সূরা আন-নাহাল (আয়াত: 81)
হরকত ছাড়া:
والله جعل لكم مما خلق ظلالا وجعل لكم من الجبال أكنانا وجعل لكم سرابيل تقيكم الحر وسرابيل تقيكم بأسكم كذلك يتم نعمته عليكم لعلكم تسلمون ﴿٨١﴾
হরকত সহ:
وَ اللّٰهُ جَعَلَ لَکُمْ مِّمَّا خَلَقَ ظِلٰلًا وَّ جَعَلَ لَکُمْ مِّنَ الْجِبَالِ اَکْنَانًا وَّ جَعَلَ لَکُمْ سَرَابِیْلَ تَقِیْکُمُ الْحَرَّ وَ سَرَابِیْلَ تَقِیْکُمْ بَاْسَکُمْ ؕ کَذٰلِکَ یُتِمُّ نِعْمَتَهٗ عَلَیْکُمْ لَعَلَّکُمْ تُسْلِمُوْنَ ﴿۸۱﴾
উচ্চারণ: ওয়াল্লা-হু জা‘আলা লাকুম মিম্মা-খালাকা জিলা-লাওঁ ওয়া জা‘আলা লাকুম মিনাল জিবা-লি আকনা-নাওঁ ওয়া জা‘আলা লাকুম ছারা-বীলা তাকীকুমুল হাররা ওয়া ছারা-বীলা তাকীকুম বা’ছাকুম কাযা-লিকা ইউতিম্মুনি‘মাতাহূ‘আলাইকুম লা‘আল্লাকুম তুছলিমূন।
আল বায়ান: আর আল্লাহ যা সৃষ্টি করেছেন, তা থেকে তোমাদের জন্য ছায়ার ব্যবস্থা করেছেন এবং পাহাড় থেকে তোমাদের জন্য আশ্রয়স্থল বানিয়েছেন, আর ব্যবস্থা করেছেন পোশাকের, যা তোমাদেরকে গরম থেকে রক্ষা করে এবং বর্মেরও ব্যবস্থা করেছেন যা তোমাদেরকে রক্ষা করে তোমাদের যুদ্ধে। এভাবেই তিনি তোমাদের উপর তার নিআমতকে পূর্ণ করবেন, যাতে তোমরা অনুগত হও।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৮১. আর আল্লাহ যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তা থেকে(১) তিনি তোমাদের জন্য ছায়ার ব্যবস্থা করেছেন এবং তোমাদের জন্য পাহাড়ে আশ্রয়স্থল বানিয়েছেন এবং তোমাদের জন্য ব্যবস্থা করেছেন পরিধেয় বস্ত্রের; তা তোমাদেরকে তাপ থেকে রক্ষা করে(২) এবং তিনি ব্যবস্থা করেছেন তোমাদের জন্য বর্মের, তা তোমাদেরকে যুদ্ধে রক্ষা করে। এভাবেই তিনি তোমাদের প্রতি তার অনুগ্রহ পূর্ণ করেছেন(৩) যাতে তোমরা আত্মসমর্পণ কর।
তাইসীরুল ক্বুরআন: আল্লাহ যা সৃষ্টি করেছেন তাত্থেকে তোমাদের জন্য ছায়ার ব্যবস্থা করেছেন, পাহাড়-পর্বতে তোমাদের আত্মগোপনের জায়গা বানিয়েছেন। তিনি তোমাদের জন্য পোশাক দিয়েছেন যা তোমাদেরকে তাপ থেকে রক্ষা করে। আর দিয়েছেন এমন পোশাক যা তোমাদেরকে সংঘাতের সময় রক্ষা করে। এভাবে তিনি তোমাদের জন্য তাঁর নি‘মাতসমূহ পূর্ণ করেন যাতে তোমরা তাঁর প্রতি আত্মসমর্পণ কর।
আহসানুল বায়ান: (৮১) আল্লাহ যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তা হতে তিনি তোমাদের জন্য ছায়ার ব্যবস্থা করেছেন[1] এবং তোমাদের জন্য পাহাড়ে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছেন এবং তোমাদের জন্য ব্যবস্থা করেছেন পরিধেয় বস্ত্রের; যা তোমাদেরকে তাপ হতে রক্ষা করে এবং তিনি ব্যবস্থা করেছেন তোমাদের জন্য বর্মের, ওটা তোমাদের যুদ্ধে রক্ষা করে।[2] এইভাবে তিনি তোমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করেন, যাতে তোমরা আত্মসমর্পণ কর।
