আল কুরআন


সূরা ইউসুফ (আয়াত: 88)

সূরা ইউসুফ (আয়াত: 88)



হরকত ছাড়া:

فلما دخلوا عليه قالوا يا أيها العزيز مسنا وأهلنا الضر وجئنا ببضاعة مزجاة فأوف لنا الكيل وتصدق علينا إن الله يجزي المتصدقين ﴿٨٨﴾




হরকত সহ:

فَلَمَّا دَخَلُوْا عَلَیْهِ قَالُوْا یٰۤاَیُّهَا الْعَزِیْزُ مَسَّنَا وَ اَهْلَنَا الضُّرُّ وَ جِئْنَا بِبِضَاعَۃٍ مُّزْجٰىۃٍ فَاَوْفِ لَنَا الْکَیْلَ وَ تَصَدَّقْ عَلَیْنَا ؕ اِنَّ اللّٰهَ یَجْزِی الْمُتَصَدِّقِیْنَ ﴿۸۸﴾




উচ্চারণ: ফালাম্মা-দাখালূ‘আলাইহি কা-লূইয়াআইয়ুহাল ‘আযীযুমাছছানা-ওয়াআহলানাদদুররু ওয়া জি’না-ব্বিিদা-‘আতিম মুযজা-তিন ফাআওফি লানাল কাইলা ওয়া তাসাদ্দাক ‘আলাইনা- ইন্নাল্লা-হা ইয়াজযিল মুতাসাদ্দিকীন।




আল বায়ান: অতঃপর যখন তারা ইউসুফের কাছে প্রবেশ করল, তখন বলল, ‘হে আযীয, অভাব-অনটন আমাদেরকে ও আমাদের পরিবারকে স্পর্শ করেছে, আর আমরা তুচ্ছ পুঁজি নিয়ে এসেছি। অতএব, আমাদেরকে মাপে পূর্ণমাত্রায় দিন এবং আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন, নিশ্চয় আল্লাহ অনুগ্রহকারীদের প্রতিদান দেন’।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৮৮. অতঃপর যখন তারা ইউসুফের কাছে উপস্থিত হল তখন তারা বলল, হে আযীয! আমরা ও আমাদের পরিবার-পরিজন বিপন্ন হয়ে পড়েছি এবং আমরা তুচ্ছ পুঁজি নিয়ে এসেছি(১); আপনি আমাদের রসদ পূর্ণ মাত্রায় দিন এবং আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন(২); নিশ্চয় আল্লাহ্‌ অনুগ্রহকারীদের পুরস্কৃত করেন।(৩)




তাইসীরুল ক্বুরআন: যখন তারা ইউসুফের দরবারে উপস্থিত হল, তারা বলল, ‘হে আযীয! আমাদেরকে আর আমাদের পরিবারবর্গকে বিপদে ঘিরে ধরেছে, আর আমরা স্বল্প পুঁজি নিয়ে এসেছি, আমাদেরকে পূর্ণ ওজনের শষ্য দিন আর আমাদেরকে দান খায়রাত করুন। আল্লাহ দানশীলদেরকে পুরস্কৃত করেন।’




আহসানুল বায়ান: (৮৮) যখন তারা তার নিকট উপস্থিত হল[1] তখন বলল, ‘হে আযীয! আমরা ও আমাদের পরিবার-পরিজন বিপন্ন হয়ে পড়েছি[2] এবং আমরা তুচ্ছ পণ্য নিয়ে এসেছি; আপনি আমাদের রসদ পূর্ণ মাত্রায় দিন[3] এবং আমাদেরকে দান করুন; [4] নিশ্চয় আল্লাহ দানীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকেন।’



মুজিবুর রহমান: যখন তারা তার নিকট উপস্থিত হল তখন বললঃ হে আযীয! আমরা ও আমাদের পরিবার পরিজন বিপন্ন হয়ে পড়েছি এবং আমরা তুচ্ছ পণ্য নিয়ে এসেছি; আপনি আমাদের রসদ পূর্ণ মাত্রায় দিন এবং আমাদেরকে দান করুন; আল্লাহ দাতাদেরকে পুরস্কৃত করেন।



