আল কুরআন


সূরা ইউসুফ (আয়াত: 36)

সূরা ইউসুফ (আয়াত: 36)



হরকত ছাড়া:

ودخل معه السجن فتيان قال أحدهما إني أراني أعصر خمرا وقال الآخر إني أراني أحمل فوق رأسي خبزا تأكل الطير منه نبئنا بتأويله إنا نراك من المحسنين ﴿٣٦﴾




হরকত সহ:

وَ دَخَلَ مَعَهُ السِّجْنَ فَتَیٰنِ ؕ قَالَ اَحَدُهُمَاۤ اِنِّیْۤ اَرٰىنِیْۤ اَعْصِرُ خَمْرًا ۚ وَ قَالَ الْاٰخَرُ اِنِّیْۤ اَرٰىنِیْۤ اَحْمِلُ فَوْقَ رَاْسِیْ خُبْزًا تَاْکُلُ الطَّیْرُ مِنْهُ ؕ نَبِّئْنَا بِتَاْوِیْلِهٖ ۚ اِنَّا نَرٰىکَ مِنَ الْمُحْسِنِیْنَ ﴿۳۶﴾




উচ্চারণ: ওয়া দাখালা মা‘আহুছ ছিজনা ফাতাইয়া-ন কা-লা আহাদুহুমাইন্নীআরা-নী আ‘সিরু খামরা- ওয়া কা-লাল আ-খারু ইন্নীআরা-নী আহমিলুফাওকা রা’ছী খুবযান তা’কুলুততাইরু মিনহু নাব্বি’না-বিতা’ওয়ীলিহী ইন্না-নারা-কা মিনাল মুহছিনীন।




আল বায়ান: আর কারাগারে তার সাথে প্রবেশ করল দু’জন যুবক। তাদের একজন বলল, ‘আমি স্বপ্নে আমাকে দেখতে পেলাম যে, আমি মদ নিংড়াচ্ছি’। আর অপর জন বলল, ‘আমি স্বপ্নে আমাকে দেখেছি যে, আমি আমার মাথার উপর রুটি বহন করছি তা থেকে পাখি খাচ্ছে। আপনি আমাদেরকে এর ব্যাখ্যা অবহিত করুন। নিশ্চয় আমরা আপনাকে ইহসানকারীদের অন্তর্ভুক্ত দেখতে পাচ্ছি’।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৬. আর তার সাথে দুই যুবক কারাগারে প্রবেশ করল। তাদের একজন বলল, ‘আমি স্বপ্নে আমাকে দেখলাম, আমি মদের জন্য আংগুর নিংড়াচ্ছি, এবং অন্যজন বলল, আমি স্বপ্নে আমাকে দেখলাম, আমি আমার মাথায় রুটি বহন করছি এবং পাখি তা থেকে খাচ্ছে। আমাদেরকে আপনি এটার তাৎপর্য জানিয়ে দিন, আমরা তো আপনাকে মুহসিনদের অন্তর্ভুক্ত দেখছি।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: তার সঙ্গে দু’যুবকও কারাগারে প্রবেশ করেছিল। তাদের একজন বলল, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম যে আমি মদ তৈরি করছি।’ অন্যজন বলল, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমি মাথায় রুটি বহন করছি আর পাখী তাত্থেকে খাচ্ছে। আমাদেরকে এর ব্যাখ্যা বলে দাও, আমরা দেখছি তুমি একজন সৎকর্মশীল লোক।’




আহসানুল বায়ান: (৩৬) তার সাথে দু’জন যুবক কারাগারে প্রবেশ করল। তাদের একজন বলল, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমি (আঙ্গুর) নিঙড়ে মদ তৈরী করছি’ এবং অপরজন বলল, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম আমি আমার মাথায় রুটি বহন করছি এবং পাখি তা হতে খাচ্ছে। আমাদেরকে আপনি এর তাৎপর্য জানিয়ে দিন, আমরা আপনাকে সৎকর্মপরায়ণ দেখছি।’ [1]



