আল কুরআন


সূরা আন-নাহাল (আয়াত: 92)

সূরা আন-নাহাল (আয়াত: 92)



হরকত ছাড়া:

ولا تكونوا كالتي نقضت غزلها من بعد قوة أنكاثا تتخذون أيمانكم دخلا بينكم أن تكون أمة هي أربى من أمة إنما يبلوكم الله به وليبينن لكم يوم القيامة ما كنتم فيه تختلفون ﴿٩٢﴾




হরকত সহ:

وَ لَا تَکُوْنُوْا کَالَّتِیْ نَقَضَتْ غَزْلَهَا مِنْۢ بَعْدِ قُوَّۃٍ اَنْکَاثًا ؕ تَتَّخِذُوْنَ اَیْمَانَکُمْ دَخَلًۢا بَیْنَکُمْ اَنْ تَکُوْنَ اُمَّۃٌ هِیَ اَرْبٰی مِنْ اُمَّۃٍ ؕ اِنَّمَا یَبْلُوْکُمُ اللّٰهُ بِهٖ ؕ وَ لَیُبَیِّنَنَّ لَکُمْ یَوْمَ الْقِیٰمَۃِ مَا کُنْتُمْ فِیْهِ تَخْتَلِفُوْنَ ﴿۹۲﴾




উচ্চারণ: ওয়ালা-তাকূনূ কাল্লাতী নাকাদাতগাযলাহা-মিমবা‘দি কুওওয়াতিন আনকা-ছান তাত্তাখিযূনা আইমা-নাকুম দাখালাম বাইনাকুম আন তাকূনা উম্মাতুন হিয়া আরবা-মিন উম্মাতিন ইন্নামা-ইয়াবলূকুমুল্লা-হু বিহী ওয়ালা ইউবাইয়িনান্না লাকুম ইয়াওমাল কিয়া-মাতি মা-কুনতুম ফীহি তাখতালিফূন।




আল বায়ান: আর তোমরা সে নারীর মত হয়ো না, যে তার পাকানো সূতো শক্ত করে পাকানোর পর টুকরো টুকরো করে ফেলে। তোমরা তোমাদের উপর অঙ্গীকারকে নিজদের মধ্যে প্রতারণা হিসেবে গ্রহণ করছ (এই উদ্দেশ্যে) যে, একদল অপর দলের চেয়ে বড় হবে। আল্লাহ তো এর মাধ্যমে তোমাদের পরীক্ষা করেন এবং নিশ্চয় তিনি তোমাদের জন্য কিয়ামতের দিনে স্পষ্ট করে দেবেন সে বিষয়, যাতে তোমরা মতবিরোধ করতে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৯২. আর তোমরা সে নারীর মত হয়ো না(১), যে তার সূতা মজবুত করে পাকাবার পর সেটার পাক খুলে নষ্ট করে দেয়। তোমাদের শপথ তোমরা পরস্পরকে প্রবঞ্চনা করার জন্য ব্যবহার করে থাক, যাতে একদল অন্যদলের চেয়ে বেশী লাভবান হও। আল্লাহ তো এটা দিয়ে শুধু তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন।(২) আর অবশ্যই আল্লাহ্‌ কিয়ামতের দিন তা তোমাদের কাছে স্পষ্ট বর্ণনা করে দেবেন যাতে তোমরা মতভেদ করতে।




তাইসীরুল ক্বুরআন: তোমরা এমন নারীর মত হয়ো না যে তার সূতাগুলোকে শক্ত করে পাকানোর পর নিজেই তার পাক খুলে টুকরো টুকরো করে দেয়। তোমরা তোমাদের শপথগুলোকে পারস্পরিক ব্যাপারে ধোঁকা-প্রতারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার কর যেন একদল আরেক দল অপেক্ষা বেশি ফায়দা লাভ করতে পারে। আল্লাহ কেবল এর দ্বারা তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন। আল্লাহ ক্বিয়ামাতের দিন অবশ্য অবশ্যই স্পষ্ট করে দিবেন যে বিষয়ে তোমরা মতভেদ করতে।




