আল কুরআন


সূরা ইউসুফ (আয়াত: 43)

সূরা ইউসুফ (আয়াত: 43)



হরকত ছাড়া:

وقال الملك إني أرى سبع بقرات سمان يأكلهن سبع عجاف وسبع سنبلات خضر وأخر يابسات يا أيها الملأ أفتوني في رؤياي إن كنتم للرؤيا تعبرون ﴿٤٣﴾




হরকত সহ:

وَ قَالَ الْمَلِکُ اِنِّیْۤ اَرٰی سَبْعَ بَقَرٰتٍ سِمَانٍ یَّاْکُلُهُنَّ سَبْعٌ عِجَافٌ وَّ سَبْعَ سُنْۢبُلٰتٍ خُضْرٍ وَّ اُخَرَ یٰبِسٰتٍ ؕ یٰۤاَیُّهَا الْمَلَاُ اَفْتُوْنِیْ فِیْ رُءْیَایَ اِنْ کُنْتُمْ لِلرُّءْیَا تَعْبُرُوْنَ ﴿۴۳﴾




উচ্চারণ: ওয়া কা-লাল মালিকুইন্নীআরা-ছাব‘আ বাকারা-তিন ছিমা-নিইঁ ইয়া’কুলুহুন্না ছাব‘উন ‘ইজাফুওঁ ওয়া ছাব‘আ ছুমবুলা-তিন খুদরিওঁ ওয়া উখারা ইয়া-বিছা-তিন ইয়াআইয়ুহাল মালাউ আফতূনী ফী রু’ইয়া-ইয়া ইন কুনতুম লিররু’ইয়া-তা‘বুরূন।




আল বায়ান: আর বাদশাহ বলল, ‘আমি স্বপ্নে দেখছি, সাতটি মোটা তাজা গাভী, তাদের খেয়ে ফেলছে সাতটি ক্ষীণকায় গাভী এবং সাতটি সবুজ শীষ ও অপর সাতটি শুষ্ক। হে পারিষদবর্গ, তোমরা আমাকে আমার স্বপ্ন সম্বন্ধে ব্যাখ্যা দাও যদি তোমরা স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিয়ে থাক’।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪৩. আর রাজা বলল, আমি স্বপ্নে দেখলাম, সাতটি মোটাতাজা গাভী, তাদেরকে সাতটি দুর্বল গাভী খেয়ে ফেলছে এবং দেখলাম সাতটি সবুজ শীষ ও অপর সাতটি শুষ্ক। হে সভাষদগণ! যদি তোমরা স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে পার তবে আমার স্বপ্ন সম্বন্ধে অভিমত দাও।




তাইসীরুল ক্বুরআন: রাজা বললেন, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম সাতটি হৃষ্টপুষ্ট গাভী, সাতটি জীর্ণশীর্ণ গাভী তাদেরকে খাচ্ছে। (আর দেখলাম) সাতটি সবুজ সতেজ শীষ আর অন্য সাতটি শুকনো। ওহে সভাষদগণ! আমার কাছে তোমরা আমার স্বপ্নের ব্যাখ্যা কর যদি তোমরা ব্যাখ্যা করতে পার।’




আহসানুল বায়ান: (৪৩) রাজা বলল, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম, সাতটি স্থূলকায় গাভী; ওগুলিকে সাতটি শীর্ণকায় গাভী ভক্ষণ করছে এবং সাতটি সবুজ শীষ ও অপর সাতটি শুষ্ক। হে প্রধানগণ! যদি তোমরা স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে পার তাহলে আমার স্বপ্ন সম্বন্ধে অভিমত দাও।’



মুজিবুর রহমান: বাদশাহ বললঃ আমি স্বপ্নে দেখলাম, সাতটি স্থূলকায় গাভী, ওগুলিকে সাতটি শীর্ণকায় গাভী ভক্ষণ করছে এবং সাতটি সবুজ শীষ এবং অপর সাতটি শুস্ক। হে প্রধানগণ! যদি তোমরা স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে পার তাহলে আমার স্বপ্ন সম্বন্ধে অভিমত দাও।



ফযলুর রহমান: (মিসরের) রাজা বলল, “আমি (স্বপ্নে) দেখলাম সাতটি মোটাতাজা গরু, যেগুলোকে সাতটি শীর্ণকায় গরু খেয়ে ফেলছে। আরও (দেখলাম) শস্যের সাতটি সবুজ শিষ ও অপর সাতটি শুকনো শিষ। হে পারিষদবর্গ! তোমরা স্বপ্নের তাবির জানলে আমাকে আমার স্বপ্নের তাৎপর্য বলে দাও।”



