সূরা ইউসুফ (আয়াত: 17)
হরকত ছাড়া:
قالوا يا أبانا إنا ذهبنا نستبق وتركنا يوسف عند متاعنا فأكله الذئب وما أنت بمؤمن لنا ولو كنا صادقين ﴿١٧﴾
হরকত সহ:
قَالُوْا یٰۤاَبَانَاۤ اِنَّا ذَهَبْنَا نَسْتَبِقُ وَ تَرَکْنَا یُوْسُفَ عِنْدَ مَتَاعِنَا فَاَکَلَهُ الذِّئْبُ ۚ وَ مَاۤ اَنْتَ بِمُؤْمِنٍ لَّنَا وَ لَوْ کُنَّا صٰدِقِیْنَ ﴿۱۷﴾
উচ্চারণ: কা-লূইয়াআবা-নাইন্না-যাহাবনা-নাছতাবিকুওয়া তারাকনা-ইঊছুফা ‘ইনদা মাতা-‘ইনাফাআকালাহুযযি’বু ওয়ামাআনতা বিমু’মিনিল লানা-ওয়ালাও কুন্না-সা-দিকীন।
আল বায়ান: তারা বলল, ‘হে আমাদের পিতা, আমরা প্রতিযোগিতা করতে গিয়েছিলাম আর ইউসুফকে রেখে গিয়েছিলাম আমাদের মালপত্রের নিকট, অতঃপর নেকড়ে তাকে খেয়ে ফেলেছে। আর আপনি আমাদেরকে বিশ্বাস করবেন না, যদিও আমরা সত্যবাদী হই’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৭. তারা বলল, হে আমাদের পিতা! আমরা দৌড়ের প্রতিযোগিতা করতে গিয়েছিলাম(১) এবং ইউসুফকে আমাদের মালপত্রের কাছে রেখে গিয়েছিলাম, অতঃপর নেকড়ে বাঘ তাকে খেয়ে ফেলেছে; কিন্তু আপনি তো আমাদেরকে বিশ্বাস করবেন না যদিও আমরা সত্যবাদী হই।
তাইসীরুল ক্বুরআন: তারা বলল, ‘হে আমাদের আব্বাজান! আমরা দৌড়ের প্রতিযোগিতা করছিলাম, আর ইউসুফকে আমরা আমাদের জিনিসপত্রের কাছে রেখে গিয়েছিলাম, তখন তাকে নেকড়ে বাঘে খেয়ে ফেলল, কিন্তু আপনি তো আমাদের কথা বিশ্বাস করবেন না, আমরা সত্যবাদী হলেও।’
আহসানুল বায়ান: (১৭) তারা বলল, ‘হে আমাদের পিতা! আমরা দৌড়-প্রতিযোগিতা করছিলাম এবং ইউসুফকে আমাদের মালপত্রের নিকট রেখে গিয়েছিলাম, অতঃপর নেকড়ে বাঘ তাকে খেয়ে ফেলেছে; কিন্তু আপনি তো আমাদেরকে বিশ্বাস করবেন না; যদিও আমরা সত্যবাদী।’ [1]
মুজিবুর রহমান: তারা বললঃ হে আমাদের পিতা! আমরা দৌড়ের প্রতিযোগিতা করেছিলাম এবং ইউসুফকে আমাদের মালপত্রের নিকট রেখে গিয়েছিলাম, অতঃপর তাকে নেকড়ে বাঘ খেয়ে ফেলেছে; কিন্তু আপনিতো আমাদের বিশ্বাস করবেননা, যদিও আমরা সত্যবাদী।
ফযলুর রহমান: তারা বলল, “বাবা! আমরা দৌড়ের পাল্লা দিতে গিয়েছিলাম এবং ইউসুফকে আমাদের মালপত্রের কাছে রেখে গিয়েছিলাম। তখন নেকড়ে বাঘ তাকে খেয়ে ফেলেছে। আমরা সত্য কথা বললেও তো আপনি আমাদেরকে বিশ্বাস করবেন না।”
মুহিউদ্দিন খান: তারা বললঃ পিতাঃ আমরা দৌড় প্রতিযোগিতা করতে গিয়েছিলাম এবং ইউসুফকে আসবাব-পত্রের কাছে রেখে গিয়েছিলাম। অতঃপর তাকে বাঘে খেয়ে ফেলেছে। আপনি তো আমাদেরকে বিশ্বাস করবেন না, যদিও আমরা সত্যবাদী।
জহুরুল হক: তারা বললে -- "হে আমাদের আব্বা! আমরা দৌড়াদেড়ি করে চলেছিলাম, আর ইউসুফকে রেখে গিয়েছিলাম আমাদের আসবাবপত্রের পাশে, তখন নেকড়ে তাকে খেয়ে ফেলেছে, কিন্তু তুমি তো আমাদের প্রতি বিশ্বাসকারী হবে না, যদিও আমরা হচ্ছি সত্যবাদী।"
Sahih International: They said, "O our father, indeed we went racing each other and left Joseph with our possessions, and a wolf ate him. But you would not believe us, even if we were truthful."
