আল কুরআন


সূরা আন-নাহাল (আয়াত: 86)

সূরা আন-নাহাল (আয়াত: 86)



হরকত ছাড়া:

وإذا رأى الذين أشركوا شركاءهم قالوا ربنا هؤلاء شركاؤنا الذين كنا ندعوا من دونك فألقوا إليهم القول إنكم لكاذبون ﴿٨٦﴾




হরকত সহ:

وَ اِذَا رَاَ الَّذِیْنَ اَشْرَکُوْا شُرَکَآءَهُمْ قَالُوْا رَبَّنَا هٰۤؤُلَآءِ شُرَکَآؤُنَا الَّذِیْنَ کُنَّا نَدْعُوْا مِنْ دُوْنِکَ ۚ فَاَلْقَوْا اِلَیْهِمُ الْقَوْلَ اِنَّکُمْ لَکٰذِبُوْنَ ﴿ۚ۸۶﴾




উচ্চারণ: ওয়া ইযা-রাআল্লাযীনা আশরাকূশুরাকাআহুম কা-লূরাব্বানা-হাউলাই শুরাকাউনাল্লাযীনা কুন্না-নাদ‘ঊ মিন দূ নিকা ফাআলকাও ইলাইহিমুল কাওলা ইন্নাকুম লাকা-যিবূন।




আল বায়ান: আর যারা শিরক করেছে, তারা যখন তাদের শরীকদের দেখবে, তখন বলবে, ‘হে আমাদের রব, এরা হল আমাদের শরীক, যাদেরকে আমরা আপনার পরিবর্তে আহবান করতাম।’ অতঃপর তারা তাদের প্রতি উত্তরে বলবে, ‘নিশ্চয় তোমরা মিথ্যাবাদী।’




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৮৬. আর যারা শির্ক করেছে, তারা যখন তাদের শরীকদেরকে দেখবে তখন বলবে, হে আমাদের রব! এরাই তারা যাদেরকে আমরা আপনার শরীক করেছিলাম, যাদেরকে আমরা আপনার পরিবর্তে ডাকতাম; তখন শরীকরা এ কথা মুশরিকদের দিকে ফিরিয়ে দিয়ে বলবে, নিশ্চয় তোমরা মিথ্যাবাদী।




তাইসীরুল ক্বুরআন: মুশরিকরা যাদেরকে আল্লাহর শারীক বানিয়েছিল তাদেরকে যখন দেখবে তখন তারা বলবে, ‘হে আমাদের রব্ব! এরাই হল আমাদের শারীক মা‘বূদ তোমাকে বাদ দিয়ে যাদেরকে আমরা ডাকতাম।’ তখন এ কথাকে তাদের দিকেই ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে তাদের সেই মা‘বূদরা বলবে, ‘তোমরা অবশ্যই মিথ্যেবাদী।’




আহসানুল বায়ান: (৮৬) অংশীবাদীরা যাদেরকে আল্লাহর অংশী করেছিল, তাদেরকে যখন দেখবে তখন বলবে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! এরাই আমাদের অংশী, যাদেরকে আমরা তোমার পরিবর্তে আহবান করতাম।’ অতঃপর প্রত্যুত্তরে তারা তাদেরকে বলবে, ‘তোমরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।’ [1]



মুজিবুর রহমান: মুশরিকরা যাদেরকে (আল্লাহর) শরীক করেছিল তাদেরকে দেখে বলবেঃ হে আমাদের রাব্ব! এরাই তারা যাদেরকে আমরা আপনার শরীক করেছিলাম, যাদেরকে আমরা আহবান করতাম আপনার পরিবর্তে; অতঃপর তদুত্তরে তারা বলবেঃ তোমরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।



ফযলুর রহমান: আর যারা শরীক করত তারা (মুশরিকরা) যখন তাদের শরীকদেরকে দেখতে পাবে তখন বলবে, “হে আমাদের প্রভু! এরাই আমাদের সেইসব শরীক যাদেরকে আমরা তোমার পরিবর্তে ডাকতাম।” তখন ঐ শরীকরা মুশরিকদের দিকে কথাটি ছুঁড়ে মারবে (তাৎক্ষণিকভাবে বলে উঠবে), “তোমরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।”



