আল কুরআন


সূরা আর-রাদ (আয়াত: 10)

সূরা আর-রাদ (আয়াত: 10)



হরকত ছাড়া:

سواء منكم من أسر القول ومن جهر به ومن هو مستخف بالليل وسارب بالنهار ﴿١٠﴾




হরকত সহ:

سَوَآءٌ مِّنْکُمْ مَّنْ اَسَرَّ الْقَوْلَ وَ مَنْ جَهَرَ بِهٖ وَ مَنْ هُوَ مُسْتَخْفٍۭ بِالَّیْلِ وَ سَارِبٌۢ بِالنَّهَارِ ﴿۱۰﴾




উচ্চারণ: ছাওয়াউম মিনকুম মান আছাররাল কাওলা ওয়া মান জাহারা বিহী ওয়া মান হুওয়া মুছতাখফিম বিল্লাইলি ওয়া ছা-রিবুম বিন্নাহা-র।




আল বায়ান: তোমাদের মধ্যে কেউ কথা গোপন রাখুক বা প্রকাশ করুক। আর রাতে লুকিয়ে করুক বা দিনে প্রকাশ্যে করুক, সবই তাঁর নিকট সমান।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১০. তোমাদের মধ্যে যে কথা গোপন রাখে বা যে তা প্রকাশ করে, রাতে যে আত্মগোপন করে এবং দিনে যে প্রকাশ্যে বিচরণ করে, তারা সবাই আল্লাহর নিকট সমান।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: তোমাদের কেউ কথা গোপন করে বা প্রকাশ করে, কেউ রাতে লুকিয়ে থাকে বা দিনে প্রকাশ্যে চলাফেরা করে, সবাই তাঁর কাছে সমান।




আহসানুল বায়ান: (১০) তোমাদের মধ্যে যে গোপনে কথা বলে এবং যে তা প্রকাশ্যে বলে, যে রাত্রে আত্মগোপন করে এবং যে দিবসে প্রকাশ্যে বিচরণ করে, তারা (আল্লাহর জ্ঞানে) সবাই সমান।



মুজিবুর রহমান: তোমাদের মধ্যে যে কথা গোপন রাখে এবং যে তা প্রকাশ করে, রাতে যে আত্মগোপন করে এবং দিনে যে প্রকাশ্যে বিচরণ করে, তারা সমভাবে তাঁর (আল্লাহর) জ্ঞানগোচর।



ফযলুর রহমান: তোমাদের মধ্যে যে কথা গোপন করে আর যে তা প্রকাশ করে এবং যে রাতে লুকিয়ে থাকে আর যে দিনে অবাধে বিচরণ করে (তাঁর কাছে) সবাই সমান।



মুহিউদ্দিন খান: তোমাদের মধ্যে কেউ গোপনে কথা বলুক বা তা সশব্দে প্রকাশ করুক, রাতের অন্ধকারে সে আত্নগোপন করুক বা প্রকাশ্য দিবালোকে বিচরণ করুক, সবাই তাঁর নিকট সমান।



জহুরুল হক: একসমান তোমাদের মধ্যে যে কথা লুকোয় ও যে তা খুলে বলে, আর যে রাত্রিবেলায় আ‌ত্মগোপন করে আর দিনের বেলায় বিচরণ করে।



Sahih International: It is the same [to Him] concerning you whether one conceals [his] speech or one publicizes it and whether one is hidden by night or conspicuous [among others] by day.



