সূরা আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল) (আয়াত: 94)
হরকত ছাড়া:
وما منع الناس أن يؤمنوا إذ جاءهم الهدى إلا أن قالوا أبعث الله بشرا رسولا ﴿٩٤﴾
হরকত সহ:
وَ مَا مَنَعَ النَّاسَ اَنْ یُّؤْمِنُوْۤا اِذْ جَآءَهُمُ الْهُدٰۤی اِلَّاۤ اَنْ قَالُوْۤا اَبَعَثَ اللّٰهُ بَشَرًا رَّسُوْلًا ﴿۹۴﴾
উচ্চারণ: ওয়ামা- মানা‘আন্না-ছা আইঁ ইউ’মিনূ ইয জাআহুমুল হুদা ইল্লাআন কা-লূ আবা‘আছাল্লা-হু বাশারার রাছূলা-।
আল বায়ান: আর যখন মানুষের নিকট হিদায়াত আসে তখন তাদের ঈমান আনতে বাধা দেয় তাদের এ কথা যে, ‘আল্লাহ কি মানুষকে রাসূল হিসেবে পাঠিয়েছেন’?
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৯৪. আর যখন মানুষের কাছে হিদায়াত আসে, তখন তাদেরকে ঈমান আনা থেকে বিরত রাখে কেবল তাদের এ কথা যে, আল্লাহ কি মানুষকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন?(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: মানুষের কাছে যখন পথের নির্দেশ আসে তখন তাদেরকে ঈমান আনতে তাদের এ কথা ছাড়া অন্য কিছুই বিরত রাখে না যে, ‘আল্লাহ কি মানুষকে রসূল বানিয়ে পাঠিয়েছেন?’
আহসানুল বায়ান: (৯৪) যখন মানুষের নিকট পথ-নির্দেশ এল, তখন তাদেরকে বিশ্বাস স্থাপন হতে এই উক্তিই বিরত রাখল যে, ‘আল্লাহ কি একজন মানুষকে রসূল করে পাঠিয়েছেন?’[1]
মুজিবুর রহমান: ‘আল্লাহ কি মানুষকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন?’ - তাদের এই উক্তিই বিশ্বাস স্থাপন হতে লোকদেরকে বিরত রাখে, যখন তাদের নিকট আসে পথ নির্দেশ।
ফযলুর রহমান: মানুষের কাছে যখন হেদায়েত এসেছে তখন “আল্লাহ কি একজন মানুষকে রসূল করে পাঠিয়েছেন?” তাদের এমন উক্তিই তাদেরকে ঈমান আনা থেকে বিরত রেখেছে।
মুহিউদ্দিন খান: আল্লাহ কি মানুষকে পয়গম্বর করে পাঠিয়েছেন? তাদের এই উক্তিই মানুষকে ঈমান আনয়ন থেকে বিরত রাখে, যখন তাদের নিকট আসে হেদায়েত।
জহুরুল হক: আর লোকগুলোকে বিশ্বাস স্থাপন করতে অন্য কিছু বাধা দেয় না যখন তাদের কাছে হেদায়ত আসে এই ভিন্ন যে তারা বলে -- "আল্লাহ্ কি একজন মানুষকেই রসূল ক’রে দাঁড় করিয়েছেন?"
Sahih International: And what prevented the people from believing when guidance came to them except that they said, "Has Allah sent a human messenger?"
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৯৪. আর যখন মানুষের কাছে হিদায়াত আসে, তখন তাদেরকে ঈমান আনা থেকে বিরত রাখে কেবল তাদের এ কথা যে, আল্লাহ কি মানুষকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন?(১)
তাফসীর:
(১) অর্থাৎ প্রত্যেক যুগের অজ্ঞ ও মুর্খ লোকেরা এ ভুল ধারণায় নিমজ্জিত থাকে যে, মানুষ কখনো রাসূল হতে পারে না। তাই যখন কোন রাসূল এসেছেন এবং তারা দেখেছে তিনি পানাহার করছেন, তাঁর স্ত্রী-সন্তানাদি আছে , তিনি রক্ত–মাংসের মানুষ তখন তারা ফায়সালা দিয়ে বসেছে যে, এ ব্যক্তি রসূল নয়, কারণ এতো মানুষ। কুরআনের অন্যান্য বহু স্থানে আল্লাহ্ তা'আলা তাদের এ প্রবণতার কথা উল্লেখ করেছেন। [যেমন, সূরা ইউনুসঃ ২, সূরা আত-তাগাবুনঃ ৬, সূরা আল মুমিনুনঃ ৪৭, সূরা ইবরাহীমঃ ১০]
