আল কুরআন


সূরা ইউসুফ (আয়াত: 109)

সূরা ইউসুফ (আয়াত: 109)



হরকত ছাড়া:

وما أرسلنا من قبلك إلا رجالا نوحي إليهم من أهل القرى أفلم يسيروا في الأرض فينظروا كيف كان عاقبة الذين من قبلهم ولدار الآخرة خير للذين اتقوا أفلا تعقلون ﴿١٠٩﴾




হরকত সহ:

وَ مَاۤ اَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِکَ اِلَّا رِجَالًا نُّوْحِیْۤ اِلَیْهِمْ مِّنْ اَهْلِ الْقُرٰی ؕ اَفَلَمْ یَسِیْرُوْا فِی الْاَرْضِ فَیَنْظُرُوْا کَیْفَ کَانَ عَاقِبَۃُ الَّذِیْنَ مِنْ قَبْلِهِمْ ؕ وَ لَدَارُ الْاٰخِرَۃِ خَیْرٌ لِّلَّذِیْنَ اتَّقَوْا ؕ اَفَلَا تَعْقِلُوْنَ ﴿۱۰۹﴾




উচ্চারণ: ওয়ামাআরছালনা-মিন কাবলিকা ইল্লা-রিজা-লাননূহীইলাইহিম মিন আহলিল কুরা- আফালাম ইয়াছীরূফিল আরদিফাইয়ানজুরূ কাইফা কা-না ‘আ-কিবাতুল্লাযীনা মিন কাবলিহিম ওয়ালাদা-রুল আ-খিরাতি খাইরুল লিল্লাযী নাত্তাকাও আফালাতা‘কিলূন।




আল বায়ান: আর আমি তোমার পূর্বে জনপদবাসী থেকে পুরুষদেরকেই কেবল রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছি, যাদের উপর আমি ওহী নাযিল করতাম। তারা কি যমীনে বিচরণ করে না। তাহলে দেখত, তাদের পূর্বে যারা ছিল তাদের পরিণতি কিরূপ হয়েছে? আর যারা তাকওয়া অবলম্বন করে তাদের জন্য আখিরাতের আবাসনই উত্তম, তবুও কি তোমরা বুঝ না?




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১০৯. আর আমরা আপনার আগেও জনপদবাসীদের মধ্য থেকে(১) পুরুষদেরকেই পাঠিয়েছিলাম(২) যাদের কাছে ওহী পাঠাতাম। তারা কি যমীনে ভ্রমণ করেনি? ফলে দেখতে পেত তাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কী হয়েছিল? আর অবশ্যই যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে তাদের জন্য আখেরাতের আবাসই উত্তম(৩); তবুও কি তোমরা বুঝ না?




তাইসীরুল ক্বুরআন: তোমার পূর্বে জনপদবাসীদের মধ্যে যাদের কাছে ওয়াহী করতাম তারা পুরুষ মানুষ ব্যতীত ছিল না। তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করতঃ দেখে না যে, তাদের পূর্ববর্তী লোকেদের পরিণাম কী হয়েছিল? যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, নিশ্চিতই পরলোকের ঘর তাদের আরো উত্তম, তবুও কি তোমরা বুঝবে না?




আহসানুল বায়ান: (১০৯) তোমার পূর্বে জনপদবাসীদের মধ্য হতে পুরুষদেরকেই আমি (রসূলরূপে) প্রেরণ করেছি; যাদের নিকট অহী পাঠাতাম।[1] তাদের পূর্ববর্তীদের কি পরিণাম হয়েছিল, তা দেখার জন্য তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করেনি? যারা সংযমশীল তাদের জন্য পরলোকের গৃহই উত্তম; তোমরা কি বুঝ না?



মুজিবুর রহমান: তোমার পূর্বেও জনপদবাসীদের মধ্য হতে পুরুষদেরকেই পাঠিয়েছিলাম, যাদের নিকট অহী পাঠাতাম; তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করেনি এবং তাদের পূর্ববর্তীদের কি পরিণাম হয়েছিল তা কি দেখেনি? যারা মুত্তাকী তাদের জন্য পরকালই শ্রেয়; তোমরা কি বুঝনা?



