সূরা আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল) (আয়াত: 11)
হরকত ছাড়া:
ويدع الإنسان بالشر دعاءه بالخير وكان الإنسان عجولا ﴿١١﴾
হরকত সহ:
وَ یَدْعُ الْاِنْسَانُ بِالشَّرِّ دُعَآءَهٗ بِالْخَیْرِ ؕ وَ کَانَ الْاِنْسَانُ عَجُوْلًا ﴿۱۱﴾
উচ্চারণ: ওয়া ইয়াদ‘উল ইনছা-নুবিশশাররি দু‘আআহূবিলখাইরি ওয়া কানা-ল ইনছা-নু ‘আজূলা-।
আল বায়ান: আর মানুষ অকল্যাণের দোআ করে, যেমন তার দোআ হয় কল্যাণের জন্য। আর মানুষ তো তাড়াহুড়াপ্রবণ।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১১. আর মানুষ অকল্যাণ কামনা করে;(১) যেভাবে কল্যাণ কামনা করে; মানুষ তো প্রকৃতিগতভাবে খুব বেশী তাড়াহুড়াকারী।
তাইসীরুল ক্বুরআন: মানুষ (তার নির্বুদ্ধিতার কারণে কল্যাণকর ভেবে) অকল্যাণ প্রার্থনা করে যেমনভাবে কল্যাণ প্রার্থনা করা উচিত। মানুষ বড়ই তাড়াহুড়াকারী।
আহসানুল বায়ান: (১১) মানুষ যেভাবে কল্যাণ কামনা করে, সেভাবেই অকল্যাণ কামনা করে; বস্তুতঃ মানুষ শীঘ্রতা-প্রিয়।[1]
মুজিবুর রহমান: মানুষ যেভাবে কল্যাণ কামনা করে সেভাবেই অকল্যাণ কামনা করে। মানুষতো অতি ত্বরাপ্রবণ।
ফযলুর রহমান: মানুষ যেভাবে কল্যাণ কামনা করে সেভাবে অকল্যাণও কামনা করে। মানুষ বড়ই তাড়াহুড়াপ্রবণ।
মুহিউদ্দিন খান: মানুষ যেভাবে কল্যাণ কামনা করে, সেভাবেই অকল্যাণ কামনা করে। মানুষ তো খুবই দ্রুততা প্রিয়।
জহুরুল হক: আর মানুষ মন্দের জন্য কামনা করে যেমন তার উচিত ভালোর জন্য কামনা করা। আর মানুষ সদা ব্যস্ত-সমস্ত।
Sahih International: And man supplicates for evil as he supplicates for good, and man is ever hasty.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১১. আর মানুষ অকল্যাণ কামনা করে;(১) যেভাবে কল্যাণ কামনা করে; মানুষ তো প্রকৃতিগতভাবে খুব বেশী তাড়াহুড়াকারী।
তাফসীর:
১. মানুষ কিভাবে অকল্যাণ কামনা করে তার উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মানুষ যখন নিজের কোন কাজের উপর রাগ হয় বা সন্তান-সন্ততির উপর বিরক্ত হয় তখন তাদের জন্য বদ-দোআ করতে থাকে। বলতে থাকে, আমার ধ্বংস হোক, আমার পরিবার নাশ হোক ইত্যাদি। এ জাতীয় দো'আ করলেও তার মন কিন্তু সে দোআ কবুল হওয়া চায় না। আবার যখন নিজে খুব ভালো অবস্থায় থাকে, বা সন্তান-সন্ততির উপর খুশী হয়ে যায় তখন বড় বড় নেক দো'আ করতে থাকে। সে তখন এটা কবুল হওয়া মন-প্ৰাণ থেকেই চায়। [আদওয়াউল বায়ান]
