আল কুরআন


সূরা আল-হিজর (আয়াত: 43)

সূরা আল-হিজর (আয়াত: 43)



হরকত ছাড়া:

وإن جهنم لموعدهم أجمعين ﴿٤٣﴾




হরকত সহ:

وَ اِنَّ جَهَنَّمَ لَمَوْعِدُهُمْ اَجْمَعِیْنَ ﴿۟ۙ۴۳﴾




উচ্চারণ: ওয়া ইন্না জাহান্নামা লামাও‘ইদুহুম আজমা‘ঈন।




আল বায়ান: ‘আর নিশ্চয় জাহান্নাম তাদের সকলের প্রতিশ্রুত স্থান’।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪৩. আর নিশ্চয় জাহান্নাম তাদের সবারই প্রতিশ্রুত স্থান,




তাইসীরুল ক্বুরআন: আর তাদের সবার জন্য অবশ্যই ওয়া‘দাকৃত স্থান হচ্ছে জাহান্নাম।




আহসানুল বায়ান: (৪৩) অবশ্যই (তোমার অনুসারীদের) তাদের সবারই প্রতিশ্রুত স্থান হবে জাহান্নাম।’ [1]



মুজিবুর রহমান: অবশ্যই তোর অনুসারীদের সবারই নির্ধারিত স্থান হবে জাহান্নাম।



ফযলুর রহমান: আর জাহান্নামই হল তাদের (বিপথগামীদের) সকলের প্রতিশ্রুত স্থান।



মুহিউদ্দিন খান: তাদের সবার নির্ধারিত স্থান হচ্ছে জাহান্নাম।



জহুরুল হক: "আর নিঃসন্দেহ জাহান্নাম হচ্ছে তাদের সকলের জন্য প্রতি‌শ্রুত স্থান --



Sahih International: And indeed, Hell is the promised place for them all.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৪৩. আর নিশ্চয় জাহান্নাম তাদের সবারই প্রতিশ্রুত স্থান,


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৪৩) অবশ্যই (তোমার অনুসারীদের) তাদের সবারই প্রতিশ্রুত স্থান হবে জাহান্নাম।’ [1]


তাফসীর:

[1] যত লোক তোমার অনুসরণ করবে তাদের সকলের স্থান হবে জাহান্নাম।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ২৬-৫০ নং আয়াতের তাফসীর:



প্রথম দু’ আয়াতে মূলত মানুষ ও জিনকে কোন্ পদার্থ থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে সে কথা বলা হয়েছে। মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে শুস্ক ঠনঠনে মাটি থেকে আর জিনকে সৃষ্টি করা হয়েছে প্রখর শিখাযুক্ত অগ্নি হতে।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ صَلْصَالٍ كَالْفَخَّارِ وَخَلَقَ الْجَآنَّ مِنْ مَّارِجٍ مِّنْ نَّارٍ)‏



“মানুষকে (আদমকে) তিনি সৃষ্টি করেছেন পোড়া মাটির মত শুকনো মাটি হতে, আর জিনকে সৃষ্টি করেছেন অগ্নি শিখা হতে।” (সূরা আর রহমান: ৫৫:১৪-১৫)



অর্থাৎ মানুষ হল মাটির তৈরি জাতি আর জিন হল আগুনের তৈরি জাতি।



صَلْصَالٍ হল এমন মাটি যা শুকিয়ে গেলে তাতে ঠনঠন শব্দ হয়।



(حَمَإٍ مَّسْنُوْنٍ)



হল এমন মাটি যা দীর্ঘদিন অতিবাহিত হওয়ার ফলে তার রং ও গন্ধ পরিবর্তন হয়ে গেছে। جن অর্থ ঢাকা, জিনেরা যেহেতু মানুষের চোখের আড়ালে থাকে তাই তাদেরকে الْجَآنَّ বা জিন বলা হয়। السَّمُوْمِ বলা হয় আগুন যার কোন ধোঁয়া নেই। مِنْ قَبْلُ বলতে মানুষের পূর্বে, অর্থাৎ মানুষের পূর্বে আল্লাহ তা‘আলা প্রখর আগুন থেকে জিন জাতিকে সৃষ্টি করেছেন। হাদীসে এসেছে: ফেরেশতাদেরকে নূর হতে সৃষ্টি করা হয়েছে, জিনকে সৃষ্টি করা হয়েছে শিখাযুক্ত আগুন হতে আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে যা তোমাদের সামনে বর্ণনা করা হল। (সহীহ বুখারী হা: ২৯৯৬)



