আল কুরআন


সূরা আল-কাহফ (আয়াত: 47)

সূরা আল-কাহফ (আয়াত: 47)



হরকত ছাড়া:

ويوم نسير الجبال وترى الأرض بارزة وحشرناهم فلم نغادر منهم أحدا ﴿٤٧﴾




হরকত সহ:

وَ یَوْمَ نُسَیِّرُ الْجِبَالَ وَ تَرَی الْاَرْضَ بَارِزَۃً ۙ وَّ حَشَرْنٰهُمْ فَلَمْ نُغَادِرْ مِنْهُمْ اَحَدًا ﴿ۚ۴۷﴾




উচ্চারণ: ওয়া ইয়াওমা নুছাইয়িরুল জিবা-লা ওয়া তারাল আরদা বা-রিযাতাওঁ ওয়া হাশারনা-হুম ফালাম নুগা-দির মিনহুম আহাদা-।




আল বায়ান: স্মরণ কর সেদিনের কথা যেদিন আমি পর্বতকে করব সঞ্চালিত এবং তুমি পৃথিবীকে দেখবে একটি শূন্য প্রান্তর; সেদিন মানুষকে আমি একত্রিত করব এবং তাদের কেহকেও অব্যাহতি দিব না।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪৭. আর স্মরণ করুন, যেদিন আমরা পর্বতমালাকে করব সঞ্চালিত(১) এবং আপনি যমীনকে দেখবেন উন্মুক্ত প্রান্তর(২), আর আমরা তাদের সকলকে একত্র করব; তারপর তাদের কাউকে ছাড়ব না।




তাইসীরুল ক্বুরআন: (সেদিনের কথা চিন্তা কর) যেদিন আমি পর্বতমালাকে চালিত করব, আর পৃথিবীকে দেখতে পাবে উন্মুক্ত প্রান্তর আর তাদের সববাইকে আমি একত্রিত করব, কাউকেও বাদ দেব না।




আহসানুল বায়ান: (৪৭) (স্মরণ কর,) যেদিন আমি পর্বতকে করব সঞ্চালিত[1] এবং তুমি পৃথিবীকে দেখবে একটি শূন্য প্রান্তর; সেদিন মানুষকে আমি একত্রিত করব এবং তাদের কাউকেও অব্যাহতি দেব না। [2]



মুজিবুর রহমান: আর যেদিন আমি পাহাড়কে চলমান করব এবং তুমি যমীনকে দেখতে পাবে দৃশ্যমান, আর আমি তাদেরকে একত্র করব। অতঃপর তাদের কাউকেই ছাড়ব না।



ফযলুর রহমান: (স্মরণ করো) যেদিন আমি (স্থির) পর্বতসমূহকে চলমান করব এবং পৃথিবীকে তুমি একটি সমতলভূমির মত দেখতে পাবে। আর তাদের সকলকে একত্রিত করব, একজনকেও বাদ রাখব না।



মুহিউদ্দিন খান: যেদিন আমি পর্বতসমূহকে পরিচালনা করব এবং আপনি পৃথিবীকে দেখবেন একটি উম্মুক্ত প্রান্তর এবং আমি মানুষকে একত্রিত করব অতঃপর তাদের কাউকে ছাড়ব না।



জহুরুল হক: আর সেই দিনে আমরা পাহাড়গুলো হটিয়ে দেব, আর তুমি পৃথিবীকে দেখবে একটি খোলা ময়দান, আর আমরা তাদের একত্রিত করব, তখন তাদের মধ্যের কোনো একজনকেও আমরা ফেলে রাখব না --



Sahih International: And [warn of] the Day when We will remove the mountains and you will see the earth prominent, and We will gather them and not leave behind from them anyone.



