আল কুরআন


সূরা আন-নাহাল (আয়াত: 28)

সূরা আন-নাহাল (আয়াত: 28)



হরকত ছাড়া:

الذين تتوفاهم الملائكة ظالمي أنفسهم فألقوا السلم ما كنا نعمل من سوء بلى إن الله عليم بما كنتم تعملون ﴿٢٨﴾




হরকত সহ:

الَّذِیْنَ تَتَوَفّٰىهُمُ الْمَلٰٓئِکَۃُ ظَالِمِیْۤ اَنْفُسِهِمْ ۪ فَاَلْقَوُا السَّلَمَ مَا کُنَّا نَعْمَلُ مِنْ سُوْٓءٍ ؕ بَلٰۤی اِنَّ اللّٰهَ عَلِیْمٌۢ بِمَا کُنْتُمْ تَعْمَلُوْنَ ﴿۲۸﴾




উচ্চারণ: আল্লাযীনা তাতাওয়াফফা-হুমুল মালাইকাতুজা-লিমীআনফুছিহিম ফাআলকাউছ ছালামা মা-কুন্না-না‘মালুমিন ছূইন বালাইন্নাল্লা-হা ‘আলীমুম বিমা-কুনতুম তা‘মালূন।




আল বায়ান: নিজদের উপর যুলমকারী থাকা অবস্থায় ফেরেশতারা যাদের মৃত্যু ঘটাবে। অতঃপর তারা আত্মসমর্পণ করে বলবে, ‘আমরা কোন পাপ করতাম না।’ হ্যাঁ, নিশ্চয় তোমরা যা করতে সে বিষয়ে আল্লাহ সম্যক জ্ঞাত।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৮. যাদের মৃত্যু ঘটায় ফিরিশতাগণ তারা নিজেদের প্রতি যুলুম করা অবস্থায়; তখন তারা আত্মসমর্পণ করে বলবে, আমরা কোন মন্দ কাজ করতাম না।(১) অবশ্যই হ্যাঁ, নিশ্চয় তোমরা যা করতে সে বিষয়ে আল্লাহ সবিশেষ অবগত।




তাইসীরুল ক্বুরআন: ফেরেশতারা যাদের মৃত্যু ঘটায় নিজেদের প্রতি যুলম করা অবস্থায়।’ অতঃপর তারা আত্মসমর্পণ ক’রে বলবে, ‘আমরা তো কোন খারাপ কাজ করতাম না।’ (ফেরেশতারা জবাব দিবে) ‘বরং, তোমরা যা করছিলে আল্লাহ সে বিষয়ে খুব ভালভাবেই অবগত।




আহসানুল বায়ান: (২৮) নিজেদের প্রতি যুলুম করতে থাকা অবস্থায় ফিরিশতাগণ যাদের প্রাণ হরণ করে, তারা আত্মসমর্পণ করে বলবে, ‘আমরা কোন মন্দ কর্ম করতাম না।’[1] অবশ্যই! তোমরা যা করতে সে বিষয়ে নিশ্চয় আল্লাহ সবিশেষ অবহিত। [2]



মুজিবুর রহমান: মালাইকা/ফেরেশতাগণ তাদের মৃত্যু ঘটায় তাদের নিজেদের প্রতি যুলম করতে থাকা অবস্থায়; অতঃপর তারা আত্মসমর্পণ করে বলবেঃ আমরা কোন মন্দ কাজ করতামনা। হ্যাঁ, তোমরা যা করতে সে বিষয়ে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত।



ফযলুর রহমান: নিজেদের প্রতি জুলুম করতে থাকা অবস্থায় ফেরেশতারা যাদের জানকবজ করে। তারপর তারা (কৃত্রিম) আত্মসমর্পণ করে বলবে, “আমরা তো খারাপ কিছু করতাম না।” অবশ্যই! তোমরা যা করতে আল্লাহ তা ভালভাবে অবগত আছেন।



মুহিউদ্দিন খান: ফেরেশতারা তাদের জান এমতাঅবস্থায় কবজ করে যে, তারা নিজেদের উপর যুলুম করেছে। তখন তারা অনুগত্য প্রকাশ করবে যে, আমরা তো কোন মন্দ কাজ করতাম না। হঁ্যা নিশ্চয় আল্লাহ সববিষয় অবগত আছেন, যা তোমরা করতে।



