আল কুরআন


সূরা আন-নাহাল (আয়াত: 90)

সূরা আন-নাহাল (আয়াত: 90)



হরকত ছাড়া:

إن الله يأمر بالعدل والإحسان وإيتاء ذي القربى وينهى عن الفحشاء والمنكر والبغي يعظكم لعلكم تذكرون ﴿٩٠﴾




হরকত সহ:

اِنَّ اللّٰهَ یَاْمُرُ بِالْعَدْلِ وَ الْاِحْسَانِ وَ اِیْتَآیِٔ ذِی الْقُرْبٰی وَ یَنْهٰی عَنِ الْفَحْشَآءِ وَ الْمُنْکَرِ وَ الْبَغْیِ ۚ یَعِظُکُمْ لَعَلَّکُمْ تَذَکَّرُوْنَ ﴿۹۰﴾




উচ্চারণ: ইন্নাল্লা-হা ইয়া’মুরু বিল‘আদলি ওয়াল ইহছা-নি ওয়া ঈতাইযিল কুরবা-ওয়া ইয়ানহা‘আনিল ফাহশাই ওয়াল মুনকারি ওয়াল বাগই ইয়া‘ইজু কুম লা‘আল্লাকুম তাযাক্কারূন।




আল বায়ান: নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফ, সদাচার ও নিকট আত্মীয়দের দান করার আদেশ দেন এবং তিনি আশ্লীলতা, মন্দ কাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৯০. নিশ্চয় আল্লাহ্ আদল (ন্যায়পরায়ণতা)(১), ইহসান (সদাচরণ)(২), ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের(৩) নির্দেশ দেন(৪) এবং তিনি অশ্লীলতা,(৫) অসৎকাজ(৬) ও সীমালজ্ঞান(৭) থেকে নিষেধ করেন; তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর।




তাইসীরুল ক্বুরআন: আল্লাহ ন্যায়-বিচার, সদাচরণ ও আত্মীয়দেরকে দেয়ার হুকুম দিচ্ছেন, আর তিনি নিষেধ করছেন অশ্লীলতা, অপকর্ম আর বিদ্রোহ থেকে। তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দিয়েছেন যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর।




আহসানুল বায়ান: (৯০) নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, অসৎকার্য ও সীমালংঘন করা হতে নিষেধ করেন।[1] তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন; যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর।



মুজিবুর রহমান: নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায় পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয় স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন এবং তিনি নিষেধ করেন অশ্লীলতা, অসৎ কাজ ও সীমা লংঘন করতে। তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর।



ফযলুর রহমান: নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সৎকাজ ও আত্মীয়-স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন এবং অশ্লীলতা, অসৎকাজ ও বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদেরকে সদুপদেশ দেন, যাতে তোমরা শিক্ষাগ্রহণ কর।



মুহিউদ্দিন খান: আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ এবং আত্নীয়-স্বজনকে দান করার আদেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, অসঙ্গত কাজ এবং অবাধ্যতা করতে বারণ করেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন যাতে তোমরা স্মরণ রাখ।



জহুরুল হক: নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ নির্দেশ দিচ্ছেন ন্যায়পরায়ণতার, আর সদাচরণের, ও আ‌ত্মীয়স্বজনকে দানদক্ষিণা করার, আর তিনি নিষেধ করেছেন অশালীনতা, আর দুষ্কৃতি, ও বিদ্রোহাচরণ। তিনি তোমাদের উপদেশ দিচ্ছেন যেন তোমরা মনোযোগ দাও।



Sahih International: Indeed, Allah orders justice and good conduct and giving to relatives and forbids immorality and bad conduct and oppression. He admonishes you that perhaps you will be reminded.



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৯০. নিশ্চয় আল্লাহ্ আদল (ন্যায়পরায়ণতা)(১), ইহসান (সদাচরণ)(২), ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের(৩) নির্দেশ দেন(৪) এবং তিনি অশ্লীলতা,(৫) অসৎকাজ(৬) ও সীমালজ্ঞান(৭) থেকে নিষেধ করেন; তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর।


তাফসীর:

