সূরা আন-নাহাল (আয়াত: 115)
হরকত ছাড়া:
إنما حرم عليكم الميتة والدم ولحم الخنزير وما أهل لغير الله به فمن اضطر غير باغ ولا عاد فإن الله غفور رحيم ﴿١١٥﴾
হরকত সহ:
اِنَّمَا حَرَّمَ عَلَیْکُمُ الْمَیْتَۃَ وَ الدَّمَ وَ لَحْمَ الْخِنْزِیْرِ وَ مَاۤ اُهِلَّ لِغَیْرِ اللّٰهِ بِهٖ ۚ فَمَنِ اضْطُرَّ غَیْرَ بَاغٍ وَّ لَا عَادٍ فَاِنَّ اللّٰهَ غَفُوْرٌ رَّحِیْمٌ ﴿۱۱۵﴾
উচ্চারণ: ইন্নামা-হাররামা ‘আলাইকুমুল মাইতাতা ওয়াদ্দামা ওয়া লাহমাল খিনযীরি ওয়ামাউহিল্লা লিগাইরিল্লা-হি বিহী ফামানিদতুররা গাইরা বা-গিওঁ ওয়ালা-‘আদিন ফাইন্নাল্লা-হা গাফূরুর রাহীম।
আল বায়ান: তিনি তো তোমাদের উপর হারাম করেছেন মৃত জন্তু, রক্ত, শূকরের গোশ্ত এবং যে জন্তুর যবেহকালে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও নাম নেয়া হয়েছে। তবে যে নিরুপায় হয়ে, ইচ্ছাকৃত অবাধ্যতা ও সীমালঙ্ঘন ব্যতীত, (প্রয়োজন মুতাবেক গ্রহণ করবে) তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১১৫. আল্লাহ তো শুধু মৃত জন্তু, রক্ত, শূকর-মাংস এবং যা যবেহকালে আল্লাহর পরিবর্তে অন্যের নাম নেয়া হয়েছে তা-ই তোমাদের জন্য হারাম করেছেন(১), কিন্তু কেউ অবাধ্য বা সীমালংঘনকারী না হয়ে অনন্যোপায় হলে আল্লাহ্ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
তাইসীরুল ক্বুরআন: আল্লাহ তোমাদের জন্য হারাম করেছেন মৃত জীব, রক্ত, শূকরের মাংস আর যা যবেহ করার সময় আল্লাহ ছাড়া অন্যের নাম নেয়া হয়েছে। কিন্তু কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে অবাধ্য না হয়ে ও সীমালঙ্ঘন না ক’রে নিতান্ত নিরুপায় (হয়ে এসব খেতে বাধ্য) হলে আল্লাহ তো বড়ই ক্ষমাশীল, বড়ই দয়ালু।
আহসানুল বায়ান: (১১৫) আল্লাহ তো শুধু মৃত, রক্ত, শূকরের গোশত এবং যার যবেহকালে আল্লাহর পরিবর্তে অন্যের নাম নেওয়া হয়েছে তা-ই তোমাদের জন্য অবৈধ করেছেন; কিন্তু কেউ অন্যায়কারী কিংবা সীমালংঘনকারী না হয়ে (তা খেতে) অনন্যোপায় হলে নিশ্চয় আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [1]
মুজিবুর রহমান: তিনি (আল্লাহ) শুধুমাত্র মৃত, রক্ত, শূকরের মাংস এবং যা যবাহকালে আল্লাহর পরিবর্তে অন্যের নাম নেয়া হয়েছে তা’ই তোমাদের জন্য অবৈধ করেছেন, কিন্তু কেহ অনন্যোপায় কিংবা সীমা লংঘনকারী না হয়ে অনন্যোপায়ী হলে আল্লাহতো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
ফযলুর রহমান: আল্লাহ তো তোমাদের জন্য মৃতপ্রাণীর মাংস, রক্ত, শূকরের মাংস এবং যে প্রাণী আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা হয় তার মাংস হারাম করেছেন। তবে কেউ যদি অবাধ্য না হয়ে কিংবা সীমালংঘন না করে (এর কোনটি খেতে) নিতান্ত বাধ্য হয় তাহলে নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।