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৭. তারা বলল, হে আমাদের পিতা! আমরা দৌড়ের প্রতিযোগিতা করতে গিয়েছিলাম(১) এবং ইউসুফকে আমাদের মালপত্রের কাছে রেখে গিয়েছিলাম, অতঃপর নেকড়ে বাঘ তাকে খেয়ে ফেলেছে; কিন্তু আপনি তো আমাদেরকে বিশ্বাস করবেন না যদিও আমরা সত্যবাদী হই।
তাফসীর:
(১) ইবনুল আরাবী আহকামুল কুরআন গ্রন্থে বলেনঃ পারস্পরিক (দৌড়) প্রতিযোগিতা শরীআতসিদ্ধ এবং একটি উত্তম খেলা। এটা জিহাদেও কাজে আসে। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং এ প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়ার কথা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত আছে। তাছাড়া ঘোড়দৌড়ও প্রমাণিত রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তা করেছেন। [দেখুন, বুখারী: ২৮৭৯; মুসলিম: ১৮৭০] সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে সালামা ইবনে আকওয়া জনৈক ব্যক্তির সাথে দৌড় প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হন। [দেখুন, মুসলিম: ১৮০৭; মুসনাদে আহমাদ: ৪/৫২] উল্লেখিত আয়াত ও বর্ণনা দ্বারা আসল ঘোড়দৌড়ের বৈধতা প্রমাণিত হয়। এছাড়া সাধারণ দৌড়, তীরে লক্ষ্যভেদ ইত্যাদিতেও প্রতিযোগিতা করা বৈধ। প্রতিযোগিতায় বিজয়ী পক্ষকে তৃতীয় পক্ষ থেকে পুরস্কৃত করাও জায়েয। কিন্তু পরস্পর হার-জিতে কোন টাকার অংশ শর্ত করা জুয়ার অন্তর্ভুক্ত, যা কুরআনুল কারীমে হারাম সাব্যস্ত করা হয়েছে। [আহকামুল কুরআন; অনুরূপ দেখুন, কুরতুবী]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৭) তারা বলল, ‘হে আমাদের পিতা! আমরা দৌড়-প্রতিযোগিতা করছিলাম এবং ইউসুফকে আমাদের মালপত্রের নিকট রেখে গিয়েছিলাম, অতঃপর নেকড়ে বাঘ তাকে খেয়ে ফেলেছে; কিন্তু আপনি তো আমাদেরকে বিশ্বাস করবেন না; যদিও আমরা সত্যবাদী।’ [1]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, যদিও আমরা আপনার নিকট বিশ্বস্ত ও সত্যবাদী হতাম, তবুও আপনি ইউসুফ সম্পর্কে আমাদের কথা সত্য বলে বিশ্বাস করতেন না। এখন তো এমনিতেই আমাদের ব্যক্তিত্ব সন্দিগ্ধ ব্যক্তিদের মত, এখন আপনি আমাদের কথা আর কিভাবে বিশ্বাস করবেন?