(১) এ আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলা পূর্ববর্তী আয়াতে জানিয়েছিলেন যে, কুরআনে সবকিছুর বর্ণনাই স্থান পেয়েছে, সে কথার সত্যায়ণ স্বরূপ এ আয়াতে এমন কিছু আলোচনা করছেন যা সমস্ত বিধি-বিধানের মূল ও প্রাণ। [ফাতহুল কাদীর] তন্মধ্যে প্রথম নির্দেশ হচ্ছে, তিনি আদলের নির্দেশ দিচ্ছেন। মূলত: عدل শব্দের আসল ও আভিধানিক অর্থ সমান করা। এ অর্থের দিক দিয়েই স্বল্পতা ও বাহুল্যের মাঝামাঝি সমতাকেও عدل বলা হয়। [ফাতহুল কাদীর] কোন কোন মুফাসসির এ অর্থের সাথে সম্বন্ধ রেখেই আলোচ্য আয়াতে বাইরে ও ভেতরে সমান হওয়া দ্বারা عدل শব্দের তাফসীর করেছেনে। ইবন আব্বাস বলেন, এর অর্থ “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”। কারও মতে আদল হচ্ছে, ফরয। কারও নিকট, আদল হচ্ছে, ইনসাফ। তবে বাস্তব কথা এই যে, عدل শব্দটি অত্যন্ত ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। সবচেয়ে উত্তম হচ্ছে তার আভিধানিক অর্থই গ্রহণ করা। যা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। কেননা কোন কিছুতে বাড়াবাড়ি যেমন খারাপ তেমনি কোন কিছুতে কমতি করাও খারাপ। [ফাতহুল কাদীর]


(২) আয়াতের দ্বিতীয় নির্দেশ হচ্ছে, ইহসান করা। বস্তুত: الإحسان এর আসল আভিধানিক অর্থ সুন্দর করা। যা ওয়াজিব নয় তা অতিরিক্ত প্রদান করা। যেমন, অতিরিক্ত সাদকা। [ফাতহুল কাদীর] ইমাম কুরতুবী বলেনঃ আলোচ্য আয়াতে এ শব্দটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তাই উপরোক্ত উভয় প্রকার অর্থই এতে শামিল রয়েছে। প্রসিদ্ধ 'হাদীসে জিবরীল'-এ স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহসানের যে অর্থ বর্ণনা করেছেন, তা হচ্ছে ইবাদাতের ইহসান। এর সারমর্ম এই যে, আল্লাহর ইবাদাত এভাবে করা দরকার, যেন তুমি তাকে দেখতে পাচ্ছ। যদি এ স্তর অর্জন করতে না পার, তবে এটুকু বিশ্বাস তো প্রত্যেক ইবাদতকারীরই থাকা উচিত যে, আল্লাহ্ তা'আলা তার কাজ দেখছেন। [ফাতহুল কাদীর]


(৩) আয়াতের এ হচ্ছে তৃতীয় আদেশ। আত্মীয়দের দান করা। কি বস্তু দেয়া, এখানে তা উল্লেখ করা হয়নি। কিন্তু অন্য এক আয়াতে তা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, “আত্মীয়কে তার প্রাপ্য প্রদান কর।” [সূরা আল-ইসরাঃ ২৬] বাহ্যতঃ আলোচ্য আয়াতেও তাই বোঝানো হয়েছে; অর্থাৎ আত্মীয়কে তার প্রাপ্য দিতে হবে। অর্থ দিয়ে আর্থিক সেবা করা, দৈহিক সেবা করা, অসুস্থ হলে দেখাশোনা করা, মৌখিক সান্তনা ও সহানুভূতি প্রকাশ করা ইত্যাদি সবই উপরোক্ত প্রাপ্যের অন্তর্ভুক্ত। মোটকথা: তাদের যা প্রয়োজন তা প্রদান করা। [ফাতহুল কাদীর] ইহসান শব্দের মধ্যে আত্মীয়ের প্রাপ্য দেয়ার কথাও অন্তর্ভুক্ত ছিল; কিন্তু অধিক গুরুত্ব বোঝাবার জন্য একে পৃথক উল্লেখ করা হয়েছে। এ তিনটি ছিল ইতিবাচক নির্দেশ। [ফাতহুল কাদীর]


(৪) আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা তিনটি বিষয়ের আদেশ দিয়েছেনঃ সুবিচার, অনুগ্রহ ও আত্মীয়দের প্রতি অনুগ্রহ। পক্ষান্তরে তিন প্রকার কাজ করতে নিষেধ করেছেনঃ অশ্লীলতা, যাবতীয় মন্দ কাজ এবং যুলুম ও উৎপীড়ন। এ আয়াত সম্পর্কে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ এটি হচ্ছে কুরআনুল কারীমের ব্যাপকতর অর্থবোধক একটি আয়াত। [ইবন কাসীর]

