণাঙ্গ মানবাকৃতিতে প্রেরণ করলেন। سَوِيًّا অর্থ পূর্ণাঙ্গ একজন পুরুষ, যিনি সুন্দর ও উত্তম অবয়বের অধিকারী। মারইয়াম (عليه السلام) তাকে মানুষ মনে করে ভয় পেয়ে গেলেন, হয়তো কোন অসৎ উদ্দেশ্যে এখানে আগমন করেছে, তাই তিনি বললেন: তুমি যদি আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় কর তাহলে আমি তোমার থেকে করুণাময় আল্লাহ তা‘আলার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। জিবরীল (عليه السلام) বললেন: আপনি যা মনে করেছেন তা নয়, আমি আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে প্রেরিত একজন দূত। আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে আপনাকে একটি পূতপবিত্র পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দান করার জন্য।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(إِنَّ اللّٰهَ يُبَشِّرُكِ بِكَلِمَةٍ مِّنْهُ ق لا اسْمُهُ الْمَسِيْحُ عِيْسَي ابْنُ مَرْيَمَ وَجِيْهًا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَمِنَ الْمُقَرَّبِيْنَ )
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তার পক্ষ থেকে এক কালিমার সুসংবাদ দিচ্ছেন, তার নাম হল মাসীহ, ঈসা ইবনু মারইয়াম। তিনি দুনিয়া এবং আখিরাতে সম্মানিত এবং নৈকট্যপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত।” (সূরা আলি-ইমরান ৩:৪৫)
মারইয়াম বললেন, কিভাবে আমার সন্তান হবে? অথচ কোন পুরুষ আমাকে স্পর্শ (বৈধ উপায়ে সহবাস) করেনি এবং আমি ব্যভিচারিণীও নই। জিবরীল (عليه السلام) বললেন: এভাবেই হবে। অর্থাৎ যদিও গর্ভ ধারণের জন্য পুরুষের সাথে মিলন হওয়া আবশ্যক, তবুও এভাবে হবে। আপনার পালনকর্তা বলেছেন, এটা আমার জন্য সহজ ব্যাপার।
পৃথিবীর মানুষকে চার পদ্ধতিতে সৃষ্টি করা হয়েছে: ১. পিতা-মাতা ছাড়া, যেমন আদম (عليه السلام), ২. শুধু পুরুষ হতে যেমন হাওয়া (عليه السلام)-কে আদম থেকে, ৩. ঈসা (عليه السلام)-কে মা থেকে পিতা ছাড়া এবং ৪. পিতা-মাতার মাধ্যমে বাকী আদম সন্তান।
(اٰيَةً لِّلنَّاسِ)
অর্থাৎ ঈসা (عليه السلام)-কে মানুষের একটি নিদর্শন বানাবেন যা আল্লাহ তা‘আলার কুদরতের ওপর প্রমাণ বহন করে। যেমন সূরা আম্বিয়ার ৯১ নং আয়াতে বলা হয়েছে।
অতঃপর মারইয়াম গর্ভে সন্তান ধারণ করল এবং তৎসহ একটি দূরবর্তী স্থানে চলে গেল। এমতাবস্থায় প্রসব বেদনা তাকে একটি খেজুর বৃক্ষের মূলে আশ্রয় নিতে বাধ্য করল। তখন তিনি বললেন: হায়! আমি যদি এর আগেই মারা যেতাম এবং আমি যদি মানুষের স্মৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে যেতাম। কেননা মানুষ সন্তান সম্পর্কে প্রশ্ন করলে কী জবাব দেব? সবাই জানে আমি বিবাহিতা নই, আমি একজন ইবাদতকারিণী, তাহলে সন্তান জন্ম নিল কিভাবে?
