সূরা আল-কাহফ (আয়াত: 83)
হরকত ছাড়া:
ويسألونك عن ذي القرنين قل سأتلو عليكم منه ذكرا ﴿٨٣﴾
হরকত সহ:
وَ یَسْـَٔلُوْنَکَ عَنْ ذِی الْقَرْنَیْنِ ؕ قُلْ سَاَتْلُوْا عَلَیْکُمْ مِّنْهُ ذِکْرًا ﴿ؕ۸۳﴾
উচ্চারণ: ওয়া ইয়াছআলূনাকা আন যিল কারনাইনি কুল ছাআতলূ‘আলাইকুম মিনহু যিকরা-।
আল বায়ান: আর তারা তোমাকে যুলকারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছে। বল, ‘আমি এখন তার সম্পর্কে তোমাদের নিকট বর্ণনা দিচ্ছি’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৮৩. আর তারা আপনাকে যুল-কারনাইন সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে।(১) বলুন, অচিরেই আমি তোমাদের কাছে তার বিষয় বর্ণনা করব।
তাইসীরুল ক্বুরআন: তোমাকে তারা যুলকারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে। বল, ‘আমি তার বিষয় তোমাদের নিকট কিছু বর্ণনা করব।’
আহসানুল বায়ান: (৮৩) আর তারা তোমাকে যুলকারনাইন সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে; [1] তুমি বলে দাও, ‘আমি তোমাদের নিকট তার বিষয়ে বর্ণনা করব।’
মুজিবুর রহমান: তারা তোমাকে যুলকারনাইন সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করছে; তুমি বলে দাওঃ আমি তোমাদের নিকট তার বিষয় বর্ণনা করব।
ফযলুর রহমান: তারা তোমাকে যুল-কারনাইন সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে। বল, “আমি তোমাদেরকে তার কিছু বিবরণ শোনাব।”
মুহিউদ্দিন খান: তারা আপনাকে যুলকারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুনঃ আমি তোমাদের কাছে তাঁর কিছু অবস্থা বর্ণনা করব।
জহুরুল হক: আর তারা তোমাকে যুল্ক্কারনাইন সন্বন্ধে জিজ্ঞাসা করছে। বলো -- "আমি এখনি তোমাদের কাছে তাঁর সন্বন্ধে কাহিনী বর্ণনা করব।"
Sahih International: And they ask you, [O Muhammad], about Dhul-Qarnayn. Say, "I will recite to you about him a report."
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৮৩. আর তারা আপনাকে যুল-কারনাইন সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে।(১) বলুন, অচিরেই আমি তোমাদের কাছে তার বিষয় বর্ণনা করব।
তাফসীর:
(১) যুলকারনাইন কে ছিলেন, কোন যুগে ও কোন দেশে ছিলেন এবং তার নাম যুলকারনাইন হল কেনঃ যুলকারনাইন নামকরণের হেতু সম্পর্কে বহু উক্তি ও তীব্র মতভেদ পরিদৃষ্ট হয়। কেউ বলেনঃ তার মাথার চুলে দুটি গুচ্ছ ছিল। তাই যুলকারনাইন (দুই গুচ্ছওয়ালা) আখ্যায়িত হয়েছেন। কেউ বলেনঃ পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যদেশসমূহ জয় করার কারণে যুলকারনাইন খেতাবে ভূষিত হয়েছেন। কেউ এমনও বলেছেন যে, তার মাথায় শিং-এর অনুরূপ দুটি চিহ্ন ছিল। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, তার মাথার দুই দিকে দুটি ক্ষতচিহ্ন ছিল। [ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর]
তবে আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত রয়েছে যে, তিনি বলেছেনঃ যুলকারনাইন নবী বা ফিরিশতা ছিলেন না, একজন নেক বান্দা ছিলেন। আল্লাহকে তিনি ভালবেসেছিলেন, আল্লাহও তাকে ভালবেসেছিলেন। আল্লাহর হকের ব্যাপারে অতিশয় সাবধানী ছিলেন, আল্লাহও তার কল্যাণ চেয়েছেন। তাকে তার জাতির কাছে পাঠানো হয়েছিল। তারা তার কপালে মারতে মারতে তাকে হত্যা করল। আল্লাহ তাকে আবার জীবিত করলেন, এজন্য তার নাম হল যুলকারনাইন। [মুখতারাঃ ৫৫৫, ফাত্হুল বারীঃ ৬/৩৮৩]