ফযলুর রহমান: অতঃপর তারা যখন (আবার) ইউসুফের কাছে গেল তখন বলল, “শাসক মহোদয়! আমরা ও আমাদের পরিবারবর্গ খুব কষ্টে পড়েছি এবং আমরা সামান্য পুঁজি নিয়ে এসেছি। আপনি আমাদেরকে পুরো বরাদ্দ দিন এবং আমাদেরকে সদ্‌কা প্রদান করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সদ্‌কা প্রদানকারীদের প্রতিদান দিয়ে থাকেন।”



মুহিউদ্দিন খান: অতঃপর যখন তারা ইউসুফের কাছে পৌঁছল তখন বললঃ হে আযীয, আমরা ও আমাদের পরিবারবর্গ কষ্টের সম্মুখীন হয়ে পড়েছি এবং আমরা অপর্যাপ্ত পুঁজি নিয়ে এসেছি। অতএব আপনি আমাদের পুরোপুরি বরাদ্দ দিন এবং আমাদের কে দান করুন। আল্লাহ দাতাদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকেন।



জহুরুল হক: তারপর তারা যখন তাঁর দরবারে দাখিল হল তখন বলল -- "ওহে প্রধান! আমাদের ও আমাদের পরিবার-পরিজনের উপরে দুর্দিন এসে পড়েছে, আর আমরা সামান্য দ্রব্যমূল্য নিয়ে এসেছি, সেজন্যে আমাদের পূর্ণমাত্রায় দিন এবং আমাদের প্রতি দানখয়রাত করুন। নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ দানশীলদের পুরস্কার দিয়ে থাকেন।"



Sahih International: So when they entered upon Joseph, they said, "O 'Azeez, adversity has touched us and our family, and we have come with goods poor in quality, but give us full measure and be charitable to us. Indeed, Allah rewards the charitable."



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৮৮. অতঃপর যখন তারা ইউসুফের কাছে উপস্থিত হল তখন তারা বলল, হে আযীয! আমরা ও আমাদের পরিবার-পরিজন বিপন্ন হয়ে পড়েছি এবং আমরা তুচ্ছ পুঁজি নিয়ে এসেছি(১); আপনি আমাদের রসদ পূর্ণ মাত্রায় দিন এবং আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন(২); নিশ্চয় আল্লাহ্– অনুগ্রহকারীদের পুরস্কৃত করেন।(৩)


তাফসীর:

(১) অর্থাৎ ইউসুফ-ভ্রাতারা যখন পিতার নির্দেশ মোতাবেক মিসরে পৌছল এবং আযীযে মিসরের সাথে সাক্ষাত করল, তখন নিতান্ত কাতরভাবে কথাবার্তা শুরু করল। নিজেদের দারিদ্র্যতা ও নিঃস্বতা প্রকাশ করে বলতে লাগলঃ হে আযীয দুর্ভিক্ষের কারণে আমরা পরিবারবর্গ নিয়ে খুবই কষ্টে আছি। এমনকি এখন খাদ্যশস্য কেনার জন্য আমাদের কাছে উপযুক্ত মূল্যও নেই। আমরা অপারগ হয়ে কিছু অকেজো বস্তু খাদ্যশস্য কেনার জন্য নিয়ে এসেছি। আপনি নিজ চরিত্রগুণে এসব অকেজো বস্তু কবুল করে নিন এবং এর পরিবর্তে আমাদেরকে পুরোপুরি খাদ্যশস্য দিয়ে দিন, যা উত্তম মূল্যের বিনিময়ে দেয়া হয়। আগে যেভাবে প্রদান করতেন। [ইবন কাসীর]