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা আদমের সৃষ্টি সমাপ্ত করার পর সকল ফেরেশতাকে নির্দেশ দিলেন তাকে সিজদা করার জন্য। সকল ফেরেশতা সিজদা করেছে শুধুমাত্র ইবলীস তাকে সিজদা করেনি। এখানে সিজদা মূলত ইবাদত করার উদ্দেশ্যে ছিল না, বরং আদমের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা বুঝানোর জন্য এ নির্দেশ দেয়া হয়েছে।



ইবলীস সে অহংকার করল, সিজদা করতে অস্বীকার করল এবং যুক্তি পেশ করল যে, আমাকে আগুন দ্বারা তৈরি করা হয়েছে আর আদমকে মাটি দ্বারা, আগুনের কাজ ওপরে উঠা আর মাটির কাজ নিচে নামা। সুতরাং আমি তাকে সিজদা করতে পারি না।



আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সম্পর্কে বলেন:



(وَاِذْ قُلْنَا لِلْمَلٰ۬ئِکَةِ اسْجُدُوْا لِاٰدَمَ فَسَجَدُوْٓا اِلَّآ اِبْلِیْسَﺚ اَبٰی وَاسْتَکْبَرَﺡ وَکَانَ مِنَ الْکٰفِرِیْنَ)‏



“আর (স্মরণ কর) আমি যখন ফেরেশতাগণকে বললাম, তোমরা আদমকে সিজদা কর, তখন ইবলিস ব্যতীত সকলে সিজদা করেছিল। সে অস্বীকার করল ও অহংকার করল এবং কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।” (সূরা বাক্বারাহ ২:৩৪)



আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:



(إِلَّآ إِبْلِيْسَ ط اِسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكٰفِرِيْنَ)‏



“কেবল ইবলীস ব্যতীত। সে অহঙ্কার করল এবং কাফিরদের দলভুক্ত হয়ে গেল।” (সূরা সোয়াদ ৩৮:৭৪)



ইবলীসের যুক্তি সম্পর্কে মহান আল্লাহর বাণী:



(قَالَ مَا مَنَعَكَ أَلَّا تَسْجُدَ إِذْ أَمَرْتُكَ ط قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِّنْهُ ج خَلَقْتَنِيْ مِنْ نَّارٍ وَّخَلَقْتَه۫ مِنْ طِيْنٍ)



“তিনি (আল্লাহ) বললেন: ‘আমি যখন তোমাকে আদেশ দিলাম তখন কিসে তোমাকে সিজদা দিতে বারণ করল?’ সে বলল: ‘আমি তার অপেক্ষা উত্তম; আপনি আমাকে অগ্নি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে কর্দম দ্বারা সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা আ‘রাফ ৭:১২)



এরূপ সূরা সোয়াদের ৭৫-৭৬ নং আয়াতে বলা হয়েছে।



আল্লাহ তা‘আলা ইবলীসকে যে জান্নাতে বসবাস করতে দিয়েছিলেন তার এই অবাধ্য হওয়ার কারণে তাকে সেই জান্নাত থেকে বের করে দিলেন।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(قَالَ فَاهْبِطْ مِنْهَا فَمَا يَكُوْنُ لَكَ أَنْ تَتَكَبَّرَ فِيْهَا فَاخْرُجْ إِنَّكَ مِنَ الصّٰغِرِيْنَ)‏



“তিনি বললেন: ‘এ স্থান হতে নেমে যাও, এখানে থেকে অহঙ্কার করবে, এটা হতে পারে না। সুতরাং বের হয়ে যাও, তুমি অধমদের অন্তর্ভুক্ত।’’ (সূরা আ‘রাফ ৭:১৩) এবং আল্লাহ তা‘আলা তার ওপর অভিশম্পাত করলেন।



যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَّإِنَّ عَلَيْكَ لَعْنَتِيْٓ إِلٰي يَوْمِ الدِّيْنِ)‏



“এবং তোমার প্রতি আমার অভিশাপ ক্বিয়ামত দিবস পর্যন্ত।” (সূরা স্ব-দ ৩৮:৭৮)



ইবলীস অভিশপ্ত হয়ে জান্নাত থেকে যখন বহিষ্কৃত হল তখন আল্লাহ তা‘আলার কাছে সে কিয়ামত পর্যন্ত জীবন আয়ুর অবকাশ দেয়ার জন্য প্রার্থনা করল। আল্লাহ তা‘আলা তাকে الْوَقْتِ الْمَعْلُوْمِ বা কিয়ামত পর্যন্ত জীবন আয়ুর অবকাশ দিলেন। ইবলীস শপথ করে বলেছিল, ‘‘হে আমার প্রতিপালক! আপনি যে জন্য আমাকে বিপথগামী করেছেন সেজন্য আমি পৃথিবীতে মানুষের নিকট পাপকর্মকে অবশ্যই শোভন করে তুলব এবং আমি তাদের সকলকেই বিপথগামী করব।”



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(قَالَ فَبِعِزَّتِكَ لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِيْنَ)‏



“সে বলল: তোমার‎ ইযযতের শপথ! আমি তাদের সবাইকে পথভ্রষ্ট করবই।” (সূরা স্ব-দ ৩৮:৮২)



কিভাবে পথভ্রষ্ট করবে তা অন্যত্র বলা হয়েছে, সে মানুষের কাছে পাপ কাজসমূহকে সৌন্দর্যমণ্ডিত ও চাকচিক্যময় করে তুলে ধরবে। ফলে মানুষ তাতে লিপ্ত হবে।



আল্লাহ তা‘আলা ইবলীসের কথা তুলে ধরে বলেন:



(ثُمَّ لَاٰتِيَنَّهُمْ مِّنْۭ بَيْنِ أَيْدِيْهِمْ وَمِنْ خَلْفِهِمْ وَعَنْ أَيْمَانِهِمْ وَعَنْ شَمَا۬ئِلِهِمْ ط وَلَا تَجِدُ أَكْثَرَهُمْ شٰكِرِيْنَ)‏



“অতঃপর আমি তাদের নিকট আসবই তাদের সম্মুখ, পশ্চাৎ , ডান ও বাম দিক হতে এবং তুমি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবে না।’’ (সূরা আ‘রাফ ৭:১৭)



আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:



(قَالَ أَرَأَيْتَكَ هٰذَا الَّذِيْ كَرَّمْتَ عَلَيَّ ز لَئِنْ أَخَّرْتَنِ إِلٰي يَوْمِ الْقِيَامَةِ لَأَحْتَنِكَنَّ ذُرِّيَّتَه۫ٓ إِلَّا قَلِيْلًا)‏



“সে বলেছিল: আপনি কি বিবেচনা করেছেন, আপনি আমার ওপর এ ব্যক্তিকে মর্যাদা দান করলেন, কিয়ামতের দিন পর্যন্ত‎ যদি আমাকে অবকাশ দেন তাহলে আমি অল্প কয়েকজন ব্যতীত তার বংশধরগণকে অবশ্যই কর্তৃত্বাধীন করে ফেলব।’’ (সূরা ইসরা ১৭:৬২)



তবে যারা আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দা তারা শয়তানের ধোঁকায় পড়ে পথভ্রষ্ট হবে না।



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِيْنَ)‏



“কিন্তু তাদের মধ্যে যারা তোমার‎ একনিষ্ঠ বান্দা, তাদের ছাড়া।” (সূরা সোয়াদ ৩৮:৮৩)