মুজিবুর রহমান: আর আল্লাহ যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তাতে তোমাদের জন্য ছায়ার ব্যবস্থা করেন এবং তিনি তোমাদের জন্য পাহাড়ে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন এবং তোমাদের জন্য ব্যবস্থা করেন পরিধেয় বস্ত্রের; ওটা তোমাদেরকে তাপ হতে রক্ষা করে এবং তিনি ব্যবস্থা করেন তোমাদের জন্য বর্মের, ওটা তোমাদেরকে যুদ্ধে রক্ষা করে; এভাবে তিনি তোমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করেন যাতে তোমরা আত্মসমর্পণ কর।
ফযলুর রহমান: আল্লাহ তাঁর সৃষ্ট বস্তু থেকে তোমাদের জন্য ছায়ার ব্যবস্থা করেছেন, পাহাড়ে আশ্রয়স্থল বানিয়ে দিয়েছেন, এমন পোশাক দিয়েছেন যা তোমাদেরকে তাপ থেকে রক্ষা করে, আবার এমন পোশাকও (বর্ম) দিয়েছেন যা তোমাদেরকে যুদ্ধের সময় রক্ষা করে। এভাবেই তিনি তোমাদের জন্য তাঁর নেয়ামত পূর্ণ করেছেন, যাতে তোমরা (তাঁর কাছে) আত্মসমর্পণ কর।
মুহিউদ্দিন খান: আল্লাহ তোমাদের জন্যে সৃজিত বস্তু দ্বারা ছায়া করে দিয়েছেন এবং পাহাড় সমূহে তোমাদের জন্যে আত্ন গোপনের জায়গা করেছেন এবং তোমাদের জন্যে পোশাক তৈরী করে দিয়েছেন, যা তোমাদেরকে গ্রীষ্ম এবং বিপদের সময় রক্ষা করে। এমনিভাবে তিনি তোমাদের প্রতি স্বীয় অনুগ্রহের পূর্ণতা দান করেন, যাতে তোমরা আত্নসমর্পণ কর।
জহুরুল হক: আর তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তা থেকে আল্লাহ্ তোমাদের জন্য বানিয়েছেন ছায়া, আর পাহাড়ের মধ্যে তোমাদের জন্য তিনি বানিয়েছেন আশ্রয়স্থল, আর তোমাদের জন্য তিনি ব্যবস্থা করেছেন পোশাক যা তোমাদের রক্ষা করে গরম থেকে, আর বর্ম যা তোমাদের রক্ষা করে তোমাদের যুদ্ধবিগ্রহে। এইভাবে তিনি তোমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পরিপূর্ণ করেছেন যেন তোমরা আত্মসমর্পণ করো।
Sahih International: And Allah has made for you, from that which He has created, shadows and has made for you from the mountains, shelters and has made for you garments which protect you from the heat and garments which protect you from your [enemy in] battle. Thus does He complete His favor upon you that you might submit [to Him].