বলাবাহুল্য, আমাদের কোন অধিকার নেই। আপনি সদকা মনে করেই দিয়ে দিন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা'আলা সদকাদাতাকে উত্তম পুরস্কার দান করেন। অকেজো বস্তুগুলো কি ছিল, কুরআন ও হাদীসে তার কোন সুস্পষ্ট বর্ণনা নেই। তাফসীরবিদগণের উক্তি বিভিন্নরূপ। [দেখুন, কুরতুবী; ইবন কাসীর] কুরআনে যে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, তা হচ্ছে مُزْجَاةٍ এর আসল অর্থ এমন বস্তু, যা নিজে সচল নয়; বরং জোরজবরদস্তি সচল করতে হয়। [কুরতুবী; ইবন কাসীর]


(২) এখানে সদকা শব্দ দ্বারা কি বোঝানো হয়েছে, এ ব্যাপারে বিভিন্ন মত রয়েছে। কারো কারো মতে এখানে সদকা দ্বারা দানকেই বোঝানো হয়েছে। কারণ, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পূর্বে অন্যান্য নবীদের উপর তা হারাম ছিল না। [ইবন কাসীর] অপর কোন কোন মুফাসসির এখানে সদকা দ্বারা দান উদ্দেশ্য না নেয়ার পক্ষে মত ব্যক্ত করেছেন। তাদের মতে এখানে সদকা শব্দ দ্বারা সত্যিকারের সদকা বোঝানো হয়নি; বরং কারবারে সুযোগ-সুবিধা ও ছাড় দেয়াকেই ‘সদকা’ শব্দ দ্বারা ব্যক্ত করা হয়েছে। কেননা, তারা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে খাদ্যশস্যের সওয়াল করেনি; বরং কিছু অকেজো বস্তু পেশ করেছিল। অনুরোধের সারমর্ম ছিল এই যে, এসব স্বল্প মূল্যের বস্তু রেয়াত করে গ্রহণ করুন। [কুরতুবী]


(৩) আল্লাহ্ তা'আলা সদকাদাতাদেরকে উত্তম প্রতিদান দেন। এ সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ এই যে, সদকার এক প্রতিদান হচ্ছে ব্যাপক, যা মুমিন ও কাফের নির্বিশেষে সবাই দুনিয়াতেই পায় এবং তা হচ্ছে বিপদাপদ দূর হওয়া। অপর একটি প্রতিদান শুধু আখেরাতেই পাওয়া যাবে, অর্থাৎ জান্নাত। এটা শুধু ঈমানদারদের প্রাপ্য। এখানে আযীযে-মিসরকে সম্বোধন করা হয়েছে। ইউসুফ-ভ্রাতারা হয়তবা তখনো পর্যন্ত জানত না যে, তিনি ঈমানদার না কাফের। তাই তারা এমন ব্যাপক বাক্য বলেছে, যাতে ইহকাল ও পরকাল-উভয়কালই বোঝা যায়। এছাড়া এখানে বাহ্যতঃ আযীযে মিসরকে সম্বোধন করে বলা উচিত ছিল যে, আপনাকে আল্লাহ্ তা'আলা উত্তম প্রতিদান দেবেন। কিন্তু তারা হয়ত জানত না যে, আযীযে-মিসর ঈমানদার। তাই সদকাদাতা মাত্রকেই আল্লাহ্ তা'আলা প্রতিদান দিয়ে থাকেন, এরূপ ব্যাপক ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, বিশেষভাবে তিনিই প্রতিদান পাবেন- এমন বলা হয়নি। [কুরতুবী]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৮৮) যখন তারা তার নিকট উপস্থিত হল[1] তখন বলল, ‘হে আযীয! আমরা ও আমাদের পরিবার-পরিজন বিপন্ন হয়ে পড়েছি[2] এবং আমরা তুচ্ছ পণ্য নিয়ে এসেছি; আপনি আমাদের রসদ পূর্ণ মাত্রায় দিন[3] এবং আমাদেরকে দান করুন; [4] নিশ্চয় আল্লাহ দানীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকেন।’


তাফসীর:

[1] তাঁদের মিসর আগমনের এটা তৃতীয় দফা ছিল।

[2] অর্থাৎ শস্য নেবার জন্য আমরা যে পরিমাণ পণ্যমূল্য (পুঁজি) নিয়ে এসেছি, তা অতি অল্প ও নগণ্য।

