সূরা আর-রাদ (আয়াত: 41)
হরকত ছাড়া:
أولم يروا أنا نأتي الأرض ننقصها من أطرافها والله يحكم لا معقب لحكمه وهو سريع الحساب ﴿٤١﴾
হরকত সহ:
اَوَ لَمْ یَرَوْا اَنَّا نَاْتِی الْاَرْضَ نَنْقُصُهَا مِنْ اَطْرَافِهَا ؕ وَ اللّٰهُ یَحْکُمُ لَا مُعَقِّبَ لِحُکْمِهٖ ؕ وَ هُوَ سَرِیْعُ الْحِسَابِ ﴿۴۱﴾
উচ্চারণ: আওয়ালাম ইয়ারাও আন্না-না’তিল আরদা নানকুসুহা-মিন আতারা-ফিহা- ওয়াল্লা-হু ইয়াহকুমূলা-মু‘আক্কিবা লিহুকমিহী ওয়া হুওয়া ছারী‘উল হিছা-ব।
আল বায়ান: তারা কি দেখে না, আমি যমীনকে চতুর্দিক থেকে সংকীর্ণ করে আনছি। আর আল্লাহই হুকুম করেন এবং তাঁর হুকুম প্রত্যাখ্যান করার কেউ নেই এবং তিনিই দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪১. তারা কি দেখে না যে, আমরা এ যমীনকে চতুর্দিক থেকে সংকুচিত করে আনছি?(১) আর আল্লাহই আদেশ করেন, তার আদেশ রদ করার কেউ নেই এবং তিনি হিসেব গ্রহণে তৎপর।(২)
তাইসীরুল ক্বুরআন: তারা কি দেখে না আমি তাদের জন্য যমীনকে চার দিক থেকে সংকীর্ণ করে আনছি? আল্লাহ হুকুম দেন, তাঁর হুকুম পেছনে ঠেলে দেবে এমন কেউ নেই। হিসেব গ্রহণের ব্যাপারে তিনি খুবই দ্রুতগতি।
আহসানুল বায়ান: (৪১) তারা কি দেখে না যে, আমি (তাদের দেশ) পৃথিবীকে চারদিক হতে সংকুচিত করে আনছি?[1] আল্লাহ আদেশ করেন। তাঁর আদেশের সমালোচনা (পুনর্বিবেচনা) করার কেউ নেই[2] এবং তিনি হিসাব গ্রহণে তৎপর।
মুজিবুর রহমান: তারা কি দেখেনা যে, আমি তাদের দেশকে চারদিক হতে সংকুচিত করে আনছি? আল্লাহ আদেশ করেন, তাঁর আদেশ রদ করার কেহ নেই এবং তিনি হিসাব গ্রহণে তৎপর।
ফযলুর রহমান: তারা কি দেখে না যে, আমি (তাদের) ভূমিকে চতুর্দিক থেকে সংকুচিত করে আনছি? আল্লাহ হুকুম দেন। কেউ তাঁর হুকুম পেছনে রাখতে পারে না। আর তিনি খুব দ্রুত হিসাব নিয়ে থাকেন।
মুহিউদ্দিন খান: তারা কি দেখে না যে, আমি তাদের দেশকে চতুর্দিক থেকে সমানে সঙ্কুচিত করে আসছি? আল্লাহ নির্দেশ দেন। তাঁর নির্দেশকে পশ্চাতে নিক্ষেপকারী কেউ নেই। তিনি দ্রুত হিসাব গ্রহণ করেন।
জহুরুল হক: ওরা কি দেখে না যে আমরা এই দেশটাকে নিয়ে চলেছি, একে সংকুচিত করছি তার চৌহদ্দি থেকে? আল্লাহ্ রায় দান করেন, তাঁর হুকুম প্রতিহত হবার নয়। আর তিনি হিসেব-নিকেশে তৎপর।
Sahih International: Have they not seen that We set upon the land, reducing it from its borders? And Allah decides; there is no adjuster of His decision. And He is swift in account.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৪১. তারা কি দেখে না যে, আমরা এ যমীনকে চতুর্দিক থেকে সংকুচিত করে আনছি?(১) আর আল্লাহই আদেশ করেন, তার আদেশ রদ করার কেউ নেই এবং তিনি হিসেব গ্রহণে তৎপর।(২)
তাফসীর:
(১) অর্থাৎ আপনার বিরোধীরা কি দেখছে না ইসলামের প্রভাব আরব ভূখণ্ডের সর্বত্র দিনের পর দিন ছড়িয়ে পড়ছে? চতুর্দিক থেকে তার বেষ্টনী সংকীর্ণতর হয়ে আসছে? এখানে যমীন সংকুচিত করার আরেক অর্থ এও করা হয় যে, যমীনের ফল-ফলাদি কমিয়ে দেয়া। আবার কোন কোন মুফাসসির এর অর্থ করেছেন, ভাল লোকদের, আলেম ও ফকীহদের প্রস্থান করা। কারও কারও মতে, এর অর্থ কুফরকারীদের জন্য যমীন সংকুচিত হয়ে ঈমান ও তাওহীদবাদীদের জন্য যমীনকে প্রশস্ত করা হচ্ছে। বাস্তবিকই ধীরে ধীরে ইসলামের আলো আরব উপদ্বীপে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে কুফর ও শির্কী শক্তির পতন হয়ে গেছে। অনুরূপ আয়াত আরও দেখুন, সুরা আল আহকাফ: ২৭ [দেখুন, ইবন কাসীর]
