আল কুরআন


সূরা আর-রাদ (আয়াত: 8)

সূরা আর-রাদ (আয়াত: 8)



হরকত ছাড়া:

الله يعلم ما تحمل كل أنثى وما تغيض الأرحام وما تزداد وكل شيء عنده بمقدار ﴿٨﴾




হরকত সহ:

اَللّٰهُ یَعْلَمُ مَا تَحْمِلُ کُلُّ اُنْثٰی وَ مَا تَغِیْضُ الْاَرْحَامُ وَ مَا تَزْدَادُ ؕ وَ کُلُّ شَیْءٍ عِنْدَهٗ بِمِقْدَارٍ ﴿۸﴾




উচ্চারণ: আল্লা-হু ইয়া‘লামুমা-তাহমিলুকুল্লুউনছা-ওয়ামা-তাগীদুল আরহা-মুওয়ামা-তাযদা-দু ওয়া কুল্লুশাইইন ‘ইনদাহূবিমিকদা-র।




আল বায়ান: আল্লাহ জানেন যা প্রতিটি নারী গর্ভে ধারণ করে এবং গর্ভাশয়ে যা কমে ও বাড়ে। আর তাঁর নিকট প্রতিটি বস্তু নির্দিষ্ট পরিমাণে রয়েছে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৮. প্রত্যেক নারী যা গর্ভে ধারণ করে এবং গর্ভাশয়ে যা কিছু কমে ও বাড়ে আল্লাহ তা জানেন(১) এবং তার নিকট প্রত্যেক বস্তুরই এক নির্দিষ্ট পরিমাণ আছে।




তাইসীরুল ক্বুরআন: আল্লাহ জানেন প্রতিটি নারী যা গর্ভে বহন করে, প্রত্যেক গর্ভে যা কমে বা বাড়ে তাও, প্রতিটি জিনিস তাঁর কাছে আছে পরিমাণ মত।




আহসানুল বায়ান: (৮) প্রত্যেক নারী যা গর্ভে ধারণ করে[1] এবং জরায়ুতে যা কিছু কমে ও বাড়ে আল্লাহ তা জানেন[2] এবং তাঁর নিকটে প্রত্যেক বস্তুই নির্দিষ্ট পরিমাণে আছে। [3]



মুজিবুর রহমান: প্রত্যেক নারী যা গর্ভে ধারণ করে এবং জরায়ুতে যা কিছু কমে ও বাড়ে আল্লাহ তা জানেন। এবং তাঁর বিধানে প্রত্যেক বস্তুরই এক নির্দিষ্ট পরিমাণ আছে।



ফযলুর রহমান: প্রত্যেক নারী (গর্ভে) যা বহন করে এবং গর্ভাশয়ে যা কমে আর যা বাড়ে আল্লাহ তা (সব) জানেন। সবকিছুই তাঁর কাছে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে রয়েছে।



মুহিউদ্দিন খান: আল্লাহ জানেন প্রত্যেক নারী যা গর্ভধারণ করে এবং গর্ভাশয়ে যা সঙ্কুচিত ও বর্ধিত হয়। এবং তাঁর কাছে প্রত্যেক বস্তুরই একটা পরিমাণ রয়েছে।



জহুরুল হক: আল্লাহ্ জানেন প্রত্যেক স্ত্রীলোক যা গর্ভে ধারণ করে, আর যা জরায়ূ শুষে নেয়, আর যা তারা বর্ধিত করে। আর তাঁর কাছে প্রত্যেক বস্তুরই এক নির্দিষ্ট পরিমাপ রয়েছে।



Sahih International: Allah knows what every female carries and what the wombs lose [prematurely] or exceed. And everything with Him is by due measure.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৮. প্রত্যেক নারী যা গর্ভে ধারণ করে এবং গর্ভাশয়ে যা কিছু কমে ও বাড়ে আল্লাহ তা জানেন(১) এবং তার নিকট প্রত্যেক বস্তুরই এক নির্দিষ্ট পরিমাণ আছে।


