আল কুরআন


সূরা আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল) (আয়াত: 71)

সূরা আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল) (আয়াত: 71)



হরকত ছাড়া:

يوم ندعو كل أناس بإمامهم فمن أوتي كتابه بيمينه فأولئك يقرءون كتابهم ولا يظلمون فتيلا ﴿٧١﴾




হরকত সহ:

یَوْمَ نَدْعُوْا کُلَّ اُنَاسٍۭ بِاِمَامِهِمْ ۚ فَمَنْ اُوْتِیَ کِتٰبَهٗ بِیَمِیْنِهٖ فَاُولٰٓئِکَ یَقْرَءُوْنَ کِتٰبَهُمْ وَ لَا یُظْلَمُوْنَ فَتِیْلًا ﴿۷۱﴾




উচ্চারণ: ইয়াওমা নাদ‘ঊ কুল্লা উনা-ছিম বিইমা-মিহিম ফামান উতিয়া কিতা-বাহূবিইয়ামীনিহী ফাউলাইকা ইয়াকরাঊনা কিতা-বাহুম ওয়ালা-ইউজলামূনা ফাতীলা-।




আল বায়ান: স্মরণ কর, যেদিন আমি প্রত্যেক মানুষকে তাদের ইমামসহ* ডাকব। অতঃপর যাকে তার আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে তারা নিজদের আমলনামা পাঠ করবে এবং তাদের প্রতি সামান্য পরিমাণ অবিচার করা হবে না।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৭১. স্মরণ করুন সে দিনকে, যখন আমরা প্রত্যেক সম্প্রদায়কে তাদের ইমাম(১) সহ ডাকব। অতঃপর যাদের ডান হাতে তাদের আমলনামা দেয়া হবে, তারা তাদের আমলনামা পড়বে এবং তাদের উপর সামান্য পরিমাণও যুলুম করা হবে না।




তাইসীরুল ক্বুরআন: স্মরণ কর, যেদিন আমি সকল সম্প্রদায়কে তাদের নেতাসহ ডাকব, অতঃপর যাদেরকে তাদের ‘আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে, তারা তাদের ‘আমালনামা পাঠ করবে (আনন্দচিত্তে) আর তাদের প্রতি এতটুকু যুলম করা হবে না।




আহসানুল বায়ান: (৭১) (স্মরণ কর,) যখন আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়কে তাদের নেতা সহ[1] আহবান করব। যাদেরকে ডান হাতে তাদের আমলনামা দেওয়া হবে, তারা তাদের আমলনামা পাঠ করবে এবং তাদের প্রতি খেজুরের আঁটির ফাটলে সুতো বরাবর (সামান্য পরিমাণ)ও যুলুম করা হবে না। [2]



মুজিবুর রহমান: স্মরণ কর সেই দিনকে যখন আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়কে তাদের নেতাসহ আহবান করব; যাদেরকে ডান হাতে ‘আমলনামা দেয়া হবে তারা তাদের ‘আমলনামা পাঠ করবে (আনন্দের সাথে) এবং তাদের উপর সামান্য পরিমাণও যুলম করা হবে না।



ফযলুর রহমান: (স্মরণ করো) যেদিন আমি সব মানুষকে যার যার নেতাসহ (অথবা আমলনামা কিংবা আসমানি কিতাবসহ) ডাকব। তখন যাদেরকে তাদের আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে তারা তাদের আমলনামা পাঠ করবে। তাদের প্রতি সামান্যও অবিচার করা হবে না।



মুহিউদ্দিন খান: স্মরণ কর, যেদিন আমি প্রত্যেক দলকে তাদের নেতাসহ আহবান করব, অতঃপর যাদেরকে তাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে, তারা নিজেদের আমলনামা পাঠ করবে এবং তাদের প্রতি সামান্য পরিমাণও জুলুম হবে না।



জহুরুল হক: সেইদিন আমরা প্রত্যেক জনসমাজকে আহ্বান করব তাদের ইমাম সহ। সুতরাং যাকে তার কিতাব তার ডান হাতে দেয়া হবে তারা তবে তাদের কিতাব পড়বে, আর তাদের প্রতি খেজুর-বিচির-পাতলা-পরত পরিমাণেও অন্যায় করা হবে না।



Sahih International: [Mention, O Muhammad], the Day We will call forth every people with their record [of deeds]. Then whoever is given his record in his right hand - those will read their records, and injustice will not be done to them, [even] as much as a thread [inside the date seed].