মুহিউদ্দিন খান: অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের জন্যে হারাম করেছেন রক্ত, শুকরের মাংস এবং যা জবাই কালে আল্লাহ ছাড়া অন্যের নাম উচ্চারণ করা হয়েছে। অতঃপর কেউ সীমালঙ্ঘন কারী না হয়ে নিরুপায় হয়ে পড়লে তবে, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
জহুরুল হক: নিঃসন্দেহ তিনি তোমাদের জন্য অবৈধ করেছেন যা নিজে মরে, ও রক্ত, ও শূকরের মাংস, আর যা হালাল করা হয়েছে তার উপরে আল্লাহ্র নাম ছাড়া, কিন্তু যে কেউ চাপে পড়েছে, অবাধ্য না হয়ে বা মাত্রা না ছাড়িয়ে, তবে আল্লাহ্ নিঃসন্দেহ পরিত্রাণকারী, অফুরন্ত ফলদাতা।
Sahih International: He has only forbidden to you dead animals, blood, the flesh of swine, and that which has been dedicated to other than Allah. But whoever is forced [by necessity], neither desiring [it] nor transgressing [its limit] - then indeed, Allah is Forgiving and Merciful.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১১৫. আল্লাহ তো শুধু মৃত জন্তু, রক্ত, শূকর-মাংস এবং যা যবেহকালে আল্লাহর পরিবর্তে অন্যের নাম নেয়া হয়েছে তা-ই তোমাদের জন্য হারাম করেছেন(১), কিন্তু কেউ অবাধ্য বা সীমালংঘনকারী না হয়ে অনন্যোপায় হলে আল্লাহ্– তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
তাফসীর:
(১) এ আয়াতে ব্যবহৃত إنها শব্দ থেকে বোঝা যায় যে, হারাম বস্তু আয়াতে উল্লেখিত চারটিই। এর চাইতে আরো অধিক স্পষ্টভাবে (قُلْ لَا أَجِدُ فِي مَا أُوحِيَ إِلَيَّ مُحَرَّمًا) [আল-আনআমঃ ১৪৫] আয়াত থেকে জানা যায় যে, এগুলো ছাড়া অন্য কোন বস্তু হারাম নয়। অথচ কুরআন ও হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী আরো বহু বস্তু হারাম হওয়া প্রমাণিত হয়েছে। এ সংশয়ের জবাব আলোচ্য আয়াতসমূহের বর্ণনাভঙ্গি চিন্তা করলেই খুঁজে পাওয়া যায়। এখানে সাধারণ হালাল ও হারাম বস্তুসমূহের তালিকা বর্ণনা করা উদ্দেশ্য নয়; বরং জাহেলিয়াত আমলের মুশরিকরা নিজেদের পক্ষ থেকে যে অনেক বস্তু হারাম করে নিয়েছিল, অথচ আল্লাহ তদ্রুপ কোন নির্দেশ দেননি, সেগুলো বর্ণনা করাই উদ্দেশ্য। অর্থাৎ তাদের হারাম কৃত বস্তুসমূহের মধ্যে আল্লাহর কাছে শুধু এগুলোই হারাম। অথবা আয়াতে যেগুলো হারাম করা হয়েছে, তারপরও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার হাদীসে বেশ কিছু জিনিস হারাম করেছেন সেগুলো এর সাথে যুক্ত হবে। [কুরতুবী, সূরা আল-আন’আমের ১৪৫ নং আয়াতের ব্যাখ্যায়]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১১৫) আল্লাহ তো শুধু মৃত, রক্ত, শূকরের গোশত এবং যার যবেহকালে আল্লাহর পরিবর্তে অন্যের নাম নেওয়া হয়েছে তা-ই তোমাদের জন্য অবৈধ করেছেন; কিন্তু কেউ অন্যায়কারী কিংবা সীমালংঘনকারী না হয়ে (তা খেতে) অনন্যোপায় হলে নিশ্চয় আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [1]
