সূরা আল-কাহফ (আয়াত: 18)
হরকত ছাড়া:
وتحسبهم أيقاظا وهم رقود ونقلبهم ذات اليمين وذات الشمال وكلبهم باسط ذراعيه بالوصيد لو اطلعت عليهم لوليت منهم فرارا ولملئت منهم رعبا ﴿١٨﴾
হরকত সহ:
وَ تَحْسَبُهُمْ اَیْقَاظًا وَّ هُمْ رُقُوْدٌ ٭ۖ وَّ نُقَلِّبُهُمْ ذَاتَ الْیَمِیْنِ وَ ذَاتَ الشِّمَالِ ٭ۖ وَ کَلْبُهُمْ بَاسِطٌ ذِرَاعَیْهِ بِالْوَصِیْدِ ؕ لَوِ اطَّلَعْتَ عَلَیْهِمْ لَوَلَّیْتَ مِنْهُمْ فِرَارًا وَّ لَمُلِئْتَ مِنْهُمْ رُعْبًا ﴿۱۸﴾
উচ্চারণ: ওয়া তাহছাবুহুম আইকা-জাওঁ ওয়া হুম রুকূদুওঁ ওয়া নুকালিলবুহুম যা-তাল ইয়ামীনি ওয়া যা-তাশশিমা-লি ওয়াকালবুহুম বা-ছিতু ন যিরা-‘আইহি বিল ওয়াসীদি লাবিততালা‘তা ‘আলাইহিম লাওয়াল্লাইতা মিনহুম ফিরা-রাওঁ ওয়ালামুলি’তা মিনহুম রু‘বা-।
আল বায়ান: তুমি তাদেরকে মনে করতে জাগ্রত, অথচ তারা ছিল ঘুমন্ত, আমি তাদেরকে পাশ পরিবর্তন করাচ্ছি ডানে ও বামে এবং তাদের কুকুরটি আঙিনায় তার সামনের দু’পা বাড়িয়ে আছে। যদি তুমি তাদেরকে উঁকি মেরে দেখতে, তবে নিশ্চয় তাদের থেকে পেছনে ফিরে পালিয়ে যেতে এবং অবশ্যই তাদের কারণে ভীষণ ভীত হতে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৮. আর আপনি মনে করতেন তারা জেগে আছে, অথচ তারা ছিল ঘুমন্ত।(১) আর আমরা তাদেরকে পাশ ফিরাতাম ডান দিকে ও বাম দিকে(২) এবং তাদের কুকুর ছিল সামনের পা দুটি গুহার দরজায় প্রসারিত করে। যদি আপনি তাদের প্রতি তাকিয়ে দেখতেন, তবে অবশ্যই আপনি পিছন ফিরে পালিয়ে যেতেন। আর অবশ্যই আপনি তাদের ভয়ে আতংকগ্ৰস্ত হয়ে পড়তেন;(৩)
তাইসীরুল ক্বুরআন: তুমি মনে করবে যে তারা সজাগ, অথচ তারা ছিল ঘুমন্ত, আমি তাদের ডানে বামে পার্শ্ব পরিবর্তন করাতাম। আর তাদের কুকুরটি ছিল গুহাদ্বারের সম্মুখে তার সামনের পা দু’টি প্রসারিত করে। তুমি যদি তাদেরকে তাকিয়ে দেখতে তাহলে অবশ্যই পেছন ফিরে পালিয়ে যেতে, আর অবশ্যই তাদের ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়তে।
আহসানুল বায়ান: (১৮) তুমি মনে করতে, তারা জাগ্রত; কিন্তু আসলে তারা নিদ্রিত।[1] আমি তাদেরকে পার্শ্ব পরিবর্তন করাতাম ডানে ও বামে[2] এবং তাদের কুকুর ছিল সম্মুখের পা দুটি গুহার দ্বারে প্রসারিত করে; তাকিয়ে তাদেরকে দেখলে তুমি পিছনে ফিরে পালিয়ে যেতে ও তাদের ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়তে।[3]
মুজিবুর রহমান: তুমি মনে করতে তারা জাগ্রত, কিন্তু তারা ছিল নিদ্রিত; আমি তাদেরকে পার্শ্ব পরিবর্তন করাতাম ডানে ও বামে এবং তাদের কুকুর ছিল সম্মুখের পা দু’টি গুহাদ্বারে প্রসারিত করে; তাকিয়ে তাদেরকে দেখলে তুমি পিছন ফিরে পালিয়ে যেতে এবং তাদের ভয়ে আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়তে।