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৭১. স্মরণ করুন সে দিনকে, যখন আমরা প্রত্যেক সম্প্রদায়কে তাদের ইমাম(১) সহ ডাকব। অতঃপর যাদের ডান হাতে তাদের আমলনামা দেয়া হবে, তারা তাদের আমলনামা পড়বে এবং তাদের উপর সামান্য পরিমাণও যুলুম করা হবে না।


তাফসীর:

(১) إمام শব্দের বিভিন্ন অর্থ করা হয়ে থাকে।

কেউ কেউ এখানে إمام দ্বারা গ্ৰন্থ উদ্দেশ্য নিয়েছেন। সে হিসেবে গ্ৰন্থকে ইমাম বলার কারণ এই যে, ভুলভ্রান্তি ও দ্বিমত দেখা দিলে গ্রন্থের আশ্রয় নেয়া হয়। যেমন- কোন অনুসৃত ইমামের আশ্রয় নেয়া হয়। যেমন অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, (وَكُلَّ شَيْءٍ أَحْصَيْنَاهُ فِي إِمَامٍ مُبِينٍ) “আর যাবতীয় বস্তুই আমি সুস্পষ্ট গ্রন্থে গুনে রেখেছি।” [সূরা ইয়াসীনঃ ১২] এখানেও (إِمَامٍ مُبِينٍ) বলে সুস্পষ্ট গ্রন্থ বুঝানো হয়েছে। তাই এ আয়াতেও তাদের বিচারের জন্য তাদের আমলনামার গ্রন্থ হাযির করার কথা বলাই উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। [ইবন কাসীর] এ অর্থের সমর্থনে কুরআনের আরো কিছু আয়াত প্রমাণ বহন করছে। [যেমনঃ সূরা কাহাফঃ ৪৯, আল-জাসিয়াঃ ২৮, ২৯, আয-যুমারঃ ৬৯, আন-নিসাঃ ৪১]

আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু ও মুজাহিদ থেকে এখানে ইমাম শব্দের অর্থ নেতাও বর্ণিত রয়েছে। অর্থাৎ প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার নেতার নাম দ্বারা ডাকা হবে এবং সবাইকে এক জায়গায় জমায়েত করা হবে। উদাহরণতঃ ইবরাহীম আলাইহিস সালামের অনুসারী দল এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসারী দল। এ প্রসঙ্গে এসব অনুসারীর প্রত্যেক নেতাদের নাম নেয়াও সম্ভবপর। [ফাতহুল কাদীর]

এ অর্থের সপক্ষে আরো প্রমাণ হলো, আল্লাহর বাণীঃ “প্রত্যেক জাতির জন্য আছে। একজন রাসূল এবং যখন ওদের রাসূল আসবে তখন ন্যায়বিচারের সাথে ওদের মীমাংসা করে দেয়া হবে এবং ওদের প্রতি যুলুম করা হবে না।” [সূরা ইউনুসঃ ৪৭] তাছাড়া একই অর্থে কুরআনের বিভিন্ন স্থানে আরো আয়াত এসেছে। [যেমন সূরা আন-নিসাঃ ৪১, আন-নাহলঃ ৮৪, ৮৯, আল-হাজ্বঃ ৭৮, আল-কাসাসঃ ৭৫, আয-যুমারঃ ৬৯]

কোন কোন সালফে সালেহীন বলেন, এ আয়াত দ্বারা হাদীসের প্রকৃত অনুসারীদের সর্বোচ্চ মর্যাদা প্রমাণিত হয়। কারণ তাদের নেতা হলেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

তবে আয়াতের পরবর্তী অংশ অর্থ থেকে বুঝা যায় যে, এখানে إمام  বলতে গ্ৰন্থই বুঝানো হয়েছে। ইবন কাসীর এ মতটিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। কারণ পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে, “যাদের ডান হাতে তাদের ‘আমলনামা দেয়া হবে, তারা তাদের আমলনামা পড়বে এবং তাদের উপর সামান্য পরিমাণও যুলুম করা হবে। না”। অনুরূপভাবে অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, “তখন যাকে তার আমলনামা তার ডান হাতে দেয়া হবে, সে বলবে, ‘লও, আমার আমলনামা পড়ে দেখ; আমি জানতাম যে, আমাকে আমার হিসেবের সম্মুখীন হতে হবে। [সূরা আল-হাক্কাহঃ ১৯–২০]।