জহুরুল হক: এরা তারা যাদের প্রাণ হরণ করবে ফিরিশ্‌তারা ওরা নিজেদের প্রতি অন্যায়কারী থাকা কালে। তখন তারা আ‌ত্মসমর্পণ করবে -- "আমরা খারাপ কিছু করি নি।" "না, তোমরা যা করতে সে বিষয়ে আল্লাহ্ নিশ্চয়ই সর্বজ্ঞাতা।



Sahih International: The ones whom the angels take in death [while] wronging themselves, and [who] then offer submission, [saying], "We were not doing any evil." But, yes! Indeed, Allah is Knowing of what you used to do.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ২৮. যাদের মৃত্যু ঘটায় ফিরিশতাগণ তারা নিজেদের প্রতি যুলুম করা অবস্থায়; তখন তারা আত্মসমর্পণ করে বলবে, আমরা কোন মন্দ কাজ করতাম না।(১) অবশ্যই হ্যাঁ, নিশ্চয় তোমরা যা করতে সে বিষয়ে আল্লাহ সবিশেষ অবগত।


তাফসীর:

(১) এটা তাদের মিথ্যাচার। অন্য আয়াতে এসেছে, তারা বলবে “আল্লাহর শপথ আমরা কখনো মুশরিক ছিলাম না” [সূরা আল-আনআমঃ ২৩] অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেনঃ “যে দিন আল্লাহ পুনরুথিত করবেন তাদের সবাইকে, তখন তারা আল্লাহর কাছে সেরূপ শপথ করবে যেরূপ শপথ তোমাদের কাছে করে।” [সূরা আল-মুজাদালাহঃ ১৮] তাদের মিথ্যাচারের কারণে আল্লাহ তা’আলা বলছেন যে, তোমাদের কথা সঠিক নয়; বরং তোমরা যাবতীয় মন্দ কাজ করতে আল্লাহ তা'আলা তোমরা যা করতে সে সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত।


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (২৮) নিজেদের প্রতি যুলুম করতে থাকা অবস্থায় ফিরিশতাগণ যাদের প্রাণ হরণ করে, তারা আত্মসমর্পণ করে বলবে, ‘আমরা কোন মন্দ কর্ম করতাম না।’[1] অবশ্যই! তোমরা যা করতে সে বিষয়ে নিশ্চয় আল্লাহ সবিশেষ অবহিত। [2]


তাফসীর:

[1] এখানে মুশরিক যালিমদের মৃত্যুর সময়ের অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে। যখন ফিরিশতা তাদের রূহ ছিনিয়ে নেন, তখন তারা আত্মসমর্পণ করে মিনতি সহকারে বলে, আমরা কোন মন্দ কাজ করতাম না। যেমন তারা হাশরের মাঠে আল্লাহর সামনে মিথ্যা শপথ করে বলবে,{وَاللهِ رَبِّنَا مَا كُنَّا مُشْرِكِينَ}  অর্থাৎ, আল্লাহর শপথ! আমরা মুশরিক ছিলাম না। (সূরা আনআম ২৩) অন্যত্র বলেন, যেদিন আল্লাহ তাদের পুনরুত্থিত করবেন, সেদিন তারা আল্লাহর সামনে সেই ভাবেই মিথ্যা শপথ করবে, যেভাবে তোমার সামনে করে। (মুজাদালাহ ১৮)

[2] ফিরিশতা উত্তরে বলবেন, কেন নয়? তোমরা মিথ্যা বলছ। তোমাদের পুরো জীবন মন্দ কাজেই কেটেছে। আর আল্লাহর নিকট তোমাদের সকল কাজের রেকর্ড জমা রয়েছে। তোমাদের অস্বীকার করার কোন উপায় নেই।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ২৪-২৯ নং আয়াতের তাফসীর:



(وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ....)



