সূরা ইউসুফ (আয়াত: 6)
হরকত ছাড়া:
وكذلك يجتبيك ربك ويعلمك من تأويل الأحاديث ويتم نعمته عليك وعلى آل يعقوب كما أتمها على أبويك من قبل إبراهيم وإسحاق إن ربك عليم حكيم ﴿٦﴾
হরকত সহ:
وَ کَذٰلِکَ یَجْتَبِیْکَ رَبُّکَ وَ یُعَلِّمُکَ مِنْ تَاْوِیْلِ الْاَحَادِیْثِ وَ یُتِمُّ نِعْمَتَهٗ عَلَیْکَ وَ عَلٰۤی اٰلِ یَعْقُوْبَ کَمَاۤ اَتَمَّهَا عَلٰۤی اَبَوَیْکَ مِنْ قَبْلُ اِبْرٰهِیْمَ وَ اِسْحٰقَ ؕ اِنَّ رَبَّکَ عَلِیْمٌ حَکِیْمٌ ﴿۶﴾
উচ্চারণ: ওয়া কাযা-লিকা ইয়াজতাবীকা রাব্বুকা ওয়া ইউ‘আলিলমুকা মিন তা’বীলিল আহা-দীছিওয়া ইউতিম্মুনি‘মাতাহূ‘আলাইকা ওয়া ‘আলা-আ-লি ইয়া‘কূবা কামাআতাম্মাহা‘আলাআবাওয়াইকা মিন কাবলুইবরা-হীমা ওয়া ইছহা-কা ইন্না রাব্বাকা ‘আলীমুন হাকীম।
আল বায়ান: আর এভাবে তোমার রব তোমাকে মনোনীত করবেন এবং তোমাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দেবেন। আর তোমার উপর ও ইয়াকূবের পরিবারের উপর তাঁর নিআমত পূর্ণ করবেন যেভাবে তিনি তা পূর্বে পূর্ণ করেছিলেন তোমার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম ও ইসহাকের উপর, নিশ্চয় তোমার রব সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৬. আর এভাবে আপনার রব আপনাকে মনোনীত করবেন এবং আপনাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা(১) শিক্ষা দেবেন(২) এবং আপনার প্রতি ইয়াকূবের পরিবার-পরিজনদের উপর তার অনুগ্রহ পূর্ণ করবেন(৩), যেভাবে তিনি এটা আগে পূর্ণ করেছিলেন আপনার পিতৃ-পুরুষ ইবরাহীম ও ইসহাকের উপর।(৪) নিশ্চয় আপনার রব সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়ত।(৫)
তাইসীরুল ক্বুরআন: (স্বপ্নে যেমন দেখেছ) এভাবে তোমার প্রতিপালক তোমাকে মনোনীত করবেন, তোমাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিবেন এবং তিনি তাঁর অনুগ্রহ তোমার প্রতি আর ইয়া‘কূব পরিবারের প্রতি পূর্ণ করবেন যেভাবে তিনি তা পূর্বে তোমার পিতৃ-পুরুষ ইবরাহীম ও ইসহাকের প্রতি পূর্ণ করেছিলেন, নিশ্চয়ই তোমার রব্ব সর্বজ্ঞ, বড়ই প্রজ্ঞাবান।’
আহসানুল বায়ান: (৬) এভাবে[1] তোমার প্রতিপালক তোমাকে মনোনীত করবেন এবং তোমাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দেবেন, আর তোমার প্রতি[2] ও ইয়াকূবের পরিবার-পরিজনের প্রতি[3] তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করবেন, যেভাবে তিনি তোমার পিতৃপুরুষ ইব্রাহীম ও ইসহাকের প্রতি পূর্বে তা পূর্ণ করেছিলেন। তোমার প্রতিপালক সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়।’