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১০. তোমাদের মধ্যে যে কথা গোপন রাখে বা যে তা প্রকাশ করে, রাতে যে আত্মগোপন করে এবং দিনে যে প্রকাশ্যে বিচরণ করে, তারা সবাই আল্লাহর নিকট সমান।(১)


তাফসীর:

(১) অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা প্রকাশ্য ও গোপন সবকিছু সম্পর্কে পূর্ণভাবে জানেন। পবিত্র কুরআনের অন্যান্য স্থানেও এ বিষয়টি বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ বলেনঃ “তোমরা তোমাদের কথা গোপনেই বল অথবা প্রকাশ্যে বল, তিনি তো অন্তর্যামী। যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানেন না? তিনি সূক্ষ্মদশী, সম্যক অবগত।” [সূরা আল-মুলকঃ ১৩–১৪] আরো বলেছেনঃ “যদি আপনি উচ্চকণ্ঠে কথা বলেন, তবে তিনি তো যা গুপ্ত ও অব্যক্ত সবই জানেন।” [সূরা ত্বা-হাঃ ৭] অন্য আয়াতে বলেছেনঃ “এবং তিনি জানেন যা তোমরা গোপন কর আর যা প্রকাশ কর।” [সূরা আন-নামলঃ ২৫]

অন্যত্র বলেছেনঃ “সাবধান! নিশ্চয়ই ওরা তার কাছে গোপন রাখার জন্য ওদের বক্ষ দ্বিভাঁজ করে। সাবধান! ওরা যখন নিজেদেরকে বস্ত্রে আচ্ছাদিত করে তখন ওরা যা গোপন করে ও প্রকাশ করে, তিনি তা জানেন। অন্তরে যা আছে, নিশ্চয়ই তিনি তা সবিশেষ অবহিত [সূরা হুদঃ ৫] আয়াতের অর্থ এই যে, আল্লাহ্ তা'আলার জ্ঞান সর্বব্যাপী। কাজেই যে ব্যক্তি আস্তে কথা বলে এবং যে ব্যক্তি উচ্চঃস্বরে কথা বলে, তারা উভয়ই আল্লাহর কাছে সমান। তিনি উভয়ের কথা সমভাবে শোনেন এবং জানেন। এমনিভাবে যে ব্যক্তি রাতের অন্ধকারে গা ঢাকা দেয় এবং যে ব্যক্তি দিবালোকে প্রকাশ্য রাস্তায় চলে, তারা উভয়ই আল্লাহ তা'আলার জ্ঞান ও শক্তির দিক দিয়ে সমান। উভয়ের আভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক অবস্থা তিনি সমভাবে জানেন এবং উভয়ের উপর তার শক্তি সমভাবে পরিব্যপ্ত। কেউ তার ক্ষমতার আওতাবহির্ভূত নয়।


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১০) তোমাদের মধ্যে যে গোপনে কথা বলে এবং যে তা প্রকাশ্যে বলে, যে রাত্রে আত্মগোপন করে এবং যে দিবসে প্রকাশ্যে বিচরণ করে, তারা (আল্লাহর জ্ঞানে) সবাই সমান।


তাফসীর:

-


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৮-১০ নং আয়াতের তাফসীর:



অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলার সূক্ষ্মদর্শিতা ও সব বিষয়ে সম্যক জ্ঞান রাখেন এ কথাই ফুটে উঠেছে। এ পৃথিবীর স্থলে-জলে, দিবালোকে-আধাঁরে, প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে ও জমিনে-আকাশমণ্ডলীতে যা কিছু হয়েছে, হচ্ছে, হবে এবং আছে কোন কিছুই আল্লাহ তা‘আলার নিকট অস্পষ্ট বা গোপন নয়। এমনকি একজন নারী গর্ভে কী ধারণ করে তাও আল্লাহ তা‘আলা জানেন। সন্তান জীবিত হবে না মৃত, সৌভাগ্যশীল হবে না দুর্ভাগা, ছেলে হবে না মেয়ে হবে ইত্যাদি আল্লাহ তা‘আলা পূর্ব থেকেই জ্ঞাত। যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(هُوَ أَعْلَمُ بِكُمْ إِذْ أَنْشَأَكُمْ مِّنَ الْأَرْضِ وَإِذْ أَنْتُمْ أَجِنَّةٌ فِيْ بُطُوْنِ أُمَّهٰتِكُمْ)