ফযলুর রহমান: তুমি তাদেরকে (দেখলে) মনে করতে, তারা জাগ্রত; অথচ তারা ছিল ঘুমন্ত। আমি তাদেরকে ডানে ও বামে এপাশ-ওপাশ করাতাম। তাদের কুকুরটি (গুহার) প্রবেশপথে সামনের পা দুঞ্চটো বিছিয়ে (প্রহরারত) থাকত। তুমি যদি তাদের দিকে তাকাতে তাহলে অবশ্যই (ভয় পেয়ে) তাদের থেকে পালানোর জন্য পেছনে ফিরে আসতে এবং তাদের ভয়ে পরিপূর্ণ (সম্পূর্ণ ভীত) হয়ে যেতে।
মুহিউদ্দিন খান: তুমি মনে করবে তারা জাগ্রত, অথচ তারা নিদ্রিত। আমি তাদেরকে পার্শ্ব পরিবর্তন করাই ডান দিকে ও বাম দিকে। তাদের কুকুর ছিল সামনের পা দুটি গুহাদ্বারে প্রসারিত করে। যদি তুমি উঁকি দিয়ে তাদেরকে দেখতে, তবে পেছন ফিরে পলায়ন করতে এবং তাদের ভয়ে আতংক গ্রস্ত হয়ে পড়তে।
জহুরুল হক: আর তুমি তাদের মনে করতে জাগ্রত যদিও তারা ছিল ঘুমন্ত, আর আমরা তাদের পাশ ফিরিয়ে দিতাম ডান দিকে ও বাঁ দিকে, আর তাদের কুকুরটি থাবা মেলে রয়েছিল প্রবেশপথে। তুমি যদি তাদের হঠাৎ দেখতে তবে তাদের থেকে পিছন ফিরতে পলায়নপর হয়ে, আর তুমি নিশ্চয়ই তাদের কারণে ভয়ে বিহল হতে।
Sahih International: And you would think them awake, while they were asleep. And We turned them to the right and to the left, while their dog stretched his forelegs at the entrance. If you had looked at them, you would have turned from them in flight and been filled by them with terror.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৮. আর আপনি মনে করতেন তারা জেগে আছে, অথচ তারা ছিল ঘুমন্ত।(১) আর আমরা তাদেরকে পাশ ফিরাতাম ডান দিকে ও বাম দিকে(২) এবং তাদের কুকুর ছিল সামনের পা দুটি গুহার দরজায় প্রসারিত করে। যদি আপনি তাদের প্রতি তাকিয়ে দেখতেন, তবে অবশ্যই আপনি পিছন ফিরে পালিয়ে যেতেন। আর অবশ্যই আপনি তাদের ভয়ে আতংকগ্ৰস্ত হয়ে পড়তেন;(৩)
তাফসীর:
(১) অর্থাৎ আপনি যদি তাদেরকে গুহায় অবস্থানকালে দেখতে পেতেন তাহলে মনে করতেন যে, তারা জেগে আছে অথচ তারা ঘুমন্ত। তাদেরকে জেগে আছে মনে করার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে যে, তারা পাশ ফিরাচ্ছে। আর যারা পাশ ফিরে শুতে পারে তারা সামান্য হলেও জাগ্রত হয়। অথবা কারও কারও মতে, তারা ঘুমন্ত হলেও তাদের চোখ খোলা থাকত। [ফাতহুল কাদীর]
(২) অর্থাৎ কেউ বাইর থেকে উঁকি দিয়ে দেখলেও তাদের সাতজনের মাঝে মাঝে পার্শ্বপরিবর্তন করতে থাকার কারণে এ ধারণা করতো যে, এরা এমনিই শুয়ে আছে, ঘুমুচ্ছে না। পার্শ্ব পরিবর্তনের কারণ কারও কারও মতে, যাতে যমীন তাদের শরীর খেয়ে না ফেলে। [ফাতহুল কাদীর]
