সূরা ইবরাহীম (আয়াত: 38)
হরকত ছাড়া:
ربنا إنك تعلم ما نخفي وما نعلن وما يخفى على الله من شيء في الأرض ولا في السماء ﴿٣٨﴾
হরকত সহ:
رَبَّنَاۤ اِنَّکَ تَعْلَمُ مَا نُخْفِیْ وَ مَا نُعْلِنُ ؕ وَ مَا یَخْفٰی عَلَی اللّٰهِ مِنْ شَیْءٍ فِی الْاَرْضِ وَ لَا فِی السَّمَآءِ ﴿۳۸﴾
উচ্চারণ: রাব্বানাইন্নাকা তা‘লামুমা-নুখফী ওয়ামা-নু‘লিনু ওয়ামা-ইয়াখফা-‘আলাল্লা-হি মিন শাইইন ফিল আরদিওয়ালা-ফিছছামাই।
আল বায়ান: হে আমাদের রব, নিশ্চয় আপনি জানেন, যা আমরা গোপন করি এবং যা প্রকাশ করি, আর কোন কিছু আল্লাহর নিকট গোপন নেই, না যমীনে না আসমানে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৮. হে আমাদের রব! আপনি তো জানেন যা আমরা গোপন করি ও যা আমরা প্রকাশ করি; আর কোন কিছুই আল্লাহর কাছে গোপন নেই, না যমীনে না আসমানে।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি তো জান যা আমরা গোপন করি আর যা প্রকাশ করি, আসমান ও যমীনের কোন বস্তুই আল্লাহ হতে গোপন নেই।
আহসানুল বায়ান: (৩৮) হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা যা গোপন করি এবং যা প্রকাশ করি তা নিশ্চয় তুমি জানো। আর পৃথিবী ও আকাশের কোন কিছুই আল্লাহর নিকট গোপন থাকে না। [1]
মুজিবুর রহমান: হে আমাদের রাব্ব! আপনিতো জানেন যা আমরা গোপন করি এবং যা আমরা প্রকাশ করি; আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর কোন কিছুই আল্লাহর নিকট গোপন থাকেনা।
ফযলুর রহমান: “হে আমাদের প্রভু! আমরা যা গোপন করি আর যা প্রকাশ করি তুমি তা সবই জান। জমিনে কিংবা আসমানে কোন কিছুই আল্লাহর কাছে গোপন থাকে না।”
মুহিউদ্দিন খান: হে আমাদের পালনকর্তা, আপনি তো জানেন আমরা যা কিছু গোপনে করি এবং যা কিছু প্রকাশ্য করি। আল্লাহর কাছে পৃথিবীতে ও আকাশে কোন কিছুই গোপন নয়।
জহুরুল হক: "আমাদের প্রভু! তুমি নিশ্চয় জান যা আমরা গোপন করি ও যা আমরা প্রকাশ করি। আর আল্লাহ্র কাছে পৃথিবীতে কোনো কিছুই লুকোনো নেই আর মহাকাশেও নয়।
Sahih International: Our Lord, indeed You know what we conceal and what we declare, and nothing is hidden from Allah on the earth or in the heaven.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩৮. হে আমাদের রব! আপনি তো জানেন যা আমরা গোপন করি ও যা আমরা প্রকাশ করি; আর কোন কিছুই আল্লাহর কাছে গোপন নেই, না যমীনে না আসমানে।(১)
তাফসীর:
(১) এ আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলার সর্বব্যাপী জ্ঞানের প্রসঙ্গ টেনে দো'আ সমাপ্ত করা হয়েছে। অর্থ এই যে, আপনি আমার আন্তরিক অবস্থা ও বাহ্যিক আবেদন নিবেদন সবকিছু সম্পর্কে ওয়াকিফহাল। আপনি আমার এ দো’আর উদ্দেশ্য ভাল করেই জানেন। আপনি জানেন যে, আমি এ দোআ দ্বারা কেবল আপনার জন্য ইখলাস ও সন্তুষ্টিই কামনা করছি। [তাবারী; ইবন কাসীর] ‘আন্তরিক অবস্থা’ বলতে ঐ দুঃখ, মনোবেদনা ও চিন্তা-ভাবনা বোঝানো হয়েছে, যা একজন দুগ্ধপোষ্য শিশু ও তার জননীকে উন্মুক্ত প্রান্তরে নিঃসম্বল, ফরিয়াদরত অবস্থায় ছেড়ে আসা এবং তাদের বিচ্ছেদের কারণে স্বাভাবিকভাবে দেখা দিয়েছিল। [কুরতুবী] আর ‘বাহ্যিক আবেদন-নিবেদন’ বলে স্পষ্টত: ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর দোআই বোঝানো হয়েছে। আয়াতের শেষে আল্লাহ্ তা'আলার জ্ঞানের বিস্তৃতি বর্ণনা করে বলা হয়েছে যে, আমাদের বাহ্যিক ও আন্তরিক অবস্থাই কেন বলি, সমস্ত ভূ-মণ্ডল ও নভোমণ্ডলে কোন অবস্থাই তার অজ্ঞাত নয়। অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমি মুখে যা কিছু বলছি তা আপনি শুনছেন এবং যেসব আবেগ-অনুভূতি আমার হৃদয় অভ্যন্তরে লুকিয়ে আছে তাও আপনি জানেন।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩৮) হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা যা গোপন করি এবং যা প্রকাশ করি তা নিশ্চয় তুমি জানো। আর পৃথিবী ও আকাশের কোন কিছুই আল্লাহর নিকট গোপন থাকে না। [1]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ আমার দু’আর উদ্দেশ্য তুমি তো ভালভাবে জান। এই শহরবাসীর জন্য দু’আর মূল উদ্দেশ্য তোমার সন্তুষ্টি। তুমি তো প্রত্যেক জিনিসের বাস্তবতা সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত, আকাশ ও পৃথিবীর কোন কিছু তোমার কাছে গোপন নেই।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৩৫-৪১ নং আয়াতের তাফসীর:
মক্কার নিরাপত্তা ও শির্ক থেকে নিজে ও সন্তানদেরকে বাঁচার জন্য আল্লাহ তা‘আলার দরগাহে মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহীম (عليه السلام) যে দু‘আ করেছিলেন সে কথা অত্র আয়াতগুলোতে তুলে ধরা হয়েছে। উক্ত আয়াতে هذا البلد দ্বারা মক্কা নগরীকে বোঝানো হয়েছে। ইবরাহীম (عليه السلام) প্রথমেই নিরাপত্তার দু‘আ করলেন এজন্য যে, কোন স্থানে নিরাপত্তা না থাকলে সে স্থান যতই মূল্যবান হোক আর যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক তাতে কেউ যেতে চাইবে না। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর দু‘আ কবূল করলেন যার ফলে আজও সেখানে নিরাপত্তা বিরাজ করছে, কোন হত্যা, খুন, রাহাজানি, বিবাদ নেই ইত্যাদি ইত্যাদি; এমনকি পশুপাখি পর্যন্তও নিরাপদে থাকে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّا جَعَلْنَا حَرَمًا اٰمِنًا وَّيُتَخَطَّفُ النَّاسُ مِنْ حَوْلِهِمْ)
“তারা কি দেখে না আমি ‘হারাম'কে নিরাপদ স্থান করেছি, অথচ তার চতুষ্পার্শ্বে যেসব মানুষ আছে, তাদেরকে ছিনিয়ে নেয়া হয় (হামলা করা হয়)।” (সূরা আনকাবুত ২৯:৬৭)
যারা অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এ ঘরের দিকে অগ্রসর হয়েছে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ধূলিস্যাৎ করে দিয়েছেন, কিয়ামত পর্যন্ত এ ঘর এবং এ ঘরে যারা আসবে সবাই নিরাপদে থাকবে।
(وَّاجْنُبْنِيْ وَبَنِيَّ)
তিনি আরো দু‘আ করলেন তাঁর জন্য এবং তাঁর সন্তানদের জন্য যেন তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা মূর্তি পূজা থেকে বাঁচিয়ে রাখেন। এখানে তৎকালীন মক্কার মুশরিকদের দাঁতভাঙ্গা জবাব দেয়া হয়েছে। তারা দাবী করত আমরা ইবরাহীমের মিল্লাতের অনুসারী, ইবরাহীম (عليه السلام) তো প্রতিমা পূজারী ছিলেন না, তিনি কাবা নির্মাণ করলেন তাওহীদের ওপর ভিত্তি করে। ভবিষ্যতে কখনো যাতে শির্ক না হয় সে জন্য তিনি আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু‘আ করলেন যেন তিনি তাঁকে ও তাঁর সন্তানদেরকে শির্ক থেকে রক্ষা করেন। অথচ তোমরা কাবা ঘরে মূর্তি রেখে পূজা করছ আর বলছ, আমরা ইবরাহীম (عليه السلام) এর অনুসারী।
আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম (عليه السلام)-এর এই দু‘আ তাঁর কিছু সন্তানের জন্য কবূল করলেন এবং কিছু সন্তানের জন্য কবূল করেননি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَمِنْ ذُرِّيَّتِهِمَا مُحْسِنٌ وَّظٰلِمٌ لِّنَفْسِه۪ مُبِيْنٌ)
“তাদের বংশধরদের মধ্যে কতক ছিল সৎ লোক এবং কতক নিজেদের ওপর প্রকাশ্য অত্যাচারী।” (সূরা স্বফ্ফাত ৩৭:১১৩)
অর্থাৎ সবাই তাওহীদের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারবে না, কেবল আল্লাহ তা‘আলা যাদেরকে তাওফীক দান করবেন তারাই পারবে।
সন্তানের ভবিষ্যত মঙ্গল কামনা করে সব পিতা-মাতাই দু‘আ করে থাকে। পিতা-মাতার উচিত সন্তানকে শির্ক থেকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু‘আ করা যেমন ইবরাহীম (عليه السلام) করেছেন।
(إِنَّهُنَّ أَضْلَلْنَ كَثِيْرًا)
অর্থাৎ এসব মূর্তি, প্রতিমা অনেক মানুষকে পথভ্রষ্ট করেছে। প্রশ্ন হতে পারে এরা তো জড় পদার্থ, এরা পথভ্রষ্ট করল কিভাবে? উত্তর এরা পথভ্রষ্ট করেনি, কিন্তু এদের কারণে মানুষ পথভ্রষ্ট হয়েছে। এদেরকে অনেকে কল্যাণদাতা, অকল্যাণ প্রতিরোধকারী মনে করে ইবাদত করে। তাই ইবরাহীম (عليه السلام) বললেন: যারা তাওহীদের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে তারাই আমার অন্তর্ভুক্ত, আমার মিল্লাতভুক্ত। আর যারা আমার অবাধ্য হবে তথা আমি যে তাওহীদের বাণী নিয়ে এসেছি তা বর্জন করবে তাদের দায়িত্ব তোমার হাতে, তুমি ক্ষমাশীল দয়ালু। যেমন
ঈসা (عليه السلام)-ও বলেছিলেন:
(إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ ج وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيْزُ الْحَكِيْمُ)
“তুমি যদি তাদেরকে শাস্তি দাও তবে তারা তো তোমারই বান্দা, আর যদি তাদেরকে ক্ষমা কর তবে তুমি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’’ (সূরা মায়িদা ৫:১১৮)
সুতরাং কেউ কথা অমান্য করলে রাগের বশবর্তী হয়ে তার ওপর বদ্দু‘আ করা যাবেনা বরং তার ওপর রহমতের দু‘আ করতে হবে। যেন আল্লাহ তা‘আলা তাকে সঠিক জিনিস বোঝার জ্ঞান দান করেন।
হাজেরার ঘরে যখন ইসমাঈল (عليه السلام) জন্ম নিলেন তখন ইবরাহীম (عليه السلام) কে আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিলেন তিনি যেন হাজেরা ও সন্তান ইসমাঈলকে নির্জন মরুভূমি মক্কায় রেখে আসে। বৃদ্ধ বয়সে একটি সন্তান পেলেন তাও নিজের কাছে রাখার সুযোগ পেলেন না। আল্লাহ তা‘আলার আদেশ পেতে দেরী, পালন করতে দেরী নয়। সকল মায়া মমতা বর্জন করে স্ত্রী হাজেরা ও কলিজার টুকরা ইসমাঈলকে রেখে আসলেন। যখন রেখে চলে আসেন তখন হাজেরা বললেন: আপনি কি নিজের পক্ষ থেকে রেখে যাচ্ছেন, না কি আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশে?
