আল কুরআন


সূরা আন-নাহাল (আয়াত: 80)

সূরা আন-নাহাল (আয়াত: 80)



হরকত ছাড়া:

والله جعل لكم من بيوتكم سكنا وجعل لكم من جلود الأنعام بيوتا تستخفونها يوم ظعنكم ويوم إقامتكم ومن أصوافها وأوبارها وأشعارها أثاثا ومتاعا إلى حين ﴿٨٠﴾




হরকত সহ:

وَ اللّٰهُ جَعَلَ لَکُمْ مِّنْۢ بُیُوْتِکُمْ سَکَنًا وَّ جَعَلَ لَکُمْ مِّنْ جُلُوْدِ الْاَنْعَامِ بُیُوْتًا تَسْتَخِفُّوْنَهَا یَوْمَ ظَعْنِکُمْ وَ یَوْمَ اِقَامَتِکُمْ ۙ وَ مِنْ اَصْوَافِهَا وَ اَوْبَارِهَا وَ اَشْعَارِهَاۤ اَثَاثًا وَّ مَتَاعًا اِلٰی حِیْنٍ ﴿۸۰﴾




উচ্চারণ: ওয়াল্লা-হু জা‘আলা লাকুম মিমবুইউতিকুম ছাকানাওঁ ওয়া জা‘আলা লাকুম মিন জূলূদিল আন‘আ-মি বুইঊতান তাছতাখিফফূনাহা-ইয়াওমা জা‘নিকুম ওয়া ইয়াওমা ইকা-মাতিকুম ওয়া মিন আসওয়া-ফিহা-ওয়া আওবা-রিহা-ওয়া আশ‘আ-রিহাআছা-ছাওঁ ওয়া মাতা‘আন ইলা-হীন।




আল বায়ান: আর আল্লাহ তোমাদের ঘরগুলোকে তোমাদের জন্য আবাস করেছেন এবং তোমাদের পশুর চামড়া দিয়ে তাবুর ব্যবস্থা করেছেন, যা খুব সহজেই তোমরা সফরকালে ও অবস্থানকালে বহন করতে পার। আর তাদের পশম, তাদের লোম ও তাদের চুল দ্বারা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য গৃহসামগ্রী ও ভোগ-উপকরণ (তৈরি করেছেন)।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৮০. আর আল্লাহ তোমাদের ঘরসমূহকে করেছেন তোমাদের জন্য আবাসস্থল(১) এবং তিনি তোমাদের জন্য পশুর চামড়ার ঘর তাঁবুর ব্যবস্থা করেছেন, তোমরা সেটাকে সহজ মনে করে থাক তোমাদের ভ্রমণকালে এবং অবস্থানকালে।(২) আর (ব্যবস্থা করেছেন) তাদের পশম, লোম ও চুল থেকে কিছু কালের গৃহ-সামগ্রী ও ব্যবহার-উপকরণ।(৩)




তাইসীরুল ক্বুরআন: আল্লাহ তোমাদের গৃহগুলোকে তোমাদের আরাম শান্তির জায়গা বানিয়ে দিয়েছেন। তিনি পশুর চামড়া থেকে তোমাদের জন্য এমন গৃহের ব্যবস্থা করেছেন যা তোমরা হালকাবোধ কর তোমাদের ভ্রমণকালে কিংবা অবস্থানকালে। তিনি ওগুলোর পশম, লোম আর চুল থেকে তোমাদের পরিধেয় ও ব্যবহার্য সামগ্রীর ব্যবস্থা করেছেন যা তোমরা কিছুকাল পর্যন্ত কাজে লাগাও।




আহসানুল বায়ান: (৮০) আল্লাহ তোমাদের গৃহকে করেছেন তোমাদের আবাসস্থল এবং তিনি তোমাদের জন্য পশু-চর্মের তাঁবুর ব্যবস্থা করেছেন; যা তোমরা ভ্রমণকালে ও অবস্থানকালে সহজে বহন করে থাক।[1] আর তিনি তোমাদের জন্য ব্যবস্থা করেছেন ওদের পশম, লোম ও কেশ হতে কিছু কালের গৃহসামগ্রী ও ব্যবহার্য উপকরণ।[2]