আর কাফেরদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, “কিন্তু যার আমলনামা তার বাম হাতে দেয়া হবে, সে বলবে, হায়! আমাকে যদি দেয়াই না হত আমার আমলনামা, এবং আমি যদি না জানতাম আমার হিসেব!” [সূরা আল-হাক্কাহঃ ২৫–২৬] যদিও মূলতঃ উভয় তাফসীরের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। কারণ, তাদের আমলনামার উপর সাক্ষীস্বরূপ প্রত্যেক উম্মতের নবীদেরকে হাজির করা হবে। তারা সেগুলোর সত্যায়ন করবে। [ইবন কাসীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৭১) (স্মরণ কর,) যখন আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়কে তাদের নেতা সহ[1] আহবান করব। যাদেরকে ডান হাতে তাদের আমলনামা দেওয়া হবে, তারা তাদের আমলনামা পাঠ করবে এবং তাদের প্রতি খেজুরের আঁটির ফাটলে সুতো বরাবর (সামান্য পরিমাণ)ও যুলুম করা হবে না। [2]


তাফসীর:

[1] إِمَامٌ এর অর্থ, পথপ্রদর্শক, নেতা ও পরিচালক। এখানে ইমাম বলতে কি বুঝানো হয়েছে? এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন, এ থেকে পয়গম্বর বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, প্রত্যেক উম্মতকে তাদের নবীর মাধ্যমে ডাকা হবে। কেউ বলেন, এ থেকে আসমানী কিতাব বুঝানো হয়েছে যা নবীদের সাথে অবতীর্ণ হয়েছে। অর্থাৎ, হে তাওরাতধারী! হে ইঞ্জীলধারী! হে কুরআনধারী! ইত্যাদি বলে ডাকা হবে। কেউ বলেন, এখানে ‘ইমাম’ অর্থ, আমলনামা। অর্থাৎ, প্রত্যেক ব্যক্তিকে যখন ডাকা হবে, তখন তার আমলনামা তার সাথে থাকবে এবং সেই অনুযায়ী তার ফায়সালা হবে। এই উক্তিকে ইমাম ইবনে কাসীর এবং ইমাম শাওকানী প্রাধান্য দিয়েছেন।

[2] فَتِيْلٌ খেজুরের আঁটির ফাটলে অতি সূক্ষ্ণ ও পাতলা যে সুতো থাকে তাকেই ‘ফাতীল’ বলা হয়। উদ্দেশ্য, অণু পরিমাণও যুলুম করা হবে না।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৭১-৭২ নং আয়াতের তাফসীর:



আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক সম্প্রদায়কে তাদের নেতাদের সাথে আহ্বান করবেন। এখানে নেতা বলতে কী উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে সে সম্পর্কে নিম্নে উল্লেখ করা হল।



কেউ কেউ বলেন, এখানে ইমাম বা নেতা বলতে রাসূলদেরকে উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রত্যেক উম্মতকে তাদের নাবীদের সাথে ডাকা হবে।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَلِكُلِّ أُمَّةٍ رَّسُوْلٌ ج فَإِذَا جَا۬ءَ رَسُوْلُهُمْ قُضِيَ بَيْنَهُمْ بِالْقِسْطِ وَهُمْ لَا يُظْلَمُوْنَ‏)‏



“প্রত্যেক জাতির জন্য (পাঠানো হয়েছে) একজন রাসূল এবং যখন তাদের রাসূল এসেছে তখন ন্যায়বিচারের সাথে তাদের মীমাংসা হয়েছে এবং তাদের প্রতি জুলুম করা হয়নি।” (সূরা ইউনুস ১২:৪৭)



এ সম্পর্কে সূরা যুমার ৬৯ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে।



কারো মতে এখানে ইমাম বা নেতা বলতে আসমানী কিতাব বুঝানো হয়েছে। যা তাদের নাবীদের ওপর অবতীর্ণ করা হয়েছে। অর্থাৎ হে তাওরাতধারী! হে ইঞ্জিলধারী! হে কুরআনধারী! ইত্যাদি বলে ডাকা হবে।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَتَرٰی کُلَّ اُمَّةٍ جَاثِیَةً ﺨ کُلُّ اُمَّةٍ تُدْعٰٓی اِلٰی کِتٰبِھَاﺚ اَلْیَوْمَ تُجْزَوْنَ مَا کُنْتُمْ تَعْمَلُوْنَﭫ)‏



“এবং প্রত্যেক সম্পদায়কে দেখবে (ভয়ে) নতজানু, প্রত্যেক সম্প্রদায়কে তার কিতাবের প্রতি আহ্বান করা হবে, আজ তোমাদেরকে তারই বিনিময় দেয়া হবে যা তোমরা করতে।” (সূরা জাসিয়া ৪৫:২৮)



আবার কারো মতে ‘ইমাম’ দ্বারা এখানে আমলের কিতাব। তাদের দলীল, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(فَأَمَّا مَنْ أُوْتِيَ كِتٰبَه۫ بِيَمِيْنِه۪ لا فَيَقُوْلُ هَآؤُمُ اقْرَئُوْا كِتٰبِيَهْ)