এভাবে তার জীবদ্দশায় তারা তাকে রাসূল হিসেবে মানেনি। আর তিনি চলে যাবার দীর্ঘকাল পর তাঁর ভক্তদের মধ্যে এমনসব লোক জন্ম নিতে থাকে যারা বলতে থাকে, তিনি মানুষ ছিলেন না, কারণ তিনি ছিলেন রসূল। ফলে কেউ তাঁকে আল্লাহ বানিয়েছে, কেউ বানিয়েছে আল্লাহর পুত্র, আবার কেউ বলেছে আল্লাহ তাঁর মধ্যে অনুপ্রবিষ্ট হয়েছিলেন। মোটকথা মানবিক সত্তা ও নবুওয়াতী সত্তার একই সত্তার মধ্যে একত্র হওয়া হামেশা মূর্খদের কাছে একটি হেঁয়ালি হয়েই থেকেছে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৯৪) যখন মানুষের নিকট পথ-নির্দেশ এল, তখন তাদেরকে বিশ্বাস স্থাপন হতে এই উক্তিই বিরত রাখল যে, ‘আল্লাহ কি একজন মানুষকে রসূল করে পাঠিয়েছেন?’[1]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, কোন মানুষের রসূল হওয়া, কাফের ও মুশরিকদের জন্য বড়ই আশ্চর্যজনক ব্যাপার ছিল। তারা মানতই না যে, আমাদের মত মানুষ; যে আমাদের মত চলাফেরা করে, আমাদের মতই পানাহার করে এবং আমাদের মতই আত্মীয়তার সম্পর্কে জড়িত ব্যক্তি রসূল হতে পারেন। আর এই আশ্চর্যবোধই তাদের ঈমান আনার পথে বাধা ছিল।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৯৪-৯৬ নং আয়াতের তাফসীর:
উক্ত আয়াতগুলোতে অধিকাংশ মানুষের ঈমান না আনার কারণ এবং মানুষের মধ্য হতে রাসূল প্রেরণের হিকমত বর্ণনা করা হয়েছে। অধিকাংশ মানুষ রাসূলদের প্রতি ঈমান আনেনি। কারণ হল তাদের মত একজন রক্ত-মাংসে গড়া মানুষকে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে। তাদের কথা হল একজন রাসূল আমাদের মত হতে পারে না। রাসূল একজন ফেরেশতা হবেন অথবা তাদের সাথে কোন ফেরেশতা থাকবে। অতএব আমরা যদি একজন মানুষের অনুসরণ করি তাহলে অবশ্যই পথভ্রষ্ট হব, ক্ষতিগ্রস্থ হব। এ সম্পর্কে সূরা ইবরাহীমের ১০ নং, সূরা মু’মিনূনের ৪৭ নং, সূরা কামারের ২৪ নং এবং সূরা তাগাবুনের ৬ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
মানুষের মধ্য হতে রাসূল প্রেরণ করার হিকমত বর্ণনা ও তাদের প্রশ্নের জবাব দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ‘ফেরেশতাগণ যদি নিশ্চিন্ত হয়ে পৃথিবীতে বিচরণ করত তবে আমি আকাশ হতে তাদের নিকট অবশ্যই ফেরেশ্তা রাসূল করে পাঠাতাম।’ যেহেতু পৃথিবীতে মানুষ বাস করে সেহেতু আমি মানুষকেই রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছি। রাসূল মানুষ না হলে রিসালাতের দায়িত্ব্ পালন করতে পারবে না এবং যাদের কাছে প্রেরণ করবেন তারাও কোন উপকৃত হতো না। সুতরাং মানুষের প্রতি আল্লাহ তা‘আলার দয়া যে, মানুষের মধ্য হতেই রাসূল প্রেরণ করেছেন।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
(لَقَدْ مَنَّ اللہُ عَلَی الْمُؤْمِنِیْنَ اِذْ بَعَثَ فِیْھِمْ رَسُوْلًا مِّنْ اَنْفُسِھِمْ یَتْلُوْا عَلَیْھِمْ اٰیٰتِھ۪ وَیُزَکِّیْھِمْ وَیُعَلِّمُھُمُ الْکِتٰبَ وَالْحِکْمَةَﺆ وَاِنْ کَانُوْا مِنْ قَبْلُ لَفِیْ ضَلٰلٍ مُّبِیْنٍ)
“নিশ্চয়ই আল্লাহ বিশ্বাসীর প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের নিজেরদেরই মধ্য হতে একজন রাসূল তাদের কাছে প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের নিকট তাঁর নিদর্শনাবলী (আয়াতসমূহ) পাঠ করেন ও তাদেরকে পবিত্র করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও বিজ্ঞান শিক্ষা দান করেন যদিও তারা এর পূর্বে প্রকাশ্য ভ্রান্তির মধ্যে ছিল।” (সূরা আলি ইমরান ৩:১৬৪)
