আল কুরআন


সূরা ইউসুফ (আয়াত: 89)

সূরা ইউসুফ (আয়াত: 89)



হরকত ছাড়া:

قال هل علمتم ما فعلتم بيوسف وأخيه إذ أنتم جاهلون ﴿٨٩﴾




হরকত সহ:

قَالَ هَلْ عَلِمْتُمْ مَّا فَعَلْتُمْ بِیُوْسُفَ وَ اَخِیْهِ اِذْ اَنْتُمْ جٰهِلُوْنَ ﴿۸۹﴾




উচ্চারণ: কা-লা হাল ‘আলিমতুম মা-ফা‘আলতুম বিইঊছুফা ওয়া আখীহি ইযআনতুম জা-হিলূন।




আল বায়ান: সে বলল, ‘তোমাদের জানা আছে কি, ইউসুফ ও তার ভাইয়ের সাথে তোমরা কিরূপ আচরণ করেছিলে, যখন তোমরা অজ্ঞ ছিলে’?




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৮৯. তিনি বললেন, তোমরা কি জান, তোমরা ইউসুফ ও তার সহোদরের প্রতি কিরূপ আচরণ করেছিলে, যখন তোমরা ছিলে অজ্ঞ?(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: সে বলল, ‘তোমরা কি জান তোমরা ইউসুফ আর তার ভাইয়ের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করেছিলে, যখন তোমরা অজ্ঞ-মূর্খ ছিলে?’




আহসানুল বায়ান: (৮৯) সে বলল, ‘তোমরা কি জান, তোমরা ইউসুফ ও তার সহোদরের প্রতি কিরূপ আচরণ করেছিলে, যখন তোমরা ছিলে (পরিণাম সম্বন্ধে) অজ্ঞ?’ [1]



মুজিবুর রহমান: সে বললঃ তোমরা কি জান, তোমরা ইউসুফ ও তার সহোদরের প্রতি কিরূপ আচরণ করেছিলে, যখন তোমরা ছিলে অজ্ঞ?



ফযলুর রহমান: ইউসুফ বলল, “তোমরা ইউসুফ ও তার ভাইয়ের সাথে কি আচরণ করেছিলে তা কি জান? তোমরা তো অজ্ঞ।”



মুহিউদ্দিন খান: ইউসুফ বললেনঃ তোমাদের জানা আছে কি, যা তোমরা ইউসুফ ও তার ভাইয়ের সাথে করেছ, যখন তোমরা অপরিণামদর্শী ছিলে?



জহুরুল হক: তিনি বললেন -- "তোমরা কি জানো ইউসুফ ও তার ভাইয়ের প্রতি তোমরা কি করেছিলে যখন তোমরা ছিলে বিবেচনাহীন?"



Sahih International: He said, "Do you know what you did with Joseph and his brother when you were ignorant?"



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৮৯. তিনি বললেন, তোমরা কি জান, তোমরা ইউসুফ ও তার সহোদরের প্রতি কিরূপ আচরণ করেছিলে, যখন তোমরা ছিলে অজ্ঞ?(১)


তাফসীর:

(১) ইউসুফ আলাইহিস সালাম ভাইদের এহেন মিসকীনসুলভ কথাবার্তা শুনে এবং দুরাবস্থা দেখে স্বভাবগতভাবে প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ করে দিতে বাধ্য হচ্ছিলেন। ঘটনা প্রবাহে অনুমিত হয় যে, ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর উপর স্বীয় অবস্থা প্রকাশের ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে যে বিধি-নিষেধ ছিল, এখন তা অবসানের সময়ও এসে গিয়েছিল। তাদের কথাবার্তা শুনে ইউসুফ আলাইহিস সালাম নিজের গোপন ভেদ প্রকাশ করে দিলেন। পরিচয়ের ভূমিকা হিসেবে ভাইদেরকে প্রশ্ন করলেন, তোমাদের স্মরণ আছে কি? তোমরা ইউসুফ ও তার ভাইয়ের সাথে কি ব্যবহার করেছিলে, যখন তোমাদের মূর্খতার দিন ছিল এবং যখন তোমরা ভাল-মন্দের বিচার করতে পারতে না? এ প্রশ্ন শুনে ইউসুফ-ভ্রাতাদের মাথা ঘুরে গেল যে, ইউসুফের ঘটনার সাথে আযীযে-মিসরের কি সম্পর্ক।