“তিনি তোমাদের সম্পর্কে সম্যক অবগত- যখন তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছিলেন মাটি হতে এবং যখন তোমরা মাতৃগর্ভে ভ্রুণরূপে ছিলে।” (সূরা নাজম ৫৩:৩২)



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(يَخْلُقُكُمْ فِيْ بُطُوْنِ أُمَّهٰتِكُمْ خَلْقًا مِّنْۭ بَعْدِ خَلْقٍ فِيْ ظُلُمٰتٍ ثَلَاثٍ)



“তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেন তোমাদের মাতৃগর্ভে এক অবস্থার পর অন্য অবস্থায় তিন স্তরের অন্ধকারের মধ্যে। তিনিই আল্লাহ তা‘আলা, তোমাদের প্রতিপালক, সর্বময় কর্তৃত্ব তাঁরই।” (সূরা যুমার ৩৯:৬)



এখানে তিনটি অন্ধকার বলতে প্রথম অন্ধকার মায়ের পেট, দ্বিতীয় অন্ধকার গর্ভাশয়, তৃতীয় অন্ধকার ঝিল্লী, তা হল সেই পাতলা আবরণ যাতে বাচ্চা জড়ানো থাকে। এ সম্পর্কে সূরা ফাতিরের ১১ নং এবং সূরা ফুসসিলাতের ৪৭ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে।



এমনকি জরায়ুতে যা বাড়ে-কমে তাও আল্লাহ তা‘আলা জানেন। এখানে বাড়ে-কমে দ্বারা উদ্দেশ্য হল গর্ভের সময় কাল। অর্থাৎ কারো আট, আবার কারো দশ মাসেও সন্তান প্রসব হয়ে থাকে। এ ব্যাপারে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই জানেন, অন্য কেউ নয়। আর তাঁর নিকট প্রত্যেক বস্তুর একটি নির্দিষ্ট সময়কাল রয়েছে। অর্থাৎ কার জীবনকাল কত দিন? সে রিযিকের কত অংশ পাবে ইত্যাদি। যেমন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: “তাঁরই এক কন্যা তাঁর কাছে লোক পাঠিয়ে খবর দেন যে, তার এক ছেলে মৃত্যু শিয়রে দণ্ডায়মান। সুতরাং তিনি তাঁর উপস্থিতি কামনা করেন। এ খবর শুনে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার মেয়ের কাছে সংবাদ পাঠান: আল্লাহ তা‘আলা যা প্রেরণ করেন তা তাঁরই। তাঁর নিকট প্রত্যেক বস্তুরই একটা নির্দিষ্ট সময় রয়েছে। তোমরা তাকে বল, সে যেন ধৈর্য ধারণ করে এবং সওয়াবের আশা করে। (সহীহ বুখারী হা: ১৬০২)



সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা সকল বিষয়েই অবগত আছেন আর প্রত্যেক বস্তুরই একটি নির্ধারিত সময়কাল রয়েছে।



শুধু তাই নয়, আল্লাহ তা‘আলা পরবর্তী আয়াতে বলছেন যে তিনি অদৃশ্য ও দৃশ্য সকল বিষয়েই অবগত আছেন, তাঁর নিকট কোন বিষয় গোপন নেই। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,



(عٰلِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ ط وَهُوَ الْحَكِيْمُ الْخَبِيْرُ)



“অদৃশ্য ও দৃশ্য সবকিছু সম্বন্ধে তিনি পরিজ্ঞাত; আর তিনিই প্রজ্ঞাময়, সবিশেষ অবহিত।” (সূরা আনয়াম ৬:৭৩)