যুলকারনাইনের ঘটনা সম্পর্কে কুরআনুল করীম যা বর্ণনা করেছে, তা এইঃ তিনি একজন সৎ ও ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ ছিলেন এবং পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যদেশসমূহ জয় করেছিলেন। এসব দেশে তিনি সুবিচার ও ইনসাফের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তাকে লক্ষ্য অর্জনের জন্য সর্বপ্রকার সাজ-সরঞ্জাম দান করা হয়েছিল। তিনি দিগ্বিজয়ে বের হয়ে পৃথিবীর তিন প্রান্তে পৌছেছিলেন- পাশ্চাত্যের শেষ প্রান্তে, প্রাচ্যের শেষ প্রান্তে এবং উত্তরে উভয় পর্বতমালার পাদদেশ পর্যন্ত। এখানেই তিনি দুই পর্বতের মধ্যবর্তী গিরিপথকে একটি থেকে এলাকার জনগণ নিরাপদ হয়ে যায়।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৮৩) আর তারা তোমাকে যুলকারনাইন সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে; [1] তুমি বলে দাও, ‘আমি তোমাদের নিকট তার বিষয়ে বর্ণনা করব।’
তাফসীর:
[1] ইয়াহুদীদের কথামত মুশরিকরা যে তিনটি প্রশ্ন নবী (সাঃ)-কে করেছিল তার মধ্যে এটি তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর। যুলক্বারনাইন এর শাব্দিক অর্থ হল দুই শিংবিশিষ্ট। আর তাঁর নামকরণের কারণঃ যেহেতু তাঁর মাথায় বাস্তবেই দুটি শিং ছিল। কিংবা কারণ এই যে, তিনি পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে পৌঁছে সূর্যের (উদয়-অস্তের সময় তার) শিং বা কিরণ প্রত্যক্ষ করেছিলেন। কেউ কেউ বলেন, তাঁর মাথায় শিঙের মত চুলের দুটি ঝুঁটি ছিল। পূর্ববর্তী মুফাসসিরগণের মতানুসারে তিনি হলেন রোমের আলেকজান্ডার, যাঁর রাজত্ব ছিল পূর্ব-পশ্চিম বিস্তৃত। কিন্তু আধুনিক যুগের মুফাসসিরগণ অভিনব ঐতিহাসিক তত্তের আলোকেই তাঁদের সাথে একমত নন। বিশেষ করে মওলানা আবুল কালাম আজাদ যিনি যুলক্বারনাইনের স্বরূপ ও প্রকৃতত্ব উদ্ঘাটনের জন্য যে গবেষণা করেছেন তা প্রশংসাযোগ্য।
তার গবেষণার সারমর্ম হলঃ
(ক) যুলক্বারনাইন সম্বন্ধে কুরআন পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, তিনি এমন এক বাদশাহ ছিলেন যাকে আল্লাহ প্রচুর পার্থিব উপকরণ ও উপাদান দান করেছিলেন। (খ) পূর্ব ও পশ্চিমের দেশসমূহকে জয় করে এমন এক পাহাড়ী রাস্তায় পৌছলেন যার অন্য দিকে য়্যা’জূজ-মা’জূজ জাতি বাস করে। (গ) সেখানে তিনি য়্যা’জূজ-মা’জুজের রাস্তা বন্ধ করার জন্য একটি মজবুত প্রাচীর নির্মাণ করেন। (ঘ) তিনি ন্যায়পরায়ণ, আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী সম্রাট ছিলেন। (ঙ) তিনি প্রবৃত্তিপূজারী ও ধন-সম্পদের লোভী ছিলেন না। মওলানা আজাদ বলেন, এই সমস্ত গুণের অধিকারী একমাত্র পারস্যের সেই সম্রাট যাকে ইউনানী (গ্রীস) ভাষায় সাইরাস, ইবরানী (হিব্রু) ভাষায় খুরাস এবং আরবী ভাষায় কাইখাসরু নামে অভিহিত করা হয়। তাঁর রাজত্বকাল ৫৩৯ খ্রিষ্টপূর্ব। মওলানা আরো বলেন, ১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দে সাইরাসের একটি মূর্তি পাওয়া গেছে, যাতে তাঁর দেহকে এমনভাবে দেখানো হয়েছে যে, তাঁর শরীরের দু দিকে ঈগলের মত দুটি ডানা এবং ভেড়ার মত মাথায় দুটি শিং রয়েছে। (বিস্তারিত দ্রষ্টব্যঃ তুরজুমানুল কুরআন ১ম খন্ড ৩৯৯-৪৩০পৃঃ) আর আল্লাহই ভালো জানেন।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৮৩-৯৯ নং আয়াতের তাফসীর:
উক্ত আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা বাদশা ‘যুল-কারনাইন’ এর ঘটনা উল্লেখ করেছেন। যার সম্পর্কে ইয়াহূদীদের কথামত মক্কার কুরাইশরা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করেছিল। সে দ্বিতীয় জিজ্ঞেসার উত্তর এটি। যুল-কারনাইন এর শাব্দিক অর্থ হল দু’ শিংবিশিষ্ট। তাঁর নাম করণের কারণ হল তাঁর মাথায় প্রকৃতপক্ষে দুটি শিং ছিল। কিংবা তিনি পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে পৌঁছে সূর্যের শিং বা কিরণ প্রত্যক্ষ করেছিলেন। কেউ কেউ বলেছেন: তাঁর মাথায় শিঙের মত চুলের দুটি ঝুটি ছিল। তার প্রকৃত নাম নিয়েও মতামত পাওয়া যায়। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: তার নাম হল আব্দুল্লাহ বিন যহহাক বিন মা‘আদ, আবার বলা হয়-আবদুল্লাহ বিন কিনান বিন আজাদ ইত্যাদি। তিনি একজন ন্যায়পরায়ণ বাদশা, সৎ মু’মিন ব্যক্তি ছিলেন। (আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ২/১০২-১০৬)
সংক্ষিপ্ত ঘটনা:
‘যুল-কারনাইন’ একজন সৎ ও ন্যায়পরায়ণ বাদশা ছিলেন। আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে পৃথিবীতে রাজত্ব ও কর্তৃত্ব দান করেছিলেন এবং তাঁকে ক্ষমতা দিয়েছিলেন যে, তুমি যেখানে খুশি সেখানে ভ্রমণ করতে পারবে। তিনি পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যদেশসমূহ জয় করেছিলেন। এসব দেশে তিনি সুবিচার ও ইনসাফের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে তাঁকে লক্ষ্য অর্জনের জন্য সকল প্রকার সাজ-সরঞ্জাম দান করা হয়েছিল। একদা একটি পথ ধরে চলতে লাগলেন, চলতে চলতে এক পর্যায়ে সূর্যের অস্তগমন স্থানে পৌছে গেলেন। অর্থাৎ পশ্চিম প্রান্তে, যার পরে কোন জনবসতি ছিল না। সেখানে তিনি দেখলেন যে, সূর্য কর্দমাক্ত গরম পানিতে অস্ত যাচ্ছে এবং তিনি সেখানে একটি সম্প্রদায়ের সাথে সাক্ষাত লাভ করলেন। আর তারা ছিল কুফরী আকীদা পোষণকারী সম্প্রদায়। তখন আল্লাহ তা‘আলা যুল-কারনাইনকে বললেন: হে যুল-কারনাইন! তুমি চাইলে তাদেরকে শাস্তি দিতে পার অথবা তাদেরকে সদয়ভাবে গ্রহণ করতে পার।
তখন যুল-কারনাইন তাদেরকে বললেন, যে কেউ সীমালঙ্ঘন করবে তিনি তাদেরকে শাস্তি দেবেন এবং তারা তাদের প্রতিপালকের নিকট প্রত্যাবর্তিত হয়েও কঠিন শাস্তি ভোগ করবে। আর যে ঈমান আনবে ও সৎকর্ম করবে তাদের জন্য থাকবে কল্যাণ ও শান্তি। আর তাদের প্রতি নম্র ব্যবহার করা হবে।
অতঃপর তিনি অন্য একটি পথ ধরে চলতে লাগলেন। চলতে চলতে এক পর্যায়ে পৌঁছে গেলেন সূর্যোদয় স্থলে অর্থাৎ পূর্বপ্রান্তে। সেখানে গিয়ে একটি সম্প্রদায়ের সাথে সাক্ষাত লাভ করলেন যাদের জন্য সূর্যের তাপ থেকে আত্মরক্ষা করার মত কোন অন্তরাল সৃষ্টি করা হয়নি। আর এ ব্যাপারে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন।
অতঃপর অন্য একটি পথ ধরে চলতে লাগলেন। চলতে চলতে এক পর্যায়ে দু’ পর্বত প্রাচীরের মধ্যবর্তী স্থলে পৌঁছে গেলেন এবং সেখানে একটি সম্প্রদায়ের সাথে সাক্ষাত হল যারা তার কথা কিছুই বুঝতে পারছিল না, তারা তাঁকে ইয়া’জূজ ও মা’জূজ এর কষ্ট দেয়ার কথা জানাল এবং তারা যে জমিনে ফিতনা-ফাসাদ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে সে কথাও জানাল আর তাকে কর দিতে চাইল এ শর্তে যে, সে ইয়া’জূজ ও মা’জূজ এবং ঐ সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি প্রাচীর তৈরী করে দেবে যাতে ইয়া’জূজ ও মা’জূজ তাদেরকে আর কষ্ট দিতে না পারে ও জমিনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে। তাদের এ দাবী শুনে যুল-কারনাইন তাদের থেকে কর নিতে রাজি হননি বরং এ প্রাচীর নির্মাণ করার জন্য তাদের সাহায্য কামনা করলেন এবং তাদেরকে বললেন, তারা যেন লৌহপিণ্ডসমূহ নিয়ে আসে। লৌহপিণ্ডসমূহ দু’ পর্বতের মধ্যবর্তী শূন্যস্থানে রাখার পর যখন তা দু’ পর্বতের সমান হল তখন তাদেরকে বললেন, হাঁপর গরম করার জন্য। অবশেষে যখন তা আগুনে উত্তপ্ত হয়ে গলে গেল তখন তাদেরকে তামা নিয়ে আসার জন্য বললেন এবং যুল-কারনাইন ঐ গলিত তামা ঐ লোহার প্রাচীরের ওপর ঢেলে দিলেন। এরপর ইয়া’জূজ ও মা’জূজ আর এ প্রাচীর ছেদ করতে পারেনি। এ ইয়া’জূজ ও মা’জূজ এখনো ঐ প্রাচীরে বন্দী অবস্থায় রয়েছে। তারা প্রাচীর ভাঙ্গতে পারেনি। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলার ওয়াদা যখন বাস্তবায়িত হয়ে যাবে তখন তারা এ প্রাচীর ভেঙ্গে ফেলবে এবং পৃথিবীতে এসে পূর্বের মতই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে।