মুজিবুর রহমান: এবং আল্লাহ তোমাদের গৃহকে করেন তোমাদের আবাসস্থল, আর তিনি তোমাদের জন্য পশুচর্মের তাবুর ব্যবস্থা করেন; ওটা বহনকালে (তোমাদের ভ্রমণকালে) এবং ওতে অবস্থানকালে তোমরা তা সহজে বহন করতে পার। তিনি তোমাদের জন্য ব্যবস্থা করেন ওদের পশম, লোম ও কেশ হতে কিছু কালের জন্য গৃহ সামগ্রী ও ব্যবহার উপকরণ।



ফযলুর রহমান: আল্লাহ তোমাদের জন্য তোমাদের ঘরে বসবাসের ব্যবস্থা করেছেন। তিনি তোমাদের জন্য পশুর চামড়া থেকে ঘর (তাঁবু) তৈরির ব্যবস্থা করেছেন— যা তোমরা ভ্রমণকালে ও কোথাও অবস্থানকালে হালকা (সহজে বহনযোগ্য) পাচ্ছ— এবং তার পশম, লোম ও চুল থেকে আসবাবপত্র ও কিছুকালের জন্য ভোগ্যসামগ্রী তৈরির ব্যবস্থা করেছেন।



মুহিউদ্দিন খান: আল্লাহ করে দিয়েছেন তোমাদের গৃহকে অবস্থানের জায়গা এবং চতুস্পদ জন্তুর চামড়া দ্বারা করেছেন তোমার জন্যে তাঁবুর ব্যবস্থা। তোমরা এগুলোকে সফরকালে ও অবস্থান কালে পাও। ভেড়ার পশম, উটের বাবরি চুল ও ছাগলের লোম দ্বারা কত আসবাবপত্র ও ব্যবহারের সামগ্রী তৈরী করেছেন এক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত।



জহুরুল হক: আর আল্লাহ্ তোমাদের বাড়িঘরে তোমাদের জন্য আবাসস্থল বানিয়েছেন, আর গবাদি-পশুর চামড়া থেকে তোমাদের জন্য ঘর বানিয়েছেন যা তোমাদের যাত্রার দিনে তোমরা হালকা বোধ কর, আর তোমাদের অবস্থানের দিনেও, আর তাদের পশম ও তাদের লোমশ চামড়া ও তাদের চুল থেকে রয়েছে গৃহস্থালী-বস্তু ও কিছুকালের জন্য উপভোগ-সামগ্রী।



Sahih International: And Allah has made for you from your homes a place of rest and made for you from the hides of the animals tents which you find light on your day of travel and your day of encampment; and from their wool, fur and hair is furnishing and enjoyment for a time.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৮০. আর আল্লাহ তোমাদের ঘরসমূহকে করেছেন তোমাদের জন্য আবাসস্থল(১) এবং তিনি তোমাদের জন্য পশুর চামড়ার ঘর তাঁবুর ব্যবস্থা করেছেন, তোমরা সেটাকে সহজ মনে করে থাক তোমাদের ভ্রমণকালে এবং অবস্থানকালে।(২) আর (ব্যবস্থা করেছেন) তাদের পশম, লোম ও চুল থেকে কিছু কালের গৃহ-সামগ্রী ও ব্যবহার-উপকরণ।(৩)


তাফসীর:

(১) এখানেও আল্লাহ তা'আলা তার নেয়ামতের কিছু বর্ণনা দিচ্ছেন। [ফাতহুল কাদীর] তিনি তার বান্দাদের উপর যে নেয়ামত দান করেছেন, তন্মধ্যে একটি হচ্ছে, তিনি তাদের জন্য ঘরের ব্যবস্থা করেছেন, যেখানে তারা বসবাস করে, আশ্রয় গ্রহণ করে, নিজেদেরকে অপরের কাছ থেকে গোপন রাখতে সমর্থ হয়, যত প্রকারের উপকার লাভ করা যায় এর মাধ্যমেই তাই তারা গ্রহণ করে। এ ঘর ছাড়াও তিনি তাদের জন্য চতুস্পদ জন্তুর মধ্য থেকে চামড়ার ঘরেরও ব্যবস্থা করেছেন। (অর্থাৎ পশুচর্মের তাঁবু। আরবে এর ব্যাপক প্রচলন রয়েছে।)

এগুলোকে তোমরা সফর অবস্থায় বহন করা তোমাদের জন্য হাল্কা বোধ করে থাক। এগুলোকে তোমরা তোমাদের সফরে ও স্থায়ী অবস্থানস্থলে ব্যবহার করতে পার। [ইবন কাসীর] তাছাড়া তিনি তোমাদের জন্য ভেড়ার পশম, উটের লোম ও ছাগলের চুলেরও ব্যবস্থা করেছেন। যা তোমাদের সম্পদ ও উপভোগ্য বিষয় হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে। ঘরের আসবাব ও কাপড় হয়েছে। ব্যবসায়ী সম্পদ হয়েছে। সুনির্দিষ্ট দিন পর্যন্ত তোমরা এগুলো ভোগ করতে পার। [ইবন কাসীর] অর্থাৎ তোমাদের প্রয়োজন পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত, অথবা পুরনো হয়ে যাওয়া পর্যন্ত অথবা আমৃত্যু বা কিয়ামত পর্যন্ত তোমরা এগুলো ভোগ করতে পার। [ফাতহুল কাদীর]


(২) অর্থাৎ যখন কোথাও রওয়ানা হয়ে যেতে চাও তখন তাকে সহজে গুটিয়ে ভাঁজ করে নিয়ে বহন করতে পারে। আবার যখন কোথাও অবস্থান করতে চাও তখন অতি সহজেই ভাঁজ খুলে খাটিয়ে ঘর বানিয়ে ফেলতে পারো [ফাতহুল কাদীর]


(৩) এ আয়াত থেকে প্রমাণিত হলো যে, জীব-জন্তুর চামড়া, লোম ও পশম ব্যবহার করা মানুষের জন্য হালাল। এতে জন্তুটি যবেহকৃত হওয়া অথবা মৃত হওয়ারও কোন শর্ত নেই। এমনিভাবে যে জন্তুর পশম বা চামড়া আহরণ করা হবে, সেটির গোশত হালাল কি হারাম সেটা বিচার করারও কোন শর্ত নেই। সব রকম জন্তুর চামড়াই লবণ দিয়ে শুকানোর পর ব্যবহার করা হালাল। লোম ও পশমের উপর জন্তুর মৃত্যুর কোন প্রভাবই পড়ে না। তাই সেটি যথারীতি শুকিয়ে ব্যবহারোপযোগী করে নিলেই তা পাক হয়ে যায় এবং সেটি ব্যবহার করা হালাল ও জায়েয হয়ে যায়। তবে শূকরের চামড়া ও যাবতীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও লোম-পশম অপবিত্র ও ব্যবহারের অযোগ্য। [কুরতুবী]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৮০) আল্লাহ তোমাদের গৃহকে করেছেন তোমাদের আবাসস্থল এবং তিনি তোমাদের জন্য পশু-চর্মের তাঁবুর ব্যবস্থা করেছেন; যা তোমরা ভ্রমণকালে ও অবস্থানকালে সহজে বহন করে থাক।[1] আর তিনি তোমাদের জন্য ব্যবস্থা করেছেন ওদের পশম, লোম ও কেশ হতে কিছু কালের গৃহসামগ্রী ও ব্যবহার্য উপকরণ।[2]


তাফসীর:

[1] অর্থাৎ চামড়ার তৈরী তাঁবু যা তোমরা সফরে সহজেই বহন করতে পারো এবং প্রয়োজনমত তাকে ব্যবহার করে ঠান্ডা ও গরম হতে নিজেদেরকে রক্ষা কর।

[2] أصواف শব্দটি صوف এর বহুবচন, ভেড়ার লোমকে বুঝায়, أوبار শব্দটি وبر এর বহুবচন, উটের পশম أشعار শব্দটি شعر এর বহুবচন দুম্বা-ছাগলের লোমকে বুঝায়। এ সব দ্বারা বিভিন্ন জিনিস তৈরী হয়। যার দ্বারা মানুষ উপার্জন করে ও এক নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত উপকৃতও হয়।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৮০-৮৩ নং আয়াতের তাফসীর:



অত্র আয়াতগুলোতে চতুষ্পদ জন্তুসহ যে সকল সৃষ্টির মাঝে মানুষের কল্যাণ নিহিত রেখেছেন তার কয়েকটির বর্ণনা দেয়া হয়েছে। মানুষের গৃহগুলোকে আশ্রয়স্থল বানিয়ে দিয়েছেন। গৃহে রাত্রি যাপন, গরম ও ঠাণ্ডার সময় আশ্রয় গ্রহণ করে থাকে। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যতত্নসহকারে রাখা হয়। ظَعْنِ অর্থ সফরে থাকা, অর্থাৎ সফরে ও বাড়িতে অবস্থানকালে চতুষ্পদ জন্তুর চামড়ার তাঁবু বানিয়ে ঘর তৈরি করে থাকতে পার, সফরে নিয়ে যাওয়ার সময় বহন করা হালকা হয়।



أَصْوَافِ শব্দটি صوف এর বহুবচন, এটি ভেড়ার লোমকে বুঝায়, وَأَوْبٰرِ শব্দটি وبر এর বহুবচন, উটের লোমকে বুঝায়, أَشْعَارِ শব্দটি شعر এর বহুবচন যা দুম্বা-ছাগলের লোমকে বুঝায়।



আল্লাহ তা‘আলার সৃষ্টির অন্যতম হল গাছ, প্রচণ্ড রৌদ্রের মধ্যে পথ চলা কালে পথিমধ্যে বিশ্রামের সময় গাছের ছায়ার গুরুত্ব বুঝা যায়। এছাড়াও অন্যান্য বস্তুর ছায়া মানুষ প্রয়োজনানুপাতে গ্রহণ করে থাকে। أَكْنَانًا অর্থ গুহা, অর্থাৎ পাহাড়ে গুহা সৃষ্টি করেছেন যাতে গরমের দিন ঠাণ্ডা আর শীতের দিন গরম গ্রহণ করতে পারে এবং ঝড়-তুফানে আশ্রয় নিতে পারে। যেমন বনী ইসরাঈলের সে তিন ব্যক্তি যারা ঝড়ের কবলে পড়ে গুহায় আশ্রয় নিয়েছিল। একটি পাথর এসে গুহার মুখে পড়ে ফলে দুনিয়ার সাথে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। (সহীহ বুখারী হা: ২৩৩৩)



(تَقِيْكُمْ بَأْسَكُمْ)



অর্থাৎ পশম ও তুলার জামা যা মানুষকে গরম ও ঠাণ্ডা থেকে রক্ষা করে। আর এমন কতক পোশাক রয়েছে যা মানুষকে যুদ্ধের ময়দানে শত্র“র আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। যেমন লৌহ বর্ম, হেলমেট ইত্যাদি।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



وَعَلَّمْنٰهُ صَنْعَةَ لَبُوْسٍ لَّكُمْ لِتُحْصِنَكُمْ مِّنْۭ بَأْسِكُمْ ج فَهَلْ أَنْتُمْ شٰكِرُوْنَ)‏



“আর আমি তাকে তোমাদের জন্য বর্ম নির্মাণ শিক্ষা দিয়েছিলাম, যাতে তা তোমাদের যুদ্ধে তোমাদেরকে রক্ষা করে; সুতরাং তোমরা কি কৃতজ্ঞ হবে না?” (সূরা আম্বিয়া ২১:৮০)