অত্র আয়াতে কাফির-মুশরিকদের চরম মিথ্যা প্রতিপন্নতার বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: যদি তাদেরকে বলা হয় নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর কী নাযিল করা হয়েছে? তারা বলে কিছুই নাযিল করা হয়নি। সে পূর্ববর্তী কিতাবে লিখিত মিথ্যা কাহিনী ব্যক্ত করে। اَسَاطِیْرُ শব্দটি اسطور এর বহুবচন, অর্থ হল পূর্ববর্তীদের কিতাবে লিখিত মিথ্যা ও বাতিল কাহিনী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَقَالُوْآ أَسَاطِيْرُ الْأَوَّلِيْنَ اكْتَتَبَهَا فَهِيَ تُمْلٰي عَلَيْهِ بُكْرَةً وَّأَصِيْلًا)‏



“তারা বলে: ‘এগুলো তো সেকালের উপকথা, যা সে লিখিয়ে নিয়েছে; এগুলো সকাল-সন্ধ্যা তার নিকট পাঠ করা হয়।’’ (সূরা ফুরকান ২৫:৫)



আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:



(وَإِذَا تُتْلٰي عَلَيْهِمْ اٰيٰتُنَا قَالُوْا قَدْ سَمِعْنَا لَوْ نَشَا۬ءُ لَقُلْنَا مِثْلَ هٰذَآ لا إِنْ هٰذَآ إِلَّآ أَسَاطِيْرُ الْأَوَّلِيْنَ)‏



“যখন তাদের নিকট আমার আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তারা তখন বলে, ‘আমরা তো শ্রবণ করলাম, ইচ্ছা করলে আমরাও এর অনুরূপ বলতে পারি; এগুলো সেকালের লোকদের উপকথা ছাড়া কিছুই না।’’ (সূরা আনফাল ৮:৩১)



মূলত তারা আল্লাহ তা‘আলার অবতীর্ণ বিধানের প্রতি ঈমান আনয়ন করত না।



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলছেন: কাফিররা এসব কথা বলে নিজেরা ঈমান আনা থেকে বিরত থাকত এবং অন্যদেরকেও ঈমান আনতে বাধা দিত। তাদের এসব কার্যকলাপের কারণে কিয়ামতের দিন নিজেদের পাপের বোঝা পূর্ণরূপে তো বহন করবেই সেই সাথে যাদেরকে এসব কথা বলে পথভ্রষ্ট করেছে তাদের পাপের বোঝাও বহন করবে। যেহেতু দাওয়াতে তাদের বাধা দেয়াতে এবং তাদের কারণে এসব লোকেরা ঈমান আনতে পারেনি।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَلَيَحْمِلُنَّ أَثْقَالَهُمْ وَأَثْقَالًا مَّعَ أَثْقَالِهِمْ ز وَلَيُسْأَلُنَّ يَوْمَ الْقِيٰمَةِ عَمَّا كَانُوْا يَفْتَرُوْنَ)‏



“তারা অবশ্যই নিজেদের পাপের ভার বহন করবে এবং নিজেদের বোঝার সাথে আরও কিছু বোঝা; আর তারা যে মিথ্যা উদ্ভাবন করত সে সম্পর্কে কিয়ামাত দিবসে অবশ্যই তাদেরকে প্রশ্ন করা হবে।” (সূরা আনকাবুত ২৯:১৩)



হাদীসে এসেছে আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: যে ব্যক্তি মানুষকে হিদায়াতের দিকে আহ্বান করে তার জন্য সে পরিমাণ প্রতিদান রয়েছে যে পরিমাণ অনুসারী ব্যক্তি পায়, তবে কারো প্রতিদান কম করা হবে না। আর যদি মানুষকে গোমরাহ ও পাপ কাজের দিকে আহ্বান করে তার জন্য সে পরিমাণ পাপ হয় যে পরিমাণ পাপ অনুসারীর হয়, তবে কারো পাপ কমবে না। (সহীহ মুসলিম হা: ২৬৭৪)



এর দ্বারা বুঝো যায় যে, তারা তাদের অনুসারীদের বোঝা বহন করবে বটে কিন্তু অনুসারীদের বোঝা একটুও হালকা হবে না। আর এটা তাদের জন্য খুবই নিকৃষ্ট ও অপমানকর একটি বিষয়। সুতরাং নিজে অন্যায় করা তো যাবেই না, অন্য কাউকে অন্যায় কাজ করার প্রতি উৎসাহও প্রদান করা যাবে না। বস্তুত সকলকেই খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে।



(بِغَيْرِ عِلْمٍ) এ কথা প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দাওয়াত পৌঁছনোর পর কাফিররা ওজর পেশ করতে পারবে না। কেননা আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মাধ্যমে দীনকে পূর্ণ করে দেয়ার পর অজ্ঞতা বলতে কোন কিছু নেই।



(قَدْ مَكَرَ الَّذِينَ....)



ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, এ চক্রান্তকারী দ্বারা নমরূদকে বুঝানো হয়েছে। সে একটি বিরাট প্রাসাদ নির্মাণ করেছিল। জমিনে সর্বপ্রথম সবচেয়ে বড় ঔদ্ধত্যপনা সেই দেখিয়েছিল। তাকে ধ্বংস করার জন্য আল্লাহ তা‘আলা একটা মশাকে প্রেরণ করেছিলেন, যে তার নাকের ছিদ্র দিয়ে তার মস্তিষ্কে প্রবেশ করে এবং চারশ বছর পর্যন্ত তার মস্তিষ্ক চাটতে থাকে। এ সুদীর্ঘ সময়কালে ঐ সময় সে কিছুটা শান্তি লাভ করত যখন তার মস্তকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা হত। চারশ বছর পর্যন্ত সে রাজ্য শাসন করেছিল। কেউ বলেছেন: এর দ্বারা উদ্দেশ্য বখতে নসর। তার চক্রান্তও এত কঠিন ছিল যে, মনে হয় যেন তার চক্রান্তে পাহাড় এক স্থান থেকে অন্যস্থানে চলে যাবে।



যেমন সূরা ইবরাহীমে বলা হয়েছে:



(وَقَدْ مَكَرُوْا مَكْرَهُمْ وَعِنْدَ اللّٰهِ مَكْرُهُمْ ط وَإِنْ كَانَ مَكْرُهُمْ لِتَزُوْلَ مِنْهُ الْجِبَالُ‏)‏



“তারা ভীষণ চক্রান্ত‎ করেছিল, কিন্তু তাদের চক্রান্ত‎ আল্লাহর সামনেই ছিল যদিও তাদের চক্রান্ত‎ এমন ছিল, যাতে পর্বত টলে যেত।” (সূরা ইবরাহীম ১৪:৪৬)



কেউ বলেছেন: কাফির-মুশরিকরা যে আল্লাকে বাদ দিয়ে অন্যের ইবাদত করে এটা তাদের আমল নষ্ট হওয়ার দৃষ্টান্ত। যেমন নূহ (عليه السلام) বলেছিলেন:



(وَمَكَرُوْا مَكْرًا كُبَّارًا)



“আর তারা ভয়ানক ষড়যন্ত্র করেছে।” (সূরা নূহ ৭১:২২)



মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য যত রকম চক্রান্ত করা দরকার সব চক্রান্ত তারা করেছে। যেমন তাদের অনুসারীরা কিয়ামতের দিন বলবে:



(وَقَالَ الَّذِيْنَ اسْتُضْعِفُوْا لِلَّذِيْنَ اسْتَكْبَرُوْا بَلْ مَكْرُ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ إِذْ تَأْمُرُوْنَنَآ أَنْ نَّكْفُرَ بِاللّٰهِ وَنَجْعَلَ لَه۫ٓ أَنْدَادًا ط وَأَسَرُّوا النَّدَامَةَ لَمَّا رَأَوُا الْعَذَابَ)



“যাদেরকে দুর্বল মনে করা হত তারা অহঙ্কারীদেরকে বলবে: প্রকৃতপক্ষে তোমরাই তো দিবা-রাত্র চক্রান্তে লিপ্ত ছিলে, আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলে যেন আমরা আল্লাহকে অমান্য করি এবং তাঁর শরীক স্থাপন করি, যখন তারা শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে তখন তারা অনুতাপ গোপন রাখবে।” (সূরা সাবা ৩৪:৩৩)



কিন্তু সঠিক কথা হল ঐ সকল জাতির পরিণতির দিকে ইঙ্গিত করা, যারা নাবীদের মিথ্যা মনে করে। আর শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলার আযাবে তারা তাদের ঘরসহ ধ্বংস হয়ে যায়। যেমন ‘আদ জাতি, লূত সম্প্রদায়, ইত্যাদি।



(بُنْيَانَهُمْ مِّنَ الْقَوَاعِدِ)



