আল কুরআন


সূরা ইবরাহীম (আয়াত: 37)

সূরা ইবরাহীম (আয়াত: 37)



হরকত ছাড়া:

ربنا إني أسكنت من ذريتي بواد غير ذي زرع عند بيتك المحرم ربنا ليقيموا الصلاة فاجعل أفئدة من الناس تهوي إليهم وارزقهم من الثمرات لعلهم يشكرون ﴿٣٧﴾




হরকত সহ:

رَبَّنَاۤ اِنِّیْۤ اَسْکَنْتُ مِنْ ذُرِّیَّتِیْ بِوَادٍ غَیْرِ ذِیْ زَرْعٍ عِنْدَ بَیْتِکَ الْمُحَرَّمِ ۙ رَبَّنَا لِیُـقِیْمُوا الصَّلٰوۃَ فَاجْعَلْ اَفْئِدَۃً مِّنَ النَّاسِ تَهْوِیْۤ اِلَیْهِمْ وَارْ زُقْهُمْ مِّنَ الثَّمَرٰتِ لَعَلَّهُمْ یَشْکُرُوْنَ ﴿۳۷﴾




উচ্চারণ: রাব্বানা ইন্নী আছকানতুমিন যুররিইইয়াতী বিওয়া-দিন গাইরি যী যার ‘ইন ‘ইনদা বাইতিকাল মুহাররামি রাব্বানা-লিইউকীমুসসালা-তা ফাজ‘আল আফইদাতাম মিনান্নাছি তাহবীইলাইহিম ওয়ারযুকহুম মিনাছছামারা-তি লা‘আল্লাহুম ইয়াশকুরূন।




আল বায়ান: ‘হে আমাদের রব, নিশ্চয় আমি আমার কিছু বংশধরদেরকে ফসলহীন উপত্যকায় তোমার পবিত্র ঘরের নিকট বসতি স্থাপন করালাম, হে আমাদের রব, যাতে তারা সালাত কায়েম করে। সুতরাং কিছু মানুষের হৃদয় আপনি তাদের দিকে ঝুঁকিয়ে দিন এবং তাদেরকে রিয্ক প্রদান করুন ফল-ফলাদি থেকে, আশা করা যায় তারা শুকরিয়া আদায় করবে’।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৭. হে আমাদের রব! আমি আমার বংশধরদের কিছু সংখ্যককে বসবাস করালাম(১) অনুর্বর উপত্যকায়(২) আপনার পবিত্র ঘরের কাছে(৩), হে আমাদের রব! এ জন্যে যে, তারা যেন সালাত কায়েম করে(৪)। অতএব আপনি কিছু লোকের অন্তর তাদের প্রতি অনুরাগী করে দিন(৫) এবং ফল-ফলাদি দিয়ে তাদের রিযকের ব্যবস্থা করুন(৬), যাতে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।(৭)




তাইসীরুল ক্বুরআন: হে আমাদের প্রতিপালক! আমি আমার সন্তানদের একাংশকে শস্যক্ষেতহীন উপত্যকায় তোমার সম্মানিত ঘরের নিকট পুনর্বাসিত করলাম। হে আমার প্রতিপালক! তারা যাতে নামায কায়িম করে। কাজেই তুমি মানুষের অন্তরকে তাদের প্রতি অনুরাগী করে দাও আর ফল-ফলাদি দিয়ে তাদের জীবিকার ব্যবস্থা কর যাতে তারা শুকরিয়া আদায় করে।




আহসানুল বায়ান: (৩৭) হে আমাদের প্রতিপালক! আমি আমার কিছু বংশধরকে[1] ফল-ফসলহীন উপত্যকায় তোমার পবিত্র গৃহের নিকট বসবাস করালাম; হে আমাদের প্রতিপালক! যাতে তারা নামায কায়েম করে।[2] সুতরাং তুমি কিছু লোকের[3] অন্তরকে ওদের প্রতি অনুরাগী করে দাও এবং ফলমূল দ্বারা তাদের জীবিকার ব্যবস্থা কর;[4] যাতে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।



মুজিবুর রহমান: হে আমাদের রাব্ব! আমি আমার বংশধরদের কতককে বসবাস করালাম অনুর্বর উপত্যকায় আপনার পবিত্র গৃহের নিকট। হে আমাদের রাব্ব! এ জন্য যে, তারা যেন সালাত কায়েম করে; সুতরাং আপনি কিছু লোকের অন্তর ওদের প্রতি অনুরাগী করে দিন এবং ফলফলাদি দ্বারা তাদের রিয্কের ব্যবস্থা করুন যাতে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।



ফযলুর রহমান: “হে আমাদের প্রভু! আমি আমার সন্তানদের (বংশধরদের) মধ্য থেকে (একজনকে) তোমার পবিত্র ঘরের (কাবার) কাছে এক ফসলহীন উপত্যকায় বাসিন্দা করেছি, হে আমাদের প্রভু! যাতে তারা নামায কায়েম করে; অতএব, তুমি কতিপয় মানুষের অন্তর তাদের প্রতি আকৃষ্ট করে দিও এবং ফলফলাদি দ্বারা তাদের জীবিকার ব্যবস্থা করে দিও, যাতে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।”



মুহিউদ্দিন খান: হে আমাদের পালনকর্তা, আমি নিজের এক সন্তানকে তোমার পবিত্র গৃহের সন্নিকটে চাষাবাদহীন উপত্যকায় আবাদ করেছি; হে আমাদের পালনকর্তা, যাতে তারা নামায কায়েম রাখে। অতঃপর আপনি কিছু লোকের অন্তরকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করুন এবং তাদেরকে ফলাদি দ্বারা রুযী দান করুন, সম্ভবতঃ তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে



জহুরুল হক: "আমার প্রভু! আমি নিশ্চয়ই আমার বংশধরদের কতককে বসবাস করালাম তোমার পবিত্র গৃহের নিকটে চাষ-বাসহীন উপত্যকায়, -- আমাদের প্রভু! যেন তারা নামায কায়েম করে, সেজন্যে কিছু লোকের মন তাদের প্রতি অনুরাগী বানিয়ে দাও, আর তাদের ফলফসল দিয়ে জীবিকা প্রদান করো, যেন তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।



Sahih International: Our Lord, I have settled some of my descendants in an uncultivated valley near Your sacred House, our Lord, that they may establish prayer. So make hearts among the people incline toward them and provide for them from the fruits that they might be grateful.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৩৭. হে আমাদের রব! আমি আমার বংশধরদের কিছু সংখ্যককে বসবাস করালাম(১) অনুর্বর উপত্যকায়(২) আপনার পবিত্র ঘরের কাছে(৩), হে আমাদের রব! এ জন্যে যে, তারা যেন সালাত কায়েম করে(৪)। অতএব আপনি কিছু লোকের অন্তর তাদের প্রতি অনুরাগী করে দিন(৫) এবং ফল-ফলাদি দিয়ে তাদের রিযকের ব্যবস্থা করুন(৬), যাতে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।(৭)


তাফসীর:

(১) এখানে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম কিভাবে তার স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানকে এ মরুপ্রান্তরে রেখে গেলেন সে ঘটনাটি সহীহ বর্ণনার উপর নির্ভর করে বর্ণনা করা প্রয়োজন। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেনঃ নারী জাতি সর্বপ্রথম ইসমাঈল আলাইহিস সালাম এর মাতা হাজেরা থেকেই কোমরবন্ধ বানানো শিখেছে। হাজেরা সারা থেকে আপন গর্ভের নিদর্শনাবলী গোপন করার উদ্দেশ্যেই কোমরবন্ধ লাগাতেন। অতঃপর উভয়ের মনোমালিণ্য চরমে পৌছলে আল্লাহর আদেশে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম হাজেরা ও তার শিশুপুত্র ইসমাইলকে সাথে নিয়ে নির্বাসন দানের জন্য বের হলেন। পথে হাজেরা শিশুকে দুধ পান করাতেন। শেষ পর্যন্ত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাদের উভয়কে নিয়ে যেখানে কাবাঘর অবস্থিত সেখানে এসে উপস্থিত হলেন এবং মসজিদের উঁচু অংশে যমযমের উপরিস্থত এক বিরাট বৃক্ষতলে তাদেরকে রাখলেন। তখন মক্কায় না ছিল কোন জনমানব, না ছিল পানির কোনরূপ ব্যবস্থা। অতঃপর সেখানেই তাদেরকে রেখে গেলেন এবং একটি থলের মধ্যে কিছু খেজুর আর একটি মশকে স্বল্প পরিমাণ পানি দিয়ে গেলেন। তারপর ইবরাহীম আলাইহিস সালাম নিজ গৃহ অভিমুখে ফিরে চললেন।

ইসমাঈলের মাতা তার পিছু পিছু ছুটে আসলেন এবং চিৎকার করে বলতে লাগলেন, হে ইবরাহীম! কোথায় চলে যাচ্ছেন? আর আমাদেরকে রেখে যাচ্ছেন এমন এক ময়দানে, যেখানে না আছে কোন সাহায্যকারী না আছে পানাহারের কোন বস্তু। তিনি বার বার এ কথা বলতে লাগলেন। কিন্ত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম সেদিকে ফিরেও তাকালেন না। তখন হাজেরা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এর আদেশ কি আপনাকে আল্লাহ দিয়েছেন? তিনি জবাব দিলেন, হ্যাঁ। হাজেরা বললেন, তাহলে আল্লাহ আমাদের ধ্বংস ও বরবাদ করবেন না। তারপর তিনি ফিরে আসলেন। ইবরাহীমও সামনে চললেন। শেষ পর্যন্ত যখন তিনি গিরিপথের বাঁকে এসে পৌছলেন, যেখানে স্ত্রী-পুত্র আর তাকে দেখতে পাচ্ছিল না, তখন তিনি কাবা ঘরের দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন এবং দু’হাত তুলে এ দোআ করলেনঃ “হে আমাদের রব! আমি আমার বংশধরদের কিছু সংখ্যককে বসবাস করালাম অনুর্বর উপত্যকায় আপনার পবিত্র ঘরের কাছে, হে আমাদের রব! এ জন্যে যে, তারা যেন সালাত কায়েম করে। অতএব আপনি কিছু লোকের অন্তর তাদের প্রতি অনুরাগী করে দিন এবং ফল-ফলাদি দিয়ে তাদের রির্যকের ব্যবস্থা করুন, যাতে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।”

তখন ইসমাঈলের মা ইসমাঈলকে দুধ খাওয়াতেন আর নিজে ঐ মশক থেকে পানি পান করতেন। পরিশেষে মশকে যা পানি ছিল তা ফুরিয়ে গেল। তখন তিনি নিজেও তৃষ্ণার্ত হলেন এবং তার শিশুপুত্রটিও পিপাসায় কাতর হয়ে পড়ল। তিনি শিশুর প্রতি দেখতে লাগলেন, শিশুর বুক ধড়ফড় করছে কিংবা বলেছেন, সে জমিনে ছটফট করছে। শিশুপুত্রের দিকে তাকানো তার পক্ষে অসহনীয় হয়ে উঠল। তিনি সরে পড়লেন এবং তাঁর অবস্থানের সংলগ্ন পর্বত সাফা’কেই একমাত্র নিকটতম পর্বত হিসেবে পেলেন তারপর তিনি এর উপর উঠে দাঁড়িয়ে ময়দানের দিকে মুখ করলেন, এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখলেন কাউকে দেখা যায় কি না? কিন্তু না কাউকে তিনি দেখলেন না। তখন দ্রুত সাফা পর্বত থেকে নেমে পড়লেন। যখন তিনি নিচু ময়দানে পৌছলেন তখন আপন কামিজের এক দিক তুলে একজন শ্রান্ত-ক্লান্ত ব্যক্তির ন্যায় দৌড়ে চললেন। শেষে ময়দান অতিক্রম করলেন, মারওয়া পাহাড়ের নিকট এসে গেলেন এবং তার উপর উঠে দাঁড়ালেন। তারপর চারদিকে নজর করলেন, কাউকে দেখতে পান কি না?