সে কেবল যারা অন্যায় কাজে লিপ্ত থাকবে তাদেরকেই পথভ্রষ্ট করবে, অন্যদেরকে নয়।



আল্লাহ তা‘আলার সৎ বান্দাদের ওপর তার কোনই কর্তৃত্ব থাকবেনা। এর অর্থ এই নয় যে, তাদের দ্বারা কোন পাপ কাজ হবে না। বরং উদ্দেশ্য হল তারা এমন কোন পাপ করবে না, যার পর তারা লজ্জিত হবে না বা তাওবা করবে না। কারণ সে পাপই মানুষের ধ্বংসের কারণ হয় যার পর মানুষ অনুতপ্ত হয় না এবং তাওবাও করে না। মানুষ পাপ করতে পারে এটাই স্বাভাবিক, তবে পাপ কাজ করার পর তাওবা করলে তাকে পাকড়াও করা হবে না। কোন ব্যক্তির ভুলবশত পাপ হয়ে যাওয়ার পর তাওবা করলে আল্লাহ তা‘আলা তার চেয়ে বেশি খুশি হন যেমন মরুভূমিতে কারো খাদ্য ও পানীয়সহ বাহন হারিয়ে যাওয়ার পর তা ফিরে পেলে খুশি হয়।



আর যারা ইবলীসের অনুসরণ করবে তারাই হবে বিভ্রান্ত। আর তারাই জাহান্নামে প্রবেশ করবে।



سَبْعَةُ أَبْوَابٍ



অর্থাৎ প্রত্যেক দরজা এক এক ধরনের বিশেষ লোকদের জন্য নির্দিষ্ট হবে। যেমন একটি হবে মুশকিরকদের জন্য, একটি হবে নাস্তিকদের জন্য, একটি হবে ধর্মদ্রোহীদের জন্য, একটি হবে ব্যভিচারীদের জন্য, একটি হবে সুদখোর ও চোর-ডাকাতদের জন্য, এরূপ আলাদা আলাদা হবে। অথবা সাতটি দরজা বলতে জাহান্নামের সাতটি স্তরকে বুঝানো হয়েছে। প্রথমটির নাম জাহান্নাম, তারপর লাযা, তারপর হুতামাহ, তারপর সায়ীর, তারপর সাকার, তারপর জাহীম, তারপর হাবিয়াহ। সবার উপরের স্তরটি আল্লাহ তা‘আলার একত্বে বিশ্বাসীদের জন্য হবে। তাদেরকে পাপ অনুপাতে কিছুদিন শাস্তি দিয়ে অথবা সুপারিশ করার পর বের করা হবে। দ্বিতীয়টি ইয়াহূদী, তৃতীয়টি খ্রিস্টান, চতুর্থটি সাবী, পঞ্চমটি অগ্নিপূজক, ষষ্ঠটি মুশরিকদের জন্য এবং সর্বনিম্ন স্তর সপ্তমটি মুনাফিকদের জন্য। (ফাতহুল কাদীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)



পক্ষান্তরে আল্লাহ তা‘আলার সৎ বান্দাগণ নেয়ামতপূর্ণ জান্নাতে থাকবে, সকল বিপদাপদ থেকে শান্তি এবং সকল প্রকার ভয় হতে নিরাপত্তায় থাকবে।



আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



“যা তাদের প্রতিপালক তাদেরকে প্রদান করবেন; তা তারা গ্রহণ করবে। নিশ্চয়ই তারা ইতোপূর্বে সৎকর্মপরায়ণ ছিল। তারা রাতের সামান্য অংশই নিদ্রাবস্থায় অতিবাহিত করত। রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত। এবং তাদের ধন-সম্পদে রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতের হক্ব।” (সূরা যারিআত ৫১:১৫-১৯)



আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:



“মুত্তাকীরা থাকবে নিরাপদ স্থানে উদ্যান ও ঝর্ণার মাঝে, তারা পরিধান করবে মিহি ও পুরু রেশমী বস্ত্র এবং তারা মুখোমুখী হয়ে বসবে, এরূপই ঘটবে; তাদেরকে বিবাহ দিয়ে দেব বড় বড় চক্ষুবিশিষ্ট পরমা সুন্দরীদের সাথে। সেখানে তারা প্রশান্ত চিত্তে বিবিধ ফল-মূল আনতে বলবে। প্রথম মৃত্যুর পর তারা সেখানে আর মৃত্যু আস্বাদন করবে না। তিনি তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি হতে রক্ষা করবেন তোমার প্রতিপালকের নিজ অনুগ্রহে। এটাই তো মহা সাফল্য।” (সূরা দুখান ৪৪:৫১-৫৭)



আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:



“নিশ্চয়ই মুত্তাকীরা থাকবে জান্নাতে ও ভোগ-বিলাসে, তাদের প্রতিপালক তাদেরকে যা দিবেন তারা তা উপভোগ করবে এবং তিনি তাদেরকে রক্ষা করবেন জাহান্নামের আযাব হতে তোমরা তৃপ্তির সাথে পানাহার কর, তোমরা যা করতে তার প্রতিদানস্বরূপ। তারা শ্রেণীবদ্ধভাবে সজ্জিত আসনে হেলান দিয়ে বসবে; আমি তাদের বিয়ে দেব সুনয়না (বড় বড় চক্ষুবিশিষ্ট) হূরের সঙ্গে।” (সূরা তুর ৫২:১৭-২০) এছাড়া অসংখ্য আয়াত রয়েছে।



(وَنَزَعْنَا مَا فِيْ صُدُوْرِهِمْ مِّنْ غِلٍّ)

অর্থাৎ পৃথিবীতে তাদের মধ্যে যে হিংসে-বিদ্বেষ, ঘৃণা বা শত্র“তা ছিল, তা তাদের অন্তর থেকে বের করে নেয়া হবে। যার ফলে তাদের অন্তর হবে একে অপরের জন্য আয়নার মত স্বচ্ছ ও পরিস্কার।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَنَزَعْنَا مَا فِيْ صُدُوْرِهِمْ مِّنْ غِلٍّ تَجْرِيْ مِنْ تَحْتِهِمُ الْأَنْهٰرُ ج وَقَالُوا الْحَمْدُ لِلّٰهِ الَّذِيْ هَدٰنَا لِهٰذَا)



“আমি তাদের অন্তর হতে হিংসে-বিদ্বেষ দূর করে দিব, তাদের পাদদেশে প্রবাহিত হবে নদী এবং তারা বলবে, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই যিনি আমাদেরকে এর পথ দেখিয়েছেন।” (সূরা আ‘রাফ ৭:৪৩)



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: মু’মিনদেরকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দানের পর জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যস্থলে অবস্থিত পুলের উপর আটক করা হবে এবং দুনিয়ায় যে তারা একে অপরের উপর জুলুম করেছিল তারা একে অপর হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করবে। অতঃপর তারা যখন হিংসে-বিদ্বেষ মুক্ত অন্তরের অধিকারী হয়ে যাবে তখন তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে। (সহীহ বুখারী হা: ৬৫৩৫)



مُّتَقٰبِلِيْنَ অর্থাৎ জান্নাতীরা জান্নাতের খাটের ওপর মুখোমুখি হয়ে বসবে।



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(عَلٰی سُرُرٍ مَّوْضُوْنَةٍﭞﺫ مُّتَّکِئِیْنَ عَلَیْھَا مُتَقٰبِلِیْنَﭟ یَطُوْفُ عَلَیْھِمْ وِلْدَانٌ مُّخَلَّدُوْنَﭠﺫ بِاَکْوَابٍ وَّاَبَارِیْقَﺃ وَکَاْسٍ مِّنْ مَّعِیْنٍﭡ)



“তারা থাকবে স্বর্ণখচিত আসনসমূহে, তার ওপরে হেলান দিয়ে পরস্পর মুখোমুখি হয়ে বসবে। তাদের সেবায় ঘোরাফেরা করবে চির কিশোরেরা। পানপাত্র, ঘটি ও শরাবে পরিপূর্ণ পেয়ালা নিয়ে, (এরা হাজির হবে।) (সূরা ওয়াকিয়া ৫৬:১৫-১৮)



জান্নাতে মু’মিনদের কোন কষ্ট থাকবে না, তারা সেখানে চিরস্থায়ীরূপে থাকবে।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(الَّذِيْٓ أَحَلَّنَا دَارَ الْمُقَامَةِ مِنْ فَضْلِه۪ ج لَا يَمَسُّنَا فِيْهَا نَصَبٌ وَّلَا يَمَسُّنَا فِيْهَا لُغُوْبٌ)‏



