সূরা ইবরাহীম (আয়াত: 6)
হরকত ছাড়া:
وإذ قال موسى لقومه اذكروا نعمة الله عليكم إذ أنجاكم من آل فرعون يسومونكم سوء العذاب ويذبحون أبناءكم ويستحيون نساءكم وفي ذلكم بلاء من ربكم عظيم ﴿٦﴾
হরকত সহ:
وَ اِذْ قَالَ مُوْسٰی لِقَوْمِهِ اذْکُرُوْا نِعْمَۃَ اللّٰهِ عَلَیْکُمْ اِذْ اَنْجٰکُمْ مِّنْ اٰلِ فِرْعَوْنَ یَسُوْمُوْنَکُمْ سُوْٓءَ الْعَذَابِ وَ یُذَبِّحُوْنَ اَبْنَآءَکُمْ وَ یَسْتَحْیُوْنَ نِسَآءَکُمْ ؕ وَ فِیْ ذٰلِکُمْ بَلَآءٌ مِّنْ رَّبِّکُمْ عَظِیْمٌ ﴿۶﴾
উচ্চারণ: ওয়া ইয কা-লা মূছা-লিকাওমিহিযকুরূনি‘মাতাল্লা-হি ‘আলাইকুম ইযআনজা-কুম মিন আ-লি ফির‘আওনা ইয়াছূমূনাকুম ছুূআল ‘আযা-বি ওয়া ইউযাব্বিহূনা আবনাআকুম ওয়া ইয়াছতাহইউনা নিছাআকুম ; ওয়া ফী যা-লিকুম বালাউম মির রাব্বিকুম ‘আজীম।
আল বায়ান: আর যখন মূসা তার কওমকে বলেছিল, তোমাদের প্রতি আল্লাহর নিয়ামাত স্মরণ কর, যখন তিনি তোমাদেরকে ফির‘আউন পরিবারের কবল থেকে রক্ষা করেছেন, তারা তোমাদের জঘন্য আযাব দিত। আর তারা তোমাদের ছেলেদেরকে যবেহ করত এবং নারীদেরকে জীবিত রাখত। আর তাতে ছিল তোমাদের রবের পক্ষ থেকে মহাপরীক্ষা।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৬. আর স্মরণ করুন, যখন মূসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, তোমাদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর(১) যখন তিনি তোমাদেরকে রক্ষা করেছিলেন ফিরআউন গোষ্ঠীদের কবল হতে, যারা তোমাদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তি দিত, তোমাদের পুত্রদেরকে যবেহ করত এবং তোমাদের নারীদেরকে জীবিত রাখত; আর এতে ছিল তোমাদের রবের পক্ষ থেকে এক মহাপরীক্ষা।(২)
তাইসীরুল ক্বুরআন: স্মরণ কর, যখন মূসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, ‘তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর নি‘মাতের কথা স্মরণ কর যখন তিনি তোমাদেরকে ফির‘আওনী গোষ্ঠী থেকে রক্ষা করেছিলেন যারা তোমাদেরকে জঘন্য রকমের শাস্তিতে পিষ্ট করছিল। তোমাদের পুত্রদেরকে তারা হত্যা করত আর তোমাদের নারীদেরকে জীবিত রাখত। এটা ছিল তোমাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে এক কঠিন পরীক্ষা।
আহসানুল বায়ান: (৬) যখন মূসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, ‘তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহকে স্মরণ কর; যখন তিনি তোমাদেরকে রক্ষা করেছিলেন ফিরআউনীয় সম্প্রদায়ের কবল হতে, যারা তোমাদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তি দিত, তোমাদের পুত্রদেরকে যবেহ করত এবং তোমাদের নারীদেরকে জীবিত রাখত। আর এতে ছিল তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে এক মহাপরীক্ষা।[1]
মুজিবুর রহমান: যখন মূসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিলঃ তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর যখন তিনি তোমাদেরকে রক্ষা করেছিলেন ফির‘আউন সম্প্রদায়ের কবল হতে যারা তোমাদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তি দিত, তোমাদের পুত্রদেরকে যবাহ করত ও তোমাদের নারীদেরকে জীবিত রাখত; এবং এতে ছিল তোমাদের রবের পক্ষ হতে এক মহা পরীক্ষা।