(৩) অর্থাৎ পাহাড়ের মধ্যে একটি অন্ধকার গুহায় কয়েকজন লোকের এভাবে অবস্থান করা এবং সামনের দিকে কুকুরের বসে থাকা এমন একটি ভয়াবহ দৃশ্য পেশ করে যে, উঁকি দিয়ে যারা দেখতো তারাই ভয়ে পালিয়ে যেতো। তাছাড়া আল্লাহ তাদের উপর ভীতি ঢেলে দিয়েছিলেন, সুতরাং যে কেউ তাদের দেখত, তারই ভয়ের উদ্রেক হতো। [ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৮) তুমি মনে করতে, তারা জাগ্রত; কিন্তু আসলে তারা নিদ্রিত।[1] আমি তাদেরকে পার্শ্ব পরিবর্তন করাতাম ডানে ও বামে[2] এবং তাদের কুকুর ছিল সম্মুখের পা দুটি গুহার দ্বারে প্রসারিত করে; তাকিয়ে তাদেরকে দেখলে তুমি পিছনে ফিরে পালিয়ে যেতে ও তাদের ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়তে।[3]
তাফসীর:
[1] أَيْقَاظٌ হল, يَقِظٌ (জাগ্রত) এর বহুবচন। আর رُقُوْدٌ হল, رَاقِدٌ (নিদ্রিত)এর বহুবচন। তারা জাগ্রত এই জন্য মনে হচ্ছিল যে, তাদের চোখগুলো জাগ্রত ব্যক্তির মত খোলা ছিল। কেউ কেউ বলেন, খুব বেশী পার্শ্ব পরিবর্তন করার কারণে তাদেরকে জাগ্রত মনে হত।
[2] যাতে তাদের দেহকে মাটিতে খেয়ে না নেয়। (উই ধরে না যায়।)
[3] তাদের হেফাযতের জন্য এ ছিল আল্লাহ কর্তৃক ব্যবস্থাপনা। যাতে কেউ যেন তাদের নিকটে যেতে না পারে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৯-২৬ নং আয়াতের তাফসীর:
উক্ত আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা “আসহাবে কাহ্ফের” ঘটনা উল্লেখ করেছেন। এটা ছিল একটা আশ্চর্যজনক ঘটনা। কাহফ বলা হয় পাহাড়ের গুহাকে। সেখানে এই যুবকরা লুকিয়ে গিয়েছিল।
আর “রকীম” দ্বারা উদ্দেশ্য কী এ নিয়ে অনেক মতামত পাওয়া যায়। কেউ বলেছেন, কুকুরের নাম রকীম।
যহ’হাক (রহঃ) বলেন: “রকীম” হল ঐ উপত্যকার নাম যেখানে আসহাবে কাহ্ফরা ছিল।
মুজাহিদ (রহঃ) বলেন: “রকীম” একটা অট্টালিকার নাম।
ইমাম শানকিতী (রহঃ) বলেন: ভাষা ও কুরআনের অন্যান্য আয়াতের দৃষ্টিকোণ থেকে আমার কাছে সঠিক মনে হয় রকীম একটি কিতাবের নাম যা তাদের কাছে ছিল। এ কিতাবে তাদের শরয়ী বিধি-বিধান লেখা ছিল তারা যার অনুসরণ করত।
অথবা স্বর্ণের ফলক তাতে তাদের নাম, নসবনামা ও ঘটনা এবং গুহায় চলে যাওয়ার কারণ উল্লেখ ছিল। তবে সঠিক জ্ঞান আল্লাহ তা‘আলার কাছে।
আসহাবে কাহফ ও রকীম কি একই দলের নাম, না তারা আলাদা দুটি দল, নাকি অন্য কিছু এ ব্যাপারে কোন সহীহ হাদীস নেই। তবে ইমাম বুখারী আসহাবে কাহফ ও আসহাবে রকীমের দুটি আলাদা আলাদা শিরোনাম রেখেছেন। অতঃপর আসহাবে রকীম শিরোনামের অধীনে বানী ইসরাঈলের সে তিন ব্যক্তির ঘটনা নিয়ে এসেছেন যারা ঝড়ের কারণে গুহায় আশ্রয় নেয়, পরে গুহার মুখে পাথর পড়ার কারণে আটকে যায়। ইবনু হাজার আসকালানীসহ অধিকাংশ মুফাসসিরদের মতে কুরআনের পূর্বাপর বর্ণনা অনুযায়ী আসহাবে কাহফ ও রকীম একই দল।
“সংক্ষিপ্ত ঘটনা”