মুজিবুর রহমান: তার সাথে দু’জন যুবক কারাগারে প্রবেশ করল, তাদের একজন বললঃ আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমি আংগুর নিংড়িয়ে রস বের করছি এবং অপরজন বললঃ আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমি আমার মাথায় রুটি বহন করছি এবং পাখী তা হতে খাচ্ছে, আমাদেরকে আপনি এর তাৎপর্য জানিয়ে দিন, আমরা আপনাকে সৎকর্মপরায়ণ দেখছি।



ফযলুর রহমান: তার সঙ্গে জেলে দুই যুবক প্রবেশ করেছিল। তাদের একজন বলল, “আমি স্বপ্নে দেখলাম, মদ (বানানোর জন্য আঙ্গুর) নিংড়াচ্ছি।” অন্যজন বলল, “আমি দেখলাম, মাথায় রুটি বহন করছি আর পাখি তা থেকে খাচ্ছে।” (তারা বলল) “আমাদেরকে এর তাৎপর্য বলে দিন। আমরা আপনাকে একজন ভাল লোক মনে করি।”



মুহিউদ্দিন খান: তাঁর সাথে কারাগারে দুজন যুবক প্রবেশ করল। তাদের একজন বললঃ আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, আমি মদ নিঙড়াচ্ছি। অপরজন বললঃ আমি দেখলাম যে, নিজ মাথায় রুটি বহন করছি। তা থেকে পাখী ঠুকরিয়ে খাচ্ছে। আমাদের কে এর ব্যাখ্যা বলুন। আমরা আপনাকে সৎকর্মশীল দেখতে পাচ্ছি।



জহুরুল হক: আর তাঁর সঙ্গে দু’জন যুবক জেলে ঢুকেছিল। তাদের একজন বললে, "আমি দেখলাম মদ তৈরি করছি।" আর অন্যজন বললে, "আমি দেখলাম আমি আমার মাথার উপরে রুটি বয়ে নিচ্ছি, তা থেকে পাখিরা খাচ্ছে।" "আমাদের এর তাৎপর্য বলে দাও, আমরা নিশ্চয়ই তোমাকে দেখছি ভালো-লোকদের মধ্যেকার।"



Sahih International: And there entered the prison with him two young men. One of them said, "Indeed, I have seen myself [in a dream] pressing wine." The other said, "Indeed, I have seen myself carrying upon my head [some] bread, from which the birds were eating. Inform us of its interpretation; indeed, we see you to be of those who do good."



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৩৬. আর তার সাথে দুই যুবক কারাগারে প্রবেশ করল। তাদের একজন বলল, ‘আমি স্বপ্নে আমাকে দেখলাম, আমি মদের জন্য আংগুর নিংড়াচ্ছি, এবং অন্যজন বলল, আমি স্বপ্নে আমাকে দেখলাম, আমি আমার মাথায় রুটি বহন করছি এবং পাখি তা থেকে খাচ্ছে। আমাদেরকে আপনি এটার তাৎপর্য জানিয়ে দিন, আমরা তো আপনাকে মুহসিনদের অন্তর্ভুক্ত দেখছি।(১)


তাফসীর:

(১) কারাগারে ইউসুফকে কোন দৃষ্টিতে দেখা হতো এ থেকে তা আন্দাজ করা যেতে পারে। ওপরে যেসব ঘটনার কথা আলোচনা করা হয়েছে সেগুলো সামনে রাখলে ব্যাপারটা আর মোটেই বিস্ময়কর মনে হয় না যে, এ কয়েদী দুজন ইউসুফের কাছেই-বা এসে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করলো কেন এবং তাঁকে “আমরা আপনাকে মুহসিন হিসেবেই পেয়েছি” বলে সম্মান করলো কেন। জেলখানার ভেতরে বাইরে সবাই জানতো, এ ব্যক্তি কোন অপরাধী নয়, বরং একজন অত্যন্ত সদাচারী পুরুষ। কঠিনতম পরীক্ষায় তিনি নিজের আল্লাহভীতি ও আল্লাহর হুকুম মেনে চলার প্রমাণ পেশ করেছেন। তিনি রাতে ইবাদত করতেন, খুব কান্নাকাটি করতেন। তার কারণে কারাগারেও মানুষের মধ্যে পবিত্রতা ফিরে আসল। আজ সারাদেশে তাঁর মতো লোক একজনও নেই। এ কারণে শুধু কয়েদীরাই তাঁকে ভক্তি ও শ্রদ্ধার চোখে দেখতো না বরং কয়েদখানার পরিচালকবৃন্দ এবং কর্মচারীরাও তাঁর ভক্তদলে শামিল হয়ে গিয়েছিল। [দেখুন, কুরতুবী]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৩৬) তার সাথে দু’জন যুবক কারাগারে প্রবেশ করল। তাদের একজন বলল, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমি (আঙ্গুর) নিঙড়ে মদ তৈরী করছি’ এবং অপরজন বলল, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম আমি আমার মাথায় রুটি বহন করছি এবং পাখি তা হতে খাচ্ছে। আমাদেরকে আপনি এর তাৎপর্য জানিয়ে দিন, আমরা আপনাকে সৎকর্মপরায়ণ দেখছি।’ [1]