“অতঃপর যার আমলনামা তার ডান হাতে দেয়া হবে, সে বলবে: নাও, আমার আমলনামা পড়ে দেখো; (সূরা হাক্বাহ ৬৯:১৯)



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَكُلَّ شَيْءٍ أَحْصَيْنٰهُ فِيْٓ إِمَامٍ مُّبِيْنٍ)



আমি প্রত্যেক বস্তু স্পষ্ট কিতাবে হিফাযত করে রেখেছি। (সূরা ইয়াসিন ৩৬:১৩)



তবে এখানে ইমাম বলতে আমলনামাকে বুঝানো হয়েছে, এটাই সঠিক। (আযওয়াউল বায়ান, অত্র আয়াতের তাফসীর)



পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, যে লোক ইহকালে অন্ধ সে আখিরাতেও অন্ধ। এখানে অন্ধ বলতে দুনিয়াতে যে চোখে দেখে না তাকে বুঝানো হয়নি, বরং যে সত্য জিনিস দেখেও দেখে না, বুঝেও বুঝে না তারা আখিরাতে অন্ধ হবে। তারা বলবে, হে আল্লাহ তা‘আলা! আমাদেরকে অন্ধ করে হাশর করলেন কেন?



আল্লাহ তা‘আলা বলবেন:



(قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِيْٓ أَعْمٰي وَقَدْ كُنْتُ بَصِيْرًا -‏ قَالَ كَذٰلِكَ أَتَتْكَ اٰيٰتُنَا فَنَسِيْتَهَا ج وَكَذٰلِكَ الْيَوْمَ تُنْسٰي)‏



“সে বলবে: ‘হে আমার প্রতিপালক! কেন আমাকে অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করলে? আমি তো ছিলাম চক্ষুষ্মান।’



আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ‘এরূপই আমার নিদর্শনাবলী তোমার নিকট এসেছিল, কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে এবং সেভাবে আজ তোমাকেও ভুলে যাওয়া হচ্ছে।’’ (সূরা ত্বা-হা- ২০:১২৫)



সুতরাং যারা দুনিয়াতে সত্য বিমুখ হবে আখিরাতে তাদের এ শাস্তি দেয়া হবে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. মানুষকে মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত করা হবে।

২. প্রত্যেক জাতিকে তাদের নেতাদের সাথে ডাকা হবে।

৩. কিয়ামতের দিন কারো প্রতি কোন জুলুম, অত্যাচার করা হবে না, প্রত্যেককে উপযুক্ত প্রতিদান দেয়া হবে।

৪. যারা দুনিয়াতে সত্য বিমুখ তারা আখিরাতেও সত্য থেকে বিমুখ হবে এবং অন্ধ অবস্থায় উঠবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৭১-৭২ নং আয়াতের তাফসীর

এখানে ইমাম দ্বারা উদ্দেশ্য নবী। প্রত্যেক উম্মতকে কিয়ামতের দিন তাদের নবীসহ ডাকা হবে যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “প্রত্যেক উম্মতেরই রাসূল রয়েছে, যখন তাদের রাসূল আসবে তখন তাদের ন্যায়ের সাথে ফায়সালা করে দেয়া হবে এবং তাদের প্রতি জুলুম করা হবে না।” (১০:৪৭)