গুহায় আশ্রয় গ্রহণকারীরা ছিল কয়েকজন যুবক। তারা সত্য দীনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে হিদায়াত লাভ করে। এই যুবকরা তাঁদের দীনকে রক্ষা করার জন্য নিজেদের কওমের নিকট থেকে পালিয়ে গিয়ে গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করে। এই ভয়ে যে, না জানি তাঁদের কওমের লোকেরা তাঁদেরকে তাঁদের দীন থেকে বিভ্রান্ত করে ফেলে। সেখানে তাঁরা প্রার্থনা করেছিল যে, হে আল্লাহ তা‘আলা! আপনার পক্ষ থেকে আমাদের ওপর রহমত অবতীর্ণ করুন। আমাদেরকে আমাদের কওম হতে লুকিয়ে রাখুন এবং আমাদের এই কাজের পরিণতি ভাল করুন। অতঃপর তাঁরা সেখানে ঘুমিয়ে পড়ে আর এই ঘুমন্ত অবস্থায়ই বহু বছর অতিবাহিত হয়ে যায়। এরপর আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে জাগ্রত করেন। আর তখন তাদের মধ্যে কোন প্রকারের পরিবর্তন সাধিত হয়নি। তারা ঘুমানোর সময় তাদের দেহ, চুল, চামড়া যেরূপ ছিল ঘুম থেকে ওঠার পরও সেরূপই রয়েছে। তারা পরস্পর বলাবলি করতে লাগল। আচ্ছা বলত, আমরা কত সময় ঘুমিয়ে ছিলাম? উত্তরে বলা হয়: একদিন বা একদিনেরও কিছু কম। কেননা, সকালে তারা ঘুমিয়ে গিয়েছিল, আর যখন জেগে ওঠে তখন ছিল সন্ধ্যা। তাই তারা সূর্যের ওপর অনুমান করে এ কথা বলেছে। অবশেষে এর সঠিক সিদ্ধান্ত আল্লাহ তা‘আলার দিকে ন্যস্ত করে।
অতঃপর তারা তাদের ক্ষুধা মিটানোর জন্য তাদের মধ্য থেকে একজনকে মুদ্রাসহ বাজারে পাঠায় কিছু খাদ্য ক্রয় করে আনার জন্য এবং তাকে বলে দেয়, সে যেন খুব সতর্কতার সাথে কাজ করে। যতদূর সম্ভব জনগণের দৃষ্টি এড়িয়ে চলতে হবে, যাতে কেউ আমাদের খবর জানতে না পারে। কারণ যদি তারা আমাদের খবর জানতে পারে তাহলে কঠিন শাস্তি প্রদান করবে আর আমাদের দীনের ব্যাপারে বিভ্রান্ত করে ফেলবে। কারণ বাদশা দাকইয়ানুস, সে ছিল শির্কী মনোভাবাপন্ন এবং সে মূর্তিপূজা করত। আর তাঁরা এই মূর্তিপূজোকে মানতে পারেনি বলেই তাদের দীন রক্ষার জন্য গুহায় আশ্রয় নেয়, যাতে তাদের দ্বারা কোন শির্ক না হয়ে যায়। আর আল্লাহ তা‘আলা এ বিষয়ে তাদের মনকে আরো দৃঢ় চিত্ত করে দিলেন যাতে তারা ভয় না পায়। আল্লাহ তাদের এ গুহায় সূর্যের মাধ্যমে আলো প্রবেশ করাতেন।
মানুষেরা মনে করত যে, তারা জাগ্রত; মূলত তারা জাগ্রত ছিল না, তারা ছিল ঘুমন্ত। আর আল্লাহ এ অবস্থায়ই তাদের পার্শ্ব পরিবর্তন করাতেন ডানে ও বামে। আর তাদের সাথে একটি কুকুর ছিল। ঐ কুকুরটি তার সম্মুখের পা দু‘টি গুহার দ্বারে প্রসারিত করে রেখেছিল। মানুষেরা এই দৃশ্য দেখলে ভয় পেত। এটি ছিল একটি ভয়ানক দৃশ্য। তারা সে গুহায় ঐ ঘুমন্ত অবস্থায় তিনশত নয় বছর ছিল। আর তাদের সংখ্যা ছিল প্রথমে বলা হয় তিনজন ও চতুর্থজন ছিল তাদের কুকুর। পরবর্তীতে তা খণ্ডন করে বলা হয় পাঁচজন ষষ্ঠজন ছিল তাঁদের কুকুর। তবে তাদের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা ই ভাল জানেন এবং তারা কত বছর ঐ ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন তা-ও একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন। এভাবেই আল্লাহ স্বীয় ক্ষমতার বলে মানুষকে গুহাবাসীদের অবস্থা অবহিত করালেন। যাতে তারা আল্লাহ তা‘আলার ওয়াদা ও কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সত্যতার জ্ঞান লাভ করে।