এ আযীযে-মিসরই স্বয়ং ইউসুফ নয় তো! এরপর আরো চিন্তা-ভাবনার পর কিছু কিছু আলামত দ্বারা চিনে ফেলল এবং আরো তথ্য জানার জন্য বললঃ (أَإِنَّكَ لَأَنْتَ يُوسُفُ) সত্যি সত্যিই কি তুমি ইউসুফ? ইউসুফ 'আলাইহিস সালাম বললেনঃ হ্যাঁ, আমিই ইউসুফ এবং এ হচ্ছে আমার সহোদর ভাই। ভাইয়ের প্রসঙ্গ জুড়ে দেয়ার কারণ, যাতে তাদের লক্ষ্য অর্জনে পুরোপুরি সাফল্যের ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, যে দু’জনের খোঁজে তারা বের হয়েছিল, তারা উভয়েই এক জায়গায় বিদ্যমান রয়েছে। [বাগভী; ইবন কাসীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৮৯) সে বলল, ‘তোমরা কি জান, তোমরা ইউসুফ ও তার সহোদরের প্রতি কিরূপ আচরণ করেছিলে, যখন তোমরা ছিলে (পরিণাম সম্বন্ধে) অজ্ঞ?’ [1]


তাফসীর:

[1] যখন তাঁরা অতি নম্রতার সাথে দান-খয়রাত করার অথবা ভাইকে মুক্ত করার জন্য আপীল করলেন এবং সাথে সাথে পিতার বার্ধক্য, দুর্বলতা ও পুত্র-বিচ্ছেদের আঘাতের কথাও উল্লেখ করলেন, তখন ইউসুফ (আঃ)-এর হৃদয় আকুল হয়ে পড়ল, চক্ষুদ্বয় অশ্রুসজল হয়ে গেল এবং বাস্তব ঘটনা ব্যক্ত করতে বাধ্য হলেন। কিন্তু তিনি ভাইদের শত্রুতার কথা উল্লেখ করার সাথে সাথে উদার চরিত্রের বিকাশ ঘটাতে ভুলে যাননি। সুতরাং তিনি বললেন, এ কাজ তোমরা তখন করেছিলে, যখন তোমরা মূর্খ ও অজ্ঞ ছিলে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৮৮-১০১ নং আয়াতের তাফসী:



অতঃপর তৃতীয় দফায় তারা তাদের পিতার নির্দেশক্রমে মিসরে আগমন করল। আগমন করে ইউসুফ (عليه السلام) কে তাদের দুরবস্থার কথা অবগত করণার্থে বলল: হে আযীয, আমাদের খাদ্যাভাবে আমাদের পরিবার বিপন্ন হয়ে গেছে, তাছাড়া আমরা যে অর্থ কড়ি নিয়ে এসেছি তা অতি সামান্য, সুতরাং আমাদের অর্থাভাবের কারণে মালামাল কম না দিয়ে পূর্ণমাত্রায় দেবেন এবং আরো কিছু বেশি দেবেন। কেউ কেউ বলেছেন, (وَتَصَدَّقْ عَلَيْنَا) অর্থাৎ বিনয়ামীনকে আমাদের সাথে যেতে দিয়ে অনুগ্রহ করুন। যখন তারা দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরল, এবং পিতার বার্ধক্য, দুর্বলতা ও পুত্র বিচ্ছেদের আঘাতের কথা বর্ণনা করল তখন ইউসুফ (عليه السلام) এর হৃদয় বিগলিত হয়ে গেল। অশ্র“সিক্ত ভারাক্রান্ত কণ্ঠে তিনি বললেন: তোমরা ইউসুফ ও তাঁর সহোদর ভাই-এর সাথে যে ব্যবহার করেছিলে তা কি তোমাদের স্মরণ আছে? তিনি ভাইদের অপরাধের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার সাথে সাথে উদারতা দেখিয়ে বললেন, তোমরা তখন অজ্ঞ ছিলে। মূলত আল্লাহ তা‘আলার পাপী বান্দারা অজ্ঞই বটে।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(ثُمَّ اِنَّ رَبَّکَ لِلَّذِیْنَ عَمِلُوا السُّوْ۬ئَ بِجَھَالَةٍ ثُمَّ تَابُوْا مِنْۭ بَعْدِ ذٰلِکَ وَاَصْلَحُوْٓا اِنَّ رَبَّکَ مِنْۭ بَعْدِھَا لَغَفُوْرٌ رَّحِیْمٌ)



