আল কুরআন


সূরা ইউসুফ (আয়াত: 35)

সূরা ইউসুফ (আয়াত: 35)



হরকত ছাড়া:

ثم بدا لهم من بعد ما رأوا الآيات ليسجننه حتى حين ﴿٣٥﴾




হরকত সহ:

ثُمَّ بَدَا لَهُمْ مِّنْۢ بَعْدِ مَا رَاَوُا الْاٰیٰتِ لَیَسْجُنُنَّهٗ حَتّٰی حِیْنٍ ﴿۳۵﴾




উচ্চারণ: ছু ম্মা বাদা-লাহুম মিম বা‘দি মা-রাআউল আ-য়া-তি লাইয়াছজুনুন্নাহূহাত্তা-হীন।




আল বায়ান: তারপর নিদর্শনসমূহ দেখার পরে তাদের কাছে স্পষ্ট হল, কিছু কাল পর্যন্ত অবশ্যই তারা তাকে কারারুদ্ধ করে রাখবে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৫. তারপর বিভিন্ন নিদর্শনাবলী দেখার পর তাদের মনে হল যে, তাকে অবশ্যই কিছু কালের জন্য কারারুদ্ধ করতে হবে।




তাইসীরুল ক্বুরআন: নিদর্শনবলী দেখার পর তাদের মনে হল যে, কিছু দিনের জন্য তাকে অবশ্য অবশ্যই কারারুদ্ধ করতে হবে।




আহসানুল বায়ান: (৩৫) নিদর্শনাবলী দেখার পরও তাদের মনে হল যে, তাকে কিছুকালের জন্য কারারুদ্ধ করতেই হবে। [1]



মুজিবুর রহমান: নিদর্শনাবলী দেখার পর তাদের মনে হল যে, তাকে কিছু কালের জন্য কারারুদ্ধ করতেই হবে।



ফযলুর রহমান: অতঃপর প্রমাণাদি দেখার পরে তারা তাকে কিছুকালের জন্য কারাগারে রাখতে মনস্থ করল।



মুহিউদ্দিন খান: অতঃপর এসব নিদর্শন দেখার পর তারা তাকে কিছুদিন কারাগারে রাখা সমীচীন মনে করল।



জহুরুল হক: অতঃপর সাক্ষীসাবুদ তারা দেখার পরে তাদের মনে হল তাঁকে কিছুকালের জন্য কারারুদ্ধ করাই উচিত।



Sahih International: Then it appeared to them after they had seen the signs that al-'Azeez should surely imprison him for a time.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৩৫. তারপর বিভিন্ন নিদর্শনাবলী দেখার পর তাদের মনে হল যে, তাকে অবশ্যই কিছু কালের জন্য কারারুদ্ধ করতে হবে।


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৩৫) নিদর্শনাবলী দেখার পরও তাদের মনে হল যে, তাকে কিছুকালের জন্য কারারুদ্ধ করতেই হবে। [1]


তাফসীর:

[1] নির্দোষিতা ও পবিত্রতা প্রকাশ হওয়ার পরেও ইউসুফ (আঃ)-কে জেলখানায় পাঠানোতে আযীযের দৃষ্টিতে এই যুক্তি ও কল্যাণ থাকতে পারে যে, তিনি ইউসুফ (আঃ)-কে তাঁর স্ত্রী থেকে দূরে রাখতে চাচ্ছিলেন, যাতে সে পুনরায় ইউসুফ (আঃ)-কে নিজ প্রেম-জালে ফাঁসানোর চেষ্টা না করতে পারে, যেমন তার ইচ্ছা তাই ছিল।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৩০-৩৫ নং আয়াতের তাফসীর:



শহরের মহিলারা আযীযের স্ত্রী (যুলাইখা) সম্পর্কে যা বলাবলি করছিল সে সম্পর্কে এ আয়াতগুলোতে আলোচনা করা হয়েছে।



