আল কুরআন


সূরা আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল) (আয়াত: 26)

সূরা আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল) (আয়াত: 26)



হরকত ছাড়া:

وآت ذا القربى حقه والمسكين وابن السبيل ولا تبذر تبذيرا ﴿٢٦﴾




হরকত সহ:

وَ اٰتِ ذَاالْقُرْبٰی حَقَّهٗ وَ الْمِسْکِیْنَ وَ ابْنَ السَّبِیْلِ وَ لَا تُبَذِّرْ تَبْذِیْرًا ﴿۲۶﴾




উচ্চারণ: ওয়া আ-তি যাল কুরবা-হাক্কাহূওয়াল মিছকীনা ওয়াবনাছ ছাবীলি ওয়ালা-তুবাযযি র তাবযীরা-।




আল বায়ান: আর আত্মীয়কে তার হক দিয়ে দাও এবং মিসকীন ও মুসাফিরকেও। আর কোনভাবেই অপব্যয় করো না।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৬. আর আত্মীয়-স্বজনকে দাও তার প্রাপ্য এবং অভাবগ্ৰস্ত ও মুসাফিরদেরকেও(১) এবং কিছুতেই অপব্যয় কর না।(২)




তাইসীরুল ক্বুরআন: আর আত্মীয়-স্বজনকে তাদের প্রাপ্য অধিকার দাও এবং মিসকীন ও মুসাফিরদেরকেও, আর অপব্যয়ে অপচয় করো না।




আহসানুল বায়ান: (২৬) তুমি আত্মীয়-স্বজনকে তার প্রাপ্য প্রদান কর এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও।[1] আর কিছুতেই অপব্যয় করো না।



মুজিবুর রহমান: আত্মীয় স্বজনকে দিবে তার প্রাপ্য এবং অভাবগ্রস্ত ও পর্যটককেও (মুসাফিরকেও), এবং কিছুতেই অপব্যয় করনা।



ফযলুর রহমান: আত্মীয়কে তার হক দিয়ে দাও; মিসকীন ও মুসাফিরকেও; আর মোটেও অপব্যয় করো না।



মুহিউদ্দিন খান: আত্নীয়-স্বজনকে তার হক দান কর এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও। এবং কিছুতেই অপব্যয় করো না।



জহুরুল হক: আর নিকটা‌ত্মীয়কে দাও তার প্রাপ্য, আর অভাবগ্রস্তকে ও পথচারীকেও, আর অপব্যয় করো না অপচয়ের সাথে।



Sahih International: And give the relative his right, and [also] the poor and the traveler, and do not spend wastefully.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ২৬. আর আত্মীয়-স্বজনকে দাও তার প্রাপ্য এবং অভাবগ্ৰস্ত ও মুসাফিরদেরকেও(১) এবং কিছুতেই অপব্যয় কর না।(২)


তাফসীর:

১. আলোচ্য আয়াতে সকল আত্মীয়দের হক বর্ণিত হয়েছে যে, প্রত্যেক আত্মীয়ের হক আদায় করতে হবে। অর্থাৎ কমপক্ষে তাদের সাথে সুন্দরভাবে জীবনযাপন ও সদ্ব্যবহার করতে হবে। যদি তারা অভাবগ্ৰস্ত হয়, তবে সামৰ্থ্য অনুযায়ী তাদের আর্থিক সাহায্যও এর অন্তর্ভুক্ত। [ফাতহুল কাদীর]


২. আয়াতে বর্ণিত আত্মীয়দের হক, মিসকিনের হক এবং মুসাফিরের হক, এ তিনটির উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানুষ নিজের উপার্জন ও ধন-দৌলত শুধুমাত্র নিজের জন্যই নির্ধারিত করে নেবে না। বরং ন্যায়সংগতভাবে ও ভারসাম্য সহকারে নিজের প্রয়োজন পূর্ণ করার পর নিজের আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও অন্যান্য অভাবী লোকদের অধিকারও আদায় করবে।