(قُلْ سَأَتْلُوْا عَلَيْكُمْ مِّنْهُ ذِكْرًا)
এখানে প্রণিধানযোগ্য বিষয় যে, কুরআন ذكره সংক্ষিপ্ত শব্দ ছেড়ে مِّنْهُ ذِكْرًا বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ দুটি শব্দের মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে, কুরআন যুল-কারনাইন এর আদ্যোপান্ত কাহিনী বর্ণনা করবে না বরং তার আলোচনার একাংশ উল্লেখ করবে।
سبب এর প্রকৃত অর্থ মাধ্যম, উপকরণ, যার দ্বারা লক্ষ্য অর্জন করা যায়। এখানে অর্থ হল আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে এমন কিছু মাধ্যম ও উপকরণ দান করেছেন যার দ্বারা তিনি দেশসমূহ জয় করেছেন। শত্র“দের অহংকার মাটিতে মিশিয়ে দেন এবং অত্যাচারী বাদশাকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলেন।
(أَتْبَعَ سَبَبًا) অর্থাৎ তাঁকে যে সকল উপকরণ দান করা হয়েছিল তা তিনি কাজে লাগান।
عين অর্থ ঝরনা বা সমুদ্র, حمئة অর্থ কর্দম বা কাদা। অর্থাৎ যুল-কারনাইন দেশের পর দেশ জয় করে যখন পশ্চিম প্রান্তে শেষ জনপদে পৌঁছে গেলেন। সেখানে কাদাময় পানির ঝরণা বা সমুদ্র ছিল যেটা নিচে থেকে কালো মনে হচ্ছিল। তার মনে হল যেন সূর্য ঐ পানিতে অস্ত যাচ্ছে। সমুদ্র-তীর থেকে দূরে সূর্যাস্ত স্থলে পানি ব্যতীত আর কিছু দেখা যায় না। সেখানে যারা সূর্যাস্ত প্রত্যক্ষ করবে তাদের মনে হবে যে সূর্য সমুদ্রেই অস্ত যাচ্ছে অথচ সূর্য মহাকাশে স্বস্থানেই অবস্থান করে।
(قُلْنَا يَذَا الْقَرْنَيْنِ)
‘আমি বললাম, ‘হে যুল-কারনাইন!’ আল্লাহ তা‘আলার এ নির্দেশ দ্বারা প্রমাণ হয় তিনি নাবী ছিলেন।
(بَيْنَ السَّدَّيْنِ)
যে বস্তু কোন কিছুর জন্য বাধা হয়ে যায় তাকে سد বলা হয়। তা প্রাচীর হোক কিংবা পাহাড় হোক, কৃত্রিম হোক আর প্রাকৃতিক হোক। এখানে السَّدَّيْنِ বলতে দু’ পাহাড় বুঝানো হয়েছে। এগুলো ইয়া’জূজ মা’জূজের পথে বাধা ছিল। কিন্তু উভয়ের মধ্যবর্তী গিরিপথ দিয়ে এসে তারা আক্রমন চালাত। যুলকারনাইন এ গিরিপথটি বন্ধ করে দেন।
زبر শব্দটি زبرة এর বহুবচন। এর অর্থ পাত। এখানে লৌহখণ্ড বুঝানো হয়েছে। গিরিপথ বন্ধ করার জন্য নির্মিতব্য প্রাচীর ইট-পাথরের পরিবর্তে লোহার পাত ব্যবহার করেছেন।
قطرا শব্দের অর্থ ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরানো তামা, আলকাতরার প্রলেপ দেয়া। ق এর হরকত পরিবর্তনের কারণে অর্থেরও পরিবর্তন হয়। এখানে গলিত তামা বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ লোহার পাতকে খুব গরম করে এর ওপর গলিত তামা ঢেলে দেয়ায় সে পাহাড়ী রাস্তার মাঝের প্রাচীর এত মজুবত হয়েছিল যে, ইয়া’জূজ-মা’জূজের পক্ষে তা ভেঙ্গে আসা অসম্ভব হয়ে গেল।
ইয়া’জূজ ও মা’জূজের বিবরণ:
ইয়া’জূজ ও মা’জূজ মূলত মানুষ। তারা আদম ও হাওয়ারই সন্তান। সাহাবী আবদুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: ইয়া’জূজ ও মা’জূজ হচ্ছে আদম (عليه السلام)-এর সন্তান। তাদেরকে যদি সাধারণ মানব সমাজে ছেড়ে দেয়া হয় তাহলে তারা ওদের স্বাভাবিক জীবন যাপন বিনষ্ট করে দেবে। তাদের কেউ মরবে না যতক্ষণ না তার সন্তান-সন্ততি এক হাজার বা তার বেশিতে পৌঁছে। (মিনহাতুল মা‘বূদ ফী তারবীবি মুসনাদিত তায়ালিসী ২/২১৯.)
