সূরা ইউসুফ (আয়াত: 42)
হরকত ছাড়া:
وقال للذي ظن أنه ناج منهما اذكرني عند ربك فأنساه الشيطان ذكر ربه فلبث في السجن بضع سنين ﴿٤٢﴾
হরকত সহ:
وَ قَالَ لِلَّذِیْ ظَنَّ اَنَّهٗ نَاجٍ مِّنْهُمَا اذْکُرْنِیْ عِنْدَ رَبِّکَ ۫ فَاَنْسٰهُ الشَّیْطٰنُ ذِکْرَ رَبِّهٖ فَلَبِثَ فِی السِّجْنِ بِضْعَ سِنِیْنَ ﴿ؕ۴۲﴾
উচ্চারণ: ওয়া কা-লা লিল্লাযী জান্না আন্নাহূনা-জিম মিনহুমাযকুরনী ‘ইনদা রাব্বিকা ফাআনছাহুশশাইতা-নুযিকরা রাব্বিহী ফালাবিছা ফিছছিজনি বিদ‘আ ছিনীন।
আল বায়ান: আর তাদের দু’জনের মধ্যে যে মুক্তি পাবে বলে সে ধারণা করল তাকে বলল, ‘তোমার মনিবের কাছে আমার কথা উল্লেখ করবে’। কিন্তু শয়তান তাকে স্বীয় মনিবের নিকট উল্লেখ করার বিষয়টি ভুলিয়ে দিল। ফলে সে কয়েক বছর কারাগারে অবস্থান করল।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪২. আর ইউসুফ তাদের মধ্যে যে মুক্তি পাবে মনে করলেন, তাকে বললেন, তোমার মনিবের কাছে আমার কথা বলো, কিন্তু শয়তান তাকে তার মনিবের কাছে তার বিষয় বলার কথা ভুলিয়ে দিল; কাজেই ইউসুফ কয়েক বছর কারাগারে রয়ে গেলেন।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: তাদের দু’জনের মধ্যে যে জন মুক্তি পাবে ব’লে সে (ইউসুফ) মনে করল তাকে বলল, ‘তোমার প্রভুর কাছে আমার সম্পর্কে বলিও।’ কিন্তু শয়তান তাকে তার প্রভুর কাছে ইউসুফের কথা উল্লেখ করতে ভুলিয়ে দিল। ফলে ইউসুফ বেশ কয়েক বছর কারাগারে আটক থেকে গেল।
আহসানুল বায়ান: (৪২) ইউসুফ তাদের মধ্যে যে মুক্তি পাবে মনে করল, তাকে বলল, ‘তোমার প্রভুর কাছে আমার কথা বলো।’ কিন্তু শয়তান তাকে তার প্রভুর কাছে তার বিষয় বলবার কথা ভুলিয়ে দিল; সুতরাং ইউসুফ কয়েক বছর কারাগারে থেকে গেল। [1]
মুজিবুর রহমান: ইউসুফ তাদের মধ্যে যে মুক্তি পাবে মনে করল, তাকে বললঃ তোমার প্রভুর কাছে আমার কথা বল; কিন্তু শাইতান তাকে তার প্রভুর কাছে তার বিষয়ে বলার কথা ভুলিয়ে দিল। সুতরাং ইউসুফ কয়েক বছর কারাগারে রইল।
ফযলুর রহমান: দুজনের মধ্যে যে জন মুক্তি পাবে বলে ইউসুফ মনে করল তাকে সে বলল, “তুমি তোমার মনিবের কাছে আমার কথা উল্লেখ করো।” কিন্তু তার মনিবের কাছে তা উল্লেখ করার কথা শয়তান তাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল। সুতরাং ইউসুফকে (আরো) কয়েকবছর কারাগারে থাকতে হল।
মুহিউদ্দিন খান: যে ব্যক্তি সম্পর্কে ধারণা ছিল যে, সে মুক্তি পাবে, তাকে ইউসুফ বলে দিলঃ আপন প্রভুর কাছে আমার আলোচনা করবে। অতঃপর শয়তান তাকে প্রভুর কাছে আলোচনার কথা ভুলিয়ে দিল। ফলে তাঁকে কয়েক বছর কারাগারে থাকতে হল।
জহুরুল হক: আর দুইজনের মধ্যে যাকে তিনি জানতেন যে সে মুক্তি পাবে তাকে তিনি বললেন, "তোমার প্রভুর কাছে আমার কথা বলো।" কিন্তু শয়তান তাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল তার প্রভুর কাছে স্মরণ করিয়ে দিতে, তাই তিনি কারাগারে থাকলেন আরো কয়েক বছর।
Sahih International: And he said to the one whom he knew would go free, "Mention me before your master." But Satan made him forget the mention [to] his master, and Joseph remained in prison several years.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৪২. আর ইউসুফ তাদের মধ্যে যে মুক্তি পাবে মনে করলেন, তাকে বললেন, তোমার মনিবের কাছে আমার কথা বলো, কিন্তু শয়তান তাকে তার মনিবের কাছে তার বিষয় বলার কথা ভুলিয়ে দিল; কাজেই ইউসুফ কয়েক বছর কারাগারে রয়ে গেলেন।(১)
তাফসীর:
(১) এ আয়াতের দুটি অর্থ করা হয়ে থাকে,
এক. বন্দী দু'জনের মধ্যে যে ব্যক্তি সম্পর্কে ধারণা ছিল যে, সে রেহাই পাবে, তাকে ইউসুফ আলাইহিস সালাম বললেনঃ যখন তুমি মুক্ত হয়ে কারাগারের বাইরে যাবে এবং শাহী দরবারে পৌছবে, তখন বাদশাহর কাছে আমার বিষয়েও আলোচনা করবে যে, এ নিরপরাধ লোকটি কারাগারে পড়ে রয়েছে। কিন্তু মুক্ত হয়ে লোকটি ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর কথা ভুলে গেল। এ হিসাবে فَأَنْسَاهُ এর মধ্যে ব্যবহৃত সর্বনামটি দ্বারা সেই বন্দী লোকটিকে বুঝানো হবে। ফলে ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর মুক্তি আরো বিলম্বিত হয়ে গেল এবং এ ঘটনার পর আরো কয়েক বছর তাকে কারাগারে কাটাতে হল। [কুরতুবী; ইবন কাসীর]
দুই. মুজাহিদ রাহেমাহুল্লাহ বলেনঃ ইউসুফ আলাইহিসসালাম বন্দীর প্রভু বা রাজার কাছে তার কথা উল্লেখ করার কথা বলেছিলেন। এতে করে তিনি যেহেতু তার প্রভু রাব্বুল আলামিনকে ভুলে গিয়েছিলেন এর শাস্তি স্বরূপ তাকে বেশ কয়েক বছর জেলে কাটাতে হয়েছে। এ হিসাবে فَأَنْسَاهُ শব্দের মধ্যে ব্যবহৃত সর্বনামটি দ্বারা ইউসুফ আলাইহিস সালামকে বুঝানো হবে। [কুরতুবী; ইবন কাসীর]
আয়াতে (بِضْعَ سِنِينَ) বলা হয়েছে। শব্দটি তিন থেকে নয় পর্যন্ত সংখ্যা বোঝায়। কোন কোন মুফাসসির বলেনঃ এ ঘটনার পর আরো সাত বছর তাকে জেলে থাকতে হয়েছে। [কুরতুবী; ইবন কাসীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৪২) ইউসুফ তাদের মধ্যে যে মুক্তি পাবে মনে করল, তাকে বলল, ‘তোমার প্রভুর কাছে আমার কথা বলো।’ কিন্তু শয়তান তাকে তার প্রভুর কাছে তার বিষয় বলবার কথা ভুলিয়ে দিল; সুতরাং ইউসুফ কয়েক বছর কারাগারে থেকে গেল। [1]
তাফসীর:
[1] بضع শব্দটি তিন থেকে নয় পর্যন্ত সংখ্যার জন্য ব্যবহার হয়। অহাব বিন মুনাব্বেহ বলেন, আইয়ুব (আঃ) তাঁর ব্যাধি অবস্থায় এবং ইউসুফ (আঃ) জেলখানায় সাত বছর ছিলেন। আর বুখতে নাসরের আযাবও সাত বছর ছিল। পক্ষান্তরে অনেকে বলেন, বারো বছর এবং অনেকের মতে চৌদ্দ বছর জেলখানাতে ছিলেন। আর আল্লাহই ভালো জানেন।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৪২-৫২ নং আয়াতের তাফসীর:
(وَقَالَ لِلَّذِیْ ظَنَّ اَنَّھ۫ نَاجٍ مِّنْھُمَا....)