মানুষকে আল্লাহ তা‘আলা এভাবে নেয়ামত দান করে থাকেন যাতে তারা আল্লাহ তা‘আলার কাছে আত্মসমর্পণ করে। কারণ দাতার কাছে গ্রহীতা সর্বদা কৃতজ্ঞ ও নমনীয় হয়ে থাকে।



আল্লাহ তা‘আলার এসব নেয়ামত পাওয়ার পরেও যদি মানুষ ঈমান না আনে, বরং ঈমান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে তাদের জেনে রাখা উচিত রাসূলদের দায়িত্ব কেবল পৌঁছে দেয়া, কারো ওপর জবরদস্তি করে ঈমান আনতে বাধ্য করা নয়।



(يَعْرِفُوْنَ نِعْمَتَ اللّٰهِ)



অর্থাৎ কাফির-মুশরিকরা চিনে এসব আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামত, কিন্তু তারপরেও তারা অস্বীকার করে। যেমন মক্কার মুশরিকরা স্বীকার করত আকাশ থেকে বৃষ্টি দেয় আল্লাহ তা‘আলা, হায়াত-মউত ও রিযিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা; কিন্তু তারপরেও তারা আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করতো না। মুজাহিদ বলেন: এর অর্থ হল যেমন মানুষ বলে: এগুলো আমার সম্পদ, আমার বাপ-দাদাদের থেকে ওয়ারিশ সূত্রে পেয়েছি। আওন বিন আব্দুল্লাহ বলেন- অমুকরা না থাকলে এসব সম্পদ পেতাম না। অনুরূপ সমুদ্রের ঢেউ যখন উত্তাল হয়ে ওঠে আর মানুষ আল্লাহ তা‘আলাকে একাগ্র চিত্তে আহ্বান করে, কিন্তু যখন তা থেকে মুক্তি পায় তখন বলে: মাঝি ভাল ছিল বলে বেঁচে গেলাম। অনুরূপভাবে বৃষ্টি পাওয়ার পর একশ্রেণির মানুষ বলে: অমুক তারকার কারণে বৃষ্টি পেয়েছি, অমুক তারকার কারণে বৃষ্টি হয়েছে। এসব কথা ও কাজ আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামতকে অস্বীকার করা এবং তাঁর সাথে কুফরী করার শামিল। যে ব্যক্তি অন্তর ও মুখ দিয়ে এসব নেয়ামতকে অস্বীকার করবে সে কাফির হয়ে যাবে। কেননা শুকরিয়া আদায় করা ঈমানের মাথা যা তিনটি রুকনের ওপর প্রতিষ্ঠিত



১. আল্লাহ তা‘আলা প্রদত্ত সকল নেয়ামত অন্তরে স্বীকার করা। ২. মুখে বলা এবং আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করা। ৩. আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত ও আনুগত্যের ক্ষেত্রে তা কাজে লাগানো। সুতরাং মানুষের উচিত আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামতকে স্বীকার করে ইবাদত ও আনুগত্যমূলক কাজে ব্যবহার করা।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. চতুষ্পদ জন্তুসহ অন্যান্য সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহ তা‘আলা অনেক উপকার নিহিত রেখেছেন।

২. এসব নেয়ামত দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার উদ্দেশ্য হল যাতে মানুষ তার কাছে আত্মসমর্পণ করে।

৩. নেয়ামতকে আল্লাহ তা‘আলার দিকে সম্পৃক্ত না করে অন্যের দিকে সম্পৃক্ত করা শিরক ও নেয়ামতকে অস্বীকার করা হয়।

৪. ঈমান ও ইসলাম গ্রহণ করতে কাউকে জবরদস্তি করা ইসলামের বিধান নয়।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৮০-৮৩ নং আয়াতের তাফসীর