ফযলুর রহমান: (স্মরণ করো) যখন মূসা তার লোকদেরকে বলেছিল, “তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করো, যখন তিনি তোমাদেরকে ফেরাউনের লোকদের থেকে রক্ষা করেছিলেন। তারা তোমাদেরকে নিকৃষ্ট ধরনের শাস্তি দিত: তোমাদের ছেলেদেরকে জবাই করত আর নারীদেরকে জীবিত রাখত। আর এতে ছিল তোমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে এক মহাপরীক্ষা।”
মুহিউদ্দিন খান: যখন মূসা স্বজাতিকে বললেনঃ তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর যখন তিনি তোমাদেরকে ফেরাউনের সম্প্রদায়ের কবল থেকে মুক্তি দেন। তারা তোমাদেরকে অত্যন্ত নিকৃষ্ট ধরনের শাস্তি দিত, তোমাদের ছেলেদেরকে হত্যা করত এবং তোমাদের মেয়েদেরকে জীবিত রাখত। এবং এতে তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে বিরাট পরীক্ষা হয়েছিল।
জহুরুল হক: আর স্মরণ করো! মূসা তাঁর সম্প্রদায়কে বললেন -- "তোমাদের প্রতি আল্লাহ্র অনুগ্রহ স্মরণ করো -- যখন তিনি তোমাদের উদ্ধার করেছিলেন ফিরআউনের লোকদের কবল থেকে, যারা তোমাদের পীড়ন করতো কঠোর নিপীড়নে, আর হত্যা করতো তোমাদের পুত্রসন্তানদের ও বাঁচতে দিত তোমাদের নারীদের। আর তোমাদের জন্য এতে তোমাদের প্রভুর কাছ থেকে ছিল এক কঠোর সংকট।
Sahih International: And [recall, O Children of Israel], when Moses said to His people, "Remember the favor of Allah upon you when He saved you from the people of Pharaoh, who were afflicting you with the worst torment and were slaughtering your [newborn] sons and keeping your females alive. And in that was a great trial from your Lord.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৬. আর স্মরণ করুন, যখন মূসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, তোমাদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর(১) যখন তিনি তোমাদেরকে রক্ষা করেছিলেন ফিরআউন গোষ্ঠীদের কবল হতে, যারা তোমাদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তি দিত, তোমাদের পুত্রদেরকে যবেহ করত এবং তোমাদের নারীদেরকে জীবিত রাখত; আর এতে ছিল তোমাদের রবের পক্ষ থেকে এক মহাপরীক্ষা।(২)
তাফসীর:
(১) অর্থাৎ মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ মোতাবেক তাদেরকে ‘আইয়্যামুল্লাহ’ বা নেয়ামত ও মুসিবত সম্পর্কে স্মরণ করানোর জন্য এ ভাষণটি প্রদাণ করেছিলেন। [ইবন কাসীর] এ নেয়ামতগুলো স্মরণ করার অর্থ হচ্ছে, নিয়ামতসমূহের কথা মুখে ও অন্তরে স্বীকার করে নেয়া। [সা’দী] অনুরূপভাবে নেয়ামতগুলোর অধিকার ও মর্যাদা চিহ্নিত করে সেগুলোকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা, সেগুলো যিনি প্রদান করেছেন তার শোকরিয়া আদায় করে তার নির্দেশের বাইরে না চলা। তাঁর বিধানের অনুগত থাকা, ইত্যাদি।
(২) আয়াতে ব্যবহৃত শব্দটি হচ্ছে, بلاء এ শব্দটি বিপরীত অর্থবোধক, এর এক অর্থ, নেয়ামত আর অপর অর্থ, বিপদ বা পরীক্ষা। এ আয়াতে পূর্ববতী বিষয়বস্তুর বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে যে, বনী-ইসরাঈলকে নিম্নলিখিত বিশেষ নেয়ামতটি স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য মূসা আলাইহিস সালাম-কে আদেশ দেয়া হয়। মূসা আলাইহিস সালাম-এর পূর্বে ফিরআউন বনী-ইসরাঈলকে অবৈধভাবে দাসে পরিণত করে রেখেছিল। এরপর এসব দাসের সাথেও মানবোচিত ব্যবহার করা হত না। তাদের ছেলে সন্তানকে জন্মগ্রহণের পরই হত্যা করা হত এবং শুধু কন্যাদেরকে খেদমতের জন্য লালন-পালন করা হত।
