আল কুরআন


সূরা আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল) (আয়াত: 33)

সূরা আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল) (আয়াত: 33)



হরকত ছাড়া:

ولا تقتلوا النفس التي حرم الله إلا بالحق ومن قتل مظلوما فقد جعلنا لوليه سلطانا فلا يسرف في القتل إنه كان منصورا ﴿٣٣﴾




হরকত সহ:

وَ لَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِیْ حَرَّمَ اللّٰهُ اِلَّا بِالْحَقِّ ؕ وَ مَنْ قُتِلَ مَظْلُوْمًا فَقَدْ جَعَلْنَا لِوَلِیِّهٖ سُلْطٰنًا فَلَا یُسْرِفْ فِّی الْقَتْلِ ؕ اِنَّهٗ کَانَ مَنْصُوْرًا ﴿۳۳﴾




উচ্চারণ: ওয়ালা-তাকতুলুন্নাফছাল্লাতী হাররামাল্লা-হু ইল্লা-বিল হাক্কি ওয়া মান কুতিলা মাজলূমান ফাকাদ জা‘আলনা-লিওয়ালিইয়িহী ছুলতা-নান ফালা-ইউছরিফ ফিল কাতলি ইন্নাহূকা-না মানসূরা-।




আল বায়ান: আর তোমরা সেই নাফ্সকে হত্যা করো না, যা আল্লাহ হারাম করেছেন, সঙ্গত কারণ ছাড়া। যে অন্যায়ভাবে নিহত হয় আমি অবশ্যই তার অভিভাবককে ক্ষমতা দিয়েছি। সুতরাং হত্যার ব্যাপারে সে সীমালঙ্ঘন করবে না; নিশ্চয় সে হবে সাহায্যপ্রাপ্ত।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৩. আর আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে না!(১) কেউ অন্যায়ভাবে নিহত হলে তার উত্তরাধিকারীকে তো আমরা তার প্ৰতিকারের অধিকার দিয়েছি(২); কিন্তু হত্যা ব্যাপারে সে যেন বাড়াবাড়ি না। করে(৩); সে তো সাহায্যপ্ৰাপ্ত হয়েছেই।




তাইসীরুল ক্বুরআন: যথাযথ কারণ ছাড়া আল্লাহ যাকে হত্যা করা নিষিদ্ধ করেছেন তাকে হত্যা করো না। কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হলে আমি তার উত্তরাধিকারীকে অধিকার দিয়েছি (কিসাস দাবী করার বা ক্ষমা করে দেয়ার) কাজেই সে যেন হত্যার ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন না করে, কারণ তাকে তো সাহায্য করা হয়েছে (আইন-বিধান দিয়ে)।




আহসানুল বায়ান: (৩৩) আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করো না; [1] কেউ অন্যায়ভাবে নিহত হলে তার উত্তরাধিকারীকে তো আমি প্রতিশোধ গ্রহণের অধিকার দিয়েছি। সুতরাং হত্যার ব্যাপারে সে যেন বাড়াবাড়ি না করে; নিশ্চয় সে সাহায্যপ্রাপ্ত। [2]



মুজিবুর রহমান: আল্লাহ যার হত্যা নিষেধ করেছেন যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করনা; কেহ অন্যায়ভাবে নিহত হলে তার উত্তরাধিকারীকে আমি প্রতিশোধ গ্রহণের অধিকার দিয়েছি। কিন্তু হত্যার ব্যাপারে সে যেন বাড়াবাড়ি না করে; সেতো সাহায্য প্রাপ্ত হয়েছেই।



ফযলুর রহমান: আল্লাহ যাকে হত্যা করা নিষিদ্ধ করেছেন ন্যায্য কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করো না। যাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয় তার উত্তরাধিকারীকে তো আমি (কেসাস বা দিয়াত গ্রহণ অথবা ক্ষমা করার) ক্ষমতা দিয়েছি; তবে সে যেন হত্যার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি না করে। (ইসলামের বিধানে) নিশ্চয়ই সে সাহায্যপ্রাপ্ত।