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (২৬) তুমি আত্মীয়-স্বজনকে তার প্রাপ্য প্রদান কর এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও।[1] আর কিছুতেই অপব্যয় করো না।


তাফসীর:

[1] কুরআন কারীমের এই শব্দগুলো থেকে প্রতীয়মান হয় যে, দরিদ্র আত্মীয়-স্বজন, মিসকীন এবং অভাবী মুসাফিরদের সাহায্য করে তার উপর অনুগ্রহ প্রকাশ করা উচিত নয়। যেহেতু এটা তাদের প্রতি অনুগ্রহ নয়, বরং এটা হল মালের সেই অধিকার, যা মহান আল্লাহ ধনীদের ধন-সম্পদে উল্লিখিত অভাবীদের জন্য নির্ধারিত করেছেন। ধনী যদি এ অধিকার আদায় না করে, তবে সে আল্লাহর নিকট অপরাধী গণ্য হবে। অর্থাৎ, এটা হল অধিকার আদায় করা, কারো উপর অনুগ্রহ করা নয়। আর আত্মীয়-স্বজনদের কথা প্রথমে উল্লেখ করে এ কথা পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, তাদের অধিকার বেশী ও প্রাধান্য পাওয়ার যোগ্য। আত্মীয়-স্বজনদের অধিকারসমূহ আদায় এবং তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করাকে আত্মীয়তার সম্পর্ক জোড়া (বা জ্ঞাতিবন্ধন বজায় রাখা) বলা হয়। এর উপর ইসলামের বড়ই তাকীদ রয়েছে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ২৬-২৮ নং আয়াতের তাফসীর:



পূর্বের আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা পিতামাতার সাথে সৎ আচরণ করার নির্দেশ দেয়ার পর আত্মীয়-স্বজন, ফকীর-মিসকীনদের ও পথিকদের হক দিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন। তাদের হক হল তাদের সাথে ভাল ব্যবহার করা, তাদেরকে ধমক না দেয়া এবং বিপদে পড়লে সহযোগিতা করা। আর ধনীদের সম্পদে তারা যাকাত পাওয়ার যে হকদার সে হক দিয়ে দেয়া। আত্মীয়-স্বজনরা যদি ওয়ারিশ হয় তাহলে তাদের প্রাপ্য সম্পদ দিয়ে দেয়া এবং মারা গেলে তাদের জানাযায় শরীক হওয়া। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর। অতঃপর যারা নিকটবর্তী ও তাদের পরে যারা নিকটবর্তী। (মুসতাদরাক: ৪২১৯, শুআবুল ঈমান হা: ৭৮৪৪)



অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: “যে ব্যক্তি তার রিযিক ও আয়ু বৃদ্ধি করতে চায় সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।” (সহীহ বুখারী হা: ৫৯৮৫, ৫৯৮৬, সহীহ মুসলিম হা: ২৫৫৭)



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে অপচয় করতে নিষেধ করেছেন। আর যে অপচয় করে তাকে শয়তানের ভাই হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। অপচয় হল প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয় করা বা নষ্ট করা। সেটা যেকোন ক্ষেত্রে হতে পারে। সম্পদ অপচয় হতে পারে, সময় অপচয় হতে পারে, জ্ঞান-বুদ্ধির অপচয় হতে পারে, ইত্যাদি। মু’মিনরা কখনো কিছু অপচয় করে না, তাদের সম্পদ অতিরিক্ত থাকলে আল্লাহ তা‘আলার পথে ব্যয় করে, সময় অতিরিক্ত থাকলে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতে মগ্ন থাকে। সুতরাং কেবল শয়তানের অনুসারীরাই অপচয় করতে পারে, অন্য কেউ নয়।