তাফসীর:

[1] উক্ত দুই যুবক রাজকর্মচারী ছিল। প্রথমজন শারাব পান করানোর কাজ করত এবং দ্বিতীয়জন রুটি তৈরী করত। কোন কারণে উভয়কে জেলখানায় বন্দী করা হয়েছিল। ইউসুফ (আঃ) আল্লাহর পয়গম্বর ছিলেন। দাওয়াত ও তবলীগের সাথে সাথে ইবাদত ও আচরণ, পরহেযগারী ও সচ্চরিত্রতার দিক থেকে জেলখানার অন্যান্য বন্দীদের থেকে স্বতন্ত্র ছিলেন। এ ছাড়া আল্লাহ তাআলা তাঁকে স্বপ্নের তা’বীর (ব্যাখ্যা) করার বিশেষ জ্ঞান ও ক্ষমতা প্রদান করেছিলেন। উক্ত বন্দীদ্বয় যখন স্বপ্ন দেখল, তখন তারা ইউসুফ (আঃ)-এর নিকট এল এবং বলল, আমরা আপনাকে সৎকর্মপরায়ণ দেখছি। আপনি আমাদেরকে আমাদের স্বপ্নের তাৎপর্য বলে দিন। কেউ কেউ محسن শব্দটির অর্থ এই বলেছেন যে, আপনি স্বপ্নের ভাল তাৎপর্য বর্ণনা করতে পারেন।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৩৬-৪১ নং আয়াতের তাফসীর:



উক্ত আয়াতগুলোতে ইউসুফ (عليه السلام)-কে কারারুদ্ধ করার পর যে সব ঘটনা ঘটেছে তার বর্ণনা দেয়া হয়েছে। ৬ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা নিজেই উল্লেখ করেছেন, তিনি ইউসুফ (عليه السلام) কে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিয়েছেন। তাছাড়া তিনি দাওয়াত ও তাবলীগের সাথে সাথে ইবাদত ও আচরণ, পরহেযগারী ও সচ্চরিত্রতার দিক থেকে জেলখানার অন্যান্য বন্দীদের চেয়ে স্বতন্ত্র ছিলেন।