আহসানুল বায়ান: (৯২) তোমরা সে নারীর মত হয়ো না, যে তার সুতা মজবুত করে পাকাবার পর ওর পাক খুলে নষ্ট করে দেয়;[1] তোমরা পরস্পরের মাঝে ধোঁকা স্বরূপ তোমাদের শপথকে ব্যবহার করে থাক;[2] যাতে একদল অন্যদল অপেক্ষা অধিক লাভবান হয়;[3] আল্লাহ তো এটা দ্বারা শুধু তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন। আর তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করতে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তা নিশ্চয়ই স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে দেবেন।



মুজিবুর রহমান: তোমরা সেই নারীর মত হয়োনা, যে তার সূতা মাযবূত করে পাকানোর পর ওর পাক খুলে নষ্ট করে দেয়। তোমাদের শপথ তোমরা পরস্পরকে প্রবঞ্চনা করার জন্য ব্যবহার করে থাকো, যাতে একদল অন্যদল অপেক্ষা অধিক লাভবান হও; আল্লাহতো এটা দ্বারা শুধু তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন; তোমাদের যে বিষয়ে মতভেদ রয়েছে, কিয়ামাত দিবসে তিনি তা নিশ্চয়ই স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে দিবেন।



ফযলুর রহমান: তোমরা ঐ নারীর মত হয়ো না যে তার সুতা শক্ত করে পাকানোর পর তা টুকরা টুকরা করে ছিঁড়ে নষ্ট করে। তোমরা একদল অন্যদলের চেয়ে অধিক লাভবান হওয়ার জন্য পরস্পরকে ধোঁকা দেওয়ার কৌশল হিসেবে নিজেদের শপথকে ব্যবহার করে থাক। আসলে এর দ্বারা আল্লাহ তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন। আর তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করতে কেয়ামতের দিন তিনি তা তোমাদের জন্য অবশ্যই স্পষ্ট করে দেবেন।



মুহিউদ্দিন খান: তোমরা ঐ মহিলার মত হয়ো না, যে পরিশ্রমের পর কাটা সূতা টুকরো টুকরো করে ছিড়ে ফেলে, তোমরা নিজেদের কসমসমূহকে পারস্পরিক প্রবঞ্চনার বাহানা রূপে গ্রহণ কর এজন্যে যে, অন্য দল অপেক্ষা এক দল অধিক ক্ষমতাবান হয়ে যায়। এতদ্বারা তো আল্লাহ শুধু তোমাদের পরীক্ষা করেন। আল্লাহ অবশ্যই কিয়ামতের দিন প্রকাশ করে দেবেন, যে বিষয়ে তোমরা কলহ করতে।



জহুরুল হক: আর সেই নারীর মতো হয়ো না যে তার সুতো খুলে ফেলে টুকরো টুকরো ক’রে তা মজবুত করে বোনার পরে। তোমাদের শপথগুলোকে তোমাদের মধ্যে ছলনার জন্যে তোমরা ব্যবহার করছ, যেন তোমাদের এক জাতি অন্য জাতির চাইতে ক্ষমতাশীল হতে পার। আল্লাহ্ অবশ্যই এর দ্বারা তোমাদের পরীক্ষা করছেন, আর যেন কিয়ামতের দিনে তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট করতে পারেন যে- বিষয়ে তোমরা মতভেদ করছিলে।



Sahih International: And do not be like she who untwisted her spun thread after it was strong [by] taking your oaths as [means of] deceit between you because one community is more plentiful [in number or wealth] than another community. Allah only tries you thereby. And He will surely make clear to you on the Day of Resurrection that over which you used to differ.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৯২. আর তোমরা সে নারীর মত হয়ো না(১), যে তার সূতা মজবুত করে পাকাবার পর সেটার পাক খুলে নষ্ট করে দেয়। তোমাদের শপথ তোমরা পরস্পরকে প্রবঞ্চনা করার জন্য ব্যবহার করে থাক, যাতে একদল অন্যদলের চেয়ে বেশী লাভবান হও। আল্লাহ তো এটা দিয়ে শুধু তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন।(২) আর অবশ্যই আল্লাহ্– কিয়ামতের দিন তা তোমাদের কাছে স্পষ্ট বর্ণনা করে দেবেন যাতে তোমরা মতভেদ করতে।