মুহিউদ্দিন খান: সে প্রাণকে হত্যা করো না, যাকে আল্লাহ হারাম করেছেন; কিন্তু ন্যায়ভাবে। যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে নিহত হয়, আমি তার উত্তরাধিকারীকে ক্ষমতা দান করি। অতএব, সে যেন হত্যার ব্যাপারে সীমা লঙ্ঘন না করে। নিশ্চয় সে সাহায্যপ্রাপ্ত।



জহুরুল হক: আর কোনো সত্ত্বাকে যথাযথ কারণ ব্যতীত হত্যা করো না যাকে আল্লাহ্ নিষেধ করেছেন। আর যে কেউ অন্যায়ভাবে নিহত হয় ইতিমধ্যে আমরা তো তার অভিভাবককে অধিকার দিয়েছি, কাজেই হত্যার ব্যাপারে সে যেন বাড়াবাড়ি না করে। সে নিশ্চয়ই সাহায্যপ্রাপ্ত হবে।



Sahih International: And do not kill the soul which Allah has forbidden, except by right. And whoever is killed unjustly - We have given his heir authority, but let him not exceed limits in [the matter of] taking life. Indeed, he has been supported [by the law].



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৩৩. আর আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে না!(১) কেউ অন্যায়ভাবে নিহত হলে তার উত্তরাধিকারীকে তো আমরা তার প্ৰতিকারের অধিকার দিয়েছি(২); কিন্তু হত্যা ব্যাপারে সে যেন বাড়াবাড়ি না। করে(৩); সে তো সাহায্যপ্ৰাপ্ত হয়েছেই।


তাফসীর:

১. অন্যায় হত্যার অবৈধতা বর্ণনা প্রসঙ্গে এটা আরেক নির্দেশ। অন্যায় হত্যা যে মহা অপরাধ, তা বিশ্বের দলমত ও ধর্মাধর্ম নির্বিশেষে সবার কাছে স্বীকৃত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ একজন মুমিনকে অন্যায়ভাবে হত্যা করার চাইতে আল্লাহর কাছে সমগ্ৰ বিশ্বকে ধ্বংস করে দেয়া লঘু অপরাধ। [তিরমিযীঃ ১৩৯৫, ইবনে মাজহঃ ২৬১৯] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেনঃ প্রত্যেক গোনাহ আল্লাহ্ তাআলা ক্ষমা করবেন বলে আশা করা যায়, কিন্তু যে ব্যক্তি কুফারী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে অথবা যে ব্যক্তি জেনে-শুনে ইচ্ছাপূর্বক কোন মুসলিমকে হত্যা করে, তার গোনাহ ক্ষমা করা হবে না। [নাসায়ীঃ ৭/৮১] সুতরাং কোন মু’মিনকে হত্যা করা অন্যায়। শুধুমাত্র তিনটি কারণে অন্যায় হত্যা ন্যায়ে পরিণত হয়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে মুসলিম আল্লাহ একমাত্র সত্যিকার মাবুদ এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল বলে সাক্ষ্য দেয়, তার রক্ত হালাল নয়; কিন্তু তিনটি কারণে তা হালাল হয়ে যায়। (এক) বিবাহিত হওয়া সত্বেও সে যদি যিনা করে, তবে প্রস্তুর বর্ষণে হত্যা করাই তার শরীআতসম্মত শাস্তি। (দুই) সে যদি অন্যায়ভাবে কোন মানুষকে হত্যা করে, তবে তার শাস্তি এই যে, নিহত ব্যক্তির ওলী তাকে কেসাস হিসেবে হত্যা করতে পারে। (তিন) যে ব্যক্তি ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে, তার শাস্তিও হত্যা। [মুসলিমঃ ১৬৭৬] এ তিনটি শাস্তির দাবী করার অধিকার প্রতিটি মুমিনের তবে এগুলো বাস্তবায়নের ক্ষমতা কেউ যেন নিজ হাতে নিয়ে না নেয়। বরং একমাত্র ইসলামী রাষ্ট্রের সরকার প্রধান এ অধিকার পাবে।