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৮১. আর আল্লাহ যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তা থেকে(১) তিনি তোমাদের জন্য ছায়ার ব্যবস্থা করেছেন এবং তোমাদের জন্য পাহাড়ে আশ্রয়স্থল বানিয়েছেন এবং তোমাদের জন্য ব্যবস্থা করেছেন পরিধেয় বস্ত্রের; তা তোমাদেরকে তাপ থেকে রক্ষা করে(২) এবং তিনি ব্যবস্থা করেছেন তোমাদের জন্য বর্মের, তা তোমাদেরকে যুদ্ধে রক্ষা করে। এভাবেই তিনি তোমাদের প্রতি তার অনুগ্রহ পূর্ণ করেছেন(৩) যাতে তোমরা আত্মসমর্পণ কর।
তাফসীর:
(১) এ আয়াতে আরও কিছু নেয়ামতের বর্ণনা দিচ্ছেন। পূর্ববর্তী আয়াতে তাঁবুবাসীদের বর্ণনা চলে গেছে। কিন্তু এমনও রয়েছে যাদের কোন তাবু নেই। তাদের পাকা ঘরের ব্যবস্থাও নেই, যার ছায়ায় তারা আশ্রয় নিতে পারে, দারিদ্রতা কিংবা অন্য কোন কারণে। তখন তাকে কোন গাছ বা দেয়াল অথবা আকাশের মেঘের ছায়ায় বা অনুরূপ জানিয়ে বলছেন যে, “আর আল্লাহ যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তা থেকে তিনি তোমাদের জন্য ছায়ার ব্যবস্থা করেছেন।” কাতাদা বলেন, এর অর্থ গাছ। [ইবন কাসীর]
তবে পূর্বে উল্লেখিত সবগুলোর ছায়াই এর দ্বারা উদ্দেশ্য হতে পারে। [ফাতহুল কাদীর] তারপর মুসাফিরকে যেহেতু কখনও কখনও এমন কোন কিছুর আশ্রয় নিতে হয়, যেখানে সে অবস্থান করবে, আবার তার কাছে এমন কিছুও থাকতে হয় যা দ্বারা সে প্রচণ্ড তাপ ও খরা থেকে নিজেকে রক্ষা করবে, সেদিকে দৃষ্টি দিয়ে আল্লাহ বলেন, “আর তিনি তোমাদের জন্য পাহাড়ে আশ্রয়স্থল বানিয়েছেন”। [ফাতহুল কাদীর] পাহাড়ে তারা কিল্লা ও দূর্গ বানায় [ইবন কাসীর] অনুরূপভাবে সেখানে তাদের জন্য রয়েছে গিরিগুহাসমূহ যেখানে তারা আশ্রয় নিতে পারে। বিপদাপদ ও লোকচক্ষু থেকে আড়াল করতে পারে। [ফাতহুল কাদীর] আর তিনি “তোমাদের জন্য ব্যবস্থা করেছেন পরিধেয় বস্ত্রের; তা তোমাদেরকে তাপ থেকে রক্ষা করে এবং তিনি ব্যবস্থা করেছেন তোমাদের জন্য এমন কিছু যা তোমাদেরকে যুদ্ধে রক্ষা করে। যেমন বর্ম ও লোহার অন্যান্য যুদ্ধের কাপড়। [ইবন কাসীর]
(২) ঠাণ্ডা থেকে বাঁচাবার কথা না বলার কারণ সম্পর্কে কোন কোন মুফাসসির বলেনঃ এ সূরার শুরুতে (لَكُمْ فِيهَا دِفْءٌ) বলে পোষাকের সাহায্যে শীত থেকে আত্মরক্ষা এবং উত্তাপ হাসিল করার কথা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছিল। তাই এখানে শুধু উত্তাপ প্রতিহত করার কথা বলা হয়েছে। অথবা একটির কথা বলায় অপরটি এমনিতেই এসে যাবে এজন্য ভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়নি। অথবা, কুরআনুল কারীম আরবী ভাষায় নাযিল হয়েছে। সর্বপ্রথম এতে আরবদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে। তাই এতে আরবদের অভ্যাস ও প্রয়োজনের প্রতি লক্ষ্য রেখে বক্তব্য রাখা হয়েছে। আরব হলো গ্রীষ্মপ্রদান দেশ। সেখানে বরফ জমা ও শীতের কল্পনা করা কঠিন। তাই শুধু গ্রীষ্ম থেকে রক্ষা করার কথা বলা হয়েছে। [ফাতহুল কাদীর]