এ কাহিনীর দুটি অংশ:
১. এ কাহিনীর আসল উদ্দেশ্য হল ইয়াহূদীদের প্রশ্নের জবাব দেয়া ও মুসলিমদেরকে তাওহীদ শিক্ষা দেয়া।
২. কাহিনীর ঐতিহাসিক ও ভৌগলিক পটভূমি উক্ত ঘটনাটি কোন্ কালে, কোন্ স্থানে ও জনপদে ঘটেছিল, কাফির বাদশাটি কে ছিল, তাদের সংখ্যা কত ছিল, তারা কতকাল ঘুমিয়েছিল, তারা কি এখনো জীবিত আছে, না মারা গেছে ইত্যাদি।
কুরআনুল কারীমে একজন নাবীর ঘটনা বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। তিনি হলেন ইউসুফ (عليه السلام), সে সাথে মূসা (عليه السلام)-এর অনেক ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু সম্পূর্ণ নয় যেমন ইউসুফ (عليه السلام)-এর ঘটনা এসেছে। এ ছাড়া কোন ঘটনার বিশদ বর্ণনা কুরআনে আসেনি। প্রত্যেক কাহিনীর ঐ অংশটুকুই বিভিন্ন স্থানে বর্ণনা করা হয়েছে যা মানবীয় হিদায়াত ও শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত। সুতরাং এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা অনর্থক, কোন প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন থাকলে আল্লাহ তা‘আলা নিজে অথবা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তা বলে দিতেন।
সংক্ষিপ্ত তাফসীর:
(أَمْ حَسِبْتَ) অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! তুমি কি মনে করেছ আসহাবে কাহফ ও রকীমের ঘটনা আশ্চর্য ধরণের কোন নিদর্শন? না, বরং আকাশ-জমিন, চন্দ্র-সূর্য ও অন্যান্য বিশাল বিশাল মাখলূক সবই আল্লাহ তা‘আলার বড় বড় নিদর্শন যা আল্লাহ তা‘আলার বড়ত্ব ও মহত্বের ওপর প্রমাণ বহন করে। তিনি যা ইচ্ছা তাই করেন, তাঁেক কোন জিনিস অক্ষম করতে পারে না।
(وَّهَيِّئْ لَنَا مِنْ أَمْرِنَا رَشَدًا)
অর্থাৎ নিজেদের দীন রক্ষার্থে গুহায় আশ্রয় নেয়া যুবকরা আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু’আ করে বলেছিল: সঠিক পথে পৌঁছার উপকরণ সহজ করে দিন এবং উভয় জগতের সফলতা দান করুন। এ অর্থও হতে পারে যে, আমাদের পরিণতি ভাল করে দিন।
(فَضَرَبْنَا عَلٰٓي اٰذَانِهِمْ)
অর্থাৎ কানে পর্দা সৃষ্টি করে দিলেন, যাতে বাইরের আওয়াজ তাদের কানে গিয়ে ঘুমের ব্যাঘাত সৃষ্টি না করে। কয়েক বছর বলতে ৩০৯ বছর। (তাফসীর সা‘দী)
এ দুটি দল বলতে তাদের মধ্যে যে দুটি দল মত বিরোধ করেছিল। যেমন ১৯ নং আয়াতে বলা হয়েছে।
(وَزِدْنٰهُمْ هُدًي)
অর্থাৎ তারা যখন নিজেদের ঈমান রক্ষা করার জন্য গুহায় চলে গেল তাদেরকে দীনের ওপর অটল রাখার জন্য ঈমান বাড়িয়ে দিলাম।
(وَّرَبَطْنَا عَلٰي قُلُوْبِهِمْ)
যেহেতু আত্মীয়-স্বজন, সব কিছু বর্জন করে দেশের বাদশার বিরুদ্ধাচরণ করে চলে যেতে হচ্ছে, তাই জীবন নাশের আশঙ্কা অন্তরে প্রবেশ করতে পারে, তাই তাদের অন্তরকে ঈমানের সাথে বেঁধে দিলাম।
(إِذْ قَامُوْا)