ইউসুফ (عليه السلام) এর সাথে আরো দু’জন যুবককেও জেলখানায় বন্দী করা হল। কাতাদাহ  বলেন: তাদের একজন ছিল যে বাদশাকে সরবত পান করাতো এবং অন্যজন ছিল রুটি প্রস্তুতকারী (বাবুর্চি)। তারা বাদশাকে বিষযুক্ত খাবার খাওয়ানোর মাধ্যমে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করছিল। তাই তাদেরকে কারারুদ্ধ করা হয়। তখনও মামলার তদন্ত চলছিল এবং চূড়ান্ত রায় বাকী ছিল। তারা জেলে এসে ইউসুফ (عليه السلام) এর সততা, বিশ্বস্ততা, পরপকারী ও স্বপ্ন ব্যাখ্যা দানের যোগ্যতা সম্পর্কে জানতে পারে। উক্ত বন্দীদ্বয় যখন আলাদা আলাদা স্বপ্ন দেখল, তখন তারা ইউসুফ (عليه السلام) এর নিকট এল এবং বলল: আমরা আপনাকে সৎকর্মপরায়ণ দেখছি, সুতরাং আপনি আমাদের স্বপ্নের তাৎপর্য বলে দিন। তাদের একজন বলল: আমি স্বপ্নে দেখলাম আমি (আঙ্গুর) নিংড়ে মদ তৈরি করছি। আর অন্যজন বলল যে, আমি স্বপ্নে দেখেছি আমার মাথায় রুটি বহন করছি আর পাখি তা থেকে খাচ্ছে। তাদের স্বপ্নের কথা শুনে ইউসুফ (عليه السلام) বললেন: তোমাদের কাছে খাবার আসার আগেই স্বপ্নের ব্যাখ্যা করে দেব। তবে আমি যে ব্যাখ্যা করব তা কোন জ্যোতিষী বা গণকের মত ধারণা নয় যে, সঠিক ও ভুল উভয়টার সম্ভাবনা থাকতে পারে। বরং আমার ব্যাখ্যা সুদৃঢ় জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে হবে যা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে আমাকে প্রদান করা হয়েছে। এতে ভুলের কোন অবকাশ নেই। তারপর তিনি বলেন: আমি স্বপ্নের যে ব্যাখ্যা করি তা আল্লাহ তা‘আলা আমাকে শিক্ষা দিয়েছেন কারণ, আমি তাদের পথে চলি না যারা আল্লাহ তা‘আলা ও আখিরাতে বিশ্বাসী নয়। বরং আমি অনুসরণ করি আমার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়া‘কূব (عليه السلام) এর দীন। আমরা আল্লাহ তা‘আলার সাথে কাউকে শরীক করি না, তাঁকে একক বলে জানি ও ইবাদত করি। এটাই আমাদের পিতৃপুরুষের দীন। এখানে পিতামহ-প্রপিতামহকেও পিতা বলে উল্লেখ করেছেন, কারণ তাঁরাও পিতা। আরবিতে দাদাকেও পিতা বলা হয়।



নিজে আল্লাহ তা‘আলার তাওহীদের কথা প্রকাশ করার পর দু’ বন্দী সঙ্গীকে তাওহীদের দিকে দাওয়াত দিচ্ছেন, যে সকল মা‘বূদ সত্তা, গুণ ও সংখ্যার দিক থেকে ভিন্ন ভিন্ন, এক মা‘বূদ অপর মা‘বূদ হতে সকল দিক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, তারা কারো কোন উপকার-ক্ষতি কিছুই করতে পারে না, এসব গাছের, পাথরের ও অন্যান্য মা‘বূদের ইবাদত করা উত্তম, না যিনি সত্তা, গুণ, সংখ্যা ও সর্বদিক দিয়ে একক অদ্বিতীয় পরাক্রমশালী সেই আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করা উত্তম? অবশ্যই এক আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত উত্তম। কারণ তোমরা যে সকল মা‘বূদের ইবাদত কর, প্রকৃতপক্ষে তারা মা‘বূদ নয়, তোমরা ও তোমাদের বাপ-দাদারা বিভিন্ন নাম দিয়ে এদেরকে মা‘বূদ বানিয়েছ। যেমন বর্তমানে খাজা গরীবে নেওয়াজ, গাউসুল আযম, পীরানে পীর দস্তগীর, খাজাবাবা ইত্যাদি। তাছাড়া এরা যে মা‘বূদ এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা প্রমাণস্বরূপ কোন কিতাব নাযিল করেননি এবং রাসূলও প্রেরণ করেননি। সুতরাং এক আল্লাহ তা‘আলাই সকল ইবাদতের হকদার। তিনি ব্যতীত অন্য কেউ ইবাদতের হকদার হতে পারে না। তাই বিধান দেয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা, তিনিই আদেশ ও নিষেধাজ্ঞা জারি করবেন, তিনিই কোন বিধান শরীয়ত সিদ্ধ করতে পারেন, তাঁর বিধান সর্বদা কার্যকর থাকবে। তিনি সকলকে একমাত্র তাঁর ইবাদত করার নির্দেশ দিয়েছেন। এটাই সঠিক দীন, যে দীনের দিকে তোমাদেরকে আমি দাওয়াত দিচ্ছি। এতদসত্ত্বেও অধিকাংশ মানুষ প্রকৃত সত্য না জানার কারণে শির্কে লিপ্ত হয়। যেমন