মূসা আলাইহিস সালাম-কে প্রেরণের পর তার দোআয় আল্লাহ্ তাআলা বনী-ইসরাঈলকে ফিরআউনের কবল থেকে মুক্তি দান করেন। সুতরাং একদিক থেকে তা তাদের পরীক্ষা ছিল অপর দিক থেকে সে পরীক্ষা থেকে মুক্তি দিয়ে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বিরাট নেয়ামত প্রদান করেন। উভয় অর্থটিই এখানে উদ্দেশ্য হতে পারে। যেমন অন্য আয়াতে এসেছে, “আর আমরা তাদেরকে মঙ্গল ও অমঙ্গল দ্বারা পরীক্ষা করেছি, যাতে তারা প্রত্যাবর্তন করে।” [সূরা আল-আরাফ: ১৬৮] [দেখুন, ইবন কাসীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৬) যখন মূসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, ‘তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহকে স্মরণ কর; যখন তিনি তোমাদেরকে রক্ষা করেছিলেন ফিরআউনীয় সম্প্রদায়ের কবল হতে, যারা তোমাদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তি দিত, তোমাদের পুত্রদেরকে যবেহ করত এবং তোমাদের নারীদেরকে জীবিত রাখত। আর এতে ছিল তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে এক মহাপরীক্ষা।[1]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, যেরূপ এটা আল্লাহর এক বিরাট পরীক্ষা ছিল, অনুরূপ এ থেকে মুক্তিলাভ আল্লাহর বিরাট অনুগ্রহ ছিল। এ জন্যই কোন কোন অনুবাদক بَلَاءٌ এর অনুবাদ ‘পরীক্ষা’ এবং কেউ কেউ এর অনুবাদ ‘অনুগ্রহ’ করেছেন।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৬-৮ নং আয়াতের তাফসীর:
(وَإِذْ قَالَ مُوْسٰي...)
পূর্বের আয়াতে মূসা (عليه السلام) ও বানী ইসরাঈলদেরকে প্রদত্ত নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার পর অত্র আয়াতে কয়েকটি নেয়ামতের বিবরণ দেয়া হচ্ছে। তা হল ফির‘আউন ও তার ক্ষমতাসীন দল বানী ইসরাঈলদেরকে নিকৃষ্টতম শাস্তি দিত, দাস বানিয়ে রাখত, ছেলেদেরকে জবাই করে ফেলত আর মেয়েদেরকে জীবিত রাখত। আল্লাহ তা‘আলা তাদের হাত থেকে বানী ইসরাঈলদেরকে মুক্তি দিয়েছেন। এটা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে একদিক থেকে যেমন পরীক্ষা ছিল তেমনি অনুগ্রহও ছিল। এ সম্পর্কে সূরা বাক্বারার ৪৯ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
(وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ...)- تَأَذَّنَ
অর্থ ঘোষণা দেয়া, জানিয়ে দেয়া। অর্থাৎ আল্লাহ জানিয়ে দিলেন যদি তোমরা আমার নেয়ামত পেয়ে শুকরিয়া আদায় কর তাহলে আমার নেয়ামত ও কৃতজ্ঞাতর পুরস্কার আরো বাড়িয়ে দেব। আর যদি কুফরী কর তথা নেয়ামত অস্বীকার কর, দাবী কর এটা আমার যোগ্যতায় পেয়েছি, আমার বাপ-দাদাদের থেকে পেয়েছি, আল্লাহর নেয়ামত বলতে কিছু নেই, আমার প্রচেষ্টা বা বাপ-দাদা না থাকলে এসব হতো না তাহলে জেনে রেখ, আল্লাহর শাস্তি বড় কঠিন। তাই মানুষের উচিত নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা ও ভাল-মন্দ সর্বাবস্থায় الحمد لله (আল হামদুলিল্লাহ) পাঠ করা এবং অকৃতজ্ঞ হওয়া থেকে বিরত থাকা। উল্লেখ্য যে, অধিকাংশ নারীরাই তাদের স্বামীর অকৃতজ্ঞ।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মিরাজের রাতে অধিকাংশ নারীদেরকে জাহান্নামে দেখতে পান। কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন: তারা স্বামীর অকৃতজ্ঞ, সারা বছর তাদের সাথে ভাল আচরণ করেও কোন দিন সামান্য কিছুর অভাব হলেই বলে, আমি তোমার কাছে কোন দিন সুখ পায়নি। (সহীহ বুখারী হা: ২৯, মুসলিম হা: ৯০৭)
