সূরা আল-কাহফ (আয়াত: 49)
হরকত ছাড়া:
ووضع الكتاب فترى المجرمين مشفقين مما فيه ويقولون يا ويلتنا مال هذا الكتاب لا يغادر صغيرة ولا كبيرة إلا أحصاها ووجدوا ما عملوا حاضرا ولا يظلم ربك أحدا ﴿٤٩﴾
হরকত সহ:
وَ وُضِعَ الْکِتٰبُ فَتَرَی الْمُجْرِمِیْنَ مُشْفِقِیْنَ مِمَّا فِیْهِ وَ یَقُوْلُوْنَ یٰوَیْلَتَنَا مَالِ هٰذَا الْکِتٰبِ لَا یُغَادِرُ صَغِیْرَۃً وَّ لَا کَبِیْرَۃً اِلَّاۤ اَحْصٰهَا ۚ وَ وَجَدُوْا مَا عَمِلُوْا حَاضِرًا ؕ وَ لَا یَظْلِمُ رَبُّکَ اَحَدًا ﴿۴۹﴾
উচ্চারণ: ওয়া উদি‘আল কিতা-বুফাতারাল মুজরিমীনা মুশফিকীনা মিম্মা-ফীহি ওয়া ইকূলূনা ইয়াওয়াইলাতানা-মা-লি হা-যাল কিতা-বি লা-ইউগা-দিরু সাগীরাতাওঁ ওয়ালা-কাবীরাতান ইল্লাআহসা-হা- ওয়া ওয়াজাদূমা-‘আমিলূহা-দিরা- ওয়ালা-ইয়াজলিমু রাব্বুকা আহাদা-।
আল বায়ান: আর আমলনামা রাখা হবে। তখন তুমি অপরাধীদেরকে দেখতে পাবে ভীত, তাতে যা রয়েছে তার কারণে। আর তারা বলবে, ‘হায় ধ্বংস আমাদের! কী হল এ কিতাবের! তা ছোট-বড় কিছুই ছাড়ে না, শুধু সংরক্ষণ করে’ এবং তারা যা করেছে, তা হাযির পাবে। আর তোমার রব কারো প্রতি যুলম করেন না।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪৯. আর উপস্থাপিত করা হবে আমলনামা, তখন তাতে যা লিপিবদ্ধ আছে তার কারণে আপনি অপরাধীদেরকে দেখবেন আতংকগ্ৰস্ত এবং তারা বলবে, হায়, দুর্ভাগ্য আমাদের! এটা কেমন গ্ৰন্থ! এটা তো ছোট বড় কিছু বাদ না দিয়ে সব কিছুই হিসেব করে রেখেছে।(১) আর তারা যা আমল করেছে তা সামনে উপস্থিত পাবে(২); আর আপনার রব তো কারো প্রতি যুলুম করেন না।(৩)
তাইসীরুল ক্বুরআন: আর ‘আমালনামা হাজির করা হবে, আর তাতে যা (লেখে রাখা আছে) তার কারণে তুমি অপরাধী লোকদেরকে দেখতে পাবে ভীত আতঙ্কিত। আর তারা বলবে, ‘হায় কপাল! এটা কেমন কিতাব যে ছোট বড় কোন কাজই ছেড়ে দেয়নি বরং সব কিছুর হিসাব রেখেছে।’ তারা যা করেছে তা সামনে উপস্থিত পাবে, আর তোমার প্রতিপালক কারো প্রতি যুলম করবেন না।
আহসানুল বায়ান: (৪৯) সেদিন (প্রত্যেকের হাতে) রাখা হবে আমলনামা এবং তাতে যা লিপিবদ্ধ আছে তার কারণে তুমি অপরাধীদেরকে দেখবে ভীত-সন্ত্রস্ত; তারা বলবে, ‘হায় দুর্ভোগ আমাদের! এ কেমন গ্রন্থ! এ তো ছোট-বড় কিছুই বাদ দেয়নি; বরং এ সমস্ত হিসাব রেখেছে!’ তারা তাদের কৃতকর্ম সম্মুখে উপস্থিত পাবে; আর তোমার প্রতিপালক কারো প্রতি যুলুম করেন না ।
মুজিবুর রহমান: এবং সেদিন উপস্থিত করা হবে ‘আমলনামা এবং তাতে যা লিপিবদ্ধ আছে তার কারণে তুমি অপরাধীদেরকে দেখবে আতংকগ্রস্ত এবং তারা বলবেঃ হায়! দুর্ভোগ আমাদের! এটা কেমন গ্রন্থ! ওটাতো ছোট বড় কিছুই বাদ দেয়নি, বরং ওটা সমস্ত হিসাব রেখেছে। তারা তাদের কৃতকর্ম সম্মুখে উপস্থিত পাবে; তোমার রাব্ব কারও প্রতি যুলম করেন না।