“যারা অজ্ঞতাবশত মন্দকর্ম করে তারা পরে তাওবাহ করে ও নিজেদেরকে সংশোধন করে নেয় তাদের জন্য তোমার প্রতিপালক অবশ্যই অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা নাহল ১৬:১১৯)



ইউসুফ (عليه السلام) এর মুখ থেকে নিজের বাল্যকালের সকল ঘটনা তুলে ধরলে তারা ইউসুফ (عليه السلام)-কে চিনে ফেলে এবং বলল যে, তুমি কি তাহলে ইউসুফ? উত্তরে তিনি তাঁর পরিচয় প্রকাশ করলেন। সাথে সাথে আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহ, ধৈর্য ও সংযমের শুভ পরিণামের কথা বর্ণনা করে বললেন: তোমরা আমাকে নিঃশেষ করার ষড়যন্ত্রের কোন প্রকার ত্র“টি করোনি, কিন্তু এটা আল্লাহ তা‘আলার দয়া যে, তিনি আমাকে শুধু কূপ থেকে পরিত্রাণ দেননি বরং মিসরের রাজত্বও দান করেছেন। তখন ইউসুফ (عليه السلام) এর ভাইয়েরা সকলেই তাদের ভুল স্বীকার করল। ইউসুফও (عليه السلام) তাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন এবং আল্লাহ তা‘আলার কাছেও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন, আর বললেন: আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই, কোন নিন্দা ও ভর্ৎসনা করা হবে না। মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মক্কার কাফির ও যারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল এমনকি তাঁকে হত্যা করতে চেয়েছিল তাদেরকে একথাই বলে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।



তাদেরকে ইউসুফ (عليه السلام) একটি জামা দিয়ে বললেন: এটা নিয়ে যাও, এটা আমার পিতার মুখমণ্ডলে রাখলেই চোখের জ্যোতি ফিরে আসবে এবং পরিবারের সকলকে মিসরে দাওয়াত দিলেন। এ জামা আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম (عليه السلام) কে দিয়েছিলেন যখন নমরুদ তাঁকে আগুনে নিক্ষেপ করে। ইবরাহীম (عليه السلام) ইসহাককে প্রদান করে, তিনি ইয়া‘কূব (عليه السلام) কে প্রদান করেন। ইয়া‘কূব (عليه السلام) ইউসুফ (عليه السلام) কে পড়িয়ে দেন যাতে কোন প্রকার বদনজর না লাগে। (কুরতুবী) উক্ত জামা নিয়ে মিসর থেকে কাফেলা রওনা হল এবং ওদিকে আল্লাহ তা‘আলা র পক্ষ থেকে ইয়া‘কূব (عليه السلام) এর কাছে মু‘জিযাহস্বরূপ ইউসুফ (عليه السلام) এর সুগন্ধি আসতে লাগল। তাই তিনি বললেন: আমি ইউসুফের সুঘ্রাণ পাচ্ছি। তখন পরিবারের লোকেরা বলল: আপনি এখনো সে পুরাতন ভ্রষ্টতার মাঝেই আছেন। অর্থাৎ ইউসুফ (عليه السلام) কে হারিয়ে ইয়া‘কূব (عليه السلام) মাঝে মাঝেই এরূপ কথা বলতেন যে, আমার মনে হয় ইউসুফ (عليه السلام) বেঁচে আছে, আমি তার সুঘ্রাণ পাচ্ছি।