ইউসুফ (عليه السلام) তাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা করার পর দুজনের যে ব্যক্তি মুক্তি লাভ করবে অর্থাৎ জেল থেকে মুক্তি পেয়ে পুনরায় বাদশাকে শরাব পান করানোর দায়িত্বে নিযুক্ত হবে তাকে বললেন: তোমার মালিকের নিকট (অর্থাৎ বাদশাহর কাছে) আমার বিষয়টি আলোচনা করবে যাতে তিনি জানতে পারেন যে, আমি অন্যায়ভাবে জেলে বন্দী হয়ে আছি। ফলে আমার মুক্তির ব্যবস্থা করবে। কিন্তু সে যখন মুক্তি পেল তখন ইউসুফ (عليه السلام) এর ব্যাপারে বাদশার নিকট আলোচনা করতে ভুলে গেল, আর ভুলিয়ে দেয়াটা মূলতঃ শয়তানেরই কাজ ছিল। যার ফলে ইউসুফ (عليه السلام) কে কারারুদ্ধ অবস্থায় কয়েক বছর জেলখানায় অবস্থান করতে হয়েছে।
(بِضْعَ سِنِیْنَ) - আয়াতে بضع যে শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছেঅ। তা মূলত তিন থেকে নয় পর্যন্ত সংখ্যাকে বুঝায়। যার ফলে ইউসুফ (عليه السلام) কত বছর কারারুদ্ধ ছিলেন তা সঠিকভাবে বলা যায় না। অধিকাংশ তাফসীরবিদগণ বলেছেন, সাত বছর জেলখানায় ছিলেন।
(وَقَالَ الْمَلِکُ اِنِّیْٓ اَرٰی سَبْعَ بَقَرٰتٍ سِمَانٍ..... وَاَنَّ اللہَ لَا یَھْدِیْ کَیْدَ الْخَا۬ئِنِیْنَ)
অত্র আয়াগুলোতে মিসরের বাদশার স্বপ্ন ও ইউসুফ (عليه السلام) কর্তৃক এর ব্যাখ্যা দান এবং কারাগার থেকে মুক্তির মাধ্যম সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে।
মিসরের বাদশা একটি স্বপ্ন দেখলেন এবং এটিই ছিল আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে ইউসুফ (عليه السلام) এর জেলখানা থেকে মুক্তির অসীলা। বাদশা তার সভাসদগণকে ডেকে বললেন: আমি স্বপ্নে দেখতে পেলাম সাতটি মোটা-তাজা গাভীকে সাতটি জীর্ণশীর্ণ (হালকা) গাভী খেয়ে ফেলছে এবং আরো দেখতে পেলাম সাতটি সবুজ শীষ আর অপর সাতটি শুষ্ক। বাদশা স্বপ্নের কথা বর্ণনা করার পর যারা স্বপ্নের ব্যাখ্যায় পারদর্শী এমন সব মুআব্বির, জ্যোতিষী ও গণকদের কাছে সঠিক ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন। কিন্তু তারা সকলেই অপারগতা প্রকাশ করল এবং বাদশাকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য বলল, এটা কোন ব্যাখ্যাযোগ্য স্বপ্ন নয়; বরং এটা (اَضْغَاثُ اَحْلَامٍ) বা কল্পনা প্রসূত মনের খেয়াল মাত্র। أَضْغَاثُ শব্দটি ضغث এর বহুবচন, অর্থ ঘাসের গোছা। أَحْلَامٍ শব্দটি حُلم এর বহুবচন যার অর্থ স্বপ্ন। অর্থাৎ এমন স্বপ্ন যার কোন অর্থ নেই, কল্পনাপ্রসূত মনের খেয়াল। কিন্তু বাদশা তাতে স্বস্তি পান পেলেন না। এমন সময় কারামুক্ত ইউসুফ (عليه السلام)-এর সেই সঙ্গী যাকে বলেছিলেন, তোমাদের একজন মুক্তি পেয়ে আবার বাদশার সরাব পান করানোর দায়িত্ব পাবে এবং এ কথাও বলেছিলেন, বাদশার