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৪৭. আর স্মরণ করুন, যেদিন আমরা পর্বতমালাকে করব সঞ্চালিত(১) এবং আপনি যমীনকে দেখবেন উন্মুক্ত প্রান্তর(২), আর আমরা তাদের সকলকে একত্র করব; তারপর তাদের কাউকে ছাড়ব না।


তাফসীর:

(১) অর্থাৎ যখন যমীনের বাঁধন আলগা হয়ে যাবে এবং পাহাড় ঠিক এমনভাবে চলতে শুরু করবে। যেমন আকাশে মেঘেরা ছুটে চলে। কুরআনের অন্য এক জায়গায় এ অবস্থাটিকে এভাবে বলা হয়েছেঃ “আর আপনি পাহাড়গুলো দেখছেন এবং মনে করছেন এগুলো অত্যন্ত জমাটবদ্ধ হয়ে আছে কিন্তু এগুলো চলবে ঠিক যেমন মেঘেরা চলে।” [সূরা আন-নামলঃ ৮৮] আরো বলা হয়েছেঃ “যেদিন আকাশ আন্দোলিত হবে প্রবলভাবে এবং পর্বত চলবে দ্রুত; [সূরা আত-তূর: ৯–১০] আরো এসেছেঃ “আর পর্বতসমূহ হবে ধুনিত রঙ্গীন পশমের মত।” [সূরা আল-কারি'আ: ৫]

(২) অর্থাৎ এর উপর কোন শ্যামলতা, বৃক্ষ তরুলতা এবং ঘরবাড়ি থাকবে না। সারাটা পৃথিবী হয়ে যাবে একটা ধুধু প্রান্তর। এ সূরার সূচনায় এ কথাটিই বলা হয়েছিল এভাবে যে, “এ পৃথিবী পৃষ্ঠে যা কিছু আছে সেসবই আমি লোকদের পরীক্ষার জন্য একটি সাময়িক সাজসজ্জা হিসেবে তৈরী করেছি। এক সময় আসবে যখন এটি সম্পূর্ণ একটি পানি ও বৃক্ষ লতাহীন মরুপ্রান্তরে পরিণত হবে।”


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৪৭) (স্মরণ কর,) যেদিন আমি পর্বতকে করব সঞ্চালিত[1] এবং তুমি পৃথিবীকে দেখবে একটি শূন্য প্রান্তর; সেদিন মানুষকে আমি একত্রিত করব এবং তাদের কাউকেও অব্যাহতি দেব না। [2]


তাফসীর:

[1] এখানে কিয়ামতের ভয়াবহতা এবং তার বড় বড় ঘটনাবলী বর্ণিত হয়েছে। পর্বতকে সঞ্চালিত করার অর্থ, পাহাড় তার স্থান থেকে সরে যাবে এবং তা ধূনিত পশমের মত উড়তে থাকবে। وَتَكُونُ الْجِبَالُ كَالْعِهْنِ الْمَنْفُوشِ ‘‘এবং পাহাড়গুলো ধূনিত রঙিন পশমের মত হয়ে যাবে।’’ (সূরা ক্বারেআহ ৫ আয়াত) আরো দেখুন, সূরা তূরের ৯-১০, সূরা নাম্লের ৮৮ এবং সূরা ত্বহা র ১০৫-১০৭নং আয়াতগুলো। যমীন থেকে এই শক্তিশালী পাহাড়গুলো যখন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, তখন ঘর-বাড়ী, গাছপালা এবং এই ধরনের অন্যান্য জিনিসগুলো কিভাবে সব সব অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারে? এই জন্যই পরে বলা হয়েছে, ‘‘তুমি যমীনকে দেখবে একটি শূন্য প্রান্তর।’’

[2] অর্থাৎ, পূর্বের ও পরের, ছোট ও বড় এবং কাফের ও মু’মিন সকলকেই একত্রিত করব। কেউ যমীনের তলায় পড়ে থাকবে না এবং কবর থেকে বেরিয়ে কোথাও লুকাতে পারবে না।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৪৭-৪৯ নং আয়াতের তাফসীর:



উক্ত আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার পূর্ব মুহুর্তে আকাশ-জমিনে যে ভয়াবহতা সৃষ্টি হবে তার বর্ণনা দিচ্ছেন। সেদিন যেসব বিস্ময়কর বড় বড় কাজ সংঘটিত হবে তার মধ্যে কয়েকটি তুলে ধরা হয়েছে। সেদিন পাহাড়গুলো উড়তে থাকবে, পৃথিবী শূন্য প্রান্তরে পরিণত হবে। গাছ-পালা, তরু-লতা কোন কিছুই থাকবে না। পৃথিবী ধূ-ধূ মরুভূমিতে পরিণত হয়ে যাবে।



আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(فَإِذَا نُفِخَ فِي الصُّوْرِ نَفْخَةٌ وَّاحِدَةٌ لا‏ وَّحُمِلَتِ الْأَرْضُ وَالْجِبَالُ فَدُكَّتَا دَكَّةً وَّاحِدَةً لا ‏ فَيَوْمَئِذٍ وَّقَعَتِ الْوَاقِعَةُ)‏



“যখন শিংগায় ফুৎকার দেওয়া হবে একটি মাত্র ফুৎকার। আর পৃথিবী ও পর্বতমালাকে উত্তোলন করা হবে এবং একই ধাক্কায় চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়া হবে। সেদিন যা সংঘটিত হওয়ার তা অর্থাৎ কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে।” (সূরা হাক্কাহ ৬৯:১৩-১৫)



আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:



(وَّسُيِّرَتِ الْـجِبَالُ فَكَانَتْ سَرَابًا‏)‏



“এবং পাহাড়সমূহকে চলমান করা হবে, ফলে সেগুলো হয়ে যাবে মরীচিকা।” (সূরা নাবা ৭৮:২০) কিয়ামতের পূর্ব অবস্থা ও কিয়ামতের ভয়াবহতা কুরআনের ত্রিশতম পারায় আল্লাহ তা‘আলা বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।



আর সেদিন সকলকে কাতারবদ্ধভাবে আল্লাহ তা‘আলার সম্মুখে উপস্থিত করা হবে। মানুষ জন্মের দিন দুনিয়াতে যেভাবে খৎনাবিহীন উলঙ্গ অবস্থায় এসেছিল ঠিক কিয়ামতের দিন সেভাবে আল্লাহ তা‘আলার সামনে উপস্থিত হবে।



নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:



إِنَّكُمْ مَحْشُورُونَ حُفَاةً عُرَاةً غُرْلًا، ثُمَّ قَرَأَ: {كَمَا بَدَأْنَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُعِيدُهُ وَعْدًا عَلَيْنَا إِنَّا كُنَّا فَاعِلِيْنَ



তোমাদেরকে হাশরের ময়দানে উপস্থিত করা হবে নগ্ন পায়ে, উলঙ্গ ও খাৎনাবিহীন অবস্থায়। ইচ্ছা করলে এ আয়াত তেলাওয়াত করতে পারো। “যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম সেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করব; এ আমার কৃত ওয়াদা, আমি এটা পালন করবই।” (সূরা আম্বিয়া ২১:১০৪)



আর তথায় তাদের আমলনামাগুলো পেশ করা হবে। কারো আমলনামায় কোন প্রকার হ্রাস-বৃদ্ধি করা হবে না। বরং যে যা আমল করবে ঠিক তা-ই সেখানে উপস্থিত পাবে, যা দেখে তারা অবাক হয়ে যাবে এবং বলবে: এটা কেমন কিতাব যা ছোট-বড় সবকিছু লিখে রেখেছে যাতে কোন কিছু বাদ নেই।



আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(وَكُلَّ إِنْسَانٍ أَلْزَمْنٰهُ طَآئِرَه۫ فِيْ عُنُقِه۪ ط وَنُخْرِجُ لَه۫ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كِتٰبًا يَّلْقَاهُ مَنْشُوْرًا ‏ اِقْرَأْ كِتٰبَكَ ط كَفٰي بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيْبًا) ‏



“প্রত্যেক মানুষের কর্ম আমি তার গ্রীবালগ্ন করেছি এবং কিয়ামতের দিন আমি তার জন্য বের করব এক কিতাব, যা সে পাবে উন্মুক্ত। ‘তুমি তোমার কিতাব পাঠ কর‎, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসেব নিকেশের জন্য যথেষ্ট।’’ (সূরা ইসরা ১৭:১৩-১৪)