অতঃপর যখন সুসংবাদদাতা জামাটি নিয়ে এসে ইয়া‘কূব (عليه السلام) এর মুখে রাখল আল্লাহ তা‘আলার রহমতে চোখের দৃষ্টি ফিরে এল। ইয়া‘কূব (عليه السلام) বললেন: ‘আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, আমি আল্লাহর নিকট হতে যা জানি তোমরা তা জান না?’ অর্থাৎ আমি ওয়াহীর মাধ্যমে জানতে পেরেছি ইউসুফ (عليه السلام) বেঁচে আছে, তোমাদের কাছে তো ওয়াহী আসে না তাই তোমরা আমার মত জানো না। তখন ইউসুফ (عليه السلام) এর ভাইয়েরা পিতার নিকটও নিজেদের অপরাধ স্বীকার করল এবং তাদের জন্য আল্লাহ তা‘আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনার জন্য আবেদন করল। ইয়া‘কূব (عليه السلام) অচিরেই ক্ষমা প্রার্থনা করবেন বলে ওয়াদা দিলেন। উদ্দেশ্য হল রাতের শেষ প্রহরে যখন আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন, সে সময়টি দু‘আ কবূলের সময়। তাছাড়া এত বড় অপরাধ করেছে সে জন্য চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন ছিল। তাই তিনি সাথে সাথে ক্ষমা প্রার্থনা না করে অচিরেই ক্ষমা প্রার্থনা করবেন বলে ওয়াদা দিয়েছেন।



অতঃপর তিনি তাঁর ছেলেদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন এবং তারা সকলে ইউসুফ (عليه السلام)-এর উদ্দেশ্যে মিসরে রওনা করলেন, ইউসুফ (عليه السلام) শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে শান্তির অভিবাদন জানিয়ে নিজের কাছে স্থান দিলেন। এমনকি তিনি তাঁর পিতা-মাতাকে রাজার যে আসন সেখানে বসালেন এবং পিতা-মাতা ও সব ভাই ইউসুফ (عليه السلام) এর সম্মানার্থে সিজদায় পড়ে গেলেন।



এখানে সিজদা করা দ্বারা এমনটি মনে করা যাবে না যে, যেহেতু ইউসুফ (عليه السلام) কে তাঁর ভাইয়েরা সিজদা করেছে সেহেতু মানুষকে সিজদা করা যাবে। অতএব কোন মাজারে বা কবরে সিজদা করা কিংবা উচ্চ মর্যাদাস¤পন্ন কোন ব্যক্তিকে সম্মানার্থে সিজদা করা বৈধ। না, এরূপ বৈধ হবে না। কারণ এই সম্মানসূচক সিজদা ইয়া‘কূব (عليه السلام)-এর শরীয়তে বৈধ ছিল কিন্তু শরীয়তে মুহাম্মাদীতে তা হারাম করে দেয়া হয়েছে।



মুআয বিন যাবাল (রাঃ) শাম থেকে ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে সিজদা করলেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন একি মুআয! মুআয (রাঃ) বললেন: আমি শামে গিয়ে দেখলাম, সে দেশের লোকজন তাদের যাজক ও পাদ্রীদেরকে সিজদা করে। তাই আমি মনে মনে চাইলাম যে, আমরাও আপনাকে সিজদা করব। তা শুনে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: খবরদার! তা করো না। কারণ আমি যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করতে আদেশ করতাম তাহলে মহিলাদেরকে বলতাম, তোমরা তোমাদের স্বামীদেরকে সিজদা কর। (ইবনু মাযাহ হা: ১৮৫৩, ইবনু হিববান হা: ৪১৭১, সিলসিলাহ সহীহাহ হা: ১২০৩) অতএব কোন বস্তু বা ব্যক্তিকে সিজদা করা সম্পূর্ণ শির্ক। সিজদা করতে হবে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাকে।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَّاَنَّ الْمَسٰجِدَ لِلہِ فَلَا تَدْعُوْا مَعَ اللہِ اَحَدًا)