ফযলুর রহমান: আর কিতাব (আমলনামা) সামনে রাখা হবে। তখন তাতে যা (লেখা) রয়েছে তার কারণে তুমি অপরাধীদের ভীত দেখবে। তারা বলবে, “হায় আমাদের কপাল! এ কেমন কিতাব? এ যে ছোট-বড় কিছুই বাদ দিচ্ছে না! বরং সবই গুনে রেখেছে।” তারা যা করেছে তা সবই উপস্থিত পাবে। তোমার প্রভু কারো প্রতি অবিচার করেন না।
মুহিউদ্দিন খান: আর আমলনামা সামনে রাখা হবে। তাতে যা আছে; তার কারণে আপনি অপরাধীদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত দেখবেন। তারা বলবেঃ হায় আফসোস, এ কেমন আমলনামা। এ যে ছোট বড় কোন কিছুই বাদ দেয়নি-সবই এতে রয়েছে। তারা তাদের কৃতকর্মকে সামনে উপস্থিত পাবে। আপনার পালনকর্তা কারও প্রতি জুলুম করবেন না।
জহুরুল হক: আর বইখানা ধরা হবে, তখন তুমি দেখবে -- ওতে যা আছে সেজন্য অপরাধীরা আতংকগ্রস্ত, আর তারা বলবে -- "হায় আমাদের দুর্ভোগ! এ কেমনতর গ্রন্থ! এ ছোটখাটো বাদ দেয় নি আর বড়গুলো তো নয়ই, বরং সমস্ত কিছু নথিভুক্ত করেছে!" আর তারা যা করেছে তা হাজির পাবে। আর তোমার প্রভু কোনো একজনের প্রতিও অন্যায় করেন না।
Sahih International: And the record [of deeds] will be placed [open], and you will see the criminals fearful of that within it, and they will say, "Oh, woe to us! What is this book that leaves nothing small or great except that it has enumerated it?" And they will find what they did present [before them]. And your Lord does injustice to no one.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৪৯. আর উপস্থাপিত করা হবে আমলনামা, তখন তাতে যা লিপিবদ্ধ আছে তার কারণে আপনি অপরাধীদেরকে দেখবেন আতংকগ্ৰস্ত এবং তারা বলবে, হায়, দুর্ভাগ্য আমাদের! এটা কেমন গ্ৰন্থ! এটা তো ছোট বড় কিছু বাদ না দিয়ে সব কিছুই হিসেব করে রেখেছে।(১) আর তারা যা আমল করেছে তা সামনে উপস্থিত পাবে(২); আর আপনার রব তো কারো প্রতি যুলুম করেন না।(৩)
তাফসীর:
(১) দুনিয়ার বুকে তারা যা যা করেছিল তা সবই লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। সে সব লিখিত গ্রন্থগুলো সেখানে তারা দেখতে পাবে। তাদের কারও আমলনামা ডান হাতে আবার কারও বাম হাতে দেয়া হবে। তারা সেখানে এটাও দেখবে যে, সেখানে ছোট-বড়, গুরুত্বপূর্ণ, গুরুত্বহীন সবকিছুই লিখে রাখা হয়েছে। অন্যত্র মহান আল্লাহ তাদের আমলনামা সম্পর্কে বলেন, প্রত্যেক মানুষের কাজ আমি তার গ্রীবালগ্ন করেছি এবং কিয়ামতের দিন আমি তার জন্য বের করব এক কিতাব, যা সে পাবে উন্মুক্ত। “তুমি তোমার কিতাব পাঠ কর, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসেবা-নিকেশের জন্য যথেষ্ঠ। [সুরা আল-ইসরা: ১৩]