কাছে আমার কথা বলিও সে এত দিন ভুলে গিয়েছিল, তখন ইউসুফ (عليه السلام) এর কথা তার স্মরণ হল। সে বাদশার কাছে ইউসুফ (عليه السلام) এর কথা উল্লেখ করল এবং এ কথাও বলল, জেলে থাকাকালে আমি ও আমার সঙ্গী (যাকে শূলিবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে) স্বপ্ন দেখেছিলাম। তিনি আমাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা করেছিলেন যা বাস্তবায়িত হয়েছে। উক্ত খাদেম কারাগারে যাবার অনুমতি তলব করলে বাদশা ইউসুফের কাছে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানার জন্য উক্ত খাদেমকে কারাগারে পাঠালেন। উক্ত খাদেম স্বপ্নের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরে ব্যাখ্যা সম্পর্কে জানতে চাইলে ইউসুফ (عليه السلام) তাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানিয়ে দিলেন। তিনি বললেন: ‘সাতটি মোটা-তাজা গাভী’ দ্বারা উদ্দেশ্য হল সাত বছর ভাল ফসল হবে, আর ‘সাতটি শীর্ণকায় গাভী’ দ্বারা উদ্দেশ্য হল সাত বছর দুর্ভিক্ষ হবে। অনুরূপ ‘সাতটি সবুজ শীষ’ দ্বারা উদ্দেশ্য হল সাত বছর ভাল ফসল হবে, এমনকি ফসলে মাঠ সবুজ শ্যামলে পরিণত হবে। আর অপর ‘সাতটি শুষ্ক শীষ’ দ্বারা উদ্দেশ্য হল কোন ফসল উৎপন্ন হবে না। এ ব্যাখ্যা দেয়ার সাথে সাথে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে তাও বলে দিলেন। তিনি বললেন: ধারাবাহিকভাবে সাত বছর ভালভাবে চাষাবাদ করবে এবং যে শস্য উৎপন্ন হবে তা কেটে যতটুকু খাওয়ার তা বাদে সব শীষসহ জমা করে রাখবে যাতে শস্য ভালভাবে সংরক্ষিত থাকে, নষ্ট না হয়। অতঃপর এ সাতটি ভাল বছরের পর সাতটি কঠিন দুর্ভিক্ষের বছর আসবে, তখন এ জমাকৃত খাদ্য কাজে লাগবে, ফসল না হলেও এগুলো খেয়ে দুর্ভিক্ষের সাত বছর অতিক্রম করতে পারবে।
(مِّمَّا تُحْصِنُوْنَ)
অর্থাৎ শস্যবীজ যা পুনরায় চাষ করার জন্য সংরক্ষণ করে রাখা হয়। এ শস্যবীজ ব্যতীত দুর্ভিক্ষের সাত বছর জমাকৃত সব খাদ্য শেষ হয়ে যাবে।
(ثُمَّ يَأْتِيْ مِنْم بَعْدِ ذٰلِكَ)
অর্থাৎ এ দুর্ভিক্ষের সাত বছর অতীত হয়ে যাওয়ার পর প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে, ফলে প্রচুর ফসল উৎপন্ন হবে এবং তোমরা আঙুর থেকে রস বের করবে, যায়তুন থেকে তেল বের করবে এবং চতুষ্পদ জন্তু থেকে দুধ দোয়াবে। বাদশা এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা শুনে বুঝতে পারলেন এটাই সঠিক ব্যাখ্যা। তাই তিনি কর্মচারীদেরকে বললেন: তাঁকে (ইউসুফকে) নিয়ে এসো। আগত দূত ইউসুফ (عليه السلام)-কে বলল, বাদশা আপনাকে ডেকেছেন। ইউসুফ (عليه السلام) বললেন, তোমার রব তথা বাদশার কাছে ফিরে যাও এবং জিজ্ঞেস কর, যে মহিলারা তাদের হাত কেটে ফেলেছিল তাদের বিষয়টি কী? ইউসুফ (عليه السلام) ধৈর্যের পরিচয় দিলেন এবং আত্মমর্যাদাবোধের দিকে লক্ষ্য করলেন। যেখানে বাদশা মুক্তি দিয়ে তার কাছে যেতে বলেছেন সেখানে তিনি বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ নিতে পারতেন, কিন্তু তিনি চাচ্ছিলেন তাকে যে অপবাদ দেয়া হয়েছে তা থেকে সকলের সামনে পবিত্রতা প্রমাণিত হোক।