তাফসীর:

(১) এর অর্থ হচ্ছে, মায়ের গর্ভাশয়ে ক্রণের অংগ-প্রত্যংগ, শক্তি-সামর্থ, যোগ্যতা ও মানসিক ক্ষমতার যাবতীয় হ্রাস-বৃদ্ধি আল্লাহর সরাসরি তত্ত্বাবধানে সাধিত হয়। অর্থাৎ প্রত্যেক নারী যা গর্ভধারণ করে, তা ছেলে কি মেয়ে, সুশ্রী কি কুশ্রী, সৎ কি অসৎ তা সবই আল্লাহ জানেন এবং নারীদের গর্ভাশয়ে যে হ্রাসবৃদ্ধি হয়, অর্থাৎ কোন সময় এক বা একাধিক সন্তান জন্মগ্রহণ করে, কোন সময় দ্রুত কোন সময় দেরীতে তাও আল্লাহ তা'আলা জানেন। [আদওয়াউল বায়ান]

এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলার একটি বিশেষ গুণ বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি আলেমুল গায়েব। সৃষ্টিজগতের প্রতিটি অণু-পরমাণু ও সেসবের পরিবর্তনশীল অবস্থা সম্পর্কে তিনি ওয়াকিফহাল। এর সাথেই মানব সৃষ্টির প্রতিটি স্তর, প্রতিটি পরিবর্তন ও প্রতিটি চিহ্ন সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর সত্যিকার ও নিশ্চিত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই রাখেন। এ বিষয়টিই অন্য এক আয়াতে বর্ণিত হয়েছেঃ (وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ) অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলাই জানেন যা কিছু গভাশয়ে রয়েছে। [সূরা লোকমানঃ ৩৪] আমরা যদি সূরা লোকমান এর এ আয়াতটির সাথে আলোচ্যসূরার (وَمَا تَغِيضُ الْأَرْحَامُ وَمَا تَزْدَادُ) আয়াতকে একসাথে মিলিয়ে তাফসীর করি তাহলে বর্তমান কালের এ আয়াত সংক্রান্ত অনেক সন্দেহের জবাব দেয়া সহজ হয়ে যাবে। কারণ সূরা লোকমানের আয়াতে যা বলা হয়েছে এ আয়াত তার তাফসীর হতে পারে।

ফলে গর্ভাশয়ে অবস্থিত সন্তানের অবস্থা বর্তমানে বিভিন্ন মাধ্যমে জানা গেলেও তা সূরা লোকমান এবং সহীহ হাদীসে বর্ণিত পাঁচটি গায়েব এর জ্ঞানের দাবী কেউ করতে পারবে না। বিশেষ করে সহীহ হাদীসে গায়েবের পাঁচটি বস্তু বর্ণনায় যে শব্দ ব্যবহার হয়েছে তাও এ তাফসীর সমর্থন করছে। হাদীসে এসেছে, “পাঁচটি বিষয় হলো সমস্ত গায়েবের চাবিকাঠি, আল্লাহ ব্যতীত কেউ তা জানে না ... আল্লাহ ব্যতীত কেউ গর্ভাশয়ে যা কিছু হ্রাস হয় তা জানে না।” [বুখারীঃ ৪৬৯৭] আর এটা সর্বজনবিদিত যে, গর্ভাশয়ে যা কিছু হ্রাস-বৃদ্ধি হয় বা হবে তা কেউ কোন দিন বলে দিতে পারবে না। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “তিনি তোমাদের সম্পর্কে সম্যক অবগত—যখন তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছিলেন মাটি হতে এবং যখন তোমরা মাতৃগর্ভে ভ্রণরূপে ছিলে। [সূরা আন-নাজম: ৩২] আরও বলেন, “তিনিই মাতৃগর্ভে যেভাবে ইচ্ছে তোমাদের আকৃতি গঠন করেন।” [সূরা আলে ইমরান: ৬] আয়াতের আরেক অর্থ হচ্ছে, একমাত্র আল্লাহই জানেন কোন মহিলা কোন ধরণের সন্তান গর্ভে ধারণ করবে। তখন ما টি হবে موصولة [আদওয়াউল বায়ান]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৮) প্রত্যেক নারী যা গর্ভে ধারণ করে[1] এবং জরায়ুতে যা কিছু কমে ও বাড়ে আল্লাহ তা জানেন[2] এবং তাঁর নিকটে প্রত্যেক বস্তুই নির্দিষ্ট পরিমাণে আছে। [3]