আর ঐ কিতাবে মানুষ তাঁর সমস্ত জীবনে যা আমল করেছে তার সকল কিছুই লিপিবদ্ধ থাকবে। আল্লাহ তা‘আলা সেই আমল অনুপাতে তাদের মধ্যে ফায়সালা করে দেবেন। বিন্দু পরিমাণ জুলুম করবেন না।



আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(وَنَضَعُ الْمَوَازِيْنَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيٰمَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا ط وَإِنْ كَانَ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِّنْ خَرْدَلٍ أَتَيْنَا بِهَا ط وَكَفٰي بِنَا حٰسِبِيْنَ)‏



“এবং কিয়ামত দিবসে আমি স্থাপন করব ন্যায়বিচারের মানদণ্ড। সুতরাং কারও প্রতি কোন অবিচার করা হবে না এবং কর্ম যদি সরিষার দানা পরিমাণ ওজনেরও হয় তবুও সেটা আমি উপস্থিত করব; হিসেব গ্রহণকারীরূপে আমিই যথেষ্ট।” (সূরা আম্বিয়া ২১:৪৭)



সুতরাং কিয়ামত দিবসে সকল কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। সেদিন সকল মানুষকে আল্লাহ তা‘আলার সামনে উপস্থিত করা হবে এবং তাদের আমল অনুপাতে বিচার করা হবে, তাদের প্রতি কোন প্রকার জুলুম করা হবে না।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. কিয়ামত একদিন অবশ্যই সংঘটিত হবে।

২. সকল মানুষকে আল্লাহ তা‘আলার সম্মুখে হাজির করা হবে।

৩. মানুষের সকল কাজ-কর্ম লিখে রাখা হয়।

৪. মানুষের প্রতি কোন প্রকার জুলুম করা হবে না।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৪৭-৪৯ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের ভয়াবহতার বর্ণনা দিচ্ছেন। সেই দিন যে সব বিস্ময়কর বড় বড় কাজ সংঘটিত হবে, তিনি সেগুলি বর্ণনা করছেন। সেই দিন আকাশ ফেটে যাবে এবং পাহাড়-পর্বত উড়তে থাকবে যদিও তোমরা একে জমাটবদ্ধ দেখতে পাচ্ছ, কিন্তু ঐ দিন তা মেঘমালার মত দ্রুতবেগে চলতে থাকবে এবং ধূনো তুলোর মত হয়ে যাবে। যমীন সম্পূর্ণরূপে সমতল ভূমিতে পরিণত হবে। তাতে কোন উঁচু-নীচু থাকবে না। এই যমীনে না থাকবে কোন বাড়ীঘর, না থাকবে কোন ছাউনি। কোন আড়াল ছাড়াই সমস্ত সৃষ্টজীব মহামহিমান্বিত আল্লাহর সামনে হয়ে যাবে। কেউই তার থেকে কোথাও লুকিয়ে থাকতে পারবে না। কোথাও কোন আশ্রয়স্থল ও মাথা লুকানোর জায়গা থাকবে না। কোন গাছ-পালা, পাথর ও তৃণ-লতা দেখা যাবে না। প্রথম থেকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত যত লোক রয়েছে সবাই একত্রিত। হবে। ছোট বড় কেউই অনুপস্থিত থাকবে না। সমস্ত লোক আল্লাহ তাআলার সামনে সাবিরুদ্ধভাবে দাড়িয়ে যাবে। রূহ ও ফেরেশতামণ্ডলী কাতারবন্দি হয়ে দাড়াবেন। কারো কোন কথা বলার সাহস হবে না। একমাত্র তারাই কথা বলতে পারবেন যাদেরকে আল্লাহ কথা বলার অনুমতি দান করবেন এবং তারাও সঠিক কথাই বলবেন। সেদিন সমস্ত মানুষের সারি একটি হবে অথবা তারা কয়েকটি সারিতে বিভক্ত হবে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “তোমার প্রতিপালক আসবেন এবং ফেরেশতারা সারিবদ্ধভাবে আসবে।” কিয়ামতকে যারা অস্বীকার করতো তাদেরকে সেইদিন ধমকের সূরে বলা হবেঃ দেখো, যেমন ভাবে আমি তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম, তেমনিভাবে দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করে আমার সামনে দাড় করিয়েছি। তোমরা তো এটা অস্বীকার করতে? আমলনামা তাদের সামনে হাজির করে দেয়া হবে, যাতে ছোট বড়, প্রকাশ্য ও গোপনীয় সমস্ত আমল লিপিবদ্ধ থাকবে। পাপীরা তাদের দুষ্কর্মগুলি দেখে ভীত বিহ্বল হয়ে পড়বে এবং অত্যন্ত আফসোস করে বলবেঃ হায়! আমরা আমাদের জীবন ও আয়ুকে কি অবহেলায় না কাটিয়ে দিয়েছিলাম। বড়ই অনুতাপ যে, আমরা দুনিয়ায় শুধু দুষ্কার্যেই লিপ্ত থাকতাম। দেখো, এমন কোন কাজ নেই যা এই কিতাবে (আমলনামায়) লিখা পড়ে নাই। বরং ছোট-বড় সমস্ত গুনাহর কাজ এতে লিপিবদ্ধ রয়েছে।

