সূরা মারইয়াম (আয়াত: 33)
হরকত ছাড়া:
والسلام علي يوم ولدت ويوم أموت ويوم أبعث حيا ﴿٣٣﴾
হরকত সহ:
وَ السَّلٰمُ عَلَیَّ یَوْمَ وُلِدْتُّ وَ یَوْمَ اَمُوْتُ وَ یَوْمَ اُبْعَثُ حَیًّا ﴿۳۳﴾
উচ্চারণ: ওয়াছছালা-মূ‘আলাইইয়া ইয়াওমা উলিততুওয়া ইয়াওমা আমূতুওয়া ইয়াওমা উব ‘আছু হাইইয়া-।
আল বায়ান: ‘আর আমার উপর শান্তি, যেদিন আমি জন্মেছি এবং যেদিন আমি মারা যাব আর যেদিন আমাকে জীবিত অবস্থায় উঠানো হবে’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৩. আমার প্রতি শান্তি যেদিন আমি জন্ম লাভ করেছি(১), যেদিন আমার মৃত্যু হবে এবং যেদিন জীবিত অবস্থায় আমি উত্থিত হব।
তাইসীরুল ক্বুরআন: আমার উপর আছে শান্তি যেদিন আমি জন্মেছি, যেদিন আমার মৃত্যু হবে আর আমি যেদিন জীবিত হয়ে উত্থিত হব।’
আহসানুল বায়ান: (৩৩) আমার প্রতি শান্তি, যেদিন আমি জন্ম লাভ করেছি ও যেদিন আমার মৃত্যু হবে এবং যেদিন আমি জীবিত অবস্থায় পুনরুত্থিত হব।’
মুজিবুর রহমান: আমার প্রতি শান্তি যেদিন আমি জন্ম লাভ করেছি ও শান্তি থাকবে যেদিন আমার মৃত্যু হবে এবং যেদিন আমি জীবিত অবস্থায় পুনরুত্থিত হব।
ফযলুর রহমান: আমার ওপর (আল্লাহর পক্ষ থেকে স্থায়ী) শান্তি থাকুক: যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি, যেদিন মারা যাব এবং যেদিন আমাকে জীবন্ত উঠানো হবে!”
মুহিউদ্দিন খান: আমার প্রতি সালাম যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি, যেদিন মৃত্যুবরণ করব এবং যেদিন পুনরুজ্জীবিত হয়ে উত্থিত হব।
জহুরুল হক: আর শান্তি আমার উপরে যেদিন আমার জন্ম হয়েছিল, আর যেদিন আমি মারা যাব আর যেদিন আমাকে পুনরুত্থিত করা হবে জীবিত অবস্থায়।
Sahih International: And peace is on me the day I was born and the day I will die and the day I am raised alive."
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩৩. আমার প্রতি শান্তি যেদিন আমি জন্ম লাভ করেছি(১), যেদিন আমার মৃত্যু হবে এবং যেদিন জীবিত অবস্থায় আমি উত্থিত হব।
তাফসীর:
(১) জন্মের সময় আমাকে শয়তান স্পর্শ করতে পারে নি। সুতরাং আমি নিরাপদ ছিলাম। অনুরূপভাবে মৃত্যুর সময় ও পুনরুত্থানের সময়ও আমাকে পথভ্রষ্ট করতে পারবে না। অথবা আয়াতের অর্থ, সালাম ও সম্ভাষণ জানানো। [ফাতহুল কাদীর] ইবন কাসীর বলেন, এর মাধ্যমে তার বান্দা হওয়ার ঘোষণা দেয়া হচ্ছে। তিনি জানাচ্ছেন যে, তিনি আল্লাহর সৃষ্ট বান্দাদের মধ্য হতে একজন। অন্যান্য সৃষ্টির মত জীবন ও মৃত্যুর অধীন। অনুরূপভাবে অন্যদের মত তিনিও পুনরুত্থিত হবেন। তবে তার জন্য এ কঠিন তিনটি অবস্থাতেই নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। [ইবন কাসীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩৩) আমার প্রতি শান্তি, যেদিন আমি জন্ম লাভ করেছি ও যেদিন আমার মৃত্যু হবে এবং যেদিন আমি জীবিত অবস্থায় পুনরুত্থিত হব।’
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৬-৪০ নং আয়াতের তাফসীর:
উক্ত আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা ঈসা (عليه السلام)-এর মা মারইয়াম (عليه السلام) সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।
আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এ কুরআনে মারইয়ামের কথা বর্ণনা করার নির্দেশ প্রদান করেছেন।
انْتَبَذَتْ এর আসল অর্থ: দূরে নিক্ষেপ করা। انتباذ এর অর্থ লোকালয় থেকে নিরালায় চলে আসা। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতের উদ্দেশ্যে পরিবার ও লোকালয় থেকে আলাদা হয়ে বায়তুল মুকাদদাসের পূর্ব দিকে পর্দা টাঙ্গিয়ে নিরালায় অবস্থান নিলেন।
এমন সময় আল্লাহ জিবরীল (عليه السلام)-কে পূর্ণাঙ্গ মানবাকৃতিতে প্রেরণ করলেন। سَوِيًّا অর্থ পূর্ণাঙ্গ একজন পুরুষ, যিনি সুন্দর ও উত্তম অবয়বের অধিকারী। মারইয়াম (عليه السلام) তাকে মানুষ মনে করে ভয় পেয়ে গেলেন, হয়তো কোন অসৎ উদ্দেশ্যে এখানে আগমন করেছে, তাই তিনি বললেন: তুমি যদি আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় কর তাহলে আমি তোমার থেকে করুণাময় আল্লাহ তা‘আলার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। জিবরীল (عليه السلام) বললেন: আপনি যা মনে করেছেন তা নয়, আমি আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে প্রেরিত একজন দূত। আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে আপনাকে একটি পূতপবিত্র পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দান করার জন্য।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(إِنَّ اللّٰهَ يُبَشِّرُكِ بِكَلِمَةٍ مِّنْهُ ق لا اسْمُهُ الْمَسِيْحُ عِيْسَي ابْنُ مَرْيَمَ وَجِيْهًا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَمِنَ الْمُقَرَّبِيْنَ )
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তার পক্ষ থেকে এক কালিমার সুসংবাদ দিচ্ছেন, তার নাম হল মাসীহ, ঈসা ইবনু মারইয়াম। তিনি দুনিয়া এবং আখিরাতে সম্মানিত এবং নৈকট্যপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত।” (সূরা আলি-ইমরান ৩:৪৫)
মারইয়াম বললেন, কিভাবে আমার সন্তান হবে? অথচ কোন পুরুষ আমাকে স্পর্শ (বৈধ উপায়ে সহবাস) করেনি এবং আমি ব্যভিচারিণীও নই। জিবরীল (عليه السلام) বললেন: এভাবেই হবে। অর্থাৎ যদিও গর্ভ ধারণের জন্য পুরুষের সাথে মিলন হওয়া আবশ্যক, তবুও এভাবে হবে। আপনার পালনকর্তা বলেছেন, এটা আমার জন্য সহজ ব্যাপার।
পৃথিবীর মানুষকে চার পদ্ধতিতে সৃষ্টি করা হয়েছে: ১. পিতা-মাতা ছাড়া, যেমন আদম (عليه السلام), ২. শুধু পুরুষ হতে যেমন হাওয়া (عليه السلام)-কে আদম থেকে, ৩. ঈসা (عليه السلام)-কে মা থেকে পিতা ছাড়া এবং ৪. পিতা-মাতার মাধ্যমে বাকী আদম সন্তান।
(اٰيَةً لِّلنَّاسِ)
অর্থাৎ ঈসা (عليه السلام)-কে মানুষের একটি নিদর্শন বানাবেন যা আল্লাহ তা‘আলার কুদরতের ওপর প্রমাণ বহন করে। যেমন সূরা আম্বিয়ার ৯১ নং আয়াতে বলা হয়েছে।
অতঃপর মারইয়াম গর্ভে সন্তান ধারণ করল এবং তৎসহ একটি দূরবর্তী স্থানে চলে গেল। এমতাবস্থায় প্রসব বেদনা তাকে একটি খেজুর বৃক্ষের মূলে আশ্রয় নিতে বাধ্য করল। তখন তিনি বললেন: হায়! আমি যদি এর আগেই মারা যেতাম এবং আমি যদি মানুষের স্মৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে যেতাম। কেননা মানুষ সন্তান সম্পর্কে প্রশ্ন করলে কী জবাব দেব? সবাই জানে আমি বিবাহিতা নই, আমি একজন ইবাদতকারিণী, তাহলে সন্তান জন্ম নিল কিভাবে?