ফযলুর রহমান: তোমার পূর্বে আমি জনপদবাসীদের মধ্য থেকে পুরুষদেরকেই রসূল হিসেবে পাঠিয়েছি। আমি তাদের কাছে ওহী পাঠাতাম। তবে কি তারা (অবিশ্বাসীরা) পৃথিবীতে ভ্রমণ করেনি এবং দেখেনি যে, তাদের পূর্ববর্তীদের পরিণতি কেমন ছিল? পরকালের নিবাসই তো মোত্তাকীদের জন্য উত্তম। তবে কি তোমরা বোঝ না?



মুহিউদ্দিন খান: আপনার পূর্বে আমি যতজনকে রসূল করে পাঠিয়েছি, তারা সবাই পুরুষই ছিল জনপদবাসীদের মধ্য থেকে। আমি তাঁদের কাছে ওহী প্রেরণ করতাম। তারা কি দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করে না, যাতে দেখে নিত কিরূপ পরিণতি হয়েছে তাদের যারা পূর্বে ছিল ? সংযমকারীদের জন্যে পরকালের আবাসই উত্তম। তারা কি এখনও বোঝে না?



জহুরুল হক: আর তোমার পূর্বে জনপদবাসীদের মধ্যে থেকে মানুষ ছাড়া অন্য কাউকে আমরা পাঠাই নি যাঁদের কাছে আমরা প্রত্যাদেশ দিয়েছিলাম। কাজেই তারা কি পৃথিবীতে পর্যটন করে নি এবং দেখে নি কেমন হয়েছিল তাদের পরিণাম যারা ছিল তাদের অগ্রগামী? আর পরকালের আবাসস্থল অবশ্যই অধিকতর ভাল তাদের জন্য যারা ধর্মভীরুতা অবলন্বন করে। তোমরা কি তবে বোঝ না?



Sahih International: And We sent not before you [as messengers] except men to whom We revealed from among the people of cities. So have they not traveled through the earth and observed how was the end of those before them? And the home of the Hereafter is best for those who fear Allah; then will you not reason?



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১০৯. আর আমরা আপনার আগেও জনপদবাসীদের মধ্য থেকে(১) পুরুষদেরকেই পাঠিয়েছিলাম(২) যাদের কাছে ওহী পাঠাতাম। তারা কি যমীনে ভ্রমণ করেনি? ফলে দেখতে পেত তাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কী হয়েছিল? আর অবশ্যই যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে তাদের জন্য আখেরাতের আবাসই উত্তম(৩); তবুও কি তোমরা বুঝ না?


তাফসীর:

(১) এ আয়াতেই (أَهْلِ الْقُرَىٰ) শব্দ দ্বারা জানা যায় যে, আল্লাহ্ তা'আলা সাধারণতঃ শহর ও নগরবাসীদের মধ্য থেকে পুরুষদেরকেই রাসূল প্রেরণ করেছেন; কোন গ্রাম কিংবা বনাঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্য থেকে রাসূল প্রেরিত হননি। কারণ, সাধারণতঃ গ্রাম বা বনাঞ্চলের অধিবাসীরা স্বভাব-প্রকৃতি ও জ্ঞান-বুদ্ধিতে নগরবাসীদের তুলনায় পশ্চাতপদ হয়ে থাকেন। [ইবন কাসীর] ইয়াকুব আলাইহিস সালামও শহরবাসী ছিলেন, কিন্তু কোন কারণে তারা শহর ছেড়ে গ্রামে চলে গিয়েছিলেন। তাই কুরআনের সূরা ইউসুফেরই ১০০ নং আয়াতে তাদেরকে গ্রাম থেকে নিয়ে আসার কথা বলা হয়েছে। কোন কোন মুফাসসির বলেন, এ আয়াতে কাফেরদের একটি প্রশ্নের উত্তর দেয়া হয়েছে, যেখানে তারা ফিরিশতার উপর এ কুরআন নাযিল হলো না কেন তা জিজ্ঞেস করেছিল। উত্তর দেয়া হচ্ছে যে, আমি তো কেবল নগরবাসী পুরুষদেরকেই রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছি। [কুরতুবী]