অর্থাৎ ইমারতগুলো খুঁটি থেকে আলাদা করে উলটিয়ে ছাদ তাদের ওপর নিপতিত করা হয়েছিল। নমরূদসহ সকল যুগের কাফিরদেরকে আল্লাহ তা‘আলা এমন শাস্তি দিয়েছেন।



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَدَمَّرْنَا مَا كَانَ يَصْنَعُ فِرْعَوْنُ وَقَوْمُه۫ وَمَا كَانُوْا يَعْرِشُوْنَ)‏



“আর ফির‘আউন ও তার সম্প্রদায়ের শিল্প এবং যে সব প্রাসাদ তারা নির্মাণ করেছিল তা ধ্বংস করে দিয়েছি।” (সূরা আ‘রাফ ৭:১৩৭)



আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:



(فَأَتَاهُمُ اللّٰهُ مِنْ حَيْثُ لَمْ يَحْتَسِبُوْا وَقَذَفَ فِيْ قُلُوْبِهِمُ الرُّعْبَ يُخْرِبُوْنَ بُيُوْتَهُمْ بِأَيْدِيْهِمْ وَأَيْدِي الْمُؤْمِنِيْنَ ق فَاعْتَبِرُوْا يٰٓأُولِي الْأَبْصَارِ)



“কিন্তু আল্লাহ এমন এক দিক হতে তাদের ওপর চড়াও হলেন যা ছিল তাদের ধারণাতীত এবং তিনি তাদের অন্তরে ভয় সঞ্চার করলেন। তারা ধ্বংস করে ফেলল তাদের বাড়ী-ঘর নিজেদের হাতে এবং মু’মিনদের হাতেও; অতএব হে চক্ষুষ্মান ব্যক্তিগণ! তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।” (সূরা হাশর ৫৯:২)



ইতোপূর্বে আল্লাহ তা‘আলার সাথে শত্র“তা বা চক্রান্ত করে কেউ রেহাই পায়নি। অতএব এখনো যারা এরূপ চক্রান্ত করবে তাদের ব্যাপারেও আল্লাহ তা‘আলা এরূপ ব্যবস্থাই গ্রহণ করবেন। তাদের চক্রান্ত যত বড়ই হোক না কেন।



পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলছেন এদের শাস্তি দুনিয়াতেই শেষ নয় বরং আখিরাতে সকল মানুষের সামনে তাদেরকে অপমানিত করবেন এবং তিরস্কারের সাথে বলবেন: যে সকল মা‘বূদদেরকে নিয়ে আমার রাসূলদের সাথে বিতণ্ডা করতে তারা আজ কোথায়?



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَيَوْمَ يُنَادِيْهِمْ فَيَقُوْلُ أَيْنَ شُرَكَا۬ئِيَ الَّذِيْنَ كُنْتُمْ تَزْعُمُوْنَ)



“এবং সেদিন তিনি তাদেরকে আহ্বান করে বলবেন: ‘তোমরা যাদেরকে আমার শরীক গণ্য করতে, তারা কোথায়?’’ (সূরা ক্বাসাস ২৮:৬২)



আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:



(وَقِيْلَ لَهُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ تَعْبُدُوْنَ لا -‏ مِنْ دُوْنِ اللّٰهِ ط هَلْ يَنْصُرُوْنَكُمْ أَوْ يَنْتَصِرُوْنَ)



“তাদেরকে বলা হবে: ‘তারা কোথায়, তোমরা যাদের ইবাদত করতে আল্লাহর পরিবর্তে? তারা কি তোমাদের সাহায্য করতে পারে অথবা তারা কি আত্মরক্ষা করতে সক্ষম?’’ (সূরা শুআরা ২৬:৯২-৯৩)



এ কথার উত্তরে তারা বলবে যে, ঐ সমস্ত শরীকরা আমাদের থেকে উধাও হয়ে গেছে।



যেমন তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(ثُمَّ قِیْلَ لَھُمْ اَیْنَمَا کُنْتُمْ تُشْرِکُوْنَﮘﺫمِنْ دُوْنِ اللہِﺚ قَالُوْا ضَلُّوْا عَنَّا بَلْ لَّمْ نَکُنْ نَّدْعُوْا مِنْ قَبْلُ شَیْئًاﺚ کَذٰلِکَ یُضِلُّ اللہُ الْکٰفِرِیْنَﮙ)