“যিনি স্বীয় অনুগ্রহে আমাদেরকে অনন্ত নির্বাসে স্থান দিয়েছেন, সেখানে আমাদেরকে কোন কষ্টও স্পর্শ করে না এবং সেথায় আমাদেরকে কোন ক্লান্তিও স্পর্শ করে না।” (সূরা ফাতির ৩৫:৩৫)



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(اِنَّ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ کَانَتْ لَھُمْ جَنّٰتُ الْفِرْدَوْسِ نُزُلًا﮺ﺫ خٰلِدِیْنَ فِیْھَا لَا یَبْغُوْنَ عَنْھَا حِوَلًا﮻)‏



“নিশ্চয়ই‎ যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তাদের আপ্যায়নের জন্য আছে ফিরদাউসের উদ্যান, সেথায় তারা স্থায়ী হবে, তা হতে স্থানান্ত‎র কামনা করবে না।” (সূরা কাহফ ১৮:১০৭-১০৮)



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: জান্নাতীদেরকে বলা হবে যে, হে জান্নাতীগণ! তোমরা চিরকাল সুস্থ থাকবে, কখনো রোগাক্রান্ত হবে না; সর্বদা জীবিত থাকবে কখনো মৃত্যুবরণ করবে না; সর্বদা যুবকই থাকবে কখনো বৃদ্ধ হবে না; চিরকাল এখানেই থাকবে কখনো বের হবে না। (সহীহ মুসলিম হা: ২৮৩৭)

অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন সকলকে জানিয়ে দেয়ার জন্য যে, আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমাশীল ও দয়ালু, আবার তিনি কঠিন শাস্তিদাতাও।



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:



لَوْ يَعْلَمُ الْمُؤْمِنُ مَا عِنْدَ اللّٰهِ مِنَ الْعُقُوبَةِ، مَا طَمِعَ بِجَنَّتِهِ أَحَدٌ، وَلَوْ يَعْلَمُ الْكَافِرُ مَا عِنْدَ اللّٰهِ مِنَ الرَّحْمَةِ، مَا قَنَطَ مِنْ جَنَّتِهِ أَحَدٌ



মু’মিন যদি জানত আল্লাহর কাছে কত কঠিন শাস্তি রয়েছে তাহলে কেউ জান্নাতের আশা করত না। কাফির যদি জানত আল্লাহর কাছে কত রহমত রয়েছে তাহলে কেউ জান্নাত থেকে নিরাশ হত না। (সহীহ মুসলিম হা: ২৭৫৫)



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



أَعْدَدْتُ لِعِبَادِي الصَّالِحِينَ مَا لاَ عَيْنٌ رَأَتْ، وَلاَ أُذُنٌ سَمِعَتْ، وَلاَ خَطَرَ عَلَي قَلْبِ بَشَرٍ



আমি আমার বান্দার জন্য এমন কিছু তৈরি করে রেখেছি যা কোন চক্ষু দেখেনি, কোন কান শোনেনি এমনকি কোন মানুষের অন্তরে কল্পনায় আসেনি। (সহীহ বুখারী হা: ৩২৪৪, সহীহ মুসলিম হা: ২৮২৪)



সুতরাং এ নেয়ামতপূর্ণ জান্নাত তাদের জন্যই প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে যারা আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে চলবে এবং সৎআমল করবে। সুতরাং আমাদের উচিত সর্বদা আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে চলা এবং বেশি বেশি সৎ আমল করা।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. মানুষকে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে আর জিনকে সৃষ্টি করা হয়েছে আগুন থেকে।

২. সর্বপ্রথম যুক্তি পেশ করেছিল ইবলীস।

৩. আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ মানার ব্যাপারে কোন প্রকার যুক্তি-তর্ক পেশ করা চলবে না।

৪. জাহান্নামের সাতটি দরজা রয়েছে।

৫. শয়তান মানুষের মাধ্যমে খারাপ কাজ করানোর জন্য সর্বদা ওঁৎ পেতে রয়েছে।

৬. ইবলীস থেকে আল্লাহ তা‘আলার সৎ বান্দাদের ক্ষমতা অনেক বেশি।

৭. মুত্তাকিদের জন্য আল্লাহ তা‘আলা এমন নেয়ামতপূর্ণ জান্নাত তৈরি করে রেখেছেন যা কল্পনাতীত।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৩৯-৪৪ নং আয়াতের তাফসীর

