আল কুরআন


সূরা আল-কাহফ (আয়াত: 25)

সূরা আল-কাহফ (আয়াত: 25)



হরকত ছাড়া:

ولبثوا في كهفهم ثلاث مائة سنين وازدادوا تسعا ﴿٢٥﴾




হরকত সহ:

وَ لَبِثُوْا فِیْ کَهْفِهِمْ ثَلٰثَ مِائَۃٍ سِنِیْنَ وَ ازْدَادُوْا تِسْعًا ﴿۲۵﴾




উচ্চারণ: ওয়া লাবিছূফী কাহফিহিম ছালা-ছা মিআতিন ছিনীনা ওয়াযদা-দূতিছ‘আ-।




আল বায়ান: আর তারা তাদের গুহায় অবস্থান করেছে তিনশ’ বছর এবং এর সাথে অতিরিক্ত হয়েছিল ‘নয়’।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৫. আর তারা তাদের গুহায় ছিল তিনাশ বছর, আরো নয় বছর বেশী।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: আর (কারো মতে) তারা তাদের গুহায় ছিল তিনশ’ বছর আর কিছু লোক নয় বছর বাড়িয়ে নিয়েছে।




আহসানুল বায়ান: (২৫) তারা তাদের গুহায় ছিল তিনশ’ বছর, অতিরিক্ত আরো নয় বছর। [1]



মুজিবুর রহমান: তারা তাদের গুহায় ছিল তিন শ’ বছর, আরও নয় বছর।



ফযলুর রহমান: তারা তাদের গুহায় (সৌরবর্ষের হিসাবে) তিনশত বছর ও (চানদ্রবর্ষের হিসাবে) নয় বছর বেশি অবস্থান করেছিল।



মুহিউদ্দিন খান: তাদের উপর তাদের গুহায় তিনশ বছর, অতিরিক্ত আরও নয় বছর অতিবাহিত হয়েছে।



জহুরুল হক: আর তারা তাদের গুহায় অবস্থান করেছিল তিন শত বছর, আর কেউ যোগ করে নয়।



Sahih International: And they remained in their cave for three hundred years and exceeded by nine.



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ২৫. আর তারা তাদের গুহায় ছিল তিনাশ বছর, আরো নয় বছর বেশী।(১)


তাফসীর:

(১) এ আয়াতে একটি বিরোধপূর্ণ আলোচনার ফয়সালা করা হয়েছে। অর্থাৎ গুহায় নিদ্রামগ্ন থাকার সময়কাল। এ আয়াতের তাফসীরে কোন কোন মুফাসসিরের মতে, এ বাক্যে তিনশ ও নয় বছরের যে সংখ্যা বর্ণনা করা হয়েছে তা লোকদের উক্তি, এটা আল্লাহর উক্তি নয়। অর্থাৎ এখানে মতভেদকারীদের মত উল্লেখ করা হয়েছে। [দেখুন, ফাতহুল কাদীর] তবে বিশুদ্ধ মত হচ্ছে যে, এখানে আল্লাহ্ তা'আলা পক্ষ থেকে তাদের গুহায় অবস্থানের কাল বর্ণনা করা হয়েছে। সে হিসাবে এ আয়াতে বলে দেয়া হয়েছে যে, এই সময়কাল তিনশ' নয় বছর। এখন কাহিনীর শুরুতে (فَضَرَبْنَا عَلَىٰ آذَانِهِمْ فِي الْكَهْفِ سِنِينَ عَدَدًا) বলে যে বিষয়টি সংক্ষেপে বলা হয়েছিল, এখানে যেন তাই বর্ণনা করে দেয়া হল। [ইবন কাসীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (২৫) তারা তাদের গুহায় ছিল তিনশ’ বছর, অতিরিক্ত আরো নয় বছর। [1]


তাফসীর:

[1] অধিকাংশ মুফাসসিরগণ এটাকে আল্লাহর উক্তি গণ্য করেছেন। সৌর মাস হিসাবে ৩০০ এবং চান্দ্র মাস হিসাবে ৩০৯ বছর হয়। কোন কোন আলেমের ধারণা হল, এটা তাদেরই কথা, যারা তাদের সংখ্যার ব্যাপারে বিভিন্ন মত পেশ করছিল। আর এর দলীল হল আল্লাহর এই বাণী, ‘‘তুমি বল, তারা কত কাল ছিল, তা আল্লাহই ভাল জানেন।’’ বলা বাহুল্য তাঁরা এরই ভিত্তিতে (আয়াতে) উল্লিখিত মেয়াদের খন্ডন করার অর্থ নিয়ে থাকেন। কিন্তু অধিকাংশ মুফাসসিরদের তফসীর অনুযায়ী এর অর্থ এই যে, আহলে-কিতাব অথবা অন্য কেউ যদি (আয়াতে) বর্ণিত এই সময়-কালের ব্যাপারে বিরোধিতা করে, তবে তুমি তাদেরকে বলে দাও যে, তোমরা বেশী জান, না আল্লাহ? তিনি যখন ৩০৯ বছরের কথা বলেছেন, তখন এটাই সঠিক। কেননা, তিনিই জানেন তারা কত বছর গুহায় ছিল?


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৯-২৬ নং আয়াতের তাফসীর:



উক্ত আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা “আসহাবে কাহ্ফের” ঘটনা উল্লেখ করেছেন। এটা ছিল একটা আশ্চর্যজনক ঘটনা। কাহফ বলা হয় পাহাড়ের গুহাকে। সেখানে এই যুবকরা লুকিয়ে গিয়েছিল।



আর “রকীম” দ্বারা উদ্দেশ্য কী এ নিয়ে অনেক মতামত পাওয়া যায়। কেউ বলেছেন, কুকুরের নাম রকীম।



যহ’হাক (রহঃ) বলেন: “রকীম” হল ঐ উপত্যকার নাম যেখানে আসহাবে কাহ্ফরা ছিল।



মুজাহিদ (রহঃ) বলেন: “রকীম” একটা অট্টালিকার নাম।



ইমাম শানকিতী (রহঃ) বলেন: ভাষা ও কুরআনের অন্যান্য আয়াতের দৃষ্টিকোণ থেকে আমার কাছে সঠিক মনে হয় রকীম একটি কিতাবের নাম যা তাদের কাছে ছিল। এ কিতাবে তাদের শরয়ী বিধি-বিধান লেখা ছিল তারা যার অনুসরণ করত।



অথবা স্বর্ণের ফলক তাতে তাদের নাম, নসবনামা ও ঘটনা এবং গুহায় চলে যাওয়ার কারণ উল্লেখ ছিল। তবে সঠিক জ্ঞান আল্লাহ তা‘আলার কাছে।



আসহাবে কাহফ ও রকীম কি একই দলের নাম, না তারা আলাদা দুটি দল, নাকি অন্য কিছু এ ব্যাপারে কোন সহীহ হাদীস নেই। তবে ইমাম বুখারী আসহাবে কাহফ ও আসহাবে রকীমের দুটি আলাদা আলাদা শিরোনাম রেখেছেন। অতঃপর আসহাবে রকীম শিরোনামের অধীনে বানী ইসরাঈলের সে তিন ব্যক্তির ঘটনা নিয়ে এসেছেন যারা ঝড়ের কারণে গুহায় আশ্রয় নেয়, পরে গুহার মুখে পাথর পড়ার কারণে আটকে যায়। ইবনু হাজার আসকালানীসহ অধিকাংশ মুফাসসিরদের মতে কুরআনের পূর্বাপর বর্ণনা অনুযায়ী আসহাবে কাহফ ও রকীম একই দল।



“সংক্ষিপ্ত ঘটনা”