কোন কোন সাহাবী এ আয়াত শ্রবণ করেই মুসলিম হয়েছিলেন। উসমান ইবনে মযউন রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ শুরুতে আমি লোকমুখে শুনে ঝোঁকের মাথায় ইসলাম গ্রহণ করেছিলাম, আমার অন্তরে ইসলাম বদ্ধমূল ছিল না। একদিন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খেদমতে উপস্থিত ছিলাম, হঠাৎ তার উপর ওহী নাযিলের লক্ষণ প্রকাশ পেল। কতিপয় বিচিত্র অবস্থার পর তিনি বললেনঃ আল্লাহর দূত এসেছিল এবং এই আয়াত আমার প্রতি নাযিল হয়েছে। উসমান ইবনে মযউন বলেনঃ এই ঘটনা দেখে এবং আয়াত শুনে আমার অন্তরে ঈমান বদ্ধমূল ও অটল হয়ে গেল এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি মহব্বত আমার মনে আসন পেতে বসল। [মুসনাদে আহমাদঃ ১/৩১৮]


(৫) ওপরের তিনটি সৎকাজের মোকাবিলায় আল্লাহ তিনটি অসৎ কাজ করতে নিষেধ করেন। অর্থাৎ আল্লাহ অশ্লীলতা, অসৎকর্ম ও সীমালঙ্ঘন করতে নিষেধ করেছেন। তন্মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে, “ফাহশা”। যার অর্থ অশ্লীলতা-নির্লজ্জতা। কথায় হোক বা কাজে। [ফাতহুল কাদীর] প্রকাশ্য মন্দকৰ্ম অথবা কথাকে অশ্লীলতা বলা হয়, যাকে প্রত্যেকেই মন্দ মনে করে। সব রকমের অশালীন, কদর্য ও নির্লজ্জ কাজ এর অন্তর্ভুক্ত। এমন প্রত্যেকটি খারাপ কাজ যা স্বভাবতই কুৎসিত, নোংরা, ঘৃণ্য ও লজ্জাকর তাকেই বলা হয় অশ্লীল।

যেমন কৃপণতা, ব্যভিচার, উলঙ্গতা, সমকামিতা, মুহররাম আত্মীয়কে বিয়ে করা, চুরি, শরাব পান, ভিক্ষাবৃত্তি, গালাগালি করা, কটু কথা বলা ইত্যাদি। এভাবে সর্বসমক্ষে বেহায়াপনা ও খারাপ কাজ করা এবং খারাপ কাজকে ছড়িয়ে দেয়াও অশ্লীলতা-নির্লজ্জতার অন্তর্ভুক্ত। যেমন মিথ্যা প্রচারণা, মিথ্যা দোষারোপ, গোপন অপরাধ জন সমক্ষে বলে বেড়ানো, অসৎকাজের প্ররোচক গল্প, নাটক ও চলচ্চিত্র, উলংগ চিত্র, মেয়েদের সাজগোজ করে জনসমক্ষে আসা, নারীপুরুষ প্রকাশ্যে মেলামেশা এবং মঞ্চে মেয়েদের নাচগান করা ও তাদের শারীরিক অংগভংগীর প্রদর্শনী করা ইত্যাদি।


(৬) নিষিদ্ধ দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে, মুনকার তথা দুস্কৃতি বা অসৎকর্ম। যা এমন কথা অথবা কাজকে বলা হয় যা শরীআত হারাম করেছেন। যাবতীয় গোনাহই এর অন্তর্ভুক্ত। কারও কারও মতে এর অর্থ শির্ক। [ফাতহুল কাদীর]


(৭) নিষিদ্ধ তৃতীয় জিনিসটি হচ্ছে, بغي, এ শব্দের আসল অর্থ সীমালঙ্ঘন করা, [ফাতহুল কাদীর] কারও কারও মতে, যুলুম। কারও কারও মতে, হিংসা-বিদ্বেষ। মোটকথা: এর দ্বারা যুলুম ও উৎপীড়ন বোঝানো হয়েছে। নিজের সীমা অতিক্রম করা এবং অন্যের অধিকার লংঘন করা ও তার ওপর হস্তক্ষেপ করা। তা আল্লাহর হক হোক বা বান্দার হক। মুনকার শব্দের যে অর্থ বর্ণিত হয়েছে, তাতে فحشاء ও بغي ও অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু চূড়ান্ত মন্দ হওয়ার কারণে এ কে পৃথক ও আগে উল্লেখ করা হয়েছে। [ফাতহুল কাদীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৯০) নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, অসৎকার্য ও সীমালংঘন করা হতে নিষেধ করেন।[1] তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন; যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর।