তাদের গঠন প্রকৃতি: তাদের গঠন বর্ণনা দিয়ে যে সকল হাদীস বর্ণিত হয়েছে তাতে বলা হয়েছে, তাদেরকে দেখতে মোঘল তুর্কীদের মতো মনে হবে। তাদের চোখ হবে ছোট। নাক হবে ছোট ও চ্যাপটা। চুল হবে লাল-সাদা মিশ্রিত হলুদ বর্ণের। তাদের চেহারা যেন চামড়া মোড়ানো ঢালের ন্যায় তথা চওড়া ও ঝুলে পড়া গণ্ডদেশবিশিষ্ট। (নিহায়া/আল ফিতান ওয়াল মালাহিম ১/১৫৩.)
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ) ইবনু হারমালাহ থেকে তিনি তাঁর খালা থেকে বর্ণনা করেন, তাঁর খালা বলেন: একদা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর খুৎবায় বলেন, তোমরা বলছ যে, কোন শত্র“ নেই, অথচ তোমরা ইয়া’জূজ ও মা’জূজ আসা পর্যন্ত শত্র“র মোকাবেলা করেই যাবে। যাদের চেহারা হবে প্রশস্ত। চোখ হবে ছোট, চুল হবে লাল-সাদা মিশ্রিত হলুদ বর্ণের। তারা প্রত্যেক উঁচু জায়গা থেকে দ্রুত নিচে পদার্পন করবে। তাদের চেহারা যেন চামড়া মোড়ানো ঢালের ন্যায় তথা চওড়া ও ঝুলে পড়া গণ্ডদেশবিশিষ্ট। (আহমাদ হা: ২২৩৩১.)
ইয়াজূজ ও মা’জূজের আবির্ভাবের প্রমাণসমূহ:
শেষ যুগে ইয়া’জূজ ও মা’জূজের আবির্ভাব কিয়ামতের বড় বড় আলামতগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি। তাদের আবির্ভাবের ব্যাপারে কুরআন ও সুন্নাহয় প্রমাণ রয়েছে। যেমন উক্ত আয়াতগুলোতে রয়েছে।
ইয়া’জূজ ও মা’জূজ সংক্রান্ত হাদীসের সংখ্যা অনেক, যা মুতাওয়াতির পর্যায়ে চলে যাবে।
সাহাবী আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, যে রাতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ইসরা তথা মিরাজ হয় সে রাতে তিনি ইবরাহীম, মূসা ও ঈসা (عليه السلام)-এর সাথে সাক্ষাত করেন। তাঁরা সবাই তখন পরস্পর কিয়ামত সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন। তাঁরা উক্ত আলোচনার জন্য ঈসা (عليه السلام) কে আবেদন করলে তিনি দাজ্জালের হত্যার ব্যাপারে আলোচনা করার পর বলেন: এরপর মানুষ তাদের নিজ নিজ শহরে চলে যাবে। তখন হঠাৎ তাদের সম্মুখীন হবে ইয়া’জূজ ও মা’জূজ। তারা প্রত্যেক উঁচু জায়গা থেকে নিচের দিকে দ্রুত অবতরণ করবে। তারা কোন পানির পাশ দিয়ে যেতে না যেতেই তা পান করে নিঃশেষ করে ফেলবে এবং কোন বস্তুর পাশ দিয়ে যেতে না যেতেই তা ধ্বংস করে দেবে। তখন মানুষেরা আমার নিকট আশ্রয় নিলে আমি আল্লাহ তা‘আলার নিকট দু‘আ করব। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে মেরে ফেলবেন। তখন পুরো পৃথিবী তাদের দুর্গন্ধে গন্ধময় হয়ে যাবে। পুনরায় তারা আবারো আমার নিকট আশ্রয় নেবে। তখন আমি তাদের জন্য আল্লাহ তা‘আলার নিকট দু‘আ করলে আকাশ ভারী বৃষ্টি বর্ষণ করবে। অতঃপর বৃষ্টির পানি তাদের শরীরগুলোকে স্থল ভাগ থেকে ভাসিয়ে নিয়ে নদীতে নিক্ষেপ করবে। (আহমাদ ৪/১৮৯-১৯০, হাকিম ৪/৪৮৮-৪৮৯)
ইয়া’জূজ মা’জূজের প্রাচীর:
যুল-কারনাইন বাদশা উক্ত প্রাচীর নির্মাণ করেন। যাতে ইয়া’জূজ-মা’জূজ ও তাদের প্রতিবেশির মাঝে একটি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয় যারা যুল-কারনাইনের কাছে সাহায্য কামনা করছিল। যেমন আয়াতে উল্লেখ রয়েছে।