(نَسْيًا مَّنْسِيًّا)
অর্থ মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যাওয়া, অর্থাৎ আমি মারইয়াম নামে দুনিয়াতে কোন নারী ছিলাম তা যদি মানুষের স্মৃতিপট থেকে মুছে যেতাম। এমন সময় ফেরেশতা তাকে নিম্নদেশ থেকে আওয়াজ দিয়ে বলল, তুমি দুঃখ কর না। তোমার পালনকর্তা তোমার পাদদেশে একটি ঝর্ণাধারা সৃষ্টি করেছেন।
سَرِيًّا অর্থ ছোট নদী বা ঝরনা। رُطَبًا جَنِيًّا অর্থ সিক্ত পরিপক্ক খেজুর। অর্থাৎ পায়ের নিচে ঝরনা দিলেন, খেজুর গাছে নাড়া দিলে সিক্ত পরিপক্ক খেজুর পড়ে যাবে, এসব কিছু মু’জিযাহ বা কারামতস্বরূপ দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বললেন: খাও, পান কর আর সন্তান দেখে চোখ জুড়াও।
আর যদি কোন মানুষকে তুমি দেখ, তবে তাকে বলে দিয়ো যে, আমি দয়াময় আল্লাহ তা‘আলার জন্য সিয়াম পালনের মানত করেছি। সুতরাং আমি আজ কারো সাথে কোন কথাই বলব না।
অতঃপর মারইয়াম (عليه السلام) সন্তান প্রসবের পর শারীরিক সুস্থতা ফিরে আসলে সন্তানকে নিয়ে সম্প্রদায়ের কাছে আসলেন। তারা বলল: হে মারইয়াম! তুমি তো এক অদ্ভূত কাণ্ড করে বসেছ। হে হারূনের বোন! তোমার পিতা কোন অসৎ ব্যক্তি ছিলেন না কিংবা তোমার মাতাও কোন ব্যভিচারিণী মহিলা ছিলেন না। সম্প্রদায়ের এ ধরণের কথা শুনে মারইয়াম তার সন্তানের দিকে ইঙ্গিত করল যে, এসব কথার জবাব সে দেবে। তারা বলল: এ কোলের শিশুর সাথে আমরা কেমন করে কথা বলব?
(أُخْتَ هٰرُوْنَ)
এখানে হারূন বলতে মূসা (عليه السلام) এর ভাই হারূন নয়, বরং হারুন বলতে বানী ইসরাঈলের কোন একজন সৎ ব্যক্তি, মারইয়াম তার সহোদর বোন ছিলেন। (আযওয়ারুল বায়ান)
ঈসা (عليه السلام) তখন বলে উঠল, আমি আল্লাহ তা‘আলার দাস। তিনি আমাকে কিতাব প্রদান করেছেন এবং আমাকে নাবী করেছেন। আমি যেখানেই থাকি না কেন তিনি আমাকে জোরালো নির্দেশ প্রদান করেছেন যতদিন আমি জীবিত থাকি ততদিন সালাত ও যাকাত আদায় করার জন্য এবং আমার মায়ের অনুগত থাকতে। আল্লাহ তা‘আলা আমাকে উদ্ধত ও হতভাগা করেননি। আমার প্রতি শান্তি ও শয়তানের সকল অনিষ্ট থেকে মুক্ত যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি আর যেদিন আমি মৃত্যুবরণ করব এবং যেদিন আমাকে জীবিত অবস্থায় পুনরুত্থিত করা হবে। এটাই হল মারইয়াম পুত্র ঈসা (عليه السلام), আর এটাই হল সত্য কথা (যা উপরে বর্ণনা করা হয়েছে) যে বিষয়ে লোকেরা বিতর্ক করে থাকে।
আল্লাহ তা‘আলা এমন নন যে, তিনি সন্তান গ্রহণ করবেন (যেমন খ্রিস্টানরা বলে থাকে ঈসা আল্লাহ তা‘আলার পুত্র) তিনি এ ব্যাপারে মহান, পবিত্র।
আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(یٰٓاَھْلَ الْکِتٰبِ لَا تَغْلُوْا فِیْ دِیْنِکُمْ وَلَا تَقُوْلُوْا عَلَی اللہِ اِلَّا الْحَقَّﺚ اِنَّمَا الْمَسِیْحُ عِیْسَی ابْنُ مَرْیَمَ رَسُوْلُ اللہِ وَکَلِمَتُھ۫ﺆ اَلْقٰٿھَآ اِلٰی مَرْیَمَ وَرُوْحٌ مِّنْھُﺑ فَاٰمِنُوْا بِاللہِ وَرُسُلِھ۪ﺤ وَلَا تَقُوْلُوْا ثَلٰثَةٌﺚ اِنْتَھُوْا خَیْرًا لَّکُمْﺚ اِنَّمَا اللہُ اِلٰھٌ وَّاحِدٌﺚ سُبْحٰنَھ۫ٓ اَنْ یَّکُوْنَ لَھ۫ وَلَدٌ)
“মারইয়ামের ছেলে ‘ঈসা মসীহ তো আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর বাণী, যা তিনি মারইয়ামের নিকট প্রেরণ করেছিলেন ও তাঁর আদেশ। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণে ঈমান আন এবং বল না, ‘তিন!’ (তিনজন ইলাহ) নিবৃত্ত হও, এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর হবে। আল্লাহ তো একমাত্র ইলাহ; তাঁর সন্তান হবে তিনি এটা হতে পবিত্র।” (সূরা নিসা ৪:১৭১)