মুজিবুর রহমান: এভাবে তোমার রাব্ব তোমাকে মনোনীত করবেন এবং তোমাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিবেন, আর তোমার প্রতি ও ইয়াকূবের পরিবার পরিজনের প্রতি অনুগ্রহ পূর্ণ করবেন যেভাবে তিনি এটা পূর্বে পূর্ণ করেছিলেন তোমার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম ও ইসহাকের প্রতি। নিশ্চয়ই তোমার রাব্ব সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
ফযলুর রহমান: আর এভাবেই তোমার প্রভু তোমাকে মনোনীত করবেন, তোমাকে স্বপ্নের তাবির (তাৎপর্য-ব্যাখ্যা) শেখাবেন এবং তোমার প্রতি ও ইয়াকূবের পরিবার-পরিজনের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করবেন; যেমন তিনি তা ইতিপূর্বে তোমার দুই পূর্বপুরুষ ইবরাহীম ও ইসহাকের প্রতিও পূর্ণ করেছিলেন। নিশ্চয়ই তোমার প্রভু মহাজ্ঞানী, পরম প্রাজ্ঞ।
মুহিউদ্দিন খান: এমনিভাবে তোমার পালনকর্তা তোমাকে মনোনীত করবেন এবং তোমাকে বাণীসমূহের নিগুঢ় তত্ত্ব শিক্ষা দেবেন এবং পূর্ণ করবেন স্বীয় অনুগ্রহ তোমার প্রতি ও ইয়াকুব পরিবার-পরিজনের প্রতি; যেমন ইতিপূর্বে তোমার পিতৃপুরুষ ইব্রাহীম ও ইসহাকের প্রতি পূর্ণ করেছেন। নিশ্চয় তোমার পালনকর্তা অত্যন্ত জ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।
জহুরুল হক: আর এইভাবে তোমার প্রভু তোমাকে মনোনীত করবেন, আর তোমাকে শিক্ষা দেবেন ঘটনাবলীর ব্যাখ্যা সম্পর্কে, আর তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণাঙ্গ করবেন তোমার প্রতি ও ইয়াকুবের বংশধরদের প্রতি, যেমন তিনি তা পূর্ণাঙ্গ করেছিলেন এর আগে তোমার পূর্বপুরুষ ইব্রাহীম ও ইসহাকের প্রতি। নিঃসন্দেহ তোমার প্রভু সর্বজ্ঞাতা, পরমজ্ঞানী।
Sahih International: And thus will your Lord choose you and teach you the interpretation of narratives and complete His favor upon you and upon the family of Jacob, as He completed it upon your fathers before, Abraham and Isaac. Indeed, your Lord is Knowing and Wise."
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৬. আর এভাবে আপনার রব আপনাকে মনোনীত করবেন এবং আপনাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা(১) শিক্ষা দেবেন(২) এবং আপনার প্রতি ইয়াকূবের পরিবার-পরিজনদের উপর তার অনুগ্রহ পূর্ণ করবেন(৩), যেভাবে তিনি এটা আগে পূর্ণ করেছিলেন আপনার পিতৃ-পুরুষ ইবরাহীম ও ইসহাকের উপর।(৪) নিশ্চয় আপনার রব সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়ত।(৫)
তাফসীর:
(১) উপরে বর্ণিত অর্থটি মুজাহিদ ও অন্যান্য তাফসীরকারক বর্ণনা করেছেন। [ইবন কাসীর] কোন কোন মুফাসসির বলেন, এর অর্থ সত্য কথার ব্যাখ্যা। সে হিসেবে আসমানী কিতাবসমূহের সঠিক ব্যাখ্যাও হতে পারে। [সা'দী]
