সূরা আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল) (আয়াত: 27)
হরকত ছাড়া:
إن المبذرين كانوا إخوان الشياطين وكان الشيطان لربه كفورا ﴿٢٧﴾
হরকত সহ:
اِنَّ الْمُبَذِّرِیْنَ کَانُوْۤا اِخْوَانَ الشَّیٰطِیْنِ ؕ وَ کَانَ الشَّیْطٰنُ لِرَبِّهٖ کَفُوْرًا ﴿۲۷﴾
উচ্চারণ: ইন্নাল মুবাযযি রীনা কা-নূইখওয়া-নাশশাইয়া-তীনি ওয়া কা-নাশ শাইতা-নু লিরাব্বিহী কাফূরা-।
আল বায়ান: নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার রবের প্রতি খুবই অকৃতজ্ঞ।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৭. নিশ্চয় যারা অপব্যয় করে তারা শয়তানের ভাই এবং শয়তান তার রাবের প্রতি খুবই অকৃতজ্ঞ।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই আর শয়তান তো তার প্রতিপালকের প্রতি না-শোকর।
আহসানুল বায়ান: (২৭) নিশ্চয় যারা অপব্যয় করে, তারা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ। [1]
মুজিবুর রহমান: নিশ্চয়ই যারা অপব্যয় করে তারা শাইতানের ভাই এবং শাইতান তার রবের প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ।
ফযলুর রহমান: অপব্যয়কারীরা শয়তানদের ভাই। আর শয়তান তার প্রভুর প্রতি বড়ই অকৃতজ্ঞ।
মুহিউদ্দিন খান: নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। শয়তান স্বীয় পালনকর্তার প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ।
জহুরুল হক: নিঃসন্দেহ অপব্যয়ীরা হচ্ছে শয়তানগোষ্ঠীর ভাই-বিরাদর। আর শয়তান হচ্ছে তার প্রভুর প্রতি বড় অকৃতজ্ঞ।
Sahih International: Indeed, the wasteful are brothers of the devils, and ever has Satan been to his Lord ungrateful.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২৭. নিশ্চয় যারা অপব্যয় করে তারা শয়তানের ভাই এবং শয়তান তার রাবের প্রতি খুবই অকৃতজ্ঞ।(১)
তাফসীর:
১. ব্যয়ের ক্ষেত্রে অপচয় করতে নিষেধ করা হয়েছে। মধ্যপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যেমন অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “এবং যখন তারা ব্যয় করে তখন অপব্যয় করে না, কৃপনতাও করে না, আর তাদের পন্থা হয় এতদুভয়ের মধ্যবর্তী।” [সূরা আল-ফুরকান: ৬৭] ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, অপচয় হচ্ছে, অন্যায় পথে ব্যয় করা। মুজাহিদ বলেন, যদি কোন লোক তার সমস্ত সম্পত্তি হক পথে ব্যয় করে তারপরও সেটা অপচয় হবে না। আর যদি অন্যায়ভাবে এক মুদ পরিমাণও ব্যয় করে তবুও সেটা অপচয় হবে। কাতাদাহ বলেন, অপচয় হচ্ছে আল্লাহর অবাধ্যতা, অন্যায় ও ফাসাদ-সৃষ্টিতে ব্যয় করা। [ইবন কাসীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২৭) নিশ্চয় যারা অপব্যয় করে, তারা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ। [1]
তাফসীর:
[1] تَبْذِيْرٌ এর মূল ধাতু হল بِذْرٌ (বীজ)। যেমন যমীনে বীজ ফেলার সময় এটা লক্ষ্য করা হয় না যে, তা যথাস্থানে পড়ছে, না যেখানে সেখানে পড়ে যাচ্ছে। বরং চাষী বীজ ফেলেই চলে যায়। تَبْذِيْرٌ (অপব্যয়ে)ও এটাই হয়। মানুষ তার মাল বীজ ফেলার মত ছড়াতে থাকে এবং ব্যয় করার ব্যাপারে শরীয়তের সীমা অতিক্রম করে। কেউ কেউ বলেছেন, تَبْذِيْر হল, অবৈধ কার্যকলাপে ব্যয় করা, যদিও তা সামান্য হয়। আমাদের জানা মতে উভয় অবস্থাই تَبْذِيْر (অপব্যয়)এর পর্যায়ভুক্ত। আর এটা এত বড় জঘন্য কাজ যে, এতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির শয়তানের সাথে রয়েছে পূর্ণ সাদৃশ্য। অথচ শয়তানের সাদৃশ্য গ্রহণ করা থেকে দূরে থাকা মানুষের জন্য ওয়াজেব; যদি তা (শয়তানের) কোন একটি অভ্যাসেও হয়। এ ছাড়া শয়তানকে كَفُوْرٌ (অতিশয় অকৃতজ্ঞ) বলে তার মত না হতে আরো তাকীদ করা হয়েছে। অর্থাৎ, যদি তুমি শয়তানের সাদৃশ্য গ্রহণ কর, তাহলে (তুমি তার ভাই হবে এবং) তুমিও তার মত كَفُوْرٌ (অকৃতজ্ঞ) বিবেচিত হয়ে যাবে। (ফাতহুল কাদীর)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২৬-২৮ নং আয়াতের তাফসীর:
পূর্বের আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা পিতামাতার সাথে সৎ আচরণ করার নির্দেশ দেয়ার পর আত্মীয়-স্বজন, ফকীর-মিসকীনদের ও পথিকদের হক দিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন। তাদের হক হল তাদের সাথে ভাল ব্যবহার করা, তাদেরকে ধমক না দেয়া এবং বিপদে পড়লে সহযোগিতা করা। আর ধনীদের সম্পদে তারা যাকাত পাওয়ার যে হকদার সে হক দিয়ে দেয়া। আত্মীয়-স্বজনরা যদি ওয়ারিশ হয় তাহলে তাদের প্রাপ্য সম্পদ দিয়ে দেয়া এবং মারা গেলে তাদের জানাযায় শরীক হওয়া। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর। অতঃপর যারা নিকটবর্তী ও তাদের পরে যারা নিকটবর্তী। (মুসতাদরাক: ৪২১৯, শুআবুল ঈমান হা: ৭৮৪৪)
অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: “যে ব্যক্তি তার রিযিক ও আয়ু বৃদ্ধি করতে চায় সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।” (সহীহ বুখারী হা: ৫৯৮৫, ৫৯৮৬, সহীহ মুসলিম হা: ২৫৫৭)
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে অপচয় করতে নিষেধ করেছেন। আর যে অপচয় করে তাকে শয়তানের ভাই হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। অপচয় হল প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয় করা বা নষ্ট করা। সেটা যেকোন ক্ষেত্রে হতে পারে। সম্পদ অপচয় হতে পারে, সময় অপচয় হতে পারে, জ্ঞান-বুদ্ধির অপচয় হতে পারে, ইত্যাদি। মু’মিনরা কখনো কিছু অপচয় করে না, তাদের সম্পদ অতিরিক্ত থাকলে আল্লাহ তা‘আলার পথে ব্যয় করে, সময় অতিরিক্ত থাকলে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতে মগ্ন থাকে। সুতরাং কেবল শয়তানের অনুসারীরাই অপচয় করতে পারে, অন্য কেউ নয়।
অর্থাৎ আর্থিক সামর্থ্য না থাকার কারণে (যা দূরীভূত হওয়ার এবং রুযীর প্রসারতার তুমি তোমার প্রতিপালকের কাছে আশা রাখ) যদি তোমাকে গরীব আত্মীয়-স্বজন, মিসকিন এবং অভাবী ব্যক্তিদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে হয় অর্থাৎ কিছু দিতে না পারার ওজর পেশ করতে হয় তাহলে নরম ও কোমল কন্ঠে পেশ করবে। কর্কশ ও অভদ্রতার সাথে বলো না। কেননা তাদের সাথে ভালভাবে কথা বলা এটাও একটা সাদকাহ।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(قَوْلٌ مَّعْرُوْفٌ وَّمَغْفِرَةٌ خَيْرٌ مِّنْ صَدَقَةٍ يَّتْبَعُهَآ أَذًي ط وَاللّٰهُ غَنِيٌّ حَلِيْمٌ)
“ভাল কথা বলা এবং ক্ষমা প্রদর্শন করা ঐ দানের চেয়ে উত্তম যে দানের পরে কষ্ট দেয়া হয়। আর আল্লাহ ধনী এবং ধৈর্যশীল।” (সূরা বাকারাহ ২:২৬৩) সুতরাং গরীব-মিসকিনরা কোন কিছু চাইতে আসলে যথাসম্ভব কিছু দেয়ার চেষ্টা করবে, দিতে না পারলে তাদের সাথে রূঢ় আচরণ করবে না, বরং সুন্দর ভাষায় ও ভদ্রতার সাথে বিদায় দেবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
(১) হক্বদারদের হক্ব যথাযথভাবে আদায় করে দিতে হবে।
(২) অপচয় ও কৃপণতা করা যাবে না।
(৩) মানুষের সাথে উত্তম ব্যবহার করাও একটি নেকীর কাজ।
(৪) গরীব-মিসকিনদেরকে ধমক দিয়ে বিদায় দেয়া উচিত নয়, বরং যদি কিছু না দিতে পারো নরম ভাষায় বিদায় দেবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ২৬-২৮ নং আয়াতের তাফসীর
পিতা-মাতার সাথে সদয় আচরণের নির্দেশ দানের পর আল্লাহ তাআলা আত্মীয়দের সাথে সদয় ব্যবহারের নির্দেশ দিচ্ছেন। হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মাতার সাথে সদাচরণ কর এবং পিতার সাথেও সদাচরণ কর। তারপর তার সাথে উত্তম ব্যবহার কর যে বেশী নিকটবর্তী, তারপর তার সাথে যে বেশী নিকটবর্তী।” অন্য হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার জীবিকায় ও বয়সে বৃদ্ধি বা উন্নতি চায় সে যেন সদয় আচরণ করে।”