তবে উক্ত প্রাচীরের সঠিক স্থান এখনো কেউ নির্ণয় করতে পারেনি। কতক রাজা-বাদশা ও ঐতিহাসিকগণ সে স্থানের পরিচয় দিয়েছেন। তার মধ্যে অন্যতম হল আব্বাসীয় খলীফা ওয়াসিক (মৃত্যু ২৩২ হি:) কতক আমীরদেরকে সৈন্যদলসহ সে প্রাচীর দেখার জন্য প্রেরণ করেছেন যাতে তার কাছে সে প্রাচীরের বর্ণনা দিতে পারে। তারা এক দেশ থেকে অন্য দেশে, এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে পৌঁছল এমনকি সে প্রাচীর পর্যন্ত পৌঁছে গেল। তারা দেখতে পেলো, সে প্রাচীরটি লোহা ও পিতল দিয়ে নির্মিত। তারা আরো উল্লেখ করলেন যে, সেখানে একটি বিরাট দরজা প্রত্যক্ষ করেছেন, তাতে বড় বড় কয়েকটি তালা রয়েছে। তারা আরো দেখতে পেলেন, একটি দুর্গে দুধ ও মধুর অবশিষ্টাংশ রয়েছে এবং পার্শ্ববর্তী বাদশার পক্ষ থেকে একজন পাহারাদার নিযুক্ত রয়েছে, যিনি সুউচ্চ ও সুঠাম দেহের অধিকারী যা পার্শ্ববর্তী পাহাড়ও তার সমান হবে না। তারপর তারা দেশে ফিরে আসলেন, তাদের ভ্রমণ ৬০ দিনের অধিক ছিল এবং তারা আরো অনেক ভয়ংকর ও আশ্চর্যজনক জিনিস দেখলেন।
ইমাম ইবনু কাসীর (রহঃ) এ ঘটনা তার স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, তবে তার কোন সনদ উল্লেখ করেননি। আল্লাহ তা‘আলাই তার বিশুদ্ধতা সম্পর্কে ভাল জানেন। (তাফসীর ইবনে কাসীর ৫/১৯৩.)
অনেকে মনে করেন ইয়া’জূজ ও মা’জূজের আর্বিভাব হয়ে গেছে। মূলত তাদের আর্বিভাব এখনো হয়নি। কিয়ামতের আলামতস্বরূপ যে ইয়া’জূজ ও মা’জূজ আগমন করবে তারা শেষ যুগে আসবে। কারণ সহীহ হাদীস প্রমাণ করে তাদের আগমন ঈসা (عليه السلام)-এর অবতরণের পর হবে। তিনিই তাদের প্রতি বদদু‘আ করবেন, ফলে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ধ্বংস করবেন। তারপর তাদেরকে সাগরে নিক্ষেপ করবেন এবং মানুষ ও জমিনকে তাদের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নবুওয়াতের প্রামাণিক স্বীকৃতি পেলাম। কারণ তিনি কুরাইশদের তৃতীয় জিজ্ঞাসার উত্তর দিলেন আল্লাহ তা‘আলা ওয়াহীর দ্বারা জানিয়ে দেয়ার মাধ্যমে।
২. প্রকৃত বিষয় জানার জন্য জ্ঞানীরা উপকরণ গ্রহণ করতে পারেন।
৩. শাসকদের উচিত ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র আল্লাহ তা‘আলার বিধানানুযায়ী পরিচালনা করা।
৪. যে সকল বাদশা সারা পৃথিবী শাসন করেছেন তাদের মধ্যে যুল-কারনাইন অন্যতম।
৫. শ্রমের বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেয়া শরীয়তসম্মত।
৬. ইয়া’জূজ ও মা’জূজের অস্তিত্ব রয়েছে, এখনো তারা প্রাচীরের মধ্যে আবব্ধ।
৭. ইয়া’জূজ ও মা’জূজের আর্বিভাব কিয়ামতের আলামত, তারা প্রাচীর থেকে বের হয়ে দুনিয়াতে ফাসাদ সৃষ্টি করবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৮৩-৮৪ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবীকে (সঃ) সম্বোধন করে বলেনঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! তারা তোমাকে যুলকারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে। একথা পূর্বেই গত হয়েছে যে, মক্কার কাফিররা আহলে কিতাবকে জিজ্ঞেস করেছিলঃ
“আমাদেরকে এমন কিছু শিখিয়ে দিন যা আমরা মুহাম্মদকে (সঃ) জিজ্ঞেস করবো এবং তিনি তার উত্তর দিতে পারবেন না।” তখন তারা তাদেরকে বলৈছিলঃ “প্রথম প্রশ্ন তোমরা তাকে ঐ ব্যক্তির ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবে, যিনি সারা ভূ-পৃষ্ঠে ভ্রমণ করেছিলেন। তোমরা তাঁকে দ্বিতীয় প্রশ্ন ঐ যুবকদের সম্পর্কে করবে, যারা সম্পূর্ণরূপে উধাও হয়ে গিয়েছিলেন। আর তৃতীয় প্রশ্ন করবে রূহ্ সম্পর্কে। তাদের এই প্রশ্নগুলির উত্তরে এই সূরায়ে