রাসূলুল্লাহ বলেছেন: যদি আমি অতদিন কারাগারে থাকতাম যতদিন ইউসুফ (عليه السلام) ছিলেন, তাহলে বাদশার দূত প্রথমবার আসার সাথে সাথে আমি তার প্রস্তাব গ্রহণ করতাম। এ কথা বলার পর তিনি ৫০ নং আয়াতটি তেলাওয়াত করেন। (তিরমিযী হা: ৩১১৬, সহীহ)
কারাগার থেকে পাঠানো ইউসুফ (عليه السلام) এর দাবী অনুযায়ী মহিলাদের কাছে বাদশা ঘটনার তদন্ত করলেন। বাদশা সেসব মহিলাকে দরবারে ডাকলেন, তারা প্রকৃত ঘটনা খুলে বলল এবং ইউসুফ (عليه السلام) যে নির্দোষ এ কথা স্বীকার করল। তখন আযীযের স্ত্রী যুলাইখাও স্বীকার করল যে, এখন সত্য সুস্পষ্ট হয়ে গেছে, আমিই তাকে অপকর্ম করার জন্য আহ্বান করেছিলাম, সে নিজেকে সংযত রেখেছে, সে নির্দোষ, সে সত্যবাদী। পরিশেষে ইউসুফ (عليه السلام) সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে জেলখানা থেকে বেরিয়ে এলেন। আর তিনি বাদশার সামনে মহিলাদের এ স্বীকারোক্তির ব্যবস্থা এ জন্য করেছিলেন যাতে যুলাইখার স্বামী জেনে নেয়, তার অনুপস্থিতিতে তিনি কোন খেয়ানত করেননি। বরং তিনি তার আমানত রক্ষা করেছেন।
(وَمَآ أُبَرِّئُ نَفْسِيْ)
‘আমি নিজেকে নির্দোষ মনে করি না’ এটা ইউসুফ (عليه السلام) এর কথাও হতে পারে, তাহলে এটা তাঁর পক্ষ থেকে আত্মবিনয়ের বহিঃপ্রকাশ হবে। কেননা এটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি অপবাদ থেকে পবিত্র। পক্ষান্তরে যুলাইখার কথাও হতে পারে, তবে এটাই সম্ভাবনা বেশি, কারণ সে নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করেছে। যার ফলেই সে বলছে, আমি নিজেকে নির্দোষ মনে করি না, কারণ মানুষের অন্তর খারাপ কাজ প্রবণ। তবে আল্লাহ তা‘আলা যাকে রহম করেন সে ব্যতীত।
সুতরাং এমন আত্মা যা খারাপ কাজের প্রতি ঝুঁকে পড়ে তা থেকে আল্লাহ তা‘আলার কাছে আশ্রয় চাইতে হবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. যারা শত প্রতিকূল পরিবেশেও আল্লাহ তা‘আলার আদেশ নিষেধ মেনে চলেন তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা উচ্চ মর্যাদায় আসীন করেন।
২. ধৈর্য ধারণ করার ফযীলত সম্পর্কে জানা গেল। সুতরাং কোন বিষয়ে তাড়াহুড়া করা উচিত নয়।
৩. মানুষের মন সর্বদা খারাপ কাজের দিকেই ধাবিত হয়। তবে যার প্রতি আল্লাহ তা‘আলা রহম করেন সে ব্যতীত।
৪. খারাপ কাজ প্রবণ অন্তর থেকে আল্লাহ তা‘আলার কাছে আশ্রয় চাইতে হবে।