(২) অর্থাৎ নির্দেশ আল্লাহর হাতেই। তিনি তাঁর সৃষ্টিকে যা ইচ্ছা তা নির্দেশ দেন। তিনিই ফয়সালা করেন। যেভাবে ইচ্ছা ফয়সালা করেন। কাউকে মর্যাদায় উপরে উঠান আবার কাউকে নীচু করেন। কাউকে জীবিত করেন, কাউকে মারেন। কাউকে ধনী করেন, কাউকে ফকীর করেন। তিনি ফয়সালা দিচ্ছেন যে, ইসলাম সম্মানিত হবে এবং সমস্ত ধর্মের উপর বিজয়ী থাকবে। [ফাতহুল কাদীর] তার নির্দেশ খণ্ডনকারী কেউ নেই। তাঁর নির্দেশের পিছু নিয়ে কেউ সেটাকে রদ করতে বা পরিবর্তন করতে পারবে না। তিনি দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। সেটা অনুসারে কাফেরদেরকে তিনি দ্রুত শাস্তি দিবেন আর মুমিনদেরকে দ্রুত সওয়াব দিবেন। [কুরতুবী]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৪১) তারা কি দেখে না যে, আমি (তাদের দেশ) পৃথিবীকে চারদিক হতে সংকুচিত করে আনছি?[1] আল্লাহ আদেশ করেন। তাঁর আদেশের সমালোচনা (পুনর্বিবেচনা) করার কেউ নেই[2] এবং তিনি হিসাব গ্রহণে তৎপর।
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, আরব ভূমি ক্রমান্বয়ে মুশরিকদের উপর সংকীর্ণ হয়ে আসছে এবং ইসলামের জয় ও উত্থান হচ্ছে। (অনেকে এই আয়াত ও সূরা আম্বিয়ার ৪৪নং আয়াত দ্বারা পৃথিবীর ভূমিক্ষয় ও তার কিছু অংশ সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়া বুঝেছেন। অল্লাহু আ’লাম। -সম্পাদক)
[2] অর্থাৎ, কেউ আল্লাহর আদেশাবলী রদ করতে পারে না।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৪০-৪১ নং আয়াতের তাফসীর:
কাফেরদেরকে শাস্তি দেয়ার যে প্রতিশ্রুতি আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে দিয়েছেন উক্ত আয়াতে সেদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, তাদেরকে শাস্তি দেয়ার যে প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়েছে সে ব্যাপারে তুমি তাড়াহুড়া করো না। তারা যদি তাদের অবাধ্যতার মাঝে অটল থাকে তাহলে তাদের যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তা অবশ্যই পাকড়াও করবে। হয়তো তুমি দুনিয়াতে তা প্রত্যক্ষ করে চক্ষু শীতল করতে পারবে অথবা তাদের শাস্তি আসার পূর্বে তোমার মৃত্যু হতে পারে। এটা নিয়ে তোমার ব্যস্ত থাকার কোন বিষয় নয়। তোমার দায়িত্ব তাবলীগের কাজ করা, তা করে যাও। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(يٰٓأَيُّهَا الرَّسُوْلُ بَلِّغْ مَآ أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَّبِّكَ ط وَإِنْ لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَه۫ )
“হে রাসূল! তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা প্রচার কর; যদি না কর তবে তুমি তাঁর রিসালাত প্রচার করলে না।” (সূরা মায়েদা ৫:৬৭)
সুতরাং রাসূলের দায়িত্ব শুধু পৌঁছে দেয়া, কাউকে হেদায়েত করা নয়। হেদায়েত করা, শাস্তি দেয়া, রহমত করা, মানুষের হিসাব নিকাশ করা এ সমস্ত দায়িত্ব একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার অন্য কারো নয়। কারণ সকলকে একদিন আল্লাহ তা‘আলার কাছেই ফিরে যেতে হবে। সেদিন তিনি তাদের হিসাব গ্রহণ করবেন এবং তদানুযায়ী প্রতিদান দিবেন। তারা কি দেখে না যে, জমিনকে সংকুচিত করা হচ্ছে অর্থাৎ কাফিরদের থেকে জমিন মুসলিমদের দখলে চলে যাচ্ছে।
কাফিররা দিন-দিন পরাজিত হচ্ছে। বরকত উঠে যাচ্ছে আর মন্দ ও অকল্যাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানুষ ও গাছপালা মারা যাচ্ছে। যার ফলে জমিন শ্মশানে পরিণত হচ্ছে ইত্যাদি। এখানে সংকীর্ণ বলতে জমিন নয় বরং জমিনের সবকিছু ধ্বংস হওয়াকে বুঝানো হয়েছে।