তাফসীর:

[1] عدل এর প্রসিদ্ধ অর্থ ন্যায়পরায়ণতা (সুবিচার)। অর্থাৎ, ঘর-পর সকলের ব্যাপারে সুবিচার করা। কারো সাথে শত্রুতা, ঝগড়া, ভালবাসা বা আত্মীয়তার কারণে সুবিচার যেন প্রভাবিত না হয়। এর দ্বিতীয় অর্থ মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা এবং কোন ব্যাপারে বাড়াবাড়ি না করা, এমন কি দ্বীনের ব্যাপারেও। কেননা, দ্বীনের মধ্যে إفراط এর পরিণাম সীমা অতিক্রম বা অতিরঞ্জন করা যা অত্যন্ত নিন্দনীয়। পক্ষান্তরে এর বিপরীত تفريط এর অর্থ দ্বীনের মধ্যে অলসতা করা; আর এটিও অপছন্দনীয়।إحسان  এর একটি অর্থ সদাচরণ, ক্ষমা ও মাফ করা। দ্বিতীয় অর্থ এহসানি বা অনুগ্রহ করা; ওয়াজিব (প্রাপ্য) অধিকারের চেয়ে বেশি দেওয়া বা ওয়াজেব (কর্তব্য) কাজের অধিক করা। যেমন কোন শ্রমিকের পারিশ্রমিক ঠিক হয়েছে এক শত টাকা, কিন্তু দেওয়ার সময় একশত দশ বা বিশ টাকা দেওয়া। এক শত টাকা দেওয়া এটি ওয়াজেব (প্রাপ্য) অধিকার, আর এটাই সুবিচার, আর দশ বিশ টাকা বেশি দেওয়া এটাই হল এহসান বা অনুগ্রহ। সুবিচার দ্বারা সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, কিন্তু সদাচরণ ও অনুগ্রহ প্রদর্শন দ্বারা সমাজে অধিক সৌন্দর্য, সৌহার্দ্য ত্যাগ-তিতিক্ষার স্পৃহা সৃষ্টি হয়। অনুরূপভাবে ফরয কাজ সম্পাদন করার সাথে সাথে নফল কাজে আগ্রহী হওয়া কর্তব্যের চাইতে বেশি আমল। যার দ্বারা আল্লাহর বিশেষ নৈকট্য লাভ হয়। এহসানের তৃতীয় অর্থঃ ইবাদত একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা ও তা সুন্দরভাবে সম্পন্ন করা। যার হাদীসে أن تعبد الله كأنك تراه (আল্লাহর ইবাদত এমনভাবে কর, যেন তুমি আল্লাহকে দেখছ) বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। إيتاء ذي القربى আত্মীয়-স্বজনের অধিকার আদায় করা, অর্থাৎ, তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করা। এটাকেই হাদীসে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা বলা হয়েছে এবং তার প্রচুর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সুবিচার, সদাচরণ অনুগ্রহের পর এর পৃথকভাবে উল্লেখ জ্ঞাতি-বন্ধন বজায় রাখার গুরুত্বকে আরো অধিকরূপে বাড়িয়ে তোলে। فحشاء অশ্লীল কাজ, আজকাল অশ্লীলতা এত ব্যাপকতা লাভ করেছে যে, তার নামই সভ্যতা, সংস্কৃতি, প্রগতি ও শিল্পকলা হয়ে গেছে! অথবা চিত্ত-বিনোদন বা মনোরঞ্জনের নামে তাকে বৈধ করে নেওয়া হয়েছে। তবে সুন্দর লেবেল লাগালে কোন জিনিসের আসলত্ব পাল্টে যায় না। অনুরূপ ইসলাম ব্যভিচার ও তার সকল ছিদ্রপথ; নাচ, পর্দাহীনতা, ফ্যাশন-প্রবণতা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা এবং অনুরূপ লজ্জাহীনতা প্রদর্শনকে অশ্লীলতা বলে অভিহিত করেছে। তার নাম যত সুন্দরই হোক না কেন; পাশ্চাত্য হতে আমদানীকৃত নোংরামি কোন মতেই বৈধ হতে পারে না। منكر (গর্হিত) প্রত্যেক সেই কাজ, যা শরীয়তে অবৈধ। بغي অর্থ অত্যাচার ও সীমালংঘন করা। একটি হাদীসে বলা হয়েছে যে, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা ও অত্যাচার করা এই দুই পাপ মহান আল্লাহর নিকট এত ঘৃণিত যে, আল্লাহর পক্ষ হতে পরকাল ছাড়া পৃথিবীতেই তার তৎক্ষণাৎ শাস্তির আশংকা থেকে যায়। (ইবনে মাজাহ কিতাবুয যুহদ)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৯০ নং আয়াতের তাফসীর:



আল্লাহ তা‘আলা উক্ত আয়াতে তাঁর বান্দাদেরকে ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ এবং আত্মীয়-স্বজনদেরকে দান করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাদেরকে নিষেধ করেছেন অশ্লীলতা, সীমালঙ্ঘন ও অসৎ কাজ করতে। الْعَدْلِ এর শাব্দিক অর্থ ন্যায়পরায়ণতা, ইনসাফ করা ও অবিচার না করা। আদল আল্লাহ তা‘আলার হকের ক্ষেত্রেও করতে হবে এবং মানুষের হকের ক্ষেত্রেও করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা ও বান্দার যত হক রয়েছে তা যথাযথভাবে আদায় করে দেয়াই হল আদল। তা আর্থিক হোক, শারীরিক হোক বা অন্য যে কোন হক হোক। বাড়াবাড়ি করা যাবে না এবং শিথিলতাও করা যাবে না। অনুরূপ আদল এর অন্যতম একটি অর্থ হল ন্যায়বিচার করা। অর্থাৎ বিচারের ক্ষেত্রে কারো পক্ষপাতিত্ব না করা।



আল্লাহ তা‘আলা ন্যায় বিচার সম্পর্কে বলেন:



(يٰٓأَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا كُوْنُوْا قَوّٰمِيْنَ لِلّٰهِ شُهَدَا۬ءَ بِالْقِسْطِ ز وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَاٰنُ قَوْمٍ عَلٰٓي أَلَّا تَعْدِلُوْا ط اِعْدِلُوْا قف هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوٰي)



“হে মু’মিনগণ! আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্যদানে তোমরা অবিচল থাক; কোন সম্প্রদায়ের শত্র“তা যেন তোমাদেরকে এর প্রতি উদ্যত না করে যে, তোমরা ন্যায়বিচার করবে না, তোমরা ন্যায়বিচার কর, এটা তাকওয়ার অধিকতর নিকটবর্তী।” (সূরা মায়িদা ৫:৮)



ইহসান অর্থ হল সদাচরণ, ক্ষমা ও সহানুভূতি দেখানো এবং অনুগ্রহ করা। অর্থাৎ আবশ্যক দায়িত্ব্ ও কর্তব্য পালন করার পরেও এবং যথাযথ হক দিয়ে দেয়ার পরেও অতিরিক্ত কিছু করা বা দেয়া। যেমন কোন শ্রমিকের প্রাপ্য একশত টাকার সাথে দশ টাকা বেশি দিলেন, এটা তার প্রতি ইহসান। আল্লাহ তা‘আলা সদাচরণ সম্পর্কে বলেন:



(وَأَحْسِنْ كَمَآ أَحْسَنَ اللّٰهُ إِلَيْكَ وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ)



“তুমি অনুগ্রহ কর যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না।” (সূরা ক্বাসাস ২৮:৭৭)



হাদীসে এসেছে; রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:



ارْحَمُوا مَنْ فِي الأَرْضِ يَرْحَمْكُمْ مَنْ فِي السَّمَاء



জমিনে যারা রয়েছে তাদের প্রতি রহম কর আকাশে যিনি রয়েছেন তিনি তোমাদেরকে রহম করবেন। (তিরমিযী হা: ১৯২৪, সহীহ)



ইহসানের অন্যতম আরেকটি অর্থ হল একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার জন্য ইবাদত করা এবং সুন্দরভাবে তা সম্পন্ন করা। হাদীসে এসেছে:



(أَنْ تَعْبُدَ اللّٰهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ)