কিন্তু কাউকে দেখলেন না তিনি অনুরূপভাবে সাতবার করলেন। ... তারপর যখন তিনি শেষবার মারওয়ার পাহাড়ের উপর উঠলেন, একটি আওয়াজ শুনলেন। তখন নিজেকেই নিজে বললেন, একটু অপেক্ষা কর। তিনি কান দিলেন। আবারও শব্দ শুনলেন। তখন বললেন, তোমার আওয়াজ তো শুনছি। যদি তোমার কাছে উদ্ধার করার মত কিছু থাকে আমাকে উদ্ধার কর। অকস্মাৎ তিনি, যমযম যেখানে অবস্থিত সেখানে একজন ফেরেশতাকে দেখতে পেলেন। সে ফেরেশতা আপন পায়ের গোড়ালি দ্বারা আঘাত করলেন। কিংবা তিনি বলেছেন-আপন ডানা দ্বারা আঘাত হানলেন। ফলে (আঘাতের স্থান থেকে) পানি উপচে উঠতে লাগল। হাজেরা এর চার পাশে বাঁধ দিয়ে তাকে হাউযের আকার দান করলেন এবং অঞ্জলি ভরে তার মশকটিতে পানি ভরতে লাগলেন। হাজেরার অঞ্জলি ভরার পরে পানি উছলে উঠতে লাগল। ... তারপর হাজেরা পানি পান করলেন এবং শিশুপুত্রকেও দুধ পান করালেন। তখন ফেরেশতা তাকে বললেন, ধ্বংসের কোন আশংকা আপনি করবেন না। কেননা, এখানেই আল্লাহর ঘর রয়েছে। এই শিশু তার পিতার সাথে মিলে এটি পুনঃ নিৰ্মাণ করবে এবং আল্লাহ তার পরিজনকে কখনও ধ্বংস করবেন না। ঐ সময় বায়তুল্লাহ জমিন থেকে টিলার ন্যায় উঁচু ছিল। বন্যার পানি আসতো এবং ডান বাম থেকে ভেঙ্গে নিয়ে যেতো।

হাজেরা এভাবেই দিন-যাপন করছিলেন। শেষ পর্যন্ত “জুরহুম” গোত্রের একদল লোক তাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে গেল। কিংবা তিনি বলেছেন, ‘জুরহুম’ গোত্রের কিছু লোক ‘কাদা’ এর পথে এ দিক দিয়ে আসছিল। তারা মক্কার নিচুভূমিতে অবতরণ করল এবং দেখতে পেল কতগুলো পাখি চক্রাকারে উড়ছে। তখন তারা বলল, নিশ্চয় এ পাখিগুলো পানির উপরই ঘুরছে। অথচ আমরা এ ময়দানে বহুকাল কাটিয়েছি। কিন্তু কোন পানি এখানে ছিল না। তারপর তারা একজন বা দু'জন লোক সেখানে পাঠাল। তারা গিয়েই পানি দেখতে পেল। ফিরে এসে সবাইকে পানির খবর দিল। সবাই সেদিকে অগ্রসর হলো। বর্ণনাকারী বলেনঃ ইসমাঈলের মাতা পানির কাছে বসা ছিলেন। তারা তাকে জিজ্ঞেস করল, আমরা আপনার নিকটবর্তী স্থানে বসবাস করতে চাই; আপনি আমাদেরকে অনুমতি দিবেন কি?

তিনি জবাব দিলেন, হ্যাঁ, তবে এ পানির উপর তোমাদের কোন অধিকার থাকবে না। তারা হ্যাঁ বলে সম্মতি জানালো। ইবনে আব্বাস বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, এ ঘটনা ইসমাঈলের মাতার জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ এনে দিল, তিনিও মানুষের সাহচর্য কামনা করছিলেন। ফলে আগন্তুক দলটি সেখানে বসতি স্থাপন করলো এবং পরিবার-পরিজনের কাছে খবর পাঠালো, তারাও এসে সেখানে বসবাস শুরু করল। শেষ পর্যন্ত সেখানে তাদের কয়েকটি খান্দান জন্ম নিল। ইসমাঈলও বড় হলেন, তাদের থেকে আরবী শিখলেন। জওয়ান হলে তিনি তাদের অধিক আগ্রহের বস্তু ও প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলেন। যখন তিনি যৌবনপ্রাপ্ত হলেন, তখন তারা তাদেরই এক মেয়েকে তার সঙ্গে বিয়ে দিল। বিয়ের পরে ইসমাঈলের মাতা মারা গেলেন। ... (ইতিমধ্যে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম দু’বার এসে ইসমাঈল ও স্ত্রীর খোজ নিলেন এবং এ ব্যাপারে দিক নির্দেশনা দিলেন)