আল্লাহ তাআলা ইবলীসের অবাধ্যতা ও হঠকারিতার খবর দিতে গিয়ে। বলছেন যে, সে শপথ করে বলেঃ “হে আমার প্রতিপালক! যেহেতু আপনি আমাকে বিপথগামী করলেন সে হেতু আমি পৃথিবীতে বনি আদমের নিকট আপনার বিরোধিতা ও অবাধ্যতামূলক কাজকে শোভনীয় করে তুলবো এবং তাদেরকে উৎসাহিত করে আপনার বিরুদ্ধাচরণে জড়িয়ে ফেলবো। সকলকেই পথ ভষ্ট করতে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। তবে হ্যা যারা আপনার খাটি ও একনিষ্ট বান্দা তাদের উপর আমার কোন হাত থাকবে না। যেমন অন্য এক জায়গায় মহান আল্লাহ ইবলীসের উক্তি উদ্ধৃত করেনঃ “বলুন, তাকে (আদম, আঃ কে) যে আপনি আমার উপর মর্যাদা দান করলেন, কেন? কিয়ামতের দিন পর্যন্ত যদি আমাকে অবকাশ দেন তা হলে আমি অল্প কয়েকজন ব্যতীত তার বংশধরদেরকে কর্তৃত্বাধীন করে ফেলবো।” উত্তরে আল্লাহ তাআলা তাকে ধমকের সুরে বলেনঃ “এটাই আমার নিকট পৌছার সরল পথ। অর্থাৎ তোমাদের সকলকে আমারই কাছে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। অতঃপর আমি তোমাদেরকে তোমাদের কৃতকর্মের বিনিময় প্রদান করবো। ভাল হলে ভাল বিনিময় হবে এবং মন্দ হলে মন্দ বিনিময় হবে। যেমন আল্লাহ তাআলার উক্তি রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমার প্রতিপালক অবশ্যই সতর্ক দৃষ্টি রাখেন।” (৮৯:১৪)।

(আরবি) শব্দটি একটি কিরআতে (আরবি) ও রয়েছে। যেমন অন্য একটি আয়াতে আছেঃ (আরবি) (৪৩:১৪) তখন এর অর্থ হবে বুলন্দ বা উচ্চ। কিন্তু প্রথম কিরআতটিই প্রসিদ্ধতর।

ঘোষিত হচ্ছেঃ ‘বিভ্রান্তদের মধ্যে যারা তোমার অনুসরণ করবে তারা ছাড়া আমার বান্দাদের উপর তোমার কোন ক্ষমতা থাকবে না। এটা হচ্ছে ‘ইসতিসনা মুনকাতা। ইয়াযীদ ইবনু কুসাইত (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবীদের মসজিদ তাঁদের গ্রামের বাইরে থাকতো যখন তারা তাঁদের প্রতিপালকের নিকট থেকে কোন বিশেষ বিষয় জানতে চাইতেন তখন সেখানে গিয়ে তাঁরা আল্লাহ তাআলা কর্তৃক নির্ধারণকৃত নামায আদায় করতেন। অতঃপর প্রার্থনা জানাতেন। একদিন একজন নবী তাঁর মসজিদে অবস্থান করছিলেন। এমন সময় আল্লাহর শত্রু অর্থাৎ ইবলীস তাঁর ও তাঁর কিবলার মাঝে বসে পড়ে। তখন ঐ নবী তিন বার বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি বিতাড়িত শয়তান হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।” তখন আল্লাহর শত্রু নবীকে বলেঃ “কি করে আপনি আমার (অনিষ্ট) থেকে মুক্তি পেয়ে থাকেন। সেই খবর আমাকে দিন।” নবী (আঃ) তখন তাকে বলেনঃ “তুমি বরং আমাকে খবর দাও কিভাবে তুমি বণী আদমের উপর জয়যুক্ত হয়ে থাকো।” শেষ পর্যন্ত একে অপরকে সঠিক খবর বলে দেয়ার চুক্তি হয়ে যায়। নবী (আঃ) তাকে বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ “নিশ্চয় বিভ্রান্তদের মধ্যে যারা তোমার অনুসরণ করবে তারা ছাড়া আমার বান্দাদের উপর তোমার কোন কর্তত্ব থাকবে না।” তখন আল্লাহর দুশমন (ইবলীস) বলেঃ “এটা তো আমি আপনার জন্মেরও পূর্ব হতে জানি।” তার এ কথা শুনে নবী (আঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আরো বলেছেনঃ “যদি শয়তানের কুমন্ত্রণা তোমাকে প্ররোচিত করে তবে তুমি আল্লাহর শরণাপন্ন হবে, তিনি তো সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। আল্লাহর শপথ! তোমার আগমনের আভাস পাওয়া মাত্রই আমি আল্লাহ তাআলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকি।” আল্লাহর শত্রু তখন বলেঃ “আপনি সত্য বলেছেন। এর দ্বারাই আপনি আমার (কুমন্ত্রণা) হতে। মুক্তি পেয়ে থাকেন।” অতঃপর নবী (আঃ) তাকে বলেনঃ “এবার কিভাবে তুমি বনী আদমের উপর জয়যুক্ত হয়ে থাকো। সেই খবর আমাকে প্রদান। করো।” সে বলেঃ “আমি ক্রোধ ও কুপ্রবৃত্তির সময় তাকে পাকড়াও করে থাকি।” (এটা ইবনু জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