মুহিউদ্দিন খান: বাদশাহ বললঃ আমি স্বপ্নে দেখলাম, সাতটি মোটাতাজা গাভী-এদেরকে সাতটি শীর্ণ গাভী খেয়ে যাচ্ছে এবং সাতটি সবুজ শীষ ও অন্যগুলো শুষ্ক। হে পরিষদবর্গ! তোমরা আমাকে আমার স্বপ্নের ব্যাখ্যা বল, যদি তোমরা স্বপ্নের ব্যাখ্যায় পারদর্শী হয়ে থাক।



জহুরুল হক: আর রাজা বললেন -- "আমি নিশ্চয়ই দেখলাম সাতটি হৃস্পুষ্ট গরু, তাদের খেয়ে ফেলল সাতটি জীর্ণশীর্ণ, আর সাতটা সবুজ শীষ আর অপর শুক্‌নো। ওহে প্রধানগণ! আমার স্বরে তাৎপর্য আমাকে বলে দাও যদি তোমরা স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে পারো।"



Sahih International: And [subsequently] the king said, "Indeed, I have seen [in a dream] seven fat cows being eaten by seven [that were] lean, and seven green spikes [of grain] and others [that were] dry. O eminent ones, explain to me my vision, if you should interpret visions."



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৪৩. আর রাজা বলল, আমি স্বপ্নে দেখলাম, সাতটি মোটাতাজা গাভী, তাদেরকে সাতটি দুর্বল গাভী খেয়ে ফেলছে এবং দেখলাম সাতটি সবুজ শীষ ও অপর সাতটি শুষ্ক। হে সভাষদগণ! যদি তোমরা স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে পার তবে আমার স্বপ্ন সম্বন্ধে অভিমত দাও।


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৪৩) রাজা বলল, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম, সাতটি স্থূলকায় গাভী; ওগুলিকে সাতটি শীর্ণকায় গাভী ভক্ষণ করছে এবং সাতটি সবুজ শীষ ও অপর সাতটি শুষ্ক। হে প্রধানগণ! যদি তোমরা স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে পার তাহলে আমার স্বপ্ন সম্বন্ধে অভিমত দাও।’


তাফসীর:

-


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৪২-৫২ নং আয়াতের তাফসীর:



(وَقَالَ لِلَّذِیْ ظَنَّ اَنَّھ۫ نَاجٍ مِّنْھُمَا....)



ইউসুফ (عليه السلام) তাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা করার পর দুজনের যে ব্যক্তি মুক্তি লাভ করবে অর্থাৎ জেল থেকে মুক্তি পেয়ে পুনরায় বাদশাকে শরাব পান করানোর দায়িত্বে নিযুক্ত হবে তাকে বললেন: তোমার মালিকের নিকট (অর্থাৎ বাদশাহর কাছে) আমার বিষয়টি আলোচনা করবে যাতে তিনি জানতে পারেন যে, আমি অন্যায়ভাবে জেলে বন্দী হয়ে আছি। ফলে আমার মুক্তির ব্যবস্থা করবে। কিন্তু সে যখন মুক্তি পেল তখন ইউসুফ (عليه السلام) এর ব্যাপারে বাদশার নিকট আলোচনা করতে ভুলে গেল, আর ভুলিয়ে দেয়াটা মূলতঃ শয়তানেরই কাজ ছিল। যার ফলে ইউসুফ (عليه السلام) কে কারারুদ্ধ অবস্থায় কয়েক বছর জেলখানায় অবস্থান করতে হয়েছে।



(بِضْعَ سِنِیْنَ) - আয়াতে بضع যে শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছেঅ। তা মূলত তিন থেকে নয় পর্যন্ত সংখ্যাকে বুঝায়। যার ফলে ইউসুফ (عليه السلام) কত বছর কারারুদ্ধ ছিলেন তা সঠিকভাবে বলা যায় না। অধিকাংশ তাফসীরবিদগণ বলেছেন, সাত বছর জেলখানায় ছিলেন।



(وَقَالَ الْمَلِکُ اِنِّیْٓ اَرٰی سَبْعَ بَقَرٰتٍ سِمَانٍ..... وَاَنَّ اللہَ لَا یَھْدِیْ کَیْدَ الْخَا۬ئِنِیْنَ)



