সূরা ইউসুফ (আয়াত: 18)
হরকত ছাড়া:
وجاءوا على قميصه بدم كذب قال بل سولت لكم أنفسكم أمرا فصبر جميل والله المستعان على ما تصفون ﴿١٨﴾
হরকত সহ:
وَ جَآءُوْ عَلٰی قَمِیْصِهٖ بِدَمٍ کَذِبٍ ؕ قَالَ بَلْ سَوَّلَتْ لَکُمْ اَنْفُسُکُمْ اَمْرًا ؕ فَصَبْرٌ جَمِیْلٌ ؕ وَ اللّٰهُ الْمُسْتَعَانُ عَلٰی مَا تَصِفُوْنَ ﴿۱۸﴾
উচ্চারণ: ওয়া জাঊ ‘আলা-কামীসিহী বিদামিন কাযিবিন কা-লা বাল ছাওওয়ালাত লাকুম আনফুছুকুম আমরান ফাসাবরুন জামীলুওঁ ওয়াল্লা-হুল মুছতা‘আ-নু‘আলা-মাতাসিফূন।
আল বায়ান: আর তারা তার জামায় মিথ্যা রক্ত লাগিয়ে নিয়ে এসেছিল। সে বলল, ‘বরং তোমাদের নফস তোমাদের জন্য একটি গল্প সাজিয়েছে। সুতরাং (আমার করণীয় হচ্ছে) সুন্দর ধৈর্য। আর তোমরা যা বর্ণনা করছ সে বিষয়ে আল্লাহই সাহায্যস্থল’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৮. আর তারা তার জামায় মিথ্যা রক্ত লেপন করে এনেছিল। তিনি বললেন, না, বরং তোমাদের মন তোমাদের জন্য একটি কাহিনী সাজিয়ে দিয়েছে। কাজেই উত্তম ধৈর্যই আমি গ্রহণ করব। আর তোমরা যা বর্ণনা করছ সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহ্ই আমার সাহায্যস্থল।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: তারা তার জামায় মিছেমিছি রক্ত মাখিয়ে নিয়ে এসেছিল। পিতা বলল, ‘না, বরং তোমাদের প্রবৃত্তি তোমাদেরকে একটা কাহিনী বানাতে উদ্বুদ্ধ করেছে। ঠিক আছে, আমি পুরোপুরি ধৈর্য ধারণ করব, তোমরা যা বানিয়েছ সে ব্যাপারে আল্লাহই আমার আশ্রয়স্থল।’
আহসানুল বায়ান: (১৮) আর তারা তার জামায় মিথ্যা রক্ত লেপন করে এনেছিল। সে বলল, ‘বরং তোমাদের মন তোমাদের জন্য একটি কাহিনী গড়ে নিয়েছে। সুতরাং আমার পক্ষে পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়।[1] তোমরা যা বর্ণনা করছ সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্যস্থল।’[2]
মুজিবুর রহমান: আর তারা তার জামায় মিথ্যা রক্ত লেপন করে এনেছিল। সে বললঃ না, তোমাদের মন তোমাদের জন্য একটি কাহিনী সাজিয়ে দিয়েছে। সুতরাং পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়, তোমরা যা বলছ সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্যস্থল।
ফযলুর রহমান: তারা তার জামায় মিথ্যা রক্ত লাগিয়ে এনেছিল। সে (বাবা) বলল, “(তোমাদের কথা ঠিক নয়) বরং তোমরা নিজেরা একটি ঘটনা সাজিয়েছো। অতএব, (আমার জন্য) ধৈর্যই শ্রেয়। আর তোমরা যা বলছ সে ব্যাপারে একমাত্র আল্লাহরই সাহায্য চাওয়া যায়।”
মুহিউদ্দিন খান: এবং তারা তার জামায় কৃত্রিম রক্ত লাগিয়ে আনল। বললেনঃ এটা কখনই নয়; বরং তোমাদের মন তোমাদেরকে একটা কথা সাজিয়ে দিয়েছে। সুতরাং এখন ছবর করাই শ্রেয়। তোমরা যা বর্ণনা করছ, সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্য স্থল।
জহুরুল হক: আর তারা এল তাঁর সার্টের উপরে ঝুটা রক্ত নিয়ে। তিনি বললেন -- "না, তোমাদের অন্তর তোমাদের জন্য এই বিষয়টি উদ্ভাবন করেছে, কিন্তু ধৈর্যধারণই উত্তম। আর আল্লাহ্ই সাহায্য কামনার স্থল তোমরা যা বর্ণনা করছ সে-ক্ষেত্রে।"
Sahih International: And they brought upon his shirt false blood. [Jacob] said, "Rather, your souls have enticed you to something, so patience is most fitting. And Allah is the one sought for help against that which you describe."