তাই মূসা (عليه السلام) তাঁর জাতিকে সম্বোধন করে বলেন: শুধু তোমরা নও, সারা পৃথিবীর মানুষ যদি আল্লাহ তা‘আলার সাথে কুফরী করে, আল্লাহ তা‘আলাকে অস্বীকার করে, আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামতকে অস্বীকার করে তাহলেও আল্লাহ তা‘আলার কিছু আসে যায় না। তিনি পৃথিবীবাসী থেকে অমুখাপেক্ষী, কেননা আল্লাহ তা‘আলার প্রতি বিশ্বাস করা, তাঁর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করার অর্থ হল নিজের উপকার করা, নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া। পক্ষান্তরে আল্লাহ তা‘আলার সাথে কুফরী করা হল নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারা।
হাদীসে কুদসীতে এসেছে: আল্লাহ তা‘আলা বলেন, হে আমার বান্দারা! তোমাদের পূর্বের ও পরের মানব ও দানব সকলেই যদি আমার বান্দাদের মধ্যে সর্বাধিক তাকওয়াবান একজন ব্যক্তির হৃদয়ের মত হয়ে যায়, তাহলে আমার রাজত্বের সামান্য বাড়বে না। হে আমার বান্দারা! তোমাদের পূর্বের ও পরের মানব ও দানব সকলেই যদি আমার বান্দাদের মধ্যে সর্বাধিক পাপীষ্ট একজন ব্যক্তির হৃদয়ের মত হয়ে যায় তাহলে আমার রাজত্বের সামান্য কমবে না। তোমাদের পূর্বের ও পরের মানব ও দানব সকলেই যদি এক জায়গায় একত্রিত হয়ে আমার কাছে চায় আর আমি তাদের সকল চাহিদা পূরণ করি, তাহলেও আমার রাজত্বের সামান্য কমবে না, তবে সমুদ্রে সুঁই ডুবিয়ে তা তুললে যতটুকু পানি সমুদ্র থেকে কমে ততটুকু কমবে। (সহীহ মুসলিম হা: ২৫৭৭)
সুতরাং সারা বিশ্বের মানুষ মিলেও যদি আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর দেয়া বিধানের প্রতি কুফরী করে তাতে আল্লাহ তা‘আলার কিছুই যায় আসে না। আল্লাহ তা‘আলা এগুলো থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। তাই অকৃতজ্ঞ হওয়া থেকে বেঁচে থাকতে হবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. কৃতজ্ঞতা স্বীকার করলে নেয়ামত বৃদ্ধি করে দেয়া হয় আর কুফরী করলে তার জন্য শাস্তির অধিকারী হতে হয় এবং নেয়ামতও কমে যায়।
২. মানুষের ঈমান আনা ও কুফরী করাতে আল্লাহ তা‘আলার কোন লাভ বা ক্ষতি নেই।
৩. আল্লাহ তা‘আলা যাবতীয় জিনিস থেকে অভাব মুক্ত।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৬-৮ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তাআলা হযরত মূসা (আঃ) সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন যে, আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে হযরত মূসা (আঃ) স্বীয় কওমকে আল্লাহ তাআলার নিয়ামতসমূহ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। যেমন ফিরআউনী সম্প্রদায়ের কবল হতে তাদেরকে রক্ষা করা, যারা তাদেরকে শক্তিহীন করে তাদের উপর বিভিন্ন প্রকারের উৎপীড়ন চালাতো, এমনকি তাদের সমস্ত পুত্র সন্তানদেরক হত্যা করতো এবং কন্যা সন্তানদেরকে জীবিত ছাড়তো। হযরত মূসা (আঃ) তাই স্বীয় কওমকে বলছেনঃ এটা তোমাদের উপর আল্লাহর তাআলার এত বড় নিয়ামত যে, এর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা তোমাদের ক্ষমতার বাইরে। এই বাক্যটির ভাবার্থ এরূপও হতে পারেঃ ফিরাআউনীদের কষ্ট প্রদান প্রকৃতপক্ষে তোমাদের উপর একটা মহাপরীক্ষা ছিল। আবার সম্ভাবনা এও রয়েছে যে, অর্থ দুটোই হবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। যেমন আল্লাহ তাআলার বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি তাদেরকে ভাল ও মন্দ দ্বারা পরীক্ষা করেছি, যাতে তারা ফিরে আসে।” (৭:১৬৮)