আর তিনি যে সকল কার্যকলাপ করেন তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তিনি এমন উপাস্য যখন তিনি কোন কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তখন বলেন, হও! এবং তা হয়ে যায়। যেমন পিতা ছাড়া ঈসা (عليه السلام)-এর জন্ম, সুতরাং সন্দেহ পোষণ করার কোন কিছুই নেই।
সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা কোন সন্তান-সন্ততি ও স্ত্রী-পরিজন গ্রহণ করা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। ঈসা (عليه السلام) আরো বললেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা আমার পালনকর্তা ও তোমাদের পালনকর্তা। অতএব তোমরা তাঁর ইবাদত কর। আর এটাই হল সরল-সঠিক পথ। ঈসা (عليه السلام)-এর এ সকল কথা শুনেও একশ্রেণির লোকের বিশ্বাস হল না।
(فَاخْتَلَفَ الْأَحْزَابُ)
অর্থাৎ ইয়াহূদীরা ঈসা (عليه السلام)-এর ব্যাপারে বিভিন্ন দলে ও মতে বিভক্ত হয়ে গেল; কেউ বাড়াবাড়ি করে বলল: তিনিই আল্লাহ, কেউ বলল: তিনি আল্লাহ তা‘আলার সন্তান, কেউ বলল: তিনি তিনজনের একজন (আল্লাহ, মারইয়াম ও ঈসা)। কেউ নাবী বলে আখ্যায়িত করে না, বরং বলে থাকে: তিনি জারজ সন্তান যেমন ইয়াহূদীরা। সব কথাই বাতিল, যারাই এসব কথা বলে তারাই কুফরী করেছে। এভাবে তাদের মধ্যকার বিভিন্ন দল বিভিন্ন মত ও পথে বিভক্ত হয়ে গেল। সুতরাং কিয়ামত দিবসে তাদের জন্য থাকবে ধ্বংস ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। যেমন সূরা যুখরুফের ৬৩-৬৫ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে।
তাদের দলে দলে বিভক্ত হওয়ার ফলে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে তিরস্কার করণার্থে বলেন দুনিয়াতে তারা সত্য কথা না শুনলেও, না দেখলেও কিয়ামতের দিন তারা চমৎকারভাবে শুনবে ও দেখবে, যেদিন তারা সবাই আমার নিকট আগমন করবে। আর তারা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছে।
আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: কিয়ামত দিবসে মৃত্যুকে একটি ধূসর রঙের মেষের আকারে আনা হবে। তখন একজন সম্বোধনকারী ডাক দিয়ে বলবেন: হে জান্নাতবাসী! তখন তারা ঘাড়-মাথা উঁচু করে দেখতে থাকবে। আহ্বানকারী বলবেন: তোমরা কি একে চিন? তারা বলবে: হ্যাঁ, এ হল মৃত্যু। কেননা সকলেই তাকে দেখেছে। তারপর সম্বোধনকারী আবার ডাক দিয়ে বলবেন: হে জাহান্নামবাসী! জাহান্নামীরা মাথা উঁচু করে দেখতে থাকবে, তখন আহ্বানকারী বলবেন: তোমরা কি একে চিন? তারা বলবে: হ্যাঁ, এ তো মৃত্যু। কেননা তারা সকলেই তাকে দেখেছে। তারপর (সেটিকে) জবেহ করা হবে। আর ঘোষক বলবেন: হে জান্নাতবাসী! স্থায়ীভাবে এখানে থাক। তোমাদের মৃত্যু নেই। আর হে জাহান্নামবাসী চিরদিন এখানে থাক। তোমাদেরও মৃত্যু নেই। এরপর রাসূলুল্লাহ পাঠ করলেন: “তাদেরকে সতর্ক করে দাও পরিতাপের দিবস সম্বন্ধে, যখন সকল সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে। এখন তারা গাফিল এবং তারা বিশ্বাস করে না।”
সুতরাং আমাদের উচিত সত্যকে সত্য বলে মেনে নেয়া আর মিথ্যাকে বর্জন করা। কারণ আমাদের সকলকেই একদিন আল্লাহ তা‘আলার নিকট ফিরে যেতে হবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. সকল ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলারই হাতে।