তাফসীর:

[1] মাতৃগর্ভে কি আছে; ছেলে না মেয়ে, সুশ্রী না কুশ্রী, সুজন না কুজন, দীর্ঘায়ু না অল্পায়ু? এসব শুধু মহান আল্লাহই জানেন।

[2] এ থেকে উদ্দিষ্ট গর্ভের সময়কাল; যা সাধারণতঃ নয় মাস হয়ে থাকে। কিন্তু তাতে কমা-বাড়াও হয়; কখনো দশ মাস, কখনো সাত মাস, কখনো আট মাস। এর জ্ঞানও মহান আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো কাছে নেই।

[3] অর্থাৎ কার জীবনকাল কত দিন? সে রুযীর কত অংশ পাবে? এর পূর্ণ জ্ঞান আল্লাহর কাছেই আছে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৮-১০ নং আয়াতের তাফসীর:



অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলার সূক্ষ্মদর্শিতা ও সব বিষয়ে সম্যক জ্ঞান রাখেন এ কথাই ফুটে উঠেছে। এ পৃথিবীর স্থলে-জলে, দিবালোকে-আধাঁরে, প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে ও জমিনে-আকাশমণ্ডলীতে যা কিছু হয়েছে, হচ্ছে, হবে এবং আছে কোন কিছুই আল্লাহ তা‘আলার নিকট অস্পষ্ট বা গোপন নয়। এমনকি একজন নারী গর্ভে কী ধারণ করে তাও আল্লাহ তা‘আলা জানেন। সন্তান জীবিত হবে না মৃত, সৌভাগ্যশীল হবে না দুর্ভাগা, ছেলে হবে না মেয়ে হবে ইত্যাদি আল্লাহ তা‘আলা পূর্ব থেকেই জ্ঞাত। যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(هُوَ أَعْلَمُ بِكُمْ إِذْ أَنْشَأَكُمْ مِّنَ الْأَرْضِ وَإِذْ أَنْتُمْ أَجِنَّةٌ فِيْ بُطُوْنِ أُمَّهٰتِكُمْ)



“তিনি তোমাদের সম্পর্কে সম্যক অবগত- যখন তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছিলেন মাটি হতে এবং যখন তোমরা মাতৃগর্ভে ভ্রুণরূপে ছিলে।” (সূরা নাজম ৫৩:৩২)



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(يَخْلُقُكُمْ فِيْ بُطُوْنِ أُمَّهٰتِكُمْ خَلْقًا مِّنْۭ بَعْدِ خَلْقٍ فِيْ ظُلُمٰتٍ ثَلَاثٍ)



“তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেন তোমাদের মাতৃগর্ভে এক অবস্থার পর অন্য অবস্থায় তিন স্তরের অন্ধকারের মধ্যে। তিনিই আল্লাহ তা‘আলা, তোমাদের প্রতিপালক, সর্বময় কর্তৃত্ব তাঁরই।” (সূরা যুমার ৩৯:৬)