মহান আল্লাহর উক্তিঃ (আরবি) “যখন তোমাদের প্রতিপালক। তোমাদেরকে অবহিত করলেন। আবার এরূপ অর্থও হতে পারেঃ ‘যখন তোমাদের প্রতিপালক তার মর্যাদা, শ্রেষ্ঠত্ব ও বিরাটত্বে কসম খেলেন। যেমন অন্য জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎঃ “যখন তোমার প্রতিপালক শপথ করে বললেন যে, অবশ্যই তিনি তাদের উপর কিয়ামত পর্যন্ত পাঠাতে থাকবেন।” (৭:১৬৭)
সুতরাং আল্লাহ তাআলার অলংঘনীয় ওয়াদা এবং তাঁর ঘোষণাও বটে যে, তিনি কৃতজ্ঞ বান্দাদের নিয়ামত আরো বাড়িয়ে দিবেন এবং অকৃতজ্ঞ ও নিয়ামত অস্বীকারকারী ও গোপনকারীদের নিয়ামত সমূহ ছিনিয়ে নিবেন, আর তাদেরকে কঠিন শাস্তি প্রদান করবেন। হাদীসে এসেছেঃ “বান্দা পাপের কারণে আল্লাহর রুজী থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকে।” বর্ণিত আছে যে, একজন ভিক্ষুক রাসূলুল্লাহর (সঃ) পার্শ্ব দিয়ে গমন করে। তিনি তাকে একটি খেজুর দেন। সে তাতে রাগান্বিত হয়ে তা প্রত্যাখ্যান করে। অতঃপর অন্য একজন ভিক্ষুক তাঁর পার্শ্ব দিয়ে গেলে তিনি তাকেও একটি খেজুর দেন। সে খুশী হয়ে তা গ্রহণ করে এবং বলেঃ “এটা হচ্ছে আল্লাহর রাসূলের (সঃ) দানা” এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে চল্লিশ দিরহাম প্রদানের হুকুম দেন।
অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) দাসীকে বলেনঃ “লোকটিকে উম্মে সালমার (রাঃ) নিকট নিয়ে যাও এবং তার কাছে যে। চল্লিশটি দিরহাম রয়েছে তা নিয়ে একে দিয়ে দাও।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)
হযরত মূসা (আঃ) বানী ইসরাঈলকে বলেনঃ “তোমরা ভূ-পৃষ্ঠের সমস্ত লোকও যদি আল্লাহ তাআলার অকৃতজ্ঞ বান্দা হয়ে যাও তবে তাঁর কি ক্ষতি হবে? তিনি তো তাঁর বান্দাদের হতে এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ হতে সম্পূর্ণরূপে বেপরোয়া। তিনি তাদের মোটেই মুখাপেক্ষী নন। একমাত্র তিনিই প্রশংসার যোগ্য। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা যদি অকৃতজ্ঞ হও তবে (জেনে রেখো যে, আল্লাহ। তোমাদের হতে বেপরোয়া।” (৩৯:৭) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা অকৃতজ্ঞ হলো এবং মুখ ফিরিয়ে নিলো, আর আল্লাহ তাদের থেকে বেপরোয়া হয়ে গেলেন, আল্লাহ হলেন অভাবমুক্ত, প্রশংসাৰ্য।” (৬৪:৬)
হযরত আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আল্লাহ। তাআলার উক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণনা করেছেঃ “হে আমার বান্দারা! যদি তোমাদের প্রথম এবং শেষ মানব ও দানব সবাই মিলিতভাবে পরহেযগারহয়ে যায় তবুও আমার রাজ্যের একটুও বৃদ্ধি পাবে না। পক্ষান্তরে হে আমার বান্দারা! তোমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মানব এবং দানব সবাই যদি পাপিষ্ঠ হয়ে যায় তবুও এই কারণে আমার রাজ্য অনুপরিমাণ ও হ্রাস পাবে না। হে আমার বান্দাগণ! তোমাদের প্রথম এবং শেষ মানব ও দানব সবাই যদি একত্রিত ভাবে একটা ময়দানে দাঁড়িয়ে যায়, অতঃপর আমার কাছে চাইতে থাকে, আর আমি প্রত্যেকের চাহিদা পূর্ণ করে দিই তবুও আমার ভাণ্ডার হতে এই পরিমাণ কমবে যে পরিমাণ পানি সমুদ্র হতে কমে যায় যখন তাতে সুঁই ডুবিয়ে উঠিয়ে নেয়া হয়। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন) সুতরাং আল্লাহ তাআলা পবিত্র অভাব মুক্ত এবং প্রশংসাৰ্হ।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।