পুনরায় ইবরাহীম আলাইহিস সালাম আল্লাহর ইচ্ছায় কিছু দিন এদের থেকে দূরে রইলেন। এরপর আবার তাদের কাছে আসলেন। ইসমাঈল আলাইহিস সালাম যমযমের কাছে একটি গাছের নীচে বসে নিজের তীর মেরামত করছিলেন। পিতাকে যখন আসতে দেখলেন, দাঁড়িয়ে তার দিকে এগিয়ে গেলেন। অতঃপর একজন পিতা-পুত্রের সঙ্গে সাক্ষাত হলে যা করে তারা তা-ই করলেন। তারপর ইবরাহীম আলাইহিস সালাম বললেনঃ হে ইসমাঈল! আল্লাহ আমাকে একটি কাজের হুকুম দিয়েছেন। ইসমাঈল আলাইহিস সালাম জবাব দিলেন, আপনার পরওয়ারদিগার আপনাকে যা আদেশ করেছেন তা করে ফেলুন। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম বললেনঃ তুমি আমাকে সাহায্য করবে কি? ইসমাঈল আলাইহিস সালাম বললেন, হ্যাঁ। আমি অবশ্যই আপনার সাহায্য করব ইবরাহীম আলাইহিস সালাম বললেন, আল্লাহ আমাকে এখানে এর চারপাশ ঘেরাও করে একটি ঘর বানানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এ বলে তিনি উঁচু টিলাটির দিকে ইশারা করলেন এবং স্থানটি দেখালেন।

তখনি তারা উভয়ে কাবা ঘরের দেয়াল উঠাতে লেগে গেলেন। ইসমাঈল আলাইহিস সালাম পাথর যোগান দিতেন এবং ইবরাহীম আলাইহিস সালাম গাথুনি করতেন। যখন দেয়াল উঁচু হয়ে গেল, তখন ইসমাঈল আলাইহিস সালাম মাকামে ইবরাহীম নামক মশহুর পাথরটি আনলেন এবং ইবরাহীম আলাইহিস সালামের জন্য তা যথাস্থানে রাখলেন। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর উপর দাঁড়িয়ে ইমারত নির্মাণ করতে লাগলেন এবং ইসমাঈল তাকে পাথর যোগান দিতে লাগলেন। আর উভয়ে এ দো'আ করতে থাকলেনঃ “হে আমাদের রব! আমাদের থেকে (এ কাজটুকু) কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সবকিছু শুনেন ও জানেন।” আবার তারা উভয়ে ইমারত নির্মাণ করতে লাগলেন। তারা কাবা ঘরের চারদিকে ঘুরছিলেন এবং উভয়ে এ দোআ করছিলেনঃ হে আমাদের প্রভু! আমাদের এ শ্রমটুকু কবুল করে নিন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। [সূরা আল-বাকারাহঃ ১২৭], [বুখারীঃ ৩৩৬৪]


(২) ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ পান যে, দুগ্ধপোষ্য শিশু ও তার জননীকে শুষ্ক প্রান্তরে ছেড়ে আপনি শামে চলে যান, তখন তিনি আবেদন করেছিলেন যে, তাদেরকে ফলমূল দান করুন; যদিও তা অন্য জায়গা থেকে আনা হয়। এ কারণেই মক্কা মুকাররামায় আজ পর্যন্ত চাষাবাদের তেমন ব্যবস্থা না থাকলেও সারা বিশ্বের ফলমূল এত অধিক পরিমাণে সেখানে পৌছে থাকে যে, অন্যান্য অনেক শহরেই সেগুলো পাওয়া দুস্কর।


(৩) এ আয়াতাংশ থেকে কেউ কেউ প্রমাণ নিতে চেষ্টা করেছেন যে, বায়তুল্লাহর ভিত্তি ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর পূর্বে স্থাপিত হয়েছিল। কোন কোন মুফাসসির এ আয়াতের এবং বিভিন্ন বর্ণনার ভিত্তিতে বলেনঃ সর্বপ্রথম আদম 'আলাইহিস সালাম বায়তুল্লাহ নিৰ্মাণ করেন। নূহের মহাপ্লাবনের পর ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে এই ভিত্তির উপরেই বায়তুল্লাহ পূননির্মাণের আদেশ দেয়া হয়। জিবরীল আলাইহিস সালাম প্রাচীন ভিত্তি দেখিয়ে দেন। [কুরতুবী] তবে সহীহ কোন দলীল সরাসরি এটা প্রমাণ করে না যে, ইবরাহীম আলাইহিস সালামের পূর্বে কেউ কা'বা ঘর বানিয়েছে। বিভিন্ন দুর্বল বর্ণনায় আদম আলাইহিস সালাম এবং পরবর্তী ধ্বংসপ্রাপ্ত কিছু জাতির মক্কায় আসার কথা এসেছে, কিন্তু সেগুলো সহীহ হাদীসের বিপরীতে টিকে না। যেখানে সরাসরি সহীহ হাদীসে এসেছে যে, “প্রথম মাসজিদ বাইতুল্লাহিল হারাম তারপর বাইতুল মাকদিস, আর এ দুয়ের মধ্যে সময়ের ব্যবধান হলো চল্লিশ বছরের”। [দেখুনঃ মুসলিমঃ ৫২০]

ইবরাহীম আলাইহিস সালাম নির্মিত এই প্রাচীর জাহেলিয়াত যুগে বিধ্বস্ত হয়ে গেলে কুরাইশরা তা নতুনভাবে নির্মান করে। এ নির্মাণকাজে আবু তালেবের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও নবুওয়তের পূর্বে অংশগ্রহণ করেন। [মুসলিমঃ ৩৪০] এতে বায়তুল্লাহর বিশেষণ محرم উল্লেখ করা হয়েছে। এর অর্থ সম্মানিতও হতে পারে এবং সুরক্ষিতও। বায়তুল্লাহর মধ্যে উভয় বিশেষণই বিদ্যমান। এটি যেমন চিরকাল সম্মানিত, তেমনি চিরকাল শক্রর কবল থেকে সুরক্ষিত। [কুরতুবী]