এখানে তিনটি অন্ধকার বলতে প্রথম অন্ধকার মায়ের পেট, দ্বিতীয় অন্ধকার গর্ভাশয়, তৃতীয় অন্ধকার ঝিল্লী, তা হল সেই পাতলা আবরণ যাতে বাচ্চা জড়ানো থাকে। এ সম্পর্কে সূরা ফাতিরের ১১ নং এবং সূরা ফুসসিলাতের ৪৭ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে।



এমনকি জরায়ুতে যা বাড়ে-কমে তাও আল্লাহ তা‘আলা জানেন। এখানে বাড়ে-কমে দ্বারা উদ্দেশ্য হল গর্ভের সময় কাল। অর্থাৎ কারো আট, আবার কারো দশ মাসেও সন্তান প্রসব হয়ে থাকে। এ ব্যাপারে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই জানেন, অন্য কেউ নয়। আর তাঁর নিকট প্রত্যেক বস্তুর একটি নির্দিষ্ট সময়কাল রয়েছে। অর্থাৎ কার জীবনকাল কত দিন? সে রিযিকের কত অংশ পাবে ইত্যাদি। যেমন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: “তাঁরই এক কন্যা তাঁর কাছে লোক পাঠিয়ে খবর দেন যে, তার এক ছেলে মৃত্যু শিয়রে দণ্ডায়মান। সুতরাং তিনি তাঁর উপস্থিতি কামনা করেন। এ খবর শুনে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার মেয়ের কাছে সংবাদ পাঠান: আল্লাহ তা‘আলা যা প্রেরণ করেন তা তাঁরই। তাঁর নিকট প্রত্যেক বস্তুরই একটা নির্দিষ্ট সময় রয়েছে। তোমরা তাকে বল, সে যেন ধৈর্য ধারণ করে এবং সওয়াবের আশা করে। (সহীহ বুখারী হা: ১৬০২)



সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা সকল বিষয়েই অবগত আছেন আর প্রত্যেক বস্তুরই একটি নির্ধারিত সময়কাল রয়েছে।



শুধু তাই নয়, আল্লাহ তা‘আলা পরবর্তী আয়াতে বলছেন যে তিনি অদৃশ্য ও দৃশ্য সকল বিষয়েই অবগত আছেন, তাঁর নিকট কোন বিষয় গোপন নেই। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,



(عٰلِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ ط وَهُوَ الْحَكِيْمُ الْخَبِيْرُ)



“অদৃশ্য ও দৃশ্য সবকিছু সম্বন্ধে তিনি পরিজ্ঞাত; আর তিনিই প্রজ্ঞাময়, সবিশেষ অবহিত।” (সূরা আনয়াম ৬:৭৩)



অতএব আল্লাহ তা‘আলা র নিকট কোন কিছুই গোপন থাকে না। তিনি প্রকাশ্য এবং অপ্রকাশ্য সবই জানেন। আর তিনি সুমহান, সর্বোচ্চ। তাঁর চেয়ে বড় আর কেউ নেই। এমনকি তিনি তাও জানেন যা মানুষ তাদের অন্তরে কল্পনা করে।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَإِنْ تَجْهَرْ بِالْقَوْلِ فَإِنَّه۫ يَعْلَمُ السِّرَّ وَأَخْفٰي)



“যদি তুমি উচ্চকণ্ঠে কথা বল, তবে (জেনে রেখ) তিনি যা গুপ্ত ও অব্যক্ত সবই জানেন।” (সূরা ত্বহা ২০:৭)



তিনি ছোট-বড় সকল বিষয় সম্পর্কে অবগত এবং রাত্রের অন্ধকারে যে আত্মগোপন করে ও দিবসে যে বিচরণ করে সবই তাঁর জ্ঞানায়ত্ত্বে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَمَا تَكُوْنُ فِيْ شَأْنٍ وَّمَا تَتْلُوْا مِنْهُ مِنْ قُرْاٰنٍ وَّلَا تَعْمَلُوْنَ مِنْ عَمَلٍ إِلَّا كُنَّا عَلَيْكُمْ شُهُوْدًا إِذْ تُفِيْضُوْنَ فِيْهِ ط وَمَا يَعْزُبُ عَنْ رَّبِّكَ مِنْ مِّثْقَالِ ذَرَّةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَا۬ءِ وَلَآ أَصْغَرَ مِنْ ذٰلِكَ وَلَآ أَكْبَرَ إِلَّا فِيْ كِتٰبٍ مُّبِيْنٍ)‏