“এবং নিশ্চয়ই সিজদার স্থানসমূহ (সমস্ত ইবাদত) একমাত্র আল্লাহর জন্য। সুতরাং আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাউকেও ডেকো না।” (সূরা জিন ৭২:১৮) এ সিজদাই ছিল ইউসুফ (عليه السلام) এর সেই স্বপ্নের ব্যাখ্যা যা আল্লাহ তা‘আলা এতদিন পর বাস্তবে পরিণত করেছেন এবং তাদের বিচ্ছিন্নতার পর পুনরায় আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে একত্রিত করে দিয়েছেন এটা ছিল আল্লাহ তা‘আলা র অনুগ্রহ।



(مِّنَ الْبَدْوِ) মিসরের মত সভ্য এলাকার তুলনায় কেন‘আন একটি মরুভূমির মত এলাকা, তাই তিনি بدو (মরু অঞ্চল) শব্দ ব্যবহার করলেন।



অতঃপর ইউসুফ (عليه السلام) আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করলেন এবং তিনি নিজের জন্য দু‘আ করলেন যাতে তিনি মুসলিম থাকা অবস্থায় ঈমানের সাথে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে পারেন এবং তাকে যেন আল্লাহ তা‘আলা সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত করেন।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. যারা অপরাধ করে তারা মূলত অজ্ঞতাবশতই করে থাকে। তবে এর ব্যতিক্রমও হয় কিন্তু তা খুবই বিরল।

২. কেউ মন্দ ব্যবহার করলেও তাঁর সাথে যতদূর সম্ভব ভাল ব্যবহার করতে হবে। যেমন ইউসুফ (عليه السلام) তাঁর ভাইদের ব্যাপারে করেছিলেন।

৩. আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত কোন ফেরেশতা, জিন, ইনসান ও বস্তুকে সিজদা করা ইসলামী শরীয়তে জায়েয নেই, বরং বড় শির্ক।

৪. নিজের জন্য দু‘আ করা উচিত যাতে ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ করতে পারে ।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৮৯-৯২ নং আয়াতের তাফসীর

হযরত ইউসুফের (আঃ) ভাইয়েরা যখন তাঁর কাছে অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত ও দারিদ্রের অবস্থায় পৌঁছেন এবং তাঁর কাছে নিজেদের দুঃখ-দুর্দশা, পিতা ও পরিবারবর্গের বিপদ-আপদের বর্ণনা দেন তখন তাঁর অন্তর বিগলিত হয়ে যায় এবং আবেগে অভিভূত হয়ে পড়েন। বর্ণিত আছে যে, সেই সময় তিনি স্বীয় মাথার তাজ নামিয়ে ফেলেন এবং ভাইদেরকে বলেনঃ “আপনারা ইউসুফের (আঃ) সাথে এবং তার ভাই বিনইয়ামীনের সাথে যে ব্যবহার করেছিলেন তা আপনাদের স্মরণ আছে কি, যখন আপনারা অজ্ঞ ছিলেন? এ জন্যেই পূর্ববর্তী কোন কোন গুরুজন বলেন যে, আল্লাহ তাআ’লার প্রত্যেক পাপী বান্দাই অজ্ঞ ও মুখ। অতঃপর তিনি (আরবি) এই আয়াতটি পাঠ করেন। (১৬: ১১৯)।