(৪) ইবরাহীম আলাইহিস সালাম দো'আর প্রারম্ভে পুত্র ও তার জননীর অসহায়তা ও দুর্দশা উল্লেখ করার পর সর্বপ্রথম সালাত কায়েমকারী করার দোআ করেন। ইবন জারীর বলেন, এখানে বায়তুল্লাহকে কেন হারাম বা সম্মানিত/সুরক্ষিত করা হয়েছে তার কারণ বর্ণনা করা হয়েছে আর সেটা হচ্ছে, যাতে মানুষ সেখানে সালাত আদায় করতে সমর্থ হয়। [তাবারী; ইবন কাসীর] তাছাড়া সালাত সবচেয়ে উত্তম ইবাদাত। [আল-বাহরুল মুহীত] এর দ্বারা দুনিয়া ও আখেরাতের যাবতীয় মঙ্গল সাধিত হয়। যে এ সালাত ঠিকভাবে কায়েম রাখতে পারবে সে দ্বীন কায়েম রাখতে পারবে। [সা'দী] এ থেকে বোঝা গেল যে, পিতা যদি সন্তানকে সালাতের অনুবর্তী করে দেয়, তবে এটাই সন্তানদের পক্ষে পিতার সর্ববৃহৎ সহানুভূতি ও হিতাকাংখা হবে।


(৫) أفئدة শব্দটি فؤاد এর বহুবচন। এর অর্থ অন্তর। এখানে أفئدة শব্দটি نكرة এবং তার সাথে من অব্যয় ব্যবহার করা হয়েছে, যা تبعيض ও تقليل এর অর্থে আসে। তাই অর্থ এই যে, কিছু সংখ্যক লোকের অন্তর তাদের দিকে আকৃষ্ট করে দিন। [কুরতুবী; ফাতহুল কাদীর] কোন কোন তাফসীরবিদ বলেনঃ যদি এ দোআয় কিছু সংখ্যক অর্থবোধক অব্যয় ব্যবহার করা না হত; তবে সারা বিশ্বের মুসলিম, অমুসলিম, ইয়াহুদী, নাসারা এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সব মানুষ মক্কায় ভীড় করত, যা তাদের জন্য কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াত। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম দোআয় বলেছেনঃ কিছু সংখ্যক লোকের অন্তর তাদের দিকে আকৃষ্ট করে দিন। যাতে করে শুধু মুসলিমরাই এখানে আসে। [ইবন কাসীর]


(৬) যাতে করে তারা এ ফল-মুল খেয়ে আপনার ইবাদতের জন্য শক্তি লাভ করতে পারে। [ইবন কাসীর] আল্লাহ তা'আলা এ দোআ কবুল করেছেন। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, “আমরা কি তাদেরকে এক নিরাপদ হারামে প্রতিষ্ঠিত করিনি, যেখানে সর্বপ্রকার ফলমূল আমদানী হয় আমাদের দেয়া রিযকস্বরূপ।” [সূরা আল-কাসাসঃ ৭৫]এ দোআর প্রভাবেই মক্কা মুকাররামা কোন কৃষিপ্রধান অথবা শিল্পপ্রধান এলাকা না হওয়া সত্বেও সারা বিশ্বের দ্রব্যসামগ্রী এখানে প্রচুর পরিমাণে আমদানী হয়, যা বোধ হয় জগতের অন্য কোন বৃহত্তম শহরেও পাওয়া যায় না। এ দোআর বরকতেই সব যুগে সব ধরনের ফল, ফসল ও অন্যান্য জীবন ধারণ সামগ্রী সেখানে পৌছে থাকে। [কুরতুবী]


(৭) এতে ইঙ্গিত করেছেন যে, সন্তানদের জন্য আর্থিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের দোআ এ কারণে করা হয়েছে, যাতে তারা কৃতজ্ঞ হয়ে কৃতজ্ঞতার সওয়াবও অর্জন করে। এভাবে সালাতের অনুবর্তিতা দ্বারা দোআ শুরু করে কৃতজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে শেষ করা হয়েছে। মাঝখানে আর্থিক সুখ-শান্তির প্রসঙ্গ আনা হয়েছে। এতে শিক্ষা রয়েছে যে, মুসলিমের এরূপই হওয়া উচিত। তার ক্রিয়াকর্ম, ধ্যান-ধারণার উপর আখেরাতের কল্যাণ চিন্তা প্রবল থাকা দরকার এবং সংসারের কাজ ততটুকুই করা উচিত, যতটুকু নেহায়েত প্রয়োজন।


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৩৭) হে আমাদের প্রতিপালক! আমি আমার কিছু বংশধরকে[1] ফল-ফসলহীন উপত্যকায় তোমার পবিত্র গৃহের নিকট বসবাস করালাম; হে আমাদের প্রতিপালক! যাতে তারা নামায কায়েম করে।[2] সুতরাং তুমি কিছু লোকের[3] অন্তরকে ওদের প্রতি অনুরাগী করে দাও এবং ফলমূল দ্বারা তাদের জীবিকার ব্যবস্থা কর;[4] যাতে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।


তাফসীর:

[1] مِنْ ذُرِّيَّتِيْ তে مِنْ তাব‘ঈযের (অর্থাৎ আংশিক অর্থ প্রকাশের) জন্য ব্যবহূত হয়েছে। অর্থাৎ কিছু বংশধরকে। বলা হয় যে, ইবরাহীম (আঃ)-এর ঔরসজাত ছেলে আটজন, তাদের মধ্যে শুধু ইসমাঈল (আঃ)-কে এখানে বসবাস করিয়েছিলেন। (ফাতহুল কাদীর)

[2] ইবাদতসমূহের মধ্যে শুধু নামাযের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে নামাযের গুরুত্ব প্রকাশ পায়।

[3] এখানেও مِنْ তাব‘ঈযের (অর্থাৎ আংশিক অর্থ প্রকাশের) জন্য ব্যবহূত হয়েছে। অর্থাৎ, কিছু লোকের; উদ্দেশ্য মুসলিমগণ। সুতরাং দেখে নিন যে, কিভাবে নিখিল বিশ্বের মুসলিমরা মক্কা মুকার্রামায় একত্রিত হয়ে থাকে এবং হজ্জের মৌসম ছাড়াও সারা বছর এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে। যদি ইবরাহীম (আঃ) أفْئِدَةَ النَّاسِ (মানুষের অন্তর) বলতেন, তাহলে খ্রিষ্টান, ইয়াহুদী, অগ্নিপূজক এবং অন্যান্য সমস্ত মানুষ মক্কা পৌঁছত। مِنَ النَّاسِ এর مِنْ শব্দটি এই দু’আকে মুসলমান পর্যন্ত সীমিত করে দিয়েছে। (ইবনে কাসীর)