অতএব আল্লাহ তা‘আলা র নিকট কোন কিছুই গোপন থাকে না। তিনি প্রকাশ্য এবং অপ্রকাশ্য সবই জানেন। আর তিনি সুমহান, সর্বোচ্চ। তাঁর চেয়ে বড় আর কেউ নেই। এমনকি তিনি তাও জানেন যা মানুষ তাদের অন্তরে কল্পনা করে।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَإِنْ تَجْهَرْ بِالْقَوْلِ فَإِنَّه۫ يَعْلَمُ السِّرَّ وَأَخْفٰي)



“যদি তুমি উচ্চকণ্ঠে কথা বল, তবে (জেনে রেখ) তিনি যা গুপ্ত ও অব্যক্ত সবই জানেন।” (সূরা ত্বহা ২০:৭)



তিনি ছোট-বড় সকল বিষয় সম্পর্কে অবগত এবং রাত্রের অন্ধকারে যে আত্মগোপন করে ও দিবসে যে বিচরণ করে সবই তাঁর জ্ঞানায়ত্ত্বে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَمَا تَكُوْنُ فِيْ شَأْنٍ وَّمَا تَتْلُوْا مِنْهُ مِنْ قُرْاٰنٍ وَّلَا تَعْمَلُوْنَ مِنْ عَمَلٍ إِلَّا كُنَّا عَلَيْكُمْ شُهُوْدًا إِذْ تُفِيْضُوْنَ فِيْهِ ط وَمَا يَعْزُبُ عَنْ رَّبِّكَ مِنْ مِّثْقَالِ ذَرَّةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَا۬ءِ وَلَآ أَصْغَرَ مِنْ ذٰلِكَ وَلَآ أَكْبَرَ إِلَّا فِيْ كِتٰبٍ مُّبِيْنٍ)‏



“তুমি যে কোন অবস্থায় থাক না কেন এবং তুমি কুরআন হতে যা তিলাওয়াত কর এবং তোমরা যে কোন কার্যই কর না কেন, আমি তোমাদের পরিদর্শক যখন তোমরা তাতে পূর্ণরূপে মনোনিবেশ কর। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অনু পরিমাণও তোমার প্রতিপালকের অগোচর নয় এবং তা অপেক্ষা ক্ষুদ্রতর অথবা বৃহত্তর কিছুই নেই যা সুস্পষ্ট কিতাবে উল্লেখ নেই।” (সূরা ইউনুস ১০: ৬১)



অতএব, আল্লাহ তা‘আলা র দৃষ্টি ফাঁকি দিয়ে কোন কিছু করার সুযোগ নেই। তাই সে আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে সকল পাপ কাজ ও আল্লাহ তা‘আলার নাফরমানী বর্জন করা প্রত্যেক মু’মিনের একান্ত কর্তব্য।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. আল্লাহ তা‘আলার নিকট সমস্ত কিছুর জ্ঞান রয়েছে।

২. আল্লাহ তা‘আলা অদৃশ্য বস্তুর খবর জানেন, এমনকি মায়ের গর্ভে যা কিছু বাড়ে-কমে তাও তিনি জানেন। তিনি ব্যতীত আর কেউ অদৃশ্যের বা গায়েবের খবর জানে না।

৩. মানুষকে তিনটি অন্ধকারের মধ্যে সৃষ্টি করা হয়।

৪. আল্লাহ তা‘আলা সবচেয়ে বড়, তাঁর চেয়ে বড় কেউ নেই ইত্যাদি।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১০-১১ নং আয়াতের তাফসীর

আল্লাহ তাআ’লা খবর দিচ্ছেন যে, তাঁর জ্ঞান সমস্ত মাখলুককে ঘিরে রয়েছে। কোন জিনিসই তাঁর জ্ঞানের বাইরে নেই। তিনি নিম্ন ও উচ্চ শব্দ শুনতে পান। তিনি প্রকাশ্য ও গোপনীয় সব কিছুই জানেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি যদি কথাকে প্রকাশ কর তবে জেনে রেখোঁরেখো যে, তিনি (ওটা তো জানতে পারেনই, এমন কি) অতি গোপনীয় কথাও জানেন।” (২০: ৭)

আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা যা কিছু গোপন কর এবং যা কিছু প্রকাশ কর তিনি তা জানেন।” (২৭: ২৫)

হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “ঐ আল্লাহ পবিত্র যাঁর শ্রবণ সমস্ত শব্দকে ঘিরে রয়েছে। আল্লাহর শপথ! নিজের স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগকারী একজন মহিলা রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট আগমন করে তাঁর সাথে এমন আস্তে আস্তে কথা বলে যে, আমি পার্শ্বেই অথচ ভালরূপে তার কথা আমার কর্ণগোচর হয় নাই। ঐ সময় আল্লাহ তাআ’লা নিম্নের আয়াতটি অবতীর্ণ করেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “ (হে রাসূল (সঃ)!) আল্লাহ শুনেছেন সেই নারীর কথা, যে তার স্বামীর বিষয়ে তোমার সাথে বাদানুবাদ করছে এবং আল্লাহর নিকটও ফরিয়াদ করছে; আল্লাহ তোমাদের কথোপকথন শুনেন, আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা” (৫৮: ১)

যে ব্যক্তি তার ঘরের কোণায় রাত্রির অন্ধকারে লুকিয়ে থাকে সে এবং যে ব্যক্তি দিনের বেলায় প্রকাশ্যভাবে জনবহুল পথে চলাচল করে, অল্লাহর অবগতিতে এরা দু’জন সমান। যেমন তিনি (আরবি) এই আয়াতে বলেছেন। (১১: ৫) মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “তুমি যে কোন কর্মে রত হও এবং তুমি তৎসম্পর্কে কুরআন হতে যা আবৃত্তি কর এবং তোমরা যে কোন কার্য কর, আমি তোমাদের পরিদর্শক, যখন তোমরা তাতে প্রবৃত্ত হও; আকাশ মণ্ডলী ও পৃথিবীর অনু পরিমাণও তোমার প্রতিপালকের অগোচর নয় এবং ওটা অপেক্ষা ক্ষুদ্রতর অথবা বৃহত্তর কিছুই নেই সুষ্পষ্ট কিতাবে নেই।” (১০: ৬১)

আল্লাহ তাআ’লার উক্তি : (আরবি) অর্থাৎ “মানুষের জন্যে তার সামনে ও পেছনে একের পর এক প্রহরী থাকে; ওরা আল্লাহর আদেশে তার রক্ষণাবেক্ষণ করে।” অর্থাৎ মানুষের রক্ষণাবেক্ষণকারী হিসেবে তাদের চতুর্দিকে ফেরেশতাদেরকে মোতায়েন করে রাখা হয়েছে। তারা মানুষকে কষ্ট ও বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করে থাকেন। যেমন তাদের কার্যাবলী পরিদর্শন করার জন্যে ফেরেশতাদের অন্য দল রয়েছে। যারা পর্যায়ক্রমে একের পর এক আসা যাওয়া করে থাকেন। রাত্রিকালের জন্যে পৃথক ফেরেশতা আছেন এবং দিবা ভাগের জন্যেও পৃথক ফেরেশতা রয়েছেন। যেমন মানুষের ডানে ও বামে দু’জন ফেরেশতা মানুষের আমল লিখবার জন্যে নিযুক্ত রয়েছেন। ডান দিকের ফেরেশতা পূণ্য লিখেন এবং বাম দিকের ফেরেশতা পাপ লিখেন। অনুরূপভাবে তার সামনে ও পেছনে দু’জন ফেরেশতা রয়েছেন যারা তার রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকেন। সুতরাং প্রত্যেক মানুষ চারজন ফেরেশতার মধ্যে অবস্থান করে। দু’জন আমল লেখক ডানে ও বামে এবং দু’জন রক্ষণাবেক্ষণকারী সামনে ও পেছনে। তারপর রাত্রির পৃথক ও দিবসের পৃথক। যেমন সহীহ হাদীসে রয়েছেঃ “তোমাদের কাছে ফেরেশতারা পালাক্রমে আগমন করে থাকেন দিবসে ও রজনীতে। ফজর ও আসরের নামাযে উভয় দলের মিলন ঘটে। রাত্রে অবস্থানকারী ফেরেশতাগণ রাত্রি শেষে আকাশে উঠে যান। বান্দাদের অবস্থা অবগত হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তাআ’লা তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা আমার বান্দাদেরকে কি অবস্থায় ছেড়ে এসেছো?” তারা উত্তরে বলেনঃ “আমরা তাদের কাছে আগমনের সময় নামাযের অবস্থায় তাদেরকে পেয়েছি এবং বিদায়ের সময়ও তাদেরকে নামাযের অবস্থায় ছেড়ে এসেছি।”