ইবরাহীম ভারাক্রান্ত মনে কথা বলতে পারছেন না, হাত দিয়ে আকাশের দিকে ইশারা করে বললেন, আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশে। তখন হাজেরা বললেন: তাহলে কোন চিন্তা নেই, যে আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশে রেখে যাচ্ছেন সে আল্লাহ তা‘আলাই আমাদের ব্যবস্থা করবেন। তখন ইবরাহীম (عليه السلام) এ দু‘আ করলেন ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমি আমার বংশধরদের কতককে বসতি করলাম অনুর্বর (চাষাবাদহীন) উপত্যকায় তোমার পবিত্র গৃহের নিকট, হে আমাদের প্রতিপালক! তারা যেন সালাত কায়েম করে।’
مِنْ এখানে تبعضية বা আংশিক অর্থে ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ কিছু লোক, উদ্দেশ্য হল মুসলিমগণ। আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম (عليه السلام) এর দু‘আ কবূল করে নিলেন, ফলে সারা পৃথিবী থেকে মুসিলমরা দলে দলে হজ্জের মওসুমে উপস্থিত হয়, হজ্জের মওসুম ছাড়াও এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে। এমনকি যাদের হজ্জ করার সামর্থ নেই তাদের মনে আগ্রহ থাকে, যদি একবার সেখানে যেতে পারতাম। এভাবে আল্লাহ তা‘আলা মুসিলমদের মনে মক্কার প্রতি একটি আগ্রহ সৃষ্টি করে দিয়েছেন।
(وَارْزُقْهُمْ مِّنَ الثَّمَرٰتِ)
এ দু‘আরও প্রভাব লক্ষ্যণীয়, মক্কার মত বৃক্ষ-লতাহীন মরুভূমি, যেখানে কোন ফলফলাদি আবাদ হয় না সেখানে আজ বিভিন্ন রকমের ফলফলাদি সর্বদা পর্যাপ্ত পরিমাণ পাওয়া যায়, যদিও মওসুম না হয়।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “আর স্মরণ কর! যখন ইবরাহীম বললেন: হে আমার রব! এ স্থানকে তুমি নিরাপত্তাময় শহরে পরিণত কর এবং এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস স্থাপন করেছে, তাদেরকে জীবিকার জন্য ফল-শস্য প্রদান কর। আল্লাহ বলেন, যারা অবিশ্বাস করে তাদেরকে আমি অল্পদিন ভোগ করতে দেব। পরে তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করতে বাধ্য করব, এটি নিকৃষ্টতম গন্তব্যস্থল! ” (সূরা বাক্বারাহ ২:১২৬)
(رَبَّنَآ إِنَّكَ تَعْلَمُ مَا نُخْفِيْ وَمَا نُعْلِنُ)
অর্থাৎ হে আল্লাহ তা‘আলা যেহেতু তুমি সব জান, কোন কিছুই তোমার কাছে গোপন নেই সেহেতু তুমি আমার দু‘আর উদ্দেশ্যও জান। সুতরাং তুমি আমার দু‘আ কবূল করে নিও।
বৃদ্ধ বয়সে সন্তান ইসমাঈল ও ইসহাককে পেয়ে ইবরাহীম (عليه السلام) আল্লাহ তা‘আলার শুকরিয়া আদায় করলেন, আর তিনি প্রার্থনা করলেন যেন তিনি সালাত কায়েম করতে পারেন এবং তাঁর উত্তরসূরীগণ। আরো দু‘আ করলেন যাতে তাঁকে, পিতা-মাতাকে এবং সকল মু’মিনদেরকে হিসাবের দিন আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমা করে দেন। তবে তাঁর পিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা তখন করেছিলেন যখন তিনি জানতেন না যে, তার পিতা আল্লাহ তা‘আলার দুশমন। যখন জানতে পারলেন তখন এ দু‘আ থেকে বিরত থাকলেন।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَمَا كَانَ اسْتِغْفَارُ إِبْرٰهِيْمَ لِأبِيْهِ إِلَّا عَنْ مَّوْعِدَةٍ وَّعَدَهَآ إِيَّاهُ ج فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَه۫ أَنَّه عَدُوٌّ لِّـلّٰهِ تَبَرَّأَ مِنْهُ ط إِنَّ إِبْرٰهِيْمَ لَأَوَّاهٌ حَلِيْمٌ)
“ইব্রাহীম তার পিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছিল, তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বলে; অতঃপর যখন এটা তার নিকট সুস্পষ্ট হল যে, সে আল্লাহর শত্র“ তখন ইব্রাহীম তার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করল। ইব্রাহীম তো কোমল হৃদয়সম্পন্ন ও সহনশীল।” (সূরা তাওবা ৯:১১৪)