(২) এ আয়াতে নবীগণের সম্পর্কে رِجَالًا শব্দের ব্যবহার থেকে বোঝা যায় যে, নবী সবসময় পুরুষই হন। নারীদের মধ্যে কেউ নবী বা রাসূল হতে পারে না। মূলত: এটাই বিশুদ্ধ মত যে, আল্লাহ তা'আলা কোন নারীকে নবী কিংবা রাসূল হিসেবে পাঠাননি। কোন কোন আলেম কয়েকজন মহিলা সম্পর্কে নবী হওয়ার দাবী করেছেন; উদাহরণতঃ ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর বিবি সারা, মূসা আলাইহিস সালাম এর জননী এবং ঈসা আলাইহিস সালাম-এর জননী মরিয়ম। এ তিন জন মহিলা সম্পর্কে কুরআনুল কারীমে এমন ভাষা প্রয়োগ করা হয়েছে, যা দ্বারা বোঝা যায় যে, আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে ফিরিশতারা তাদের সাথে বাক্যালাপ করেছে, সুসংবাদ দিয়েছে কিংবা ওহীর মাধ্যমে স্বয়ং তারা কোন বিষয় জানতে পেরেছেন। কিন্তু ব্যাপকসংখ্যক আলেমের মতে এসব আয়াত দ্বারা উপরোক্ত তিন জন মহিলার মাহাত্ম্য এবং আল্লাহর কাছে তাদের উচ্চ মর্যাদাশালিনী হওয়া বোঝা যায় মাত্র। এই ভাষা নবুওয়াত ও রেসালাত প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়। [ইবন কাসীর]


(৩) বলা হয়েছে যে, দুনিয়ার সুখ-দুঃখ সর্বাবস্থায়ই ক্ষণস্থায়ী। আসল চিন্তা আখেরাতের হওয়া উচিত। সেখানকার অবস্থান চিরস্থায়ী এবং সুখ-দুঃখও চিরস্থায়ী। আরো বলা হয়েছে যে, আখেরাতের সুখ-শান্তি তাকওয়ার উপর নির্ভরশীল। তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর নিষেধকৃত যাবতীয় বিষয় থেকে নিজেকে হেফাযত করে শরীআতের যাবতীয় বিধি-বিধান পালন করা।


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১০৯) তোমার পূর্বে জনপদবাসীদের মধ্য হতে পুরুষদেরকেই আমি (রসূলরূপে) প্রেরণ করেছি; যাদের নিকট অহী পাঠাতাম।[1] তাদের পূর্ববর্তীদের কি পরিণাম হয়েছিল, তা দেখার জন্য তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করেনি? যারা সংযমশীল তাদের জন্য পরলোকের গৃহই উত্তম; তোমরা কি বুঝ না?


তাফসীর:

[1] এই আয়াত এ কথার প্রমাণ যে, সকল নবী পুরুষ ছিলেন এবং মহিলাদের মধ্য হতে কেউ নবুঅত লাভ করেনি। অনুরূপ তাঁরা সকলেই সমাজবদ্ধ জনপদের অধিবাসী ছিলেন, যাতে ছোট শহর, বড় শহর এবং গ্রামাঞ্চলও শামিল। তাঁদের মধ্যে কেউই মরুবাসী (বেদুঈন) ছিলেন না। কেননা মরুবাসীরা নগরবাসীদের তুলনায় কঠোর মেজাজের এবং অসভ্য চরিত্রের হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে শহরবাসীরা তাদের তুলনায় কোমল, গম্ভীর, সভ্য ও ভদ্র হয়ে থাকে। আর এ ধরনের বৈশিষ্ট্য নবুঅতের জন্য আবশ্যক।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১০৮-১১১ নং আয়াতের তাফসীর:



ইউসুফ (عليه السلام) এর জীবনী বিস্তারিত তুলে ধরার পর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নাবীকে নির্দেশ দিচ্ছেন বলে দাও পূর্বের নাবীরা যেমন সঠিক জ্ঞান ও তাওহীদের ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকে তাঁর দিকে দাওয়াত দিয়েছেন আমিও তাওহীদের পথ অবলম্বন করে তাঁর দিকে দাওয়াত দিচ্ছি। তবে এ দাওয়াতী কাজ শুধু আমি একাই করি না, বরং আমি ও আমার অনুসারী যারা সবাই এ কাজ করে।