তাফসীর:

(১) আব্দুল্লাহ ইবনে কাসীর এবং সুদ্দী বলেনঃ এখানে মক্কার এমন এক বেঅকুফ নারীর কথা বলা হচ্ছে, যে কাপড় বুননের পর তা আবার খুলে ফেলত। মুজাহিদ, কাতাদা এবং ইবনে যায়েদ বলেনঃ এটা একটি উদাহরণ যা ঐ সমস্ত লোকদের ক্ষেত্রে পেশ করা হয়, যারা কোন পাকাপাকি শপথ করার পর তা ভঙ্গ করত। ইবনে কাসীর এ দ্বিতীয় মতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন।


(২) এখানে আল্লাহ্‌ তা’আলা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, প্রত্যেকটি অঙ্গীকার আসলে অঙ্গীকারকারী ব্যক্তি ও জাতির চরিত্র ও বিশ্বস্ততার পরীক্ষা স্বরূপ। আল্লাহ্ তাআলা অঙ্গীকার পূর্ণ করার কথা বলে মানুষদেরকে পরীক্ষায় ফেললেন। [তাবারী] সা’ঈদ ইবন জুবাইর বলেন, এখানে পরীক্ষার বিষয় হচ্ছে, বেশী লাভবান হতে দেখা। [ইবন কাসীর]

কারণ, সাধারণত জাহেলী যুগে মানুষ বেশী লাভবান হওয়ার আশায় অঙ্গীকার ভঙ্গ করত। মোটকথা: আল্লাহ দেখতে চান কারা এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। যারা এ পরীক্ষায় ব্যর্থ হবে তারা আল্লাহর আদালতে জবাবদিহির হাত থেকে বাঁচতে পারবে না। আখেরাতের ময়দানে তিনি তাদের মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়া মতবিরোধকে বর্ণনা করে, তাদের প্রত্যেককে তার আমল অনুসারে ভাল-মন্দ প্রতিফল দেবেন। [ইবন কাসীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৯২) তোমরা সে নারীর মত হয়ো না, যে তার সুতা মজবুত করে পাকাবার পর ওর পাক খুলে নষ্ট করে দেয়;[1] তোমরা পরস্পরের মাঝে ধোঁকা স্বরূপ তোমাদের শপথকে ব্যবহার করে থাক;[2] যাতে একদল অন্যদল অপেক্ষা অধিক লাভবান হয়;[3] আল্লাহ তো এটা দ্বারা শুধু তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন। আর তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করতে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তা নিশ্চয়ই স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে দেবেন।


তাফসীর:

[1] শপথ দ্বারা সুদৃঢ়কৃত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা এমন, যেমন কোন নারী সুতা মজবুত করে পাকাবার পর তার পাক খুলে নষ্ট করে। এটি একটি উপমা মাত্র।

[2] ধোঁকা ও প্রবঞ্চনা দেওয়ার জন্য ব্যবহার কর।

[3] أربى অর্থ অধিকতর। অর্থাৎ যখন তোমরা মনে কর যে, তোমাদের সংখ্যা বেশি হয়ে গেছে, আর এর কারণে তোমরা শপথ ভঙ্গ করে ফেল; যদিও শপথ ও প্রতিশ্রুতির সময় প্রতিপক্ষ দুর্বল ছিল। কিন্তু দুর্বল থাকা সত্ত্বেও তারা নিশ্চিন্ত ছিল যে, প্রতিশ্রুতি বা চুক্তির কারণে আমাদের কোন ক্ষতি করা হবে না। কিন্তু তোমরা বাহানা ও চুক্তিভঙ্গ করে ক্ষতি কর। জাহেলিয়াতের যুগে চারিত্রিক অবক্ষয়ের কারণে এরূপ চুক্তি ভঙ্গ করা ছিল সাধারণ ব্যাপার। মুসলিমদেরকে এই শ্রেণীর চারিত্রিক অবনতি থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৯১-৯২ নং আয়াতের তাফসীর:



প্রথম আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যদি কোন বিষয়ে ওয়াদাবদ্ধ হয় তাহলে তা যেন পূর্ণ করে। এ ওয়াদা আল্লাহ তা‘আলা ও বান্দার মাঝে হতে পারে, অথবা বান্দা ও অন্য কোন মানুষের সাথে হতে পারে। ওয়াদা ভঙ্গ করা কোন মু’মিন ব্যক্তির কাজ নয়।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَبِعَهْدِ اللّٰهِ أَوْفُوْا ط ذٰلِكُمْ وَصّٰكُمْ بِهٰ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُوْنَ)‏



“আল্লাহকে প্রদত্ত অঙ্গীকার পূর্ণ করবে। এভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিলেন যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।” (সূরা আন‘আম ৬:১৫২)



আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:



(وَأَوْفُوْا بِالْعَهْدِ ج إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُوْلًا)



“প্রতিশ্রুতি পালন কর; নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।” (সূরা ইসরা ১৭:৩৪)



আর আল্লাহ তা‘আলা নিষেধ করছেন যেন তারা ওয়াদা করার পর তা ভঙ্গ না করে। কেননা ওয়াদা ভঙ্গ করলে তার ক্ষতি নিজের ওপর বর্তাবে।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(فَمَنْ نَّكَثَ فَإِنَّمَا يَنْكُثُ عَلٰي نَفْسِه۪ ج وَمَنْ أَوْفٰي بِمَا عَاهَدَ عَلَيْهُ اللّٰهَ فَسَيُؤْتِيْهِ أَجْرًا عَظِيْمًا )



“সুতরাং যে এ ওয়াদা ভঙ্গ করবে এর কুফল তার ওপরই পড়বে। আর আল্লাহর সাথে ওয়াদা করে যে তা পূরণ করবে, আল্লাহ অচিরেই তাকে মহা পুরস্কার দেবেন।” (সূরা ফাতহ ৪৮:১০)



এক প্রকার শপথ হল যা কোন কথা অঙ্গীকার বা প্রতিশ্রুতি সুদৃঢ় করার জন্য করা হয়। আর দ্বিতীয় হল যা অনেকে কোন সময় শপথ করে বলে ‘আমি এ কাজ করব অথবা করব না’। এখানে প্রথম অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। বলা হয়েছে তোমরা শপথ করে আল্লাহ তা‘আলাকে জামিন করেছ, অতএব এখন তা ভঙ্গ করো না। বরং সে অঙ্গীকার পূরণ কর, যার জন্য তুমি শপথ করেছ। কারণ দ্বিতীয় শপথের ব্যাপারে হাদীসে আদেশ করা হয়েছে যে, কোন ব্যক্তি কোন কাজের জন্য শপথ করে সে যদি বুঝে যে, বিপরীত করলে তার মঙ্গল হবে তাহলে তার উচিত হবে মঙ্গল কাজে জড়িত হওয়া এবং শপথের কাফ্ফারা দিয়ে দেয়া। যারা শপথ করার পর ভঙ্গ করে তাদের একটি উপমা দেয়া হয়েছে, তা হল কোন নারী সূতো মজবুত করে পাকানোর পর খুলে নষ্ট করা যেমন, শপথ করার পর ভঙ্গ করাও তেমন।



(تَتَّخِذُوْنَ أَيْمَانَكُمْ دَخَلًا)