দাহহাক বলেন, এটি মক্কায় নাযিল হয়েছে। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও মুসলিমরা তখন মক্কায় ছিল। এটি হত্যা সংক্রান্ত নাযিল হওয়া প্রথম আয়াত। তখন মুসলিমদেরকে কাফেররা গোপনে বা প্রকাশ্যে হত্যা করছিল। তাই আল্লাহ তা’আলা এ নির্দেশ দিচ্ছেন যে, মুশরিকদের কেউ তোমাদের হত্যা করছে বলে তোমরা তাদের পিতা, ভাই, অথবা তাদের গোত্রীয় কাউকে হত্যা করো না। যদিও তারা মুশরিক হয়। তোমাদের হত্যাকারী ছাড়া কাউকে হত্যা করো না। [ফাতহুল কাদীর]


২. মূল শব্দ হচ্ছে, “তার অভিভাবককে আমি সুলতান দান করেছি।” এখানে সুলতান অর্থ হচ্ছে “প্ৰমাণ” যার ভিত্তিতে সে হত্যাকারীর উপর কিসাস দাবী করতে পারে। এ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি বের হয় যে, হত্যা মোকদ্দমায় নিহত ব্যক্তির অভিভাবকগণই এর মূল বাদীপক্ষ। তারা হত্যাকারীকে মাফ করে দিতে এবং কিসাসের পরিবর্তে রক্তপণ গ্ৰহণ করতে সম্মত হতে পারে। [ইবন কাসীর] তবে যদি মূল অভিভাবক না থাকে, তখন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি এ কাজের দায়িত্ব নিতে পারে। [ফাতহুল কাদীর]


৩. এর সারমর্ম এই যে, অন্যায়ের প্রতিশোধ অন্যায়ের মাধ্যমে নেয়া জায়েয নয়। প্ৰতিশোধের বেলায়ও ইনসাফের প্রতি লক্ষ্য রাখা অপরিহার্য। হত্যার ব্যাপারে বিভিন্নভাবে সীমা অতিক্রম করা যেতে পারে। এগুলো সবই নিষিদ্ধ। যেমন প্ৰতিশোধ গ্রহণ করতে গিয়ে উন্মত্তের মতো অপরাধী ছাড়া অন্যদেরকেও হত্যা করা। অথবা অপরাধীকে কষ্ট দিয়ে দিয়ে মেরে ফেলা। কিংবা মেরে ফেলার পর তার লাশের উপর মনের ঝাল মেটানো অথবা রক্তপণ নেবার পর আবার তাকে হত্যা করা ইত্যাদি। [ইবন কাসীর] যে পর্যন্ত নিহত ব্যক্তির ওলী ইনসাফ সহকারে নিহতের প্রতিশোধ কেসাস নিতে চাইবে, সেই পর্যন্ত শরীআতের আইন তার পক্ষে থাকবে। আল্লাহ তাআলা তার সাহায্যকারী হবেন। পক্ষান্তরে সে যদি প্রতিশোধ স্পৃহায় উম্মত্ত হয়ে কেসাসের সীমালঙ্ঘন করে, তবে সে মযলুম না হয়ে যালেম হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর আইন এখন তার সাহায্য করার পরিবর্তে প্রতিপক্ষের সাহায্য করবে এবং তাকে যুলুম থেকে বাঁচাবে।