(২) অধিকাংশ মুফাসসির বলেন, আয়াতটি ইয়াকুব আলাইহিস সালাম-এর পূর্ব কথার পরিপূরক বাক্য অর্থাৎ ইয়াকুব আলাইহিস সালাম নিজেই বলছেন, হে ইউসুফ! তুমি তোমার স্বপ্নের কথা তোমার ভাইদের বলো না। কেননা, তারা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে পারে। যেভাবে তুমি স্বপ্নে তোমাকে সম্মানিত দেখেছ, এভাবে আল্লাহ তোমাকে মনোনীত করবেন নবী হিসেবে এবং স্বপ্নের ব্যাখ্যাদাতা হিসেবে। অনুরূপভাবে তোমার উপর তার নেয়ামত পরিপূর্ণ করবেন। [বাগভী; ইবন কাসীর]
অথবা এ আয়াতটি আল্লাহর পক্ষ থেকে ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর প্রতি প্রদত্ত সুসংবাদ অর্থাৎ এখানে আল্লাহ্ তা'আলা ইউসুফ আলাইহিস সালাম-কে কতিপয় নেয়ামত দানের ওয়াদা করেছেন। প্রথম, আল্লাহ স্বীয় নেয়ামত ও অনুগ্রহরাজির জন্য আপনাকে মনোনীত করবেন। মিসর দেশে রাজ্য, সম্মান ধন-সম্পদ লাভের মাধ্যমে এ ওয়াদা পূর্ণতা লাভ করেছে। দ্বিতীয়, আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা সম্পর্কিত জ্ঞান শিক্ষা দেবেন। [কুরতুবী] তবে প্রথম তাফসীরটি বেশী যুক্তিযুক্ত। এ আয়াত থেকে আরো জানা গেল যে, স্বপ্নের ব্যাখ্যা একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্র, যা আল্লাহ তা'আলা কোন কোন ব্যক্তিকে দান করেন। সবাই এর যোগ্য নয়। ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ এ ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। [দেখুন, কুরতুবী]
(৩) তৃতীয় ওয়াদা (وَيُتِمُّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكَ) অর্থাৎ আল্লাহ আপনার প্রতি স্বীয় নেয়ামত পূর্ণ করবেন। এতে নবুওয়াত দানের প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে এবং পরবর্তী বাক্যসমূহেও এর প্রতি ইঙ্গিত আছে। [কুরতুবী; ইবন কাসীর] কেউ কেউ বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, আপনার ভাইদেরকে আপনার প্রতি মুখাপেক্ষী বানাব। আবার কেউ কেউ অর্থ করেছেন, আপনাকে প্রতিটি বিপদ থেকে উদ্ধার করব। [কুরতুবী] তবে আয়াতের পরবর্তী অংশ থেকে বুঝা যায় যে, এখানে নবুওয়াতই বুঝানো হয়েছে।
(৪) অর্থাৎ যেভাবে আমি স্বীয় নবুওয়াতের নেয়ামত আপনার পিতৃ-পুরুষ ইবরাহীম ও ইসহাকের প্রতি ইতিপূর্বে পূর্ণ করেছি। এখানে নেয়ামত বলতে অন্যান্য নেয়ামতের সাথে সাথে নবুওয়াত ও রেসালাতই উদ্দেশ্য। [ইবন কাসীর]
(৫) আয়াতের শেষে বলা হয়েছে (إِنَّ رَبَّكَ عَلِيمٌ حَكِيمٌ) অর্থাৎ আপনার পালনকর্তা অত্যন্ত জ্ঞানবান, সুবিজ্ঞ। তিনি ভাল করেই জানেন কার কাছে ওহী পাঠাবেন, কাকে রাসূল বানাবেন। কে নবুওয়াত ও রিসালাতের অধিক উপযুক্ত। [ইবন কাসীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৬) এভাবে[1] তোমার প্রতিপালক তোমাকে মনোনীত করবেন এবং তোমাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দেবেন, আর তোমার প্রতি[2] ও ইয়াকূবের পরিবার-পরিজনের প্রতি[3] তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করবেন, যেভাবে তিনি তোমার পিতৃপুরুষ ইব্রাহীম ও ইসহাকের প্রতি পূর্বে তা পূর্ণ করেছিলেন। তোমার প্রতিপালক সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়।’