[4] এ দু’আরও প্রভাব লক্ষণীয় যে, মক্কার মত বৃক্ষ-পানিহীন অনাবাদ জায়গাতে যেখানে কোন ফলদার বৃক্ষ ছিল না, আজ সেখানে বিভিন্ন প্রকারের ফলমূল পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যায়। হজ্জের মৌসুমেও ফল-ফ্রুটের কোন প্রকার ঘাটতি হয় না, অথচ লক্ষ লক্ষ মানুষ সেখানে উপস্থিত হয়। এটা মহান আল্লাহর খলীল ইবরাহীম (আঃ)-এর দু’আর বদৌলতে তাঁর (আল্লাহর) পক্ষ থেকে দয়া, কৃপা, অনুগ্রহ, অনুকম্পা ও বরকত। বলা হয় যে, তিনি উক্ত দু’আ কা’বাঘর নির্মাণ করার পর করেছিলেন। পক্ষান্তরে প্রথম দু’আটি (নিরাপদ কর) সেই সময় করেছিলেন, যখন স্বীয় স্ত্রী ও নবজাত শিশু ইসমাঈলকে আল্লাহর নির্দেশে সেখানে রেখে চলে গিয়েছিলেন। (ইবনে কাসীর)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৩৫-৪১ নং আয়াতের তাফসীর:



মক্কার নিরাপত্তা ও শির্ক থেকে নিজে ও সন্তানদেরকে বাঁচার জন্য আল্লাহ তা‘আলার দরগাহে মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহীম (عليه السلام) যে দু‘আ করেছিলেন সে কথা অত্র আয়াতগুলোতে তুলে ধরা হয়েছে। উক্ত আয়াতে هذا البلد দ্বারা মক্কা নগরীকে বোঝানো হয়েছে। ইবরাহীম (عليه السلام) প্রথমেই নিরাপত্তার দু‘আ করলেন এজন্য যে, কোন স্থানে নিরাপত্তা না থাকলে সে স্থান যতই মূল্যবান হোক আর যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক তাতে কেউ যেতে চাইবে না। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর দু‘আ কবূল করলেন যার ফলে আজও সেখানে নিরাপত্তা বিরাজ করছে, কোন হত্যা, খুন, রাহাজানি, বিবাদ নেই ইত্যাদি ইত্যাদি; এমনকি পশুপাখি পর্যন্তও নিরাপদে থাকে।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّا جَعَلْنَا حَرَمًا اٰمِنًا وَّيُتَخَطَّفُ النَّاسُ مِنْ حَوْلِهِمْ)



“তারা কি দেখে না আমি ‘হারাম'কে নিরাপদ স্থান করেছি, অথচ তার চতুষ্পার্শ্বে যেসব মানুষ আছে, তাদেরকে ছিনিয়ে নেয়া হয় (হামলা করা হয়)।” (সূরা আনকাবুত ২৯:৬৭)



যারা অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এ ঘরের দিকে অগ্রসর হয়েছে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ধূলিস্যাৎ করে দিয়েছেন, কিয়ামত পর্যন্ত এ ঘর এবং এ ঘরে যারা আসবে সবাই নিরাপদে থাকবে।



(وَّاجْنُبْنِيْ وَبَنِيَّ)



তিনি আরো দু‘আ করলেন তাঁর জন্য এবং তাঁর সন্তানদের জন্য যেন তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা মূর্তি পূজা থেকে বাঁচিয়ে রাখেন। এখানে তৎকালীন মক্কার মুশরিকদের দাঁতভাঙ্গা জবাব দেয়া হয়েছে। তারা দাবী করত আমরা ইবরাহীমের মিল্লাতের অনুসারী, ইবরাহীম (عليه السلام) তো প্রতিমা পূজারী ছিলেন না, তিনি কাবা নির্মাণ করলেন তাওহীদের ওপর ভিত্তি করে। ভবিষ্যতে কখনো যাতে শির্ক না হয় সে জন্য তিনি আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু‘আ করলেন যেন তিনি তাঁকে ও তাঁর সন্তানদেরকে শির্ক থেকে রক্ষা করেন। অথচ তোমরা কাবা ঘরে মূর্তি রেখে পূজা করছ আর বলছ, আমরা ইবরাহীম (عليه السلام) এর অনুসারী।



আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম (عليه السلام)-এর এই দু‘আ তাঁর কিছু সন্তানের জন্য কবূল করলেন এবং কিছু সন্তানের জন্য কবূল করেননি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَمِنْ ذُرِّيَّتِهِمَا مُحْسِنٌ وَّظٰلِمٌ لِّنَفْسِه۪ مُبِيْنٌ)‏



“তাদের বংশধরদের মধ্যে কতক ছিল সৎ লোক এবং কতক নিজেদের ওপর প্রকাশ্য অত্যাচারী।” (সূরা স্বফ্ফাত ৩৭:১১৩)



অর্থাৎ সবাই তাওহীদের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারবে না, কেবল আল্লাহ তা‘আলা যাদেরকে তাওফীক দান করবেন তারাই পারবে।



সন্তানের ভবিষ্যত মঙ্গল কামনা করে সব পিতা-মাতাই দু‘আ করে থাকে। পিতা-মাতার উচিত সন্তানকে শির্ক থেকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু‘আ করা যেমন ইবরাহীম (عليه السلام) করেছেন।



(إِنَّهُنَّ أَضْلَلْنَ كَثِيْرًا)