২. আল্লাহ তা‘আলা ইচ্ছা করলে পিতা ছাড়াও সন্তান দান করতে পারেন।
৩. আল্লাহ তা‘আলা কোন স্ত্রী-পুত্র, পরিজন গ্রহণ করা থেকে পূতপবিত্র।
৪. আল্লাহ তা‘আলা চাইলে কোলের শিশুকেও কথা বলাতে পারেন। যেমন ঈসা (عليه السلام)।
৫. ঈসা (عليه السلام) ছিলেন বরকতস্বরূপ।
৬. সকলকে আল্লাহ তা‘আলার নিকট ফিরে যেতে হবে।
৭. ফেরেশতা মানবাকৃতি ধারণ করতে পারেন।
৮. মানুষের রিযিক নির্ধারণ করা থাকলেও তা অন্বেষণ করে নিতে হবে, যেমন মারইয়াম (عليه السلام)-কে নির্দেশ দেয়া হলো।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ২৭-৩৩ নং আয়াতের তাফসীর:
হযরত মারইয়াম (আঃ) আল্লাহ তাআলার এই হুকুমও মেনে নেন এবং নিজের শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে জনগণের নিকট হাজির হন। তাঁকে ঐ অবস্থায় দেখা মাত্রই প্রত্যেকে সঁতে আঙ্গুল কাটে এবং সবারই মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়েঃ “মারইয়াম (আঃ)! তুমি তো বড়ই মন্দ কাজ করেছো!” নাউফ বাকারী (রঃ) বলেন যে, লোকেরা হযরত মারইয়ামকে (আঃ) খোজে বের হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তাআলার কি মাহাত্ম যে, তারা কোথাও তাকে খুঁজে পায় নাই। পথে একজন রাখালের সাথে তাদের সাক্ষাৎ হলে তারা তাকে জিজ্ঞেস করেঃ “এরূপ এরূপ ধরণের কোন স্ত্রী লোককে এই জঙ্গলের কোন জায়গায় দেখেছো কি?” উত্তরে সে বলেঃ “না তো। তবে রাত্রে আমি এক বিস্ময়কর দৃশ্য দেখেছি। আমার এই সব গরু এই উপত্যকার দিকে সিজদায় পড়ে গিয়েছিল। ইতিপূর্বে আমি কখনো এরূপ দেখি নাই। আমি স্বচক্ষে ঐদিকে এক নূর (জ্যোতি) দেখেছি।” লোকগুলি ঐ নিশানা ধরে চলতে শুরু করে। এমতাবস্থায় তারা হযরত মারইয়ামকে (আঃ) দেখতে পায় যে, তিনি সন্তানকে কোলে করে এগিয়ে আসছেন। লোকগুলিকে দেখে সেখানেই তিনি সন্তানকে কোলে নিয়ে বসে পড়েন। তারা সবাই তাকে ঘিরে ফেলে এবং বলতে থাকেঃ “হে মারইয়াম (আঃ)! তুমি তো এক অদ্ভুত কাণ্ড করে বসেছে। তারা তাকে হারূণের ভগ্নী বলে সম্বোধন করার কারণ এই যে, তিনি হযরত হারূণের (আঃ) বংশেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। অথবা হয়তো তাঁর পরিবারের মধ্যে হারূণ নামক একজন সৎ লোক ছিলেন এবং তিনি ইবাদত বন্দেগী ও আধ্যাত্মিক সাধনায় তাকেই অনুসরণ করছিলেন। এজন্যেই তাকে হারূণের ভগ্নী বলা হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, হারূণ নামক একজন দুষ্ট লোক ছিল। এজন্যে লোকেরা উপহাস করে তাকে হারূণের বোন বলেছিল। এসব উক্তি হতে সবচেয়ে বেশী গারীব উক্তি হলো এই যে, তিনি হযরত হারূণের (আঃ) ও হযরত মূসার (আঃ) সহদরা ভগ্নী ছিলেন, যাকে হযরত মূসার (আঃ) মাতা হযরত মূসাকে বাক্সে ভরে সমুদ্রে নিক্ষেপ করার সময় বলেছিলেনঃ “তুমি এই বাক্সের পিছনে পিছনে সমুদ্রের ধার দিয়ে এমনভাবে চলবে যে, কেউ যেন বুঝতেই না পারে। কিন্তু এই উক্তিটি একেবারে ভুল ও ভিত্তিহীন। কেননা, কুরআন কারীম দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, হযরত ঈসা (আঃ) বাণী ইসরাঈলের শেষ নবী ছিলেন। তার পরে শুধু খাতামুল আম্বিয়া হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সঃ) নবী হন। আর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “আমিই হযরত ঈসা ইবনু মারইয়ামের (আঃ) সবচেয়ে বেশী নিকটবর্তী কেননা, আমার ও তার মাঝে অন্য কোন নবীর আবির্ভাব হয় নাই।` (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)