কাতাদাহ বলেন, এ সূরাকে সূরাতুন নি’আম বা নেয়ামতের সূরা বলা হয়। আতা আল-খুরাসানী বলেন, কুরআন আরবদের জ্ঞান অনুসারে নাযিল হয়েছে। তুমি কি দেখনা আল্লাহ তা'আলার বাণীর দিকে যেখানে বলা হয়েছে, “আর আল্লাহ যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তা থেকে তিনি তোমাদের জন্য ছায়ার ব্যবস্থা করেছেন এবং তোমাদের জন্য পাহাড়ে আশ্রয়স্থল বানিয়েছেন” অথচ সমতল ভূমিতে আরও বড় ও বেশী ব্যবস্থাপনা আল্লাহ করে রেখেছেন কিন্তু সেটা উল্লেখ করেন নি। কেননা, তারা ছিল পাহাড়ী জাতি। অনুরূপভাবে তুমি দেখ না আল্লাহর বাণীর দিকে যেখানে বলা হয়েছে, “আর (ব্যবস্থা করেছেন) তাদের পশম, লোম ও চুল থেকে কিছু কালের গৃহ-সামগ্রী ও ব্যবহার উপকরণ” অথচ এর বাইরে আরও যে সমস্ত সামগ্রী তিনি মানুষের জন্য রেখেছেন তা অনেক বেশী কিন্তু তারা ছিল মেষপালক, পশমের বাড়িতে অবস্থানকারী গোষ্ঠী।
তদ্রুপ তুমি কি দেখ না আল্লাহর বাণীর প্রতি, যেখানে তিনি বলেছেন, “আকাশে অবস্থিত মেঘের পাহাড়ের মধ্যস্থিত শিলাস্তুপ থেকে তিনি বর্ষণ করেন শিলা।” [সূরা আন-নূর: ৪৩] কারণ, তারা এটা নিয়ে আশ্চর্যবোধ করে। অথচ আল্লাহ যে বরফ নাযিল করেন তা আরও বড় ব্যাপারে ও অধিকহারেই। কিন্তু তারা সেটা জানত না। সেরকমই তুমি দেখবে আল্লাহর বাণীর প্রতি লক্ষ্য করলে, যেখানে বলা হয়েছে, “এবং তোমাদের জন্য ব্যবস্থা করেছেন পরিধেয় বস্ত্রের; তা তোমাদেরকে তাপ থেকে রক্ষা করে” অথচ ঠাণ্ডার ব্যাপারে তার ব্যবস্থাপনা আরও বড় ও বেশী। কিন্তু তারা যেহেতু গরম এলাকার লোক, তাই তাদের কাছে গরমটাই উল্লেখ করা হয়েছে। [ইবন কাসীর]
(৩) নিয়ামত পূর্ণ বা সম্পূর্ণ করার মানে হচ্ছে এই যে, মহান আল্লাহ জীবনের প্রতিটি বিভাগে মানুষের যাবতীয় প্রয়োজনের চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন এবং তারপর একটি প্রয়োজন পূর্ণ করার ব্যবস্থা করেন। তিনি সম্পূর্ণ তার রহমতের কারণে এখানে সেখানে মানুষের উপর তার নেয়ামত দিয়েই যাচ্ছেন। এভাবে তিনি তার দয়া ও অনুগ্রহে দুনিয়া ও আখেরাতে বান্দার যাবতীয় প্রয়োজন পূরণ করবেন। [ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৮১) আল্লাহ যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তা হতে তিনি তোমাদের জন্য ছায়ার ব্যবস্থা করেছেন[1] এবং তোমাদের জন্য পাহাড়ে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছেন এবং তোমাদের জন্য ব্যবস্থা করেছেন পরিধেয় বস্ত্রের; যা তোমাদেরকে তাপ হতে রক্ষা করে এবং তিনি ব্যবস্থা করেছেন তোমাদের জন্য বর্মের, ওটা তোমাদের যুদ্ধে রক্ষা করে।[2] এইভাবে তিনি তোমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করেন, যাতে তোমরা আত্মসমর্পণ কর।