অর্থাৎ একজন অন্য জনের থেকে অধিক লাভবান হবার জন্য শপথকে ধোঁকা ও প্রবঞ্চনাস্বরূপ ব্যবহার করে থাক? এরূপ করো না। অতএব কোন বিষয়ে ওয়াদা ও শপথ করার পর তা পূর্ণ করতে হবে, ভঙ্গ করা যাবে না। কারণ ওয়াদা ভঙ্গ করা মুনাফিকের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যেমনটি সহীহ হাদীসে বলা হয়েছে। মুনাফিকের আলামত তিনটি তন্মধ্যে একটি হল ওয়াদা ভঙ্গ করা (সহীহ বুখারী হা: ৩৩-৩৪, সহীহ মুসলিম হা: ৫৮-৫৯)



মূলত আল্লাহ তা‘আলা এর দ্বারা তাঁর বান্দাদেরকে পরীক্ষা করে থাকেন কে বিধান লঙ্ঘন করে; আর কে সংরক্ষণ করে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. ওয়াদা ভঙ্গ করা যাবে না।

২. শপথ করার পর তা পূর্ণ করতে হবে।

৩. দুনিয়ার কৃতকর্মের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদেরকে পরীক্ষা করে থাকেন।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৯১-৯২ নং আয়াতের তাফসীর

আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন তাদের অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতির হিফাজত করে, কসম পুরো করে এবং তা ভঙ্গ না করে। এখানে আল্লাহ তাআলা কসম ভঙ্গ না করার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। অন্য আয়াতে আছেঃ “তোমরা আল্লাহকে তোমাদের অঙ্গীকারের লক্ষ্যস্থল করো না।”এর দ্বারাও কসমের হিফাজতের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করাই উদ্দেশ্য। আর এক আয়াতে রয়েছে “ওটাই হচ্ছে তোমাদের কসম ভঙ্গ করার কাফফারা, যখন তোমরা কসম করবে এবং তোমরা তোমাদের কসমের হিফাযত কর।” অর্থাৎ কাফফারা ছাড়া তা পরিত্যাগ করো না।

সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর কসম! আমি যখন কোন কিছুর উপর শপথ করবো, অতঃপর ওর বিপরীত জিনিসে মঙ্গল দেখবো তখন ইনশাআল্লাহ আমি ঐ মঙ্গলজনক কাজটিই করবো এবং আমার কসমের কাফফারা আদায়। করবো।”এখন উল্লিখিত আয়াত ও হাদীসে যে বৈপরীত্ব রয়েছে এটা যেন মনে করা না হয়। সেই কসম ও অঙ্গীকার, যা পরষ্পরের চুক্তি ও ওয়াদা হিসেবে করা হবে তা পুরো করা তো নিঃসন্দেহে জরুরী ও অপরিহার্য কর্তব্য। আর যে কসম আগ্রহ উৎপাদন বিরত রাখার উদ্দেশ্যে মুখ থেকে বেরিয়ে যায় তা অবশ্যই কাফফারা আদায়ের মাধ্যমে ভঙ্গ করা যেতে পারে। যেমন হযরত জুবাইর ইবনু মুতইম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ইসলামে কোন শপথ নেই, শপথ ছিল জাহেলিয়াতের যুগে, ইসলাম এর দৃঢ়তা বৃদ্ধি করে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন। সহীহ মুসলিমে অনুরূপ বর্ণনা ইবনু আবি শায়বা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে) এর অর্থ এই যে, ইসলাম গ্রহণের পর এক দল অন্য দলের সাথে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ থাকবে এবং একে অপরের সুখে- দুঃখে অংশ নেবে এইরূপ কসম করার কোন প্রয়োজনীয়তা নেই। কেননা, ইসলামী সম্পর্ক সমস্ত মুসলমানকে ভাই ভাই করে দেয়। পূর্ব ও পশ্চিমের সুসলমানরা একে অপরের দুঃখে সমবেদনা জ্ঞাপন করে থাকে।

আর যে হাদীসটি হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের বাড়ীতে আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে শপথ করিয়েছিলেন।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)