সুতরাং যারাই নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উম্মত বলে দাবি করবে তাদের উচিত ও আবশ্যক হল নিজে সৎ আমল করা এবং মানুষদেরকে আল্লাহ তা‘আলার পথে ডাকা এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করা। আর তাঁকে সর্বপ্রকার দোষ-ত্র“টি থেকে পবিত্র রাখা। এটাই ছিল সকল নাবীগণের কাজ। তাঁরা মানুষদেরকে আল্লাহ তা‘আলার তাওহীদের দিকে আহ্বান করতেন।



উক্ত আয়াতে একজন দাঈ ইলাল্লাহ বা আল্লাহ তা‘আলার পথে আহ্বানকারীর পাঁচটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে:



(১) (الدَّعْوَةُ إِلَي اللّٰهِ)



আল্লাহ তা‘আলার দিকে আহ্বান; অর্থাৎ কোন দল, মত, পথ ও মাযহাব বা তরীকার প্রতি দাওয়াত নয়, বরং দাওয়াত হতে হবে সরাসরি আল্লাহ তা‘আলার দিকে তথা আল্লাহ তা‘আলার দীন ইসলামের প্রতি। আর দীন ইসলামের প্রতি দাওয়াতের প্রথম পদক্ষেপ হবে তাওহীদ বা আল্লাহ তা‘আলার একত্ব ও আকীদাহ বিশ্বাস এর প্রতি দাওয়াত। অতঃপর ইসলামের অন্যান্য ইবাদতের প্রতি। এটাই হল নাবী-রাসূলদের দাওয়াতী নীতি ও পদ্ধতি। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ পদ্ধতি তাঁর সাহাবী তথা উম্মাতকে শিক্ষা দিয়েছেন। যেমন প্রসিদ্ধ সাহাবী আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বলেন: যখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুয়ায বিন জাবাল (রাঃ) কে ইয়ামানে দাওয়াতের জন্য প্রেরণ করেন তখন তাকে নির্দেশ দেন: “সর্বপ্রথম তুমি যে বিষয় দাওয়াত দেবে তাহল এ সাক্ষ্য প্রদান করা যে, আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত সত্যিকার কোন মা‘বূদ নেই। অন্য বর্ণনায় এসেছে, আল্লাহ তা‘আলার তাওহীদ বা একত্বতার প্রতি যেন তোমার প্রথম দাওয়াত হয়। তারা যদি তোমার এ তাওহীদের দাওয়াত পূর্ণভাবে মেনে নেয় অতঃপর তাদের জানিয়ে দাও যে, আল্লাহ তা‘আলা প্রতি রাত ও দিনে তোমাদের ওপর পাচঁ ওয়াক্ত সালাত ফরয করে দিয়েছেন, এভাবে যাকাত ও অন্যান্য কথা বললেন। (সহীহুল বুখারী হা: ১৩৯৫, সহীহ মুসলিম হা: ১৯)



অতএব আলিমদের দাওয়াত হতে হবে সর্বপ্রথম তাওহীদ বা আকীদা বিশ্বাসের দিকে, কারণ আকীদাহ বিশ্বাসই হলো সবকিছুর মূল, আকীদাহ বাতিল হলে সবকিছু বাতিল হয়ে যায়।



(২) (عَلٰي بَصِيْرَةٍ)



“জ্ঞান-বুদ্ধি, বিচক্ষণতা ও সুস্পষ্ট দলীল-প্রমাণসহকারে” অর্থাৎ যে বিষযের প্রতি দাওয়াত দেব সে বিষয় সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান থাকতে হবে। না জেনে, না বুঝে প্রমাণহীন আমল-আখলাক ও ইবাদত-বন্দেগীর প্রতি দাওয়াত দিলে হিদায়াতের পরিবর্তে গুমরাহির বেশি সম্ভাবনা থাকে।



(৩) (أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِيْ)



“আমি এবং আমার অনুসারীরা” অতএব যে আলিম দাওয়াত দেবেন, তাকে সকল পীর মুরশিদ ও দল, তরীকার অনুসরণ বর্জন করে ব্যক্তি হিসেবে ও দাওয়াতের বিষয়ে একমাত্র রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর অনুসারী হতে হবে। কারণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর অনুকরণ ইবাদত কবূলের অন্যতম শর্ত, তা লঙ্ঘিত হলে এ দাওয়াত আল্লাহ তা‘আলার কাছে কবূল হতে পারে না। অতএব কোন মুজতাহিদ, মুফতী, পীর-মুর্শিদ ও বুজুর্গের অনুসরণ নয় বরং অনুসরণ হবে শুধু রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরামের।