আবার কেউ কেউ এর দ্বারা উদ্দেশ্য নিয়েছেন জমিন পানিতে নিমজ্জিত হয়ে বিলীন হয়ে যাবে।
তবে এর দ্বারা সঠিক উদ্দেশ্য হল ইসলাম শিরকের উপর জয়যুক্ত হওয়া।
আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(وَلَقَدْ أَهْلَكْنَا مَا حَوْلَكُمْ مِّنَ الْقُرٰي)
“তোমাদের আশপাশের এলাকার অনেক জনবসতি আমি ধ্বংস করে দিয়েছি।” (সূরা আহকাফ ৪৬:২৭)
সুতরাং অচিরেই তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলার নিকট ফিরে যেতে হবে। আর তখন তিনি তাদের হিসাব গ্রহণ করবেন। অতএব হে রাসূল! আপনার তাড়াহুড়া করার কোন প্রয়োজন নেই। তাদের ব্যাপারে আমিই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. রাসূলের দায়িত্ব শুধু পৌঁছে দেয়া।
২. ইসলাম একদিন জয়লাভ করবেই।
৩. পৃথিবীর সব কিছু শেষ হওয়ার মাধ্যমে পৃথিবী সংকীর্ণ হয়ে যাবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৪০-৪১ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তাআ’লা তাঁর রাসূলকে (সঃ) বলছেনঃ হে রাসূল (সঃ)! তোমার শত্রুদের উপর আমার শাস্তি যে আসবে তা আমি তোমার জীবদ্দশাতেই আনি বা তোমার মৃত্যুর পরই আনয়ন করি তাতে তোমার কি হয়েছে? তোমার কাজ তো শুধু আমার বাণী মানুষের কাছে পৌঁছিয়ে দেয়া। আর তা তো তুমি করেছে। তাদের হিসাব গ্রহণ এবং তাদেরকে বিনিময় প্রদানের দায়িত্ব আমার। তুমি শুধু তাদেরকে উপদেশ দিতে থাকো। তুমি তাদের উপর দারোগা বা রক্ষক নও। যে মুখ ফিরিয়ে নেবে এবং কুফরী করবে, তাদেরকে আল্লাহ স্বয়ং শাস্তির মধ্যে নিক্ষেপ করবেন। তাদের প্রত্যাবর্তন আমারই কাছে এবং তাদের হিসাব নিকাশ গ্রহণের দায়িত্বও আমার। তারা কি দেখে নাই যে, আমি যমীনকে তোমার দখলে আনয়ন করেছি। তারা দেখে না যে, জনবহুল স্থান ও সুউচ্চ অট্টালিকা ধ্বংসাবশেষ ও বিজনে পরিণত হচ্ছে? তারা কি লক্ষ্য করে না যে, মুসলমানরা কাফিরদের উপর আধিপত্য লাভ করছে। তারা অবলোকন করছে না যে, দিন দিন বরকত উঠে যাচ্ছে এবং মন্দ ও অকল্যাণ আসতে রয়েছে। মানুষ মরতে আছে এবং যমীন শ্মশানে পরিণত হচ্ছে? যদি স্বয়ং যমীনকে সংকীর্ণ করে দেয়া হতো তবে এর উপর মানুষের কুঁড়ে ঘর নির্মাণ করাও অসম্ভব হয়ে পড়তো। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে দিন দিন মানুষ এবং মানুষও গাছপালা কমতে থাকা। এর দ্বারা উদ্দেশ্য যমীনের সংকীর্ণতা নয়, বরং মানুষ মরে যাওয়া। বিদ্বান মণ্ডলী, ধর্মশাস্ত্রবিধ এবং ভাল লোকদের মৃত্যুও হচ্ছে যমীনের ধ্বংস হওয়া। এ ব্যাপারে একজন আরব কৰি নিম্নরূপ কবিতা বলেছেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “যে ভূমিতে কোন (দ্বীনের) আলেম জীবন যাপন করেন সেই ভূমি জীবন্তরূপ লাভ করে, আর যখন আলেম মৃত্যু মুখে পতিত হন তখন সেই ভূমিও মরে যায় অর্থাৎ বিজনে পরিণত হয়। যেমন, যখন ভূমিতে বৃষ্টি বর্ষিত হয় তখন তা সবুজ শ্যামল হয়ে ওঠে, কিন্তু যদি তাতে বৃষ্টিপাত না হয় তবে তা শুকিয়ে যায় এবং অনুর্বর হয়ে পড়ে।” সুতরাং এই আয়াতের ভাবার্থ হচ্ছে ইসলাম শিরকের উপর জয়যুক্ত হওয়া যেমন আল্লাহ তাআ’লা বলেছেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “অবশ্যই আমি তোমাদের চতুষ্পর্শ্বের গ্রামগুলিকে ধ্বংস করে দিয়েছি।” (৪৬: ২৭) এটা ইমাম ইবনু জারীরেরও (রঃ) পছন্দনীয় উক্তি।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।