তুমি এমনভাবে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করবে যেন তাঁকে দেখছো, যদি না দেখতে পাও তাহলে জেনে রেখো, আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে দেখছেন। (সহীহ বুখারী হা: ৫০, সহীহ মুসলিম হা: ৮)



পূর্বে আদলের আলোচনা করার পর এখানে আবার আত্মীয়-স্বজনের অধিকার সম্পর্কে আলোচনা করা হচ্ছে তার উদ্দেশ্য, এ ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করা।



আল্লাহ তা‘আলা আত্মীয়-স্বজনের হক সম্পর্কে বলেন:



(فَاٰتِ ذَا الْقُرْبٰي حَقَّه۫ وَالْمِسْكِيْنَ وَابْنَ السَّبِيْلِ ط ذٰلِكَ خَيْرٌ لِّلَّذِيْنَ يُرِيْدُوْنَ وَجْهَ اللّٰهِ ز وَأُولٰ۬ئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ)



“অতএব আত্মীয়-স্বজনকে তাদের হক দিয়ে দাও এবং মিসকিন ও মুসাফিরদেরকেও। এটা তাদের জন্য উত্তম, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে, আর তারাই হল সফলকাম।” (সূরা রূম ৩০:৩৮)



হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখবে আল্লাহ তা‘আলা তার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখবেন, আর যে সম্পর্ক ছিন্ন করবে তার সাথে আল্লাহ তা‘আলা সম্পর্ক ছিন্ন করবেন। (সহীহ বুখারী হা: ৫৯৮৭)



আর অশ্লীলতা ও বেহায়াপনার তো কোন সীমা নেই। চিত্ত বিনোদন, সংস্কৃতি ও প্রগতির নামে আজ অশ্লীলতা, নোংরামী ও বেহায়াপনা লাগামহীন হয়ে গেছে। অশ্লীলতা ও অসৎ কাজ (মানুষের বিবেকও বলে দেয় যে) কক্ষনোই ভাল নয়।



আল্লাহ তা‘আলা অশ্লীলতা, অসৎ কার্য ও সীমালংঘন না করার ব্যাপারে বলেন:



(قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّـيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ)



“বল:‎ নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক হারাম করেছেন প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা আর পাপ ও অন্যায় বিরোধিতা।” (সূরা আ‘রাফ ৭:৩৩)



وَالْبَغْيِ অর্থ সীমালংঘন ও অত্যাচার। শরীয়ত যে সীমারেখা দিয়েছে তার বাইরে যাওয়াই হল সীমালংঘন করা। অন্যের হক নষ্ট করাও সীমালংঘন করার অন্তর্ভুক্ত।



অতএব আমাদের প্রত্যেকের উচিত, আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ অনুপাতে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করা, মানুষের সাথে সদাচরণ করা, আত্মীয়তার হক যথাযথভাবে আদায় করা এবং মন্দ ও অশ্লীলকার্য পরিহার করা।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. সৎ কাজ করতে হবে, অসৎ কাজ করা যাবে না।

২. কোন কিছুর ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা যাবে না।

৩. আত্মীয়-স্বজনের হক আদায় করতে হবে।

৪. সকল ক্ষেত্রে ন্যায় বিচার ও ন্যায় নীতি গ্রহণ করতে হবে।

৫. অশ্লীল কার্য পরিহার করতে হবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: মহামহিমান্বিত আল্লাহ স্বীয় বান্দাদেরকে ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনের প্রতি দানের নির্দেশ দিচ্ছেন, যদিও প্রতিশোধ গ্রহণও জায়েয। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যদি তোমরা প্রতিশোধ গ্রহণ কর তবে সমান সমান ভাবে প্রতিশোধ গ্রহণ কর। আর যদি ধৈর্য ধারণ কর তবে ধৈর্যশীলদের জন্যে এটা বড়ই উত্তম কাজ।” (১৬:১২৬) অন্য আয়াতে আছেঃ “মন্দের বদল সমপরিমাণ মন্দ, আর যে মাফ করে দেয় ও মীমাংসা করে নেয়, তার প্রতিদান আল্লাহর নিকট রয়েছে।” আর একটি আয়াতে রয়েছেঃ “যখমের কিসাস রয়েছে, কিন্তু যে ক্ষমা করে দেয়, ওটা তার জন্যে গুনাহ মাফের কারণ।” সুতরাং ন্যায়পরায়ণতা তো ফরয, আর ইহসান নফল। কালেমায়ে তাওহীদের সাক্ষ্য দেয়াও আ। বাহির ও ভিতর এক হওয়াও আ। আর ইহসান এই যে, ভিতরের পরিচ্ছন্নতা বাইরের চেয়েও বেশী হবে। ফাহসা’ এবং ‘মুনকার’ হচ্ছে ভিতর অপেক্ষা বাহির বেশী সুন্দর হওয়া।