যায়েদ ইবন আসলাম এ আয়াতের তাফসীরে বলেন, জাহেলিয়াত যুগের আরবে সাধারণতঃ এক ব্যক্তির হত্যার পরিবর্তে হত্যাকারীর পরিবার অথবা সঙ্গীসাথীদের মধ্য থেকে যাকেই পাওয়া যেত, তাকেই হত্যা করা হত। কোন কোন ক্ষেত্রে নিহত ব্যক্তি গোত্রের সরদার অথবা বড়লোক হলে তার পরিবর্তে শুধু এক ব্যক্তিকে কেসাস হিসেবে হত্যা করা যথেষ্ট মনে করা হত না; বরং এক খুনের পরিবর্তে দু-তিন কিংবা আরও বেশী মানুষের প্রাণ সংহার করা হত। কেউ কেউ প্রতিশোধ সম্পূহায় উম্মত্ত হয়ে হত্যাকারীকে শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত হত না, বরং তার নাক, কান ইত্যাদি কেটে অঙ্গ বিকৃত করা হত। আয়াতে মুসলিমদেরকে এ রকম কিছু না করতে উপদেশ দেয়া হয়েছে [ফাতহুল কাদীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৩৩) আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করো না; [1] কেউ অন্যায়ভাবে নিহত হলে তার উত্তরাধিকারীকে তো আমি প্রতিশোধ গ্রহণের অধিকার দিয়েছি। সুতরাং হত্যার ব্যাপারে সে যেন বাড়াবাড়ি না করে; নিশ্চয় সে সাহায্যপ্রাপ্ত। [2]


তাফসীর:

[1] যথার্থ কারণে হত্যাঃ যেমন হত্যার বদলে হত্যা করা। যাকে মানুষের জীবন এবং নিরাপত্তার ও শান্তির কারণ গণ্য করা হয়েছে। অনুরূপ বিবাহিত ব্যভিচারীকে এবং মুরতাদ (ধর্মত্যাগী)-কে হত্যা করার নির্দেশ আছে।

[2] অর্থাৎ, নিহতের উত্তরাধিকারীদের এ অধিকার বা ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যে, তারা হত্যাকারীকে ক্ষমতাসীন শাসক কর্তৃক শরীয়তী ফায়সালার পর খুনের বদলে খুন নিয়ে তাকে হত্যা করবে অথবা তার নিকট থেকে মুক্তিপণ গ্রহণ করবে কিংবা তাকে ক্ষমা করে দেবে। আর যদি খুনের বদলে খুনই করতে চায়, তবে তাতে যেন বাড়াবাড়ি না করে। অর্থাৎ, একজনের পরিবর্তে দু’জনকে যেন হত্যা না করে অথবা তার যেন অঙ্গবিকৃতি না ঘটায় অথবা নানা কষ্ট দিয়ে যেন তাকে হত্যা না করে। নিহতের ওয়ারেস ‘সাহায্যপ্রাপ্ত’ অর্থাৎ, নেতা ও শাসকদেরকে তার সাহায্য করার তাকীদ করা হয়েছে। কাজেই এর জন্য আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। বাড়াবাড়ি করে তাঁর অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত নয়।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৩১-৩৩ নং আয়াতের তাফসীর:



পূর্বের আয়াতে রিযিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা, তিনি মানবসহ সকল প্রাণীর রিযিকের দায়িত্ব নিয়েছেন এ কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার পর মানুষকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন দারিদ্রতার ভয়ে সন্তান হত্যা না করে। কারণ তিনিই তোমাদেরকে এবং তোমাদের সন্তানদেরকে রিযিক দিয়ে থাকেন। আমরা জানি মানুষ সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে রিযিক নির্ধারণ করে রাখা হয়। সুতরাং যিনি দুনিয়াতে মানুষ প্রেরণ করবেন তিনি তার রিযিকের ব্যাবস্থা করেই প্রেরণ করবেন। দারিদ্রতার ভয়ে সন্তান হত্যা করা শিরকের পর বড় ধরণের একটি গুনাহ বলে হাদীসে এসেছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, তুমি তোমার নিজ সন্তানকে এই ভয়ে হত্যা করো না যে, সে তোমার সাথে খাবে। (সহীহ বুখারী হা: ৪৪৭৭)