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৮. আর তারা তার জামায় মিথ্যা রক্ত লেপন করে এনেছিল। তিনি বললেন, না, বরং তোমাদের মন তোমাদের জন্য একটি কাহিনী সাজিয়ে দিয়েছে। কাজেই উত্তম ধৈর্যই আমি গ্রহণ করব। আর তোমরা যা বর্ণনা করছ সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহ্ই আমার সাহায্যস্থল।(১)
তাফসীর:
(১) অর্থাৎ ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর ভ্রাতারা তার জামায় কৃত্রিম রক্ত লাগিয়ে এনেছিল, যাতে পিতার মনে বিশ্বাস জন্মাতে পারে যে, বাঘই তাকে খেয়ে ফেলেছে। কিন্তু ইয়াকুব আলাইহিস সালাম ঠিকই বুঝলেন যে, ইউসুফকে বাঘে খায়নি; বরং তোমাদেরই মন একটি বিষয় খাড়া করেছে। এখন আমার জন্য উত্তম এই যে, ধৈর্য্যধারণ করি এবং তোমরা যা বল, তাতে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করি।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৮) আর তারা তার জামায় মিথ্যা রক্ত লেপন করে এনেছিল। সে বলল, ‘বরং তোমাদের মন তোমাদের জন্য একটি কাহিনী গড়ে নিয়েছে। সুতরাং আমার পক্ষে পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়।[1] তোমরা যা বর্ণনা করছ সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্যস্থল।’[2]
তাফসীর:
[1] বলা হয় যে, তাঁরা একটি ছাগল ছানা যবেহ করে ইউসুফের জামায় রক্ত লেপন করে নেন এবং এ কথা তাঁরা ভুলে যান যে, যদি ইউসুফকে বাঘে খেয়ে ফেলত, তবে অবশ্যই তাঁর জামাও ছিঁড়ে যেত। কিন্তু জামা অক্ষত অবস্থায় ছিল। যা দেখে এবং তার উপর ইউসুফ (আঃ)-এর স্বপ্ন এবং নিজ নবুঅতের জ্ঞান দ্বারা অনুমান করে ইয়াকূব (আঃ) বললেন, ঘটনা ঐরূপ ঘটেনি, যেরূপ তোমরা বর্ণনা করছ; বরং তোমরা নিজের মন থেকে সাজিয়ে এ কথা বলছ। সুতরাং যা হওয়ার ছিল তা হয়ে গেছে। কিন্তু ইয়াকূব (আঃ) ঘটনার আসল রহস্য জানতেন না, ফলে ধৈর্য ছাড়া কোন অবলম্বন এবং আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোন উপায় তাঁর ছিল না।
[2] মদীনার মুনাফেকরা যখন আয়েশা (রাঃ) উপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে, তখন নবী (সাঃ) তাঁর ব্যাপারে যা বুঝেছিলেন ও বলেছিলেন তার উত্তরে তিনিও বলেছিলেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি আমার ও আপনাদের জন্য ইউসুফের আব্বার ঐ উদাহরণই দেখতে পাচ্ছি। সুতরাং ‘‘আমার পক্ষে পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়। তোমরা যা বর্ণনা করছ, সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্যস্থল।’’ অর্থাৎ আমারও ধৈর্য ধারণ করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১১-১৮ নং আয়াতের তাফসীর:
অত্র আয়াতগুলোতে ইউসুফ (عليه السلام)-এর এগার ভাই তাঁর ক্ষতিসাধন করার জন্য যে মিথ্যা কাহিনী তাঁর পিতার নিকট বানিয়ে বলেছিল সে সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে।
ইউসুফ (عليه السلام) এর দশ বৈমাত্রেয় ভাই তাদের সিদ্ধান্ত অনুসারে ইউসুফ (عليه السلام)-কে জঙ্গলে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রতারণার আশ্রয় নিল। তারা একদিন পিতা ইয়া‘কূব (عليه السلام) এর কাছে এসে ইউসুফকে সাথে নিয়ে পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে আনন্দ ভ্রমণে যাবার প্রস্তাব পেশ করল। তারা পিতাকে বলল, আগামীকাল আপনি ইউসুফকে আমাদের সাথে মাঠে যেতে দিন। সেখানে সবার সাথে সে ফল-মূল খাবে, খেলা-ধূলা করবে এবং আনন্দ-উল্লাস করবে। আমরা তাঁর রক্ষণাবেক্ষণ করব। তাদের কথার উত্তরে ইয়া‘কূব (عليه السلام) বললেন, তোমরা তাকে নিয়ে যাবে, আমি দুশ্চিন্তায় থাকব আর আমার ভয় হয় যে, তোমরা তাঁকে রেখে খেলা-ধূলা করতে যাবে তখন নেকড়ে বাঘ তাকে খেয়ে ফেলবে। তারা বলল, আমাদের সাথে ইউসুফকে পাঠাতে আপনি নিরাপদ মনে করছেন না কেন? ইউসুফের ব্যাপারে আপনি কি আমাদের প্রতি অবিশ্বাস করছেন? অথচ আমরা তাঁর ভাই; আমরা তাঁর কল্যাণকামী। আমরা এতগুলো ভাই থাকতে নেকড়ে বাঘ খেয়ে ফেলবে তাহলে তো আমরা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাব। উল্লেখ্য যে, কেন‘আন অঞ্চলে সে সময়ে বাঘের আক্রমণের ভয় বেশি ছিল। তাছাড়াও ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, ইয়া‘কূব (عليه السلام) পূর্বরাতে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তিনি পাহাড়ের ওপরে আছেন আর নীচে ইউসুফ (عليه السلام) খেলা করছে। হঠাৎ দশটি বাঘ এসে তাকে ঘেরাও করে ফেলে এবং আক্রমণ করতে উদ্যত হয়। কিন্তু তন্মধ্যে একটি বাঘ এসে তাকে মুক্ত করে দেয়। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: উক্ত স্বপ্নের ব্যাখ্যা অনুযায়ী ইয়া‘কূব (عليه السلام) তার দশ পুত্রকেই বাঘ গণ্য করেছিলেন (কুরতুবী)। তখন তারা ছলে বলে কৌশলে পিতাকে এসব কথা বলে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করল এবং ছেলেদের পীড়াপীড়িতে এক পর্যায় তিনি রাযী হলেন। কিন্তু তাদের থেকে অঙ্গীকার নিলেন যাতে তারা ইউসুফের কোনরূপ কষ্ট না দেয় এবং সর্বদা তার প্রতি খেয়াল রাখে। অতঃপর যখন ইউসুফ (عليه السلام) কে তাদের সাথে নিয়ে যেতে সক্ষম হল তখন তারা তাদের সিদ্ধান্ত অনুপাতে ইউসুফ (عليه السلام) কে কূপে নিক্ষেপ করল। আর এমতাবস্থায় আল্লাহ তা‘আলা ইউসুফ (عليه السلام) এর প্রতি ওয়াহী করলেন যে, তুমি ঘাবড়ে যেও না; আমি তোমাকে সংরক্ষণ তো করবই বরং তোমাকে এমন মর্যাদার অধিকারী বানাব যে, তোমার ভাইয়েরা তোমার নিকট সাহায্যের জন্য আসবে। তখন তুমি তাদেরকে এই কর্মের কথা বলে দেবে আর তারা তোমাকে চিনতে পারবে না। যেমন অত্র সূরার ৮৯ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে এবং ৫৮ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে যে, যখন দুর্ভিক্ষের সময় তারা মিসরে যায় ইউসুফ (عليه السلام) তাদেরকে চিনতে পারেন কিন্তু তারা ইউসুফ (عليه السلام) কে চিনতে পারেনি।
(وَأَوْحَيْنَآ إِلَيْهِ) ‘আমি তাকে ওয়াহী করলাম’ যদিও ইউসুফ (عليه السلام) তখন ছোট কিন্তু যাকে আল্লাহ তা‘আলা নবুওয়াত দেবেন তাদের অনেককে শৈশবেও ওয়াহী প্রেরণ করেন। তবে এ ওয়াহী নবুওয়াতী ওয়াহী ছিল না। কেননা সাধারণতঃ চল্লিশ বছর বয়স হওয়ার পূর্বে আল্লাহ তা‘আলা কাউকে নাবী করেন না। এ ওয়াহী ছিল সেরূপ, যেরূপ ওয়াহী বা ইলহাম এসেছিল শিশু মূসার মায়ের কাছে এবং ইয়াহইয়া (عليه السلام)-এর কাছে। ইমাম কুরতুবী বলেন: কূপে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পূর্বেই অথবা পরে ইউসুফকে সান্ত্বনা ও মুক্তির সুসংবাদস্বরূপ এ ওয়াহী নাযিল হয়েছিল।
পিতার নিকটে ভাইদের কৈফিয়ত:
ইউসুফ (عليه السلام)-কে অন্ধকূপে ফেলে দিয়ে একটা ছাগলছানা জবেহ করে তার রক্ত ইউসুফ (عليه السلام) এর পরিত্যক্ত জামায় মেখে তারা সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরল এবং কাঁদতে কাঁদতে পিতার কাছে হাযির হয়ে কৈফিয়ত পেশ করে বলল: হে আমাদের পিতা! আমরা যখন দৌড় প্রতিযোগিতায় মত্ত ছিলাম এমতাবস্থায় ইউসুফ আমাদের মালপত্রের নিকট ছিল আর তখন নেকড়ে বাঘ এসে তাকে খেয়ে ফেলে। আমরা জানি আপনি আমাদের কথা বিশ্বাস করবেন না যদিও আমরা সত্যবাদী। প্রমাণস্বরূপ ইউসুফ (عليه السلام) এর রক্তমাখা জামা পেশ করল। কিন্তু তারা এটা বুুঝতে পারেনি যে, বাঘে খেয়ে ফেললে কি জামা অক্ষত থাকে? তাই যখন রক্তমাখা অক্ষত জামা পিতার কাছে নিয়ে আসল তখন ইয়া‘কূব (عليه السلام) বুঝতে পারলেন এটা তাদের সাজানো ঘটনা। প্রকৃত ঘটনা এটা নয়। সুতরাং এখন ধৈর্য ধারণ করা ব্যতীত আর কোন উপায় নেই। আল্লাহ তা‘আলাই এ ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করবেন। তখন ইয়া‘কূব (عليه السلام) সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা করলেন। মদীনার মুনাফিকরা আয়িশাহ কে যখন মিথ্যা অপবাদ দিয়েছিল তখন নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ ব্যাপারে আয়িশাহ কে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেছিলেন: আল্লাহ তা‘আলার কসম! আমি আমার ও আপনাদের জন্য ইউসুফের বাবার ঐ উদাহরণ দেখতে পাচ্ছি। সুতরাং আমার পক্ষে পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়। তোমরা যা বর্ণনা করছ, সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই আমার সাহায্যস্থল। (সহীহ বুখারী হা: ৪৭৫০)
عُصْبَةٌ অর্থাৎ শক্তিশালী দল, سَوَّلَتْ চাকচিক্য করে দেয়া, আকর্ষণীয় করে দেয়া।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. বিপদে বিচলিত না হয়ে বরং ধৈর্যধারণ করতে হবে এবং আল্লাহ তা‘আলার সাহায্য চাইতে হবে।
২. মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে, মিথ্যার পরিণতি ভয়াবহ।
৩. যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে সহযোগিতা করেন।
৪. দৌড়, তীর নিক্ষেপ ও কুস্তী ইসলামে বৈধ খেলা তবে যেন সীমালংঘন না হয়।
৫. কোন বিষয়ে সঠিক জ্ঞান না আসা পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলার দিকে সোপর্দ করে দেয়া উচিত।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১৬-১৮ নং আয়াতের তাফসীর
হযরত ইউসুফকে (আঃ) অন্ধকার কূপে ফেলে দেয়ার পর তাঁর ভ্রাতাগণ কি করেছিল আল্লাহ তাআ’লা এখানে সেই খবরই দিচ্ছেন। গুপ্তভাবে তারা ছোট ভাই, আল্লাহর নিস্পাপ নবী এবং পিতার চোখের মণি হযরত ইউসুফের (আঃ) উপর অবিচার ও অত্যাচারের পাহাড় ভেঙ্গে দিয়ে রাত্রে তারা বাহ্যিকভাবে দুঃখের ভান করে কাঁদতে কাঁদতে পিতার নিকট আগমন করে। আর ইউসুফকে (আঃ) হাত ছাড়া করে দেয়ার কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেঃ “হে পিতঃ! আমরা তীরন্দাযী ও দৌড় প্রতিযোগিতা শুরু করি এবং ছোট ভাই ইউসুফকে (আঃ) আমাদের আসবাবপত্রের নিকট রেখে যাই। ঘটনাক্রমে ঐ সময়েই নেকড়ে বাঘ এসে পড়ে এবং তাঁকে খেয়ে ফেলে। এরপর তারা তাদের পিতার কাছে নিজেদের কথা সত্য প্রমাণিত করার জন্যে বললো: “আব্বাজান! এটা এমন একটা ঘটনা যে, তা সত্য বলে মেনে নিতে আপনার বিবেকে বাধছে, পূর্বেই তো আপনার মনে খটকা লেগেছিল এবং ঘটনাক্রমে তা ঘটেই গেল। তবুও কিন্তু আপনি আমাদেরকে সত্যবাদী রূপে মেনে নিতে পারছেন না। অথচ আমরা যে সত্যবাদী তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ থাকতে পারে না। কিন্তু আমাদেরকে সত্যবাদীরূপে মেনে না নেয়ার ব্যাপারে আপনি একদিক দিয়ে সত্যের উপর রয়েছেন। কেননা, এটা এমনই একটা অস্বাভাবিক ঘটনা যে, এটা দেখে আমরা নিজেরাই বিস্মিত না হয়ে পারি না। এটা ছিল তাদের মৌখিক কথা। এছাড়া একটা মিথ্যা প্রমাণও তারা পেশ করেছিল। অর্থাৎ তারা বকরীর একটা বাচ্চাকে যবাহ করে ওর রক্ত দ্বারা হযরত ইউসুফের (অঃ) জামাটি রঞ্জিত করেছিল। ঐ জামাটি তারা পিতার সামনে হাযির করে বলেছিলঃ “দেখুন! ইউসুফের (আঃ) দেহের রক্ত তার জামায় ভরে রয়েছে। কিন্তু আল্লাহ তাআ’লার কি মহিমা যে, তারা সবকিছুই করেছিল, কিন্তু জামাটি ছেদন করতে ভুলে গিয়েছিল। ফলে পিতার কাছে তাদের প্রতারণা ধরা পড়ে যায়। কিন্তু তিনি নিজেকে সামলিয়ে নিলেন এবং স্পষ্টভাবে ছেলেদেরকে তেমন কিছু বললেন না। তথাপি ছেলেরা বুঝে নেয় যে, তাদের পিতার কাছে তাদের ধোকাবাজী ধরা পড়ে গেছে। তাদের পিতা তাদেরকে শুধু বললেনঃ “তোমাদের মন এই কথা বানিয়ে নিয়েছে। যাই হোক, আমি ধৈর্য ধারণ করবো যে পর্যন্ত না আল্লাহ তাআ’লা দয়া পরবশ হয়ে আমার এই দুঃখ দুর করে দেন। তোমরা যে একটা মিথ্যা কথা আমার কাছে বর্ণনা করছে এবং একটা অসম্ভব ব্যাপারের উপর আমাকে বিশ্বাস স্থাপন করতে বলছো তার জন্যে আমি একমাত্র আল্লাহরই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করছি। যদি তাঁর সাহায্য লাভে আমি সমর্থ হই তবে অবশ্যই দুধ ও পানি পৃথক হয়ে যাবে।
হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইউসুফের (আঃ) রক্ত-রঞ্জিত জামাটি দেখে তাঁর পিতা হযরত ইয়াকুব (আঃ) বলেছিলেনঃ “এটা বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার যে, নেকড়ে বাঘে ইউসুফকে (আঃ) খেয়ে ফেললো এবং তাঁর জামাটি রক্তে রঞ্জিত হলো, অথচ তা একটুও ছিড়লো না বা ফাটলো না! যা হোক, আমি ধৈর্যধারণকরবো, যাতে না থাকবে কোন অভিযোগ এবং না থাকবে কোন চিন্তা ও উদ্বেগ।”
সাওরী (রঃ) তাঁর কোন এক সহচর হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেনঃ “সবর বা ধৈর্য হচ্ছে তিনটি জিনিষের নাম। (১) নিজের বিপদ আপদের কথা কারো কাছে বর্ণনা না করা। (২) নিজের দুঃখের কাহিনী গেয়ে কারো সামনে ক্রন্দন না করা এবং (৩) নিজেকে পাক পবিত্র মনে না করা।” এখানে ইমাম বুখারী (রঃ) হযরত আয়েশার (রাঃ) ঐ ঘটনাটির পূর্ণ হাদীস বর্ণনা করেছেন, যাতে তাঁর উপর অপবাদ লাগানোর বর্ণনা রয়েছে। সেখানে তিনি বলেছেনঃ “আল্লাহর শপথ! আমার এবং আপনাদের দৃষ্টান্ত হযরত ইউসুফের (আঃ) পিতার মতই বটে। তিনি বলেছিলেনঃ “এখন পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়, তোমরা যা বলছে সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্যস্থল।”
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।