মুহিউদ্দিন খান: মুশরিকরা যখন ঐ সব বস্তুকে দেখবে, যেসবকে তারা আল্লাহর সাথে শরীক সাব্যস্ত করেছিল, তখন বলবেঃ হে আমাদের পালনকর্তা এরাই তারা যারা আমাদের শেরেকীর উপাদান, তোমাকে ছেড়ে আমরা যাদেরকে ডাকতাম। তখন ওরা তাদেরকে বলবেঃ তোমরা মিথ্যাবাদী।



জহুরুল হক: আর যারা অংশী দাঁড় করিয়েছিল তারা যখন তাদের দেবতাদের দেখতে পাবে তখন তারা বলবে -- "আমাদের প্রভু! এরাই আমাদের ঠাকুরদেবতা যাদের আমরা পূজা করতাম তোমাকে ছেড়ে দিয়ে।" তখন তারা তাদের দিকে কথাটা ছুঁড়ে মারবে -- "নিঃসন্দেহ তোমরাই তো মিথ্যাবাদী।"



Sahih International: And when those who associated others with Allah see their "partners," they will say," Our Lord, these are our partners [to You] whom we used to invoke besides You." But they will throw at them the statement, "Indeed, you are liars."



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৮৬. আর যারা শির্ক করেছে, তারা যখন তাদের শরীকদেরকে দেখবে তখন বলবে, হে আমাদের রব! এরাই তারা যাদেরকে আমরা আপনার শরীক করেছিলাম, যাদেরকে আমরা আপনার পরিবর্তে ডাকতাম; তখন শরীকরা এ কথা মুশরিকদের দিকে ফিরিয়ে দিয়ে বলবে, নিশ্চয় তোমরা মিথ্যাবাদী।


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৮৬) অংশীবাদীরা যাদেরকে আল্লাহর অংশী করেছিল, তাদেরকে যখন দেখবে তখন বলবে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! এরাই আমাদের অংশী, যাদেরকে আমরা তোমার পরিবর্তে আহবান করতাম।’ অতঃপর প্রত্যুত্তরে তারা তাদেরকে বলবে, ‘তোমরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।’ [1]


তাফসীর:

[1] আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদতকারীরা তো নিজেদের এই দাবিতে মিথ্যাবাদী হবে না, কিংবা যাদেরকে তারা আল্লাহর শরীক করত, তারা বলবে যে, এরা মিথ্যাবাদী। অথবা এখানে তাদের শিরক করার কথা খন্ডন করা হয়েছে। অর্থাৎ, আমাদেরকে আল্লাহর শরীক করার ব্যাপারে এরা মিথ্যাবাদী; আল্লাহর শরীক কি কেউ হতে পারে? অথবা এই কারণে তারা তাদেরকে মিথ্যাবাদী বলবে যে, তারা তাদের শিরক, ইবাদত ও পূজা সম্পর্কে অবগতই ছিল না। যেমন কুরআন কারীম এ কথাটিকে বহু জায়গায় উল্লেখ করেছে। যেমন, {فَكَفَى بِاللّهِ شَهِيدًا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ إِن كُنَّا عَنْ عِبَادَتِكُمْ لَغَافِلِينَ}  অর্থাৎ, আমাদের ও তোমাদের মধ্যে আল্লাহই সাক্ষীর জন্য যথেষ্ট যে, আমরা তোমাদের ইবাদত সম্বন্ধে অবগত ছিলাম না। (সূরা ইউনুস ২৯) আরো দেখুনঃ সূরা আহক্বাফ ৫-৬, সূরা মারয়্যাম ৮১-৮২, সূরা আনকাবূত ২৫, সূরা কাহ্ফ ৫২নং ইত্যাদি আয়াত। এর একটি অর্থ এও হতে পারে যে, আমরা তোমাদেরকে আমাদের ইবাদত করতে কখনও বলিনি। সেই জন্য তোমরাই মিথ্যাবাদী। আল্লাহর সাথে কৃত উক্ত শরীকরা যদি পাথর বা গাছপালা হয়, তাহলে মহান আল্লাহ তাদের বাকশক্তি দান করবেন। আর জীন-শয়তান হলে তো কোন প্রশ্নই ওঠে না। আর যদি শরীক আল্লাহর নেক বান্দা হয়ে থাকেন, যেমন বহু নেক, পরহেযগার ও বুযুর্গ আল্লাহর ওলীদেরকে সাহায্যের জন্য ডাকা হয়, তাঁদের নামে নযর মানত করা হয়, তাঁদের কবরে গিয়ে এমন তা’যীম করা হয়, যেমন ভয় ও আশার সাথে কোন দেবদেবীর করা হয়, মহান আল্লাহ তাঁদেরকে হাশরের মাঠে নির্দোষ ঘোষণা করবেন। আর যারা তাঁদের ইবাদত করত, তাদেরকে জাহান্নামে ঠেলে দেওয়া হবে। যেমন ঈসা (আঃ)-এর সাথে আল্লাহর প্রশ্নোত্তর সূরা মায়েদার শেষের দিকে (১১৬-১১৮নং আয়াতে) বর্ণিত হয়েছে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৮৪-৮৯ নং আয়াতের তাফসীর:



এখানে আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়াতে মানুষের পাপের কারণে আখিরাতে তাদের কিরূপ অবস্থা হবে সে কথা বর্ণনা করছেন।



شَهِيْدًا একজন সাক্ষী বলতে সে জাতির নাবীকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ প্রত্যেক নাবী তাঁর জাতির জন্য সাক্ষ্য দেবে যে, তিনি তাদের নিকট আল্লাহ তা‘আলার বাণী পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু তারা তা অগ্রাহ্য করেছিল। ঐ সকল কাফিরদেরকে অজুহাত পেশ করার কোন সুযোগ দেয়া হবে না। কারণ তাদের গ্রহণযোগ্য কোন অজুহাত থাকবে না। আর না তাদেরকে প্রত্যাবর্তন বা অসন্তোষ দূর করার সময় দেয়া হবে। কারণ তার প্রয়োজন তখন হয়, যখন কাউকে সুযোগ দেয়ার উদ্দেশ্য থাকে।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(هٰذَا يَوْمُ لَا يَنْطِقُوْنَ -‏ وَلَا يُؤْذَنُ لَهُمْ فَيَعْتَذِرُوْنَ‏)‏



“এটা এমন একদিন যেদিন তারা কিছু বলতে পারবে না। এবং না তাদেরকে অনুমতি দেয়া হবে ওযর পেশ করার।” (সূরা মুরসালাত ৭৭:৩৫-৩৬)



(وَلَا هُمْ يُسْتَعْتَبُوْنَ)



এর অন্য আরেকটি অর্থ হল তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি অর্জন করার কোন সুযোগ দেয়া হবে না। কারণ সে সুযোগ তাদেরকে পৃথিবীতে দেয়া হয়েছিল, যা ছিল কর্মস্থল। আখিরাত কর্মস্থল নয়, বরং প্রতিদান দেয়ার দিন। সেখানে মানুষ পৃথিবীতে যা করেছে তার প্রতিদান পাবে। সেখানে কাউকেই কিছু আমল করার সুযোগ দেয়া হবে না।



(وَلَا هُمْ يُنْظَرُوْنَ)



অর্থাৎ শাস্তি হালকা করা হবে না এবং বিরতি দেয়া হবে না। বরং অবিরাম শাস্তি দেয়া হবে।



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলছেন যে, কিয়ামতের দিন যখন মুশরিকরা তাদের মা‘বূদদেরকে দেখতে পাবে তখন তারা বলবে: হে আল্লাহ তা‘আলা! এরা হল আমাদের মা‘বূদ, আপনাকে বাদ দিয়ে এদের ইবাদত করেছি। তখন মা‘বূদেরা অস্বীকার করে বলবে: তোমরা মিথ্যা বলছ, তোমরা আমাদের ইবাদত করনি, কারণ আমরা কখনো তোমাদেরকে আমাদের ইবাদত করতে বলিনি।



আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنْ يَّدْعُوْا مِنْ دُوْنِ اللّٰهِ مَنْ لَّا يَسْتَجِيْبُ لَه۫ٓ إِلٰي يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَهُمْ عَنْ دُعَا۬ئِهِمْ غٰفِلُوْنَ - وَإِذَا حُشِرَ النَّاسُ كَانُوْا لَهُمْ أَعْدَا۬ءً وَّكَانُوْا بِعِبَادَتِهِمْ كٰفِرِيْنَ)