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللّٰهِ إِلَّا وَهُمْ مُّشْرِكُوْنَ ‏)‏



“অধিকাংশ মানুষ আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা সত্ত্বেও মুশরিক।” (সূরা ইউসুফ ১২:১০৬)



অতঃপর তিনি তাদেরকে তাদের স্বপ্নের সঠিক ব্যাখ্যা বলে দিলেন। যে ব্যক্তি স্বপ্নে নিজেকে আঙ্গুরের জুস তৈরি করতে দেখেছিল সে জেলখানা থেকে মুক্তি পাবে এবং পুনরায় সে তার মনিবকে সরাব পান করাবে। আর দ্বিতীয়জন যে স্বপ্ন দেখেছে নিজ মাথার ওপর রুটি বহন করছে তার সঠিক ব্যাখ্যা হল, সে শূলবিদ্ধ হবে অতঃপর পাখি তার মাথার মগজ খাবে। তিনি একথাও বলে দিলেন যে, তোমাদের এ স্বপ্ন বাস্তবে ঘটবে। যেহেতু এ স্বপ্নের তা‘বীর বা ব্যাখ্যা করা হয়ে গেছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ ব্যাপারে বলেন, কোন ব্যক্তি যখন স্বপ্ন দেখে তখন তা তার ওপর লটকানো থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যাখ্যা করা না হয়। যখনই তা ব্যাখ্যা করা হয় তখনই তা সংঘটিত হয়। (আবূ দাঊদ হা: ৫০২০, ইবনু মাজাহ হা: ৩৯১৪, সহীহ) সুতরাং তোমাদের দু‘জনের ওপর এ স্বপ্ন সংঘটিত হবেই।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. মানুষের সকল প্রকার ইবাদতের একমাত্র হকদার হলেন আল্লাহ তা‘আলা।

২. বিধানদাতা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। তাই একমাত্র তাঁর বিধান মেনে নিতে হবে এবং সে অনুযায়ী জীবনের সকল ক্ষেত্রে চলতে হবে।

২. পিতা শব্দ ব্যবহার করে দাদা উদ্দেশ্য নেয়া জায়েয। যেমন বলা হয়েছে, اباؤكم এখানে পিতা দ্বারা বাপ-দাদা সকলেই উদ্দেশ্য।

৩. যখন কোন স্বপ্নের ব্যাখ্যা করা হয়ে যায় তখন সে স্বপ্নের উভয় সম্ভাবনার সুযোগ থাকে না। বরং ভাল-মন্দের একটি ফায়সালা হয়ে যায়।

৪. বিপদ থেকে মুক্তি কামনা করা ও সেজন্য চেষ্টা করা আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসার পরিপন্থি নয়। বরং বিপদ থেকে মুক্তির জন্য বৈধ মাধ্যম গ্রহণ করার সুযোগ রয়েছে।

৫. শির্কের অসারতা হাতেনাতে ধরিয়ে দিয়ে মুশরিককে প্রথমেই কালেমা শাহাদাতের দিকে আহ্বান করা আবশ্যক।

৬. প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে শ্রোতার মস্তিষ্ক যাচাই করে দাওয়াত দেয়া একটি উত্তম পদ্ধতি।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: যেই দিন হযরত ইউসুফকে (আঃ) কারাগারে যেতে হয়, ঘটনাক্রমে সেই দিনই দু’জন যুবক কারাগারে প্রবেশ করে। কাতাদা’ (রঃ) বলেন যে, যুবকদ্বয়ের একজন ছিল বাদশাহ’র সুরাবাহী এবং অপরজন ছিল তার রুটি প্রস্তুতকারী (বাবুর্চি)। মুহাম্মদ ইবনু ইসহাক (রঃ) বলেন যে, সুরাবাহীর নাম ছিল নাবওয়া এবং বাবুর্চির নাম ছিল মিজলাস। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, তাদেরকে বন্দী করার কারণ হচ্ছে, তারা বাদশাহ’র খাদ্যে ও পানিয়ে বিষ মিশ্রিত করার ষড়যন্ত্র করেছিল বলে বাদশাহ সন্দেহ করেছিলেন। কারাগারে হযরত ইউসুফের (আঃ) সৎকার্যাবলীর যথেষ্ট সুনাম ছিল। সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা, দানশীলতা, চরিত্রের মাধুর্য, ইবাদত বন্দেগীতে অধিক সময় কাটিয়ে দেয়া, খোদাভীতি, ইলম ও আমল, স্বপ্নের ব্যাখ্যা দান, সদাচার প্রভৃতি সদগুণাবলীর জন্যে তিনি বিশেষ খ্যাতি লাভ করেছিলেন। জেলখানার কয়েদীদের কল্যাণ সাধন, তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার, তাদের প্রতি অনুগ্রহকরণ। তাদের মন জয়করণ, তাদের দুঃখে সমবেদনা জ্ঞাপন রুগীদের সেবাকরণ প্রভৃতিই ছিল তাঁর প্রতিদিনের কাজ। এই দু’জন সরকারী চাকুরে হযরত ইউসুফকে (আঃ) অত্যন্ত ভালবাসতে থাকে।