অর্থাৎ এ দাঁড়ানো অধিকাংশ মুফাসসিরদের মতে বাদশার নিকট ছিল। তারা রাজ দরবারে দাঁড়িয়ে তাওহীদের ওয়াজ করছিল। কেউ কেউ বলেছেন, শহর থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়িয়ে একে অপরকে তাওহীদের সে কথা শোনাতে লাগল যা এক এক করে প্রত্যেকের অন্তরে প্রবেশ করে দেয়া হয়েছিল এবং তারা সকলে একত্রিত হয়ে বেরিয়ে আসে।
(تَّزَاوَرُ عَنْ كَهْفِهِمْ ذَاتَ الْيَمِيْنِ)
অর্থাৎ সূর্য ওঠার সময় ডান দিকে এবং অস্ত যাবার সময় বাম দিকে পাশ কেটে চলে যায়। আর এভাবে উভয় সময়ে তাদের ওপর সূর্যের আলো পড়ত না। অথচ তারা গুহার প্রশস্ত চত্বরে আরামে অবস্থান করছিল। فَجْوَةٍ অর্থ প্রশস্ত স্থান।
أَيْقَاظًا শব্দটি يقظ এর বহুবচন, অর্থ জাগ্রত। رُقُوْدٌ শব্দটি راقد এর বহুবচন অর্থ ঘুমন্ত। অর্থাৎ তাদেরকে এ জন্য জাগ্রত মনে হচ্ছিল যে, তাদের চোখগুলো জাগ্রত ব্যক্তির মত খোলা ছিল। কেউ বলেছেন: খুব বেশি পার্শ্ব পরিবর্তন করার কারণে তাদরেকে জাগ্রত মনে হচ্ছিল।
(وَكَذٰلِكَ بَعَثْنٰهُمْ)
অর্থাৎ তাদেরকে যেভাবে আমি নিজ কুদরতে ৩০৯ বছর ঘুমের মধ্যে রেখেছিলাম তেমনি কত কাল অবস্থান করেছে তা জিজ্ঞেস করার জন্য জাগ্রত করেছি।
(لِيَعْلَمُوْآ أَنَّ وَعْدَ اللّٰهِ حَقٌ)
অর্থাৎ তাদেরকে আমি যেভাবে ৩০৯ বছর ঘুম পাড়ানোর পর জাগ্রত করেছি তেমনি দুনিয়ার জীবন অতিবাহিত করার পর মৃত্যুর পরে হাজার হাজার বছর অতিত হয়ে গেলেও হিসাব-নিকাশের জন্য পুনরুত্থিত করতে সক্ষম।
(إِذْ يَتَنَازَعُوْنَ بَيْنَهُمْ)
অর্থাৎ তাদের সম্পর্কে সে সময় অবগত করালেন যখন তারা মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের এবং কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারে আপোসে বিতর্কে লিপ্ত ছিল।
(فَقَالُوا ابْنُوا عَلَيْهِمْ بُنْيَانًا)
‘তাদের ওপর সৌধ নির্মাণ কর।’ এ কথা কে বলেছিল? কেউ বলেছেন, সে যুগের ঈমানদারগণ। কেউ বলেছেন; বাদশা ও তার সাথের লোকেরা যখন সেখানে গিয়ে তাদের সাথে সাক্ষাত করল এবং এরপর আল্লাহ তা‘আলা পুনরায় তাদেরকে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন। তখন বাদশা ও তার সাথীরা বলল: এদের হেফাযত করার জন্য একটি প্রাসাদ নির্মাণ কর।
(الَّذِيْنَ غَلَبُوْا عَلٰٓي أَمْرِهِمْ)
এ প্রবল দলটি ঈমানদার ছিল, না কাফির মুশরিক ছিল? ইমাম শাওকানী প্রথম মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন। ইবনু কাসীর দ্বিতীয় মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কারণ কবরকে মাসজিদে পরিণত করা নিষেধ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: ইয়াহূদী ও খ্রিস্টানদের ওপর আল্লাহ তা‘আলার লা‘নত, তারা তাদের নাবীদের কবরকে মাসজিদ হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে। (সহীহ বুখারী হা: ৪৩৫) সুতরাং ঈমানদাররা এ কাজ করতে পারে না।
(سَيَقُوْلُوْنَ)
