সূরা ইবরাহীম (আয়াত: 1)
হরকত ছাড়া:
الر كتاب أنزلناه إليك لتخرج الناس من الظلمات إلى النور بإذن ربهم إلى صراط العزيز الحميد ﴿١﴾
হরকত সহ:
الٓرٰ ۟ کِتٰبٌ اَنْزَلْنٰهُ اِلَیْکَ لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمٰتِ اِلَی النُّوْرِ ۬ۙ بِاِذْنِ رَبِّهِمْ اِلٰی صِرَاطِ الْعَزِیْزِ الْحَمِیْدِ ۙ﴿۱﴾
উচ্চারণ: আলিফ লাম রা- কিতা-বুন আনযালনা-হু ইলাইকা লিতুখরিজান্না-ছা মিনাজজু লুমাতি ইলাননূরি, বিইযনি রাব্বিহিম ইলা -সিরা-তিল ‘আযীযিল হামীদ।
আল বায়ান: আলিফ-লাম-রা; এই কিতাব, যা আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে তুমি মানুষকে তাদের রবের অনুমতিক্রমে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আন, পরাক্রমশালী সর্বপ্রশংসিতের পথের দিকে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১. আলিফ-লাম্-রা, এ কিতাব, আমরা এটা আপনার প্রতি নাযিল করেছি(১) যাতে আপনি মানুষদেরকে তাদের রবের অনুমতিক্রমে বের করে আনতে পারেন অন্ধকার থেকে আলোর দিকে(২) পরাক্রমশালী, সর্বপ্রশংসিতের পথের দিকে(৩),
তাইসীরুল ক্বুরআন: আলিফ-লাম-র, একটা কিতাব যা তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি যাতে তুমি মানুষকে তাদের প্রতিপালকের নির্দেশে অন্ধকার থেকে নিয়ে আসতে পার আলোর দিকে- মহাপরাক্রমশালী প্রশংসিতের পথে।
আহসানুল বায়ান: (১) আলিফ লা-ম রা। এই কিতাব এটা আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি; যাতে তুমি মানব জাতিকে তাদের প্রতিপালকের নির্দেশক্রমে[1] অন্ধকার হতে আলোকের দিকে;[2] পরাক্রমশালী, সর্বপ্রশংসিতের পথে বের করে আনতে পার।
মুজিবুর রহমান: আলিফ লাম রা। এই কিতাব আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি যাতে তুমি মানব জাতিকে বের করে আনতে পার অন্ধকার হতে আলোর দিকে; তাঁর পথে, যিনি পরাক্রমশালী, প্রশংসা ।
ফযলুর রহমান: আলিফ লাম রা [পবিত্র কোরআনে কোন কোন সূরার শুরুতে শব্দসংক্ষেপের আদলে সন্নিবেশিত এ জাতীয় বিচ্ছিন্ন হরফমালার প্রকৃত তাৎপর্য আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না]। (এটি) একটি কিতাব, যা আমি তোমার কাছে নাযিল করেছি, যাতে তুমি মানুষকে তাদের প্রভুর হুকুমে অন্ধকার থেকে বের করে আলোতে আনতে পার, অর্থাৎ মহাপরাক্রমশালী ও সর্বময় প্রশংসার মালিকের (আল্লাহর) পথে নিয়ে আসতে পার।
মুহিউদ্দিন খান: আলিফ-লাম-রা; এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি-যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন-পরাক্রান্ত, প্রশংসার যোগ্য পালনকর্তার নির্দেশে তাঁরই পথের দিকে।
জহুরুল হক: আলিফ, লাম, রা। একখানা গ্রন্থ, আমরা তোমার কাছে এ অবতারণ করেছি যেন তুমি মানবগোষ্ঠিকে তাদের প্রভুর অনুমতিক্রমে অন্ধকার থেকে আলোকে বের করে আনতে পারো, -- মহাশক্তিশালী পরম প্রশংসার্হের পথে,
Sahih International: Alif, Lam, Ra. [This is] a Book which We have revealed to you, [O Muhammad], that you might bring mankind out of darknesses into the light by permission of their Lord - to the path of the Exalted in Might, the Praiseworthy -