“সে ব্যক্তির চেয়ে বেশি গোমরাহ আর কে হতে পারে, যে আল্ল¬াহকে বাদ দিয়ে এমন কাউকে ডাকে, যে কিয়ামতের দিন পর্যন্তও সাড়া দেবে না। বরং তারা তাদের আহ্বান সম্পর্কে গাফেল। (হাশরের ময়দানে) যখন সব মানুষকে একত্রিত করা হবে তখন যারা যাদেরকে ডাকত তারা তাদের দুশমন হয়ে যাবে এবং তাদের ইবাদতকে অস্বীকার করবে।” (সূরা আহক্বাফ ৪৬:৫-৬)



আর যদি শরীক আল্লাহ তা‘আলার নেক বান্দা হয়, যেমন বহু নেক বান্দা যাদেরকে কেন্দ্র করে মাযার তৈরি করা হয়েছে কিংবা তাদের নামে মানত করা হয়, নযর মানা হয় বা তাদের কাছে চাওয়া হয় এবং সিজদা করা হয় তাহলে কিয়ামতের দিন হাশরের মাঠে নির্দোষ প্রমাণ করা হবে। আর যারা তাদের ইবাদত করত তাদেরকে জাহান্নামে ঠেলে দেয়া হবে। যেমন ঈসা (عليه السلام)-এর সাথে আল্লার প্রশ্নোত্তর সূরা মায়িদার ১১৬-১১৮ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে।



আর যারা নিজেরা আল্লাহ তা‘আলার সাথে কুফরী করত এবং মানুষকে আল্লাহ তা‘আলার পথে চলতে বাধা প্রদান করত তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা শাস্তির ওপর শাস্তি বৃদ্ধি করে দেবেন। কারণ যাদেরকে বাধা দিয়েছে তাদের পাপের ভারও বহণ করতে হবে। যদি বাধা না দিত তাহলে হয়তো তারা ঈমান আনত।



আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(وَلَيَحْمِلُنَّ أَثْقَالَهُمْ وَأَثْقَالًا مَّعَ أَثْقَالِهِمْ)



“তারা অবশ্যই নিজেদের পাপের ভার বহন করবে এবং নিজেদের বোঝার সাথে আরও কিছু বোঝা।” (সূরা আনকাবুত ২৯:১৩)



আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, তিনি প্রত্যেক সম্প্রদায় থেকে একজন সাক্ষী উপস্থিত করবেন এবং তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী হিসেবে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নিয়ে আসবেন। আর তখন পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(فَکَیْفَ اِذَا جِئْنَا مِنْ کُلِّ اُمَّةٍۭ بِشَھِیْدٍ وَّجِئْنَا بِکَ عَلٰی ھٰٓؤُلَا۬ئِ شَھِیْدًاﭸﺛیَوْمَئِذٍ یَّوَدُّ الَّذِیْنَ کَفَرُوْا وَعَصَوُا الرَّسُوْلَ لَوْ تُسَوّٰی بِھِمُ الْاَرْضُﺚ وَلَا یَکْتُمُوْنَ اللہَ حَدِیْثًاﭹﺟ)



“যখন আমি প্রত্যেক উম্মত হতে একজন সাক্ষী উপস্থিত করব এবং তোমাকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষীরূপে উপস্থিত করব তখন কী অবস্থা হবে? যারা কুফরী করেছে এবং রাসূলের অবাধ্য হয়েছে তারা সেদিন কামনা করবে, যদি তারা মাটির সঙ্গে মিশে যেতে পারত! আর তারা আল্লাহ হতে কোন কথাই গোপন করতে পারবে না।” (সূরা নিসা ৪:৪১-৪২) আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:



(فَلَنَسْئَلَنَّ الَّذِيْنَ أُرْسِلَ إِلَيْهِمْ وَلَنَسْئَلَنَّ الْمُرْسَلِيْنَ)



“অতঃপর যাদের নিকট রাসূল প্রেরণ করা হয়েছিল তাদেরকে আমি অবশ্যই জিজ্ঞেস করব এবং রাসূলগণকেও জিজ্ঞেস করব।” (সূরা আ‘রাফ ৭:৬)



অতএব সেদিনের অবস্থা হবে খুবই কঠিন। সেদিন প্রত্যেক অপরাধীকে তার কৃতকর্মের জন্য কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। যে শাস্তি থেকে রেহাই পাবার কোনই পথ থাকবে না।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. প্রত্যেক সম্প্রদায় থেকে সাক্ষী উপস্থিত করা হবে।