৫. উক্ত আয়াত অর্থনীতি ও সম্পদ সংরক্ষণের মূলনীতি।
৬. উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা বিপদ মুক্তির চেয়ে আপতিত অপবাদ মুক্তিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।
৭. এখানে তাদের জন্য বড় শিক্ষা নিহিত রয়েছে যারা অপরের বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন। আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে নারীদের চক্রান্ত থেকে সাবধান থাকবেন।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: হযরত ইউসুফ (আঃ) যার স্বপ্নের তাৎপর্য অনুযায়ী স্বীয় ধারণায় জেলখানা হতে মুক্তি পাবেন বলে মনে করেছিলেন তাকে তিনি দ্বিতীয় ব্যক্তি অর্থাৎ বাবুর্চির অগোচরে গোপনে বলেছিলেন যে, সে যেন বাদশাহর সামনে তাঁর সম্পর্কে আলোচনা করে। কিন্তু লোকটি তাঁর এ কথাটি সম্পূর্ণরূপে ভুলে যায়। এটাও ছিল শয়তানেরই চক্রান্ত। এ কারণে হযরত ইউসুফকে (আঃ) কয়েক বছর কারাগারে কাটাতে হয়েছিল। সুতরাং সঠিক কথা এটাই যে, (আরবি) এর ‘(আরবি)’ সর্বনামটি মুক্তিপ্রাপ্ত লোকটির দিকেই প্রত্যাবর্তিত। তবে কেউ কেউ এ কথাও বলেছেন যে, ‘(আরবি)' সর্বনামটি হযরত ইউসুফের (আঃ) দিকে ফিরেছে।
হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে মারফূ’ রূপে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যদি হযরত ইউসুফ (আঃ) এ কথা না বলতেন তবে তাঁকে এতো দীর্ঘদিন জেলখানায় থাকতে হতো না। তিনি আল্লাহ তাআ’লাকে ছেড়ে অন্যের কাছে নিজের জীবনের প্রশস্ততা কামনা করেছিলেন।” কিন্তু এই রিওয়াইয়াতটি অত্যন্ত দুর্বল। কেননা, সুফইয়ান ইবনু ওয়াকী’ এবং ইবরাহীম ইবনু ইয়াযীদ এ দু'জন বর্ণনাকারী দুর্বল। হাসান (রঃ) ও কাতাদা’ (রঃ) হতে মুরসাল রূপে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। যদিও কোন কোন ক্ষেত্রে মুরসাল হাদীস গ্রহণযোগ্য হয়ে থাকে, তথাপি এরূপ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এরূপ মুরসাল হাদীস কখনোই গ্রহণযোগ্য দলীল হতে পারে না। এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআ’লারই রয়েছে।
(আরবি) শব্দটি তিন থেকে নয় পর্যন্ত সংখ্যার জন্যে এসে থাকে। হযরত অহাব ইবনু মুনাববাহ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আইয়ুব (আঃ) সাত বছর যাবৎ রোগে ভুগেছিলেন, হযরত ইউসুফ (আঃ) সাত বছর কারাগারে অবস্থান করেছিলেন এবং বাখ্তে নাসারের শাস্তিও সাত বছর ধরে চলেছিল। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, হযরত ইউসুফের (আঃ) কারাগারে অবস্থানের সময়কাল ছিল বারো বছর। যহ্হাক (রঃ) বলেন যে চৌদ্দ বছর তিনি জেলখানায় অবস্থান করেছিলেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।