[3] অর্থাৎ আমাদের অল্প পুঁজির দিকে লক্ষ্য না করে আমাদেরকে এর পরিবর্তে পূর্ণ মাপ দিন।

[4] অর্থাৎ আমাদের এই অল্প পুঁজি গ্রহণ করে আমাদের প্রতি অনুগ্রহ ও খয়রাত করুন। কোন কোন ব্যাখ্যাকারী এর অর্থ করেছেন যে, আমাদের ভাই বিনয়্যামীনকে ছেড়ে দিয়ে আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৮৮-১০১ নং আয়াতের তাফসী:



অতঃপর তৃতীয় দফায় তারা তাদের পিতার নির্দেশক্রমে মিসরে আগমন করল। আগমন করে ইউসুফ (عليه السلام) কে তাদের দুরবস্থার কথা অবগত করণার্থে বলল: হে আযীয, আমাদের খাদ্যাভাবে আমাদের পরিবার বিপন্ন হয়ে গেছে, তাছাড়া আমরা যে অর্থ কড়ি নিয়ে এসেছি তা অতি সামান্য, সুতরাং আমাদের অর্থাভাবের কারণে মালামাল কম না দিয়ে পূর্ণমাত্রায় দেবেন এবং আরো কিছু বেশি দেবেন। কেউ কেউ বলেছেন, (وَتَصَدَّقْ عَلَيْنَا) অর্থাৎ বিনয়ামীনকে আমাদের সাথে যেতে দিয়ে অনুগ্রহ করুন। যখন তারা দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরল, এবং পিতার বার্ধক্য, দুর্বলতা ও পুত্র বিচ্ছেদের আঘাতের কথা বর্ণনা করল তখন ইউসুফ (عليه السلام) এর হৃদয় বিগলিত হয়ে গেল। অশ্র“সিক্ত ভারাক্রান্ত কণ্ঠে তিনি বললেন: তোমরা ইউসুফ ও তাঁর সহোদর ভাই-এর সাথে যে ব্যবহার করেছিলে তা কি তোমাদের স্মরণ আছে? তিনি ভাইদের অপরাধের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার সাথে সাথে উদারতা দেখিয়ে বললেন, তোমরা তখন অজ্ঞ ছিলে। মূলত আল্লাহ তা‘আলার পাপী বান্দারা অজ্ঞই বটে।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(ثُمَّ اِنَّ رَبَّکَ لِلَّذِیْنَ عَمِلُوا السُّوْ۬ئَ بِجَھَالَةٍ ثُمَّ تَابُوْا مِنْۭ بَعْدِ ذٰلِکَ وَاَصْلَحُوْٓا اِنَّ رَبَّکَ مِنْۭ بَعْدِھَا لَغَفُوْرٌ رَّحِیْمٌ)



“যারা অজ্ঞতাবশত মন্দকর্ম করে তারা পরে তাওবাহ করে ও নিজেদেরকে সংশোধন করে নেয় তাদের জন্য তোমার প্রতিপালক অবশ্যই অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা নাহল ১৬:১১৯)



ইউসুফ (عليه السلام) এর মুখ থেকে নিজের বাল্যকালের সকল ঘটনা তুলে ধরলে তারা ইউসুফ (عليه السلام)-কে চিনে ফেলে এবং বলল যে, তুমি কি তাহলে ইউসুফ? উত্তরে তিনি তাঁর পরিচয় প্রকাশ করলেন। সাথে সাথে আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহ, ধৈর্য ও সংযমের শুভ পরিণামের কথা বর্ণনা করে বললেন: তোমরা আমাকে নিঃশেষ করার ষড়যন্ত্রের কোন প্রকার ত্র“টি করোনি, কিন্তু এটা আল্লাহ তা‘আলার দয়া যে, তিনি আমাকে শুধু কূপ থেকে পরিত্রাণ দেননি বরং মিসরের রাজত্বও দান করেছেন। তখন ইউসুফ (عليه السلام) এর ভাইয়েরা সকলেই তাদের ভুল স্বীকার করল। ইউসুফও (عليه السلام) তাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন এবং আল্লাহ তা‘আলার কাছেও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন, আর বললেন: আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই, কোন নিন্দা ও ভর্ৎসনা করা হবে না। মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মক্কার কাফির ও যারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল এমনকি তাঁকে হত্যা করতে চেয়েছিল তাদেরকে একথাই বলে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।