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, গাছ সৃষ্টি করেছেন; যার থেকে ছায়া পাওয়া যায়।
[2] অর্থাৎ, উল ও সুতোর পোশাক যা সাধারণতঃ ব্যবহার করা হয় এবং লোহার বর্ম, শিরস্ত্রাণ; যা যুদ্ধে পরা হয়।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৮০-৮৩ নং আয়াতের তাফসীর:
অত্র আয়াতগুলোতে চতুষ্পদ জন্তুসহ যে সকল সৃষ্টির মাঝে মানুষের কল্যাণ নিহিত রেখেছেন তার কয়েকটির বর্ণনা দেয়া হয়েছে। মানুষের গৃহগুলোকে আশ্রয়স্থল বানিয়ে দিয়েছেন। গৃহে রাত্রি যাপন, গরম ও ঠাণ্ডার সময় আশ্রয় গ্রহণ করে থাকে। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যতত্নসহকারে রাখা হয়। ظَعْنِ অর্থ সফরে থাকা, অর্থাৎ সফরে ও বাড়িতে অবস্থানকালে চতুষ্পদ জন্তুর চামড়ার তাঁবু বানিয়ে ঘর তৈরি করে থাকতে পার, সফরে নিয়ে যাওয়ার সময় বহন করা হালকা হয়।
أَصْوَافِ শব্দটি صوف এর বহুবচন, এটি ভেড়ার লোমকে বুঝায়, وَأَوْبٰرِ শব্দটি وبر এর বহুবচন, উটের লোমকে বুঝায়, أَشْعَارِ শব্দটি شعر এর বহুবচন যা দুম্বা-ছাগলের লোমকে বুঝায়।
আল্লাহ তা‘আলার সৃষ্টির অন্যতম হল গাছ, প্রচণ্ড রৌদ্রের মধ্যে পথ চলা কালে পথিমধ্যে বিশ্রামের সময় গাছের ছায়ার গুরুত্ব বুঝা যায়। এছাড়াও অন্যান্য বস্তুর ছায়া মানুষ প্রয়োজনানুপাতে গ্রহণ করে থাকে। أَكْنَانًا অর্থ গুহা, অর্থাৎ পাহাড়ে গুহা সৃষ্টি করেছেন যাতে গরমের দিন ঠাণ্ডা আর শীতের দিন গরম গ্রহণ করতে পারে এবং ঝড়-তুফানে আশ্রয় নিতে পারে। যেমন বনী ইসরাঈলের সে তিন ব্যক্তি যারা ঝড়ের কবলে পড়ে গুহায় আশ্রয় নিয়েছিল। একটি পাথর এসে গুহার মুখে পড়ে ফলে দুনিয়ার সাথে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। (সহীহ বুখারী হা: ২৩৩৩)
(تَقِيْكُمْ بَأْسَكُمْ)
অর্থাৎ পশম ও তুলার জামা যা মানুষকে গরম ও ঠাণ্ডা থেকে রক্ষা করে। আর এমন কতক পোশাক রয়েছে যা মানুষকে যুদ্ধের ময়দানে শত্র“র আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। যেমন লৌহ বর্ম, হেলমেট ইত্যাদি।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وَعَلَّمْنٰهُ صَنْعَةَ لَبُوْسٍ لَّكُمْ لِتُحْصِنَكُمْ مِّنْۭ بَأْسِكُمْ ج فَهَلْ أَنْتُمْ شٰكِرُوْنَ)
“আর আমি তাকে তোমাদের জন্য বর্ম নির্মাণ শিক্ষা দিয়েছিলাম, যাতে তা তোমাদের যুদ্ধে তোমাদেরকে রক্ষা করে; সুতরাং তোমরা কি কৃতজ্ঞ হবে না?” (সূরা আম্বিয়া ২১:৮০)
মানুষকে আল্লাহ তা‘আলা এভাবে নেয়ামত দান করে থাকেন যাতে তারা আল্লাহ তা‘আলার কাছে আত্মসমর্পণ করে। কারণ দাতার কাছে গ্রহীতা সর্বদা কৃতজ্ঞ ও নমনীয় হয়ে থাকে।