বাহ্যতঃ এটা জানা যাচ্ছে যে, প্রথম দু’দফার সাক্ষাতের সময় নিজের পরিচয় দানের নির্দেশ আল্লাহ তাআ’লার পক্ষ হতে হযরত ইউসুফের (আঃ) প্রতি ছিল না। তৃতীয় বারে সাক্ষাতের সময় তাঁকে নিজের পরিচয় দানের নির্দেশ দেয়া হয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআ’লাই সবচেয়ে ভাল জানেন। যখন কষ্ট বেড়ে গেল এবং কাঠিণ্য বৃদ্ধি পেলো তখন আল্লাহ তাআ’লা কাঠিণ্য ও সংকীর্ণতা দূর করে দিলেন এবং প্রশস্ততা আনয়ন করলেন। যেমন কুরআন কারীমে ঘোষিত হয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “কষ্টের সাথেই তো স্বস্তি আছে। অবশ্য কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে।” (৯৪: ৫-৬)

হযরত ইউসুফের (আঃ) প্রশ্নে তাঁর ভ্রাতাগণ বিস্ময়ে চমকে উঠেন। এর একটা কারণ এই ছিল যে, মুকুট নামিয়ে দেয়ার ফলে তার কপালের নিদর্শন তাঁরা দেখে নেন। ঐ সময় তাঁরা তাঁকে প্রশ্ন করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তা হলে তুমিই কি ইউসুফ?” (১২:৯০) ইবনু মুহাইসিন (রঃ) (আরবি) পড়েছেন। প্রথমটিই প্রসিদ্ধ কিরআত। কেননা (আরবি) বা প্রশ্ন (আরবি) এর উপর ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ এতে তাঁরা বিস্মিত হন যে, তারা তাঁর কাছে দু’বছর বা তার চেয়েও বেশি সময় ধরে যাতায়াত করছেন, অথচ তাঁকে তাঁরা চিনতে পারেন নাই।, আর তিনি কিন্তু তাদেরকে চিনেছেন ও নিজেকে গোপন করেছেন! এজন্যেই তারা প্রশ্নের সুরে বলেনঃ “তুমি কি ইউসুফ?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “হ্যাঁ, আমিই ইউসুফ (আঃ) এবং এটা (বিনইয়ামীন) আমার (সহোদর) ভাই। আল্লাহ তাআ’লা আমাদের উপর অনুগ্রহ করেছেন যে, দীর্ঘ দিনের বিচ্ছেদের পর আমাদেরকে তিনি মিলিত করেছেন। আল্লাহ্ভীতি ও ধৈর্যশীলতা বিফলে যায় না।”

এখন হযরত ইউসুফের (আঃ) ভ্রাতাগণ তাঁর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নেন। তাঁরা তাঁকে বলেনঃ “বাস্তবিকই দৈহিক সৌন্দর্য ও নৈতিক চরিত্র উভয় দিক দিয়েই তুমি আমাদের চেয়ে উত্তম। রাজত্ব ও ধন-মালের দিক দিয়েও আল্লাহ তোমাকে আমাদের উপর মর্যাদা দান করেছেন।” অনুরূপভাবে কারো কারো মতে নুবওয়াতের দিক দিয়েও তিনি ভাইদের উপর প্রাধান্য লাভ করেছিলেন। কেননা, তিনি নবী ছিলেন এবং তাঁর ভ্রাতাগণ নবী ছিলেন না। এই স্বীকারোক্তির পর তাঁরা তাঁদের ভুলও স্বীকার করেন। তৎক্ষণাৎ হযরত ইউসুফ (আঃ) তাদেরকে বলেনঃ “আজকের পরে আমি আপনাদের এই ভুলের কথা মনেও করবো না। এ কারণে আমি আপনাদেরকে শাসন গর্জন করতে চাইনে। আমি আপনাদের উপর কোন অভিযোগও করছি না। আপনাদের উপর আমি রাগান্বিত নই। বরং আমার প্রার্থনা এই যে, আল্লাহ তাআ’লাও আপনাদেরকে ক্ষমা করুন! তিনি সর্বাপেক্ষা বড় দয়ালু।” তার ভ্রাতাগণ ওজর পেশ করলেন এবং তিনি তা কবুল করলেন। অর্থাৎ তিনি তাদেরকে বললেনঃ “আপনারা যা করেছেন, আল্লাহ তার উপর পর্দা করে দিন! তিনি হচ্ছেন পরম করুণাময়।”





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।