কিন্তু আল্লাহ তাঁর রহমতের কারণে মানুষের নেক-দো'আ সমূহকে কবুল করে থাকেন আর বদ-দোআর জন্য সময় দেন। মানুষের এ তাড়াহুড়াকারী চরিত্রের কারণে যদি তিনি তাদের শাস্তি দিতেন তবে অনেকেই ক্ষতিগ্ৰস্ত হতো। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাউকে তার নিজের ও সন্তান সন্ততির উপর বদ-দোআ করতে নিষেধ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমরা তোমাদের নিজের এবং তোমাদের সন্তান-সন্ততি ও তোমাদের কর্মচারীদের উপর বদ-দো'আ করো না। অনুরূপভাবে তোমাদের সম্পদ নাশের জন্যও বদ-দো'আ করো না। কারণ এমন হতে পারে যে, আল্লাহর দো'আ কবুলের সময় তোমাদের এ বদ-দো'আগুলো সংঘটিত হয়ে যাবে আর তা কবুল হয়ে যাবে।” [আবু দাউদঃ ১৫৩২]
অন্য এক হাদীসে আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কেউ কষ্ট ও যাতনায় পড়ে কখনো মৃত্যু কামনা করবে না। আর যদি তাকে মৃত্যু কামনা করতেই হয়, তবে সে যেন বলেঃ “আয় আল্লাহ! যতদিন বেঁচে থাকাটা আমার জন্য মঙ্গলজনক হয় ততদিন আমাকে জীবিত রাখেন এবং যখন মৃত্যু আমার জন্য উত্তম হয়, তখন আমার মৃত্যু দেন।” [বুখারীঃ ৬৩৫১]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১১) মানুষ যেভাবে কল্যাণ কামনা করে, সেভাবেই অকল্যাণ কামনা করে; বস্তুতঃ মানুষ শীঘ্রতা-প্রিয়।[1]
তাফসীর:
[1] মানুষ যেহেতু দ্রুততা প্রিয় এবং দুর্বল মনের তাই যখন সে কোন কষ্টের শিকার হয়, তখন ধ্বংসের জন্য ঐভাবে বদ্দুআ করে, যেভাবে কল্যাণের জন্য স্বীয় প্রতিপালকের কাছে প্রার্থনা করে। এটা তো প্রতিপালকের দয়া ও অনুগ্রহ যে, তিনি তাদের বদ্দুআ কবুল করেন না। এই বিষয়টাই সূরা ইউনুসের ১১ নং আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৯-১১ নং আয়াতের তাফসীর:
(اِنَّ ھٰذَا الْقُرْاٰنَ یَھْدِیْ لِلَّتِیْ ھِیَ اَقْوَمُ.... اَعْتَدْنَا لَھُمْ عَذَابًا اَلِیْمًا)
উক্ত আয়াতে কুরআনের মর্যাদা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, এই কুরআন উত্তম পথের নির্দেশ প্রদান করে। অর্থাৎ আকীদাহ, আমল ও আখলাকের এমন পথ যা দৃঢ় ও মজবুত এবং উৎকৃষ্ট। সুতরাং যারা কুরআনের অনুসরণ করবে তারা পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে হিদায়াতের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং কুরআন সুসংবাদ প্রদান করে যে, তাদের জন্য রয়েছে বড় প্রতিদান জান্নাত। আর যারা ঈমান আনে না ও সৎ কর্ম করে না তারা হবে আখিরাতে জাহান্নামী। মূলত এ কুরআন একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা র ইবাদত করার দিকেই আহ্বান করে। কুরআন যে সঠিক ও সুদৃঢ় পথের দিশা দেয় এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ইমাম শানকিত্বী (عليه السلام) তার তাফসীর আযওয়াউল বায়ানে।
(وَیَدْعُ الْاِنْسَانُ بِالشَّرِّ دُعَا۬ءَھ۫ بِالْخَیْرِ....)