গুহায় আশ্রয় গ্রহণকারীরা ছিল কয়েকজন যুবক। তারা সত্য দীনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে হিদায়াত লাভ করে। এই যুবকরা তাঁদের দীনকে রক্ষা করার জন্য নিজেদের কওমের নিকট থেকে পালিয়ে গিয়ে গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করে। এই ভয়ে যে, না জানি তাঁদের কওমের লোকেরা তাঁদেরকে তাঁদের দীন থেকে বিভ্রান্ত করে ফেলে। সেখানে তাঁরা প্রার্থনা করেছিল যে, হে আল্লাহ তা‘আলা! আপনার পক্ষ থেকে আমাদের ওপর রহমত অবতীর্ণ করুন। আমাদেরকে আমাদের কওম হতে লুকিয়ে রাখুন এবং আমাদের এই কাজের পরিণতি ভাল করুন। অতঃপর তাঁরা সেখানে ঘুমিয়ে পড়ে আর এই ঘুমন্ত অবস্থায়ই বহু বছর অতিবাহিত হয়ে যায়। এরপর আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে জাগ্রত করেন। আর তখন তাদের মধ্যে কোন প্রকারের পরিবর্তন সাধিত হয়নি। তারা ঘুমানোর সময় তাদের দেহ, চুল, চামড়া যেরূপ ছিল ঘুম থেকে ওঠার পরও সেরূপই রয়েছে। তারা পরস্পর বলাবলি করতে লাগল। আচ্ছা বলত, আমরা কত সময় ঘুমিয়ে ছিলাম? উত্তরে বলা হয়: একদিন বা একদিনেরও কিছু কম। কেননা, সকালে তারা ঘুমিয়ে গিয়েছিল, আর যখন জেগে ওঠে তখন ছিল সন্ধ্যা। তাই তারা সূর্যের ওপর অনুমান করে এ কথা বলেছে। অবশেষে এর সঠিক সিদ্ধান্ত আল্লাহ তা‘আলার দিকে ন্যস্ত করে।



অতঃপর তারা তাদের ক্ষুধা মিটানোর জন্য তাদের মধ্য থেকে একজনকে মুদ্রাসহ বাজারে পাঠায় কিছু খাদ্য ক্রয় করে আনার জন্য এবং তাকে বলে দেয়, সে যেন খুব সতর্কতার সাথে কাজ করে। যতদূর সম্ভব জনগণের দৃষ্টি এড়িয়ে চলতে হবে, যাতে কেউ আমাদের খবর জানতে না পারে। কারণ যদি তারা আমাদের খবর জানতে পারে তাহলে কঠিন শাস্তি প্রদান করবে আর আমাদের দীনের ব্যাপারে বিভ্রান্ত করে ফেলবে। কারণ বাদশা দাকইয়ানুস, সে ছিল শির্কী মনোভাবাপন্ন এবং সে মূর্তিপূজা করত। আর তাঁরা এই মূর্তিপূজোকে মানতে পারেনি বলেই তাদের দীন রক্ষার জন্য গুহায় আশ্রয় নেয়, যাতে তাদের দ্বারা কোন শির্ক না হয়ে যায়। আর আল্লাহ তা‘আলা এ বিষয়ে তাদের মনকে আরো দৃঢ় চিত্ত করে দিলেন যাতে তারা ভয় না পায়। আল্লাহ তাদের এ গুহায় সূর্যের মাধ্যমে আলো প্রবেশ করাতেন।



মানুষেরা মনে করত যে, তারা জাগ্রত; মূলত তারা জাগ্রত ছিল না, তারা ছিল ঘুমন্ত। আর আল্লাহ এ অবস্থায়ই তাদের পার্শ্ব পরিবর্তন করাতেন ডানে ও বামে। আর তাদের সাথে একটি কুকুর ছিল। ঐ কুকুরটি তার সম্মুখের পা দু‘টি গুহার দ্বারে প্রসারিত করে রেখেছিল। মানুষেরা এই দৃশ্য দেখলে ভয় পেত। এটি ছিল একটি ভয়ানক দৃশ্য। তারা সে গুহায় ঐ ঘুমন্ত অবস্থায় তিনশত নয় বছর ছিল। আর তাদের সংখ্যা ছিল প্রথমে বলা হয় তিনজন ও চতুর্থজন ছিল তাদের কুকুর। পরবর্তীতে তা খণ্ডন করে বলা হয় পাঁচজন ষষ্ঠজন ছিল তাঁদের কুকুর। তবে তাদের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা ই ভাল জানেন এবং তারা কত বছর ঐ ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন তা-ও একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন। এভাবেই আল্লাহ স্বীয় ক্ষমতার বলে মানুষকে গুহাবাসীদের অবস্থা অবহিত করালেন। যাতে তারা আল্লাহ তা‘আলার ওয়াদা ও কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সত্যতার জ্ঞান লাভ করে।