অত্র আয়াগুলোতে মিসরের বাদশার স্বপ্ন ও ইউসুফ (عليه السلام) কর্তৃক এর ব্যাখ্যা দান এবং কারাগার থেকে মুক্তির মাধ্যম সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে।



মিসরের বাদশা একটি স্বপ্ন দেখলেন এবং এটিই ছিল আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে ইউসুফ (عليه السلام) এর জেলখানা থেকে মুক্তির অসীলা। বাদশা তার সভাসদগণকে ডেকে বললেন: আমি স্বপ্নে দেখতে পেলাম সাতটি মোটা-তাজা গাভীকে সাতটি জীর্ণশীর্ণ (হালকা) গাভী খেয়ে ফেলছে এবং আরো দেখতে পেলাম সাতটি সবুজ শীষ আর অপর সাতটি শুষ্ক। বাদশা স্বপ্নের কথা বর্ণনা করার পর যারা স্বপ্নের ব্যাখ্যায় পারদর্শী এমন সব মুআব্বির, জ্যোতিষী ও গণকদের কাছে সঠিক ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন। কিন্তু তারা সকলেই অপারগতা প্রকাশ করল এবং বাদশাকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য বলল, এটা কোন ব্যাখ্যাযোগ্য স্বপ্ন নয়; বরং এটা (اَضْغَاثُ اَحْلَامٍ) বা কল্পনা প্রসূত মনের খেয়াল মাত্র। أَضْغَاثُ শব্দটি ضغث এর বহুবচন, অর্থ ঘাসের গোছা। أَحْلَامٍ শব্দটি حُلم এর বহুবচন যার অর্থ স্বপ্ন। অর্থাৎ এমন স্বপ্ন যার কোন অর্থ নেই, কল্পনাপ্রসূত মনের খেয়াল। কিন্তু বাদশা তাতে স্বস্তি পান পেলেন না। এমন সময় কারামুক্ত ইউসুফ (عليه السلام)-এর সেই সঙ্গী যাকে বলেছিলেন, তোমাদের একজন মুক্তি পেয়ে আবার বাদশার সরাব পান করানোর দায়িত্ব পাবে এবং এ কথাও বলেছিলেন, বাদশার কাছে আমার কথা বলিও সে এত দিন ভুলে গিয়েছিল, তখন ইউসুফ (عليه السلام) এর কথা তার স্মরণ হল। সে বাদশার কাছে ইউসুফ (عليه السلام) এর কথা উল্লেখ করল এবং এ কথাও বলল, জেলে থাকাকালে আমি ও আমার সঙ্গী (যাকে শূলিবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে) স্বপ্ন দেখেছিলাম। তিনি আমাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা করেছিলেন যা বাস্তবায়িত হয়েছে। উক্ত খাদেম কারাগারে যাবার অনুমতি তলব করলে বাদশা ইউসুফের কাছে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানার জন্য উক্ত খাদেমকে কারাগারে পাঠালেন। উক্ত খাদেম স্বপ্নের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরে ব্যাখ্যা সম্পর্কে জানতে চাইলে ইউসুফ (عليه السلام) তাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানিয়ে দিলেন। তিনি বললেন: ‘সাতটি মোটা-তাজা গাভী’ দ্বারা উদ্দেশ্য হল সাত বছর ভাল ফসল হবে, আর ‘সাতটি শীর্ণকায় গাভী’ দ্বারা উদ্দেশ্য হল সাত বছর দুর্ভিক্ষ হবে। অনুরূপ ‘সাতটি সবুজ শীষ’ দ্বারা উদ্দেশ্য হল সাত বছর ভাল ফসল হবে, এমনকি ফসলে মাঠ সবুজ শ্যামলে পরিণত হবে। আর অপর ‘সাতটি শুষ্ক শীষ’ দ্বারা উদ্দেশ্য হল কোন ফসল উৎপন্ন হবে না। এ ব্যাখ্যা দেয়ার সাথে সাথে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে তাও বলে দিলেন। তিনি বললেন: ধারাবাহিকভাবে সাত বছর ভালভাবে চাষাবাদ করবে এবং যে শস্য উৎপন্ন হবে তা কেটে যতটুকু খাওয়ার তা বাদে সব শীষসহ জমা করে রাখবে যাতে শস্য ভালভাবে সংরক্ষিত থাকে, নষ্ট না হয়। অতঃপর এ সাতটি ভাল বছরের পর সাতটি কঠিন দুর্ভিক্ষের বছর আসবে, তখন এ জমাকৃত খাদ্য কাজে লাগবে, ফসল না হলেও এগুলো খেয়ে দুর্ভিক্ষের সাত বছর অতিক্রম করতে পারবে।