কারণ কাফির-মুশরিকদের জন্য দু‘আ করা কোন নবী-রাসূলের জন্য সমীচীন নয়।
আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِيْنَ اٰمَنُوْآ أَنْ يَّسْتَغْفِرُوْا لِلْمُشْرِكِيْنَ وَلَوْ كَانُوْا أُولِيْ قُرْبٰي مِنْۭ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحٰبُ الْجَحِيْمِ)
“নিকট আত্মীয়-স্বজন হলেও মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা নাবী এবং মু’মিনদের জন্য সংগত নয় যখন এটা সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, নিশ্চিতই তারা জাহান্নামী।” (সূরা তাওবাহ ৯:১১৩)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. পিতা-মাতার উচিত সন্তানের জন্য ভাল দু‘আ করা।
২. কোন মানুষের জন্য বদদু‘আ করা উচিত নয়।
৩. মানুষ সামাজিক জীব হিসেবে সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করে, তাই ইসলাম সন্ন্যাসী জীবন পছন্দ করে না।
৪. কোন খুশির সংবাদ পেলে আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা আদায় করতে হবে। যেমন ইবরাহীম (عليه السلام) সন্তান লাভ করার পর আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করেছেন।
৫. ভালো কাজ করার জন্য আল্লাহ তা‘আলার তাওফীক কামনা করতে হবে।
৬. সন্তান পিতা-মাতার জন্য উত্তম দু‘আ করবে।
৭. মক্কা ও পার্শ্ববর্তী হারাম এলাকা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে নিরাপত্তাপ্রাপ্ত। সেখানে কোন মারামারি, হানাহানি ইত্যাদি কিছুই হবে না।
৮. মু’মিন ব্যক্তিদের উচিত পরস্পরের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা ।
৯. কোন কাফির-মুশরিকদের জন্য ক্ষমা চাওয়া জায়েয নয়।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৩৮-৪১ নং আয়াতের তাফসীর
ইবনু জারীর (রঃ) বলেনঃ এখানে আল্লাহ তাআলা স্বীয় বন্ধু ইবরাহীম খালীলের (আঃ) সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন যে, তিনি বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমার ইচ্ছা ও মনের বাসনা আমার চেয়ে আপনিই ভাল জানেন। আমি চাই যে, এখানকার অধিবাসীরা যেন আপনার সন্তুষ্টি কামনাকারী হয় এবং শুধুমাত্র আপনারই প্রতি অনুরাগী হয়। প্রকাশ্য ও গোপনীয় সবই আপনার কাছে পূর্ণরূপে জ্বাজ্জল্যমান। যমীন ও আসমানের প্রতিটি জিনিসের অবস্থা সম্পর্কে আপনি ওয়াকিফহাল। এটা আমার প্রতি আপনার বড় অনুগ্রহ যে, এই বৃদ্ধ বয়সেও আপনি আমাকে ইসমাঈল (আঃ) ও ইসহাকের (আঃ) । নয় দু’টি সুসন্তান দান করেছেন। আপনি প্রার্থনা কবুলকারী বটে। আমি চেয়েছি আর আপনি দিয়েছেন। সুতরাং হে আমার প্রতিপালক! এজন্যে আমি আপনার নিকট বড়ই কৃতজ্ঞ হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আপনি নামায প্রতিষ্ঠিতকারী বানিয়ে দিন এবং আমার সন্তানদের মধ্যেও এই সিলসিলা বা ক্ৰম কায়েম রাখুন! আমার সমস্ত প্রার্থনা কবুল করুন।” (আরবি) এই কিরআতটি কেউ কেউ (আরবি) এইরূপও করেছেন। এটাও স্মরণ রাখার বিষয় যে, তাঁর পিতা যে আল্লাহর শত্রুতার উপর মারা গিয়েছিল এটা জানতে পারার পূর্বে তিনি এই দুআ করে ছিলেন। কিন্তু যখন তিনি এটা জানতে পারেন তখন তিনি এর থেকে বিরত থাকেন। এখানে তিনি তাঁর পিতামাতা এবং সমস্ত মুমিনের পাপের জন্যে আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন যে, আমলের হিসাব গ্রহণ ও বিনিময় প্রদানের দিন যেন তাদের দোষত্রুটি ক্ষমা করে দেয়া হয়।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।