মহামহিমান্বিত আল্লাহ তাঁর আরো অসংখ্য ইহসান, ইনআম ও নিয়ামতের বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনিই আদম সন্তানের বসবাসের এবং আরাম ও শান্তি লাভ করার জন্যে ঘর-বাড়ির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। অনুরূপভাবে চতুষ্পদ জন্তুর চামড়ার তাঁবু, ডেরা ইত্যাদি তাদেরকে দান করেছেন। এগুলো তাদের সফরের সময় কাজে লাগে। এগুলো বহন করাও সহজ এবং কোন জায়গায় অবস্থানকালে খাটানোও সহজ। তারপর বকরীর লোম, উঁটের কেশ এবং মেষ ও দুম্বার পশম ব্যবসায়ের মাল হিসেবে তিনি বানিয়ে দিয়েছেন। এগুলো দ্বারা বাড়ীর আসবাবপত্রও তৈরী হয়। যেমন এগুলো দ্বারা কাপড়ও বয়ন করা হয়। এবং বিছানাও তৈরী করা হয়, আবার ব্যবসার ক্ষেত্রে ব্যবসার মালও বটে। এগুলো বড়ই উপকারী জিনিস এবং একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মানুষ এগুলো দ্বারা উপকার লাভ করে থাকে।

এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ “আল্লাহ তোমাদের উপকার ও আরামের জন্য গাছের ছায়া দান করেছেন। তোমাদের উপকারার্থে তিনি পাহাড়ের উপর গুহা, দুর্গ ইত্যাদির ব্যবস্থা করেছেন যাতে তোমরা তাতে আশ্রয় গ্রহণ করতে পার এবং মাথা গুজবার ব্যবস্থা করে নিতে পারে। তিনি তোমাদেরকে দান। করেছেন সূতী ও পশমী কাপড়, যেন তোমরা তা পরিধান করে শীত ও গরম। হতে রক্ষা পাওয়ার সাথে সাথে নিজেদের গুপ্তস্থান আবৃত কর এবং দেহের শোভাবর্ধনে সমর্থ হতে পার। তিনি তোমাদেরকে দান করেছেন লৌহবর্ম, যা শত্রুদের আক্রমণ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে তোমাদের কাজে লাগে। এভাবে তিনি তোমাদেরকে তোমাদের প্রয়োজনের পুরোপুরি জিনিস নিয়ামত স্বরূপ দিতে রয়েছেন, যেন তোমরা আরাম ও শান্তি পাও এবং প্রশান্তির সাথে নিজেদের প্রকৃত নিয়ামত দাতার ইবাদতে লেগে থাকো।”