(مِّمَّا تُحْصِنُوْنَ)



অর্থাৎ শস্যবীজ যা পুনরায় চাষ করার জন্য সংরক্ষণ করে রাখা হয়। এ শস্যবীজ ব্যতীত দুর্ভিক্ষের সাত বছর জমাকৃত সব খাদ্য শেষ হয়ে যাবে।



(ثُمَّ يَأْتِيْ مِنْم بَعْدِ ذٰلِكَ)



অর্থাৎ এ দুর্ভিক্ষের সাত বছর অতীত হয়ে যাওয়ার পর প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে, ফলে প্রচুর ফসল উৎপন্ন হবে এবং তোমরা আঙুর থেকে রস বের করবে, যায়তুন থেকে তেল বের করবে এবং চতুষ্পদ জন্তু থেকে দুধ দোয়াবে। বাদশা এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা শুনে বুঝতে পারলেন এটাই সঠিক ব্যাখ্যা। তাই তিনি কর্মচারীদেরকে বললেন: তাঁকে (ইউসুফকে) নিয়ে এসো। আগত দূত ইউসুফ (عليه السلام)-কে বলল, বাদশা আপনাকে ডেকেছেন। ইউসুফ (عليه السلام) বললেন, তোমার রব তথা বাদশার কাছে ফিরে যাও এবং জিজ্ঞেস কর, যে মহিলারা তাদের হাত কেটে ফেলেছিল তাদের বিষয়টি কী? ইউসুফ (عليه السلام) ধৈর্যের পরিচয় দিলেন এবং আত্মমর্যাদাবোধের দিকে লক্ষ্য করলেন। যেখানে বাদশা মুক্তি দিয়ে তার কাছে যেতে বলেছেন সেখানে তিনি বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ নিতে পারতেন, কিন্তু তিনি চাচ্ছিলেন তাকে যে অপবাদ দেয়া হয়েছে তা থেকে সকলের সামনে পবিত্রতা প্রমাণিত হোক।



রাসূলুল্লাহ বলেছেন: যদি আমি অতদিন কারাগারে থাকতাম যতদিন ইউসুফ (عليه السلام) ছিলেন, তাহলে বাদশার দূত প্রথমবার আসার সাথে সাথে আমি তার প্রস্তাব গ্রহণ করতাম। এ কথা বলার পর তিনি ৫০ নং আয়াতটি তেলাওয়াত করেন। (তিরমিযী হা: ৩১১৬, সহীহ)



কারাগার থেকে পাঠানো ইউসুফ (عليه السلام) এর দাবী অনুযায়ী মহিলাদের কাছে বাদশা ঘটনার তদন্ত করলেন। বাদশা সেসব মহিলাকে দরবারে ডাকলেন, তারা প্রকৃত ঘটনা খুলে বলল এবং ইউসুফ (عليه السلام) যে নির্দোষ এ কথা স্বীকার করল। তখন আযীযের স্ত্রী যুলাইখাও স্বীকার করল যে, এখন সত্য সুস্পষ্ট হয়ে গেছে, আমিই তাকে অপকর্ম করার জন্য আহ্বান করেছিলাম, সে নিজেকে সংযত রেখেছে, সে নির্দোষ, সে সত্যবাদী। পরিশেষে ইউসুফ (عليه السلام) সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে জেলখানা থেকে বেরিয়ে এলেন। আর তিনি বাদশার সামনে মহিলাদের এ স্বীকারোক্তির ব্যবস্থা এ জন্য করেছিলেন যাতে যুলাইখার স্বামী জেনে নেয়, তার অনুপস্থিতিতে তিনি কোন খেয়ানত করেননি। বরং তিনি তার আমানত রক্ষা করেছেন।



(وَمَآ أُبَرِّئُ نَفْسِيْ)



‘আমি নিজেকে নির্দোষ মনে করি না’ এটা ইউসুফ (عليه السلام) এর কথাও হতে পারে, তাহলে এটা তাঁর পক্ষ থেকে আত্মবিনয়ের বহিঃপ্রকাশ হবে। কেননা এটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি অপবাদ থেকে পবিত্র। পক্ষান্তরে যুলাইখার কথাও হতে পারে, তবে এটাই সম্ভাবনা বেশি, কারণ সে নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করেছে। যার ফলেই সে বলছে, আমি নিজেকে নির্দোষ মনে করি না, কারণ মানুষের অন্তর খারাপ কাজ প্রবণ। তবে আল্লাহ তা‘আলা যাকে রহম করেন সে ব্যতীত।