(২) অর্থাৎ হাশরবাসীরা তাদের কৃতকর্মকে উপস্থিত পাবে। অন্যান্য আয়াতে আরো স্পষ্ট ভাষায় তা বর্ণিত হয়েছে। বলা হয়েছে: “যে দিন প্রত্যেকে সে যা ভাল কাজ করেছে এবং সে যা মন্দ কাজ করেছে তা বিদ্যমান পাবে, সেদিন সে তার ও ওটার মধ্যে ব্যবধান কামনা করবে। আল্লাহ তাঁর নিজের সম্বন্ধে তোমাদেরকে সাবধান করতেছেন। আল্লাহ বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত দয়াদ্র।” [সূরা আলে-ইমরান: ৩০] আরও বলা হয়েছেঃ “সেদিন মানুষকে অবহিত করা হবে সে কী আগে পাঠিয়েছে ও কী পিছনে রেখে গেছে।” [সূরা আল-কিয়ামাহঃ ১৩]
আরও বলা হয়েছেঃ “যে দিন গোপন ভেদসমূহ প্রকাশ করা হবে” [সূরা আত-ত্বরেক: ৯] মুফাসসিরগণ বিভিন্ন হাদীসের ভিত্তিতে এর অর্থ সাধারণভাবে এরূপ বর্ণনা করেন যে, এসব কৃতকর্মই প্রতিদান ও শাস্তির রূপ পরিগ্রহ করবে। তাদের আকার-আকৃতি সেখানে পরিবর্তিত হয়ে যাবে। যেমন, কোন কোন হাদীসে আছে, যারা যাকাত দেয় না, তাদের মাল কবরে একটি বড় সাপের আকার ধারণ করে তাদেরকে দংশন করবে এবং বলবেঃ আমি তোমার সম্পদ ৷ [বুখারীঃ ১৩৩৮, তিরমিযীঃ ১১৯৫] সৎকর্ম সুশ্ৰী মানুষের আকারে কবরের নিঃসঙ্গ অবস্থায় আতঙ্ক দূর করার জন্য আগমন করবে। [মুসনাদে আহমাদঃ ৪/২৮৭] মানুষের গোনাহ বোঝার আকারে প্রত্যেকের মাথায় চাপিয়ে দেয়া হবে। অনুরূপভাবে, কুরআন ইয়াতীমের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষনকারীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে- (إِنَّمَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ نَارًا) [সূরা আন-নিসাঃ ১০]
অথবা, আয়াতের এ অর্থও করা যায় যে, তারা তাদের কৃতকর্মের বিবরণ সম্বলিত দপ্তর দেখতে পাবে, কোন কিছুই সে আমলনামা লিখায় বাদ পড়েনি। কাতাদা রাহেমাহুল্লাহ এ আয়াত শুনিয়ে বলতেন: তোমরা যদি লক্ষ্য কর তবে দেখতে পাবে যে, লোকেরা ছোট-বড় সবকিছু গণনা হয়েছে বলবে কিন্তু কেউ এটা বলবে না যে, আমার উপর যুলুম করা হয়েছে। সুতরাং তোমরা ছোট ছোট গুনাহর ব্যাপারে সাবধান হও; কেননা এগুলো একত্রিত হয়ে বিরাট আকার ধারণ করে ধ্বংস করে ছাড়বে। [তাবারী]
(৩) অর্থাৎ এক ব্যক্তি একটি অপরাধ করেনি। কিন্তু সেটি খামাখা তার নামে লিখে দেয়া হয়েছে, এমনটি কখনো হবে না। আবার কোন ব্যক্তিকে তার অপরাধের কারণে প্রাপ্য সাজার বেশী দেয়া হবে না এবং নিরপরাধ ব্যক্তিকে অযথা পাকড়াও করেও শাস্তি দেয়া হবে না। জাবের ইবন আব্দুল্লাহ বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিনে আল্লাহ তা'আলা মানুষদেরকে অথবা বলেছেন বান্দাদেরকে নগ্ন, অখতনাকৃত এবং কপর্দকশূণ্য অবস্থায় একত্রিত করবেন। তারপর কাছের লোকেরা যেমন শুনবে দূরের লোকরাও তেমনি শুনতে পাবে এমনভাবে ডেকে বলবেনঃ আমিই বাদশাহ, আমিই বিচার-প্রতিদান প্রদানকারী, জান্নাতে প্রবেশকারী কারও উপর জাহান্নামের অধিবাসীদের কোন দাবী অনাদায়ী থাকতে পারবে না।