মুসনাদে বায্যারে রয়েছে যে, এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়া মাত্রই রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ফাতিমাকে (রাঃ) ডেকে তাকে ফিদক (বাগানটি) দান করেন। (এই হাদীসের সনদ সঠিক নয় এবং ঘটনাটিও সত্য বলে মনে হচ্ছে না। কেননা, এই আয়াতটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। এ সময় ফিদক' বাগানটি রাসূলুল্লাহর (সঃ) দখলেই ছিল না। সপ্তম হিজরীতে খায়বার বিজিত হয়, এরপর ফিদক নামক বাগানটি রাসূলুল্লাহর (সঃ) অধিকারভূক্ত হয়)
মিসকীন ও মুসাফিরের পূর্ণ তাফসীর সূরায়ে বারাআতে গত হয়ে গেছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। খরচের হুকুমের পর অপব্যয় করতে আল্লাহ তাআলা নিষেধ করছেন। মানুষের কৃপণ হওয়াও উচিত নয় এবং অপব্যয়ী হওয়াও উচিত নয়, বরং মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা উচিত। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “যখন তারা ব্যয় করে তখন তারা অমিতব্যয় করে না, কার্পণ্যও করে না, বরং তারা এতদুভয়ের মধ্যবর্তী পন্থা অবলম্বন করে।” (২৫:৬৭) তারপর আল্লাহ তাআলা অপব্যয়ের মন্দগুণের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, অপব্যয়ী লোকেরা শয়তানের ভাই। (আরবি) বলা হয় অন্যায় পথে ব্যয় করাকে। কেউ যদি তার সমুদয় মাল আল্লাহর পথে ব্যয় করে দেয়, তবুও তাকে অমিতব্যয়ী বলা হবে না। পক্ষান্তরে অল্প মালও যদি অন্যায় পথে ব্যয় করে তবুও, তাকে অমিতব্যয়ী বলা হবে।
বানু তামীম গোত্রের একটি লোক রাসূলুল্লাহর দরবারে হাজির হয়ে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি একজন সম্পদশালী লোক এবং আমার পরিবারবর্গ ও আত্মীয় স্বজন রয়েছে। আমি কি পন্থা অবলম্বন করবো। তা আমাকে বলে দিন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে বললেনঃ “প্রথমে তুমি। যাকাতকে তোমার মাল হতে পৃথক করে দাও, তাহলে তোমার মাল পবিত্র হয়ে যাবে। তারপর তা হতে তোমার আত্মীয় স্বজনের উপর খরচ কর, ভিক্ষুককে তার প্রাপ্য দিয়ে দাও এবং প্রতিবেশী ও মিসকীনদের উপরও খরচ কর।” সে আবার বললোঃ (আরবি) “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অল্প কথায় পূর্ণ। উদ্দেশ্যটি আমাকে বুঝিয়ে দিন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে বললেনঃ “আত্মীয় স্বজন, মিসকীন ও মুসাফিরদের হক আদায় কর এবং বাজে খরচ করো না।” সে তখন বললোঃ । অর্থাৎ “আল্লাহ আমার জন্যে যথেষ্ট।” আচ্ছা জনাব! যখন আপনার যাকাত আদায়কারীকে আমার যাকাতের মাল প্রদান করবো তখন কি আমি আল্লাহর ও তাঁর রাসূলের (সঃ) কাছে মুক্ত হয়ে যাবো। (অর্থাৎ আমার উপর আর কোন দায়িত্ব থাকবে না, (তা)?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে তাকে বললেনঃ “হাঁ, যখন তুমি আমার দূতকে তোমার যাকাতের মাল প্রদান করে দেবে তখন তুমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) কাছে মুক্ত হয়ে যাবে এবং তোমার জন্যে প্রতিদান ও পুরস্কার সাব্যস্ত হয়ে। যাবে। এখন যে এটা বদলিয়ে দেবে, এর গুনাহ তার উপরই বর্তিবে।”
এখানে বলা হয়েছে যে, অপব্যয়, নির্বুদ্ধিতা, আল্লাহর আনুগত্য হতে ফিরে আসা এবং অবাধ্যতার কারণে অপব্যয়ী লোকেরা শয়তানের ভাই হয়ে যায়। শয়তানের মধ্যে এই বদঅভ্যাসই আছে যে, সে আল্লাহর নিয়ামতের নাশুকরী করে এবং তার আনুগত্য অস্বীকার করে। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ “এই আত্মীয় স্বজন, মিসকীন ও মুসাফিরদের কেউ যদি তোমার কাছে কিছু চেয়ে বসে এবং ঐ সময় তোমার হাতে কিছুই না থাকে, আর এই কারণে তোমাকে তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে দিতে হয় তবে তাকে নরম কথায় বিদায় করতে হবে। যেমন বলতে হবেঃ “ভাই! এখন আমার হাতে কিছুই নেই। যখন আল্লাহ তাআলা আমাকে দিবেন তখন আমি। তোমার প্রাপ্য ভুলে যাবো না ইত্যাদি।”
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।