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১১-১৮ নং আয়াতের তাফসীর:
অত্র আয়াতগুলোতে ইউসুফ (عليه السلام)-এর এগার ভাই তাঁর ক্ষতিসাধন করার জন্য যে মিথ্যা কাহিনী তাঁর পিতার নিকট বানিয়ে বলেছিল সে সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে।
ইউসুফ (عليه السلام) এর দশ বৈমাত্রেয় ভাই তাদের সিদ্ধান্ত অনুসারে ইউসুফ (عليه السلام)-কে জঙ্গলে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রতারণার আশ্রয় নিল। তারা একদিন পিতা ইয়া‘কূব (عليه السلام) এর কাছে এসে ইউসুফকে সাথে নিয়ে পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে আনন্দ ভ্রমণে যাবার প্রস্তাব পেশ করল। তারা পিতাকে বলল, আগামীকাল আপনি ইউসুফকে আমাদের সাথে মাঠে যেতে দিন। সেখানে সবার সাথে সে ফল-মূল খাবে, খেলা-ধূলা করবে এবং আনন্দ-উল্লাস করবে। আমরা তাঁর রক্ষণাবেক্ষণ করব। তাদের কথার উত্তরে ইয়া‘কূব (عليه السلام) বললেন, তোমরা তাকে নিয়ে যাবে, আমি দুশ্চিন্তায় থাকব আর আমার ভয় হয় যে, তোমরা তাঁকে রেখে খেলা-ধূলা করতে যাবে তখন নেকড়ে বাঘ তাকে খেয়ে ফেলবে। তারা বলল, আমাদের সাথে ইউসুফকে পাঠাতে আপনি নিরাপদ মনে করছেন না কেন? ইউসুফের ব্যাপারে আপনি কি আমাদের প্রতি অবিশ্বাস করছেন? অথচ আমরা তাঁর ভাই; আমরা তাঁর কল্যাণকামী। আমরা এতগুলো ভাই থাকতে নেকড়ে বাঘ খেয়ে ফেলবে তাহলে তো আমরা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাব। উল্লেখ্য যে, কেন‘আন অঞ্চলে সে সময়ে বাঘের আক্রমণের ভয় বেশি ছিল। তাছাড়াও ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, ইয়া‘কূব (عليه السلام) পূর্বরাতে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তিনি পাহাড়ের ওপরে আছেন আর নীচে ইউসুফ (عليه السلام) খেলা করছে। হঠাৎ দশটি বাঘ এসে তাকে ঘেরাও করে ফেলে এবং আক্রমণ করতে উদ্যত হয়। কিন্তু তন্মধ্যে একটি বাঘ এসে তাকে মুক্ত করে দেয়। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: উক্ত স্বপ্নের ব্যাখ্যা অনুযায়ী ইয়া‘কূব (عليه السلام) তার দশ পুত্রকেই বাঘ গণ্য করেছিলেন (কুরতুবী)। তখন তারা ছলে বলে কৌশলে পিতাকে এসব কথা বলে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করল এবং ছেলেদের পীড়াপীড়িতে এক পর্যায় তিনি রাযী হলেন। কিন্তু তাদের থেকে অঙ্গীকার নিলেন যাতে তারা ইউসুফের কোনরূপ কষ্ট না দেয় এবং সর্বদা তার প্রতি খেয়াল রাখে। অতঃপর যখন ইউসুফ (عليه السلام) কে তাদের সাথে নিয়ে যেতে সক্ষম হল তখন তারা তাদের সিদ্ধান্ত অনুপাতে ইউসুফ (عليه السلام) কে কূপে নিক্ষেপ করল। আর এমতাবস্থায় আল্লাহ তা‘আলা ইউসুফ (عليه السلام) এর প্রতি ওয়াহী করলেন যে, তুমি ঘাবড়ে যেও না; আমি তোমাকে সংরক্ষণ তো করবই বরং তোমাকে এমন মর্যাদার অধিকারী বানাব যে, তোমার ভাইয়েরা তোমার নিকট সাহায্যের জন্য আসবে। তখন তুমি তাদেরকে এই কর্মের কথা বলে দেবে আর তারা তোমাকে চিনতে পারবে না। যেমন অত্র সূরার ৮৯ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে এবং ৫৮ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে যে, যখন দুর্ভিক্ষের সময় তারা মিসরে যায় ইউসুফ (عليه السلام) তাদেরকে চিনতে পারেন কিন্তু তারা ইউসুফ (عليه السلام) কে চিনতে পারেনি।