তাফসীর:
[1] এই আয়াত এর পূর্বে আরো তিনবার উল্লিখিত হয়েছে। সূরা বাকারা ১৭৩নং, সূরা মায়িদা ৩নং এবং সূরা আনআম ১৪৫নং আয়াতে। চতুর্থবার মহান আল্লাহ আবার আয়াতটি উল্লেখ করেছেন। এখানে إنما হাসর (সীমিতকরণ)এর জন্য। কিন্তু এখানে ‘হাসরে হাকিকী’ (প্রকৃত সীমিতকরণ উদ্দিষ্ট) নয়; বরং ‘হাসরে ইযাফী’ (তূলনামূলক সীমিতকরণ উদ্দিষ্ট)। অর্থাৎ সম্বোধিত ব্যক্তিদের আকীদা ও বিশ্বাসকে সামনে রেখে সীমিতকরণ করা হয়েছে। নচেৎ আরো অন্যান্য জীবজন্তুও হারাম। অবশ্য এই আয়াতে এ কথা স্পষ্ট যে, এখানে যে চারটি হারাম জিনিসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে মহান আল্লাহ তা থেকে মুসলিমদেরকে তাকীদের সাথে বাঁচাতে চান। যার প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে। তবে এখানে {وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللّهِ بِهِ} (যার যবেহ কালে আল্লাহর পরিবর্তে অন্যের নাম নেওয়া হয়েছে) এই চতুর্থ নম্বরের অর্থে দুর্বল ও দূর ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে শিরকের চোরা দরজা খোলার চেষ্টা করা হয়। এই জন্য এখানে এর অধিক আলোকপাত প্রয়োজন। যে পশু আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে উৎসর্গ করা হয়, তার কয়েকটি অবস্থা হতে পারে। (ক) আল্লাহ ছাড়া অন্যের নৈকট্য ও সন্তুষ্টির জন্য কোন পশু যবেহ করা এবং যবেহ করার সময় তারই নাম নেওয়া। (খ) উদ্দেশ্য আল্লাহ ছাড়া অন্যের নৈকট্য লাভ করা কিন্তু যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম নেওয়া, যেমন কবর পূজারীদের নিকট প্রচলিত। তারা বুযুর্গদের নামে পশু নির্দিষ্ট করে রাখে; যেমন এই মোরগ বা খাসিটি অমুক পীর বা মাযারের জন্য বা এই গরু অমুক পীরের জন্য বা এই পশু আব্দুল কাদের জীলানীর জন্য ইত্যাদি। তারা তা ‘বিসমিল্লাহ’ বলেই যবেহ করে। সেই জন্য তারা বলে, প্রথমটি নিঃসন্দেহে হারাম; কিন্তু এই দ্বিতীয়টি হারাম নয়; বরং তা হালাল। কারণ তা আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে যবেহ করা হয়নি। আর এভাবে শিরকের দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে; যদিও ফকীহগণ দ্বিতীয় অবস্থাকেও হারাম বলে গণ্য করেছেন। যেহেতু এটাও {وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللهِ بِهِ} এর অর্ন্তভুক্ত। তাফসীর বায়যাবীর টিকায় রয়েছে যে, যে পশু আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গ করা হয় তা হারাম; যদিও সেটি আল্লাহর নামেই যবেহ করা হয়। উলামাগণ এ ব্যাপারে একমত যে, যদি কোন মুসলমান গায়রুল্লাহর নামে পশু যবেহ করে, তাহলে সে মুরতাদ হয়ে যায় এবং তার যবেহকৃত পশু মুর্তাদের