অতঃপর তাদের আচরণে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উত্তর কী হবে তা বলে দিচ্ছেন যে, তুমি বল, তোমরা আমাকে মানুষ বলে প্রত্যাখ্যান করছ; জেনে রেখ, আল্লাহ তা‘আলা বান্দার সকল কাজকর্ম প্রত্যক্ষ করছেন ও খবর রাখেন। তিনি সাক্ষী হিসেবে যথেষ্ট, তিনিই আমাদের মাঝে ফায়সালা করবেন। সুতরাং মানুষের মধ্য থেকে রাসূল প্রেরণ করা এটা মানুষের প্রতি আল্লাহ তা‘আলার একটি অনুগ্রহ। নাবীরা আমাদের মত রক্ত-মাংসের মানুষ এ কথা পূর্বের জাতিরাও জানত। কিন্তু আমাদের সমাজে একশ্রেণির মুসলিম দাবীদার রয়েছে যারা আমাদের নাবীকে মাটির মানুষ বলতে চায় না। তারা বলে, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নাকি নূরের তৈরী। এদেরকে পূর্ববর্তী জাতিদের থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাধারণ মানুষের মতই একজন মানুষ, কোন ফেরেশতা বা জিন নন, পার্থক্য হল তাঁকে রিসালাত দিয়ে রাসূলের মর্যাদা দেয়া হয়েছে।
২. মানুষ মানুষের দুঃখ-বেদনা, সমস্যা ইত্যাদি বুঝে। কোন ফেরেশতা বা জিন মানুষের সমস্যা বুঝবে না, তাই মানুষকে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করাই যুক্তিযুক্ত।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৯৪-৯৫ নং আয়াতের তাফসীর
মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অধিকাংশ লোক ঈমান আনয়ন হতে এবং রাসূলদের আনুগত্য হতে একারণেই বিরত থাকছে যে, কোন মানুষ যে আল্লাহর রাসূল হতে পারেন এটা তাদের বোধগম্যই হয় না, এতে তারা অত্যন্ত বিস্মিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত অস্বীকার করে বসে। তারা পরিষ্কারভাবে বলে দেয়ঃ “একজন মানুষ আমাদেরকে পথ প্রদর্শন করবে?” ফিরাউন ও তার কওম একথাই বলেছিলঃ “আমরা আমাদের মতই দু'টি মানুষের উপর কি করে ঈমান আনতে পারি? বিশেষ করে ঐ অবস্থায় যে, তাদের কওমের সমস্ত লোক আমাদেরই অধীনে রয়েছে?” একথাই অন্যান্য উম্মতেরাও নিজ নিজ যামানার নবীদেরকে বলেছিলঃ “তোমরা তো আমাদের মতই মানুষ। তোমরা তো এটা ছাড়া আর কিছুই করছো না যে, আমাদেরকে আমাদের বড়দের মা’ৰূদের থেকে বিভ্রান্ত করছো। আচ্ছা, কোন বিরাট নিদর্শন পেশ কর দেখি?” এ বিষয়ের আরো বহু আয়াত রয়েছে। এরপর মহান আল্লাহ নিজের স্নেহ, দয়া এবং মানুষের মধ্য হতেই রাসূল পাঠানোর কারণ বর্ণনা করেছেন এবং এর নিপূণতা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলছেনঃ ফেরশতারা যদি রিসালাতের কাজ চালাতো, তবে না তোমরা তাদের কাছে উঠা-বসা করতে পারতে, ভালভাবে তাদের কথা বুঝতে পারতে। মানবীয় রাসূল তোমাদেরই শ্রেণীভুক্ত হয়ে থাকে বলেই তোমরা তাদের সাথে মেলামেশা করতে পার, তাদের আচার আচরণ দেখতে পার এবং তাদের সাথে মিলেজুলে নিজেদের ভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করতে পার। আর তাদের আমল দেখে নিজেরা শিখে নিতে সক্ষম হও। যেমন আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) (৩:১৬৪) (আরবি) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবি) (৯:১২৮) অন্য আর এক স্থানে রয়েছেঃ (আরবি) (২:১৫১)
সবগুলিরই ভাবার্থ হচ্ছেঃ “এটাতো আল্লাহ তাআলার এক বড় অনগ্রহ যে, তিনি তোমাদেরই মধ্য হতে রাসূল পাঠিয়েছেন। সে তোমাদেরকে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে শুনিয়ে থাকে, তোমাদেরকে (পাপ থেকে) পবিত্র করে এবং তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়, আর তোমরা যা জানতে না তা তোমাদেরকে শিখিয়ে থাকে। সুতরাং আমাকে খুব বেশী বেশী স্মরণ করা তোমাদের উচিত, তা হলে আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করবো। তোমাদের উচিত আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং অকৃতজ্ঞ না হওয়া” এখানে মহান আল্লাহ বলেনঃ অবশ্যই আমি কোন ফেরেশতাকে রাসূল করে পাঠাতাম। কিন্তু তোমরা নিজেরা মানুষ এই যৌক্তিকতাতেই মানুষের মধ্য হতেই আমি রাসূল পাঠিয়েছি।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।