অন্য হাদীসে এসেছেঃ “তোমাদের সাথে তাঁরা রয়েছেন যাঁরা তোমাদের পায়খানা ও সহবাসের সময় ছাড়া কোন অবস্থাতেই তোমাদের থেকে পৃথক হন না। সুতরাং তোমাদের উচিত তাদের থেকে লজ্জা করা ও তাদেরকে সম্মান করা।”

হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাআ’লা যখন বান্দার কোন ক্ষতি সাধনের ইচ্ছা করেন তখন রক্ষক ফেরেশতা তা হতে দেন। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক বান্দার সাথে আল্লাহর পক্ষ থেকে ভারপ্রাপ্ত ফেরেশতা থাকেন যিনি তাকে ঘুমন্ত ও জাগ্রত অবস্থায় দানব, মানব, বিষধর প্রাণী এবং সমস্ত বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করে থাকেন।

হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এটা হচ্ছে পার্থিব বাদশাহ ও আমীরদের আলোচনা যারা প্রহরাধীনে অবস্থান করে থাকেন। যহ্‌হাক (রঃ) বলেন যে, সম্রাট বা শাহান্শাহ আল্লাহর রক্ষণাবেক্ষণে থাকেন আল্লাহর আমর হতে এবং তারা হচ্ছে আলুশ শিরক ও আহলুয যাহির। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআ’লাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।

সম্ভবতঃ এই উক্তির উদ্দেশ্য এই যে, বাদশাহ ও আমীরদেরকে যেমন সৈন্য প্রহরীরা পাহারা দিয়ে থাকে তেমনিভাবে আল্লাহ তাআ’লার বান্দাদেরকে পাহারা দিয়ে থাকেন তার পক্ষ থেকে নিযুক্ত ফেরেশতাগণ।