একদিন তারা তাঁকে বলেঃ “জনাব! আপনার সাথে আমাদের অত্যন্ত ভালবাসা জন্মেছে।” তিনি তাদেরকে উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহ তোমাদের মধ্যে বরকত দান করুন।” কথা এই যে, যেই আমাকে ভালবেসেছে তারই কারণে আমি বিপদগ্রস্ত হয়েছি। আমার ফুফু আমাকে ভালবেসে ছিলেন, তার ভালবাসার কারণে আমি বিপদে পড়েছিলাম। আমার পিতা আমাকে ভালবেসেছিলেন, তাঁর ভালবাসার কারণে আমাকে কষ্টভোগ করতে হয়েছে। আযীযের স্ত্রী (যুলাইখা) আমাকে ভালবেসেছিল, তার ফলে কি হয়েছে তা শুধু আমার নয় বরং তোমাদের চোখের সামনেও স্পষ্টরূপে প্রকাশমান।”

যুবকদ্বয় একদা স্বপ্ন দেখলো- সুরাবাহী লোকটি স্বপ্নে দেখলো যে, সে যেন আঙ্গুরের রস নিঙড়াচ্ছে। হযরত ইবনু মাসউদের (রাঃ) কিরআতে (আরবি) শব্দের স্থলে (আরবি) শব্দ রয়েছে। আম্মনবাসী আঙ্গুরকে (আরবি) বলে থাকে। লোকটি স্বপ্নে দেখলো যে, সে যেন আঙ্গুরের চারা রোপন করেছে। তাতে আঙ্গুরের গুচ্ছ রয়েছে এবং সে তা ভেঙ্গে নিয়েছে। অতঃপর সে তা নিংড়িয়ে রস বের করেছে এবং বাদশাহ’কে পান করিয়েছে। হযরত ইউসুফের (আঃ) সামনে স্বপ্নের বর্ণনা দেয়ার পর সে তাঁকে এর তাৎপর্য বলে দিতে অনুরোধ করলো। আল্লাহর নবী হযরত ইউসুফ (আঃ) তাকে বললেনঃ “এর তাৎপর্য হচ্ছে এই যে, তিন দিন পরে তোমাকে জেলখানা হতে মুক্তি দেয়া হবে। আর তুমি তোমার কাজে অর্থাৎ বাদশাহর সুরা পরিবেশনকারী পদে পুনরায় নিযুক্ত হবে।” অপর ব্যক্তি বললো: “আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, আমি মাথায় রুটি বহন করছি এবং পাখী এসে তা থেকে খাচ্ছে।” অধিকাংশ মুফাসসিরদের মতে প্রসিদ্ধ উক্তি এই যে, প্রকৃতপক্ষে তারা উভয়েই এই স্বপ্নই দেখেছিল এবং এর সঠিক ব্যাখ্যা হযরত ইউসুফের (আঃ) নিকট জানতে চেয়েছিল। কিন্তু হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, প্রকৃতপক্ষে তারা কোন স্বপ্নই দেখে নাই। হযরত ইউসুফকে (আঃ) পরীক্ষা করবার জন্যেই শুধু তারা তার কাছে মিথ্যা স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছিল।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।