২. কোন ওযর-আপত্তি পেশ করা যাবে না।

৩. আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় মানুষকে বাধা দেয়া যাবে না।

৪. জাহান্নামে শাস্তির কোন কম-বেশি করা হবে না।

৫. দুনিয়ায় যাদের ইবাদত করা হত তারা তাদের অনুসারীদের কথা অস্বীকার করবে।

৬. কুরআনে সকল বিষয় স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৮৪-৮৮ নং আয়াতের তাফসীর

কিয়ামতের দিন মুশরিকদের যে দূরবস্থা ও দুর্গতি হবে, আল্লাহ তাআলা এখানে তারই খবর দিচ্ছেন। ঐদিন প্রত্যেক উম্মতের বিরুদ্ধে তার নবী সাক্ষ্য প্রদান করবেন যে, তিনি তাদের কাছে আল্লাহর কালাম পৌঁছিয়ে দিয়েছেন।

অতঃপর কাফিরদেরকে কোন ওযর পেশ করার অনুমতি দেয়া হবে না। কেননা, তাদের ওযর যে বাতিল ও মিথ্যা এটা তো স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “এটা এমন একদিন যেদিন কারো বাকস্ফুর্তি হবে না, এবং তাদেরকে অনুমতি দেয়া হবে না অপরাধ স্থালনের।” (৭৭:৩৫-৩৬)

মুশরিকরা আযাব দেখবে, তাদের আযাব হ্রাস করা হবে না এবং এক ঘন্টার জন্যেও শাস্তি হালকা হবে না এবং তারা অবকাশও পাবে না। অকস্মাৎ তাদেরকে পাকড়াও করা হবে। জাহান্নাম এসে পড়বে যা সত্তর হাজার লাগাম বিশিষ্ট হবে। একটি লাগামের উপর নিযুক্ত থাকবেন সত্তর হাজার ফেরেশতা। তাদের মধ্যে একজন গ্রীবা বের করে এমনভাবে ক্রোধ প্রকাশ করবেন যে, সমস্ত হাশরবাসী ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে হাটুর ভরে পড়ে যাবে। এ সময় জাহান্নাম নিজের ভাষায় সশব্দে ঘোষণা করবেঃ “আমাকে প্রত্যেক অবাধ্য ও হঠকারীর জন্যে নির্দিষ্ট করা হয়েছে, যে আল্লাহর সাথে অন্য কাউকেও শরীক করেছে এবং এরূপ এরূপ কাজ করেছে। এভাবে সে কয়েক প্রকারের পাপীর কথা উল্লেখ করবে, যেমন হাদীসে রয়েছে। অতঃপর সে সমস্ত লোককে জড়িয়ে ধরবে এবং হাশরের মাঠে তাদেরকে লাফিয়ে ধরবে যেমন পাখী চঞ্চু দ্বারা খাদ্য ধরে খেয়ে থাকে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “দূর হতে অগ্নি যখন তাদেরকে দেখবে তখন তারা শুনতে পাবে ওর ক্রুদ্ধ গর্জন ও চীৎকার। আর যখন তাদেরকে শৃংখলিত অবস্থায় ওর কোন সংকীর্ণ স্থানে নিক্ষেপ করা হবে তখন তারা তথায় ধ্বংস কামনা করবে। তাদেরকে বলা হবেঃ আজ তোমরা একবারের জন্যে ধ্বংস কামনা করো না। বহুবার ধ্বংস হওয়ার কামনা করতে থাকো।” (২৫:১২-১৪)

আর এক জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “অপরাধীরা জাহান্নাম দেখে ধারণা করবে যে, তাদেরকে ওর মধ্যে নিক্ষেপ করা হবে এবং তারা ওর থেকে মুক্তি পাওয়ার কোন উপায় দেখতে পাবে না। অন্য আয়াতে রয়েছেঃ “যদি কাফিররা ঐ সময়ের কথা জানতে পারতো! যখন তারা নিজেদের চেহারা ও কোমরের উপর হতে জাহান্নামের আগুন দূর করতে পারবে না, তারা কোন সাহায্যকারীও পাবে না, হঠাৎ আল্লাহর শাস্তি তাদেরকে হতভম্ব করে ফেলবে!