তাদেরকে ইউসুফ (عليه السلام) একটি জামা দিয়ে বললেন: এটা নিয়ে যাও, এটা আমার পিতার মুখমণ্ডলে রাখলেই চোখের জ্যোতি ফিরে আসবে এবং পরিবারের সকলকে মিসরে দাওয়াত দিলেন। এ জামা আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম (عليه السلام) কে দিয়েছিলেন যখন নমরুদ তাঁকে আগুনে নিক্ষেপ করে। ইবরাহীম (عليه السلام) ইসহাককে প্রদান করে, তিনি ইয়া‘কূব (عليه السلام) কে প্রদান করেন। ইয়া‘কূব (عليه السلام) ইউসুফ (عليه السلام) কে পড়িয়ে দেন যাতে কোন প্রকার বদনজর না লাগে। (কুরতুবী) উক্ত জামা নিয়ে মিসর থেকে কাফেলা রওনা হল এবং ওদিকে আল্লাহ তা‘আলা র পক্ষ থেকে ইয়া‘কূব (عليه السلام) এর কাছে মু‘জিযাহস্বরূপ ইউসুফ (عليه السلام) এর সুগন্ধি আসতে লাগল। তাই তিনি বললেন: আমি ইউসুফের সুঘ্রাণ পাচ্ছি। তখন পরিবারের লোকেরা বলল: আপনি এখনো সে পুরাতন ভ্রষ্টতার মাঝেই আছেন। অর্থাৎ ইউসুফ (عليه السلام) কে হারিয়ে ইয়া‘কূব (عليه السلام) মাঝে মাঝেই এরূপ কথা বলতেন যে, আমার মনে হয় ইউসুফ (عليه السلام) বেঁচে আছে, আমি তার সুঘ্রাণ পাচ্ছি।



অতঃপর যখন সুসংবাদদাতা জামাটি নিয়ে এসে ইয়া‘কূব (عليه السلام) এর মুখে রাখল আল্লাহ তা‘আলার রহমতে চোখের দৃষ্টি ফিরে এল। ইয়া‘কূব (عليه السلام) বললেন: ‘আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, আমি আল্লাহর নিকট হতে যা জানি তোমরা তা জান না?’ অর্থাৎ আমি ওয়াহীর মাধ্যমে জানতে পেরেছি ইউসুফ (عليه السلام) বেঁচে আছে, তোমাদের কাছে তো ওয়াহী আসে না তাই তোমরা আমার মত জানো না। তখন ইউসুফ (عليه السلام) এর ভাইয়েরা পিতার নিকটও নিজেদের অপরাধ স্বীকার করল এবং তাদের জন্য আল্লাহ তা‘আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনার জন্য আবেদন করল। ইয়া‘কূব (عليه السلام) অচিরেই ক্ষমা প্রার্থনা করবেন বলে ওয়াদা দিলেন। উদ্দেশ্য হল রাতের শেষ প্রহরে যখন আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন, সে সময়টি দু‘আ কবূলের সময়। তাছাড়া এত বড় অপরাধ করেছে সে জন্য চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন ছিল। তাই তিনি সাথে সাথে ক্ষমা প্রার্থনা না করে অচিরেই ক্ষমা প্রার্থনা করবেন বলে ওয়াদা দিয়েছেন।