(৪) (وَسُبْحٰنَ اللّٰهِ)



“আল্লাহ তা‘আলা পূত পবিত্র” দাওয়াতের প্রতিটি কথা ও কাজে আল্লাহ তা‘আলাকে শির্কমুক্ত ও পূত পবিত্র রাখতে হবে এবং সে সঠিক বিষয়ের প্রতি দাওয়াত দিতে হবে।



(৫) (وَمَآ أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِيْنَ)



“আর আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই” অতএব একজন আলিম বা দাঈকে আকীদাহ-বিশ্বাস, আমল-আখলাক ও ইবাদত-বন্দেগী সকল ক্ষেত্রে শির্ক মুক্ত হতে হবে। আলিম সমাজের অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো আল্লাহ তা‘আলার প্রতি আহ্বান করা। আর এক্ষেত্রে উপরোক্ত বিষয়সমূহ অবশ্যই অবলম্বন করতে হবে নচেৎ দাওয়াতে সার্থক ও সফল হওয়া সম্ভব হবে না।



(إِلَّا رِجَالًا نُّوْحِيْ إِلَيْهِمْ)



অর্থাৎ সকল নাবী-রাসূলই পুরুষ ছিলেন, কোন নাবী-রাসূল মহিলা ছিলেন না।



(حَتّٰي إِذَا اسْتَيْأَسَ الرُّسُلُ)



অর্থাৎ যখন রাসূলগণ তাদের সম্প্রদায়ের লোকেদের থেকে ঈমানের আশা থেকে নিরাশ হয়ে গেলেন এবং তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে এরূপ বিশ্বাস তাদের চলে আসল তখন তাদের কাছে আল্লাহ তা‘আলার সাহায্য এসেছিল। অতএব যারা ঈমান এনেছিল তাদেরকেসহ আল্লাহ তা‘আলা রাসূলদেরকে কঠিন বিপদ থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। আর যারা অপরাধী, আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্য হয় তাদের থেকে তিনি শাস্তি প্রত্যাহার করেন না। বরং তিনি কিছু সময়ের অবকাশ দেন, যখন তিনি শাস্তি দেয়া উপযুক্ত মনে করেন তখন শাস্তি দেন।



(مَا كَانَ حَدِيْثًا يُّفْتَرٰي)



ইউসুফ (عليه السلام) এর জীবন কাহিনী শুনে অনেকে মনে করতে পারে যে, এটা একটা মিথ্যা ঘটনা যা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রচনা করেছেন। না, এটা কোন মিথ্যা ঘটনা নয় এবং বাণীও নয়, বরং এ কিতাব পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী এবং সকল কিছুর বিশদ বর্ণনাকারী। যারা এ কুরআন নিয়ে গবেষণা করবে তাদের জন্য রয়েছে শিক্ষা এবং যারা ঈমান আনবে তাদেরকে এ কিতাব সঠিক পথ দেখাবে ও তাদের প্রতি করুনা হয়ে থাকবে।



সুতরাং আমরা যদি দৃঢ় ঈমানের সাথে কুরআনের মর্মার্থ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করি তাহলে তা থেকে শিক্ষা নিতে পারব এবং তা আমাদেরকে সঠিক পথের নির্দেশনা দেবে ও রহমত হয়ে থাকবে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-সহ সকল নাবীর দাওয়াতী মূলনীতি ছিল একটাই যে, আল্লাহ তা‘আলার তাওহীদ বা একত্ববাদের প্রতি আহ্বান ও শির্ক হতে বিরত রাখা।

২. পুরুষের ওপর মহিলার নেতৃত্ব দেয়া ঠিক নয়। কারণ তা অশান্তি ও ব্যর্থতার কারণ। এ জন্যই আল্লাহ তা‘আলা কোন মহিলাকে নবুওয়াতের দায়িত্ব দেননি।