(وَأَوْحَيْنَآ إِلَيْهِ) ‘আমি তাকে ওয়াহী করলাম’ যদিও ইউসুফ (عليه السلام) তখন ছোট কিন্তু যাকে আল্লাহ তা‘আলা নবুওয়াত দেবেন তাদের অনেককে শৈশবেও ওয়াহী প্রেরণ করেন। তবে এ ওয়াহী নবুওয়াতী ওয়াহী ছিল না। কেননা সাধারণতঃ চল্লিশ বছর বয়স হওয়ার পূর্বে আল্লাহ তা‘আলা কাউকে নাবী করেন না। এ ওয়াহী ছিল সেরূপ, যেরূপ ওয়াহী বা ইলহাম এসেছিল শিশু মূসার মায়ের কাছে এবং ইয়াহইয়া (عليه السلام)-এর কাছে। ইমাম কুরতুবী বলেন: কূপে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পূর্বেই অথবা পরে ইউসুফকে সান্ত্বনা ও মুক্তির সুসংবাদস্বরূপ এ ওয়াহী নাযিল হয়েছিল।
পিতার নিকটে ভাইদের কৈফিয়ত:
ইউসুফ (عليه السلام)-কে অন্ধকূপে ফেলে দিয়ে একটা ছাগলছানা জবেহ করে তার রক্ত ইউসুফ (عليه السلام) এর পরিত্যক্ত জামায় মেখে তারা সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরল এবং কাঁদতে কাঁদতে পিতার কাছে হাযির হয়ে কৈফিয়ত পেশ করে বলল: হে আমাদের পিতা! আমরা যখন দৌড় প্রতিযোগিতায় মত্ত ছিলাম এমতাবস্থায় ইউসুফ আমাদের মালপত্রের নিকট ছিল আর তখন নেকড়ে বাঘ এসে তাকে খেয়ে ফেলে। আমরা জানি আপনি আমাদের কথা বিশ্বাস করবেন না যদিও আমরা সত্যবাদী। প্রমাণস্বরূপ ইউসুফ (عليه السلام) এর রক্তমাখা জামা পেশ করল। কিন্তু তারা এটা বুুঝতে পারেনি যে, বাঘে খেয়ে ফেললে কি জামা অক্ষত থাকে? তাই যখন রক্তমাখা অক্ষত জামা পিতার কাছে নিয়ে আসল তখন ইয়া‘কূব (عليه السلام) বুঝতে পারলেন এটা তাদের সাজানো ঘটনা। প্রকৃত ঘটনা এটা নয়। সুতরাং এখন ধৈর্য ধারণ করা ব্যতীত আর কোন উপায় নেই। আল্লাহ তা‘আলাই এ ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করবেন। তখন ইয়া‘কূব (عليه السلام) সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা করলেন। মদীনার মুনাফিকরা আয়িশাহ কে যখন মিথ্যা অপবাদ দিয়েছিল তখন নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ ব্যাপারে আয়িশাহ কে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেছিলেন: আল্লাহ তা‘আলার কসম! আমি আমার ও আপনাদের জন্য ইউসুফের বাবার ঐ উদাহরণ দেখতে পাচ্ছি। সুতরাং আমার পক্ষে পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়। তোমরা যা বর্ণনা করছ, সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই আমার সাহায্যস্থল। (সহীহ বুখারী হা: ৪৭৫০)
عُصْبَةٌ অর্থাৎ শক্তিশালী দল, سَوَّلَتْ চাকচিক্য করে দেয়া, আকর্ষণীয় করে দেয়া।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. বিপদে বিচলিত না হয়ে বরং ধৈর্যধারণ করতে হবে এবং আল্লাহ তা‘আলার সাহায্য চাইতে হবে।
২. মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে, মিথ্যার পরিণতি ভয়াবহ।
৩. যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে সহযোগিতা করেন।
৪. দৌড়, তীর নিক্ষেপ ও কুস্তী ইসলামে বৈধ খেলা তবে যেন সীমালংঘন না হয়।
৫. কোন বিষয়ে সঠিক জ্ঞান না আসা পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলার দিকে সোপর্দ করে দেয়া উচিত।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১৬-১৮ নং আয়াতের তাফসীর