“তুমি যে কোন অবস্থায় থাক না কেন এবং তুমি কুরআন হতে যা তিলাওয়াত কর এবং তোমরা যে কোন কার্যই কর না কেন, আমি তোমাদের পরিদর্শক যখন তোমরা তাতে পূর্ণরূপে মনোনিবেশ কর। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অনু পরিমাণও তোমার প্রতিপালকের অগোচর নয় এবং তা অপেক্ষা ক্ষুদ্রতর অথবা বৃহত্তর কিছুই নেই যা সুস্পষ্ট কিতাবে উল্লেখ নেই।” (সূরা ইউনুস ১০: ৬১)



অতএব, আল্লাহ তা‘আলা র দৃষ্টি ফাঁকি দিয়ে কোন কিছু করার সুযোগ নেই। তাই সে আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে সকল পাপ কাজ ও আল্লাহ তা‘আলার নাফরমানী বর্জন করা প্রত্যেক মু’মিনের একান্ত কর্তব্য।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. আল্লাহ তা‘আলার নিকট সমস্ত কিছুর জ্ঞান রয়েছে।

২. আল্লাহ তা‘আলা অদৃশ্য বস্তুর খবর জানেন, এমনকি মায়ের গর্ভে যা কিছু বাড়ে-কমে তাও তিনি জানেন। তিনি ব্যতীত আর কেউ অদৃশ্যের বা গায়েবের খবর জানে না।

৩. মানুষকে তিনটি অন্ধকারের মধ্যে সৃষ্টি করা হয়।

৪. আল্লাহ তা‘আলা সবচেয়ে বড়, তাঁর চেয়ে বড় কেউ নেই ইত্যাদি।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৮-৯ নং আয়াতের তাফসীর

আল্লাহ তাআ’লা খবর দিচ্ছেন যে, কোন জিনিসই তাঁর অগোচরে নেই। সমস্ত মাদীরা, স্ত্রী লিঙ্গ জন্তুই হোক অথবা মানুষই হোক, ওদের পেটের বা গর্ভের বাচ্চা সম্পর্কে জ্ঞান বা অবগতি আল্লাহ তাআ’লার রয়েছে। পেটে কি আছে তা তিনি ভালরূপেই জানেন। অর্থাৎ পুংলিঙ্গ কি স্ত্রী লিঙ্গ, ভাল কি মন্দ, বেশী বয়স পাবে কি কম বয়স পাবে এ সব খবর তিনি রাখেন। যেমন ইরশাদ হয়েছেঃ (আরবি)

অর্থাৎ “তিনি ভালরূপেই জানেন যখন তিনি তোমাদেরকে যমীন হতে সৃষ্টি করেছেন এবং তোমরা যখন তোমাদের মাতাদের পেটে লুকায়িত থাকো (শেষ পর্যন্ত)।” (৫৩: ৩২) অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “তিনি তোমাদেরকে তোমাদের মায়ের পেটে সৃষ্টি করেন, এক সৃষ্টির পরে আর এক সৃষ্টি, তিন অন্ধকারের মধ্যে (শেষ পর্যন্ত)।” (৩৯: ৬) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি মৃত্তিকার উপাদান হতে। অতঃপর আমি ওকে শুক্র বিন্দু রূপে স্থাপন করি এক নিরাপদ আধারে। পরে আমি শুক্র বিন্দুকে পরিণত করি রক্ত পিন্ডে, অতঃপর রক্ত পিন্ডকে পরিণত করি মাংস পিন্ডে এবং মাংস পিন্ডকে পরিণত করি অস্থিপঞ্জরে, অতঃপর অস্থিপঞ্জরকে ঢেকে দিই গোশত দ্বারা, অবশেষে ওকে গড়ে তুলি অন্য এক সৃষ্ঠি রূপে; অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত মহান।” (২৩:১২-১৪)

হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টি তার মায়ের পেটে চল্লিশ দিন পর্যন্ত জমা হতে থাকে। অতঃপর চল্লিশ দিন পর্যন্ত ওটা জমাট রক্তের আকারে থাকে। তারপর চল্লিশ দিন পর্যন্ত ওটা মাংস পিন্ড রূপে থাকে। এরপর আল্লাহ তাআ’লা একজন ফেরেশতা প্রেরণ করেন, যাকে চারটি কথা লিখে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। ওগুলি হচ্ছেঃ তার রিয্‌ক, তার বয়স, এবং তার ভাল ও মন্দ হওয়া।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

অন্য হাদীসে আছে যে, ঐ সময় ফেরেশতা জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! সে নর হবে, না নারী হবে? হতভাগ্য হবে, না সৌভাগ্যবান। হবে? তার জীবিকা কি হবে? তার বয়স কত হবে?” আল্লাহ তাআ’লা তখন বলে দেন এবং তিনি লিখে নেন।

হযরত ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অদৃশ্যের পাঁচটি চাবী রয়েছে যা আল্লাহ ছাড়া কেউই জানে না। (১) আগামীকল্যের খবর আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ অবগত নয়। (২) জরায়ুতে যা কিছু কমে তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। (৩) বৃষ্টি কখন হবে তার অবগতিও শুধুমাত্র আল্লাহরই আছে। (৪) কে কোথায় মারা যাবে এ খবরও আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। এবং (৫) কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে এ খবরও একমাত্র আল্লাহই রাখেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

‘জরায়ুতে যা কিছু কমে’ এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে গর্ভ পড়ে যাওয়া। আর ‘জরায়ুতে যা কিছু বাড়ে’ এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছেঃ কিভাবে তা পূর্ণ হয় এ খবরও আল্লাহ তাআ’লাই রাখেন। দেখা যায় যে, কোন কোন নারী গর্ভ ধারণ করে থাকে পূর্ণ দশ মাস। আবার কেউ ধারণ করেন ন'মাস। কারো গর্ভ বাড়ে এবং কারো কমে। ন'মাস থেকে কমে যাওয়া এবং নমাস থেকে বেড়ে যাওয়া আল্লাহ তাআ’লার অবগতিতে রয়েছে।