আল্লাহ তা‘আলার এসব নেয়ামত পাওয়ার পরেও যদি মানুষ ঈমান না আনে, বরং ঈমান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে তাদের জেনে রাখা উচিত রাসূলদের দায়িত্ব কেবল পৌঁছে দেয়া, কারো ওপর জবরদস্তি করে ঈমান আনতে বাধ্য করা নয়।
(يَعْرِفُوْنَ نِعْمَتَ اللّٰهِ)
অর্থাৎ কাফির-মুশরিকরা চিনে এসব আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামত, কিন্তু তারপরেও তারা অস্বীকার করে। যেমন মক্কার মুশরিকরা স্বীকার করত আকাশ থেকে বৃষ্টি দেয় আল্লাহ তা‘আলা, হায়াত-মউত ও রিযিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা; কিন্তু তারপরেও তারা আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করতো না। মুজাহিদ বলেন: এর অর্থ হল যেমন মানুষ বলে: এগুলো আমার সম্পদ, আমার বাপ-দাদাদের থেকে ওয়ারিশ সূত্রে পেয়েছি। আওন বিন আব্দুল্লাহ বলেন- অমুকরা না থাকলে এসব সম্পদ পেতাম না। অনুরূপ সমুদ্রের ঢেউ যখন উত্তাল হয়ে ওঠে আর মানুষ আল্লাহ তা‘আলাকে একাগ্র চিত্তে আহ্বান করে, কিন্তু যখন তা থেকে মুক্তি পায় তখন বলে: মাঝি ভাল ছিল বলে বেঁচে গেলাম। অনুরূপভাবে বৃষ্টি পাওয়ার পর একশ্রেণির মানুষ বলে: অমুক তারকার কারণে বৃষ্টি পেয়েছি, অমুক তারকার কারণে বৃষ্টি হয়েছে। এসব কথা ও কাজ আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামতকে অস্বীকার করা এবং তাঁর সাথে কুফরী করার শামিল। যে ব্যক্তি অন্তর ও মুখ দিয়ে এসব নেয়ামতকে অস্বীকার করবে সে কাফির হয়ে যাবে। কেননা শুকরিয়া আদায় করা ঈমানের মাথা যা তিনটি রুকনের ওপর প্রতিষ্ঠিত
১. আল্লাহ তা‘আলা প্রদত্ত সকল নেয়ামত অন্তরে স্বীকার করা। ২. মুখে বলা এবং আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করা। ৩. আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত ও আনুগত্যের ক্ষেত্রে তা কাজে লাগানো। সুতরাং মানুষের উচিত আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামতকে স্বীকার করে ইবাদত ও আনুগত্যমূলক কাজে ব্যবহার করা।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. চতুষ্পদ জন্তুসহ অন্যান্য সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহ তা‘আলা অনেক উপকার নিহিত রেখেছেন।
২. এসব নেয়ামত দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার উদ্দেশ্য হল যাতে মানুষ তার কাছে আত্মসমর্পণ করে।
৩. নেয়ামতকে আল্লাহ তা‘আলার দিকে সম্পৃক্ত না করে অন্যের দিকে সম্পৃক্ত করা শিরক ও নেয়ামতকে অস্বীকার করা হয়।
৪. ঈমান ও ইসলাম গ্রহণ করতে কাউকে জবরদস্তি করা ইসলামের বিধান নয়।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৮০-৮৩ নং আয়াতের তাফসীর