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১. আলিফ-লাম্-রা, এ কিতাব, আমরা এটা আপনার প্রতি নাযিল করেছি(১) যাতে আপনি মানুষদেরকে তাদের রবের অনুমতিক্রমে বের করে আনতে পারেন অন্ধকার থেকে আলোর দিকে(২) পরাক্রমশালী, সর্বপ্রশংসিতের পথের দিকে(৩),
তাফসীর:
(১) অর্থাৎ এটা ঐ গ্রন্থ, যা আমরা আপনার প্রতি নাযিল করেছি। এতে নাযিল করার কাজটি আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করা এবং সম্বোধন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দিকে করার দ্বারা এটা বুঝা যায় যে, এ গ্রন্থ আল-কুরআন অত্যন্ত মহান। একে স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা নাযিল করেছেন। এটি আসমান থেকে নাযিল হওয়া কিতাবাদির মধ্যে অতি সম্মানিত গ্রন্থ। তিনি তা নাযিল করেছেন আরব বা অনারব যমীনের অধিবাসী সকল মানুষের কাছে প্রেরিত রাসূলদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তির উপর। [ইবন কাসীর]
(২) এখানে ناس শব্দের অর্থ সাধারণ মানুষ। এতে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সকল যুগের মানুষই বোঝানো হয়েছে। [ফাতহুল কাদীর] ظلمات শব্দটি ظلمة এর বহুবচন। এর অর্থ অন্ধকার। এখানে ظلمات বলে কুফর, শির্ক ও মন্দকর্মের অন্ধকারসমূহ আবার কারও কারও মতে, বিদ'আত। অপর কারও মতে, সন্দেহ। পক্ষান্তরে نور বলে ঈমানের আলো বোঝানো হয়েছে। অথবা সুন্নাত বা ইয়াকীন বা দৃঢ়বিশ্বাস বোঝানো হয়েছে। [ফাতহুল কাদীর] ظلمات শব্দটি বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। কেননা, কুফর ও শির্কের প্রকারভেদ অনেক। অমনিভাবে মন্দকর্মের সংখ্যাও গণনার বাইরে। বিদ'আতের সংখ্যাও অনুরূপভাবে প্রচুর। আর যে সন্দেহ মানব ও জিন শয়তান মানুষের মনে তৈরী করে তা বহু রকমের। পক্ষান্তরে نور শব্দটি একবচনে আনা হয়েছে। কেননা, ঈমান ও সত্য এক। আয়াতের অর্থ এই যে, আমি এ গ্রন্থ এ জন্য আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি এর সাহায্যে বিশ্বের মানুষকে কুফর, শির্ক ও মন্দকর্মের অন্ধকার থেকে মুক্তি দিয়ে তাদের রবের আদেশক্রমে ঈমান ও সত্যের আলোর দিকে আনয়ন করেন। যেমন অন্য আয়াতে আল্লাহ্ বলেন, “তিনিই তাঁর বান্দার প্রতি সুস্পষ্ট আয়াত নাযিল করেন, তোমাদেরকে অন্ধকার হতে আলোতে আনার জন্য [সূরা আল-হাদীদঃ ৯] [ইবন কাসীর]
(৩) এ আয়াতের শুরুতে যে অন্ধকার ও আলোর উল্লেখ করা হয়েছিল, বলাবাহুল্য তা ঐ অন্ধকার ও আলো নয়, যা সাধারণ দৃষ্টিতে দেখা যায়। তাই তা ফুটিয়ে তোলার জন্য এ বাক্যে বলা হয়েছে যে, ঐ আলো হচ্ছে আল্লাহর পথ। যে সুস্পষ্ট পথ আল্লাহ মানুষের চলার জন্য প্রবর্তন করেছেন। যে পথে যেতে এবং যে পথে প্রবেশ করতে তিনি মানুষদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। [ফাতহুল কাদীর] এস্থলে আল্লাহ শব্দটি পরে এবং তার আগে তার দুটি গুণবাচক নাম عزيز ও حميد উল্লেখ করা হয়েছে। عزيز শব্দের অর্থ শক্তিশালী ও পরাক্রান্ত এবং حميد শব্দের অর্থ ঐ সত্তা, যিনি প্রশংসার হকদার হওয়ার ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ। [ফাতহুল কাদীর]। তিনি তার যাবতীয় কাজ, কথা, শরীআত, নির্দেশ, ও নিষেধের ক্ষেত্রে প্রশংসিত এবং তাঁর যাবতীয় নির্দেশের ক্ষেত্রে সত্যবাদী। [ইবন কাসীর] আল্লাহর এ দুটি গুণবাচক নাম আসল নামের পূর্বে উল্লেখ করে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, এ পথ পথিককে যে সত্তার দিকে নিয়ে যায়, তিনি প্রবল পরাক্রান্ত এবং প্রশংসার হকদার হওয়ার ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ। ‘হামীদ’ শব্দটির অপর অর্থ, প্রত্যেকের মুখেই তাঁর প্রশংসা, সকল স্থানে ও সকল অবস্থায় তিনি সম্মানিত। [ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১) আলিফ লা-ম রা। এই কিতাব এটা আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি; যাতে তুমি মানব জাতিকে তাদের প্রতিপালকের নির্দেশক্রমে[1] অন্ধকার হতে আলোকের দিকে;[2] পরাক্রমশালী, সর্বপ্রশংসিতের পথে বের করে আনতে পার।
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, নবীর কাজ শুধু হিদায়াতের রাস্তা দেখানো। যদি কেউ হিদায়াতের পথ অবলম্বন করে, তাহলে তা একমাত্র আল্লাহর হুকুম ও ইচ্ছার ভিত্তিতেই করে থাকে। কেননা মূল হিদায়াতদানকারী তো তিনিই। যদি তাঁর ইচ্ছা না হয়, তাহলে নবী যতই ওয়ায-নসীহত করুক না কেন, লোকেরা হিদায়াতের পথে আসতে প্রস্তুত হবে না। এর বিভিন্ন উদাহরণ পূর্ববর্তী নবীদের জীবনে বিদ্যমান রয়েছে। স্বয়ং শেষনবী (সাঃ)-এর কঠিন ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তাঁর দয়ার্দ্র চাচা আবূ তালেবকে মুসলমান করতে পারেননি।
[2] যেমন মহান আল্লাহ অন্য স্থানেও বলেছেন, هُوَ الَّذِي يُنَزِّلُ عَلَى عَبْدِهِ آيَاتٍ بَيِّنَاتٍ لِيُخْرِجَكُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ অর্থাৎ, তিনিই তাঁর বান্দার প্রতি সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ অবতীর্ণ করেন, তোমাদেরকে সমস্ত প্রকার অন্ধকার হতে আলোর দিকে আনার জন্য। (সূরা হাদীদ ৯) তিনি আরো বলেন, ﴿اللهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُواْ يُخْرِجُهُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّوُرِ﴾ অর্থাৎ, আল্লাহই হচ্ছেন মুমিনদের অভিভাবক, তিনি তাদেরকে অন্ধকার হতে আলোর দিকে নিয়ে যান। (সূরা বাক্বারাহ ২৫৭)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: নামকরণ:
ইবরাহীম (عليه السلام) একজন অন্যতম উলুল আযম (শ্রেষ্ঠ পাঁচজনের একজন) নাবী। ইবরাহীম (عليه السلام) কর্তৃক মক্কার জন্য, নিজের জন্য, ছেলে ইসমাইলের জন্য এবং সারা জাহানের মু’মিনদের জন্য দু‘আ ও আল্লাহ তা‘আলার কৃতজ্ঞতা সম্পর্কে এ সূরার ৩৫-৪১ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে, সে ঘটনাকে কেন্দ্র করেই সূরার নামকরণ করা হয়েছে।
সূরার শুরুতে কুরআন অবতীর্ণের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, প্রত্যেক সম্প্রদায়ের কাছে তাদের মাতৃভাষায় রাসূল প্রেরণ, মূসা (عليه السلام) ও বানী ইসরাঈলদের সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত, শুকরিয়া আদায় ও অনাদায়ের ফলাফল এবং পূর্ববর্তী কয়েকটি জাতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। রাসূলগণ মানুষ ছিলেন, তাদের ওপর উম্মাতের অবাধ্য লোকেরা যে সকল নির্যাতন করত তার বিবরণ, কাফিরদের সৎ আমলের উপমা, কিয়ামতের মাঠে শয়তানের বক্তব্য এবং যারা দুনিয়াতে ঈমান ও সৎ আমল করবে তারা কবরেও ঈমানের ওপর অটল থাকতে পারবে এই সম্পর্কে সূরার মাঝে আলোচনা করা হয়েছে। তারপর ইবরাহীম (عليه السلام)-এর কথাসহ কাফিরদের আখিরাতে যে অপমানজনক শাস্তি দেয়া হবে সে সম্পর্কে আলোচনা তুলে ধরা হয়েছে।