অনুরূপভাবে, জাহান্নামে প্রবেশকারী কারও উপর জান্নাতের অধিবাসীদের কারও দাবীও অনাদায়ী থাকতে পারবে না। এমনকি যদি তা একটি চপেটাঘাতও হয়। বর্ণনাকারী বললেনঃ কিভাবে তা সম্ভব হবে, অথচ আমরা তখন নগ্ন শরীর, অখতনাকৃত ও রিক্তহস্তে সেখানে আসব? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ নেককাজ ও বদকাজের মাধ্যমে সেটার প্রতিদান দেয়া হবে। [মুসনাদে আহমাদ: ৩/৪৯৫] অন্য হাদীসে এসেছে, ‘শিংবিহীন প্রাণী সেদিন শিংওয়ালা প্রাণী থেকে তার উপর কৃত অন্যায়ের কেসাস নিবে।’ [মুসনাদে আহমাদ: ১/৪৯৪]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৪৯) সেদিন (প্রত্যেকের হাতে) রাখা হবে আমলনামা এবং তাতে যা লিপিবদ্ধ আছে তার কারণে তুমি অপরাধীদেরকে দেখবে ভীত-সন্ত্রস্ত; তারা বলবে, ‘হায় দুর্ভোগ আমাদের! এ কেমন গ্রন্থ! এ তো ছোট-বড় কিছুই বাদ দেয়নি; বরং এ সমস্ত হিসাব রেখেছে!’ তারা তাদের কৃতকর্ম সম্মুখে উপস্থিত পাবে; আর তোমার প্রতিপালক কারো প্রতি যুলুম করেন না ।
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৪৭-৪৯ নং আয়াতের তাফসীর:
উক্ত আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার পূর্ব মুহুর্তে আকাশ-জমিনে যে ভয়াবহতা সৃষ্টি হবে তার বর্ণনা দিচ্ছেন। সেদিন যেসব বিস্ময়কর বড় বড় কাজ সংঘটিত হবে তার মধ্যে কয়েকটি তুলে ধরা হয়েছে। সেদিন পাহাড়গুলো উড়তে থাকবে, পৃথিবী শূন্য প্রান্তরে পরিণত হবে। গাছ-পালা, তরু-লতা কোন কিছুই থাকবে না। পৃথিবী ধূ-ধূ মরুভূমিতে পরিণত হয়ে যাবে।
আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(فَإِذَا نُفِخَ فِي الصُّوْرِ نَفْخَةٌ وَّاحِدَةٌ لا وَّحُمِلَتِ الْأَرْضُ وَالْجِبَالُ فَدُكَّتَا دَكَّةً وَّاحِدَةً لا فَيَوْمَئِذٍ وَّقَعَتِ الْوَاقِعَةُ)
“যখন শিংগায় ফুৎকার দেওয়া হবে একটি মাত্র ফুৎকার। আর পৃথিবী ও পর্বতমালাকে উত্তোলন করা হবে এবং একই ধাক্কায় চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়া হবে। সেদিন যা সংঘটিত হওয়ার তা অর্থাৎ কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে।” (সূরা হাক্কাহ ৬৯:১৩-১৫)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(وَّسُيِّرَتِ الْـجِبَالُ فَكَانَتْ سَرَابًا)