আযীযে মিসর ইউসুফ (عليه السلام) কে ঘটনা চেপে যেতে বললেও ঘটনা চেপে থাকেনি। বরং নানা ডাল-পালা দিয়ে শহরে প্রচার হয়ে গেল। আযীযের স্ত্রীর এসব ঘটনা যখন শহরের লোকজন/নারীরা জানতে পারল তখন তারা অত্যন্ত বিস্ময় ও ঘৃণার সাথে এই ঘটনার সমালোচনা করতে লাগল। এমনকি তারা পরস্পরে বলতে লাগল যে, আযীযের স্ত্রী তার পুত্রসম দাসের সাথে অপকর্ম মনস কামনা করছে অথচ তার স্বামী বিদ্যমান। ক্রীতদাসের প্রেম তার অন্তরকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। এরকম বিভিন্ন কথা-বার্তা বলাবলি করতে লাগল। তাদের এই সমালোচনার কথা যখন সে মহিলার (যুলাইখা) কানে পৌঁছল তখন তাদেরকে আসার জন্য খবর পাঠাল এবং একটি ভোজ সভার আয়োজন করল এ প্রমাণ করার জন্য যে, আমি যার প্রেমে আসক্ত হয়েছি সে কি সাধারণ একজন দাস, না অসাধারণ সৌন্দর্যের অধিকারী। সভায় আগত মহিলাদের হাতে ফল কেটে খাওয়ার জন্য একটি করে ছুরি দেয়া হল। যখন মহিলারা ছুরি হাতে নিল তখন যুলাইখা ইউসুফ (عليه السلام) কে বলল: হে ইউসুফ! তুমি এই মহিলাদের সামনে দিয়ে হেঁটে যাও। এর আগে তাঁকে আড়াল করে রাখা হয়েছিল। তখন ইউসুফ (عليه السلام) তাদের সামনে দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছিলেন। অতঃপর মহিলারা ইউসুফ (عليه السلام) এর মনোমুগ্ধকর রূপ-সৌন্দর্য দেখে প্রথমে তাঁর মাহাত্ম্য ও মর্যাদা বর্ণনা করে, তারপর তারা এমন দিশেহারা হয়ে পড়ে যে, ঐ ছুরি দিয়ে ফল কাটার পরিবর্তে তাদের হাঁত কেটে ফেলল এবং সৌন্দর্য দেখে বলল যে, সে কোন সাধারণ মানুষ নয় বরং আল্লাহ তা‘আলার উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন ফেরেশতা! তখন যুলাইখা ঐ সমস্ত মহিলাদেরকে বলল: এই হচ্ছে সেই যুবক, যার ব্যাপারে তোমরা আমাকে অপবাদ রটিয়েছিলে। তোমরা এক নজর দেখে নিজেদের হাত কেটে ফেললে, বুঝতেও পারলেনা অথচ সে সর্বদা আমার প্রাসাদে থাকে আমি কিভাবে তাঁর প্রেমে আবদ্ধ না হয়ে পারি। তখন মহিলারা তাদের অপরাধ স্বীকার করল। এতে যুলাইখার মনে আরো সাহস বেড়ে গেল, লজ্জা-শরম যা ছিল তাও চলে গেল এবং বলল যে, আমি তাকে প্রেম নিবেদন করেছি কিন্তু সে নিজেকে পবিত্র রেখেছে। আমি তাকে যা আদেশ করব তা যদি সে আমার কথা মত না করে তাহলে তাকে অবশ্যই কারারুদ্ধ হতে হবে এবং হীনদের দলভুক্ত হবে। এতে যুলাইখা ইউসুফ (عليه السلام) কে কিছুটা হুমকি দিল।



তখন ইউসুফ (عليه السلام) ঐ মহিলার কথার প্রত্যত্তুরে আল্লাহ তা‘আলার কাছে এই বলে দু‘আ করলেন যে, হে আমার প্রতিপালক! এই মহিলারা আমাকে যে দিকে আহ্বান করছে তা থেকে কারাগারই আমার জন্য উত্তম। আপনি তাদের থেকে আমাকে রক্ষা করুন। আপনার সাহায্য ব্যতীত আমি কোন পাপকার্য থেকে বাঁচতে পারব না এবং কোন সৎ কাজও করতে পারব না। সুতরাং আপনি তাদের থেকে আমাকে হেফাযত করুন নতুবা আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। তখন আল্লাহ তা‘আলা ইউসুফ (عليه السلام) এর দু‘আ কবূল করলেন এবং তাঁর ডাকে সাড়া দিলেন ও তাঁকে মহিলাদের চক্রান্ত থেকে রক্ষা করলেন। অতঃপর ইউসুফ ঐ মহিলাদের সাথে অপকর্মে লিপ্ত হবার চেয়ে জেলে যাওয়াটাই পছন্দ করলেন এবং তিনি কারারুদ্ধও হলেন। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা সাত শ্রেণির মানুষকে আরশের ছায়া তলে স্থান দেবেন। তাদের মধ্যে এক শ্রেণি হল সে সকল যুবক যাদেরকে কোন রূপসী ও সম্ভ্রান্ত নারী অপকর্ম করার জন্য আহ্বান করে। কিন্তু সে তার ডাকে সাড়া না দিয়ে বলে আমি আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করি। (সহীহ বুখারী হা: ১৪২৩, সহীহ মুসলিম হা: ১০৩১)