(نَسْيًا مَّنْسِيًّا)
অর্থ মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যাওয়া, অর্থাৎ আমি মারইয়াম নামে দুনিয়াতে কোন নারী ছিলাম তা যদি মানুষের স্মৃতিপট থেকে মুছে যেতাম। এমন সময় ফেরেশতা তাকে নিম্নদেশ থেকে আওয়াজ দিয়ে বলল, তুমি দুঃখ কর না। তোমার পালনকর্তা তোমার পাদদেশে একটি ঝর্ণাধারা সৃষ্টি করেছেন।
سَرِيًّا অর্থ ছোট নদী বা ঝরনা। رُطَبًا جَنِيًّا অর্থ সিক্ত পরিপক্ক খেজুর। অর্থাৎ পায়ের নিচে ঝরনা দিলেন, খেজুর গাছে নাড়া দিলে সিক্ত পরিপক্ক খেজুর পড়ে যাবে, এসব কিছু মু’জিযাহ বা কারামতস্বরূপ দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বললেন: খাও, পান কর আর সন্তান দেখে চোখ জুড়াও।
আর যদি কোন মানুষকে তুমি দেখ, তবে তাকে বলে দিয়ো যে, আমি দয়াময় আল্লাহ তা‘আলার জন্য সিয়াম পালনের মানত করেছি। সুতরাং আমি আজ কারো সাথে কোন কথাই বলব না।
অতঃপর মারইয়াম (عليه السلام) সন্তান প্রসবের পর শারীরিক সুস্থতা ফিরে আসলে সন্তানকে নিয়ে সম্প্রদায়ের কাছে আসলেন। তারা বলল: হে মারইয়াম! তুমি তো এক অদ্ভূত কাণ্ড করে বসেছ। হে হারূনের বোন! তোমার পিতা কোন অসৎ ব্যক্তি ছিলেন না কিংবা তোমার মাতাও কোন ব্যভিচারিণী মহিলা ছিলেন না। সম্প্রদায়ের এ ধরণের কথা শুনে মারইয়াম তার সন্তানের দিকে ইঙ্গিত করল যে, এসব কথার জবাব সে দেবে। তারা বলল: এ কোলের শিশুর সাথে আমরা কেমন করে কথা বলব?
(أُخْتَ هٰرُوْنَ)
এখানে হারূন বলতে মূসা (عليه السلام) এর ভাই হারূন নয়, বরং হারুন বলতে বানী ইসরাঈলের কোন একজন সৎ ব্যক্তি, মারইয়াম তার সহোদর বোন ছিলেন। (আযওয়ারুল বায়ান)
ঈসা (عليه السلام) তখন বলে উঠল, আমি আল্লাহ তা‘আলার দাস। তিনি আমাকে কিতাব প্রদান করেছেন এবং আমাকে নাবী করেছেন। আমি যেখানেই থাকি না কেন তিনি আমাকে জোরালো নির্দেশ প্রদান করেছেন যতদিন আমি জীবিত থাকি ততদিন সালাত ও যাকাত আদায় করার জন্য এবং আমার মায়ের অনুগত থাকতে। আল্লাহ তা‘আলা আমাকে উদ্ধত ও হতভাগা করেননি। আমার প্রতি শান্তি ও শয়তানের সকল অনিষ্ট থেকে মুক্ত যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি আর যেদিন আমি মৃত্যুবরণ করব এবং যেদিন আমাকে জীবিত অবস্থায় পুনরুত্থিত করা হবে। এটাই হল মারইয়াম পুত্র ঈসা (عليه السلام), আর এটাই হল সত্য কথা (যা উপরে বর্ণনা করা হয়েছে) যে বিষয়ে লোকেরা বিতর্ক করে থাকে।
আল্লাহ তা‘আলা এমন নন যে, তিনি সন্তান গ্রহণ করবেন (যেমন খ্রিস্টানরা বলে থাকে ঈসা আল্লাহ তা‘আলার পুত্র) তিনি এ ব্যাপারে মহান, পবিত্র।
আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(یٰٓاَھْلَ الْکِتٰبِ لَا تَغْلُوْا فِیْ دِیْنِکُمْ وَلَا تَقُوْلُوْا عَلَی اللہِ اِلَّا الْحَقَّﺚ اِنَّمَا الْمَسِیْحُ عِیْسَی ابْنُ مَرْیَمَ رَسُوْلُ اللہِ وَکَلِمَتُھ۫ﺆ اَلْقٰٿھَآ اِلٰی مَرْیَمَ وَرُوْحٌ مِّنْھُﺑ فَاٰمِنُوْا بِاللہِ وَرُسُلِھ۪ﺤ وَلَا تَقُوْلُوْا ثَلٰثَةٌﺚ اِنْتَھُوْا خَیْرًا لَّکُمْﺚ اِنَّمَا اللہُ اِلٰھٌ وَّاحِدٌﺚ سُبْحٰنَھ۫ٓ اَنْ یَّکُوْنَ لَھ۫ وَلَدٌ)
“মারইয়ামের ছেলে ‘ঈসা মসীহ তো আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর বাণী, যা তিনি মারইয়ামের নিকট প্রেরণ করেছিলেন ও তাঁর আদেশ। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণে ঈমান আন এবং বল না, ‘তিন!’ (তিনজন ইলাহ) নিবৃত্ত হও, এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর হবে। আল্লাহ তো একমাত্র ইলাহ; তাঁর সন্তান হবে তিনি এটা হতে পবিত্র।” (সূরা নিসা ৪:১৭১)
আর তিনি যে সকল কার্যকলাপ করেন তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তিনি এমন উপাস্য যখন তিনি কোন কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তখন বলেন, হও! এবং তা হয়ে যায়। যেমন পিতা ছাড়া ঈসা (عليه السلام)-এর জন্ম, সুতরাং সন্দেহ পোষণ করার কোন কিছুই নেই।
সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা কোন সন্তান-সন্ততি ও স্ত্রী-পরিজন গ্রহণ করা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। ঈসা (عليه السلام) আরো বললেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা আমার পালনকর্তা ও তোমাদের পালনকর্তা। অতএব তোমরা তাঁর ইবাদত কর। আর এটাই হল সরল-সঠিক পথ। ঈসা (عليه السلام)-এর এ সকল কথা শুনেও একশ্রেণির লোকের বিশ্বাস হল না।
(فَاخْتَلَفَ الْأَحْزَابُ)
অর্থাৎ ইয়াহূদীরা ঈসা (عليه السلام)-এর ব্যাপারে বিভিন্ন দলে ও মতে বিভক্ত হয়ে গেল; কেউ বাড়াবাড়ি করে বলল: তিনিই আল্লাহ, কেউ বলল: তিনি আল্লাহ তা‘আলার সন্তান, কেউ বলল: তিনি তিনজনের একজন (আল্লাহ, মারইয়াম ও ঈসা)। কেউ নাবী বলে আখ্যায়িত করে না, বরং বলে থাকে: তিনি জারজ সন্তান যেমন ইয়াহূদীরা। সব কথাই বাতিল, যারাই এসব কথা বলে তারাই কুফরী করেছে। এভাবে তাদের মধ্যকার বিভিন্ন দল বিভিন্ন মত ও পথে বিভক্ত হয়ে গেল। সুতরাং কিয়ামত দিবসে তাদের জন্য থাকবে ধ্বংস ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। যেমন সূরা যুখরুফের ৬৩-৬৫ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে।
তাদের দলে দলে বিভক্ত হওয়ার ফলে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে তিরস্কার করণার্থে বলেন দুনিয়াতে তারা সত্য কথা না শুনলেও, না দেখলেও কিয়ামতের দিন তারা চমৎকারভাবে শুনবে ও দেখবে, যেদিন তারা সবাই আমার নিকট আগমন করবে। আর তারা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছে।
আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: কিয়ামত দিবসে মৃত্যুকে একটি ধূসর রঙের মেষের আকারে আনা হবে। তখন একজন সম্বোধনকারী ডাক দিয়ে বলবেন: হে জান্নাতবাসী! তখন তারা ঘাড়-মাথা উঁচু করে দেখতে থাকবে। আহ্বানকারী বলবেন: তোমরা কি একে চিন? তারা বলবে: হ্যাঁ, এ হল মৃত্যু। কেননা সকলেই তাকে দেখেছে। তারপর সম্বোধনকারী আবার ডাক দিয়ে বলবেন: হে জাহান্নামবাসী! জাহান্নামীরা মাথা উঁচু করে দেখতে থাকবে, তখন আহ্বানকারী বলবেন: তোমরা কি একে চিন? তারা বলবে: হ্যাঁ, এ তো মৃত্যু। কেননা তারা সকলেই তাকে দেখেছে। তারপর (সেটিকে) জবেহ করা হবে। আর ঘোষক বলবেন: হে জান্নাতবাসী! স্থায়ীভাবে এখানে থাক। তোমাদের মৃত্যু নেই। আর হে জাহান্নামবাসী চিরদিন এখানে থাক। তোমাদেরও মৃত্যু নেই। এরপর রাসূলুল্লাহ পাঠ করলেন: “তাদেরকে সতর্ক করে দাও পরিতাপের দিবস সম্বন্ধে, যখন সকল সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে। এখন তারা গাফিল এবং তারা বিশ্বাস করে না।”
সুতরাং আমাদের উচিত সত্যকে সত্য বলে মেনে নেয়া আর মিথ্যাকে বর্জন করা। কারণ আমাদের সকলকেই একদিন আল্লাহ তা‘আলার নিকট ফিরে যেতে হবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. সকল ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলারই হাতে।
২. আল্লাহ তা‘আলা ইচ্ছা করলে পিতা ছাড়াও সন্তান দান করতে পারেন।
৩. আল্লাহ তা‘আলা কোন স্ত্রী-পুত্র, পরিজন গ্রহণ করা থেকে পূতপবিত্র।
৪. আল্লাহ তা‘আলা চাইলে কোলের শিশুকেও কথা বলাতে পারেন। যেমন ঈসা (عليه السلام)।
৫. ঈসা (عليه السلام) ছিলেন বরকতস্বরূপ।
৬. সকলকে আল্লাহ তা‘আলার নিকট ফিরে যেতে হবে।
৭. ফেরেশতা মানবাকৃতি ধারণ করতে পারেন।
৮. মানুষের রিযিক নির্ধারণ করা থাকলেও তা অন্বেষণ করে নিতে হবে, যেমন মারইয়াম (عليه السلام)-কে নির্দেশ দেয়া হলো।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৩৪-৩৭ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল হযরত মুহাম্মদ মুস্তফাকে (সঃ) বলছেনঃ হযরত ঈসার (আঃ) ঘটনার ব্যাপারে যে লোকদের মতানৈক্য ছিল, ওর মধ্যে যা সঠিক, তা আমি বর্ণনা করলাম। (আরবী) এর দ্বিতীয় পঠন (আরবী) ও রয়েছে। হযরত ইবনু মাসউদের (রাঃ) কিরআতে (আরবী) রয়েছে। (আরবী) শব্দের (আরবী) 'কে (আরবী) বা পেশ দিয়ে পড়াই বেশী প্রকাশমান। আল্লাহ তাআলার নিম্নের উক্তিটিই এর প্রমাণ। তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে সত্য, সুতরাং তুমি সন্দেহ পোষণকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” (৩:৬০) হযরত ঈসা (আঃ) যে আল্লাহর নবী ও বান্দা ছিলেন এ কথা বলার পর আল্লাহ তাআলা নিজের সত্তার পবিত্রতা বর্ণনা করছেন। তার মাহাত্মের এটা সম্পূর্ণ বিপরীত যে, তার সন্তান হবে। অজ্ঞ ও যালিম লোকেরা যে এই গুজব রটিয়ে ফিরছে তার থেকে মহান আল্লাহ সম্পূর্ণরূপে পবিত্র এবং তিনি এর থেকে দূরে রয়েছেন। তিনি যে কাজের ইচ্ছা করেন, সে জন্যে তার কোন উপকরণের প্রয়োজন হয় না। তিনি শুধু মাত্র বলেনঃ ‘হও’ আর তেমনই তা হয়ে যায়। একদিকে হুকুম এবং অন্যদিকে জিনিস মওজুদ। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই ঈসার (আঃ) আশ্চর্য অবস্থা আল্লাহর নিকট আদমের (আঃ) আশ্চর্য অবস্থার ন্যায়, তাকে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করলেন, তৎপর তা (রকালবীকে বললেনঃ (সজীব) হয়ে যাও, তখনই তা (সজীব) হয়ে গেলো এই বাস্তব ঘটনা তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে; সুতরাং তুমি সংশয়ীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।”
হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর কওমকে বললেনঃ আল্লাহই আমার প্রতিপালক ও তোমাদের প্রতিপালক। সুতরাং তোমরা তারই ইবাদত করো, এটাই সরল পথ! এটাই আমি আল্লাহ তাআলার নিকট থেকে নিয়ে এসেছি। যারা এর অনুসরণ করবে তারা সুপথ প্রাপ্ত হবে এবং যারা এর বিপরীত করবে তারা পথভ্রষ্ট হবে।
হযরত ঈসা (আঃ) নিজের সম্পর্কে এইরূপ বর্ণনার পরেও আহলে কিতাবের দলগুলি নিজেদের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি করলো। ইয়াহূদীরা বললো যে, (নাউযুবিল্লাহ) তিনি জারজ সন্তান। তাদের উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক যে, তারা তার একজন উত্তম রাসূলের উপর জঘন্য অপবাদ দিয়েছে। তারা বলেছে যে, তার এই কথা বলা ইত্যাদি সবই জাদু। অনুরূপভাবে খৃস্টানরাও বিভ্রান্ত হয়ে বলতে শুরু করেছে যে, তিনি তো স্বয়ং আল্লাহ এবং এই কথা আল্লাহরই কথা। অন্যেরা বলেছে যে, তিনি আল্লাহর পুত্র। আরো অন্যেরা বলেছে যে, তিনি তিন মা'বুদের মধ্যে এক মাবদ। তবে একটি দল প্রকৃত ঘটনা মুতাবেক বলেছে যে, তিনি আল্লাহর বান্দা ও তার রাসূল। এটাই হচ্ছে সঠিক উক্তি। হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কে মুসলমানদের আকীদা এটাই। আর মু'মিনদেরকে আল্লাহ তাআলা এই শিক্ষাই দিয়েছেন।
বর্ণিত আছে যে, বাণী ইসরাঈলের এক সম্মেলন হয়। তারা চারটি দল। ছাঁটাই করে এবং প্রত্যেক কওম নিজ নিজ আলেমকে পেশ করে। এটা হযরত ঈসার (আঃ) আকাশে উঠে যাওয়ার পরের ঘটনা। এখন চারটি দলের চারজন আলেমের মধ্যে হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কে মতানৈক্য হয়। একজন বলে যে, তিনি নিজেই আল্লাহ ছিলেন। তিনি যত দিন ইচ্ছা দুনিয়ায় অবস্থান করেছেন। যাকে ইচ্ছা জীবিত রেখেছেন এবং যাকে ইচ্ছা মেরে ফেলেছেন।