অনেকে মনে করে থাকে, এটা অপরাধ হবে বাচ্চা দুনিয়াতে আসার পর হত্যা করলে। না, ছোট ও সুখী পরিবারের নামে বা অর্থ সম্পদ নেই, বেশি সন্তান হলে খাবার দেব কোথা থেকে, বা মহিলাদের সৌন্দর্য অক্ষত রাখার জন্য সন্তান কম নেয়াই হল সন্তান হত্যা করা। এসব যেকোন পদ্ধতিতেই হোক না কেন এ অপরাধের শামিল হবে। এ সম্পর্কে সূরা আন‘আমের ১৫১ নং আয়াতে আলোচনা রয়েছে।



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা ব্যভিচারের মত অশ্লীল বেহায়াপনাপূর্ণ কাজের নিকটবর্তী হতেও নিষেধ করছেন। এটি এমন একটি অপরাধ যে, অপরাধী বিবাহিত হলে ইসলামী সমাজে তার জীবিত থাকার অধিকার থাকে না। এমনকি তরবারী দিয়ে হত্যা করলেও যথেষ্ট হয় না, বরং পাথর মেরে হত্যা করতে হয় যাতে সমাজে এ শ্রেণির লোকদের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে এবং লোকেরা তা থেকে শিক্ষা নেয়। তাই এখানে ব্যভিচারের কথা বলা হয়নি, ব্যভিচারের প্রতি উৎসাহিত করে, ধাবিত করে এমন কাজ ও কথাবার্তার কাছে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন গায়ের মাহরাম নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, কোমল কন্ঠে কথা বলা, মহিলাদের সাজ-সজ্জা করে বাড়ির বাইরে যাওয়া, অশ্লীল গান-বাজনা ও ভিডিও ফিল্ম ইত্যাদি। আল্লাহ তা‘আলা এটাকে فَاحِشَةً বা অশ্লীল বলে আখ্যায়িত করেছেন, কারণ এটা শরীয়তের দিক থেকে যেমন খারাপ কাজ তেমনি মানুষের বিবেকও খারাপ বলে। এতে আল্লাহ তা‘আলার হক নষ্ট হয়, মহিলার হক নষ্ট হয়, স্বামীর হক নষ্ট হয় সর্বোপরি সমাজে অশ্লীতা সৃষ্টি হয় ও মানুষের বংশনামা নষ্ট হয়। তাই আমাদের প্রত্যেককে এ অশ্লীল কাজ থেকে বেঁচে থাকতে হবে।



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা নিষেধ করছেন ইসলামী শরীয়তের বৈধ পন্থা ব্যতীত কাউকে হত্যা করতে। যেমন অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন, যদি কেউ কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করল সে সারা পৃথিবীর মানুষকে হত্যা করল। (সূরা মায়িদাহ ৫:৩২)



আর যদি মু’মিনকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে তাহলে তার ঠিকানা জাহান্নাম। (সূরা নিসা ৪:৯৩)



কাউকে হত্যা করার বৈধ পন্থাগুলো হল হত্যার বদলে হত্যা করা, বিবাহিত ব্যক্তি ব্যভিচার করলে তাকে হত্যা করা এবং কেউ ইসলাম বর্জন করে মুরতাদ হলে তাকে হত্যা করা। সেটাও রাষ্ট্রপ্রধনের দায়িত্বে। উল্লিখিত বিধি-বিধানগুলো সম্পর্কে সূরা আন‘আমের ১৫১ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।



(وَمَنْ قُتِلَ مَظْلُوْمًا فَقَدْ جَعَلْنَا لِوَلِيِّه۪ سُلْطَانًا)