অর্থাৎ এসব মূর্তি, প্রতিমা অনেক মানুষকে পথভ্রষ্ট করেছে। প্রশ্ন হতে পারে এরা তো জড় পদার্থ, এরা পথভ্রষ্ট করল কিভাবে? উত্তর এরা পথভ্রষ্ট করেনি, কিন্তু এদের কারণে মানুষ পথভ্রষ্ট হয়েছে। এদেরকে অনেকে কল্যাণদাতা, অকল্যাণ প্রতিরোধকারী মনে করে ইবাদত করে। তাই ইবরাহীম (عليه السلام) বললেন: যারা তাওহীদের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে তারাই আমার অন্তর্ভুক্ত, আমার মিল্লাতভুক্ত। আর যারা আমার অবাধ্য হবে তথা আমি যে তাওহীদের বাণী নিয়ে এসেছি তা বর্জন করবে তাদের দায়িত্ব তোমার হাতে, তুমি ক্ষমাশীল দয়ালু। যেমন



ঈসা (عليه السلام)-ও বলেছিলেন:



(إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ ج وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيْزُ الْحَكِيْمُ)



“তুমি যদি তাদেরকে শাস্তি দাও তবে তারা তো তোমারই বান্দা, আর যদি তাদেরকে ক্ষমা কর তবে তুমি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’’ (সূরা মায়িদা ৫:১১৮)



সুতরাং কেউ কথা অমান্য করলে রাগের বশবর্তী হয়ে তার ওপর বদ্দু‘আ করা যাবেনা বরং তার ওপর রহমতের দু‘আ করতে হবে। যেন আল্লাহ তা‘আলা তাকে সঠিক জিনিস বোঝার জ্ঞান দান করেন।



হাজেরার ঘরে যখন ইসমাঈল (عليه السلام) জন্ম নিলেন তখন ইবরাহীম (عليه السلام) কে আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিলেন তিনি যেন হাজেরা ও সন্তান ইসমাঈলকে নির্জন মরুভূমি মক্কায় রেখে আসে। বৃদ্ধ বয়সে একটি সন্তান পেলেন তাও নিজের কাছে রাখার সুযোগ পেলেন না। আল্লাহ তা‘আলার আদেশ পেতে দেরী, পালন করতে দেরী নয়। সকল মায়া মমতা বর্জন করে স্ত্রী হাজেরা ও কলিজার টুকরা ইসমাঈলকে রেখে আসলেন। যখন রেখে চলে আসেন তখন হাজেরা বললেন: আপনি কি নিজের পক্ষ থেকে রেখে যাচ্ছেন, না কি আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশে?



ইবরাহীম ভারাক্রান্ত মনে কথা বলতে পারছেন না, হাত দিয়ে আকাশের দিকে ইশারা করে বললেন, আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশে। তখন হাজেরা বললেন: তাহলে কোন চিন্তা নেই, যে আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশে রেখে যাচ্ছেন সে আল্লাহ তা‘আলাই আমাদের ব্যবস্থা করবেন। তখন ইবরাহীম (عليه السلام) এ দু‘আ করলেন ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমি আমার বংশধরদের কতককে বসতি করলাম অনুর্বর (চাষাবাদহীন) উপত্যকায় তোমার পবিত্র গৃহের নিকট, হে আমাদের প্রতিপালক! তারা যেন সালাত কায়েম করে।’



مِنْ এখানে تبعضية বা আংশিক অর্থে ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ কিছু লোক, উদ্দেশ্য হল মুসলিমগণ। আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম (عليه السلام) এর দু‘আ কবূল করে নিলেন, ফলে সারা পৃথিবী থেকে মুসিলমরা দলে দলে হজ্জের মওসুমে উপস্থিত হয়, হজ্জের মওসুম ছাড়াও এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে। এমনকি যাদের হজ্জ করার সামর্থ নেই তাদের মনে আগ্রহ থাকে, যদি একবার সেখানে যেতে পারতাম। এভাবে আল্লাহ তা‘আলা মুসিলমদের মনে মক্কার প্রতি একটি আগ্রহ সৃষ্টি করে দিয়েছেন।



(وَارْزُقْهُمْ مِّنَ الثَّمَرٰتِ)



এ দু‘আরও প্রভাব লক্ষ্যণীয়, মক্কার মত বৃক্ষ-লতাহীন মরুভূমি, যেখানে কোন ফলফলাদি আবাদ হয় না সেখানে আজ বিভিন্ন রকমের ফলফলাদি সর্বদা পর্যাপ্ত পরিমাণ পাওয়া যায়, যদিও মওসুম না হয়।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “আর স্মরণ কর! যখন ইবরাহীম বললেন: হে আমার রব! এ স্থানকে তুমি নিরাপত্তাময় শহরে পরিণত কর এবং এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস স্থাপন করেছে, তাদেরকে জীবিকার জন্য ফল-শস্য প্রদান কর। আল্লাহ বলেন, যারা অবিশ্বাস করে তাদেরকে আমি অল্পদিন ভোগ করতে দেব। পরে তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করতে বাধ্য করব, এটি নিকৃষ্টতম গন্তব্যস্থল! ” (সূরা বাক্বারাহ ২:১২৬)



(رَبَّنَآ إِنَّكَ تَعْلَمُ مَا نُخْفِيْ وَمَا نُعْلِنُ)



অর্থাৎ হে আল্লাহ তা‘আলা যেহেতু তুমি সব জান, কোন কিছুই তোমার কাছে গোপন নেই সেহেতু তুমি আমার দু‘আর উদ্দেশ্যও জান। সুতরাং তুমি আমার দু‘আ কবূল করে নিও।