“এবং পাহাড়সমূহকে চলমান করা হবে, ফলে সেগুলো হয়ে যাবে মরীচিকা।” (সূরা নাবা ৭৮:২০) কিয়ামতের পূর্ব অবস্থা ও কিয়ামতের ভয়াবহতা কুরআনের ত্রিশতম পারায় আল্লাহ তা‘আলা বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।
আর সেদিন সকলকে কাতারবদ্ধভাবে আল্লাহ তা‘আলার সম্মুখে উপস্থিত করা হবে। মানুষ জন্মের দিন দুনিয়াতে যেভাবে খৎনাবিহীন উলঙ্গ অবস্থায় এসেছিল ঠিক কিয়ামতের দিন সেভাবে আল্লাহ তা‘আলার সামনে উপস্থিত হবে।
নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
إِنَّكُمْ مَحْشُورُونَ حُفَاةً عُرَاةً غُرْلًا، ثُمَّ قَرَأَ: {كَمَا بَدَأْنَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُعِيدُهُ وَعْدًا عَلَيْنَا إِنَّا كُنَّا فَاعِلِيْنَ
তোমাদেরকে হাশরের ময়দানে উপস্থিত করা হবে নগ্ন পায়ে, উলঙ্গ ও খাৎনাবিহীন অবস্থায়। ইচ্ছা করলে এ আয়াত তেলাওয়াত করতে পারো। “যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম সেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করব; এ আমার কৃত ওয়াদা, আমি এটা পালন করবই।” (সূরা আম্বিয়া ২১:১০৪)
আর তথায় তাদের আমলনামাগুলো পেশ করা হবে। কারো আমলনামায় কোন প্রকার হ্রাস-বৃদ্ধি করা হবে না। বরং যে যা আমল করবে ঠিক তা-ই সেখানে উপস্থিত পাবে, যা দেখে তারা অবাক হয়ে যাবে এবং বলবে: এটা কেমন কিতাব যা ছোট-বড় সবকিছু লিখে রেখেছে যাতে কোন কিছু বাদ নেই।
আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(وَكُلَّ إِنْسَانٍ أَلْزَمْنٰهُ طَآئِرَه۫ فِيْ عُنُقِه۪ ط وَنُخْرِجُ لَه۫ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كِتٰبًا يَّلْقَاهُ مَنْشُوْرًا اِقْرَأْ كِتٰبَكَ ط كَفٰي بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيْبًا)
“প্রত্যেক মানুষের কর্ম আমি তার গ্রীবালগ্ন করেছি এবং কিয়ামতের দিন আমি তার জন্য বের করব এক কিতাব, যা সে পাবে উন্মুক্ত। ‘তুমি তোমার কিতাব পাঠ কর, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসেব নিকেশের জন্য যথেষ্ট।’’ (সূরা ইসরা ১৭:১৩-১৪)
আর ঐ কিতাবে মানুষ তাঁর সমস্ত জীবনে যা আমল করেছে তার সকল কিছুই লিপিবদ্ধ থাকবে। আল্লাহ তা‘আলা সেই আমল অনুপাতে তাদের মধ্যে ফায়সালা করে দেবেন। বিন্দু পরিমাণ জুলুম করবেন না।
আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(وَنَضَعُ الْمَوَازِيْنَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيٰمَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا ط وَإِنْ كَانَ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِّنْ خَرْدَلٍ أَتَيْنَا بِهَا ط وَكَفٰي بِنَا حٰسِبِيْنَ)