ঐ শাস্তি দূর করার তাদের ক্ষমতা থাকবে, না তাদেরকে এক মুহূর্তকাল অবকাশ দেয়া হবে।”
ঐ সময় মুশরিকরা তাদের ঐ বাতিল মা’বূদদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়বে যাদের তারা জীবন ধরে ইবাদত করে এসেছিল। কারণ, এ সময় তারা তাদের কোনই কাজে আসবে না। তাদের মা’বূদদেরকে দেখে তারা বলবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! এরা তারাই যাদের আমরা দুনিয়ায় ইবাদত করতাম।” তখন তারা উত্তরে বলবেঃ “তোমরা মিথ্যাবাদী। আমরা কখন তোমাদেরকে বলেছিলাম যে, তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে আমাদেরই ইবাদত করো?” এ সম্পর্কেই আল্লাহ পাক বলেনঃ “ওদের চেয়ে বেশী পথভ্রষ্ট আর কে হতে পারে, যারা আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুকে আহ্বান করে যারা কিয়ামত পর্যন্তও তাদের আহ্বানে সাড়া দিতে পারবে না। বরং তাদের ডাক থেকেও তারা। উদাসীন? হাশরের দিন তারা তাদের শত্রু হয়ে যাবে এবং তাদের ইবাদতের কথা অস্বীকার করবে।” অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ “তারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য মাবুদ গ্রহণ করে, যেন তারা তাদের সহায় হয়। কখনই নয়; তারা তাদের ইবাদত অস্বীকার করবে এবং তাদের বিরোধী হয়ে যাবে।” হযরত খলীলও (আঃ) একথাই বলেছিলেনঃ (আরবি), অর্থাৎ “অতঃপর কিয়ামতের দিন তোমাদের একে অপরকে অস্বীকার করবে।” (২৯:২৫) আর এক আয়াতে আছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “বলা হবেঃ তোমরা তোমাদের শরীকদেরকে আহবান কর।” (২৮:৬৪) এ বিষয়ের আরো বহু আয়াত কুরআন কারীমে বিদ্যমান রয়েছে। এ দিন সবাই মুসলমান ও অনুগত হয়ে যাবে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যেদিন তারা আমার নিকট আসবে সেইদিন তারা খুবই শ্রবণকারী ও দর্শনকারী হয়ে যাবে।” (১৯:৩৮) অন্য এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “হায়! তুমি যদি দেখতে! যখন অপরাধীরা তাদের প্রতিপালকের সম্মুখে অধোবদন হয়ে বলবেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা প্রত্যক্ষ করলাম ও শ্রবণ করলাম। (৩২:১২) অন্য একটি আয়াতে রয়েছেঃ “ঐ দিন। সমস্ত চেহারা চিরঞ্জীব, স্বাধিষ্ঠ বিশ্বধাতার সামনে অধোমুখী হবে।” অর্থাৎ বাধ্য ও অনুগত হবে। তাদের সমস্ত অপবাদ প্রদান দূর হয়ে যাবে। শেষ হবে সমস্ত ষড়যন্ত্র ও চাতুরী। কোন সহায় সাহায্যকারী সাহায্যের জন্যে দাঁড়াবে না।

মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আমি শাস্তির উপর শাস্তি বৃদ্ধি করবো কাফিরদের ও আল্লাহর পথে বাধাদানকারীদের; কারণ, তারা অশান্তি সৃষ্টি করতো। প্রকৃতপক্ষে তারা নিজেরাই ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছে, কিন্তু তারা বুঝে না।

এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, কাফিরদের শাস্তিরও শ্রেণী বিভাগ থাকবে, যেমন মুমিনদের পুরস্কারের শ্রেণী বিভাগ হবে। আল্লাহ তাআলা যেমন বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “প্রত্যেকের জন্যে রয়েছে দ্বিগুণ শাস্তি, কিন্তু তোমরা অবগত নও।” (৭:৩৮)

হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জাহান্নামের শাস্তির সাথে সাথেই বিষাক্ত সর্পের দংশন বৃদ্ধি পাবে। সর্পগুলি এতো বড় বড় হবে যেমন বড় বড় খেজুরের গাছ। (এটা হাফিয আবু ইয়ালা (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছেনঃ “আরশের নীচে পাঁচটি নদী রয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে জাহান্নামীদেরকে শাস্তি দেয়া হবে। দিনেও এবং রাত্রেও।”





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।