এর ভাবার্থ এই যে, তিনি তাঁদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করেছিলেন, এমন কি তারা একে অপরের মালের উত্তরাধিকারী হতেন। শেষ পর্যন্ত তা মানসূখ বা রহিত হয়ে যায়। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলার এই নির্দেশ দ্বারা তাঁর উদ্দেশ্য হচ্ছে ঐ মুসলসানদেরকে ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার হুকুম করা যারা রাসূলুল্লাহর (সঃ) হাতে দীক্ষা গ্রহণ করে ইসলামের আহকাম মেনে চলার স্বীকারোক্তি করেছিলেন। তাদেরকে বলা হচ্ছেঃ “এরূপ গুরুত্বপূর্ণ কসম ও পূর্ণ। অঙ্গীকারের পর এটা যেন না হয় যে, মুহাম্মদের (সঃ) দলের স্বল্পতা ও মুশরিকদের দলের আধিক্য দেখে তোমরা কসম ভেঙ্গে দাও।”

হযরত নাফে’ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনগণ যখন ইয়াযীদ ইবনু মুআবিয়ার (রাঃ) বায়আত ভঙ্গ করতে থাকে তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) তাঁর পরিবারের সমস্ত লোককে একত্রিত করেন এবং আল্লাহর প্রশংসাকীৰ্তন করতঃ (আরবি) বলার পর বলেনঃ “আমরা এই লোকটির (ইয়াযীদের হাতে বায়আত করেছি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) বায়আতের উপর। আর আমি রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলতে শুনেছিঃ “কিয়ামতের দিন প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকের জন্যে একটি পতাকা গেড়ে দেয়া হবে এবং ঘোষণা করা হবেঃ “এটা হচ্ছে অমুকের পুত্র অমুকের বিশ্বাসঘাতকতা। আল্লাহর সঙ্গে শিরক করার পরে সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা হচ্ছে এই যে, আল্লাহ ও তাঁর। রাসূলের (সঃ) বায়আত কারো হাতে করার পর তা ভেঙ্গে দেয়া হয়। সুতরাং তোমাদের কেউ যেন এরূপ মন্দ কাজ না করে এবং সীমা ছাড়িয়ে না যায়, অন্যথায় আমার মধ্যে ও তার মধ্যে বিচ্ছেদ হয়ে যাবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত হুযাইফা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলতে শুনেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার মুসলমান ভাই-এর কাছে এমন কোন শর্ত করে যা পুরো করার ইচ্ছা তার আদৌ থাকে না, সে ঐ ব্যক্তির মত যে তার প্রতিবেশীকে নিরাপত্তা দান করার পর আশ্রয়হীন অবস্থায় ছেড়ে দেয়।” (এ হাদীসটিও ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)

এরপর আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ধমকের সুরে বলেনঃ “যারা অঙ্গীকার ও কসমের হিফাযত করে না তাদের এই কাজ সম্পর্কে আল্লাহ পূর্ণ ওয়াকিফহাল।”

মক্কায় একটি স্ত্রী লোক ছিল, যার মস্তিষ্ক বিকৃত হয়েছিল। সে সূতা কাটতো। সূতা কাটার পরে যখন তা ঠিকঠাক ও মযবুত হয়ে যেতো, তখন সে বিনা কারণে তা ছিড়ে ফেলতো এবং টুকরো টুকরো করে দিতো। এটা দৃষ্টান্ত হচ্ছে ঐ ব্যক্তির, যে অঙ্গীকার ও কসম মযবুত করার পর তা ভঙ্গ করে দেয়। এটাই হচ্ছে সঠিক কথা। এখন আসলে এই ঘটনার সাথে এরূপস্ত্রীলোক জড়িত ছিল কি না, তা জানার আমাদের কোন প্রয়োজন নেই। এখানে শুধুমাত্র দৃষ্টান্ত বর্ণনা করাই উদ্দেশ্য।

এহাদীসটি এর অর্থ হচ্ছে টুকরা টুকরা। সম্ভবতঃ এটা (আরবি) এর (আরবি) হবে। আবার এটাও হতে পারে যে, (আরবি) এর (আরবি) এর (আরবি) হবে। অর্থাৎ তোমরা (আরবি) হয়ো না। এটা (আরবি) এর বহু বচন, (আরবি) হতে।

অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “তোমরা তোমাদের কসমকে প্রবঞ্চনার মাধ্যম বানিয়ে নিয়ো না। এইভাবে যে, নিজের চেয়ে বড়দেরকে নিজের কসম দ্বারা শান্ত করে এবং ঈমানদারী ও নেকনামীর ছাঁচে নিজেকে ফেলে দিয়ে বিশ্বাসঘাতকতা ও বেঈমানী করতে শুরু কর এবং তাদের সংখ্যাধিক্য দেখে তাদের সাথে সন্ধিস্থাপনের পর সুযোগ পেয়ে আবার যুদ্ধ শুরু করে দাও। খবরদার! এইরূপ করো না। সুতরাং ঐ অবস্থাতেও যখন চুক্তি ভঙ্গ করাহারাম, তখন নিজের বিজয় ও সংখ্যাধিকোর সময় তো আরো হারাম হবে। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যে, আমরা সূরায়ে আনফালে হযরত মুআবিয়ার (রাঃ) ঘটনা লিখে এসেছি। তা এই যে, তাঁর মধ্যে ও রোমক সম্রাটের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্যে সন্ধি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ঐ মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় নিকটবর্তী হলে তিনি তার সেনাবাহিনীকে রোম সীমান্তে পাঠিয়ে দেন যে, তারা যেন শিবির সন্নিবেশ করে এবং মেয়াদ শেষ হওয়া মাত্রই অকস্মাৎ আক্রমণ চালিয়ে দেয়, যেন তারা প্রস্তুতি গ্রহণে সুযোগ না পায়। হযরত আমর ইবনু উৎবার (রাঃ) কানে যখন এই খবর পৌঁছে, তখন তিনি আমীরুল মু'মিনীন হযরত মুআবিয়ার (রাঃ) নিকট আসেন এবং তাঁকে বলেনঃ “আল্লাহু আকবার! হে মুআবিয়া (রাঃ) ! অঙ্গীকার পূর্ণ করুন এবং বিশ্বাসঘাতকতা ও চুক্তি ভঙ্গের দোষ থেকে দূরে থাকুন। আমি রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলতে শুনেছিঃ যে কওমের সাথে চুক্তি হয়ে যায়, চুক্তির মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোন বন্ধন খোলার অনুমতি নেই (অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা চলবে না।” একথা শুনা মাত্রই হযরত মুআবিয়া (রাঃ) তার সেনাবাহিনীকে ফিরে আসতে বলেন।

(আরবি) শব্দের অর্থ হচ্ছে অধিক। এই বাক্যের অর্থ এটাও হতে পারেঃ “যখন দেখলো সৈন্য সংখ্যা অধিক ও শক্তিশালী তখন সন্ধি করে নিলো এবং এই সন্ধিকে প্রবঞ্চনার মাধ্যম করে তাদেরকে অপ্রস্তুত করতঃ অকস্মাৎ আক্রমণ করে বসলো।” আবার ভাবার্থ এও হতে পারেঃ “এক কওমের সঙ্গে চুক্তি করলো। তারপর দেখলো যে, অপর কওম তাদের চেয়ে শক্তিশালী। তখন তাদের দলে ভিড়ে গেল এবং পূর্ববর্তী কওমের সঙ্গে কৃত চুক্তি ভঙ্গ করে দিলো।” এসব নিষিদ্ধ। এই আধিক্য দ্বারা আল্লাহ তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন। কিংবা তিনি নিজের এই হুকুম দ্বারা অর্থাৎ অঙ্গীকার পালনের হুকুম দ্বারা তোমাদের পরীক্ষা করেন। আর কিয়ামতের দিন তিনি তোমাদের মধ্যে সঠিক ফায়সালা করবেন। প্রত্যেককে তিনি তার আমলের বিনিময় প্রদান করবেন, ভাল আমলকারীদেরকে ভাল বিনিময় এবং মন্দ আমলকারীদেরকে মন্দ বিনিময়।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।