(আরবি) এর দ্বিতীয় পঠন (আরবি) এরূপও রয়েছে অর্থাৎ, তোমরা শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ কর। আর প্রথম কিরআতের অর্থ হচ্ছেঃ যাতে অনুগত হও ও আত্মসমর্পণ কর। এই সূরার আর একটি নাম ‘সূরাতুন নিআ’মও রয়েছে। অর্থাৎ নিয়ামত সমূহের সূরা। (আরবি) এর (আরবি) কে যবর দিয়ে পড়লে আর একটি অর্থ হবেঃ “তিনি তোমাদেরকে যুদ্ধ ক্ষেত্রে কাজে লাগে এরূপ জিনিস দান করেছেন, যেন তোমরা শত্রুদের আক্রমণ থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পার।” জঙ্গল ও মরুপ্রান্তরও আল্লাহর একটি বড় নিয়ামত, কিন্তু এখানে পাহাড়ের নিয়ামতের বর্ণনা দেয়ার কারণ এই যে, যাদের সাথে কথা বলা হচ্ছে তারা ছিল পাহাড়ের অধিবাসী। কাজেই তাদের অবগতি অনুযায়ী তাদের সাথে। কথা বলা হচ্ছে। অনুরূপভাবে মেষ, বকরী ও উট ছিল তাদের প্রধান জীবনোপকরণ। তাই, মহান আল্লাহ তাদেরকে এই নিয়ামতের কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। অথচ এর চেয়ে আরো অনেক বড় বড় অসংখ্য নিয়ামত মাখলুকের হাতে রয়েছে। আর এই একই কারণে শীত-গ্রীষ্ম হতে রক্ষা পাওয়ার উপকরণরূপ নিয়ামতের কথা বলেছেন, অথচ এর চেয়ে আরো বড় নিয়ামত বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু এটা তাদের সামনে রয়েছে এবং তাদের জানা জিনিস। তারা ছিল যুদ্ধপ্রিয় জাতি। তাই, যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর আক্রমণ হতে রক্ষা পাওয়ার যে উপকরণ রয়েছে, সেই নিয়ামতের কথা তাদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। অথচ এর চেয়ে বহু বড় বড় নিয়ামত মানুষের অধিকারে রয়েছে। যেহেতু ওটা ছিল গরম দেশ, সেহেতু তাদেরকে বলা হয়েছেঃ “তিনি তোমাদের জন্যে ব্যবস্থা করেন পরিধেয় বস্ত্রের; ওটা তোমাদেরকে তাপ হতে রক্ষা করে। কিন্তু এর চেয়ে বহুগুণ উত্তম আরো বহু নিয়ামত কি এই প্রকৃত নিয়ামত দাতা আল্লাহ তাআলার নিকট বিদ্যমান নেই? অবশ্যই আছে। এ কারণেই এ সব নিয়ামত ও রহমত প্রকাশ করার পরেই স্বীয় নবীকে (সঃ) সম্বোধন করে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! এখনো যদি এরা আমার ইবাদত, তাওহীদ এবং অসংখ্য নিয়ামতের কথা স্বীকার না করে বরং মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে এতে তোমার কি আসে যায়? তুমি তাদেরকে তাদের কাজের উপর ছেড়ে দাও। তুমি তো শুধু প্রচারক মাত্র। সুতরাং তুমি তোমার কার্য চালিয়ে যাও।

মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “তারা তো নিজেরাই জানে যে, একমাত্র আল্লাহ তাআলাই হচ্ছেন নিয়ামতরাজি দানকারী। কিন্তু এটা জানা সত্ত্বেও তারা এগুলি অস্বীকার করছে এবং তার সাথে অন্যদের ইবাদত করছে। এমন কি তারা তাঁর নিয়ামতের সম্পর্ক অন্যদের প্রতি আরোপ করছে। তারা মনে করছে যে, সাহায্যকারী অমুক, আহার্যদাতা অমুক। তাদের অধিকাংশই কাফির। তারা হচ্ছে আল্লাহর অকৃতজ্ঞ বান্দা।

হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন বেদুঈন রাসূলুল্লাহর (সঃ) কাছে আগমন করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার সামনে (আরবি) এই আয়াতটি পাঠ করেন। অর্থাৎ “আল্লাহ তোমাদের গৃহকে করেন তোমাদের আবাস স্থল।” বেদুঈন বলেঃ “হাঁ, (এটা সত্য)।” তারপর তিনি পাঠ করেনঃ “তিনি তোমাদের জন্যে পশু চর্মের ব্যবস্থা করেন। সে বলেঃ “হাঁ, (এটাও সত্য)।” এইভাবে তিনি আয়াতগুলি পাঠ করতে থাকেন এবং সে প্রত্যেক নিয়ামতেরই স্বীকারোক্তি করে। শেষে তিনি পাঠ করেনঃ “যাতে তোমরা মুসলমান ও অনুগত হয়ে যাও।” সে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে চলে যায়। এ সময় আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করেনঃ “তারা আল্লাহর অনুগ্রহ জ্ঞাত আছে; কিন্তু সেগুলি তারা অস্বীকার করে এবং তাদের অধিকাংশই কাফির।” (এটা ইবনু আবি হাতিম (রাঃ) বর্ণনা করেছেন)





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।