সুতরাং এমন আত্মা যা খারাপ কাজের প্রতি ঝুঁকে পড়ে তা থেকে আল্লাহ তা‘আলার কাছে আশ্রয় চাইতে হবে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. যারা শত প্রতিকূল পরিবেশেও আল্লাহ তা‘আলার আদেশ নিষেধ মেনে চলেন তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা উচ্চ মর্যাদায় আসীন করেন।

২. ধৈর্য ধারণ করার ফযীলত সম্পর্কে জানা গেল। সুতরাং কোন বিষয়ে তাড়াহুড়া করা উচিত নয়।

৩. মানুষের মন সর্বদা খারাপ কাজের দিকেই ধাবিত হয়। তবে যার প্রতি আল্লাহ তা‘আলা রহম করেন সে ব্যতীত।

৪. খারাপ কাজ প্রবণ অন্তর থেকে আল্লাহ তা‘আলার কাছে আশ্রয় চাইতে হবে।

৫. উক্ত আয়াত অর্থনীতি ও সম্পদ সংরক্ষণের মূলনীতি।

৬. উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা বিপদ মুক্তির চেয়ে আপতিত অপবাদ মুক্তিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।

৭. এখানে তাদের জন্য বড় শিক্ষা নিহিত রয়েছে যারা অপরের বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন। আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে নারীদের চক্রান্ত থেকে সাবধান থাকবেন।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৪৩-৪৯ নং আয়াতের তাফসীর

আল্লাহ তাআ’লা এটা নির্ধারণ করে রেখেছিলেন যে, হযরত ইউসুফ (আঃ) অত্যন্ত মর্যাদা, সম্মানজনক মুক্তি ও পবিত্রতার সাথে কারাগার হতে বের হয়ে আসবেন। এ জন্যেই মহান আল্লাহ এই কারণ বানিয়ে দিলেন যে, মিসরের বাদশাহ এক স্বপ্ন দেখলেন, যার ফলে তিনি কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়লেন। তিনি দরবার ডাকলেন এবং সমস্ত সভাসদ, যাদুকর, জ্যোতিষী এবং স্বপ্নের ব্যাখ্যাকারীকে একত্রিত করলেন। তাদের সামনে তিনি নিজের স্বপ্নের বর্ণনা দিলেন এবং ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন। কিন্তু কেউই কিছুই বুঝলো না এবং সবাই অপারগ হয়ে এটাকে এড়িয়ে যেতে চাইলো। তাই তারা বললো: “এটা কোন ব্যাখ্যা যোগ্য স্বপ্ন নয়। এটা শুধু এলোমেলো খেয়াল মাত্র। আমরা এগুলির ব্যাখ্যা জানি না।” ঐ সময় শাহী সুরা পরিবেশনকারীর হযরত ইউসুফের (আঃ) কথা মনে পড়ে গেল। তার স্মরণ হয়ে গেল যে, তিনি স্বপ্নের ব্যখ্যা দানে বিশেষ অভিজ্ঞ। এই বিদ্যায় তাঁর খুবই পারদর্শিতা রয়েছে। এটা ছিল ঐ ব্যক্তি যে হযরত ইউসুফের (আঃ) সাথে কারাগারে অবস্থান করেছিল এবং তার সাথে তার এক সঙ্গীও ছিল। এই লোকটিকেই হযরত ইউসুফ (আঃ) বলেছিলেন যে, সে যেন বাদশাহর কাছে তার কথা আলোচনা করে। কিন্তু শয়তান তাকে ঐ কথা ভুলিয়ে দিয়েছিল। এই দীর্ঘদিন পরে তার সে কথা স্মরণ হলো। সে দরবারের সবারই সামনে এসে বলেঃ “এই স্বপ্নের সঠিক ব্যাখ্যা জানবার আপনাদের আগ্রহ থাকলে আমাকে কারাগারে হযরত ইউসুফের (আঃ) কাছে হাজির হওয়ার অনুমতি দিন। আমি তাঁর কাছে গিয়ে তাঁকে এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করবো।” সবাই তার প্রস্তাবে সম্মত হলো এবং তাকে হযরত ইউসুফের (আঃ) নিকট পাঠিয়ে দিলো।