৩. দুনিয়া আখিরাতের তুলনায় অতি নগণ্য, আখিরাতই স্থায়ী এবং মু’মিনের জন্য চির সুখের স্থান। সুতরাং আখিরাতকেই সর্বাবস্থায় প্রাধান্য দেয়া উচিত।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: আল্লাহ তাআ’লা খবর দিচ্ছেন যে, তিনি রাসূল ও নবী হিসেবে দুনিয়ায় পুরুষ লোককেই পাঠিয়েছেন। স্ত্রীলোকদেরকে নয়। জমহুর আলেমদের উক্তি এটাই যে, নুবওয়াত কখনো নারীদেরকে দান করা হয় নাই। এই আয়াতের ধরণেও এটাই প্রমাণিত হয়। কিন্তু কোন কোন আলেমের উক্তি এই যে, হযরত ইবরাহীমের (আঃ) স্ত্রী হযরত সারা (আঃ) হযরত মূসার (আঃ) মাতা এবং হযরত ঈসার (আঃ) মাতা মারইয়ামও (আঃ) নবী ছিলেন। ফেরেশতাগণ হযরত সারা (আঃ) কে তার পুত্র হযরত ইসহাক (আঃ) এবং পৌত্র হযরত ইয়াকুবের (আঃ) সুসংবাদ দিয়েছিলেন। হযরত মূসার (আঃ) মাতার নিকট তাঁকে দুধ পান করাবার ওয়াহী করা হয়। হযরত মারইয়ামকে (আঃ) ফেরেশতাগণ তাঁর পুত্র হযরত ঈসার (আঃ) সুসংবাদ দিয়েছিলেন। ফেরেশতাগণ তাকে বলেছিলেনঃ “হে মারইয়াম (আঃ)! আল্লাহ তোমাকে মনোনীত ও পবিত্র করেছেন এবং বিশ্বের নারীদের মধ্যে তোমাকে মনোনীত করেছেন। হে মারইয়াম (আঃ) তোমার প্রতিপালকের অনুগত হও ও সিজদা কর, এবং যারা রুকু করে তাদের সাথে রুকু’ কর।”

এর উত্তর এই যে, কুরআন কারীমে যেটুকু বর্ণনা রয়েছে তা আমরা বিনা বাক্য ব্যয়ে স্বীকার করে নিচ্ছি। কিন্তু এর দ্বারা তাদের নুবওয়াত প্রমাণিত হয় না। শুধু এইটুকু ফরমান বা এইটুকু শুভ সংবাদ অথবা এইটুকু হুকুম কারো নুবওয়াতের জন্যে দলীল নয়। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সবারই মাযহাব এটাই যে, নারীদের মধ্যে কেউই নবী হন নাই। হ্যাঁ তবে তাঁদের মধ্যে সিদ্দিকা বা সত্যবাদিণী রয়েছেন। যেমন সর্বাপেক্ষা সম্ভ্রান্ত বংশীয়া ও মর্যাদা সম্পন্না স্ত্রীলোক মারইয়াম (আঃ) সম্পর্কে কুরআন কারীমে ঘোষিত হয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “তার (হযরত ঈসার (আঃ) মা হচ্ছে সিদ্দীকা বা চরম সত্যবাদিনী।” সুতরাং যদি তিনি নবী হতেন তবে এই জায়গায় তাকে এটাই বলা হতো।

আয়াতটির ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, যমীনে বসবাসকারী মানুষই নবী হয়ে থাকেন, এটা নয় যে, আকাশ হতে কোন ফেরেশতা অবতীর্ণ হন। যেমন এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “(হে নবী সঃ)! তোমার পূর্বে আমি যে রাসূলদেরকে প্রেরণ করেছিলাম তারা অবশ্যই খাদ্য খেতো এবং বাজারে চলাফেরা করতো।” (২৫: ২০) তারা এইরূপ দেহ বিশিষ্ট ছিলেন না যে, খাদ্য গ্রহণ থেকে পবিত্র থাকবেন। তারা এমনও ছিলেন না যে, মৃত্যু তাদেরকে পেয়ে বসবে না। তারা বাজারেও চলাফেরা করতেন। আল্লাহ তাদের সাথে কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছেন। তিনি তাঁদের সাথে যাদেরকে ইচ্ছা মুক্তি দিয়েছেন এবং সীমালংঘনকারী লোকদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। এক আয়াতে আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “ (হে নবী (সঃ)! তুমি বলঃ আমি তো প্রথম রাসূল নই।” (৪৬: ৯) এ কথা জেনে রাখা প্রয়োজন যে, এখানে ‘গ্রামবাসী’ দ্বারা শহরবাসী উদ্দেশ্য। কেননা, গ্রামবাসী বড়ই বক্র স্বভাব ও দুশ্চরিত্র হয়ে থাকে। এটা সর্বজন বিদিত যে, শহরবাসী হয় কোমল অন্তর ও মহৎ চরিত্রের অধিকারী। অনুরূপভাবে জনপদ হতে দূরে তাঁবুতে বসবাসকারী বেদুঈনরাও অত্যন্ত কঠোর স্বভাবের হয়ে থাকে। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “মরুবাসী বেদুঈনরা কুফরী ও নিফাকে খুবই কঠিন।” (৯: ৯৭) কাতাদা’'ও (রঃ) এই ভাবার্থ বর্ণনা করেছেন। কেননা, শহরের লোকদের মধ্যে বিদ্যা ও ধৈর্য বেশি থাকে।