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ যেভাবে তোমাকে তোমার প্রভু বড় মহত্তপূর্ণ স্বপ্ন দেখানোর জন্য বেছে নিয়েছেন, সেইভাবে তোমার প্রভু তোমাকে সম্মান দানে মনোনীত করবেন এবং স্বপ্নের তা’বীর (ব্যাখ্যা) শিখাবেন। تأويل الأحاديث এর প্রকৃত অর্থ হল কথার গভীরে পৌঁছনো। এখানে উদ্দেশ্য হল, স্বপ্নের ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য।
[2] এর উদ্দেশ্য হল নবুঅত; যা ইউসুফ (আঃ)-কে প্রদান করা হয়েছিল। অথবা সেই নেয়ামতসমূহ যা ইউসুফ (আঃ)-কে মিশরে প্রদান করা হয়েছিল।
[3] এর দ্বারা ইউসুফ (আঃ)-এর ভাই, তাঁদের সন্তানাদিকে বুঝানো হয়েছে। যারা পরে আল্লাহর অনুগ্রহের অধিকারী হয়েছিলেন।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৪-৬ নং আয়াতের তাফসীর:
ইউসুফ (عليه السلام) তাঁর পিতা ইয়া‘কূব (عليه السلام)-কে বললেন, হে আমার পিতা! আমি স্বপ্নে দেখেছি এগারটি তারকা আমাকে সিজদা করছে এবং চন্দ্র, সূর্যও সিজদা করছে।
ইবনু আব্বাস ও কাতাদাহ বলেন: এগারটি নক্ষত্র দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ইউসুফ (عليه السلام) এর এগার ভাই এবং সূর্য ও চন্দ্র দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ইউসুফ (عليه السلام)-এর মাতা-পিতা। (কুরতুবী, তাফসীর সাদী, অত্র আয়াতের তাফসীর) বস্তুতঃ এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা বাস্তবায়িত হয় যখন ইউসুফ (عليه السلام)-এর পিতা-মাতাসহ সব ভায়েরা মিসরে গিয়ে তাঁর সামনে সিজদাবনত হয়। যা অত্র সূরার ৯৯-১০০ নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, স্বপ্ন ব্যাখ্যা করা জ্ঞানের অন্যতম একটি শাখা। ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়া‘কূব (عليه السلام) সকলে এ বিষয়ে পারদর্শী ছিলেন। ইউসুফ (عليه السلام) কেও আল্লাহ তা‘আলা স্বপ্ন ব্যাখ্যা করার জ্ঞান দান করেছিলেন। যা ৬ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে।
ইউসুফ (عليه السلام)-এর স্বপ্নের কথা শুনে ইয়া‘কূব (عليه السلام) বুঝতে পারলেন যে, তাঁর এই পুত্র মহা সম্মানের অধিকারী হবে এবং নবুওয়াতের ধারা তাঁর কাছে পৌঁছবে। তাই তিনি ইউসুফ (عليه السلام) কে এই স্বপ্নের কথা তাঁর ভাইদের কাছে প্রকাশ করতে নিষেধ করলেন। কারণ তাঁর ভাইয়েরা যখন এ স্বপ্নের কথা শুনবে তখন তারা এ মর্যাদার কথা বুঝতে পারবে। আর এ মর্যাদার কথা বুঝতে পেরে ইউসুফ (عليه السلام) এর কোন ক্ষতি সাধন করতে পারে, যার ফলে তিনি এ স্বপ্ন প্রকাশ করতে নিষেধ করলেন।