-এখানে আল্লাহ তা‘আলা ঘোষণা করছেন যে, যদি কোন ব্যক্তি অন্যায়ভাবে নিহত হয় তাহলে তার যে অভিভাবক রয়েছে তারা দায়িত্বশীল হবে। অর্থাৎ ইসলামী সরকারের ব্যবস্থাপনায় নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীগণ হত্যা করলে হত্যাকারীকে হত্যা করতে পারবে, ইচ্ছা করলে দিয়াত গ্রহণ করতে পারবে অথবা সম্পূর্ণ ক্ষমা করে দিতে পারবে। তিনটি বিধানেই তাদের স্বাধীনতা রয়েছে, তবে বাড়াবাড়ি যাতে না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। বাড়াবাড়ি বলতে হত্যাও করবে আবার দিয়াতও নেবে, বা ক্ষমা করে আবার হত্যা করল বা কিসাস গ্রহণ করার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি যেমন



(১) একজনকে হত্যা করার ফলে দুইজন বা একের অধিক জনকে হত্যা করা, যদি তারা জড়িত না থাকে।

(২) একজনকে হত্যা করার ফলে একজনকেই হত্যা করা, কিন্তু যে হত্যা করেছে তার পরিবর্তে অন্যকে হত্যা করা।

(৩) একজনকে এবং যে হত্যা করেছে তাকেই হত্যা করা কিন্তু তার সাথে অতিরিক্ত আঘাত করা। এগুলো হল হত্যা করার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা। (আযওয়াউল বায়ান, অত্র আয়াতের তাফসীর)



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. যেকোন পদ্ধতি অবলম্বন করে দারিদ্রতার ভয়ে সন্তান হত্যা করা জঘন্য অপরাধ।

২. রিযিক দেয়ার মালিক আল্লাহ তা‘আলা।

৩. যিনা-ব্যাভিচারের মত অশ্লীল কাজ করা তো দূরের কথা, এর নিকটবর্তীও হওয়া যাবে না।

৪. বৈধ কারণ ব্যতীত মানুষকে হত্যা করা যাবে না।

৫. অন্যায়ভাবে নিহত হলে কিসাস গ্রহণ করার সুযোগ রয়েছে।

৬. কিসাস আদায়ের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা যাবে না।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: আল্লাহ তাআলা বলেন যে, শরীয়তের কোন হক ছাড়া কাউকেও হত্যা করা হারাম। সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ এক হওয়া এবং মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর রাসূল হওয়ার সাক্ষ্য প্রদান করেছে তাকে তিনটি কারণের কোন একটি ছাড়া হত্যা করা বৈধ নয়। কারণগুলি হচ্ছেঃ হয়তো সে কাউকেও হত্যা করেছে অথবা বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও ব্যভিচার করেছে কিংবা দ্বীন হতে ফিরে গিয়ে জমাআতকে পরিত্যাগ করেছে।

সুনানে রয়েছে যে, সারা দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাওয়া আল্লাহ তাআলার নিকট একজন মুমিনের হত্যা অপেক্ষা বেশী হাকা। যদি কোন লোক কারো হাতে অন্যায়ভাবে নিহত হয়, তবে আল্লাহ তাআলা তার উত্তরাধিকারীদেরকে হত্যাকারীর উপর অধিকার দান করেছেন। তার উপর কিসাস (হত্যার বিনিময়ে হত্যা) লওয়া বা রক্তপণ গ্রহণ করা অথবা সম্পূর্ণরূপে ক্ষমা করে দেয়া তাদের ইখতিয়ার রয়েছে।