এ কাহিনীর দুটি অংশ:



১. এ কাহিনীর আসল উদ্দেশ্য হল ইয়াহূদীদের প্রশ্নের জবাব দেয়া ও মুসলিমদেরকে তাওহীদ শিক্ষা দেয়া।



২. কাহিনীর ঐতিহাসিক ও ভৌগলিক পটভূমি উক্ত ঘটনাটি কোন্ কালে, কোন্ স্থানে ও জনপদে ঘটেছিল, কাফির বাদশাটি কে ছিল, তাদের সংখ্যা কত ছিল, তারা কতকাল ঘুমিয়েছিল, তারা কি এখনো জীবিত আছে, না মারা গেছে ইত্যাদি।



কুরআনুল কারীমে একজন নাবীর ঘটনা বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। তিনি হলেন ইউসুফ (عليه السلام), সে সাথে মূসা (عليه السلام)-এর অনেক ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু সম্পূর্ণ নয় যেমন ইউসুফ (عليه السلام)-এর ঘটনা এসেছে। এ ছাড়া কোন ঘটনার বিশদ বর্ণনা কুরআনে আসেনি। প্রত্যেক কাহিনীর ঐ অংশটুকুই বিভিন্ন স্থানে বর্ণনা করা হয়েছে যা মানবীয় হিদায়াত ও শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত। সুতরাং এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা অনর্থক, কোন প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন থাকলে আল্লাহ তা‘আলা নিজে অথবা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তা বলে দিতেন।



সংক্ষিপ্ত তাফসীর:



(أَمْ حَسِبْتَ) অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! তুমি কি মনে করেছ আসহাবে কাহফ ও রকীমের ঘটনা আশ্চর্য ধরণের কোন নিদর্শন? না, বরং আকাশ-জমিন, চন্দ্র-সূর্য ও অন্যান্য বিশাল বিশাল মাখলূক সবই আল্লাহ তা‘আলার বড় বড় নিদর্শন যা আল্লাহ তা‘আলার বড়ত্ব ও মহত্বের ওপর প্রমাণ বহন করে। তিনি যা ইচ্ছা তাই করেন, তাঁেক কোন জিনিস অক্ষম করতে পারে না।



(وَّهَيِّئْ لَنَا مِنْ أَمْرِنَا رَشَدًا)



অর্থাৎ নিজেদের দীন রক্ষার্থে গুহায় আশ্রয় নেয়া যুবকরা আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু’আ করে বলেছিল: সঠিক পথে পৌঁছার উপকরণ সহজ করে দিন এবং উভয় জগতের সফলতা দান করুন। এ অর্থও হতে পারে যে, আমাদের পরিণতি ভাল করে দিন।



(فَضَرَبْنَا عَلٰٓي اٰذَانِهِمْ)



অর্থাৎ কানে পর্দা সৃষ্টি করে দিলেন, যাতে বাইরের আওয়াজ তাদের কানে গিয়ে ঘুমের ব্যাঘাত সৃষ্টি না করে। কয়েক বছর বলতে ৩০৯ বছর। (তাফসীর সা‘দী)



এ দুটি দল বলতে তাদের মধ্যে যে দুটি দল মত বিরোধ করেছিল। যেমন ১৯ নং আয়াতে বলা হয়েছে।



(وَزِدْنٰهُمْ هُدًي)



অর্থাৎ তারা যখন নিজেদের ঈমান রক্ষা করার জন্য গুহায় চলে গেল তাদেরকে দীনের ওপর অটল রাখার জন্য ঈমান বাড়িয়ে দিলাম।