“পরে তাদেরকে বলা হবে: কোথায় তারা যাদেরকে তোমরা (তাঁর) শরীক করতে; আল্লাহ ব্যতীত? তারা বলবে: তারা তো আমাদের নিকট হতে অদৃশ্য হয়েছে; বন্তুতঃ পূর্বে আমরা এমন কিছুকেই আহ্বান করিনি। এভাবে আল্লাহ কাফিরদেরকে বিভ্রান্ত করেন।” (সূরা মু’মিন ৪০:৭৩-৭৪)



সুতরাং কিয়ামতের দিন মুশরিকদের অবস্থা কত অপমানজনক হবে এবং তারা কত কঠিন বিপদে পড়বে তা সহজেই অনুমেয়।



(الَّذِيْنَ تَتَوَفَّاهُمُ....)



এখানে মুশরিক জালিমদের মৃত্যুর সময়ের অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে। যখন ফেরেশতারা তাদের রূহ ছিনিয়ে নিতে আসবে তখন তারা السَّلَمَ তথা আত্মসমর্পণ করে মিনতি সহকারে বলবে: আমরা কোন মন্দ কাজ করিনি। আমরা মুশরিক ছিলাম না। যেমন তারা হাশরের ময়দানে শপথ করে বলবে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(ثُمَّ لَمْ تَکُنْ فِتْنَتُھُمْ اِلَّآ اَنْ قَالُوْا وَاللہِ رَبِّنَا مَا کُنَّا مُشْرِکِیْنَﭦاُنْظُرْ کَیْفَ کَذَبُوْا عَلٰٓی اَنْفُسِھِمْ وَضَلَّ عَنْھُمْ مَّا کَانُوْا یَفْتَرُوْنَﭧ)



“অতঃপর (যখন তাদের শরীকদের সম্পর্কে প্রশ্নের সম্মুখীন করা হবে তখন) তাদের এটা ছাড়া বলার অন্য কোন অজুহাত থাকবে না ‘আমাদের প্রতিপালক আল্লাহর শপথ! আমরা তো মুশরিকই ছিলাম না।’ দেখ, তারা নিজেদের প্রতি কেমন মিথ্যারোপ করে এবং যে মিথ্যা তারা রচনা করত তা কিভাবে তাদের হতে উধাও হয়ে গেল।” (সূরা আনয়াম ৬:২৩-২৪)



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:



(یَوْمَ یَبْعَثُھُمُ اللہُ جَمِیْعًا فَیَحْلِفُوْنَ لَھ۫ کَمَا یَحْلِفُوْنَ لَکُمْ وَیَحْسَبُوْنَ اَنَّھُمْ عَلٰی شَیْءٍﺚ اَلَآ اِنَّھُمْ ھُمُ الْکٰذِبُوْنَﭡ)‏



“যেদিন আল্লাহ তাদের সবাইকে পুনরুত্থিত করবেন, যেদিন তারা আল্লাহর সামনে শপথ করবে, যেমন তোমাদের সামনে শপথ করে থাকে এবং তারা এরূপ ধারণা করে যে, তারা সঠিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত আছে। শুনে রাখ, তারা তো বড়ই মিথ্যাবাদী।” (সূরা মুজাদালাহ ৫৮:১৮)



(بَلٰٓي إِنَّ اللّٰهَ عَلِيْمٌ)



ফেরেশতারা উত্তরে বলবে: কেন নয়? অবশ্যই তোমরা মন্দ কাজ করেছ। তোমরা মিথ্যা বলছ। আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের সকল আমল সম্পর্কে অবগত রয়েছেন। তিনি ফেরেশতাদের দ্বারা লিখিয়ে রেখেছেন। অতএব তোমরা অস্বীকার করলেও কোন লাভ নেই। তাদের এই সমস্ত অপরাধের কারণে তাদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করার নির্দেশ দেয়া হবে। আর এটা বড়ই নিকৃষ্ট স্থান।