কাহ্ফ অবতীর্ণ হয়। রিওয়াইয়াতে এটাও আছে যে, ইয়াহূদীদের একটি দল রাসূলুল্লাহকে (সঃ) যুলকারনাইনের ঘটনা জিজ্ঞেস করতে এসেছিল। তিনি তাদেরকে দেখেই বলেনঃ “তোমরা এই ঘটনা জিজ্ঞেস করতে এসেছে।” অতঃপর তিনি তাদের কাছে ঘটনাটি বর্ণনা করেন। তাতে রয়েছে যে, তিনি রোমের একজন যুবক ছিলেন। তিনিই ইসকানদারিয়া শহরের ভিত্তি স্থাপন করেন। তাকে একজন ফেরেশতা আকাশ পর্যন্ত উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং দেয়াল পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি এমন কতকগুলি লোককে দেখেছিলেন, যাদের মুখ ছিল কুকুরের মত। কিন্তু এতে বড়ই দীর্ঘসূতিকা, অস্বীকৃতি ও দুর্বলতা রয়েছে। এর মারফু হওয়া প্রমাণিত নয়। প্রকৃতপক্ষে এটা বাণী ইসরাঈলের রিওয়াইয়তি। এটা বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার যে, আবু যার আ’রাযীর (রঃ) মত একজন আল্লামা স্বীয় গ্রন্থ দালাইলুন নবুওয়ার মধ্যে এটা আনয়ন করেছেন। এরূপ বর্ণনা তার ন্যায় একজন মনীষীর পক্ষে অতি বিস্ময়করই বটে। এটাও ঠিক নয়। দ্বিতীয় ইসকান্দার ছিলেন রোমক। তিনি হলেন ইসকান্দার ইবনু ফায়লীস আল মাকদূনী আল ইউনানী। তাঁর উযীর ছিলেন বিখ্যাত দার্শনিক য়্যারিষ্টটল। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। তার দ্বারাই রোমের ইতিহাস শুরু হয়। তিনি ছিলেন হযরত ঈসার (আঃ) তিনশ বছর পূর্বে। আর প্রথম ইসকান্দার যার বর্ণনা কুরআনে কারীমে দেয়া হয়েছে, তিনি তো ছিলেন হযরত ইবরাহীম খলীলের (আঃ) যামানার লোক। যেমন আযরাকী (রঃ) প্রভৃতি গুরুজন বর্ণনা করেছেন। তিনি হযরত ইবরাহীম খলীলের (আঃ) সাথে বায়তুল্লাহ শরীফের ভিত্তি স্থাপন করেন এবং এরপর ওর তাওয়াফ করেন। তার উপর তিনি ঈমান আনয়ন করেন এবং তাঁর অনুসারী হন। আল্লাহ তাআলার ফলে তাঁর বহু ঘটনা আল বিদাইয়াহ ওয়ান নিহাইয়ার মধ্যে বর্ণনা করে দিয়েছি। ওহাব ইবনু মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন যে, তিনি বাদশাহ ছিলেন। তার মাথার দুদিকে তামা থাকতো বলে তাঁকে যুলকারনাইন (দুটি শিং বিশিষ্ট) বলা হতো। কারণ এটাও বলা হয়েছে যে, তিনি রোম ও পারস্যের বাদশাহ ছিলেন। কেউ কেউ বলেছেন যে, আসলেই তার মাথার দুদিকে শিং-এর সাথে সাদৃশ্যযুক্ত কিছু ছিল। হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ তাঁর এই নামের কারণ এই যে, তিনি ছিলেন আল্লাহ তাআলার একজন সৎ বান্দা। তিনি স্বীয় কওমকে আল্লাহর পথে আহবান করেন। লোকেরা তাঁর বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লেগে যায় এবং তার মাথার এক দিকে এমনভাবে আঘাত করে যে, তিনি শহীদ হয়ে যান। আল্লাহ তাআ'লা তাঁকে পুনরুজ্জীবিত করেন। আবার লোকেরা তার মাথার অন্য দিকে আঘাত করে। ফলে, পুনরায় মৃত্যু বরণ করেন। এজন্যেই তাকে যুলকারনাইন বলা হয়। একথাও বলা হয়েছে যে, পূর্ব ও পশ্চিম পর্যন্ত ভ্রমণ করেন বলে তাঁকে যুলকারনাইন বলা হয়।
মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমি তাকে পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দিয়েছিলাম। সাথে সাথে আমি তাকে সামরিক শক্তি ও যুদ্ধাস্ত্রও দান করেছিলাম। পূর্ব হতে পশ্চিম পর্যন্ত তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল। আরব অনারব সবাই তাঁর কর্তৃত্বাধীন ছিল। আমি তাকে প্রত্যেক বিষয়ের উপায় ও পন্থা নির্দেশ করেছিলাম। তিনি সমস্ত ভাষা জানতেন। যে কওমের সাথে তাঁর যুদ্ধ হতো তিনি তাদের ভাষাতেই কথা বলতেন।