“এবং কিয়ামত দিবসে আমি স্থাপন করব ন্যায়বিচারের মানদণ্ড। সুতরাং কারও প্রতি কোন অবিচার করা হবে না এবং কর্ম যদি সরিষার দানা পরিমাণ ওজনেরও হয় তবুও সেটা আমি উপস্থিত করব; হিসেব গ্রহণকারীরূপে আমিই যথেষ্ট।” (সূরা আম্বিয়া ২১:৪৭)
সুতরাং কিয়ামত দিবসে সকল কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। সেদিন সকল মানুষকে আল্লাহ তা‘আলার সামনে উপস্থিত করা হবে এবং তাদের আমল অনুপাতে বিচার করা হবে, তাদের প্রতি কোন প্রকার জুলুম করা হবে না।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. কিয়ামত একদিন অবশ্যই সংঘটিত হবে।
২. সকল মানুষকে আল্লাহ তা‘আলার সম্মুখে হাজির করা হবে।
৩. মানুষের সকল কাজ-কর্ম লিখে রাখা হয়।
৪. মানুষের প্রতি কোন প্রকার জুলুম করা হবে না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৪৭-৪৯ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের ভয়াবহতার বর্ণনা দিচ্ছেন। সেই দিন যে সব বিস্ময়কর বড় বড় কাজ সংঘটিত হবে, তিনি সেগুলি বর্ণনা করছেন। সেই দিন আকাশ ফেটে যাবে এবং পাহাড়-পর্বত উড়তে থাকবে যদিও তোমরা একে জমাটবদ্ধ দেখতে পাচ্ছ, কিন্তু ঐ দিন তা মেঘমালার মত দ্রুতবেগে চলতে থাকবে এবং ধূনো তুলোর মত হয়ে যাবে। যমীন সম্পূর্ণরূপে সমতল ভূমিতে পরিণত হবে। তাতে কোন উঁচু-নীচু থাকবে না। এই যমীনে না থাকবে কোন বাড়ীঘর, না থাকবে কোন ছাউনি। কোন আড়াল ছাড়াই সমস্ত সৃষ্টজীব মহামহিমান্বিত আল্লাহর সামনে হয়ে যাবে। কেউই তার থেকে কোথাও লুকিয়ে থাকতে পারবে না। কোথাও কোন আশ্রয়স্থল ও মাথা লুকানোর জায়গা থাকবে না। কোন গাছ-পালা, পাথর ও তৃণ-লতা দেখা যাবে না। প্রথম থেকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত যত লোক রয়েছে সবাই একত্রিত। হবে। ছোট বড় কেউই অনুপস্থিত থাকবে না। সমস্ত লোক আল্লাহ তাআলার সামনে সাবিরুদ্ধভাবে দাড়িয়ে যাবে। রূহ ও ফেরেশতামণ্ডলী কাতারবন্দি হয়ে দাড়াবেন। কারো কোন কথা বলার সাহস হবে না। একমাত্র তারাই কথা বলতে পারবেন যাদেরকে আল্লাহ কথা বলার অনুমতি দান করবেন এবং তারাও সঠিক কথাই বলবেন। সেদিন সমস্ত মানুষের সারি একটি হবে অথবা তারা কয়েকটি সারিতে বিভক্ত হবে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “তোমার প্রতিপালক আসবেন এবং ফেরেশতারা সারিবদ্ধভাবে আসবে।” কিয়ামতকে যারা অস্বীকার করতো তাদেরকে সেইদিন ধমকের সূরে বলা হবেঃ দেখো, যেমন ভাবে আমি তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম, তেমনিভাবে দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করে আমার সামনে দাড় করিয়েছি। তোমরা তো এটা অস্বীকার করতে? আমলনামা তাদের সামনে হাজির করে দেয়া হবে, যাতে ছোট বড়, প্রকাশ্য ও গোপনীয় সমস্ত আমল লিপিবদ্ধ থাকবে। পাপীরা তাদের দুষ্কর্মগুলি দেখে ভীত বিহ্বল হয়ে পড়বে এবং অত্যন্ত আফসোস করে বলবেঃ হায়! আমরা আমাদের জীবন ও আয়ুকে কি অবহেলায় না কাটিয়ে দিয়েছিলাম। বড়ই অনুতাপ যে, আমরা দুনিয়ায় শুধু দুষ্কার্যেই লিপ্ত থাকতাম। দেখো, এমন কোন কাজ নেই যা এই কিতাবে (আমলনামায়) লিখা পড়ে নাই। বরং ছোট-বড় সমস্ত গুনাহর কাজ এতে লিপিবদ্ধ রয়েছে।