যবেহ বলে গণ্য হয়। হানাফী ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ দুর্রে মুখতারে রয়েছে, কোন রাজা বা অন্য কোন বুযুর্গ ব্যক্তির আগমনে (সৌজন্য বা মেহমান-নেওয়াযীর উদ্দেশে নয় বরং তার সন্তুষ্টি বা তা’যীমের জন্য) পশু যবেহ করা হারাম। কারণ তা {وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللهِ بِهِ} এরই পর্যায়ভুক্ত; যদিও তা আল্লাহর নামেই যবেহ করা হয়। আল্লামা শামী এর সমর্থন করেছেন। (কিতাবুয যাবায়েহ ১২৭৭ হিজরী পুরাতন ছাপা, ২৭৭পৃঃ, ফাতওয়া শামী ৫/২০৩ মায়মানা প্রেস মিসর।) অবশ্য কিছু ফুকহা দ্বিতীয় অবস্থাকে {وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللهِ بِهِ} এর উদ্দিষ্ট অর্থ বা তার পর্যায়ভুক্ত গণ্য করেন না। কিন্তু তাতে একই হেতু (আল্লাহ ছাড়া অন্যের নৈকট্যলাভ) থাকার জন্য হারাম মনে করেন। অতএব হারাম গণ্য করায় কোন মতভেদ নাই। শুধু দলীল গ্রহণের ধরন ভিন্ন। তাছাড়া এটি {وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ} (যা দেবীর নামে বা আস্তানায় বলি দেওয়া হয়েছে) এর অন্তর্ভুক্ত। যাকে সুরা মায়িদায় হারাম ও নিষিদ্ধ বস্তুসমূহের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। হাদীস থেকেও বুঝা যায় যে, আস্তানা, থান ও মাযারে যবেহ করা পশু হারাম। কারণ সেখানে যবেহ করা বা সেখানে নিয়ে গিয়ে বিলির উদ্দেশ্য আল্লাহ ছাড়া অন্যের সন্তুষ্টি অর্জন করাই হয়ে থাকে। একটি হাদীসে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি এসে রসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে বললেন, ‘আমি বুওয়ানা নামক জায়গায় উট যবাই করার মানত করেছি।’ নবী (সাঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘সেখানে জাহেলিয়াতের যুগে কোন দেব-দেবী ছিল কি, যার পূজা করা হত?’’ সাহাবীগণ বললেন, ‘না।’ তিনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘সেখানে তাদের কোন ঈদ-অনুষ্ঠান পালন করা হতো কি?’’ তাঁরা বললেন, ‘না।’ তখন নবী (সাঃ) প্রশ্নকারীকে মানত পূরণ করার অনুমতি দিলেন। (আবূ দাঊদঃ কসম ও নযর অধ্যায়) এখান হতে বুঝা গেল যে, দেব-দেবী সরিয়ে নেওয়ার পরও অনাবাদ আস্তানায় পশু যবেহ করা বৈধ নয়। তাহলে ঐ সকল আস্তানায় ও মাযারে গিয়ে পশু যবেহ করা কিভাবে বৈধ হতে পারে, যা পূজা ও নযর-নিয়াযের আড্ডায় পরিণত? أعاذنا الله منه
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১১৪-১১৯ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন, তারা যেন হালাল ও পবিত্র রিযিক আহার করে, তাঁর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে এবং একমাত্র তাঁরই ইবাদত করে আর তিনি যে সকল জিনিস হারাম করেছেন ভক্ষণ করা থেকে বিরত থাকে।
(إِنَّمَا حَرَّمَ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةَ)