একদা হযরত মুআবিয়া (রাঃ) হযরত কা'ব আহরকে (রাঃ) বলেনঃ “আপনি কি বলেন যে, যুলকারনাইন তাঁর ঘোড়াটি সারিয়ার (তারকা) সাথে বাঁধতেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “আপনি যখন এটা বললেন তখন শুনুন! আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আমি তাকে জিনিসের সব সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র দান করেছিলাম। প্রকৃতপক্ষে এই অস্বীকারের ব্যাপারে সত্য হযরত মুআবিয়ার (রাঃ) সাথেই ছিল। এজন্যেও যে, হযরত কা'ব (রাঃ) লিখিত যা কিছু যেখানেই পেতেন বর্ণনা করে দিতেন। যদিও তা মিথ্যা হতো। এজন্যেই তিনি বলতেনঃ “কাবের মিথ্যা তো বার বার সামনে এসেছে।” অর্থাৎ তিনি নিজে তো মিথ্যা বানিয়ে নিতেন না বটে, কিন্তু তিনি যে রিওয়াইয়াতই পেতেন তা সনদহীন হলেও বর্ণনা করে দিতে দ্বিধাবোধ করতেন না। আর এটা তো স্পষ্ট কথা যে, বানী ইসরাঈলের রিওয়াইয়াত মিথ্যা, অশ্লীল কথন এবং পরিবর্তন ও পরিবর্ধন হতে রক্ষিত নয়। তা ছাড়া বানী ইসরাঈলের কথার প্রতি ভ্রক্ষেপ করারও আমাদের কোন প্রয়োজন নেই। কেননা, আমাদের হাতে আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের (সঃ) বিশুদ্ধ হাদীস সমূহ বিদ্যমান রয়েছে। বড়ই দুঃখের বিষয় যে, এই বানী ইসরাঈলের রিওয়াইয়াতগুলি মুসলমানদের মধ্যে অনেক অকল্যাণ ঢুকিয়ে দিয়েছে এবং বড় রকমের ফাসাদ ছড়িয়ে দিয়েছে। হযরত কা'ব (রাঃ) এই বানী ইসরাঈলের রিওয়াইয়াতকে প্রমাণ করতে গিয়ে কুরআন কারীমের এই আয়াতের যে শেষাংশ পেশ করেছেন এটাও ঠিক নয়। কেননা, এটাতো সম্পূর্ণরূপে প্রকাশমান যে, কোন মানুষকেই আল্লাহ তাআলা আসমানের উপর ও সারিয়ার উপর পৌছবার ক্ষমতা দেন নাই। বিলকীস সম্পর্কেও কুরআন কারীমে এই শব্দই ব্যবহার করা হয়েছে। বলা হয়েছেঃ (আরবী) (২৭:২৩) অর্থাৎ “তাকে সব কিছুই দেয়া হয়েছে। এর দ্বারা উদ্দেশ্য এটাই যে, বাদশাহদের কাছে সাধারণতঃ যা কিছু থাকে ঐ সবই তার নিকট বিদ্যমান ছিল। অনুরূপ ভাবে হযরত যুলকারনাইনকে আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক বিষয়ের উপায় ও পন্থা নির্দেশ করেছিলেন। উদ্দেশ্য এই যে, যেন তিনি ব্যাপকভাবে বিজয় লাভ করে যেতে পারেন এবং যমীনকে যেন মুশরিক ও কাফিরদের থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও পবিত্র করতে পারেন। আর যেন আল্লাহর তাওহীদ বা একত্ববাদের সাথে একত্ববাদীদের রাজত্ব ভূ-পৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড়ে এবং সারা দুনিয়ায় আল্লাহর হুকুমত প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সব কাজে যে সব আসবাব ও সরঞ্জামের প্রয়োজন হয়ে থাকে ঐ সব কিছুই মহামহিমান্বিত আল্লাহ হযরত যুলকারনাইনকে প্রদান করেছিলেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। হযরত আলীকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করা। হয়েছিলঃ “মাশরিক ও মাগরিব পর্যন্ত তিনি কি রূপে পৌঁছে ছিলেন?` উত্তরে তিনি বলেছিলেনঃ “সুবহানাল্লাহ! মেঘমালাকে আল্লাহ তাআ'লা তাঁর অনুগত করে দিয়েছিলেন এবং তার জন্যে সমস্ত আসবাবপত্রের ব্যবস্থা। করেছিলেন ও সর্ব প্রকারের শক্তি তাকে প্রদান করেছিলেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।