তার পর তিনি আকাশে উঠে গেছেন। এই দলটিকে ইয়াকুবিয়্যাত বলা হয়। বাকী তিনটি দলের তিনজন আলেম ঐ আলেমকে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করে। তখন ঐ তিন জনের দুজন তৃতীয়জনকে বলেঃ “তোমার ধারণা ও মতামত কি?” সে বললোঃ “তিনি আল্লাহর পুত্র ছিলেন। এই দলটির নাম নাসতুরিয়্যাহ। অবশিষ্ট দুজন ঐ তৃতীয় জনকে বললোঃ “তুমিও ভুল বললে।` অবশিষ্ট দু’জনের একজন অপরজনকে বললোঃ “তুমি তোমার মতামত পেশ কর।” সে বললোঃ “আমার তো আকীদা এই যে, তিনি তিন মাবুদের এক মাবুদ। এক মা’দ আল্লাহ, দ্বিতীয় মাবুদ এই ঈসা (আঃ) এবং তৃতীয় মা'বুদ তাঁর মাতা মারইয়াম (আঃ)।` এই দলটির নাম ইসরাঈলিয়্যাহ। আর দলটিই ছিল খৃস্টানদের বাদশাহ। তাদের সবার উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক। চুতর্থ জন বললোঃ “তোমরা সবাই মিথ্যাবাদী। হযরত ঈসা (আঃ) ছিলেন আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসুল। তিনি ছিলেন আল্লাহর কালেমা এবং তারই নিকট হতে প্রেরিত আল্লাহর রূহ।” এই দলটি মুসলমান। আর এরাই ছিল সঠিক পথের অনুসারী। তাদের মধ্যে যার অনুসারী যে দল ছিল সেই দল তার উক্তির উপরই চলে গেলো এবং তারা পরস্পর যুদ্ধ বিগ্রহ শুরু করে। দিলো। সর্বযুগে মুসলমানদের সংখ্যা কম থাকে বলে ঐ সব দল মুসলমানদের উপর বিজয় লাভ করলো। আল্লাহ তাআলার উক্তির তাৎপর্য এটাই যে, তারা এমন লোকদেরকে হত্যা করতো মানুষের মধ্যে যারা ন্যায়ের আদেশ করতো।
ঐতিহাসিকদের বর্ণনা এই যে, বাদশাহ কুতুনতীন তিনবার খৃস্টানদের একত্রিত করে। শেষ বারের সম্মেলনে তাদের দু' হাজার এক শ’ সর জন আলেম একত্রিত ছিল। কিন্তু তারা সবাই হযরত ঈসার (আঃ) ব্যাপারে বিভিন্ন মতাবলম্বী ছিল। এক শ' জন এক কথা বললে সত্তর জন অন্য কথা বলে। পঞ্চাশ জন আরো অন্য কিছু বলে। ষাট জনের আকীদা অন্য। প্রত্যেকের মত একে অপরের বিপরীত ছিল। সবচেয়ে বড় দলটির লোক সংখ্যা ছিল তিনশ ষাট। বাদশাহ এই দলের লোক সংখ্যা বেশী দেখে এই দলভুক্ত হয়ে যায়। রাজ্যের মঙ্গল এতেই ছিল। সুতরাং তার রাজনীতি তাকে এই দলের প্রতিই মনোযোগী করলো। সে অন্যান্য সমস্ত দলকে বের করে দিলো। আর এদের জন্যে সে ‘আমানাতে কুবরা এর প্রথা আবিষ্কার করলো। প্রকৃত পক্ষে এটাই হচ্ছে জঘন্যতম খিয়ানত বা বিশ্বাসঘাতকতা। এখন ঐ আলেমদের দ্বারা সে শরীয়তের মাসআলার কিতাবগুলি লিখিয়ে নিলো। আর রাজ্যের বহু রীতি-নীতি এবং শহরের জরুরী বিষয়গুলি শরীয়তরূপে তার মধ্যে দাখিল করে দিলো। সে অনেক কিছু নতুন নতুন বিষয় আবিষ্কার করলো। এভাবে প্রকৃত দ্বীনে মাসীহর রূপ পরিবর্তন করে একটা সংমিশ্রিত দ্বীন তৈরী করলো। আর জনগণের মধ্যে ওটা আইন রূপে চালু করে দিলো। তখন থেকে দ্বীনে মাসীহ বলতে এটাকেই বুঝায়। ওটার উপর যখন সে সকলকে সম্মত করে ফেললো, তখন চতুর্দিকে গীর্জা ও ইবাদতখানা নির্মাণ করা এবং ওগুলিতে আ'লেমদেরকে বসিয়ে দিয়ে তাদের মাধ্যমে ঐ নব সৃষ্ট মাসীহিয়্যাতকে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টায় উঠে পড়ে লেগে গেল। সিরিয়ায়, জাযীরায় এবং রোমে প্রায় বারো হাজার এইরূপ ঘর তার যুগে নির্মিত হয়। যে জায়গায় শূল তৈরী করা হয়েছিল সেখানে তারা মাতা হায়লানা একটা গম্বুজ তৈরী করিয়ে নিয়েছিল। নিয়মিতভাবে ওর পূজা শুরু হয়ে যায় এবং সবাই বিশ্বাস করে নেয় যে, হযরত ঈসাকে (আঃ) শূলে চড়ানো হয়েছে। অথচ তাদের এ উক্তিটি সম্পূর্ণ ভুল। আল্লাহ তাআলা তাকে নিজের পক্ষ থেকে আকাশে উঠিয়ে নিয়েছেন। এটাই হলো খৃস্ট ধর্মের সংক্ষিপ্ত নমুনা।