এ সম্পর্কে আরো তিনবার আলোচনা হয়েছে। সূরা বাকারার ১৭৩ নং আয়াতে, সূরা মায়িদার ৩ নং আয়াতে এবং সূরা আন‘আমের ১৪৫ নং আয়াতে। এখানে চতুর্থবার উল্লেখ করে আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে খুব সতর্ক করছেন যেন তারা এসব কর্ম ও আকীদার কাছে না যায়। বিশেষ করে
(وَمَآ أُهِلَّ لِغَيْرِ اللّٰهِ بِه)
তথা জবেহকালে আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্যের নামে জবেহ করা। এটি মারাত্মক শিরক। যা অনেক মুসলিম ব্যক্তিরা করে থাকে, কিন্তু তারা বুঝে এটা শিরক। যে পশু আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্যের নামে জবেহ করা হয় তার কয়েকটি অবস্থা হতে পারে ১. আল্লাহ তা‘আলার ছাড়া অন্যের নৈকট্য হাসিলের জন্য এবং জবেহ করার সময় সে ব্যক্তির নাম নেয়া। ২. আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্যের নৈকট্য লাভ করা উদ্দেশ্য কিন্তু জবেহ করে আল্লাহ তা‘আলার নাম নিয়ে। যেমন মাযার, কবর দরগাহ ইত্যাদিতে করা হয়। অনেকে মনে করে আল্লাহ তা‘আলার নামেই তো জবেহ করছি, সুতরাং পাপ বা শিরক হবে না। কিন্তু না, এটা প্রকাশ্য শিরক। আল্লাহ তা‘আলার নামে যেমন জবাই করতে হবে তেমনি আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির জন্য জবাই করতে হবে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(قُلْ إِنَّ صَلَاتِيْ وَنُسُكِيْ وَمَحْيَايَ وَمَمٰتِيْ لِلّٰهِ رَبِّ الْعٰلَمِيْنَ)
“বল: ‘আমার সলাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ শুধুমাত্র জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই উদ্দেশ্যে।’’ (সূরা আন‘আম ৬:১৬২)
এমনকি যে জায়াগায় শিরকী ও জাহিলী যুগের কোন কর্মকাণ্ড হয়ে থাকে সে জায়গায় আল্লাহ তা‘আলার জন্য কোন ইবাদত ও পশু জবেহ করা যাবে না। কারণ এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলল: আমি বুওয়ানা নামক স্থানে উট জবাই করার মানত করেছি। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: সেখানে জাহিলী যুগের কোন দেব-দেবী ছিল কি, যার পূজো করা হত? সাহাবী বললেন: না। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন সেখানে তাদের কোন ঈদ-অনুষ্ঠান হয়ে থাকে কি? সাহাবী বললেন: না। তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে বললেন: তুমি তোমার মানত পূর্ণ করতে পারো। (আবূ দাউদ হা: ৩৩১৫, সহীহ) সুতরাং বুঝা যাচ্ছে দেব দেবী সরিয়ে নেয়ার পরেও অথবা কোন স্থান থেকে জাহিলী যুগের আনন্দ অনুষ্ঠান উঠে যাওয়ার পরেও সেখানে ইবাদত করা ঠিক নয়। তাহলে ঐ সকল আস্তানায় ও মাযারে কিভাবে পশু জবেহ করা বৈধ হতে পারে, যা শিরক ও গাইরুল্লাহর ইবাদতের আড্ডাখানা?
(وَلَا تَقُولُوا لِمَا تَصِفُ...)