সুতরাং যদি মুহাম্মদ ইবনু কা'ব কারাযীর (রঃ) উক্তি সঠিক হয় যে, হযরত ঈসার (আঃ) মাতা হযরত মারইয়াম (আঃ) হারূণের (আঃ) ভগ্নী ছিলেন, তবে এটা মানতে হবে যে, তিনি হযরত দাউদ (আঃ) ও হযরত সুলাইমানের (আঃ) পূর্বে বিদ্যমান ছিলেন। কেননা, কুরআন কারীমে বিদ্যমান রয়েছে যে, হযরত দাউদ (আঃ) হযরত মূসার (আঃ) পরে এসেছেন। আয়াত গুলি হলোঃ (আরবী) (২:২৪৬)।
এই আয়াতগুলিতে হযরত দাউদের (আঃ) ঘটনা এবং তাঁর জাতকে হত্যা করার বর্ণনা রয়েছে। আর এতে এই শব্দ বিদ্যমান রয়েছে যে, এটা হযরত মূসার (আঃ) পরের ঘটনা। তিনি যে ভুল বুঝেছেন তার কারণ এই যে, তাওরাতে আছেঃ যখন হযরত মূসা (আঃ) বাণী ইসরাঈলসহ সমুদ্র অতিক্রম করেন এবং ফিরাউন তার কওমসহ পানিতে নিমজ্জিত হয়, তখন মারইয়াম বিনতে ইমরান, যিনি হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত হারূণের (আঃ) ভগ্নী ছিলেন, অন্যান্য স্ত্রীলোকসহ দ (এক প্রকার বাদ্য যন্ত্র) বাজিয়ে আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করতঃ তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাওরাতের এই ইবারত থেকেই কারাযী (রঃ) মনে করে নিয়েছেন যে, ঐ মারইয়ামই হযরত ঈসার (আঃ) মাতা ছিলেন। অথচ এটা সম্পূর্ণ ভুল। হতে পারে যে, হযরত মূসার (আঃ) বোনের নামও মারইয়াম ছিল কিন্তু ঐ মারইয়াম যে ঈসার (আঃ) মাতা ছিলেন এর কোন প্রমাণ নেই, বরং এটা অস। হতে পারে যে, দুজনের একই নাম। একজনের নামে অন্যের নাম রাখা হয়ে থাকে। বাণী ইসরাঈলের তো এটা অভ্যাসই ছিল যে, তারা তাদের নবী ও ওয়ালীদের নামে নিজেদের নাম রাখতো।
হযরত মুগীরা ইবনু শু'বা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাকে নাজরানে প্রেরণ করেন। সেখানে আমাকে খৃস্টানরা জিজ্ঞেস করেঃ “তোমরা (আরবী) পড়ে থাকো। অথচ হযরত মূসা (আঃ) তে। হযরত ঈসার (আঃ) বহু পূর্বে অতীত হয়েছেন?” ঐ সময় আমি তাদের এই প্রশ্নের কোন জবাব দিতে পারলাম না। মদীনায় ফিরে এসে আমি রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সামনে ওটা বর্ণনা করলাম। তিনি বলেনঃ “তুমি তো তাদেরকে ঐ সময়েই এ উত্তর দিতে পারতে যে, ঐ লোকেরা তাদের পূর্ববর্তী নবী ও সৎ লোকদের নামে তাদের সন্তানদের নাম বরাবরই রেখে আসতো।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে। সহীহ মুসলিমেও এটা রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন।)
বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত কা'ব (রাঃ) বলেছিলেনঃ “এই হারূণ হযরত মূসার (আঃ) ভাই হারূণ (আঃ) নন।` উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত কাবের (রাঃ) একথা অস্বীকার করেন। তখন হযরত কা'ব (রাঃ) তাকে বলেনঃ “যদি আপনি রাসুলুল্লাহ (সাঃ) হতে কিছু শুনে থাকেন, তবে আমি তা মানতে সম্মত আছি। অন্যথায় ইতিহাসের সাক্ষ্য হিসেবে তো তাদের মাঝে ছয় শ বছরের ব্যবধান রয়েছে। তাঁর একথা শুনে হযরত আয়েশা (রাঃ) নীরব হয়ে যান। (এই ইতিহাসের ব্যাপারে কিছু চিন্তা বিবেচনার অবকাশ রয়েছে)