একটি বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) এই আয়াতের হুকুম কে সাধারণ হিসেবে ধরে নিয়ে হযরত মুআবিয়ার (রাঃ) রাজত্বের উপর এটাকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন যে, তিনি বাদশাহ হয়ে যাবেন। কেননা, হযরত উছমানের (রাঃ) ওয়ালী তিনিই ছিলেন। আর হযরত উছমান (রাঃ) শেষ পর্যায়ের জুলুমের সাথে শহীদ হয়েছিলেন। হযরত মুআবিয়া (রাঃ) , হযরত আলীর (রাঃ) নিকট আবেদন জানিয়েছিলেন যে, হযরত উছমানের (রাঃ) হত্যাকারীদের উপর যেন কিসাস নেয়া হয়। কেননা, হযরত মুআবিয়াও (রাঃ) উমাইয়া বংশীয় ছিলেন। হযরত আলী (রাঃ) এ ব্যাপারে কিছুটা শিথিলতা করছিলেন। এদিকে তিনি হযরত মুআবিয়ার (রাঃ) । নিকটে আবেদন করেছিলেন যে, তিনি যেন সিরিয়াকে তাঁর হাতে সমর্পণ করেন। হযরত মুআবিয়া (রাঃ) হযরত আলীকে (রাঃ) পরিষ্কার ভাষায় বলে দিয়েছিলেনঃ “যে পর্যন্ত না আপনি হযরত উছমানের (রাঃ) হত্যাকারীদেরকে আমার হাতে সমর্পণ করবেন, আমি সিরিয়াকে আপনার শাসনাধীন করবো ।” সুতরাং তিনি সমস্ত সিরিয়াবাসীসহ হযরত আলীর (রাঃ) হাতে বায়আত গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদী কলহ শুরু হয়ে যায় এবং হযরত মুআবিয়া (রাঃ) সিরিয়ার শাসনকর্তা হয়ে যান।

মু’জিমে তিবরানীতে এই রিওয়াইয়াত রয়েছে যে, হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) রাত্রির কথোপকথনে একবার বলেনঃ “আজ আমি তোমাদেরকে একটি কথা শুনাচ্ছি যা এমন কোন গোপনীয় কথাও নয় এবং তেমন প্রকাশ্য কথাও নয়। হযরত উছমানের (রাঃ) যা কিছু করা হয়েছে, ঐ সময় আমি তাকে নিরপেক্ষ থাকতে পরামর্শ দিয়েছিলাম এবং বলেছিলামঃ আল্লাহর শপথ! যদি আপনি কোন পাথরের মধ্যেও লুকিয়ে থাকেন তবুও আপনাকে বের করা হবে। কিন্তু তিনি আমার পরামর্শ গ্রহণ করেন নাই। আর একটি কথা জেনে নাও যে, আল্লাহর কসম! মুআবিয়া (রাঃ) তোমাদের উপর বাদশাহ হয়ে যাবেন। কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ “যে অত্যাচারিত ব্যক্তি নিহত হবে, আমি তার ওয়ারিছদেরকে তার উপর প্রতিশোধ গ্রহণের অধিকার দিয়েছি। এখন তারা যে হত্যার বিনিময়ে হত্যা করবে, এ ব্যাপারে তারা যেন বাড়াবাড়ি না করে (শেষ পর্যন্ত)। আরো জেনে রেখো যে, এই কুরায়েশী তোমাদেরকে পারস্য ও রোমের পন্থায় উত্তেজিত করবে এবং তোমাদের উপর খৃস্টান, ইয়াহুদী ও মাজুসী দাঁড়িয়ে যাবে। ঐ সময় যে ব্যক্তি ওটা ধারণ করবে যা সুপরিচিত, সে মুক্তি পেয়ে যাবে। আর যে ব্যক্তি ওটা ছেড়ে দেবে এবং বড়ই আফসোস যে, তোমরা ছেড়েই দেবে, তবে তোমরা এ যুগের লোকদের মত হয়ে যাবে যে, যারা ধ্বংস প্রাপ্তদের সাথে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।” এখন মহান আল্লাহ বলেনঃ ওয়ারিছদের জন্যে এটা উচিত নয় যে, হত্যার বদলে হত্যার ব্যাপারে তারা সীমালংঘন করে। যেমন তার মৃতদেহকে নাক, কান কেটে বিকৃত করা বা হত্যাকারী ছাড়া অন্যের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করা ইত্যাদি। শরীয়তে নিহত ব্যক্তির ওয়ারিছকে অধিকার ও ক্ষমা প্রদানের দিক দিয়ে সর্বপ্রকার সাহায্য দান করা হয়েছে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।