আল্লাহ তাআলা আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখারও নির্দেশ দিচ্ছেন। যেমন স্পষ্ট ভাষায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “আত্মীয়-স্বজন, মিল্কীন ও মুসাফিরদেরকে তাদের হক দিয়ে দাও এবং অপচয় করো না।” আর তিনি অশ্লীলতা, অসৎকার্য ও সীমালংঘন থেকে নিষেধ করছেন। প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সমস্ত অশ্লীলতা হারাম এবং লোকদের উপর যুলুম ও বাড়াবাড়ী করাও হারাম। যেমন হাদীসে এসেছেঃ যুলুম ও সীমালংঘন অপেক্ষা এমন কোন বড় গুনাহ নেই যার জন্যে দুনিয়াতেই তাড়াতাড়ি শাস্তি দেয়া হয় এবং পরকালে কঠিন শাস্তি জমা থাকে।” আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “এই আদেশ ও নিষেধ তোমাদের জন্যে উপদেশ স্বরূপ, যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর।”

হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, গোটা কুরআনের ব্যাপক অর্থ জ্ঞাপক আয়াত হচ্ছে সূরায়ে নাহলের এই আয়াতটি। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যত ভাল স্বভাব আছে সেগুলি অবলম্বনের নির্দেশ কুরআন দিয়েছে এবং মানুষের মধ্যে যে সব খারাপ স্বভাব রয়েছে সেগুলি পরিত্যাগ করতে আল্লাহ তাআ’লা হুকুম করেছেন। হাদীসে রয়েছে যে, উত্তম চরিত্র আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন এবং অসৎ চরিত্র তিনি অপছন্দ করেন।

আবদুল মালিক ইবনু উমাইর (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন। যে,হযরত আকসাম ইবনু সাইফীর (রাঃ) নিকট নবীর (সঃ) আবির্ভাবের খবর পোঁছে। তিনি তাঁর কাছে গমন করার স্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কিন্তু তাঁর কওম তাঁর এই পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তিনি তখন তাদেরকে বলেনঃ

“তোমরা আমাকে তাঁর কাছে যেতে না দিলে এমন লোক আমার কাছে হাজির কর যাদেরকে আমি দূত হিসেবে তাঁর নিকট প্রেরণ করবো।” তাঁর কথা অনুযায়ী দু’জন লোক এ কাজের জন্যে প্রস্তুত হয়ে যান। তাঁরা নবীর (সঃ) নিকট হাজির হয়ে আরজ করেনঃ “আমরা আকসাম ইবনু সাইফীর (রাঃ) দূত হিসেবে আপনার নিকট আগমন করেছি।” অতঃপর তাঁরা তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি কে এবং আপনি কি?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “তোমাদের প্রথম প্রশ্নের উত্তর এই যে, আমি মুহাম্মদ ইবনু আব্দিল্লাহ (সঃ)। আর তোমাদের দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর এই যে, আমি আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রাসূল।” অতঃপর তিনি (আরবি) এই আয়াতটি পাঠ করেন। তাঁরা বলেনঃ “পুনরায় পাঠ করুন।” তিনি আবার পাঠ করেন। তারা তা মুখস্থ করে নেন এবং ফিরে গিয়ে আকসামকে (রাঃ) সমস্ত খবর অবহিত করেন। তাঁরা তাঁকে বলেনঃ “তিনি নিজের বংশের কোন গৌরব প্রকাশ করেন নাই। শুধু নিজের নাম ও পিতার নাম তিনি বলেন। অথচ তিনি অতি সম্ভান্ত বংশের লোক। তিনি আমাদেরকে যে কথাগুলি শিখিয়ে দিয়েছেন তা আমরা মুখস্থ করে নিয়েছি।” অতঃপর তাঁরা তাঁকে তা শুনিয়ে দেন। কথাগুলি শুনে আকসাম (রাঃ) বলেনঃ “তিনি তো তাহলে খুবই উত্তম ও উন্নত মানের কথা শিখিয়ে থাকেন। আর তিনি খারাপ ও অশ্লীল কথা ও কাজ থেকে বিরত রাখেন। হে আমার কওমের লোকেরা! তোমরা ইসলামে অগ্রগামী হও। তাহলে তোমরা নেতৃত্ব লাভ করবে এবং অন্যদের গোলাম হয়ে থাকবে না।”

হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা বাড়ীর উঠানে বসে ছিলেন। এমন সময় হযরত উসমান ইবনু মাযউন (রাঃ) তার পার্শ্ব দিয়ে গমন করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “বসছে না কেন?” তিনি তখন বসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার সাথে কথা বলতে ছিলেন। হঠাৎ তিনি (নবী (সঃ) তাঁর দৃষ্টি আকাশের দিকে উত্তোলন করেন। কিছুক্ষণ ধরে তিনি উপরের দিকেই তাকাতে থাকেন। তারপর ধীরে ধীরে তিনি দৃষ্টি নীচের দিকে নামিয়ে দেন এবং নিজের ডান দিকে যমীনের দিকে তাকাতে থাকেন। এ দিকে তিনি মুখমণ্ডলও ঘুরিয়ে দেন। আর এমনভাবে মাথা হেলাতে থাকেন যে, যেন কারো নিকট থেকে কিছু বুঝতে রয়েছেন এবং কেউ তাঁকে কিছু বলতে রয়েছে। কিছুক্ষণ পর্যন্ত এই অবস্থাই থাকে। তারপর তিনি স্বীয় দৃষ্টি উঁচু করতে শুরু করেন, এমন কি আকাশ পর্যন্ত তাঁর দৃষ্টি পৌঁছে যায়। তারপর তিনি স্বাভাবিক অবস্থায় চলে আসেন এবং পূর্বের বসার অবস্থায় হযরত উসমানের (রাঃ) দিকে মুখ করেন। হযরত উসমান (রাঃ) সবকিছুই দেখতে ছিলেন। তিনি আর ধৈর্য ধরতে পারলেন না। জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার পাশে বেশ কয়েকবার আমার বসার সুযোগ ঘটেছে। কিন্তু আজকের মত কোন দৃশ্য তো কখনো দেখি নাই?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “কি দেখেছো?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “দেখি যে, আপনি দৃষ্টি আকাশের দিকে উত্তোলন করলেন এবং পরে নীচের দিকে নামিয়ে দিলেন। এরপর ডান দিকে ঘুরে গিয়ে ঐ দিকেই তাকাতে লাগলেন এবং আমাকে ছেড়ে দিলেন। তারপর আপনি মাথাকে এমনভাবে নড়াতে থাকলেন যে, যেন কেউ আপনাকে কিছু বলছে এবং আপনি কান লাগিয়ে তা শুনছেন।” তিনি বললেনঃ “তা হলে তুমি সবকিছুই দেখেছো?” তিনি জবাবে বলেনঃ “জ্বি, হাঁ, আমি সবকিছুই দেখেছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “আমার কাছে আল্লাহ তাআলার প্রেরিত ফেরে ওয়াহী নিয়ে এসেছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “হাঁ, আল্লাহ কর্তৃকই প্রেরিত।” তিনি প্রশ্ন করলেনঃ “তিনি আপনাকে কি বললেনঃ “তিনি জবাব দিলেনঃ “তিনি আমাকে (আরবি) এই আয়াতটি পড়ে শুনালেন।” হযরত উসমান ইবনু মাযউন (রাঃ) বলেনঃ “তৎক্ষণাৎ আমার অন্তরে ঈমান সুদৃঢ় হয়ে যায় এবং রাসূলুল্লাহর (সঃ) মহব্বত আমার অন্তরে স্থান করে নেয়।” অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত উসমান ইবনু আবুল আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহর (সঃ) পার্শ্বে বসে ছিলাম। এমন সময় হঠাৎ তিনি তাঁর দৃষ্টি উপরের দিকে উত্তোলন করেন এবং বললেনঃ “আমার নিকট হযরত জিবরাঈল (আঃ) আগমন করে আমাকে নির্দেশ দেন যে, আমি যেন (আরবি) এই আয়াতটিকে এই সূরার এই স্থানে রেখে দিই।” এই রিওয়াইয়াতটিও সঠিক।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।