(আরবি) শব্দটি অন্য পঠনে (আরবি) রয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে ভুলে যাওয়া। অর্থাৎ ভুলে যাওয়ার পর তার স্মরণ হলো।

দরবারের লোকদের কাছে অনুমতি নিয়ে লোকটি হযরত ইউসুফের (আঃ) নিকট হাজির হলো এবং বললো: “হে সত্যবাদী ইউসুফ (আঃ) বাদশাহ এই ধরণের একটি স্বপ্ন দেখেছেন এবং এর ব্যাখ্যা জানতে তিনি খুবই আগ্রহী। রাজদরবার লোকে ভরপুর রয়েছে। তারা অধীরভাবে আমার পথ পানে চেয়ে আছে। দয়া করে আপনি আমাকে এর ব্যাখ্যা বলে দিন যাতে আমি ফিরে গিয়ে তাদেরকে এটা অবহিত করতে পারি।” হযরত ইউসুফ (আঃ) তাকে কোন ভৎর্সনা করলেন না যে, সে এতোদিন পর্যন্ত তাঁর কথা ভুলে গিয়েছিল এবং বাদশাহর সামনে তাঁর কথা আলোচনা করে নাই। সে বাদশাহর কাছে এ আবেদনও করে নাই যে, তাঁকে কারাগার হতে মুক্তি দেয়া হোক! তিনি তার কাছে কোন আশা প্রকাশও করলেন না। এবং তাকে দোষারোপও করলেন না, বরং বিনা বাক্য ব্যয়ে বাদশাহর স্বপ্নের পূর্ণ তাৎপর্য বর্ণনা করলেন এবং সাথে সাথে তদবীরও বলে দিলেন। সাতটি স্থূলকায় গাভী দ্বারা উদ্দেশ্য এই যে, সাত বছর পর্যন্ত প্রয়োজন মোতাবেক বরাবর বৃষ্টি বর্ষিত হতে থাকবে। গাছে খুবই ফল ধরবে এবং জমিতে প্রচুর ফসল উৎপন্ন হবে। সাতটি সবুজ শীষ দ্বারা উদ্দেশ্য এটাই। গাভী ও বলদকেই হালে জুড়ে দেয়া হয় এবং ওগুলি দ্বারাই জমিতে চাষ করা হয়। তিনি প্রণালীও বলে দিলেন যে, ঐ সাত বছর যে ফসল উৎপন্ন হবে তা সঞ্চিত সম্পদ হিসাবে জমা করে রাখতে হবে এবং সেগুলিকে রাখতে হবে শীষসহ যাতে পঁচে না যায় এবং খারাপ ও নষ্ট না হয়। শুধু খাবারের প্রয়োজন হিসেবে ওর থেকে গ্রহণ করতে হবে। সামান্য পরিমাণও বেশি নেয়া চলবেনা। এই সাত বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরই দুর্ভিক্ষ শুরু হয়ে যাবে এবং এই দুর্ভিক্ষ পর্যায়ক্রমে সাত বছর পর্যন্ত থাকবে। বৃষ্টিও হবে না এবং ফসলও ফলবে না। সাতটি শীর্ণকায় গাভী দ্বারা এটাই বুঝানো হয়েছে। এই সময়ে তোমরা তোমাদের জমাকৃত সাত বছরের শীষযুক্ত ফসল হতে খেতে থাকবে। জেনে রেখোঁরেখো, পরবর্তী সাত বছরে ফসল মোটেই উৎপন্ন হবে না। বরং তোমাদের পূর্বের সাত বছরের জমাকৃত ফসল হতেই খেতে হবে। তোমরা বীজ বপণ করবে বটে, কিন্তু শস্য মোটেই উৎপন্ন হবে না। তিনি স্বপ্নের পূর্ণ ব্যাখ্যা দানের পর এই সুসংবাদও প্রদান করলেন যে, দুর্ভিক্ষের সাতটি বছরের পর যে বছরটি আসবে তা বড়ই বরকতময় বছর হবে। প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টিপাত হবে এবং যথেষ্ট পরিমাণে ফসল উৎপন্ন হবে। ফলে সংকীর্ণতা দূর হয়ে যাবে। লোকেরা অভ্যাসগতভাবে যায়তুন প্রভৃতির তেল বের করবে এবং অভ্যাস অনুযায়ী আঙ্গুরের রস নিঙড়াতে থাকবে। জন্তুর স্তন দুধে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে। সুতরাং জনগণ যথেষ্ট পরিমাণে দুধ বের করে পান করবে এবং পরিতৃপ্ত হবে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।