(وَّرَبَطْنَا عَلٰي قُلُوْبِهِمْ)



যেহেতু আত্মীয়-স্বজন, সব কিছু বর্জন করে দেশের বাদশার বিরুদ্ধাচরণ করে চলে যেতে হচ্ছে, তাই জীবন নাশের আশঙ্কা অন্তরে প্রবেশ করতে পারে, তাই তাদের অন্তরকে ঈমানের সাথে বেঁধে দিলাম।



(إِذْ قَامُوْا)

অর্থাৎ এ দাঁড়ানো অধিকাংশ মুফাসসিরদের মতে বাদশার নিকট ছিল। তারা রাজ দরবারে দাঁড়িয়ে তাওহীদের ওয়াজ করছিল। কেউ কেউ বলেছেন, শহর থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়িয়ে একে অপরকে তাওহীদের সে কথা শোনাতে লাগল যা এক এক করে প্রত্যেকের অন্তরে প্রবেশ করে দেয়া হয়েছিল এবং তারা সকলে একত্রিত হয়ে বেরিয়ে আসে।



(تَّزَاوَرُ عَنْ كَهْفِهِمْ ذَاتَ الْيَمِيْنِ)



অর্থাৎ সূর্য ওঠার সময় ডান দিকে এবং অস্ত যাবার সময় বাম দিকে পাশ কেটে চলে যায়। আর এভাবে উভয় সময়ে তাদের ওপর সূর্যের আলো পড়ত না। অথচ তারা গুহার প্রশস্ত চত্বরে আরামে অবস্থান করছিল। فَجْوَةٍ অর্থ প্রশস্ত স্থান।



أَيْقَاظًا শব্দটি يقظ এর বহুবচন, অর্থ জাগ্রত। رُقُوْدٌ শব্দটি راقد এর বহুবচন অর্থ ঘুমন্ত। অর্থাৎ তাদেরকে এ জন্য জাগ্রত মনে হচ্ছিল যে, তাদের চোখগুলো জাগ্রত ব্যক্তির মত খোলা ছিল। কেউ বলেছেন: খুব বেশি পার্শ্ব পরিবর্তন করার কারণে তাদরেকে জাগ্রত মনে হচ্ছিল।



(وَكَذٰلِكَ بَعَثْنٰهُمْ)



অর্থাৎ তাদেরকে যেভাবে আমি নিজ কুদরতে ৩০৯ বছর ঘুমের মধ্যে রেখেছিলাম তেমনি কত কাল অবস্থান করেছে তা জিজ্ঞেস করার জন্য জাগ্রত করেছি।



(لِيَعْلَمُوْآ أَنَّ وَعْدَ اللّٰهِ حَقٌ)



অর্থাৎ তাদেরকে আমি যেভাবে ৩০৯ বছর ঘুম পাড়ানোর পর জাগ্রত করেছি তেমনি দুনিয়ার জীবন অতিবাহিত করার পর মৃত্যুর পরে হাজার হাজার বছর অতিত হয়ে গেলেও হিসাব-নিকাশের জন্য পুনরুত্থিত করতে সক্ষম।



(إِذْ يَتَنَازَعُوْنَ بَيْنَهُمْ)



অর্থাৎ তাদের সম্পর্কে সে সময় অবগত করালেন যখন তারা মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের এবং কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারে আপোসে বিতর্কে লিপ্ত ছিল।



(فَقَالُوا ابْنُوا عَلَيْهِمْ بُنْيَانًا)



‘তাদের ওপর সৌধ নির্মাণ কর‎।’ এ কথা কে বলেছিল? কেউ বলেছেন, সে যুগের ঈমানদারগণ। কেউ বলেছেন; বাদশা ও তার সাথের লোকেরা যখন সেখানে গিয়ে তাদের সাথে সাক্ষাত করল এবং এরপর আল্লাহ তা‘আলা পুনরায় তাদেরকে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন। তখন বাদশা ও তার সাথীরা বলল: এদের হেফাযত করার জন্য একটি প্রাসাদ নির্মাণ কর।