এ আয়াত প্রমাণ করে স্বপ্নের কথা সকলের কাছে বলা যাবে না, কেবল যাকে নিজের কল্যাণকামী বা একনিষ্ঠ মনে হবে তাদের কাছেই বলা উচিত। হাদীসে এসেছে: ভাল স্বপ্ন আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে, যখন তোমাদের কেউ ভাল স্বপ্ন দেখবে তখন যেন তার প্রিয় ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারো কাছে না বলে। অন্য বর্ণনায় এসেছে, জ্ঞানী অথবা কল্যাণকামীর কাছে বলবে। আর যদি অপছন্দনীয় কিছু দেখে তাহলে তার অনিষ্ট থেকে আল্লাহ তা‘আলার কাছে আশ্রয় চাইবে, তিন বার থুথু ফেলবে। অন্য বর্ণনাতে পার্শ্ব পরিবর্তন করে বাম দিকে শয়নের কথা বলা হয়েছে। এবং তা কারো কাছে বর্ণনা করবে না, এতে তা সে ব্যক্তির ক্ষতি করবে না। (সহীহ বুখারী হা: ৭০৪৪, সহীহ মুসলিম হা: ২২৬১)
ইউসুফ (عليه السلام) কে পিতা তাঁর ভাইদের ষড়যন্ত্রের কারণও বলে দিলেন যে, শয়তান যেহেতু মানুষের চিরশত্র“ সেহেতু সে মানুষকে ভ্রষ্ট ও হিংসা-বিদ্বেষে নিমজ্জিত করার সুযোগ খোঁজে। বলা বাহুল্য, এটা শয়তানের জন্য একটি সুবর্ণ সুযোগ ছিল যে, ইউসুফ (عليه السلام) এর বিরুদ্ধে ভাইদের মনে হিংসা বিদ্বেষের আগুন জ্বালিয়ে দেয়া। যেমন পরবর্তী জীবনে ইউসুফ (عليه السلام) তার ভাইদের চক্রান্তের শিকার হয়েছিলেন।
ইউসুফ (عليه السلام) এর স্বপ্নের মর্মার্থ বুঝতে পেরে ইয়া‘কূব (عليه السلام) আরো বললেন, তোমার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়া‘কূবকে যেভাবে নবুওয়াতের জন্য মনোনীত করেছেন, স্বপ্ন ব্যাখ্যার জ্ঞান দান করেছেন এবং নেয়ামত দিয়েছেন সেভাবেই তোমার প্রতিপালক তোমাকে নবুওয়াতের জন্য মনোনীত করবেন, স্বপ্ন ব্যাখ্যার জ্ঞান দান করবেন এবং নেয়ামতকে পূর্ণ করবেন। মূলতঃ অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ইউসুফ (عليه السلام) কে তিনটি নেয়ামতের সুসংবাদ দিয়েছেন (১) আল্লাহ তা‘আলা তাকে নাবী হিসেবে মনোনীত করবেন, (২) স্বপ্ন ব্যাখ্যা করার জ্ঞান দান করবেন, (৩) তার প্রতি স্বীয় নেয়ামত পূর্ণ করবেন। ফলে ইউসুফ (عليه السلام) স্বপ্নের ব্যাখ্যায় পারদর্শী ছিলেন, যেমন মিসরের বাদশার স্বপ্নের ব্যাখ্যা করে দিয়েছিলেন যা অত্র সূরার ৪১ ও ৪৭-৪৯ নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। আর এখানে যে নেয়ামতের কথা বলা হয়েছে তা দ্বারা দুটি উদ্দেশ্য হতে পারে (১) নবুওয়াত যা ইউসুফ (عليه السلام)-কে প্রদান করা হয়েছিল; যেমন আয়াতের পরের অংশ প্রমাণ করছে যে, ‘যেভাবে তিনি এটা পূর্বে পূর্ণ করেছিলেন তোমার পিতৃ-পুরুষ ইব্রাহীম ও ইস্হাকের প্রতি’ তাদের প্রতি যে নেয়ামত পরিপূর্ণ করে দেয়া হয়েছিল তা হল নবুওয়াত। (২) সেই নেয়ামতসমূহ যা ইউসুফ (عليه السلام)-কে মিসরে প্রদান করা হয়েছিল। আল্লাহ তা‘আলাই এ ব্যাপারে ভাল জানেন।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. পিতা সন্তানদের লালন-পালন করবেন, সন্তানদের মধ্য হতে যার মাঝে জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা ও বুঝার যোগ্যতা অনুভব করবেন তার ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্বারোপ করবেন।