মুশরিকরা কিছু কিছু হালাল জন্তুকে নিজেদের জন্য হারাম করে নিত এবং কিছু কিছু হারাম জন্তুকে হালাল করে নিত। যেমন বাহীরা, ওয়াসিলা, সায়েবা, হাম ইত্যাদি জন্তু থেকে দুধ দোহন, তাদের ওপর বোঝা বহনসহ অন্যান্য উপকার হারাম করে নিত এবং দেব-দেবীর নামে ছেড়ে দিত। আল্লাহ তা‘আলা বলছেন: তোমরা নিজেরাই হালালকে হারাম করে এবং হারামকে হালাল করে আল্লাহ তা‘আলার ওপর মিথ্যারোপ করো না। এরূপ করেছিল ‘আমর বিন লুহাই’। এ কারণে আল্লাহ তা‘আলা তার ওপর লা‘নত করেছেন।
আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(قُلْ أَرَأَيْتُمْ مَّآ أَنْزَلَ اللّٰهُ لَكُمْ مِّنْ رِّزْقٍ فَجَعَلْتُمْ مِّنْهُ حَرَامًا وَّحَلٰلًا ط قُلْ آٰللّٰهُ أَذِنَ لَكُمْ أَمْ عَلَي اللّٰهِ تَفْتَرُوْنَ)
“বল: ‘তোমরা কি ভেবে দেখেছ, আল্লাহ তোমাদের যে রিযিক দিয়েছেন তোমরা তার কিছু হালাল ও কিছু হারাম করেছ? বল: ‘আল্লাহ কি তোমাদেরকে এ ব্যাপারে অনুমতি দিয়েছেন, না তোমরা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করছ?’’ (সূরা ইউনুস ১০:৫৯)
এ সম্পর্কে সূরা মায়িদার ১০৩ নং এবং সূরা আনয়ামের ১৪০ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
لَا يُفْلِحُوْنَ অর্থাৎ যারা এভাবে আল্লাহ তা‘আলার প্রতি মিথ্যারোপ করে, আল্লাহ তা‘আলা যা হারাম করেননি তা হারাম করে নেয়, আল্লাহ তা‘আলা যা বলেননি তা বলেছেন বলে উল্লেখ করে ইত্যাদি তারা কক্ষনো আখিরাতে সফলকাম হবে না। তারা দুনিয়াতে হয়তো কিছু দিন দুনিয়ার সামগ্রী উপভোগ করবে কিন্তু আখিরাতে তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(قُلْ إِنَّ الَّذِيْنَ يَفْتَرُوْنَ عَلَي اللّٰهِ الْكَذِبَ لَا يُفْلِحُوْنَ - مَتَاعٌ فِي الدُّنْيَا ثُمَّ إِلَيْنَا مَرْجِعُهُمْ ثُمَّ نُذِيْقُهُمُ الْعَذَابَ الشَّدِيْدَ بِمَا كَانُوْا يَكْفُرُوْنَ)
“বল: ‘যারা আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা উদ্ভাবন করে তারা সফলকাম হবে না।’ পৃথিবীতে তাদের জন্য আছে কিছু সুখ-সম্ভোগ; পরে আমারই নিকট তাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর কুফরীর কারণে তাদেরকে আমি কঠোর শাস্তির আস্বাদ গ্রহণ করাব।” (সূরা ইউনুস ১০:৬৯-৭০)
(حَرَّمْنَا مَا قَصَصْنَا عَلَيْكَ مِنْ قَبْلُ)
ইয়াহূদীদের ওপর যা হারাম করা হয়েছিল সে সম্পর্কে সূরা আন‘আমের ১৪৬ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
(ثُمَّ تَابُوْا مِنْۭ بَعْدِ ذٰلِكَ)
অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা বান্দাদেরকে তাওবার উৎসাহ প্রদান করছেন। بجهالة বা অজ্ঞতাবশত। কাতাদাহ (রহঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাহাবাগণ এ বিষয়ে একমত যে, প্রত্যেক অবাধ্য কাজ অজ্ঞতাবশত হয়। সে ইচ্ছায় করুক আর অনিচ্ছায় করুক।
মুজাহিদ (রহঃ) বলেন: প্রত্যেক আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্য ব্যক্তি অজ্ঞ যখন সে অবাধ্যতা করে। (তিরমিযী: ৩৫৩৭, হাসান। তাফসীর ইবনে কাসীর, ২/২৬২) তবে সঠিক কথা হল: যদি গুনাহ স্বেচ্ছায় বারবার এবং বেপরোয়াভাবে না করে। (আয়সারুত তাফাসীর, ১/৩৭৬)
উপরোক্ত যে সকল বিধানাবলী জানতে পারলাম আমাদের উচিত তা মেনে চলা এবং খেয়াল রাখতে হবে আমার দ্বারা যেন শিরক না হয়।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. হারাম জিনিস ভক্ষণ করা যাবে না।
২. হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল গণ্য করা যাবে না।
৩. একমাত্র আল্লাহ তা‘আলারই ইবাদত করতে হবে।
৪. আল্লাহ তা‘আলার ওপর মিথ্যা আরোপ করা যাবে না।
৫. অন্যায় করার পর সঠিক তাওবা করলে আল্লাহ তা‘আলা তাকে ক্ষমা করে দেন।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১১৪-১১৭ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন তাঁর হালাল ও পবিত্র রিযক ভক্ষণ করে এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। কেননা, সমস্ত নিয়ামতদাতা একমাত্র তিনিই। এই কারণে ইবাদতের যোগ্যও একমাত্র তিনই। তাঁর কোন অংশীদার নেই।
অতঃপর আল্লাহ তাআ’লা হারাম জিনিসগুলির বর্ণনা দিচ্ছেন। ঐ সব জিনিসে তাদের দ্বীনেরও ক্ষতি এবং দুনিয়ারও ক্ষতি। ওগুলো হচ্ছে নিজে নিজেই মৃত জন্তু, যবাহ করার সময় প্রবাহিত রক্ত, শূকরের গোশত এবং যে সব জন্তুকে আল্লাহ ছাড়া অন্যান্যদের নামে যবাহ করা হয়। কিন্তু যারা অনন্যোপায় হয়ে যায়, তারা ঐ অবস্থায় ওগুলি থেকে যদি কিছু খেয়ে নেয় তবে আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে থাকেন। সূরায়ে বাকারায় এই ধরণের আয়াত গত হয়েছে এবং সেখানে ওর পূর্ণ তাফসীরও বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তির কোন প্রয়োজন নেই। অতএব সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর।
এরপর মহান আল্লাহ মু'মিনদেরকে কাফিরদের রীতিনীতি হতে বিরত রাখছেন। তিনি বলেছেনঃ “তারা যেমন নিজেদের বিবেক অনুযায়ী হালাল ও হারাম বানিয়ে নিয়েছে, তোমরা তদ্রুপ করো না। তারা পরস্পর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, অমুক নামের জন্তু বড়ই সম্মান ও মর্যাদার পাত্র। যেমন ‘বাহীরা', ‘সায়েবা’, ওয়াসীলা ইত্যাদি।” তাই, মহান আল্লাহ বলেনঃ “আল্লাহ তাআলার উপর মিথ্যা আরোপ করে তোমরা কোন কিছুকে হালাল ও হারাম বানিয়ে নিয়ো না।” এর মধ্যে এটাও থাকলো যে, কেউ যেন নিজের পক্ষ হতে কোন বিদআত বের না করে যার কোন শরীয়ী দলীল নেই। কিংবা আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা হালাল এবং যা হালাল করেছেন তা হারাম করে না নেয়। কেউ যেন নিজের মতানুসারে কোন হুকুম আবিস্কার না করে।
(আরবি) এর মধ্যে (আরবি) টি রূপে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ তোমরা তোমাদের জিহবার মিথ্যা বর্ণনার দ্বারা হালালকে হারাম করে নিয়ো না। এই ধরনের লোক দুনিয়ার সফলতা এবং আখেরাতের পরিত্রাণ থেকে বঞ্চিত থাকে। দুনিয়ায় যদিও কিছুটা সুখভোগ করে, কিন্তু মৃত্যুর সাথে সাথেই ভয়াবহ শাস্তির তারা শিকার হয়ে যাবে। এই পার্থিব জগতে সামান্য সুখের স্বাদ তারা গ্রহণ করুক, পরকালে ভীষণ শাস্তি তাদের জন্যে অপেক্ষা করছে। যখন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “নিশ্চয় যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে তারা পরিত্রাণ পাবে না।” অর্থাৎ দুনিয়াতেও নয়, আখেরাতেও নয়। আর এক আয়াতে রয়েছেঃ “নিশ্চয় যারা মিথ্যা আরোপ করে, তারা সফলকাম হবে না। দুনিয়ায় তারা সামান্য সুখভোগ করবে, আমারই নিকট তাদের প্রত্যাবর্তন স্থল; অতঃপর আমি তাদেরকে তাদের কুফরীর কারণে কঠিন শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাবো।”
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।