(الَّذِيْنَ غَلَبُوْا عَلٰٓي أَمْرِهِمْ)



এ প্রবল দলটি ঈমানদার ছিল, না কাফির মুশরিক ছিল? ইমাম শাওকানী প্রথম মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন। ইবনু কাসীর দ্বিতীয় মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কারণ কবরকে মাসজিদে পরিণত করা নিষেধ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: ইয়াহূদী ও খ্রিস্টানদের ওপর আল্লাহ তা‘আলার লা‘নত, তারা তাদের নাবীদের কবরকে মাসজিদ হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে। (সহীহ বুখারী হা: ৪৩৫) সুতরাং ঈমানদাররা এ কাজ করতে পারে না।



(سَيَقُوْلُوْنَ)



অর্থাৎ আসহাবে কাহফের সংখ্যা সম্পর্কে মতানৈক্য করেছিল রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগের আহলে কিতাবরা। তাই আয়াতের শেষের দিকে তাদের সংখ্যা সম্পর্কে আহলে কিতাবদেরকে জিজ্ঞেস করতে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নিষেধ করা হয়েছে।



(وَلَا تَقُوْلَنَّ لِشَیْءٍ)



এখানে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নির্দেশ দিয়ে উম্মাতের সকলকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের কোন কাজ করতে হলে এ কথা বলা যাবে না: আগামী কাল আমি এ কাজ করব। বরং বলবে: ইনশা-আল্লাহ তা‘আলা আগামীকাল এ কাজ করব। কারণ হতে পারে আগামী কাল সে উক্ত কাজ নাও করতে পারে।



আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: সুলাইমান ইবনু দাউদ (عليه السلام) বলেছেন: অবশ্যই আমি আজ রাতে (আমার) সত্তরজন স্ত্রীর সাথে সহবাস করব। প্রত্যেক স্ত্রী একজন করে অশ্বারোহী মুজাহিদ গর্ভ ধারণ করবে। এরা আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় জিহাদ করবে। সুলাইমান (عليه السلام)-এর এক সাথী বলল: ইনশা-আল্লাহ বলেন। সুলাইমান (عليه السلام) তা বললেন না। অতঃপর একজন স্ত্রী ছাড়া বাকী আর কেউ গর্ভ ধারণ করেনি। সে একটি পুত্র সন্তান প্রসব করল এবং তারও একটি অঙ্গ ছিল না। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: যদি তিনি ইনশা-আল্লাহ বলতেন তাহলে সব স্ত্রীর গর্ভেই সন্তান জন্ম নিত এবং আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় জিহাদ করতো। (সহীহ বুখারী হা: ৩৪২৪, সহীহ মুসলিম হা: ১৬৫৪)



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. যদি জনসমাজে থাকার ফলে ঈমান হারানোর আশঙ্কা থাকে তাহলে তা প্রত্যাখ্যান করা জায়েয।

২. আকাশ ও জমিনের প্রতিপালক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা।

৩. হিদায়াত আল্লাহ তা‘আলার হাতে অন্য কেউ হিদায়াতের মালিক নয়।

৪. যা না জানলে দীনের কোন ক্ষতি হবে না তা জানা আবশ্যক নয়।

৫. কিয়ামত অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে।

৬. কবরের ওপর মাসজিদ বা সৌধ নির্মাণ করা যাবে না।

৭. কোন অনিশ্চিত বিষয় সম্পর্কে তর্ক বিতর্ক না করে আল্লাহ তা‘আলার দিকে ন্যস্ত করতে হবে।

৮. ভবিষ্যতের কোন কাজের ব্যাপারে অবশ্যই ইনশা-আল্লাহ তা‘আলা বলতে হবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ২৫-২৬ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবীকে (সঃ) ঐ সময়কালের খবর দিচ্ছেন, যে সময়কাল পর্যন্ত গুহাবাসীরা তাদের গুহার মধ্যে নিদ্রিত অবস্থায় অবস্থান করে ছিলেন। ঐ সময়কাল ছিল সূর্যের হিসেবে তিন শ' বছর এবং চন্দ্রের হিসেবে তিনি শ’ নয় বছর। প্রকৃতপক্ষে শামসী ও কামরী বছরের মধ্যে প্রতি একশ বছরের তিন বছরের পৃথকভাবে বর্ণনা করার পর নয় বছর আলাদাভাবে বর্ণনা করেছেন।