নাবীগণ নিষ্পাপ মানুষ ছিলেন:



ইউসুফ (عليه السلام) এর প্রার্থনায় ‘আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ব’ এ কথার মথ্যে এ সত্য ফুটে উঠেছে যে, নাবীগণ মানুষ ছিলেন এবং মনুষ্যসুলভ স্বাভাবিক প্রবণতা তাদের মধেও ছিল। তবে আল্লাহ তা‘আলার বিশেষ অনুগ্রহ ও ব্যবস্থাধীনে তাঁরা যাবতীয় কবীরা গুনাহ থেকে মুক্ত থাকেন এবং নিষ্পাপ থাকেন। ইউসুফ (عليه السلام) এর অন্তরে অনিচ্ছাকৃত অপরাধ প্রবণতা সৃষ্টির আশংকাটি কেবল ধারণার পর্যায়ে ছিল। তা সগীরা বা কবীরা কোনরূপ গুনাহের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। নিঃসন্দেহে ইউসুফ ছিলেন নির্দোষ ও নিষ্পাপ এবং পূত পবিত্র চরিত্রের অধিকারী। (ثُمَّ بَدَا لَهُمْ) নির্দোষ ও পবিত্রতার নিদর্শন প্রকাশ হবার পরেও আযীয ও তার সহচর এ জন্য ইউসুফ (عليه السلام)-কে জেলে প্রেরণ করেছে যাতে ইউসুফ (عليه السلام) তার স্ত্রী থেকে দূরে থাকতে পারে এবং যে ঘটনা ঘটে গেছে তার চর্চা ও রটনা বন্ধ হয়ে যায়।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. অধিকাংশ মহিলারা গীবত ও পরনিন্দায় লিপ্ত হয়ে থাকে।

২. অপকর্মে লিপ্ত হবার চেয়ে শাস্তি ভোগ করাও উত্তম ও নিরাপদ। যেমন ইউসুফ (عليه السلام) কারারুদ্ধ হওয়াটাই পছন্দ করেছিলেন।

৩. আল্লাহ তা‘আলা তাঁর ওলী ও একনিষ্ঠ বান্দাদের ডাকে সাড়া দিয়ে থাকেন।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: আল্লাহ তাআ’লা বলেন যে, ইউসুফের (আঃ) পবিত্রতা সবারই কাছে প্রকাশিত হয়ে গেল। কিন্তু এরপরও তাকে কিছুকালের জন্যে কারারুদ্ধ করে রাখাই তারা যুক্তি সঙ্গত মনে করলো। কেননা, জনগণের মধ্যে এটা ছড়িয়ে পড়েছিল যে, আযীযের স্ত্রী যুলাইখা হযরত (ইউসুফের, আঃ) প্রেমে পাগলিনী হয়ে গেছে। সুতরাং এমতাবস্থায় যদি তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয় তবে তারা মনে করবে, যে তাঁরই হয়তো পদস্খলন ঘটে থাকবে।

কারণ এটাই ছিল যে, যখন মিসরের বাদশাহ কারাগার হতে মুক্তি দেয়ার জন্যে হযরত ইউসুফকে (আঃ) ডেকে পাঠান তখন তিনি জেলখানা থেকেই বলেছিলেনঃ “আমি বের হবো না যে পর্যন্ত না আমার নিরপরাধ হওয়া এবং পবিত্রতা স্পষ্টরূপে প্রকাশিত হয়ে যাবে। আমি কারাগারেই থাকবো যে পর্যন্ত বাদশাহ সাক্ষীদের মাধ্যমে এবং স্বয়ং আযীযের স্ত্রীর দ্বারা পূর্ণ সত্যতা যাচাই না করবেন যে, আমি সম্পূর্ণরূপে নিরপরাধ, আমি মোটেই বিশ্বাসঘাতকতা করি নাই। এটা সারা দুনিয়াবাসীর কাছে স্পষ্ট প্রতীয়মান না হওয়া পর্যন্ত আমি জেলখানা হতে বের হবে না।” অতঃপর যখন হযরত ইউসুফ (আঃ) কারাগার হতে বেরিয়ে আসেন তখন একটা লোকও এমন ছিল না যে তাঁর পবিত্রতা ও নিষ্কলুষতার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহ করেছিল। তাঁকে কারাগারে বন্দী করার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল এই যে, যেন আযীযের স্ত্রীর বদনাম না হয়।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।