তাফসীরে ইবনু জারীরে একটি দুর্বল রিওয়াইয়াতে এসেছে যে, একদা হযরত উসমান (রাঃ) রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট আগমন করেন এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! বান্দার সাথে কতজন ফেরেশতা থাকেন?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “একজন ডান দিকে থাকেন, যিনি পূণ্য লিখেন এবং তিনি বামদিকে অবস্থানকারী পাপ লেখক ফেরেশতার উপর নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। যখন তুমি কোন পূণ্যের কাজ কর তখন ঐ পূণ্য লেখক ফেরেশতা একটির বিনিময়ে দশটি পূণ্য লিখে ফেলেন। পক্ষান্তরে যখন তুমি কোন পাপকার্য কর তখন বাম দিকের ফেরেশতা তা লিখবার জন্যে ডানদিকের ফেরেশতার কাছে অনুমতি প্রার্থনা করেন। ডান দিকের ফেরেশতা তখন তাকে বলেনঃ “কিছুক্ষণ অপেক্ষা কর, হয়তো সে ক্ষমা প্রার্থনা ও তওবা করবে।” তিন বার তিনি অনুমতি চান। তখন পর্যন্তই যদি সে তওবা না করে তখন ঐ পূণ্য লেখক ফেরেশতা পাপ লেখক ফেরেশতাকে বলেনঃ “এখন লিখে নাও। আল্লাহ তার থেকে আমাদেরকে আরাম দান করুন। সে কতই না নিকৃষ্ট সঙ্গী। সে আল্লাহ তাআ’লার প্রতি খেয়াল রাখে না এবং আমাদের থেকে লজ্জা করে না।” আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তা লিপিবদ্ধ করবার জন্যে তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে।” (৫০: ১৮) আর দু’জন ফেরেশতা তোমার সামনে ও পেছনে রয়েছেন। যেমন আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “মানুষের সামনে ও পেছনে একের পর এক প্রহরী থাকে।” আর একজন ফেরেশতা তোমার মাথার চুল ধরে রয়েছেন। যখন তুমি আল্লাহর সামনে বিনয় ও নীচতা প্রকাশ কর তখন তিনি তোমার মর্যাদা উচ্চ করে দেন। আর যখন তুমি আল্লাহর সামনে অবাধ্যতা ও অহংকার প্রকাশ কর তখন তিনি তোমার মর্যাদা নিচু করে দেন এবং তোমাকে অপারগ ও অক্ষম করেন। দু’জন ফেরেশতা তোমার ওষ্ঠের উপর রয়েছেন। তুমি যে দরূদ আমার উপর পাঠ করে থাকো তিনি তা হিফাযত করেন। একজন ফেরেশতা তোমার মুখের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছেন, যেন সর্প ইত্যাদির ন্যায় কোন কিছু গলায় চলে না যায়। দু’জন ফেরেশতা তোমার চোখের উপর রয়েছেন। অতএব এই দশজন ফেরেশতা প্রত্যেক বনী আদমের সাথে রয়েছেন। দিনের ফেরেশতা আলাদা এবং রাতের ফেরেশতা আলাদা। এভাবে প্রত্যেক লোকের সাথে আল্লাহ তাআ’লার পক্ষ হতে বিশজন ফেরেশতা নিযুক্ত রয়েছেন। আর এদিকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্যে সারা দিন ইবলীস কর্মব্যস্ত থাকে এবং রাত্রে এ কাজে লেগে থাকে তার সন্তানেরা।” (এ হাদীসটি তাফসীরে ইবনে জারীরে কিনানা’ আল আদাভী (রঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এটা খুবই গারীব বা দুর্বল)

হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকের সাথে ভারপ্রাপ্ত সঙ্গী হিসেবে রয়েছে একজন জ্বিন ও একজন ফেরেশতা।” জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার সাথেও কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যাঁ, আমার সাথেও রয়েছে। তবে আল্লাহ আমাকে তার উপর সাহায্য করেছেন। সে আমাকে ভাল ছাড়া কিছুই হুকুম করে না।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিম একাকী এটা তাখরীজ করেছেন)

আল্লাহ পাকের উক্তিঃ (আরবি) (তারা আল্লাহর আদেশে তার রক্ষণাবেক্ষণ করে) কোন কোন কিরআতে (আরবি) এর স্থলে (আরবি) রয়েছে। হযরত কা’ব (রঃ) বলেন যে, বনী আদমের জন্যে যদি প্রত্যেক নরম ও শক্ত খুলে যায় তবে অবশ্যই প্রতিটি জিনিস সে নিজেই দেখতে পাবে। আর যদি আল্লাহ তাআ’লার পক্ষ থেকে এই রক্ষক ফেরেশতাগুলি নিযুক্ত না থাকেন যারা পানাহার ও লজ্জাস্থানের হিফাযত করে থাকেন তবে আল্লাহর শপথ! তোমাদেরকে অবশ্যই ছিনিয়ে নেয়া হবে। আবু উমামা (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক মানুষের সাথে রক্ষণাবেক্ষণকারী ফেরেশতা রয়েছেন যারা ভাগ্যে লিখিত ছাড়া অন্যান্য সমস্ত বিপদ-আপদ তার থেকে দূর করে থাকে।