বর্ণিত আছে যে, সাহাবীগণ বলেনঃ “হুনায়েনের যুদ্ধ শেষে আমরা। মদীনায় প্রত্যাবর্তন করছিলাম। পথিমধ্যে এক ময়দানে আমরা সওয়ারী হতে অবতরণ করি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে বলেনঃ “যাও লাকড়ি, খড়ি, ডাল-পাতা, কঞ্চি, ছিটকি যা পাবে কুড়িয়ে নিয়ে এসো।” আমরা এদিক ওদিক ছুটে পড়লাম এবং ডাল, পাতা, কাঁটা খোচ, লাকড়ি, যা কিছু কুড়িয়ে নিয়ে আসলাম এবং এগুলোর একটি বড় ঢেরি হয়ে গেল। এ দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “এই ভাবেই গুনাহ্ জমা হয়ে ঢেরি হয়ে যায়। আল্লাহকে তোমরা ভয় করতে থাকো এবং ছোট বড় গুনাহ হতে পরহেয করো। সবই লিখে নেয়া হচ্ছে ও গণনা করা হচ্ছে। ভাল মন্দ যে যা কিছু করেছে তা সে বিদ্যমান পাবে। (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) যেমন (আরবী) ও (আরবী) এসব আয়াতে রয়েছে। অর্থাৎ সেই দিন গোপনীয় সবকিছুই প্রকাশিত হয়ে যাবে।
রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকের জন্যে কিয়ামতের দিন একটি পতাকা থাকবে। এই পতাকা হবে তাদের বিশ্বাসঘাতকতা অনুযায়ী, এর দ্বারা তারা পরিচিত হবে। অন্য হাদীসে আছে যে, ঐ ঝাণ্ডাটি তার উরুর পার্শ্বে থাকবে এবং ঘোষণা করা হবেঃ “এটা অমুকের পুত্র অমুকের বিশ্বাসঘাতকতা।
মহান আল্লাহ বলেনঃ “তোমার প্রতিপালক কারো প্রতি জুলুম করেন না। ক্ষমা ও মাফ করে দেয়া তার বিশেষণ। হাঁ, তবে পাপী ও অপরাধীদেরকে তিনি স্বীয় ক্ষমতা, নিপুণতা এবং আদল ও ইনসাফের সাথে শাস্তি প্রদান করে থাকেন।”
অপরাধী ও অবাধ্য লোকদের দ্বারা জাহান্নাম পরিপূর্ণ হয়ে যাবে। তারপর কাফির ও মুশরিকরা ছাড়া মু'মিনরা পরিত্রাণ পেয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা এক অনু পরিমাণও অন্যায় করেন না। তিনি পুণ্যকে বৃদ্ধি করে দেন এবং পাপকে সমান রাখেন। ন্যায়ের দাড়িপাল্লা সেদিন সামনে থাকবে। কারো সাথে কোন দুর্ব্যবহার করা হবে না।