একটি হাদীসে এসেছে যে, এক মরুবাসী বেদুঈন রাসূলুল্লাহর (সঃ) সমিনে কিছু হাদিয়া পেশ করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে ওর বিনিময় প্রদান করেন। সে কিন্তু ওটাকে খুবই কম মনে করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে আরো দেন এবং শেষ পর্যন্ত তাকে খুশী করেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ “আমি ইচ্ছা করছি যে, আমি কুরায়েশ, আনসারী, সাকাথী এবং দাওসী গোত্রের লোক ছাড়া আর কারো উপঢৌকন গ্রহণ করবো না।”

হযরত আ’মাশ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যে মুমিনমু’মিন লোকদের সাথে মেলামেশা করে এবং তাদের দেয়া কষ্টের উপর ধৈর্য ধারণ করে সে ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা উত্তম যে লোকদের সাথে মেলামেশা করে না এবং তাদের দেয়া কষ্টের উপর ধৈর্য ধারণও করে না।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)

আল্লাহ তাআ’লার উক্তিঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী এই লোকগুলি কি ভূপৃষ্ঠে ভ্রমণ করে নাই, অতঃপর তাদের পুর্ববর্তীদের পরিণাম কি হয়েছিল তা কি দেখে নাই?’ (৪০: ৪৮২) অর্থাৎ তাদের পূর্ববর্তী যে সব উম্মত তাদের রাসূলদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল তাদের পরিণাম ফল কি হয়েছিল! আল্লাহ কিভাবে তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন! এই কাফিরদের জন্যে অনুরূপ শাস্তি রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে নাই যে, তাদের অন্তরগুলি তার ফলে বোধশক্তি সম্পন্ন হতো?” (২২: ৪৬) এরূপ করলে তারা দেখতে পেতো যে, তাদের ন্যায় কাফির ও গুনাহগারদের পরিণতি কি হয়েছিল! আল্লাহ তাআ’লা কাফিরদের ধ্বংস করে দিয়েছিলেন এবং মুমিনমু’মিনদেরকে মুক্তি দিয়েছিলেন। আল্লাহ তাআ’লার নীতি তাঁর মাখলুকের সাথে এইরূপই বটে। এই জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ যারা আল্লাহকে ভয় করে তাদের জন্যে পরকালই উত্তম। অর্থাৎ যেমন দুনিয়ায় আমি মু'মিনদেরকে মুক্তি দিয়ে থাকি, অনুরূপভাবে আখেরাতেও তাদেরকে আমার শাস্তি হতে রক্ষা করবো এবং পরকালের মুক্তি তাদের জন্যে দুনিয়ার মুক্তি হতে উত্তম হবে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “আমি অবশ্যই আমার রাসূলদেরকে এবং মু'মিনদেরকে পার্থিব জগতে সাহায্য করবো এবং যে দিন সাক্ষীগণ দাঁড়িয়ে যাবে। সেইদিন অত্যাচারীদের ওজর কোনই উপকারে আসবে না। তাদের উপর অভিসম্পাত বর্ষিত হবে এবং তাদের জন্যে নিকৃষ্ট ঘর হবে।” (৪০: ৫১-৫২) এখানে (আরবি) বা ঘরের সম্বন্ধ আখেরাতের দিকে লাগানো হয়েছে। যেমন (আরবি) এবং (আরবি) বলা হয়ে থাকে। আরব কবিদের কবিতাতেও এইরূপ (আরবি) বা সম্বন্ধ অনেক রয়েছে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।