সূরা হূদ (আয়াত: 91)
হরকত ছাড়া:
قالوا يا شعيب ما نفقه كثيرا مما تقول وإنا لنراك فينا ضعيفا ولولا رهطك لرجمناك وما أنت علينا بعزيز ﴿٩١﴾
হরকত সহ:
قَالُوْا یٰشُعَیْبُ مَا نَفْقَهُ کَثِیْرًا مِّمَّا تَقُوْلُ وَ اِنَّا لَنَرٰىکَ فِیْنَا ضَعِیْفًا ۚ وَ لَوْ لَا رَهْطُکَ لَرَجَمْنٰکَ ۫ وَ مَاۤ اَنْتَ عَلَیْنَا بِعَزِیْزٍ ﴿۹۱﴾
উচ্চারণ: কা-লূইয়া-শু‘আইবুমা-নাফকাহু কাছীরাম মিম্মা-তাকূলুওয়া ইন্না-লানারা-কা ফীনা-দা‘ঈফাওঁ- ওয়া লাওলা-রাহতুকা লারাজামনা-কা ওয়ামাআনতা ‘আলাইনাবি‘আযীয।
আল বায়ান: তারা বলল, ‘হে শু‘আইব, তুমি যা বল, তার অনেক কিছুই আমরা বুঝি না। আর তোমাকে তো আমরা আমাদের মধ্যে দুর্বলই দেখতে পাচ্ছি। যদি তোমার আত্মীয়-স্বজন না থাকত, তবে আমরা তোমাকে অবশ্যই পাথর মেরে হত্যা করতাম। আর আমাদের উপর তুমি শক্তিশালী নও’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৯১. তারা বলল, হে শু’আইব! তুমি যা বল তার অনেক কথা আমরা বুঝি না(১) এবং আমরা তো আমাদের মধ্যে তোমাকে দুর্বলই দেখছি। তোমার স্বজনবর্গ না থাকলে আমরা তোমাকে পাথর নিক্ষেপ করে মেরে ফেলতাম, আর আমাদের উপর তুমি শক্তিশালী নও।(২)
তাইসীরুল ক্বুরআন: তারা বলল, ‘হে শু‘আয়ব! তুমি যা বল তার অনেক কথাই আমরা বুঝি না, আমরা আমাদের মধ্যে তোমাকে অবশ্যই দুর্বল দেখছি, তোমার গোত্র না থাকলে আমরা তোমাকে অবশ্যই পাথর নিক্ষেপ ক’রে মেরে ফেলতাম, আমাদের উপর তোমার কোন ক্ষমতাই নেই।
আহসানুল বায়ান: (৯১) তারা বলল, ‘হে শুআইব! তুমি যা বল, তার অনেক কথা আমাদের বুঝে আসে না[1] এবং আমরা অবশ্যই নিজেদের মধ্যে তোমাকে দুর্বল দেখছি।[2] তোমার স্বজনবর্গ না থাকলে আমরা তোমাকে পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলতাম।[3] আর তুমি আমাদের উপর পরাক্রমশালীও নও।’ [4]
মুজিবুর রহমান: তারা বললঃ হে শু‘আইব! তোমার বর্ণিত অনেক কথা আমাদের বুঝে আসেনা এবং আমরা নিজেদের মধ্যে তোমাকে দুর্বল দেখছি, আর যদি তোমার প্রতি তোমার স্বজনবর্গের লক্ষ্য না থাকতো তাহলে আমরা তোমাকে প্রস্তরাঘাতে চূর্ণ করে ফেলতাম, আর আমাদের নিকট তোমার কোনই মর্যাদা নেই।
ফযলুর রহমান: তারা বলল, “হে শোয়াইব! তুমি যা বল তার অনেকটাই আমরা বুঝি না। আর আমরা তোমাকে আমাদের মধ্যে দুর্বলই দেখতে পাচ্ছি। তোমার গোত্রের লোকজন না থাকলে আমরা তোমাকে পাথর নিক্ষেপ করে মেরে ফেলতাম। তুমি তো আমাদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী নও।”
মুহিউদ্দিন খান: তারা বলল-হে শোয়ায়েব (আঃ) আপনি যা বলেছেন তার অনেক কথাই আমরা বুঝি নাই, আমারা তো আপনাকে আমাদের মধ্যে দূর্বল ব্যক্তি রূপে মনে করি। আপনার ভাই বন্ধুরা না থাকলে আমরা আপনাকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করতাম। আমাদের দৃষ্টিতে আপনি কোন মর্যাদাবান ব্যক্তি নন।
জহুরুল হক: তারা বললে -- "হে শোআইব! তুমি যা বল তার অধিকাংশই আমরা বুঝি না, আর আমরা অবশ্য আমাদের মধ্যে তোমাকে দুর্বলই তো দেখছি, আর তোমার পরিজনবর্গের জন্যে না হলে আমরা তোমাকে পাথর মেরেই শেষ করতাম, আর তুমি আমাদের উপরে মোটেই শক্তিশালী নও।"
Sahih International: They said, "O Shu'ayb, we do not understand much of what you say, and indeed, we consider you among us as weak. And if not for your family, we would have stoned you [to death]; and you are not to us one respected."
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৯১. তারা বলল, হে শু’আইব! তুমি যা বল তার অনেক কথা আমরা বুঝি না(১) এবং আমরা তো আমাদের মধ্যে তোমাকে দুর্বলই দেখছি। তোমার স্বজনবর্গ না থাকলে আমরা তোমাকে পাথর নিক্ষেপ করে মেরে ফেলতাম, আর আমাদের উপর তুমি শক্তিশালী নও।(২)
তাফসীর:
(১) শু'আইব কোন বিদেশী ভাষায় কথা বলছিলেন তাই তারা বুঝতে পারছিল না, এমন কোন ব্যাপার ছিল না। অথবা তাঁর কথা কