আল কুরআন


সূরা ইউসুফ (আয়াত: 31)

সূরা ইউসুফ (আয়াত: 31)



হরকত ছাড়া:

فلما سمعت بمكرهن أرسلت إليهن وأعتدت لهن متكأ وآتت كل واحدة منهن سكينا وقالت اخرج عليهن فلما رأينه أكبرنه وقطعن أيديهن وقلن حاش لله ما هذا بشرا إن هذا إلا ملك كريم ﴿٣١﴾




হরকত সহ:

فَلَمَّا سَمِعَتْ بِمَکْرِهِنَّ اَرْسَلَتْ اِلَیْهِنَّ وَ اَعْتَدَتْ لَهُنَّ مُتَّکَاً وَّ اٰتَتْ کُلَّ وَاحِدَۃٍ مِّنْهُنَّ سِکِّیْنًا وَّ قَالَتِ اخْرُجْ عَلَیْهِنَّ ۚ فَلَمَّا رَاَیْنَهٗۤ اَکْبَرْنَهٗ وَ قَطَّعْنَ اَیْدِیَهُنَّ وَ قُلْنَ حَاشَ لِلّٰهِ مَا هٰذَا بَشَرًا ؕ اِنْ هٰذَاۤ اِلَّا مَلَکٌ کَرِیْمٌ ﴿۳۱﴾




উচ্চারণ: ফালাম্মা-ছামি‘আত বিমাকরিহিন্না আরছালাত ইলাইহিন্না ওয়া আ‘তাদাত লাহুন্না মুত্তাকাআওঁ ওয়া আ-তাত কুল্লা ওয়াহিদাতিম মিনহুন্না ছিক্কীনাওঁ ওয়া কা-লাতিখরুজ ‘আলাইহিন্না ফালাম্মা-রাআইনাহূআকবারনাহূওয়া কাত্তা‘না আইদিয়াহুন্না ওয়াকুলনা হা-শা লিল্লা-হি মা- হা-যা-বাশারান ইন হা-যা ইল্লা-মালাকুন কারীম।




আল বায়ান: অতঃপর যখন সে তাদের কূটকৌশলের কথা শুনতে পেল, তখন তাদেরকে ডেকে পাঠাল এবং তাদের জন্য আসন প্রস্তুত করল, আর তাদের প্রত্যেককে একটি করে ছুরি প্রদান করল এবং ইউসুফকে বলল, ‘তাদের সামনে বেরিয়ে আস’। অতঃপর তারা যখন তাকে দেখল, তখন তাকে বিশাল সৌন্দর্যের অধিকারী মনে করল এবং তারা নিজদের হাত কেটে ফেলল আর বলল, ‘মহিমা আল্লাহর, এতো মানুষ নয়। এ তো এক সম্মানিত ফেরেশতা’।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩১. অতঃপর স্ত্রীলোকটি যখন তাদের ষড়যন্ত্রের কথা শুনল, তখন সে তাদেরকে ডেকে পাঠাল(১) এবং তাদের জন্য আসন প্রস্তুত করল। আর তাদের সবাইকে একটি করে ছুরি দিল এবং ইউসুফকে বলল, তাদের সামনে বের হও। অতঃপর তারা যখন তাকে দেখল তখন তারা তার সৌন্দর্যে অভিভূত হল(২) ও নিজেদের হাত কেটে ফেলল এবং তারা বলল, অদ্ভুত আল্লাহর মাহাত্ম্য! এ তো মানুষ নয়, এ তো এক মহিমান্বিত ফেরেশতা(৩)।




তাইসীরুল ক্বুরআন: মহিলাটি যখন তাদের চক্রান্তের কথা জানতে পারল, তখন তাদেরকে ডেকে পাঠাল আর তাদের জন্য হেলান দিয়ে বসার ব্যবস্থা করল, আর তাদের প্রত্যেককে একটা করে ছুরি দিল। অতঃপর ইউসুফকে বলল, ‘ওদের সামনে বেরিয়ে এসো।’ যখন তারা তাকে দেখল, বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেল আর নিজেদের হাত কেটে ফেলল, আর বলল, ‘আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন, এ তো মানুষ নয়, এতো এক সম্মানিত ফেরেশতা।’




আহসানুল বায়ান: (৩১) মহিলাটি যখন তাদের চক্রান্তের কথা শুনল, তখন সে তাদেরকে ডেকে পাঠাল[1] এবং একটি বৈঠকের আয়োজন করল।[2] তাদের প্রত্যেককে একটি করে ছুরি দিল এবং তাকে বলল, ‘তাদের সামনে বের হও।’[3] অতঃপর তারা যখন তাকে দেখল, তখন তারা তার (রূপ-মাধুর্যে) অভিভূত হল এবং নিজেদের হাত কেটে ফেলল।[4] তারা বলল, ‘আল্লাহ পবিত্র! এ তো মানুষ নয়। এ তো এক মহিমান্বিত ফিরিশতা!’ [5]



মুজিবুর রহমান: স্ত্রী লোকটি যখন তাদের ষড়যন্ত্রের কথা শুনল, তখন সে তাদেরকে ডেকে পাঠাল, তাদের প্রত্যেককে একটি করে চাকু দিল এবং যুবককে বললঃ তাদের সামনে বের হও। অতঃপর তারা যখন তাকে দেখল তখন তারা তার সৌন্দর্যে অভিভূত হল এবং নিজেদের হাত কেটে ফেলল। তারা বললঃ অদ্ভুত আল্লাহর মাহাত্য! এতো মানুষ নয়, এতো এক মহিমান্বিত মালাক/ফেরেশতা!



ফযলুর রহমান: আযীযের স্ত্রী মহিলাদের এই চক্রান্তের কথা শুনে তাদেরকে ডেকে পাঠাল এবং তাদের জন্য একটি ভোজসভার আয়োজন করল। সে তাদের প্রত্যেককে (খাদ্যসামগ্রী কাটার জন্য) একটি করে চাকু দিল এবং (ইউসুফকে) বলল, এদের সামনে বের হও। তারা ইউসুফকে দেখে তার উচ্চ প্রশংসা করল এবং (তার সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে চাকু দিয়ে খাদ্য কাটার পরিবর্তে) নিজেদের হাত কেটে ফেলল আর বলল, “সোব্‌হানাল্লাহ! এ তো কোন মানুষ নয়। এ তো এক মহান ফেরেশতা।”



মুহিউদ্দিন খান: যখন সে তাদের চক্রান্ত শুনল, তখন তাদেরকে ডেকে পাঠাল এবং তাদের জন্যে একটি ভোজ সভার আয়োজন করল। সে তাদের প্রত্যেককে একটি ছুরি দিয়ে বললঃ ইউসুফ এদের সামনে চলে এস। যখন তারা তাকে দেখল, হতভম্ব হয়ে গেল এবং আপন হাত কেটে ফেলল। তারা বললঃ কখনই নয় এ ব্যক্তি মানব নয়। এ তো কোন মহান ফেরেশতা।



জহুরুল হক: সুতরাং সে যখন শুনলে তাদের ফন্দির কথা, সে তাদের ডেকে পাঠালে এবং তাদের জন্য তৈরি করলে গদির আসন, আর তাদের মধ্যের প্রত্যেককে দিলে একটি করে ছুরি, আর বললে -- "বেরিয়ে এস এদের সামনে।" অতঃপর তারা যখন তাঁকে দেখল তাঁকে ভাবলো অতুলনীয়, আর নিজেদের হাত কেটে ফেলল ও বললো -- "আল্লাহ্‌র কি নিখুঁত সৃষ্টি! এ তো মানুষ নয়, এ তো এক মহিমান্নিত ফিরিশ্‌তা।"



Sahih International: So when she heard of their scheming, she sent for them and prepared for them a banquet and gave each one of them a knife and said [to Joseph], "Come out before them." And when they saw him, they greatly admired him and cut their hands and said, "Perfect is Allah! This is not a man; this is none but a noble angel."



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৩১. অতঃপর স্ত্রীলোকটি যখন তাদের ষড়যন্ত্রের কথা শুনল, তখন সে তাদেরকে ডেকে পাঠাল(১) এবং তাদের জন্য আসন প্রস্তুত করল। আর তাদের সবাইকে একটি করে ছুরি দিল এবং ইউসুফকে বলল, তাদের সামনে বের হও। অতঃপর তারা যখন তাকে দেখল তখন তারা তার সৌন্দর্যে অভিভূত হল(২) ও নিজেদের হাত কেটে ফেলল এবং তারা বলল, অদ্ভুত আল্লাহর মাহাত্ম্য! এ তো মানুষ নয়, এ তো এক মহিমান্বিত ফেরেশতা(৩)।


তাফসীর:

(১) অর্থাৎ আযীয-পত্নী মহিলাদের চক্রান্তের কথা জানতে পারল, তখন তাদেরকে একটি ভোজসভায় ডেকে পাঠাল। এখানে মহিলাদের কানাঘুষাকে আযীয-পত্নী مكر অর্থাৎ চক্রান্ত বলেছে। অথচ, বাহ্যতঃ তারা কোন চক্রান্ত করেনি। কিন্তু যেহেতু তারা গোপনে গোপনে কুৎসা রটনা করত, তাই একে চক্রান্ত বলা হয়েছে। [কুরতুবী] কোন কোন মুফাসসির বলেন, এখানে চক্রান্ত বলে উদ্দেশ্য হচ্ছে, সে সমস্ত মহিলারা ইউসুফ আলাইহিস সালামের সৌন্দর্যের কথা শুনতে পেয়ে তাকে দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল। তখন তারা কানযুষা শুরু করে দিল যাতে তাকে দেখতে সমর্থ হয়। এটাই হচ্ছে তাদের চক্রান্ত। [ইবন কাসীর]


(২) মূল শব্দ যা ব্যবহার হয়েছে, তার অর্থ দাঁড়ায়, “তারা তাকে খুব বড় করল”। কিন্তু কিসে তাকে বড় করল? মূলত, তার সৌন্দর্যই তাকে তাদের দৃষ্টিতে বৃহৎ আকারে প্রতিভাত হলো, এজন্য আয়াতের অর্থ করা হয়েছে, তার সৌন্দর্যে তারা অভিভূত হল। এ অর্থের সপক্ষে আয়াতের পরবর্তী বাক্য “এ তো মানুষ নয়, এ তো এক মহিমান্বিত ফিরিশতা’। কারণ ফেরেশতাদের সৌন্দর্য সর্বজনস্বীকৃত। অন্য অর্থ হচ্ছে, তার মর্যাদা তাদের কাছে অনেক গুণ বেড়ে গেল। তারা তাকে উচ্চ মর্যাদাশীল মনে করল। [মুয়াসসার]


(৩) এ আয়াত থেকে আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারি যে, তাদের মধ্যেও ফিরিশতার উপর বিশ্বাস ছিল। অনুরূপভাবে এ আয়াত থেকে আরও জানতে পারি যে, ইউসুফ আলাইহিস সালাম অত্যন্ত সুন্দর ছিলেন। ইসরা ও মিরাজের বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইউসুফ আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বলেনঃ “তারপর আমি আচানকভাবে ইউসুফকে দেখতে পেলাম। তাকে সৌন্দর্যের অর্ধেকটাই দেয়া হয়েছে।” [মুসলিমঃ ১৬২]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৩১) মহিলাটি যখন তাদের চক্রান্তের কথা শুনল, তখন সে তাদেরকে ডেকে পাঠাল[1] এবং একটি বৈঠকের আয়োজন করল।[2] তাদের প্রত্যেককে একটি করে ছুরি দিল এবং তাকে বলল, ‘তাদের সামনে বের হও।’[3] অতঃপর তারা যখন তাকে দেখল, তখন তারা তার (রূপ-মাধুর্যে) অভিভূত হল এবং নিজেদের হাত কেটে ফেলল।[4] তারা বলল, ‘আল্লাহ পবিত্র! এ তো মানুষ নয়। এ তো এক মহিমান্বিত ফিরিশতা!’ [5]


তাফসীর:

[1] মিসরের মহিলাদের পশ্চাতে সমালোচনা এবং নিন্দা ও ভৎর্সনাকে ‘চক্রান্ত’ বলা হয়েছে। যার ফলে কোন কোন তফসীরবিদ বলেছেন যে, শহরের সেই নারীদের নিকটেও ইউসুফ (আঃ)-এর অপরূপ সৌন্দর্যের সংবাদ পৌঁছে গিয়েছিল এবং তারাও কোনক্রমে সেই সৌন্দর্যের অধিকারী (ইউসুফ)-কে দেখতে চাচ্ছিল। সুতরাং তারা তাদের সেই চক্রান্ত (গুপ্ত কৌশলে) কৃতকার্য হয়ে গেল। যেহেতু আযীয-পত্নী এই কথা প্রমাণ করার জন্য সেই মহিলাদেরকে যিয়াফত করল এবং তাদের ভোজনের ব্যবস্থা করল যে, আমি যার প্রতি আসক্তা হয়ে পড়েছি, সে শুধু একজন দাস বা সাধারণ ব্যক্তি নয়; বরং সে বাহ্যিক ও আভ্যন্তরিক এমন অসাধারণ সৌন্দর্যের অধিকারী যে, তাকে দেখে মন মুগ্ধ ও প্রাণ লুণ্ঠিত হওয়া কোন আশ্চর্যের বিষয় নয়।

[2] অর্থাৎ, এমন বসার স্থান নির্দিষ্ট করল, যেখানে হেলান-বালিশ রাখা হয়ে ছিল। যেমন বর্তমানে আরবদের মাঝে এরূপ মজলিস প্রসিদ্ধ আছে, এমনকি হোটেল ও রেস্তরাঁতেও তা রাখা হয়।

[3] অর্থাৎ, ইউসুফ (আঃ)-কে প্রথমে আড়ালে রাখা হয়েছিল। অতঃপর যখন উপস্থিত সব মহিলারা (ফল বা অন্য কিছু কেটে খাওয়ার জন্য) ছুরি হাতে নিল, তখন আযীয-পত্নী (যুলাইখা) ইউসুফ (আঃ)-কে উক্ত মজলিসে আসার আদেশ দিল।

[4] অর্থাৎ, ইউসুফের মনোমুগ্ধকর রূপ দেখে প্রথমতঃ তাঁর মাহাত্ম্য ও মর্যাদার কথা স্বীকার করল এবং দ্বিতীয়তঃ তারা নিজেরা এমন দিশেহারা হয়ে পড়ল যে, (ফল কাটার জায়গায়) নিজ নিজ হাতেই ছুরি চালিয়ে বসল, ফলে তাদের হাত কেটে রক্তাক্ত হয়ে গেল। হাদীসে এসেছে যে, ইউসুফকে (সৃষ্টির) অর্ধেক রূপ দান করা হয়েছিল। (মুসলিমঃ ঈমান অধ্যায়)

[5] এর অর্থ এ নয় যে, ফিরিশতাগণ আকার-আকৃতিতে মানুষ থেকে অধিক সুন্দর। কারণ, ফিরিশতাদেরকে তো মানুষ দেখেইনি। তাছাড়া আল্লাহ তাআলা মানুষ সম্পর্কে নিজেই কুরআন মাজীদে বর্ণনা দিয়েছেন যে, আমি তাদেরকে সুন্দরতম অবয়বে সৃষ্টি করেছি। (সূরা তীন) সেই মহিলাগণ ইউসুফ (আঃ)-কে ‘মানুষ নয়’ এই জন্য বলেছিল যে, তারা তখন যেরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী ব্যক্তিকে দেখেছিল, সেরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী কোন মানুষকে কখনো দেখেনি এবং তারা এই জন্য তাঁকে ফিরিশতা বলেছিল যে, সাধারণতঃ মানুষ মনে করে যে, ফিরিশতাগণ রূপ ও গুণের দিক থেকে এমন হন, যা মানুষ থেকে ঊর্ধ্বে। এ থেকে বুঝা গেল যে, নবীগণের অসাধারণ বৈশিষ্ট্য ও স্বতন্ত্র গুণাবলীর কারণে তাঁদেরকে মানব-বংশ থেকে বের করে ‘নূরের সৃষ্টি’ বলা সর্বযুগের এমন মানুষদের স্বভাব ছিল, যারা নবুঅত ও তাঁর মর্যাদার ব্যাপারে অজ্ঞ।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৩০-৩৫ নং আয়াতের তাফসীর:



শহরের মহিলারা আযীযের স্ত্রী (যুলাইখা) সম্পর্কে যা বলাবলি করছিল সে সম্পর্কে এ আয়াতগুলোতে আলোচনা করা হয়েছে।



আযীযে মিসর ইউসুফ (عليه السلام) কে ঘটনা চেপে যেতে বললেও ঘটনা চেপে থাকেনি। বরং নানা ডাল-পালা দিয়ে শহরে প্রচার হয়ে গেল। আযীযের স্ত্রীর এসব ঘটনা যখন শহরের লোকজন/নারীরা জানতে পারল তখন তারা অত্যন্ত বিস্ময় ও ঘৃণার সাথে এই ঘটনার সমালোচনা করতে লাগল। এমনকি তারা পরস্পরে বলতে লাগল যে, আযীযের স্ত্রী তার পুত্রসম দাসের সাথে অপকর্ম মনস কামনা করছে অথচ তার স্বামী বিদ্যমান। ক্রীতদাসের প্রেম তার অন্তরকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। এরকম বিভিন্ন কথা-বার্তা বলাবলি করতে লাগল। তাদের এই সমালোচনার কথা যখন সে মহিলার (যুলাইখা) কানে পৌঁছল তখন তাদেরকে আসার জন্য খবর পাঠাল এবং একটি ভোজ সভার আয়োজন করল এ প্রমাণ করার জন্য যে, আমি যার প্রেমে আসক্ত হয়েছি সে কি সাধারণ একজন দাস, না অসাধারণ সৌন্দর্যের অধিকারী। সভায় আগত মহিলাদের হাতে ফল কেটে খাওয়ার জন্য একটি করে ছুরি দেয়া হল। যখন মহিলারা ছুরি হাতে নিল তখন যুলাইখা ইউসুফ (عليه السلام) কে বলল: হে ইউসুফ! তুমি এই মহিলাদের সামনে দিয়ে হেঁটে যাও। এর আগে তাঁকে আড়াল করে রাখা হয়েছিল। তখন ইউসুফ (عليه السلام) তাদের সামনে দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছিলেন। অতঃপর মহিলারা ইউসুফ (عليه السلام) এর মনোমুগ্ধকর রূপ-সৌন্দর্য দেখে প্রথমে তাঁর মাহাত্ম্য ও মর্যাদা বর্ণনা করে, তারপর তারা এমন দিশেহারা হয়ে পড়ে যে, ঐ ছুরি দিয়ে ফল কাটার পরিবর্তে তাদের হাঁত কেটে ফেলল এবং সৌন্দর্য দেখে বলল যে, সে কোন সাধারণ মানুষ নয় বরং আল্লাহ তা‘আলার উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন ফেরেশতা! তখন যুলাইখা ঐ সমস্ত মহিলাদেরকে বলল: এই হচ্ছে সেই যুবক, যার ব্যাপারে তোমরা আমাকে অপবাদ রটিয়েছিলে। তোমরা এক নজর দেখে নিজেদের হাত কেটে ফেললে, বুঝতেও পারলেনা অথচ সে সর্বদা আমার প্রাসাদে থাকে আমি কিভাবে তাঁর প্রেমে আবদ্ধ না হয়ে পারি। তখন মহিলারা তাদের অপরাধ স্বীকার করল। এতে যুলাইখার মনে আরো সাহস বেড়ে গেল, লজ্জা-শরম যা ছিল তাও চলে গেল এবং বলল যে, আমি তাকে প্রেম নিবেদন করেছি কিন্তু সে নিজেকে পবিত্র রেখেছে। আমি তাকে যা আদেশ করব তা যদি সে আমার কথা মত না করে তাহলে তাকে অবশ্যই কারারুদ্ধ হতে হবে এবং হীনদের দলভুক্ত হবে। এতে যুলাইখা ইউসুফ (عليه السلام) কে কিছুটা হুমকি দিল।



তখন ইউসুফ (عليه السلام) ঐ মহিলার কথার প্রত্যত্তুরে আল্লাহ তা‘আলার কাছে এই বলে দু‘আ করলেন যে, হে আমার প্রতিপালক! এই মহিলারা আমাকে যে দিকে আহ্বান করছে তা থেকে কারাগারই আমার জন্য উত্তম। আপনি তাদের থেকে আমাকে রক্ষা করুন। আপনার সাহায্য ব্যতীত আমি কোন পাপকার্য থেকে বাঁচতে পারব না এবং কোন সৎ কাজও করতে পারব না। সুতরাং আপনি তাদের থেকে আমাকে হেফাযত করুন নতুবা আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। তখন আল্লাহ তা‘আলা ইউসুফ (عليه السلام) এর দু‘আ কবূল করলেন এবং তাঁর ডাকে সাড়া দিলেন ও তাঁকে মহিলাদের চক্রান্ত থেকে রক্ষা করলেন। অতঃপর ইউসুফ ঐ মহিলাদের সাথে অপকর্মে লিপ্ত হবার চেয়ে জেলে যাওয়াটাই পছন্দ করলেন এবং তিনি কারারুদ্ধও হলেন। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা সাত শ্রেণির মানুষকে আরশের ছায়া তলে স্থান দেবেন। তাদের মধ্যে এক শ্রেণি হল সে সকল যুবক যাদেরকে কোন রূপসী ও সম্ভ্রান্ত নারী অপকর্ম করার জন্য আহ্বান করে। কিন্তু সে তার ডাকে সাড়া না দিয়ে বলে আমি আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করি। (সহীহ বুখারী হা: ১৪২৩, সহীহ মুসলিম হা: ১০৩১)



নাবীগণ নিষ্পাপ মানুষ ছিলেন:



ইউসুফ (عليه السلام) এর প্রার্থনায় ‘আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ব’ এ কথার মথ্যে এ সত্য ফুটে উঠেছে যে, নাবীগণ মানুষ ছিলেন এবং মনুষ্যসুলভ স্বাভাবিক প্রবণতা তাদের মধেও ছিল। তবে আল্লাহ তা‘আলার বিশেষ অনুগ্রহ ও ব্যবস্থাধীনে তাঁরা যাবতীয় কবীরা গুনাহ থেকে মুক্ত থাকেন এবং নিষ্পাপ থাকেন। ইউসুফ (عليه السلام) এর অন্তরে অনিচ্ছাকৃত অপরাধ প্রবণতা সৃষ্টির আশংকাটি কেবল ধারণার পর্যায়ে ছিল। তা সগীরা বা কবীরা কোনরূপ গুনাহের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। নিঃসন্দেহে ইউসুফ ছিলেন নির্দোষ ও নিষ্পাপ এবং পূত পবিত্র চরিত্রের অধিকারী। (ثُمَّ بَدَا لَهُمْ) নির্দোষ ও পবিত্রতার নিদর্শন প্রকাশ হবার পরেও আযীয ও তার সহচর এ জন্য ইউসুফ (عليه السلام)-কে জেলে প্রেরণ করেছে যাতে ইউসুফ (عليه السلام) তার স্ত্রী থেকে দূরে থাকতে পারে এবং যে ঘটনা ঘটে গেছে তার চর্চা ও রটনা বন্ধ হয়ে যায়।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. অধিকাংশ মহিলারা গীবত ও পরনিন্দায় লিপ্ত হয়ে থাকে।

২. অপকর্মে লিপ্ত হবার চেয়ে শাস্তি ভোগ করাও উত্তম ও নিরাপদ। যেমন ইউসুফ (عليه السلام) কারারুদ্ধ হওয়াটাই পছন্দ করেছিলেন।

৩. আল্লাহ তা‘আলা তাঁর ওলী ও একনিষ্ঠ বান্দাদের ডাকে সাড়া দিয়ে থাকেন।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৩০-৩৪ নং আয়াতের তাফসীর

আল্লাহ তাআ’লা সংবাদ দিচ্ছেন যে, ইউসুফ (আঃ) ও আযীযের স্ত্রীর খবর শহরময় ছড়িয়ে পড়লো এবং ওটা হচ্ছে মিসর (এর শহর)। কতকগুলি ভদ্র মহিলা অত্যন্ত বিষ্ময় ও ঘৃণার সাথে এই ঘটনার সমালোচনা করতে থাকে। তারা পরস্পর বলাবলি করেঃ ‘যুলাইখার কর্মকান্ডটা দেখো! সে হচ্ছে উযীরের স্ত্রী, অথচ সে তার ক্রীতদাসের সাথে দুস্কার্যে লিপ্ত হতে চাচ্ছে! ক্রীতদাসের প্রেম তার অন্তরকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে।’

যহ্‌হাক (রঃ) হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, (আরবি) বলা হয় হত্যাকারী প্রেমকে। (আরবি) হচ্ছে এর নিম্নস্তরের প্রেম। আর (আরবি) বলা হয় অন্তরের পর্দাকে। স্ত্রীলোকগুলি বললো: “আমরা যুলাইখাকে স্পষ্ট বিভ্রান্তির মধ্যে দেখছি।

শহরের ভদ্রমহিলারা তাকে যে দোষারোপ করছে এ খবর তার কানে পৌঁছে গেল। এখানে ‘মকর’ বা ষড়যন্ত্র শব্দটি আনার কারণ এই যে, কারো কারো মতে এটা প্রকৃতপক্ষে ঐ মহিলাদের ষড়যন্ত্রই ছিল। আসলে তারা হযরত ইউসুফের (আঃ) দর্শন কামনা করছিল। সুতরাং যুলাইখাকে দোষারোপ করা তাদের একটা কৌশল ছিল মাত্র। আযীযের স্ত্রী যুলাইখা তাদের এই চাল বুঝে ফেললো। এতে সে তার ওজর পেশ করার একটা সুযোগ পেয়ে গেল। সে তাদেরকে বলে পাঠালো: ‘অমুক সময় আমার বাড়ীতে আপনাদের দাওয়াত থাকলো।’ ইবনু আব্বাস (রাঃ), সাঈদ ইবনু জুবাইর (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ) হাসান (রঃ), সুদ্দী (রঃ) প্রভৃতি গুরুজন বলেন যে, যুলাইখা মহিলাদের জন্যে এমন মজলিসের ব্যবস্থা করলো যেখানে খাদ্য হিসেবে ফল রাখা হয়েছিল। ফলগুলি কেটে কেটে ও ছিলে ছিলে খাওয়ার জন্যে সে প্রত্যেককে একটি করে ধাৱাল চাকু প্রদান করলো। এটাই ছিল মহিলাদের ষড়যন্ত্রের প্রতিফলন। তারা আসলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনয়ন করে ইউসুফের (আঃ) সৌন্দর্য দেখতে চেয়েছিল। যুলাইখা নিজেকে ক্ষমার্হ প্রমাণ এবং তাদের ষড়যন্ত্র প্রকাশ করার জন্যেই তাদেরকে আহত করলো এবং সেটাও আবার তাদের নিজেদের হাতে। যুলাইখা হযরত ইউসুফকে (আঃ) বললো: “তাদের কাছে বেরিয়ে এসো, হযরত ইউসুফ (আঃ) কি করে তার প্রভুপত্নীর আদেশ অমান্য করতে পারেন? তৎক্ষণাৎ তিনি ঐ কামরা থেকে বেরিয়ে আসলেন যেখানে তিনি অবস্থান করছিলেন। মহিলাদের দৃষ্টি তাঁর দিকে পড়া মাত্রই তারা তাঁর গরিমায় অভিভূত হয়ে পড়লো এবং তাঁর সৌন্দর্য দর্শনে একেবারে আত্মহারা হয়ে গেল। ফলে ঐ সূতীক্ষ্ণ চাকু দ্বারা ফল কাটার পরিবর্তে তারা নিজেদের হাতের অঙ্গুলীগুলি কেটে ফেললো।

হযরত যায়েদ ইবনু আসলাম (রঃ) বলেন যে, যিয়াফতের খাদ্য ইতিপূর্বেই যথারীতি পরিবেশন করা হয়েছিল এবং তাদের আহারও ছিল সমাপ্তির পথে। শুধুমাত্র ফল দ্বারা আপ্যায়ন অবশিষ্ট ছিল। তাদের হাতে চাকু ছিল এবং তা দ্বারা তারা ফল কাটতে ছিল। এমতাবস্থায় যুলাইখা তাদেরকে বললো: “আপনারা ইউসুফকে (আঃ) দেখতে চান কি?” সবাই সমস্বরে বলে উঠলো: “হ্যাঁ হ্যাঁ।” তখনই হযরত ইউসুফকে (আঃ) ডেকে পাঠানো হয় এবং তিনি তাদের সামনে হাযির হন। এর পরেই তাকে চলে যেতে বলা হয়। সুতরাং তিনি চলে যান। তাঁর এই আগমন ও প্রস্থানের ফলে তারা তার সামনের দিক এবং পিছনের দিক পূর্ণভাবে দেখবার সুযোগ পায়। তাকে দেখা মাত্রই তাদের মুর্ছা যাওয়ার উপক্রম হয় এবং ফল কাটার পরিবর্তে নিজেদের হাত কেটে ফেলে। কিন্তু তারা ব্যথা অনুভব করতে পারলো না। যখন হযরত ইউসুফ (আঃ) তাদের নিকট থেকে বিদায় হয়ে গেলেন তখন তারা ব্যথা অনুভব করলো এবং বুঝতে পারলো যে, ফলের পরিবর্তে তারা নিজেদের হাত কেটে ফেলেছে। ঐ সময় আযীযের স্ত্রী যুলাইখা তাদেরকে বললো: “দেখুন তো, একবার মাত্র তার সৌন্দর্য দর্শনে আপনারা আত্মভোলা হয়ে গেলেন, তাহলে আমার কি অবস্থা হতে পারে?” মহিলারা বলে উঠলো: “আল্লাহর কসম! ইনি তো মানুষ নন, বরং ফেরেশতা! সাধারণ ফেরেশতা নন বরং বড় মর্যাদাবান ফেরেশতা! আজ থেকে আমরা আর আপনাকে ভৎসনা করবো না।” ভদ্র-মহিলারা হযরত ইউসুফের (আঃ) মত তো নয়ই, এমনকি তাঁর কাছাকাছি এবং তাঁর সাথে সাদৃশ্যযুক্ত সুন্দর লোকও কখনো দেখে নাই। তাঁকে সৌন্দর্যের অর্ধেক দান করা হয়েছিল।

মি’রাজের সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তৃতীয় আকাশে হযরত ইউসুফের (আঃ) পার্শ্ব দিয়ে গমন করার সময় বলেনঃ “তাঁকে সৌন্দর্যের অর্ধেক দান করা হয়েছে।” হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্নিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ইউসুফকে (আঃ) এবং তাঁর মাতাকে অর্ধেক সৌন্দর্য দান করা হয়েছে।” হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্নিত, তিনি বলেনঃ “ইউসুফ (আঃ) এবং তাঁর মাতাকে সৌন্দর্যের এক তৃতীয়াংশ দান করা হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “হরত ইউসুফের (আঃ) মুখমন্ডল বিদ্যুতের মতো উজ্জ্বল ছিল। যখন কোন নারী কোন প্রয়োজনে তাঁর কাছে আসতো তখন তিনি তার ফিৎনায় পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় নিজের মুখমণ্ডল ঢেকে নিতেন।”

হযরত হাসান বসরী (রঃ) মুরসালরূপে নবী (সঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেনঃ “ইউসুফ (আঃ) এবং তাঁর মাতাকে দুনিয়াবাসীর সৌন্দর্যের এক তৃতীয়াংশ দান করা হয়েছে এবং বাকী দুই তৃতীয়াংশ সৌন্দর্য সারা দুনিয়ার লোককে দান করা হয়েছে।”

মুজাহিদ (রঃ) রাবী’’আ আল-জারাশী (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেনঃ “সৌন্দর্যকে দু'ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এক ভাগ দেয়া হয়েছে ইউসুফ (আঃ) এবং তাঁর মাতা সা’রা’কে এবং বাকী এক ভাগ দেয়া হয়েছে সমস্ত মাখলুককে।

ইমাম আবুল কাসিম আস-সুহাইলী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ হযরত ইউসুফকে (আঃ) হযরত আদমের (আঃ) অর্ধেক সৌন্দর্য দান করা হয়েছে। আল্লাহ তাআ’লা হযরত আদমকে (আঃ) নিজের হাতে পূর্ণ আকৃতির নমুনা বানিয়েছিলেন এবং খুবই সুন্দর করে সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর সন্তানদের মধ্যে তার সমপরিমাণ সৌন্দর্য কারো ছিল না। আর হযরত ইউসুফকে (আঃ) তার সৌন্দর্যের অর্ধেক দান করা হয়েছিল।

যা হোক, ঐ মহিলারা হযরত ইউসুফকে (আঃ) দেখা মাত্রই বলেছিলেনঃ “আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, ইনি তো মানুষ নন। (আরবি) শব্দটি অন্য কিরআতে (আরবি) রয়েছে। অর্থাৎ “ইনি ক্রীতদাস হতেই পারেন না। ইনি কোন মর্যাদাবান ফেরেশতা হবেন।” আযীযের স্ত্রী তখন তাদেরকে বললো: “এখন আপনারা আমাকে ক্ষমার্হ মনে করবেন কি? তাঁর সৌন্দর্য কি ধৈর্য শক্তি ছিনিয়ে নেয়ার মত নয়? আমি তাকে সব সময় নিজের দিকে আকৃষ্ট করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি সর্বদা আমার আয়ত্বের বাইরে রয়েছেন। আপনারা মনে রাখবেন যে, বাইরে তিনি যেমন তুলনীয় সৌন্দর্যের অধিকারী তেমনই ভিতরেও তিনি পবিত্র ও নিষ্কলুষ।