হযরত যহহাক (রঃ) বলেনঃ “আমি দু’বছর মায়ের পেটে থেকেছি। আমি যখন ভূমিষ্ঠ হই তখন আমার সামনে দু’টি দাঁত বেরিয়ে পড়েছিল।” হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন যে, গর্ভধারণের শেষ সময়কাল হচ্ছে দু’বছর। কমে যাওয়া দ্বারা কারো কারো মতে উদ্দেশ্য হচ্ছে গর্ভধারণের সময়কালের মধ্যে রক্ত আসা। আর বেড়ে যাওয়া দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে গর্ভধারণের সময়কাল ন'মাসের বেশী হওয়া। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, ন’মাসের পূর্বে যদি স্ত্রীলোক রক্ত দেখে তবে গর্ভ ন'মাস ছাড়িয়ে যায় হায়েযের সময়কালের মত। রক্ত ঝরলে শিশু ভাল হয় এবং রক্ত না ঝরলে শিশু পূর্ণ ও বড় হয়। হযরত মাকহুল (রঃ) বলেনঃ “মায়ের পেটে শিশু সম্পূর্ণরূপে শান্তি ও আরামে থাকে। তার কোনই কষ্ট হয় না। তার মায়ের হায়েযের রক্ত তার খাদ্য হয়ে থাকে। তা অতি সহজে তার কাছে পৌঁছে থাকে। এ কারণেই গর্ভ ধারণের সময়কালে মায়ের হায়েয বা ঋতু হয় না। যখন সন্তান ভূমিষ্টি হয় তখন মাটিতে পড়া মাত্রই চীৎকার করে ওঠে। ঐ অপরিচিত জায়গায় সে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। যখন তার নাভি কেটে দেয়া হয় তখন তার খাদ্য আল্লাহ তাআ’লা তার মায়ের বক্ষে পৌঁছিয়ে দেন। তখনও বিনা সন্ধানে, বিনা চাওয়ায়, বিনা কষ্টে এবং বিনা চিন্তায় সে খাদ্য পেয়ে থাকে। তারপর কিছুটা বড় হলে সে নিজের হাতে পানাহার করতে শুরু করে। কিন্তু বালেগ হওয়া মাত্রই জীবিকার জন্যে সে হা-হুতাশ করতে থাকে। মরে যাওয়া এবং নিহত হওয়া পর্যন্ত রুযী লাভের সম্ভাবনা থাকলে তখনও তাতে সে কোন দ্বিধাবোধ করে না। আফসোস। হে বনি আদম (আঃ)! তোমাকে দেখে বিস্মিত হতে হয়! যিনি তোমাকে তোমার মায়ের পেটে আহার্য দিলেন, যিনি তোমাকে তোমার মায়ের কোলে আহার্য দিলেন, যিনি তোমাকে তোমার বয়োঃপ্রাপ্ত হওয়া পর্যন্ত খেতে দিলেন, এখন তুমি বয়োঃপ্রাপ্ত ও বুদ্ধিমান হয়ে (তাকে ভুলে গেলে এবং) বলতে শুরু করলেঃ হায়! কোথা থেকে খেতে পাবো? আমার মরণ হোক বা আমি নিহত হই।” অতঃপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করেন (আরবি) (এবং তাঁর বিধানে প্রত্যেক বস্তুরই এক নির্দিষ্ট পরিমাণ আছে)। এ সম্পর্কে কাতাদা’ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তাঁর বিধানে প্রত্যেকেরই অয়ু, রিযক ইত্যাদি নির্ধারিত রয়েছে।

সহীহ হাদীসে আছে যে, নবীর (সঃ) এক কন্যা তাঁর কাছে লোক পাঠিয়ে খবর দেন যে, তাঁর এক ছেলে মৃত্যু শিয়রে দণ্ডায়মান। সুতরাং তিনি তাঁর উপস্থিতি কামনা করেন। এ খবর শুনে নবী (সঃ) তাঁর মেয়ের কাছে সংবাদ পাঠানঃ “আল্লাহ যা গ্রহণ করেন তা তাঁরই। তাঁর কাছে প্রত্যেক বস্তুরই একটা নির্দিষ্ট সময় রয়েছে।” (অতঃপর তিনি জনগণকে বলেনঃ) “তোমরা তাকে নির্দেশ দাও যে, সে যেন ধৈর্য ধারণ করে এবং আল্লাহর কাছে সওয়াবের আশা রাখে।”

আল্লাহ তাআ’লা ঐ সব কিছুই জানেন যা তাঁর বান্দাদের থেকে গোপনীয় রয়েছে এবং যা তাদের কাছে প্রকাশমান আছে। তাঁর কাছে কোন কিছুই গোপন নেই। তিনি সর্বাপেক্ষা বড়। তিনি সবচেয়ে উচ্চ। সবকিছুই তাঁর অবগতিতে রয়েছে। সমস্ত মাখলুক তার কাছে বিনীত ও অবনত। এটা ইচ্ছায়ই হোক বা বাধ্য হয়েই হোক।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।