বৃদ্ধ বয়সে সন্তান ইসমাঈল ও ইসহাককে পেয়ে ইবরাহীম (عليه السلام) আল্লাহ তা‘আলার শুকরিয়া আদায় করলেন, আর তিনি প্রার্থনা করলেন যেন তিনি সালাত কায়েম করতে পারেন এবং তাঁর উত্তরসূরীগণ। আরো দু‘আ করলেন যাতে তাঁকে, পিতা-মাতাকে এবং সকল মু’মিনদেরকে হিসাবের দিন আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমা করে দেন। তবে তাঁর পিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা তখন করেছিলেন যখন তিনি জানতেন না যে, তার পিতা আল্লাহ তা‘আলার দুশমন। যখন জানতে পারলেন তখন এ দু‘আ থেকে বিরত থাকলেন।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَمَا كَانَ اسْتِغْفَارُ إِبْرٰهِيْمَ لِأبِيْهِ إِلَّا عَنْ مَّوْعِدَةٍ وَّعَدَهَآ إِيَّاهُ ج فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَه۫ أَنَّه عَدُوٌّ لِّـلّٰهِ تَبَرَّأَ مِنْهُ ط إِنَّ إِبْرٰهِيْمَ لَأَوَّاهٌ حَلِيْمٌ)‏



“ইব্রাহীম তার পিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছিল, তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বলে; অতঃপর যখন এটা তার নিকট সুস্পষ্ট হল যে, সে আল্লাহর শত্র“ তখন ইব্রাহীম তার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করল। ইব্রাহীম তো কোমল হৃদয়সম্পন্ন ও সহনশীল।” (সূরা তাওবা ৯:১১৪)



কারণ কাফির-মুশরিকদের জন্য দু‘আ করা কোন নবী-রাসূলের জন্য সমীচীন নয়।



আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِيْنَ اٰمَنُوْآ أَنْ يَّسْتَغْفِرُوْا لِلْمُشْرِكِيْنَ وَلَوْ كَانُوْا أُولِيْ قُرْبٰي مِنْۭ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحٰبُ الْجَحِيْمِ)



“নিকট আত্মীয়-স্বজন হলেও মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা নাবী এবং মু’মিনদের জন্য সংগত নয় যখন এটা সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, নিশ্চিতই তারা জাহান্নামী।” (সূরা তাওবাহ ৯:১১৩)



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. পিতা-মাতার উচিত সন্তানের জন্য ভাল দু‘আ করা।

২. কোন মানুষের জন্য বদদু‘আ করা উচিত নয়।

৩. মানুষ সামাজিক জীব হিসেবে সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করে, তাই ইসলাম সন্ন্যাসী জীবন পছন্দ করে না।

৪. কোন খুশির সংবাদ পেলে আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা আদায় করতে হবে। যেমন ইবরাহীম (عليه السلام) সন্তান লাভ করার পর আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করেছেন।

৫. ভালো কাজ করার জন্য আল্লাহ তা‘আলার তাওফীক কামনা করতে হবে।

৬. সন্তান পিতা-মাতার জন্য উত্তম দু‘আ করবে।

৭. মক্কা ও পার্শ্ববর্তী হারাম এলাকা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে নিরাপত্তাপ্রাপ্ত। সেখানে কোন মারামারি, হানাহানি ইত্যাদি কিছুই হবে না।

৮. মু’মিন ব্যক্তিদের উচিত পরস্পরের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা ।

৯. কোন কাফির-মুশরিকদের জন্য ক্ষমা চাওয়া জায়েয নয়।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: এটা হচ্ছে দ্বিতীয় দুআ। তাঁর প্রথম দুআ হচ্ছে তখনকার দুআ’টি যখন তিনি এই শহরটি আবাদ হওয়ার পূর্বে হযরত ইসমাঈলকে (আঃ) তাঁর মা সহ এখানে ছেড়ে এসেছিলেন। আর এটা হচ্ছে এ শহরটি আবাদ হওয়ার পরের দুআ’। এ জন্যেই তিনি (আরবি) (আপনার পবিত্র গৃহের নিকট) বলেছেন। আর তিনি নামায কায়েম করার কথাও উল্লেখ করেছেন।

ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বলেন, যে এটা (আরবি) শব্দের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। অর্থাৎ এটাকে মর্যাদা সম্পন্ন রূপে এজন্যেই বানানো হয়েছে যে, যেন এখানকার লোকেরা শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে এখানে নামায আদায় করতে পারে। এখানে একথাটিও স্মরণ যোগ্য যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) বললেনঃ “কিছু লোকের অন্তর এর প্রতি অনুরাগী করে দিন।” যদি তিনি সমস্ত লোকের অন্তর এর প্রতি অনুরাগী করে দেয়ার প্রার্থনা করতেন তবে পারসিক, রোমক, ইয়াহুদী, খৃস্টান, মোট কথা দুনিয়ার সমস্ত লোক এখানে এসে ভীড় জমাতো। তিনি শুধুমাত্র মুসলমানদের জন্যে এই প্রার্থনা করেছিলেন। আর প্রার্থনায় তিনি বললেনঃ “ফলাদির দ্বারা তাদের রিকের ব্যবস্থা করুন।” অথচ এই যমীন ফল উৎপাদনের যোগ্যই নয়। এটা তো অনুর্বর ভূমি। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁর এই দুআ’ও কবুল করেন। ইরশাদহচ্ছেঃ “আমি কি তাদেরকে মর্যাদা সম্পন্ন নিরাপদ শহর দান করি নাই, যেখানে সর্বপ্রকারের ফল পূর্ণভাবে আমদানি হয়ে থাকে? এই রিকের ব্যবস্থা খাস করে আমার নিকট থেকেই করা হয়েছে।” সুতরাং এটা আল্লাহ তাআলার একটা বিশেষ দান ও রহমত যে, এই শহরে কোন কিছুই জন্মে না, অথচ চতুর্দিক থেকে নানা প্রকারের ফল এখানে পূর্ণ মাত্রায় আমদানিহচ্ছে। এটা হচ্ছে হযরত ইবরাহীম খালীলুল্লাহরই (আঃ) দুআ’র বরকত।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।