হযরত ইউসুফকে (আঃ) অন্ধকার কূপে ফেলে দেয়ার পর তাঁর ভ্রাতাগণ কি করেছিল আল্লাহ তাআ’লা এখানে সেই খবরই দিচ্ছেন। গুপ্তভাবে তারা ছোট ভাই, আল্লাহর নিস্পাপ নবী এবং পিতার চোখের মণি হযরত ইউসুফের (আঃ) উপর অবিচার ও অত্যাচারের পাহাড় ভেঙ্গে দিয়ে রাত্রে তারা বাহ্যিকভাবে দুঃখের ভান করে কাঁদতে কাঁদতে পিতার নিকট আগমন করে। আর ইউসুফকে (আঃ) হাত ছাড়া করে দেয়ার কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেঃ “হে পিতঃ! আমরা তীরন্দাযী ও দৌড় প্রতিযোগিতা শুরু করি এবং ছোট ভাই ইউসুফকে (আঃ) আমাদের আসবাবপত্রের নিকট রেখে যাই। ঘটনাক্রমে ঐ সময়েই নেকড়ে বাঘ এসে পড়ে এবং তাঁকে খেয়ে ফেলে। এরপর তারা তাদের পিতার কাছে নিজেদের কথা সত্য প্রমাণিত করার জন্যে বললো: “আব্বাজান! এটা এমন একটা ঘটনা যে, তা সত্য বলে মেনে নিতে আপনার বিবেকে বাধছে, পূর্বেই তো আপনার মনে খটকা লেগেছিল এবং ঘটনাক্রমে তা ঘটেই গেল। তবুও কিন্তু আপনি আমাদেরকে সত্যবাদী রূপে মেনে নিতে পারছেন না। অথচ আমরা যে সত্যবাদী তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ থাকতে পারে না। কিন্তু আমাদেরকে সত্যবাদীরূপে মেনে না নেয়ার ব্যাপারে আপনি একদিক দিয়ে সত্যের উপর রয়েছেন। কেননা, এটা এমনই একটা অস্বাভাবিক ঘটনা যে, এটা দেখে আমরা নিজেরাই বিস্মিত না হয়ে পারি না। এটা ছিল তাদের মৌখিক কথা। এছাড়া একটা মিথ্যা প্রমাণও তারা পেশ করেছিল। অর্থাৎ তারা বকরীর একটা বাচ্চাকে যবাহ করে ওর রক্ত দ্বারা হযরত ইউসুফের (অঃ) জামাটি রঞ্জিত করেছিল। ঐ জামাটি তারা পিতার সামনে হাযির করে বলেছিলঃ “দেখুন! ইউসুফের (আঃ) দেহের রক্ত তার জামায় ভরে রয়েছে। কিন্তু আল্লাহ তাআ’লার কি মহিমা যে, তারা সবকিছুই করেছিল, কিন্তু জামাটি ছেদন করতে ভুলে গিয়েছিল। ফলে পিতার কাছে তাদের প্রতারণা ধরা পড়ে যায়। কিন্তু তিনি নিজেকে সামলিয়ে নিলেন এবং স্পষ্টভাবে ছেলেদেরকে তেমন কিছু বললেন না। তথাপি ছেলেরা বুঝে নেয় যে, তাদের পিতার কাছে তাদের ধোকাবাজী ধরা পড়ে গেছে। তাদের পিতা তাদেরকে শুধু বললেনঃ “তোমাদের মন এই কথা বানিয়ে নিয়েছে। যাই হোক, আমি ধৈর্য ধারণ করবো যে পর্যন্ত না আল্লাহ তাআ’লা দয়া পরবশ হয়ে আমার এই দুঃখ দুর করে দেন। তোমরা যে একটা মিথ্যা কথা আমার কাছে বর্ণনা করছে এবং একটা অসম্ভব ব্যাপারের উপর আমাকে বিশ্বাস স্থাপন করতে বলছো তার জন্যে আমি একমাত্র আল্লাহরই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করছি। যদি তাঁর সাহায্য লাভে আমি সমর্থ হই তবে অবশ্যই দুধ ও পানি পৃথক হয়ে যাবে।
হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইউসুফের (আঃ) রক্ত-রঞ্জিত জামাটি দেখে তাঁর পিতা হযরত ইয়াকুব (আঃ) বলেছিলেনঃ “এটা বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার যে, নেকড়ে বাঘে ইউসুফকে (আঃ) খেয়ে ফেললো এবং তাঁর জামাটি রক্তে রঞ্জিত হলো, অথচ তা একটুও ছিড়লো না বা ফাটলো না! যা হোক, আমি ধৈর্যধারণকরবো, যাতে না থাকবে কোন অভিযোগ এবং না থাকবে কোন চিন্তা ও উদ্বেগ।”
সাওরী (রঃ) তাঁর কোন এক সহচর হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেনঃ “সবর বা ধৈর্য হচ্ছে তিনটি জিনিষের নাম। (১) নিজের বিপদ আপদের কথা কারো কাছে বর্ণনা না করা। (২) নিজের দুঃখের কাহিনী গেয়ে কারো সামনে ক্রন্দন না করা এবং (৩) নিজেকে পাক পবিত্র মনে না করা।” এখানে ইমাম বুখারী (রঃ) হযরত আয়েশার (রাঃ) ঐ ঘটনাটির পূর্ণ হাদীস বর্ণনা করেছেন, যাতে তাঁর উপর অপবাদ লাগানোর বর্ণনা রয়েছে। সেখানে তিনি বলেছেনঃ “আল্লাহর শপথ! আমার এবং আপনাদের দৃষ্টান্ত হযরত ইউসুফের (আঃ) পিতার মতই বটে। তিনি বলেছিলেনঃ “এখন পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়, তোমরা যা বলছে সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্যস্থল।”
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।