বর্ণিত আছে যে, সাহাবীগণ বলেনঃ “হুনায়েনের যুদ্ধ শেষে আমরা। মদীনায় প্রত্যাবর্তন করছিলাম। পথিমধ্যে এক ময়দানে আমরা সওয়ারী হতে অবতরণ করি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে বলেনঃ “যাও লাকড়ি, খড়ি, ডাল-পাতা, কঞ্চি, ছিটকি যা পাবে কুড়িয়ে নিয়ে এসো।” আমরা এদিক ওদিক ছুটে পড়লাম এবং ডাল, পাতা, কাঁটা খোচ, লাকড়ি, যা কিছু কুড়িয়ে নিয়ে আসলাম এবং এগুলোর একটি বড় ঢেরি হয়ে গেল। এ দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “এই ভাবেই গুনাহ্ জমা হয়ে ঢেরি হয়ে যায়। আল্লাহকে তোমরা ভয় করতে থাকো এবং ছোট বড় গুনাহ হতে পরহেয করো। সবই লিখে নেয়া হচ্ছে ও গণনা করা হচ্ছে। ভাল মন্দ যে যা কিছু করেছে তা সে বিদ্যমান পাবে। (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) যেমন (আরবী) ও (আরবী) এসব আয়াতে রয়েছে। অর্থাৎ সেই দিন গোপনীয় সবকিছুই প্রকাশিত হয়ে যাবে।

রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকের জন্যে কিয়ামতের দিন একটি পতাকা থাকবে। এই পতাকা হবে তাদের বিশ্বাসঘাতকতা অনুযায়ী, এর দ্বারা তারা পরিচিত হবে। অন্য হাদীসে আছে যে, ঐ ঝাণ্ডাটি তার উরুর পার্শ্বে থাকবে এবং ঘোষণা করা হবেঃ “এটা অমুকের পুত্র অমুকের বিশ্বাসঘাতকতা।

মহান আল্লাহ বলেনঃ “তোমার প্রতিপালক কারো প্রতি জুলুম করেন না। ক্ষমা ও মাফ করে দেয়া তার বিশেষণ। হাঁ, তবে পাপী ও অপরাধীদেরকে তিনি স্বীয় ক্ষমতা, নিপুণতা এবং আদল ও ইনসাফের সাথে শাস্তি প্রদান করে থাকেন।”

অপরাধী ও অবাধ্য লোকদের দ্বারা জাহান্নাম পরিপূর্ণ হয়ে যাবে। তারপর কাফির ও মুশরিকরা ছাড়া মু'মিনরা পরিত্রাণ পেয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা এক অনু পরিমাণও অন্যায় করেন না। তিনি পুণ্যকে বৃদ্ধি করে দেন এবং পাপকে সমান রাখেন। ন্যায়ের দাড়িপাল্লা সেদিন সামনে থাকবে। কারো সাথে কোন দুর্ব্যবহার করা হবে না।