ইবনু কাসীর (রহঃ) বলেন: তাদের মৃত্যুর পর পরই তাদের রূহগুলো জাহান্নামে চলে যাবে। আর তাদের দেহগুলো কবরে পড়ে থাকবে। যেখানে আল্লাহ তা‘আলা নিজ কুদরতে শরীর ও রূহের মধ্যে দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও এক ধরনের সম্পর্ক সৃষ্টি করে শাস্তি দেন। সকাল-সন্ধ্যা তাদের সামনে আগুন পেশ করা হয়। অতঃপর যখন কিয়ামত সংঘটিত হবে, তখন তাদের রূহগুলো তাদের নিজ নিজ নতুন দেহে ফিরে আসবে এবং চিরকালের জন্য তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। (ইবনু কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. কেউ মানুষকে সৎ পথ দেখালে, অনুসারী ব্যক্তি সৎ কাজ করে যত নেকী পাবে সে ব্যক্তিও তত নেকী পাবে, কারো নেকীর কোন কমতি হবে না। পক্ষান্তরে কেউ অসৎ পথ দেখালে অনুসারী অসৎ কাজ করলে যে পরিমাণ গুনাহ করবে সে গুনাহ তারও হবে।

২. আল্লাহ তা‘আলার বিধানের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করা যাবে না।

৩. দুনিয়ায় আল্লাহ তা‘আলাকে ছেড়ে যাদের উপাসনা করা হয় তারা আখিরাতে তাদের মুরীদদের থেকে উধাও হয়ে যাবে।

৪. আখিরাতে কোন আমল অস্বীকার করার কোনই সুযোগ থাকবে না।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ২৮-২৯ নং আয়াতের তাফসীর

আল্লাহ তাআলা এখানে নিজেদের উপর যুলুমকারী মুশরিকদের জান কবযের সময়ে অবস্থার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, যখন ফেরেশতারা তাদের প্রাণ বের করার জন্যে আগমন করেন তখন তারা (আল্লাহ তাআলার আদেশ ও নিষেধ) শুনার ও মান্য করবার কথা স্বীকার করে এবং সাথে সাথে নিজেদের কৃতকর্ম গোপন করতঃ নিজেদেরকে নিরপরাধ সাব্যস্ত করার চেষ্টা করে থাকে। কিয়ামতের দিনেও আল্লাহর সামনে তারা শপথ করে করে বলবে যে, তারা মুশরিক ছিল না। যেমন দুনিয়ায় তারা জনগণের সামনে কসম খেয়ে খেয়ে বলতো যে, তারা মুশরিক নয়। উত্তরে তাদেরকে বলা হবেঃ “তোমরা মিথ্যাবাদী। প্রাণ খুলে তোমরা দুষ্কর্ম করেছো। আল্লাহ তাআলা তোমাদের কাজ থেকে উদাসীন ও অমনোযোগী নন। প্রত্যেকের অমিল তার কাছে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। সুতরাং এখন তোমরা তোমাদের দুষ্কর্মের শাস্তি ভোগ কর এবং দরজা দিয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করে চিরতরে ঐ নিকৃষ্ট জায়গায় পড়ে থাকো। তথাকার জায়গা খারাপ, খুব খারাপ। সেখানে আছে শুধুমাত্র লাঞ্ছণা ও অপমান। এটা হচ্ছে ঐ লোকদের প্রতিফল যারা গর্ব ভরে আল্লাহর আয়াতসমূহ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং তাঁর রাসূলদের আনুগত্য স্বীকার করে না।

মৃত্যুর সাথে সাথেই তাদের রূহ জাহান্নামের সাথে সম্পর্কযুক্ত হয়ে যায় এবং কবরে তাদের দেহের উপর জাহান্নামের প্রখরতা ও ওর আক্রমণ আসতে থাকে। কিয়ামতের দিন তাদের আত্মাগুলি তাদের দেহগুলির সাথে মিলিতহয়ে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে। সেখানে আর মৃত্যুও হবে না, এবং তাদের শাস্তি হালকাও হবে না। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তাদেরকে প্রত্যহ সকালে ও সন্ধ্যায় জাহান্নামের আগুনের সামনে। হাযির করা হয়, কিয়ামত সংঘটিত হওয়া মাত্রই (ফিরআউনীদেরকে বলাহবেঃ) - হে ফিরআউনীগণ! তোমরা জাহান্নামের কঠিন শাস্তিতে প্রবেশ কর।” (৪০:৪৬)





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।