তাঁর বাহির যেমন সুন্দর ভিতরও তেমনই সুন্দর।” অতঃপর সে ধমক দিয়ে বলেঃ “যদি তিনি আমার কথা না মানেন এবং মনোবাঞ্ছা পূর্ণ না করেন তবে অবশ্যই তাঁকে জেলখানায় যেতে হবে এবং আমি তাঁকে কঠিনভাবে লাঞ্ছিত করবো।” ঐ সময় হযরত ইউসুফ (আঃ) আল্লাহ তাআ’লার আশ্রয় প্রার্থনা করে বলেছিলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক। এই নারীরা আমাকে যার প্রতি আহ্‌বান করছে তা অপেক্ষা কারাগার আমার কাছে অধিক প্রিয়। আমাকে আপনি তাদের কুকর্ম হতে রক্ষা করুন! আমি যেন দুষ্কার্যে লিপ্ত হয়ে না পড়ি। যদি আপনি আমাকে রক্ষা করেন তবেই আমি রক্ষা পাবো। আমার নিজের কোনই ক্ষমতা নেই। আমি আমার নিজের লাভ ও ক্ষতির মালিক নই। আপনার সাহায্য ও করুণা ছাড়া না আমি কোন পাপ কার্য থেকে বাঁচতে পারি, না কোন সৎ কাজ করতে পারি। হে আমার প্রতিপালক! আমি আপনার কাছেই সাহায্য চাচ্ছি এবং আপনার উপরই ভরসা করছি। আপনি আমাকে আমার নফসের কাছে সমর্পণ করবেন না যে, আমি ঐ মহিলাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ি এবং মুখদের অন্তর্ভুক্ত হই।”

মহান আল্লাহ তাঁর প্রার্থনা কবুল করলেন এবং নির্লজ্জতাপূর্ণ কাজ থেকে বাঁচিয়ে নিলেন। তাঁকে তিনি পবিত্রতা দান করলেন এবং স্বীয় হিফাযতে রাখলেন। অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা থেকে তিনি রক্ষা পেতেই থাকলেন। অথচ তিনি সেই সময় পূর্ণ যৌবনে পদার্পণ করেছিলেন এবং তিনি পূর্ণমাত্রায় সৌন্দর্যের অধিকারী হয়েছিলেন। তার ভিতরে বিভিন্ন প্রকারের সদ্গুণাবলীর সমাবেশ ঘটেছিল। তথাপি তিনি স্বীয় প্রবৃত্তিকে দমন করেছিলেন এবং আযীযের স্ত্রী যুলাইখার প্রতি মোটেই ভ্রূক্ষেপ করেননি। অথচ সে ছিল নেতার কন্যা ও নেতার স্ত্রী এবং তার প্রভুপত্নী। তাছাড়া সে ছিল অতীব সুন্দরী ও প্রচুর মালের অধিকারিণী। সে তাকে বলেছিল যে, যদি তিনি তার কথা মেনে নেন তবে সে তাকে পুরস্কৃত করবে এবং না মানলে কারাগারে পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু তাঁর অন্তরে ছিল আল্লাহর ভয়। তাই তিনি পার্থিব সুখ শান্তিকে আল্লাহর নামে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন এবং ওর উপর কারাগারকেই পছন্দ করেছিলেন। উদ্দেশ্য একমাত্র এটাই যে, এর মাধ্যমে তিনি আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা পাবেন এবং পরকালে সাওয়াবের অধিকারী হবেন। এ জন্যেই সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সাত প্রকারের লোককে আল্লাহ তাঁর (আর্‌শের) ছায়ায় স্থান দিবেন, এমন দিনে যেই দিন তার ছায়া ছাড়া অন্য কোন ছায়া থাকবে নাঃ (১) ন্যায় পরায়ন বাদশাহ, (২) ঐ যুবক (বা যুবতী) যে তার যৌবনকে আল্লাহর ইবাদতে কাটিয়ে দিয়েছে, (৩) ঐ ব্যক্তি যার অন্তর সদা মসজিদে লটকানো থাকে, যখন সে মসজিদ হতে বের হয় যে পর্যন্ত না সে তাতে ফিরে যায়, (৪) এমন দুই ব্যক্তি যারা আল্লাহর জন্যেই একে অপরকে ভালবাসে, আল্লাহর জন্যেই তারা একত্রিত থাকে এবং আল্লাহর জন্যেই বিচ্ছিন্ন হয়, (৫) ঐ ব্যক্তি যে এমন গোপনে দান করে যে, তার ডান হাত যা দান করে বাম হাত তা জানতে পারে না, (৬) ঐ ব্যক্তি যাকে সম্ভ্রান্ত বংশীয়া ও সুশ্রী নারী কু-কাজের দিকে আহ্‌বান করে এবং সে বলেঃ আমি আল্লাহকে ভয় করি, (৭) ঐ ব্যক্তি যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে, অতঃপর তার দু'চক্ষু দিয়ে অশ্রু বয়ে যায়।”





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।