অর্থাৎ আসহাবে কাহফের সংখ্যা সম্পর্কে মতানৈক্য করেছিল রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগের আহলে কিতাবরা। তাই আয়াতের শেষের দিকে তাদের সংখ্যা সম্পর্কে আহলে কিতাবদেরকে জিজ্ঞেস করতে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নিষেধ করা হয়েছে।
(وَلَا تَقُوْلَنَّ لِشَیْءٍ)
এখানে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নির্দেশ দিয়ে উম্মাতের সকলকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের কোন কাজ করতে হলে এ কথা বলা যাবে না: আগামী কাল আমি এ কাজ করব। বরং বলবে: ইনশা-আল্লাহ তা‘আলা আগামীকাল এ কাজ করব। কারণ হতে পারে আগামী কাল সে উক্ত কাজ নাও করতে পারে।
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: সুলাইমান ইবনু দাউদ (عليه السلام) বলেছেন: অবশ্যই আমি আজ রাতে (আমার) সত্তরজন স্ত্রীর সাথে সহবাস করব। প্রত্যেক স্ত্রী একজন করে অশ্বারোহী মুজাহিদ গর্ভ ধারণ করবে। এরা আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় জিহাদ করবে। সুলাইমান (عليه السلام)-এর এক সাথী বলল: ইনশা-আল্লাহ বলেন। সুলাইমান (عليه السلام) তা বললেন না। অতঃপর একজন স্ত্রী ছাড়া বাকী আর কেউ গর্ভ ধারণ করেনি। সে একটি পুত্র সন্তান প্রসব করল এবং তারও একটি অঙ্গ ছিল না। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: যদি তিনি ইনশা-আল্লাহ বলতেন তাহলে সব স্ত্রীর গর্ভেই সন্তান জন্ম নিত এবং আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় জিহাদ করতো। (সহীহ বুখারী হা: ৩৪২৪, সহীহ মুসলিম হা: ১৬৫৪)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. যদি জনসমাজে থাকার ফলে ঈমান হারানোর আশঙ্কা থাকে তাহলে তা প্রত্যাখ্যান করা জায়েয।
২. আকাশ ও জমিনের প্রতিপালক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা।
৩. হিদায়াত আল্লাহ তা‘আলার হাতে অন্য কেউ হিদায়াতের মালিক নয়।
৪. যা না জানলে দীনের কোন ক্ষতি হবে না তা জানা আবশ্যক নয়।
৫. কিয়ামত অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে।
৬. কবরের ওপর মাসজিদ বা সৌধ নির্মাণ করা যাবে না।
৭. কোন অনিশ্চিত বিষয় সম্পর্কে তর্ক বিতর্ক না করে আল্লাহ তা‘আলার দিকে ন্যস্ত করতে হবে।
৮. ভবিষ্যতের কোন কাজের ব্যাপারে অবশ্যই ইনশা-আল্লাহ তা‘আলা বলতে হবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: মহান আল্লাহ বলেনঃ “তারা শুয়ে আছে, কিন্তু দর্শকরা তাদেরকে জাগ্রত মনে করে। কেননা তাদের চক্ষু খুলে রয়েছে। বর্ণিত আছে যে, নেকড়ে বাঘ যখন ঘুমায় তখন সে একটি চক্ষু বন্ধ করে ও আর একটি চুক্ষ খুলে রাখে। আবার ওটাকে বন্ধ করে এবং অন্যটিকে খুলে রাখে। যেমন কোন কবি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ সে তার দুই চক্ষুর একটি দ্বারা ঘুমায় এবং অপরটি দ্বারা জেগে থাকে। সে নিজেকে রক্ষা করে। সুতরাং একই সময় সে জাগ্রত ও ঘুমন্ত উভয়ই।`