২. সত্য স্বপ্ন আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে। ইউসুফ (عليه السلام) সত্য স্বপ্ন দেখেছেন, ফলে তাঁর পিতা স্বপ্নের কথা ভাইদের কাছে বর্ণনা করতে নিষেধ করেছেন। ভাল স্বপ্ন প্রিয় মানুষের কাছে প্রকাশ করা যাবে, তবে মন্দ স্বপ্ন প্রকাশ করা ঠিক নয়।
৩. আল্লাহ তা‘আলা ইউসুফ (عليه السلام)-কে স্বপ্নের সঠিক ব্যাখ্যা শিক্ষা দিয়েছিলেন।
৪. কল্যাণার্থে নেয়ামত প্রকাশ না করে গোপন রাখা বৈধ। এজন্য ইউসুফ (عليه السلام) এর পিতা স্বপ্নের কথা কাউকে বলতে নিষেধ করেছেন। অথচ এখানে স্বপ্ন একটি নেয়ামত ছিল।
৫. শয়তান সহোদর ভাইদের মাঝেও প্রবেশ করে তাদের অন্তরে পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে পারে, ফলে ভাইরা পরস্পরের প্রতি দয়াদ্র হওয়া সত্ত্বেও শত্র“তে পরিণত হয়।
৬. কেউ কারো কাছে স্বপ্নের কথা বললে উত্তম দিকনির্দেশনা দেয়া উচিত।
৭. পিতা সব সন্তানদের প্রতি ন্যায়-নীতি অবলম্বন করবেন, যদিও কোন সন্তানকে অধিক পরিমাণ গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজন হয় তাহলে তা পিতা প্রকাশ করবেন না। কারণ ভাইদের মাঝে বিদ্বেষের কারণ হতে পারে।
৮. একটি উত্তম পরিবার থেকে উত্তম সন্তানের আশা করা যায়। যেমন পিতা ইয়া‘কূব তেমনি সন্তান ইউসুফ (عليه السلام)।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: আল্লাহ তাআ’লা হযরত ইয়াকুবের (আঃ) উক্তির সংবাদ দিচ্ছেন, যে উক্তি তিনি তাঁর পূত্র হযরত ইউসুফের (আঃ) ব্যাপারে করেছিলেন। তিনি তাঁর পুত্রকে বলেছিলেনঃ বৎস! যেমনভাবে আল্লাহ তাআ’লা তোমাকে মনোনীত করেছেন যে, স্বপ্নে তোমাকে এই তারকাগুলি, সূর্য এবং চন্দ্রকে তোমার প্রতি সিজদাবনত অবস্থায় দেখিয়েছেন, তেমনিভাবে তিনি তোমাকে নুবওয়াতের উচ্চ মর্যাদাও দান করবেন এবং তোমাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিবেন। আর তিনি তোমার প্রতি তাঁর নিয়ামত পূর্ণ করবেন অর্থাৎ তোমাকে রাসূলরূপে প্রেরণ করবেন এবং তোমার প্রতি ওয়াহী পাঠাবেন। যেমন তিনি ইতিপূর্বে তাঁর খলীল বা দোস্ত ইবরাহীমের (আঃ) প্রতি ও ইসহাকের (আঃ) প্রতি ওয়াহী পাঠিয়েছিলেন ও নুবওয়াত দান করেছিলেন, যাঁরা ছিলেন তোমার পিতামহ ও প্রপিতামহ। নুবওয়াতের যোগ্য কে বা কারা তা আল্লাহ তাআ’লা ভালরূপেই অবগত রয়েছেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।