১-৩ নং আয়াতের তাফসীর:
الٓرٰ-(আলিফ-লাম-রা) এ জাতীয় “হুরূফুল মুক্বাত্বআত” বা বিচ্ছিন্ন অক্ষরসমূহ সম্পর্কে সূরা বাকারার শুরুতে আলোচনা করা হয়েছে। এগুলোর সঠিক উদ্দেশ্য আল্লাহ তা‘আলাই ভালো জানেন।
অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা কুরআন অবতীর্ণের অন্যতম একটি উদ্দেশ্য বর্ণনা করেছেন। আর তা হল তিনি তাঁর নাবীর ওপর এই কিতাব (কুরআন) অবতীর্ণ করেছেন যাতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মানব জাতিকে কুফর, ভ্রষ্টতা ও অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে ঈমান, হিদায়াত ও জ্ঞানের আলোর দিকে নিয়ে আসতে পারেন। যেমন
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:
(هُوَ الَّذِيْ يُنَزِّلُ عَلٰي عَبْدِه۪ اٰيٰتٍۭ بَيِّنٰتٍ لِّيُخْرِجَكُمْ مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَي النُّوْرِ)
“তিনিই তাঁর বান্দার প্রতি সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ অবতীর্ণ করেন, তোমাদেরকে সকল প্রকার অন্ধকার হতে আলোর দিকে আনার জন্য।” (সূরা হাদীদ ৫৭:৯)
তবে যে কেউ ইচ্ছা করলেই হিদায়াত গ্রহণ করতে পারবে না, এমনকি আল্লাহ তা‘আলা ইচ্ছা না করলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বয়ং কাউকে ইচ্ছা করলেও হিদায়াত দিতে পারবেন না।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(إِنَّكَ لَا تَهْدِيْ مَنْ أَحْبَبْتَ وَلٰكِنَّ اللّٰهَ يَهْدِيْ مَنْ يَّشَا۬ءُ)
“তুমি যাকে ভালবাস, ইচ্ছা করলেই তাকে সৎ পথে আনতে পারবে না। তবে আল্লাহই যাকে ইচ্ছা সৎপথে আনয়ন করেন।” (সূরা কাসাস ২৮:৫৬)
বরং হিদায়াত সে ব্যক্তিই পাবে আল্লাহ তা‘আলা যার জন্য ইচ্ছা করবেন এবং তাওফীক দেবেন।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(اَللّٰهُ وَلِيُّ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا يُخْرِجُهُمْ مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَي النُّوْر)
“মু’মিনদের অভিভাবক হচ্ছেন আল্লাহ। তিনি তাদেরকে অন্ধকারসমূহ হতে আলোর দিকে নিয়ে আসেন।” (সূরা বাক্বারাহ ২:২৫৭)
নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাজ হল মানব জাতিকে হিদায়াতের রাস্তা দেখিয়ে দেয়া। কথাটি যদিও এখানে আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সম্বোধন করে বলেছেন, কিন্তু তা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়, কারণ নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চিরদিন থাকার জন্য আসেননি, তিনি একদিন চলে যাবেন এবং চলে গেছেনও বটে। তাঁর পর মানব জাতিকে সঠিক পথ দেখানোর দায়িত্ব পালন করবে তাঁর ওয়ারিশ আলেমগণ, তাই আলেমগণ সঠিক পথ দেখানোর পর আল্লাহ তা‘আলা যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দেবেন, যার ভাগ্যে হিদায়াতের মর্যাদা রয়েছে সে-ই তা পাবে। সুতরাং মানব জাতিকে কুরআন দেয়া হয়েছে এজন্য যে, তারা এ থেকে হিদায়াতের পথ গ্রহণ করবে আর আলেমদের উচিত হবে তারা কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ অনুযায়ী মানব জাতিকে সঠিক পথের সন্ধান দেবেন, কোন তরীকাহ, মত, পথ ও দলের দিকে নয়।
আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছা ব্যতীত কেউ সঠিক পথ লাভ করতে পারবে না। সঠিক পথ পাওয়ার অন্যতম একটি মাধ্যম হল তাঁর রাসূলের অনুসরণ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَمَآ أَرْسَلْنَا مِنْ رَّسُوْلٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللّٰهِ)
“রাসূলকে একমাত্র এ উদ্দেশ্যেই প্রেরণ করেছি যে, আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে তার আনুগত্য করা হবে।” (সূরা নিসা ৪:৬৪)
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন: আকাশ ও জমিনে যা কিছু রয়েছে সব কিছুর সৃষ্টি, পরিচালনা, রিযিক ও সার্বভৌমত্বের মালিক একমাত্র তিনি। তিনি যা বলেন তাই হয়, তিনি যেভাবে চালান সেভাবেই চলে এবং তিনি যাকে যতটুকু পরিমাণ রিযিক দেয়ার ইচ্ছা করেন সে ততটুকুই রিযিক পায়।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ)
“আকাশ এবং পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর।” (সূরা বাক্বারা ২:২৮৪)
সুতরাং যারা আল্লাহ তা‘আলাকে অস্বীকার করবে, আল্লাহ তা‘আলার সার্বভৌমত্বকে মেনে নিবে না তারাই কাফির তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।
অতএব সে সমস্ত ইঁদুর কপালে লোকদের বিবরণ তুলে ধরছেন যারা দুনিয়ার জীবনকে আখিরাতের জীবনের ওপর প্রাধান্য দেয় তথা আখিরাতের প্রতি ঈমান আনে না, আখিরাতকে ভয় করে পাপ ও আল্লাহ তা‘আলাদ্রোহী কাজ বর্জন করে না এবং দীন-ধর্মের কোন পরওয়া না করে লাগামহীন চলাফেরা করে । আর মানুষকে আল্লাহ তা‘আলার পথে চলতে ও আসতে বাধা দেয়। আল্লাহ তা‘আলার পথে মানুষকে বাধা দেয়ার অনেক পদ্ধতি ও দিক রয়েছে; যেমন ইসলামের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো, ইসলামী শিক্ষার ব্যাপারে কুধারণা সৃষ্টি করা, যারা দীন মেনে চলে তাদেরকে বিভিন্ন নামে ও উপাধি দিয়ে ব্যঙ্গ করা ও শারীরিক নির্যাতন করে ইসলামের পথে চলতে ও আসতে বাধা দেয়া। অনেকেই ইসলামের পথে চলতে চায় কিন্তু কেউ পারিবারিক কারণে, রাষ্ট্রীয় কারণে বা অন্য জাতির চাপের কারণে ইসলাম গ্রহণ ও তার পথে চলতে পারে না। মোট কথা যে কোন উপায়ে ইসলামের পথে বাধা এবং তাতে বক্রতা সৃষ্টি করা, তা যে কোন পদ্ধতি ও উপায়ে হোক আল্লাহ তা‘আলাদ্রোহী কাজ, তারা সুদূর গোমরাহীতে রয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
أَنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمُ الْأَئِمَّةُ الْمُضِلُّونَ
আমি আমার উম্মতের পথভ্রষ্ট নেতাদের ব্যাপারে বেশি ভয় করি। কারণ তারা নিজেরা পথভ্রষ্ট অন্যদেরকেও পথভ্রষ্ট করবে এবং সঠিক পথে চলতে বাধা দিবে। (মুসনাদে আহমাদ হা: ২৬৯৩৯, সহীহুল জামে হা: ১৫৫১, সহীহ)
সুতরাং যারা আখেরাতের ওপর দুনিয়াকে প্রাধান্য দিবে, মানুষকে আল্লাহ তা‘আলার পথে আসতে ও চলতে বাধা দেয় এবং ইসলামের নামে ধূম্রজাল সৃষ্টি করে তারা নিজেরা পথভ্রষ্ট, অন্যদেরকেও পথভ্রষ্ট করতে চায়। আমাদের উচিত এদের প্রপাগাণ্ডায় প্ররোচিত না হয়ে আল্লাহ তা‘আলা যে দীন দিয়ে যুগে যুগে রাসূল প্রেরণ করেছেন এবং সর্বশেষ নাবী ও রাসূল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে চয়ন করেছেন তাঁর সে দীনের পথে বহাল থাকা এবং মানুষের মাঝে তার প্রচার করা।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে মানুষকে সঠিক পথ দেখানোর জন্য।
২. আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছা ব্যতীত কেউ সঠিক পথ লাভ করতে পারবে না।
৩. আখিরাতের ওপর ইহকালের প্রাধান্য দেয়া যাবে না।
৪. আলেমদের উচিত মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দেয়া, কোন মত, তরীকাহ বা দলের দিকে নয়।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১-৩ নং আয়াতের তাফসীর
‘হুরূফে মুকাত্তাআ’হ’ যা সূরাসমূহের শুরুতে এসে থাকে ওগুলির বর্ণনা পূর্বেই গত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। এরপর আল্লাহ তাআ’লা স্বীয় নবীকে (সঃ) সম্বোধন করে বলছেনঃ হে নবী (সঃ)! এই ব্যাপক মর্যাদা সম্পন্ন কিতাবটি আমি তোমার উপর অবতীর্ণ করেছি। এই কিতাবটি অন্যান্য সমূদয় আসমানী কিতাব হতে বেশী উন্নত মানের এবং রাসূলও (সঃ) অন্যান্য সমস্ত রাসূল হতে শ্রেষ্ঠ। যে জায়গায় এই কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে সেই জায়গাটিও দুনিয়ার সমস্ত জায়গা হতে উত্তম-এর প্রথম গুণ এই যে, তুমি এর মাধ্যমে জনগণকে অজ্ঞতার অন্ধকার হতে জ্ঞানের আলোকের দিকে নিয়ে আসবে। তোমার প্রথম কাজ এই যে, তুমি পথ ভ্রষ্টতাকে হিদায়াত এবং মন্দকে ভালোর দ্বারা পরিবর্তন ঘটাবে। স্বয়ং আল্লাহ তাআলাই হচ্ছেন মুমিনদের সহায়ক। তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোকের দিকে নিয়ে আসেন। আর কাফিরদের সঙ্গী হচ্ছে আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ, যা তাদেরকে আলো থেকে সরিয়ে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। প্রকৃত হিদায়াতকারী আল্লাহ তাআ’লাই। রাসূলদের মাধ্যমে যাদের হিদায়াতের তিনি ইচ্ছা করেন তারাই সুপথ প্রাপ্ত হয়ে থাকে এবং তারাই অপরাজেয়, বিজয়ী এবং সব কিছুর বাদশাহ বনে যায় এবং সর্বাবস্থায় প্রশংসিত আল্লাহর পথের দিকে পরিচালিত হয়।
(আরবি) শব্দটির অন্য কিরআত (আরবি) ও রয়েছে। প্রথমটি (আরবি) হিসেবে এবং দ্বিতীয়টি নতুন বাক্য হিসেবে। যেমন আল্লাহ তাআলার উক্তিঃ (আরবি) অর্থাৎ “(হে নবী, সঃ) তুমি বলঃ হে লোক সকল! নিশ্চয় আমি তোমাদের সকলের নিকট সেই আল্লাহর রাসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছি যার জন্যে রয়েছে আকাশসমূহ ও পৃথিবীর রাজত্ব।” (৭:১৫৮)
আল্লাহপাক বলেনঃ কঠিন শাস্তির দুর্ভোগ কাফিরদের জন্যে। কিয়ামতের দিন তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি ভোগ করতে হবে। তারা পার্থিব জীবনকে পারলৌকিক জীবনের উপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে। তারা দুনিয়া লাভের জন্যে পুরো মাত্রায় চেষ্টা-তদবীর করে এবং আখেরাত হতে থাকে সম্পূর্ণরূপে উদাসীন। তারা রাসূলদের আনুগত্য হতে অন্যদেরকেও বিরত রাখে। আল্লাহর পথ হচ্ছে সোজা ও পরিষ্কার, তারা সেই পথকে বক্র করতে চায়। তারাই অজ্ঞতা ও ঘোর বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে। কিন্তু আল্লাহর পথ বক্র হয়ও নি এবং হবেও না। সুতরাং এ অবস্থায় তাদের সংশোধন সুদূর পরাহত।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।