হযতর কাতাদা (রঃ) বলেন যে, হযরত মারইয়ামের (আঃ) পরিবার ও বংশের লোক উপরের স্তর হতেই সৎ ও দ্বীনদার ছিলেন এবং এই দ্বীনদারী যেন বরাবরই উত্তরাধিকার সূত্রে চলে আসছিল। কতকগুলি লোক এরূপই। হয়ে থাকেন। আবার কতক পরিবার ও বংশ এর বিপরীতও হয় যে, উপরের স্তর থেকে নীচের স্তর পর্যন্ত সবাই খারাপ হয়। এই হারূণ বড়ই বুযুর্গ লোক ছিলেন। এই কারণেই বাণী ইসরাঈলের মধ্যে হারূণ নাম রাখার সাধারণভাবে প্রচলন হয়ে যায়। এমন কি বর্ণিত আছে যে, যেই দিন এই হারূণের জানাযা বের হয় সেই দিন তার জানাযায় ঐ হারূণ নামেরই চল্লিশ হাজার লোক শরীক হয়েছিল।
হযরত মারইয়ামের (আঃ) কওম তাকে তিরস্কারের সুরে বলেঃ “কি করে তুমি এরূপ অসৎ কাজ করলে? তুমি তো ভাল ঘরের মেয়ে! তোমার পিতামাতা উভয়েই ভাল ছিলেন। তোমার পরিবারের সমস্ত লোকই পবিত্র। এতদসত্ত্বেও কি করে তুমি একাজ করতে পারলে?” কওমের এই ভৎসনা মূলক কথা শুনে হযরত মারইয়াম (আঃ) নির্দেশ অনুযায়ী তার শিশু সন্তানের দিকে ইশারা করেন। তারা তার মর্যাদা স্বীকার করে নাই বলে তাকে অন্যায়ভাবে অনেক কিছু বললো। তারা বললোঃ “তুমি কি আমাদেরকে পাগল পেয়েছে। যে, আমরা তোমার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে তোমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবো? সে আমাদেরকে কি বলবে?” ইতিমধ্যেই হযরত ঈসা (আঃ) মায়ের কোল থেকেই বলে উঠলেনঃ “হে লোক সকল! আমি আল্লাহর একজন দাস।`
হযরত ঈসার (আঃ) প্রথম উক্তি ছিল এটাই। তিনি মহান আল্লাহর পবিত্রতা ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করলেন এবং নিজের দাসত্বের কথা ঘোষণা করলেন। তিনি আল্লাহ তাআলার ‘যাত বা সত্তাকে সন্তান জন্মদান হতে পবিত্র বলে ঘোষণা দিলেন, এমনকি তা সাব্যস্ত করে দিলেন। কেননা, সন্তান দাস হয় না। অতঃপর তিনি বললেনঃ “আল্লাহ আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী করেছেন। এতে তিনি তাঁর মাতার দোষমুক্তির বর্ণনা দিয়েছেন এবং দলীলও বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেনঃ “আমাকে আল্লাহ তাআলা নবী করেছেন এবং কিতাব দান করেছেন।`
বর্ণিত আছে যে, যখন ঐ লোকগুলি হযরত মারইয়াম (আঃ) কে তিরস্কার করছিল ঐ সময় হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর দুধ পান করছিলেন। তাদের ঐ তিরস্কার বাণী শুনে তিনি স্তন থেকে মুখ টেনে নেন এবং বাম পার্শ্বে ফিরে তাদের দিকে মুখ করে এই উত্তর দেন। কথিত আছে যে, এই উক্তির সময় তার অঙ্গলী উখিত ছিল এবং হাত কাধ পর্যন্ত উঁচু ছিল। ইকরামা (রঃ) বলেন যে, আমাকে কিতাব দিয়েছেন তার এই উক্তির ভাবার্থ হচ্ছেঃ আমাকে কিতাব দেয়ার ইচ্ছা করেছেন। এটা পূর্ণ হবেই। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন যে, জন্ম গ্রহণের সময়েই হযরত ঈসার (আঃ) সব কিছু মুখস্থ ছিল এবং তাকে সব কিছু শিখিয়েই সৃষ্টি করা হয়েছিল। (কিন্তু এই উক্তিটির সনদ ঠিক নয়) হযরত ঈসা (আঃ) আরো বলেনঃ “যেখানেই আমি থাকি না কেন, তিনি (আল্লাহ) আমাকে আশিস ভজিন করেছেন। আমি মানুষকে কল্যাণের কথা শিক্ষা দেবে এবং তারা আমার দ্বারা উপকৃত হবে।`
বানূ মাখযুম গোত্রের গোলাম অহাব ইবনু অরূদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন আলেম তার চেয়ে বড় একজন আলেমের সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আল্লাহ আপনার উপর দয়া করুন! বলুন তো, আমার কোন আমল আমি ঘোষণা বা প্রচার করতে পারি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ। কেননা, এটাই হচ্ছে আল্লাহর দ্বীন যা সহ তিনি তাঁর নবীদেরকে তার বান্দাদের নিকট পাঠিয়েছিলেন। সমস্ত ধর্মশাস্ত্রবিদ এ বিষয়ে একমত যে, হযরত ঈসার (আঃ) এই সাধারণ বরকত দ্বারা ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধকেই বুঝানো হয়েছে। তিনি যেখানেই আসতেন, যেতেন, উঠতেন ও বসতেন সেখানেই তার একাজ তিনি চালু রাখতেন। আল্লাহর কথা মানুষের কাছে পৌঁছিয়ে দিতে তিনি কখনো কার্পণ্য করতেন না।