অর্থাৎ আর্থিক সামর্থ্য না থাকার কারণে (যা দূরীভূত হওয়ার এবং রুযীর প্রসারতার তুমি তোমার প্রতিপালকের কাছে আশা রাখ) যদি তোমাকে গরীব আত্মীয়-স্বজন, মিসকিন এবং অভাবী ব্যক্তিদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে হয় অর্থাৎ কিছু দিতে না পারার ওজর পেশ করতে হয় তাহলে নরম ও কোমল কন্ঠে পেশ করবে। কর্কশ ও অভদ্রতার সাথে বলো না। কেননা তাদের সাথে ভালভাবে কথা বলা এটাও একটা সাদকাহ।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(قَوْلٌ مَّعْرُوْفٌ وَّمَغْفِرَةٌ خَيْرٌ مِّنْ صَدَقَةٍ يَّتْبَعُهَآ أَذًي ط وَاللّٰهُ غَنِيٌّ حَلِيْمٌ‏)‏



“ভাল কথা বলা এবং ক্ষমা প্রদর্শন করা ঐ দানের চেয়ে উত্তম যে দানের পরে কষ্ট দেয়া হয়। আর আল্লাহ ধনী এবং ধৈর্যশীল।” (সূরা বাকারাহ ২:২৬৩) সুতরাং গরীব-মিসকিনরা কোন কিছু চাইতে আসলে যথাসম্ভব কিছু দেয়ার চেষ্টা করবে, দিতে না পারলে তাদের সাথে রূঢ় আচরণ করবে না, বরং সুন্দর ভাষায় ও ভদ্রতার সাথে বিদায় দেবে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



(১) হক্বদারদের হক্ব যথাযথভাবে আদায় করে দিতে হবে।

(২) অপচয় ও কৃপণতা করা যাবে না।

(৩) মানুষের সাথে উত্তম ব্যবহার করাও একটি নেকীর কাজ।

(৪) গরীব-মিসকিনদেরকে ধমক দিয়ে বিদায় দেয়া উচিত নয়, বরং যদি কিছু না দিতে পারো নরম ভাষায় বিদায় দেবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ২৬-২৮ নং আয়াতের তাফসীর

পিতা-মাতার সাথে সদয় আচরণের নির্দেশ দানের পর আল্লাহ তাআলা আত্মীয়দের সাথে সদয় ব্যবহারের নির্দেশ দিচ্ছেন। হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মাতার সাথে সদাচরণ কর এবং পিতার সাথেও সদাচরণ কর। তারপর তার সাথে উত্তম ব্যবহার কর যে বেশী নিকটবর্তী, তারপর তার সাথে যে বেশী নিকটবর্তী।” অন্য হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার জীবিকায় ও বয়সে বৃদ্ধি বা উন্নতি চায় সে যেন সদয় আচরণ করে।”

মুসনাদে বায্যারে রয়েছে যে, এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়া মাত্রই রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ফাতিমাকে (রাঃ) ডেকে তাকে ফিদক (বাগানটি) দান করেন। (এই হাদীসের সনদ সঠিক নয় এবং ঘটনাটিও সত্য বলে মনে হচ্ছে না। কেননা, এই আয়াতটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। এ সময় ফিদক' বাগানটি রাসূলুল্লাহর (সঃ) দখলেই ছিল না। সপ্তম হিজরীতে খায়বার বিজিত হয়, এরপর ফিদক নামক বাগানটি রাসূলুল্লাহর (সঃ) অধিকারভূক্ত হয়)