আবু মাজায (রঃ) বলেন যে, মুরাদ গোত্রের একটি লোক হযরত আলীর (রাঃ) নিকট আগমন করে তাঁকে নামাযে মশগুল দেখতে পান। অতঃপর তাঁকে তিনি বলেনঃ “মুরাদ গোত্রের লোক আপনাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সুতরাং আপনি প্রহরী নিযুক্ত করুন।” এ কথা শুনে হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ “প্রত্যেক ব্যক্তির সাথে তার হিফাযতের জন্যে দু’জন ফেরেশতা নিযুক্ত রয়েছেন। তকদীরে লিপিবদ্ধ ছাড়া কোন বিপদাপদ তারা তাঁর প্রতি আপতিত হতে দেন না। জেনে রেখোঁরেখো যে, ‘আজল’ একটা মযবুত দুর্গ ও উত্তম ঢাল স্বরূপ।”

কেউ কেউ বলেছেন যে, (আরবি) এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তারা আল্লাহর নির্দেশক্রমে তাকে তাঁর আমর থেকে হিফাযত করে থাকে। যেমন হাদীস শরীফে এসেছেঃ জনগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা যে ঝাড় ফুঁক করে থাকি তা কি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত তকদীরের পরিবর্তন ঘটাতে পারে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “ওটা স্বয়ং আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত।”

ইবরাহীম (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, বনী ইসরাঈলের কোন এক নবীর কাছে আল্লাহ তাআ’লা ওয়াহী করেনঃ “তোমার কওমকে বলে দাওঃ যে গ্রামবাসী বা যে গৃহবাসী আল্লাহর আনুগত্য করতে করতে তাঁর অবাধ্য হতে শুরু করে, আল্লাহ তাদের আরামের জিনিস গুলিকে তাদের থেকে দূর করে দিয়ে ঐ জিনিসগুলি তাদের কাছে আনয়ন করেন যেগুলি তাদের কষ্টের ও দুঃখের কারণ হয়।” (এটা ইবনু আবি হা’তিম (রঃ) স্বীয় তাফসীরে বর্ণনা করেছেন। ইমাম ইবনু আবি শায়বার (রঃ) “সিফাতুল আর্‌শ' নামক গ্রন্থে এই রিওয়াইয়াতটি মার’ রূপেও এসেছে)

আল্লাহ তাআ’লার উক্তিঃ (আরবি) (নিশ্চয় আল্লাহ কোন সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে) এই আয়াত দ্বারা এ কথার সত্যতা স্বীকৃত হয়।

উমাইর ইবনু আবদিল মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ একদা কূফার (মসজিদের) মিম্বরের উপর হতে হযরত আলী (রাঃ) আমাদের মধ্যে ভাষণ দেন। তাতে তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে নীরবতা অবলম্বন করলে তিনি কথা বলতে শুরু করতেন। আর আমি কিছু জিজ্ঞেস করলে তিনি তার উত্তর দিতেন। এক দিন তিনি আমাকে বলেন যে, আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “আমার ইযযত ও জালাল এবং আমার আর্‌শের উচ্চতার শপথ! যে গ্রামবাসী বা যে গৃহবাসী আমার নাফরমানীতে জড়িয়ে পড়ার পর তা পরিত্যাগ করতঃ আমার আনুগত্যের কাজে লেগে পড়ে, আমি তখন আমার শাস্তি ও কষ্ট তাদের থেকে সরিয়ে নিয়ে আমার রহমত ও সুখ তাদের উপর অবতীর্ণ করে থাকি।” (এ হাদীসটি গারীব- এর সনদে একজন বর্ণনাকারী অপরিচিত)





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।