মহামহিমান্বিত আল্লাহ তাঁর আরো অসংখ্য ইহসান, ইনআম ও নিয়ামতের বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনিই আদম সন্তানের বসবাসের এবং আরাম ও শান্তি লাভ করার জন্যে ঘর-বাড়ির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। অনুরূপভাবে চতুষ্পদ জন্তুর চামড়ার তাঁবু, ডেরা ইত্যাদি তাদেরকে দান করেছেন। এগুলো তাদের সফরের সময় কাজে লাগে। এগুলো বহন করাও সহজ এবং কোন জায়গায় অবস্থানকালে খাটানোও সহজ। তারপর বকরীর লোম, উঁটের কেশ এবং মেষ ও দুম্বার পশম ব্যবসায়ের মাল হিসেবে তিনি বানিয়ে দিয়েছেন। এগুলো দ্বারা বাড়ীর আসবাবপত্রও তৈরী হয়। যেমন এগুলো দ্বারা কাপড়ও বয়ন করা হয়। এবং বিছানাও তৈরী করা হয়, আবার ব্যবসার ক্ষেত্রে ব্যবসার মালও বটে। এগুলো বড়ই উপকারী জিনিস এবং একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মানুষ এগুলো দ্বারা উপকার লাভ করে থাকে।
এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ “আল্লাহ তোমাদের উপকার ও আরামের জন্য গাছের ছায়া দান করেছেন। তোমাদের উপকারার্থে তিনি পাহাড়ের উপর গুহা, দুর্গ ইত্যাদির ব্যবস্থা করেছেন যাতে তোমরা তাতে আশ্রয় গ্রহণ করতে পার এবং মাথা গুজবার ব্যবস্থা করে নিতে পারে। তিনি তোমাদেরকে দান। করেছেন সূতী ও পশমী কাপড়, যেন তোমরা তা পরিধান করে শীত ও গরম। হতে রক্ষা পাওয়ার সাথে সাথে নিজেদের গুপ্তস্থান আবৃত কর এবং দেহের শোভাবর্ধনে সমর্থ হতে পার। তিনি তোমাদেরকে দান করেছেন লৌহবর্ম, যা শত্রুদের আক্রমণ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে তোমাদের কাজে লাগে। এভাবে তিনি তোমাদেরকে তোমাদের প্রয়োজনের পুরোপুরি জিনিস নিয়ামত স্বরূপ দিতে রয়েছেন, যেন তোমরা আরাম ও শান্তি পাও এবং প্রশান্তির সাথে নিজেদের প্রকৃত নিয়ামত দাতার ইবাদতে লেগে থাকো।”
(আরবি) এর দ্বিতীয় পঠন (আরবি) এরূপও রয়েছে অর্থাৎ, তোমরা শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ কর। আর প্রথম কিরআতের অর্থ হচ্ছেঃ যাতে অনুগত হও ও আত্মসমর্পণ কর। এই সূরার আর একটি নাম ‘সূরাতুন নিআ’মও রয়েছে। অর্থাৎ নিয়ামত সমূহের সূরা। (আরবি) এর (আরবি) কে যবর দিয়ে পড়লে আর একটি অর্থ হবেঃ “তিনি তোমাদেরকে যুদ্ধ ক্ষেত্রে কাজে লাগে এরূপ জিনিস দান করেছেন, যেন তোমরা শত্রুদের আক্রমণ থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পার।” জঙ্গল ও মরুপ্রান্তরও আল্লাহর একটি বড় নিয়ামত, কিন্তু এখানে পাহাড়ের নিয়ামতের বর্ণনা দেয়ার কারণ এই যে, যাদের সাথে কথা বলা হচ্ছে তারা ছিল পাহাড়ের অধিবাসী। কাজেই তাদের অবগতি অনুযায়ী তাদের সাথে। কথা বলা হচ্ছে। অনুরূপভাবে মেষ, বকরী ও উট ছিল তাদের প্রধান জীবনোপকরণ। তাই, মহান আল্লাহ তাদেরকে এই নিয়ামতের কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। অথচ এর চেয়ে আরো অনেক বড় বড় অসংখ্য নিয়ামত মাখলুকের হাতে রয়েছে। আর এই একই কারণে শীত-গ্রীষ্ম হতে