আল্লাহ পাক বলেনঃ “অবশ্যই তোমার অনুসারীদের সবারই নির্ধারিত স্থান হবে জাহান্নাম। যেমন কুরআন কারীমে এ সম্পর্কে রয়েছেঃ “দলসমূহের কেউ এটাকে অমান্য করলে তার নির্ধারিত স্থান হবে জাহান্নাম।”

এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “ওর (জাহান্নামের) সাতটি দরজা রয়েছে। নিজ নিজ প্রত্যেক দরজার জন্যে পৃথক পৃথক দল আছে। প্রত্যেক দরজা দিয়ে গমনকারী ইবলীসী দল নির্ধারিত রয়েছে নিজ নিজ আমল অনুযায়ী তাদের জন্যে দরজা বন্টন করা আছে।

হযরত আলী ইবনু আবি তালিব (রাঃ) তাঁর এক ভাষণে বলেনঃ “জাহান্নামের দরজাগুলি এইভাবে রয়েছে অর্থাৎ একের উপর একটি। ঐ গুলি রয়েছে সাতটি। একটির পর একটি করে সাতটি দরজা পূর্ণ হয়ে যাবে।” হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, সাতটি স্তর রয়েছে। ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) সাতটি দরজার নিম্নরূপ নাম বলেছেনঃ (১) জাহান্নাম, (২) লাযা, (৩) হুতামাহ (৪) সাঈর, (৫) সাকার, (৬) জাহীম এবং (৭) হাবীয়াহ। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতেও অনুরূপ বর্ণিত আছে। কাতাদা (রঃ) বলেন, এগুলি হবে আমল হিসেবে মনযিল। যেমন একটি দরজা ইয়াহূদীদের, একটি খৃস্টানদের, একটি সাবেঈদের, একটি মাজুসদের, একটি মুশরিকদের, একটি কাফিরদের, একটি মুনাফিকদের এবং একটি একত্ববাদীদের। কিন্তু একত্ববাদীদের মুক্তি লাভের আশা রয়েছে। আর বাকী সব নিরাশ হয়ে যাবে।

হযরত ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “জাহান্নামের সাতটি দরজা রয়েছে। ওগুলির মধ্যে একটি দরজা ঐ লোকদের জন্যে যারা আমার উম্মতের বিরুদ্ধে তরবারী ধারণ করেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত সামুরা ইবনু জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এই আয়াতের তাফসীরে বলেনঃ “আগুন জাহান্নামবাসীদের কারো কারো হাঁটু পর্যন্ত ধরবে, কারো ধরবে কোমর পর্যন্ত এবং কারো ধরবে কাঁধ পর্যন্ত। মোট কথা, এ সব তাদের আমল অনুপাতে হবে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।