জীব-জন্তু ও পোকামাকড় ও শত্রু হতে রক্ষা করার জন্যে নিদ্রিত অবস্থায়ও তাদের চুক্ষ খুলে রাখেন এবং মাটিতে যেন খেয়ে না ফেলে এজন্যে তিনি তাদের পার্শ্ব পরিবর্তন করাতে থাকেন। বর্ণিত আছে যে, বছরে দু'বার করে। তাদের পার্শ্ব পরিবর্তন করানো হতো। তাদের কুকুরটিও তাদের পাহারাদার হিসেবে দরজার পার্শ্বে চৌকাঠের নিকটবর্তী জায়গায় মাটিতে তার সামনের পা দুটি প্রসারিত করে বসেছিল। কুকুরটির দরজার বাইরে থাকার কারণ এই যে, যে ঘরে কুকুর, ছবি, অপবিত্র ব্যক্তি এবং কাফের ব্যক্তি থাকে সেই ঘরে ফেরেশতা যান না। যেমন একটি হাসান হাদীসে এসেছে। ঐকুকুরটিও ঐ অবস্থাতেই ঘুমিয়ে পড়ে। এটা সত্য কথাই যে, ভাল লোকের সংস্পর্শে আসলে ভাল হওয়া যায়। এরই প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় ঐ কুকুরটি এমন মর্যাদা লাভ করে যার ফলে আল্লাহর কিতাবে ওরও বর্ণনা দেয়া হয়। বর্ণিত আছে যে, ঐ কুকুরটি তাদেরই কোন একজনের পালিত শিকারী কুকুর ছিল। একটা উক্তি এও আছে যে, ওটা ছিল বাদশাহর বাবুর্চীর কুকুর। সেও ছিল ঐ যুবকদেরই মাযহাবপন্থী। সেও তাদের সাথে হিজরত করেছিল। তখন তার কুকুরটিও তাদের পিছনে পিছনে চলে গিয়েছিল। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবরাহীমের (আঃ) হাতে হযরত যাবীহুল্লাহর (আঃ) পরিবর্তে যে ভেড়াটি যবাহকৃত হয়েছিল তার নাম ছিল জারীর। হযরত সুলাইমানকে (আঃ) যে হুদহুদ পাখিটি সাবার দেশের রাণী খবর এনে দিয়েছিল তার নাম ছিল আনফায। গুহাবাসীদের ঐ কুকুরটির নাম ছিল ‘কিমীর। বাণী ইসরাঈল যে বাছুরটির পূজা শুরু করেছিল তার নাম ছিল বাহমূত’। হযরত আদম (আঃ) জান্নাত থেকে ভারতে নেমেছিলেন।, হযরত হাওয়া (আঃ) নেমেছিলেন জিদ্দায়, ইবলীস নেমেছিল দাশতে বীসানে এবং সাপ পড়েছিল ইসফাহানে।
একটি উক্তি আছে যে, ঐ কুকুরটির নাম ছিল হামরান। কুকুরটির রঙ সম্পর্কেও অনেকগুলি উক্তি রয়েছে। কিন্তু আমরা বিস্মিত হই যে, এতে লাভ কি? এর প্রয়োজনীয়তাই বা কি? বরং এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, এ সম্পর্কে তর্ক-বিতর্ক নিষিদ্ধ। কেননা এতো হচ্ছে চক্ষু বন্ধ করে প্রস্তর নিক্ষেপ করা এবং বিনা দলীলে কথা বলা!
এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাদেরকে এমন প্রভাব দিয়েছিলাম যে, কেউই তাদের দিকে তাকাতে পারতো না। এটা এই কারণে যে, লোকেরা যেন তাদেরকে তামাশার পাত্র বানিয়ে না নেয়, কেউ বীরত্বপনা দেখিয়ে তাদের কাছে চলে না যায়, কেউ তাদের উপর হাত উঠাতে না পারে। যেন তারা ঐ সময় পর্যন্ত আরাম ও শান্তিতে ঘুমাতে পারে যত দিন পর্যন্ত তাদের ঘুমানো আল্লাহ তাআলা ইচ্ছা করেন। যারাই তাদের দিকে তাকায়, তাদের প্রভাবে তারা থর থর কাঁপতে থাকে। তৎক্ষণাৎ তারা উল্টো পায়ে ফিরে যায়। তাদের দিকে দৃষ্টিপাত করাও প্রত্যেকের জন্যে অসম্ভ।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।