রক্ষা পাওয়ার উপকরণরূপ নিয়ামতের কথা বলেছেন, অথচ এর চেয়ে আরো বড় নিয়ামত বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু এটা তাদের সামনে রয়েছে এবং তাদের জানা জিনিস। তারা ছিল যুদ্ধপ্রিয় জাতি। তাই, যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর আক্রমণ হতে রক্ষা পাওয়ার যে উপকরণ রয়েছে, সেই নিয়ামতের কথা তাদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। অথচ এর চেয়ে বহু বড় বড় নিয়ামত মানুষের অধিকারে রয়েছে। যেহেতু ওটা ছিল গরম দেশ, সেহেতু তাদেরকে বলা হয়েছেঃ “তিনি তোমাদের জন্যে ব্যবস্থা করেন পরিধেয় বস্ত্রের; ওটা তোমাদেরকে তাপ হতে রক্ষা করে। কিন্তু এর চেয়ে বহুগুণ উত্তম আরো বহু নিয়ামত কি এই প্রকৃত নিয়ামত দাতা আল্লাহ তাআলার নিকট বিদ্যমান নেই? অবশ্যই আছে। এ কারণেই এ সব নিয়ামত ও রহমত প্রকাশ করার পরেই স্বীয় নবীকে (সঃ) সম্বোধন করে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! এখনো যদি এরা আমার ইবাদত, তাওহীদ এবং অসংখ্য নিয়ামতের কথা স্বীকার না করে বরং মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে এতে তোমার কি আসে যায়? তুমি তাদেরকে তাদের কাজের উপর ছেড়ে দাও। তুমি তো শুধু প্রচারক মাত্র। সুতরাং তুমি তোমার কার্য চালিয়ে যাও।
মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “তারা তো নিজেরাই জানে যে, একমাত্র আল্লাহ তাআলাই হচ্ছেন নিয়ামতরাজি দানকারী। কিন্তু এটা জানা সত্ত্বেও তারা এগুলি অস্বীকার করছে এবং তার সাথে অন্যদের ইবাদত করছে। এমন কি তারা তাঁর নিয়ামতের সম্পর্ক অন্যদের প্রতি আরোপ করছে। তারা মনে করছে যে, সাহায্যকারী অমুক, আহার্যদাতা অমুক। তাদের অধিকাংশই কাফির। তারা হচ্ছে আল্লাহর অকৃতজ্ঞ বান্দা।
হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন বেদুঈন রাসূলুল্লাহর (সঃ) কাছে আগমন করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার সামনে (আরবি) এই আয়াতটি পাঠ করেন। অর্থাৎ “আল্লাহ তোমাদের গৃহকে করেন তোমাদের আবাস স্থল।” বেদুঈন বলেঃ “হাঁ, (এটা সত্য)।” তারপর তিনি পাঠ করেনঃ “তিনি তোমাদের জন্যে পশু চর্মের ব্যবস্থা করেন। সে বলেঃ “হাঁ, (এটাও সত্য)।” এইভাবে তিনি আয়াতগুলি পাঠ করতে থাকেন এবং সে প্রত্যেক নিয়ামতেরই স্বীকারোক্তি করে। শেষে তিনি পাঠ করেনঃ “যাতে তোমরা মুসলমান ও অনুগত হয়ে যাও।” সে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে চলে যায়। এ সময় আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করেনঃ “তারা আল্লাহর অনুগ্রহ জ্ঞাত আছে; কিন্তু সেগুলি তারা অস্বীকার করে এবং তাদের অধিকাংশই কাফির।” (এটা ইবনু আবি হাতিম (রাঃ) বর্ণনা করেছেন)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।