পূর্ব যুগীয় কোন কোন মনীষীর উক্তি রয়েছে যে, এতে আহলে হাদীসের খুবই বড় মর্যাদা রয়েছে। কেননা, তাঁদের ইমাম হলেন হযরত মুহাম্মদ (সঃ)। ইবনু যায়েদ (রঃ) বলেন যে, এখানে ইমাম দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর কিতাব যা তাদের শরীয়তের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছিল। ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) এই তাফসীরকে খুবই পছন্দ করেছেন এবং এটাকেই মনোনীত বলেছেন। মজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে তাদের কিতাব। সম্ভবতঃ কিতাব দ্বারা উদ্দেশ্য আল্লাহর আহকামের কিতাব অথবা আমলনামা অর্থ নিয়েছেন। আবুল আলিয়া (রঃ), হাসান (রঃ) এবং যহহাক ও (রঃ) এটাই বলেন। আর এটাই বেশী প্রাধান্য প্রাপ্ত উক্তি। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ আমি প্রত্যেক বিষয়কে এক সমুজ্জ্বল কিতাবে সংরক্ষিত করে রেখেছি।” (৩৬:১২) অন্য আয়াতে আছেঃ
(আরবি) অর্থাৎ “কিতাব অর্থাৎ আমলনামা মধ্যস্থলে রেখে দেয়া হবে, এ সময় তুমি দেখবে যে, পাপীরা ওর মধ্যে লিখিত বিষয় দেখে ভীত সন্ত্রস্ত থাকবে।” (১৮:৪৯) অন্য আয়াতে রয়েছেঃ “প্রত্যেক উম্মতকে তুমি হাঁটুর ভরে পড়ে থাকতে দেখবে, প্রত্যেক উম্মতকে তার কিতাবের দিকে ডাকা হবে, (এবং বলা হবেঃ) আজ তোমাদেরকে তোমাদের কৃতকর্মের প্রতিফল দেয়া হবে। এটাই হচ্ছে। আমার কিতাব যা তোমাদের মধ্যে ন্যায়ের সাথে ফায়সালা করবে, তোমরা যা কিছু করতে আমি বরাবরই তা লিখে রাখতাম।” এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, এই তাফসীর প্রথম তাফসীরের বিপরীত নয়। একদিকে আমলনামা হাতে থাকবে, অপর দিকে স্বয়ং নবী সামনে বিদ্যমান থাকবেন। যেমন কুরআন কারীমে ঘোষিত হয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “যমীন স্বীয় প্রতিপালকের নূরে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে, আমলনামা রেখে দেয়া হবে এবং নবীদেরকে ও সাক্ষীদেরকে হাজির করে দেয়া হবে।” (৩৯:৬৯) অন্য একটি আয়াতে আছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “ঐ সময়েই বা কি অবস্থা হবে? যখন আমি প্রত্যেক উম্মত হতে এক একজন সাক্ষী উপস্থাপিত করবো এবং তোমাকে তাদের উপর সাক্ষীরূপে উপস্থিত করবো।” (৪:৪১) কিন্তু এখানে ইমাম দ্বারা আমলনামাই উদ্দেশ্য। এজন্যেই এরপরেই আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ যাদেরকে দক্ষিণ হস্তে তাদের আমলনামা দেয়া হবে তারা তাদের আমলনামা পাঠ করবে। এমন কি খুশীতে অন্যদেরকেও দেখাবে ও পাঠ করাবে। এরই আরো বর্ণনা সূরায়ে তে রয়েছে। দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ঐ লম্বা সুতা যা খেজুরের আঁটির মধ্যে থাকে। বাযার (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই আয়াতের তাফসীরে বলেছেনঃ “একটি লোককে ডেকে তার আমলনামা তার ডান হাতে দেয়াহবে। তখন তার দেহ বেড়ে যাবে, চেহারা উজ্জ্বল হবে এবং মাথায় উজ্জ্বলহীরার মুকুট পরিয়ে দেয়া হবে। সে তার দলীয় লোকদের দিকে এগিয়ে যাবে। তারা তাকে ঐ অবস্থায় আসতে দেখে সবাই আকাংখা করে বলবেঃ “হে আল্লাহ! আমাদেরকেও এটা দান করুন এবং আমাদেরকে এতে বরকত দিন।” ঐ লোকটি তাদের কাছে এসেই বলবেঃ “তোমরা আনন্দিত হও। তোমাদের প্রত্যেককেও এটা দেয়া হবে।” কিন্তু কাফিরের চেহারা কালো ও মলিন হয়ে যাবে এবং তারও দেহ বেড়ে যাবে। তাকে দেখে তার সঙ্গীরা বলবেঃ “আমরা তার থেকে আল্লাহ তাআলার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি, তার দুষ্কৃতি থেকে আমরা আশ্রয় প্রার্থনা করছি। হে আল্লাহ! তাকে আমাদের কাছে আনয়ন করবেন না।” ইতিমধ্যে সে সেখানে চলে আসবে। তারা তখন তাকে বলবেঃ “আল্লাহ তোমাকে অপদস্থ করুন।” সে জবাবে তাদেরকে বলবেঃ “তোমাদেরকে আল্লাহ ধ্বংস করুন! এটা আল্লাহর মার। এটা তোমাদের সবারই জন্যে অবধারিত রয়েছে।”এই দুনিয়ায় যারা আল্লাহ তাআলার আয়াত সমূহ হতে, তাঁর কিতাব হতে এবং তাঁর হিদায়াতের পথ হতে চক্ষু ফিরিয়ে নিয়েছে, পরকালে বাস্তবপক্ষেই তারা অন্ধ হয়ে যাবে এবং দুনিয়ার চেয়েও বেশী পথভ্রষ্ট হবে। আমরা এর থেকে মহান আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।