হযরত ঈসা (আঃ) আরো বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, যতদিন আমি জীবিত থাকবে, ততদিন যেন নামায পড়ি ও যাকাত প্রদান করি। আমাদের নবীকেও (সঃ) এই নির্দেশই দেয়া হয়েছিল। তার ব্যাপারে ইরশাদ হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “মৃত্যু পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদতে লেগে থাকো।” (১৫:৯৯) সুতরাং হযরত ঈসাও (আঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এ দুটি কাজ আমার উপর ফরয করে দিয়েছেন। এর দ্বারা তকদীর সাব্যস্ত হয় এবং যারা তকদীরকে অস্বীকার করে তাদের দাবী খণ্ডন করা হয়ে যায়।
অতঃপর তিনি বলেনঃ আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের সাথে সাথে আমাকে এ হুকুমও দেয়া হয়েছে যে, আমি যেন আমার মাতার প্রতি অনুগত থাকি। কুরআন কারীমে এ দুটি বর্ণনা প্রায়ই একই সাথে দেয়া হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন, তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত না করতে ও পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে।” (১৭:২৩) অন্য এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো আমার ও তোমার পিতা-মাতার।” (৩১:১৪)
তিনি বলেনঃ তিনি (আল্লাহ) আমাকে উদ্ধত ও হতভাগ্য করেন নাই। আল্লাহ তাআলা আমাকে এমন উদ্ধত করেন নাই যে, আমি তার ইবাদত এবং আমার মাতার আনুগত্যের ব্যাপারে অহংকার করি এবং হতভাগ্য হয়ে যাই। সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, (আরবী) ও (আরবী) হলো ঐ ব্যক্তি যে ক্রোধের সময় কাউকেও হত্যা করে ফেলে। পূর্ব যুগীয় কোন কোন মনীষী বলেছেন যে, পিতা-মাতার অবাধ্য সেই হয়, যে উদ্ধত ও হতভাগ্য হয়। দুশ্চরিত্র সেই হয়, যে গর্ব ও অহংকার করে।
বর্ণিত আছে যে, একটি স্ত্রী লোক হযরত ঈসার (আঃ) মু'জিযাগুলি দেখে তাঁকে বলেঃ “ঐ পেট কতই না বরকতময়, যে পেট আপনাকে বহন করেছে এবং ঐ সন্তান কতইনা কল্যাণময়, যে আপনাকে দুধ পান করিয়েছে। তার একথার জবাবে হযরত ঈসা (আঃ) বলেনঃ “ঐ ব্যক্তির জন্যে সুসংবাদ, যে আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, অতঃপর ওর অনুসরণ করে এবং উদ্ধত ও হতভাগ্য হয় না।”
এরপর হযরত ঈসা (আঃ) বলেন, আমার প্রতি ছিল শান্তি যেদিন আমি জন্ম লাভ করেছি ও শান্তি থাকবে যে দিন আমার মৃত্যু হবে এবং যেদিন জীবিত অবস্থায় আমি পুনরুত্থিত হবে। এর দ্বারাও হযরত ঈসার (আঃ) দাসত্ব এবং সমস্ত মাখলুকের মত তিনিও যে আল্লাহর এক মাখলুক, এটা প্রমাণিত হচ্ছে। সমস্ত মানুষ যেমন অস্তিত্বহীনতা হতে অস্তিত্বে এসেছে, অনুরূপ ভাবে তিনিও অস্তুিতহীনতা হতে অস্তিত্বে এসেছেন। অতঃপর তিনি মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবেন। অতঃপর কিয়ামতের দিন জীবিত অবস্থায় পুনরুতিও হবেন। তবে এই তিনটি অবস্থা অত্যন্ত কঠিন হওয়া সত্ত্বেও তাঁর জন্যে এটা সহজ হয়ে যাবে। তার মধ্যে কোন উদ্বেগ ও ভয়-ভীতি থাকবে না; বরং তিনি পূর্ণভাবে শান্তি লাভ করবেন। তার উপর আল্লাহর দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।