এরপর মহান আল্লাহ স্বীয় নবীকে (সঃ) সম্বোধন করে বলছেনঃ “হে বী (সঃ)! যদি তোমাকে গুহাবাসীদের শয়নকাল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয় এবং তোমার এর সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকে এবং আল্লাহ তাআলাও তোমাকে তা জানিয়ে না থাকেন, তবে তুমি সামনে বেড়ে যেয়ো না এবং এরূপ স্থলে উত্তর দাওঃ এর সঠিক জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর রয়েছে। আসমান ও যমীনের গায়েবের খবর তিনিই রাখেন। তবে তিনি যাকে জানিয়ে দেন সে জানতে পারে।”

কাতাদা (রঃ) বলেন যে, তারা গুহায় তিন শ’ বছর ছিলেন এটা আহলে কিতাবের উক্তি। আল্লাহ তাআলা এই উক্তিটি খণ্ডন করেছেন এবং বলেছেনঃ এরপূর্ণ ও সঠিক জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর রয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ)। হতেও এই অর্থের কিরআত বর্ণিত আছে। কিন্তু কাতাদার (রঃ) উক্তিটি বিবেচনাধীন। কেননা, আহলে কিতাবের মধ্যে শামসী বছরের প্রচলন রয়েছে। এবং তারা গুহাবাসীদের অবস্থানের সময়কাল তিন শ’বছর মেনে থাকে। তিন শ’ নয় বছর তাদের উক্তি নয়। যদি এটা তাদেরই উক্তি হতো, তবে আল্লাহ তাআলা একথা বলতেন না যে, তারা তিনশ’ বছর ঘুমিয়েছিল এবং আরো নয় বছর বেশী করেছিল। বাহ্যতঃ তো এটাই ঠিক মনে হচ্ছে যে, স্বয়ং আল্লাহ তাআলা এটার খবর দিচ্ছেন, কারো উক্তি তিনি বর্ণনা করছেন না। এটাই ইমাম ইবনু জারীর (রাঃ) গ্রহণ করেছেন। কাতাদার (রাঃ) রিওয়াইয়াত এবং হযরত ইবনু মাসউদের (রঃ) কিরআত দু'টোই ছেদ কাটা এবং অতি বিরলও বটে জমহূরের কিরআত ওটাই যা কুরআনে রয়েছে। তিনি বিরল দলীলের পক্ষপাতি নন।

আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদেরকে খুবই দেখতে রয়েছেন এবং তাদের কথাও তিনি বেশ শুনতে রয়েছেন। এই দু'টি শব্দে প্রশংসার আধিক্য রয়েছে। অর্থাৎ “খুব বেশী শ্রোতা ও খুব বেশী দ্রষ্টা। প্রত্যেক বিদ্যমান জিনিস তিনি দেখতে রয়েছেন এবং সমস্ত কথা তিনি শুনতে রয়েছেন। কোন কাজ ও কোন কথা তার কাছে গোপন নেই। তাঁর চেয়ে বেশী কেউ শ্রবণকারীও নেই এবং দর্শনকারীও নেই। প্রত্যেকের আমল তিনি দেখতে রয়েছেন এবং প্রত্যেকের কথা তিনি শুনতে রয়েছেন। সৃষ্টির স্রষ্টা এবং হুকুমের মালিক তিনিই। কেউ তার আদেশকে প্রতিরোধ করতে পারে না। তার কোন উযীর ও সাহায্যকারী নেই। তাঁর কোন অংশীদারও নেই এবং কোন পরামর্শদাতাও নেই। তিনি এই সমূদয় অভাব হতে মুক্ত ও পবিত্র। এই সব ত্রুটি হতে তিনি সম্পূর্ণরূপে মুক্ত।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।