যারা আল্লাহ তাআলার উপর মিথ্যা আরোপ করে এবং সন্তান ও শরীক স্থাপন করে তারা দুনিয়ায় হয়তো অবকাশ লাভ করবে, কিন্তু ঐ ভীষণ ভয়াবহ দিনে চতুর্দিক থেকে তাদের উপর ধ্বংসের তাণ্ডবলীলা শুরু হয়ে যাবে এবং তারা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা স্বীয় অবাধ্য বান্দাদেরকে তাড়াতাড়ি শাস্তি দেন না বটে, কিন্তু তাদেরকে একেবারে ছেড়েও দেন না।
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা যালিমকে অবকাশ দেন, কিন্তু যখন তাকে পাকড়াও করেন, তখন তার কোন আশ্রয় স্থল বাকী থাকে না।` একথা বলার পর তিনি কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেন।
(আরবী) অর্থাৎ “তোমার প্রতিপালকের পাকড়াও করার পন্থা এরূপই যে, যখন কোন অত্যাচারী গ্রামবাসীকে পাকড়াও করেন ,তখন নিশ্চিত জানবে যে, তার পাকড়াও কঠিন যন্ত্রণাদায়ক।` (১১:১০২)
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের অন্য একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অপছন্দনীয় কথা শুনে আল্লাহ অপেক্ষা অধিক ধৈর্যশীল আর কেউই নেই। মানুষ তার সন্তান স্থাপন করে, তথাপি তিনি তাদেরকে রিযক দিতেই রয়েছেন এবং তাদেরকে নিরাপদে রেখেছেন। আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অনেক গ্রামবাসীকে, তারা অত্যাচারী হওয়া সত্ত্বেও আমি অবকাশ দিয়েছি, তারপরে তাদেরকে পাকড়াও করেছি, শেষে তাদের প্রত্যাবর্তন আমারই কাছে।` (২২:৪৮) অন্য জায়গায় তিনি বলেছেনঃ “অত্যাচারী লোকেরা যেন তাদের আমলের ব্যাপারে আল্লাহকে উদাসীন ও অমনোযোগী মনে না করে। তাদেরকে তিনি অবকাশ দিচ্ছেন ঐ দিনের জন্যে, যেই দিন চক্ষু উপরের দিকে উঠে যাবে।” ঐ কথা তিনি এখানেও বলছেনঃ এই কাফিরদের এক মহা দিবসের আগমনে ভীষণ দুর্দশা রয়েছে।
হযরত উবাদা ইবনু সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ যে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ এক, তার কোন অংশীদার নেই এবং মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল, আর ঈসা (আঃ) আল্লাহর বান্দা ও তার রাসূল এবং তাঁর কালেমা যা তিনি মারইয়ামের (আঃ) প্রতি নিক্ষেপ করেছিলেন এবং তিনি তাঁর রূহ; আরো সাক্ষ্য দেয় যে, জান্নাত সত্য, জাহান্নাম সত্য, তার আমল যা-ই হোক না কেন আল্লাহ তাকে বেহেশতে প্রবিষ্ট করবেন। (এ হাদীসটি বিশুদ্ধ। এর বিশুদ্ধ তার ব্যাপারে সবাই একমত)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।