হযরত জাবির ইবনু আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে একটি হাদীস শুনেছেন এই খবর অামার কাছে পৌঁছে। ঐ হাদীসটি আমি স্বয়ং তার মুখে শুনবার উদ্দেশ্য একটি উট ক্রয় করি এবং ওর উপর আসবাবপত্র উঠিয়ে নিয়ে সফরে বেরিয়ে পড়ি। সুদীর্ঘ এক মাসের ভ্রমণের পর সন্ধ্যার সময় আমি তাঁর কাছে পৌঁছি। সেখানে পৌঁছে জানতে পারি যে, তিনি হলেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনু উনায়েস (রাঃ)। আমি দারওয়ানকে বললামঃ যাও, তাকে খবর দাও যে, যাবির (রাঃ) দরবার উপর পঁড়িয়ে রয়েছেন। তিনি খবর পেয়ে জিজ্ঞেস করেনঃ “জাবির ইবনু আবদিল্লাহ কি?” আমি উত্তরে বললামঃ জ্বি, হাঁ। এটা শোনা মাত্রই তিনি গায়ের চাদর ঠিক করতে করতে তড়িৎ গতিতে আমার কাছে ছুটে আসলেন। এসেই তিনি আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। মুআনাকার (কাধে কাধ মেলানোর পর আমি তাকে বললামঃ “আমি খবর পেয়েছি যে, আপনি কিসাসের ব্যাপারে কোন একটি হাদীস রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শুনেছেন। আমি স্বয়ং আপনার মুখে ঐ হাদীসটি শুনবার উদ্দেশ্য এখানে এসেছি এবং খবর শোনা মাত্রই আমি সফর শুরু করেছি এই ভয়ে যে, এই হাদীসটি শুনবার পূর্বেই হয়তো আমি মৃত্যুবরণ করি অথবা আপনার মৃত্যু হয়ে যায়। এখন আপনি আমাকে ঐ হাদীসটি শুনিয়ে দিন। তিনি তখন বলতে শুরু করলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলতে শুনেছিঃ “কিয়ামতের দিন মহামহিমান্বিত আল্লাহ তার সমস্ত বান্দাকে তার সামনে একত্রিত করবেন। ঐ সময় তারা উলঙ্গ দেহ ও খৎনাহীন অবস্থায় থাকবে। তাদের কাছে কোনই আসবাবপত্র থাকবে না। তারপর তাদের সামনে ঘোষণা করা হবে যে, ঘোষণা নিকটবর্তী ও দূরবর্তী সবাই সমানভাবে শুনতে পাবে। মহান আল্লাহ বলবেনঃ “আমি মালিক। আমি বিনিময় প্রদানকারী। ততক্ষণ পর্যন্ত কোন জাহান্নামী জাহান্নামে যাবে না যতক্ষণ না আমি তার ঐ হক আদায় করে না দেবো যা কোন জান্নাতীর জিম্মায় রয়েছে। আর কোন জান্নাতীও জান্নাতে যেতে পারবে না যতক্ষণ না আমি তার ঐ প্রাপ্য আদায় করে দেবো যা কোন জাহান্নামীর যিম্মায় রয়েছে। ঐ হক বা প্রাপ্য যতই ক্ষুদ্র হোক না কেন।` আমরা জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা সবাই তো সেদিন উলঙ্গ দেহ ও মালধন শূন্য অবস্থায় থাকবে, এ অবস্থায় কেমন করে প্রাপ্য আদায় করা। হবে? তিনি উত্তরে বলেনঃ “হাঁ (যেভাবেই হোক না কেন), সেই দিন পুণ্যবান ও পাপীদের নিকট থেকে হক বা প্রাপ্য আদায় করে নেয়া হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন) অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কোন শিং বিহীন বকরীকে যদি কোন শিং বিশিষ্ট বকরী শিং দ্বারা গুঁতো মেরে থাকে তবে তার থেকেও প্রতিশোধ গ্রহণ করিয়ে দেয়া হবে। এর আরো বহু প্রমাণ রয়েছে। যেগুলি আমরা (আরবী) (২১:৪৭) এই আয়াতের তাফসীরে এবং (আরবী) (৬:৩৮) এই আয়াতের তাফসীরে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছি।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।