হযরত জাবির ইবনু আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে একটি হাদীস শুনেছেন এই খবর অামার কাছে পৌঁছে। ঐ হাদীসটি আমি স্বয়ং তার মুখে শুনবার উদ্দেশ্য একটি উট ক্রয় করি এবং ওর উপর আসবাবপত্র উঠিয়ে নিয়ে সফরে বেরিয়ে পড়ি। সুদীর্ঘ এক মাসের ভ্রমণের পর সন্ধ্যার সময় আমি তাঁর কাছে পৌঁছি। সেখানে পৌঁছে জানতে পারি যে, তিনি হলেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনু উনায়েস (রাঃ)। আমি দারওয়ানকে বললামঃ যাও, তাকে খবর দাও যে, যাবির (রাঃ) দরবার উপর পঁড়িয়ে রয়েছেন। তিনি খবর পেয়ে জিজ্ঞেস করেনঃ “জাবির ইবনু আবদিল্লাহ কি?” আমি উত্তরে বললামঃ জ্বি, হাঁ। এটা শোনা মাত্রই তিনি গায়ের চাদর ঠিক করতে করতে তড়িৎ গতিতে আমার কাছে ছুটে আসলেন। এসেই তিনি আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। মুআনাকার (কাধে কাধ মেলানোর পর আমি তাকে বললামঃ “আমি খবর পেয়েছি যে, আপনি কিসাসের ব্যাপারে কোন একটি হাদীস রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শুনেছেন। আমি স্বয়ং আপনার মুখে ঐ হাদীসটি শুনবার উদ্দেশ্য এখানে এসেছি এবং খবর শোনা মাত্রই আমি সফর শুরু করেছি এই ভয়ে যে, এই হাদীসটি শুনবার পূর্বেই হয়তো আমি মৃত্যুবরণ করি অথবা আপনার মৃত্যু হয়ে যায়। এখন আপনি আমাকে ঐ হাদীসটি শুনিয়ে দিন। তিনি তখন বলতে শুরু করলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলতে শুনেছিঃ “কিয়ামতের দিন মহামহিমান্বিত আল্লাহ তার সমস্ত বান্দাকে তার সামনে একত্রিত করবেন। ঐ সময় তারা উলঙ্গ দেহ ও খৎনাহীন অবস্থায় থাকবে। তাদের কাছে কোনই আসবাবপত্র থাকবে না। তারপর তাদের সামনে ঘোষণা করা হবে যে, ঘোষণা নিকটবর্তী ও দূরবর্তী সবাই সমানভাবে শুনতে পাবে। মহান আল্লাহ বলবেনঃ “আমি মালিক। আমি বিনিময় প্রদানকারী। ততক্ষণ পর্যন্ত কোন জাহান্নামী জাহান্নামে যাবে না যতক্ষণ না আমি তার ঐ হক আদায় করে না দেবো যা কোন জান্নাতীর জিম্মায় রয়েছে। আর কোন জান্নাতীও জান্নাতে যেতে পারবে না যতক্ষণ না আমি তার ঐ প্রাপ্য আদায় করে দেবো যা কোন জাহান্নামীর যিম্মায় রয়েছে। ঐ হক বা প্রাপ্য যতই ক্ষুদ্র হোক না কেন।` আমরা জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা সবাই তো সেদিন উলঙ্গ দেহ ও মালধন শূন্য অবস্থায় থাকবে, এ অবস্থায় কেমন করে প্রাপ্য আদায় করা। হবে? তিনি উত্তরে বলেনঃ “হাঁ (যেভাবেই হোক না কেন), সেই দিন পুণ্যবান ও পাপীদের নিকট থেকে হক বা প্রাপ্য আদায় করে নেয়া হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন) অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কোন শিং বিহীন বকরীকে যদি কোন শিং বিশিষ্ট বকরী শিং দ্বারা গুঁতো মেরে থাকে তবে তার থেকেও প্রতিশোধ গ্রহণ করিয়ে দেয়া হবে। এর আরো বহু প্রমাণ রয়েছে। যেগুলি আমরা (আরবী) (২১:৪৭) এই আয়াতের তাফসীরে এবং (আরবী) (৬:৩৮) এই আয়াতের তাফসীরে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছি।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।