অতঃপর তিনি তাঁর ছেলেদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন এবং তারা সকলে ইউসুফ (عليه السلام)-এর উদ্দেশ্যে মিসরে রওনা করলেন, ইউসুফ (عليه السلام) শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে শান্তির অভিবাদন জানিয়ে নিজের কাছে স্থান দিলেন। এমনকি তিনি তাঁর পিতা-মাতাকে রাজার যে আসন সেখানে বসালেন এবং পিতা-মাতা ও সব ভাই ইউসুফ (عليه السلام) এর সম্মানার্থে সিজদায় পড়ে গেলেন।



এখানে সিজদা করা দ্বারা এমনটি মনে করা যাবে না যে, যেহেতু ইউসুফ (عليه السلام) কে তাঁর ভাইয়েরা সিজদা করেছে সেহেতু মানুষকে সিজদা করা যাবে। অতএব কোন মাজারে বা কবরে সিজদা করা কিংবা উচ্চ মর্যাদাস¤পন্ন কোন ব্যক্তিকে সম্মানার্থে সিজদা করা বৈধ। না, এরূপ বৈধ হবে না। কারণ এই সম্মানসূচক সিজদা ইয়া‘কূব (عليه السلام)-এর শরীয়তে বৈধ ছিল কিন্তু শরীয়তে মুহাম্মাদীতে তা হারাম করে দেয়া হয়েছে।



মুআয বিন যাবাল (রাঃ) শাম থেকে ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে সিজদা করলেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন একি মুআয! মুআয (রাঃ) বললেন: আমি শামে গিয়ে দেখলাম, সে দেশের লোকজন তাদের যাজক ও পাদ্রীদেরকে সিজদা করে। তাই আমি মনে মনে চাইলাম যে, আমরাও আপনাকে সিজদা করব। তা শুনে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: খবরদার! তা করো না। কারণ আমি যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করতে আদেশ করতাম তাহলে মহিলাদেরকে বলতাম, তোমরা তোমাদের স্বামীদেরকে সিজদা কর। (ইবনু মাযাহ হা: ১৮৫৩, ইবনু হিববান হা: ৪১৭১, সিলসিলাহ সহীহাহ হা: ১২০৩) অতএব কোন বস্তু বা ব্যক্তিকে সিজদা করা সম্পূর্ণ শির্ক। সিজদা করতে হবে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাকে।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَّاَنَّ الْمَسٰجِدَ لِلہِ فَلَا تَدْعُوْا مَعَ اللہِ اَحَدًا)



“এবং নিশ্চয়ই সিজদার স্থানসমূহ (সমস্ত ইবাদত) একমাত্র আল্লাহর জন্য। সুতরাং আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাউকেও ডেকো না।” (সূরা জিন ৭২:১৮) এ সিজদাই ছিল ইউসুফ (عليه السلام) এর সেই স্বপ্নের ব্যাখ্যা যা আল্লাহ তা‘আলা এতদিন পর বাস্তবে পরিণত করেছেন এবং তাদের বিচ্ছিন্নতার পর পুনরায় আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে একত্রিত করে দিয়েছেন এটা ছিল আল্লাহ তা‘আলা র অনুগ্রহ।



(مِّنَ الْبَدْوِ) মিসরের মত সভ্য এলাকার তুলনায় কেন‘আন একটি মরুভূমির মত এলাকা, তাই তিনি بدو (মরু অঞ্চল) শব্দ ব্যবহার করলেন।



অতঃপর ইউসুফ (عليه السلام) আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করলেন এবং তিনি নিজের জন্য দু‘আ করলেন যাতে তিনি মুসলিম থাকা অবস্থায় ঈমানের সাথে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে পারেন এবং তাকে যেন আল্লাহ তা‘আলা সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত করেন।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. যারা অপরাধ করে তারা মূলত অজ্ঞতাবশতই করে থাকে। তবে এর ব্যতিক্রমও হয় কিন্তু তা খুবই বিরল।

২. কেউ মন্দ ব্যবহার করলেও তাঁর সাথে যতদূর সম্ভব ভাল ব্যবহার করতে হবে। যেমন ইউসুফ (عليه السلام) তাঁর ভাইদের ব্যাপারে করেছিলেন।