মিসকীন ও মুসাফিরের পূর্ণ তাফসীর সূরায়ে বারাআতে গত হয়ে গেছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। খরচের হুকুমের পর অপব্যয় করতে আল্লাহ তাআলা নিষেধ করছেন। মানুষের কৃপণ হওয়াও উচিত নয় এবং অপব্যয়ী হওয়াও উচিত নয়, বরং মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা উচিত। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “যখন তারা ব্যয় করে তখন তারা অমিতব্যয় করে না, কার্পণ্যও করে না, বরং তারা এতদুভয়ের মধ্যবর্তী পন্থা অবলম্বন করে।” (২৫:৬৭) তারপর আল্লাহ তাআলা অপব্যয়ের মন্দগুণের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, অপব্যয়ী লোকেরা শয়তানের ভাই। (আরবি) বলা হয় অন্যায় পথে ব্যয় করাকে। কেউ যদি তার সমুদয় মাল আল্লাহর পথে ব্যয় করে দেয়, তবুও তাকে অমিতব্যয়ী বলা হবে না। পক্ষান্তরে অল্প মালও যদি অন্যায় পথে ব্যয় করে তবুও, তাকে অমিতব্যয়ী বলা হবে।

বানু তামীম গোত্রের একটি লোক রাসূলুল্লাহর দরবারে হাজির হয়ে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি একজন সম্পদশালী লোক এবং আমার পরিবারবর্গ ও আত্মীয় স্বজন রয়েছে। আমি কি পন্থা অবলম্বন করবো। তা আমাকে বলে দিন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে বললেনঃ “প্রথমে তুমি। যাকাতকে তোমার মাল হতে পৃথক করে দাও, তাহলে তোমার মাল পবিত্র হয়ে যাবে। তারপর তা হতে তোমার আত্মীয় স্বজনের উপর খরচ কর, ভিক্ষুককে তার প্রাপ্য দিয়ে দাও এবং প্রতিবেশী ও মিসকীনদের উপরও খরচ কর।” সে আবার বললোঃ (আরবি) “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অল্প কথায় পূর্ণ। উদ্দেশ্যটি আমাকে বুঝিয়ে দিন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে বললেনঃ “আত্মীয় স্বজন, মিসকীন ও মুসাফিরদের হক আদায় কর এবং বাজে খরচ করো না।” সে তখন বললোঃ । অর্থাৎ “আল্লাহ আমার জন্যে যথেষ্ট।” আচ্ছা জনাব! যখন আপনার যাকাত আদায়কারীকে আমার যাকাতের মাল প্রদান করবো তখন কি আমি আল্লাহর ও তাঁর রাসূলের (সঃ) কাছে মুক্ত হয়ে যাবো। (অর্থাৎ আমার উপর আর কোন দায়িত্ব থাকবে না, (তা)?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে তাকে বললেনঃ “হাঁ, যখন তুমি আমার দূতকে তোমার যাকাতের মাল প্রদান করে দেবে তখন তুমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) কাছে মুক্ত হয়ে যাবে এবং তোমার জন্যে প্রতিদান ও পুরস্কার সাব্যস্ত হয়ে। যাবে। এখন যে এটা বদলিয়ে দেবে, এর গুনাহ তার উপরই বর্তিবে।”

এখানে বলা হয়েছে যে, অপব্যয়, নির্বুদ্ধিতা, আল্লাহর আনুগত্য হতে ফিরে আসা এবং অবাধ্যতার কারণে অপব্যয়ী লোকেরা শয়তানের ভাই হয়ে যায়। শয়তানের মধ্যে এই বদঅভ্যাসই আছে যে, সে আল্লাহর নিয়ামতের নাশুকরী করে এবং তার আনুগত্য অস্বীকার করে। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ “এই আত্মীয় স্বজন, মিসকীন ও মুসাফিরদের কেউ যদি তোমার কাছে কিছু চেয়ে বসে এবং ঐ সময় তোমার হাতে কিছুই না থাকে, আর এই কারণে তোমাকে তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে দিতে হয় তবে তাকে নরম কথায় বিদায় করতে হবে। যেমন বলতে হবেঃ “ভাই! এখন আমার হাতে কিছুই নেই। যখন আল্লাহ তাআলা আমাকে দিবেন তখন আমি। তোমার প্রাপ্য ভুলে যাবো না ইত্যাদি।”





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।