বিদ্বানগণ উক্ত আয়াতের দুটি তাফসীর বর্ণনা করেছেন যা ইমাম শানকিত্বী তার তাফসীরে নিয়ে এসেছেন: (১) মানুষ যেহেতু দ্রুততাপ্রিয় এবং দুর্বল মনের তাই যখন কোন কষ্ট বা বিপদে পড়ে তখন নিজের ধ্বংসের জন্য বদ্দুআ করে বলে: হে আল্লাহ তা‘আলা আমাকে এ বিপদে ফেলার আগে কেন মৃত্যু দিলে না। ঠিক যেভাবে স্বচ্ছলতা বা সুখের সময় কল্যাণের জন্য দু‘আ করে। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা মেহেরবান যে মানুষের এ সকল বদ্দু‘আ কবুল করেন না।
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَلَوْ يُعَجِّلُ اللّٰهُ لِلنَّاسِ الشَّرَّ اسْتِعْجَالَهُمْ بِالْخَيْرِ لَقُضِيَ إِلَيْهِمْ أَجَلُهُمْ)
“আল্লাহ যদি মানুষের অকল্যাণ ত্বরান্বিত করতেন, যেভাবে তারা তাদের কল্যাণ ত্বরান্বিত করতে চায়, তবে অবশ্যই তাদের মৃত্যু ঘটত।” (সূরা ইউনুস ১০:১১)
অধিকাংশ মুফাসসিরগণ যেমন ইবনু আব্বাস, মুজাহিদ, কাতাদাহ এ তাফসীর করেছেন।
(২) মানুষ যেমন কল্যাণের দু‘আ করে আল্লাহ তা‘আলার কাছে জান্নাত চায় ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি চায় তেমনি খারাপ কাজ করার কামনা করে আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু‘আ করে বলে: হে আল্লাহ তা‘আলা অমুক কাজটা আমার জন্য সহজ করে দাও, অমুককে হত্যা করা সহজ করে দাও ইত্যাদি। এ সম্পর্কে সূরা ইউনুসের ১১ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. কুরআন ঈমানদারদের সুসংবাদ দেয় আর কাফিরদের জাহান্নামের ভীতি প্রদর্শন করে।
২. কুরআন সৎ ও দৃঢ় পথের দিক নির্দেশনা দেয়।
৩. যারা কুরআনের দিক নির্দেশনা অনুসরণ করবে তারা সফলকাম হবে।
৪. কোন কিছুর ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করা যাবে না।
৫. কোন জিনেসের ব্যাপারে বদ দু‘আ করা যাবে না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: আল্লাহ তাআলা মানুষের একটা বদ অভ্যাসের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তারা কখনো কখনো মনভাঙ্গা ও নিরাশ হয়ে গিয়ে ভুল করে নিজের জন্যে অমঙ্গলের প্রার্থনা করতে শুরু করে। মাঝে মাঝে নিজের মাল-ধন ও সন্তানসন্ততির জন্যে বদদুআ করতে লাগে। কখনো মৃত্যুর, কখনো ধ্বংসের এবং কখনো অভিশাপের দুআ করে। কিন্তু তার প্রতিপালক আল্লাহ তার নিজের চেয়েও তার উপর বেশী দয়ালু। এদিকে সে দুআ করে আর ওদিকে যদি তিনি কবুল করে নেন তবে সাথে সাথেই সে ধ্বংস হয়ে যায় (কিন্তু তিনি তা করেন না)। হাদীসেও আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা নিজেদের জান ও মালের জন্যে বদ দুআ করো না। নচেৎ কবুল হওয়ার মুহূর্তে হয়তো কোন খারাপ কথা মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়বে।” এর একমাত্র কারণ হচ্ছে মানুষের চাঞ্চল্যকর অবস্থাও দ্রুততা। মানুষ আশুরূপায়ণ কামনাকারীই বটে।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে হযরত সালমান ফারসী (রাঃ) ও হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হযরত আদমের (আঃ) ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে, তখন তাঁর রূহ তাঁর পায়ের নিম্নদেশ পর্যন্ত পৌঁছে নাই, অথচ তখনই তিনি দাঁড়াবার চেষ্টা করেন। রূহ মাথার দিক থেকে আসছিল। যখন নাক পর্যন্ত পৌঁছলো তখন তার হাঁচি আসলো। তিনি বললেনঃ (আরবি) (সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্যে)। তখন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবি) (হে আদম (আঃ)! তোমার প্রতিপালক তোমার প্রতি দয়া করুন!) রূহ যখন চক্ষু পর্যন্ত পৌঁছলো তখন তিনি চক্ষু খুলে দেখতে লাগলেন। তারপর যখন নীচের অঙ্গগুলিতে পৌঁছলো তখন তিনি খুশী হয়ে নিজের দিকে তাকাতে থাকলেন। তখনো পর্যন্ত পৌঁছে নাই। অথচ হাঁটার ইচ্ছা করলেন, কিন্তু হাঁটতে পারলেন না তখন দুআ করতে লাগলেনঃ “হে আল্লাহ! রাত্রির পূর্বেই যেন পায়ে রূহ্ চলে আসে!”
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।