৩. আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত কোন ফেরেশতা, জিন, ইনসান ও বস্তুকে সিজদা করা ইসলামী শরীয়তে জায়েয নেই, বরং বড় শির্ক।

৪. নিজের জন্য দু‘আ করা উচিত যাতে ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ করতে পারে ।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৮৭-৮৮ নং আয়াতের তাফসীর

হযরত ইয়াকুব (আঃ) স্বীয় পুত্রদেরকে আদেশ করছেনঃ “হে আমার প্রিয় বৎসগণ! তোমরা এদিক ওদিক গমন কর এবং ইউসুফ (আঃ)ও বিনইয়ামীনের খোঁজ কর।” আরবী ভাষায় (আরবি) শব্দটি ভাল অনুসন্ধান করার ব্যাপারে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আর মন্দ অনুসন্ধানের ব্যাপারে ব্যবহৃত হয় (আরবি) শব্দটি। এর সাথে সাথেই তিনি পুত্রদেরকে বলেন: “আল্লাহর সত্ত্বা থেকে নিরাশ হয়ে যেয়ো না। তাঁর করুণা ও রহমত থেকে কাফিররা ছাড়া আর কেউই নিরাশ হয় না। তোমরা তাদের অনুসন্ধান বন্ধ করে দিয়ো না। আল্লাহর নিকট তোমরা ভাল আশা কর। তোমরা নিজেদের চেষ্টা চালিয়ে যাও।”

পিতার উপদেশ ক্রমে তাঁরা যাত্রা শুরু করে মিসরে পৌঁছে গেলেন। হযরত ইউসুফের (আঃ) সামনে হাজির হয়ে তাঁরা নিজেদের দুরাবস্থার কথা প্রকাশ করলেন। তারা বললেনঃ “দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে আমরা ধ্বংসের মুখোমুখি হয়ে গেছি। আমাদের কাছে এমন কিছুই নেই যার দ্বারা আমরা খাদ্য ক্রয় করতে পারি। আমাদের কাছে খারাপ, মেকী, ত্রুটিযুক্ত এবং মূল্য হতে পারে না, এরূপ সামান্য কিছু রয়েছে। এগুলো নিয়েই আমরা আপনার কাছে এসেছি। যদিও এগুলো খাদ্যের বিনিময় হতে পারে না, তথাপি আমরা কামনা করছি যে, আপনি আমাদেরকে ওগুলোই প্রদান করবেন: যেগুলো সঠিক ও পূর্ণ মূল্যের বিনিময়ে দেয়া হয়ে থাকে। আমরা আশা রাখছি যে, আপনি আমাদের বোঝা পূর্ণ করবেন এবং আমাদের বস্তা ভর্তি করে দেবেন।” হযরত ইবনু মাসউদের (রাঃ) কিরআতে (আরবি) এর স্থলে (আরবি) রয়েছে। অর্থাৎ আপনি আমাদের উট খাদ্য দ্বারা বোঝাই করে দিন।

অথবা ভাবার্থ হচ্ছে : এই খাদ্য আমাদেরকে আমাদের এই মালের বিনিময়ে নয়, বরং দান হিসেবে প্রদান করুন! হযরত সুফইয়ান ইবনু উয়াইনাকে (রাঃ) প্রশ্ন করা হয়ঃ “আমাদের নবীর (সঃ) পূর্বেও কি কোন নবীর উপর সাদকা হারাম ছিল?” উত্তরে তিনি এই আয়াতটিই পাঠ করে দলীল হিসাবে বলেনঃ “না, ইতিপূর্বে অন্য কোন নবীর উপর সাদকা হারাম হয় নাই।”

হযরত মুজাহিদকে (রঃ) প্রশ্ন করা হয়ঃ “কোন ব্যক্তি তার প্রার্থনায় হে আল্লাহ! আমার উপর সাদকা করুন, একথা বলা কি মাকরূহ?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “হ্যাঁ। কেননা, ‘সাদকা’ সেই করে থাকে যে সাওয়াব চায়।”





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।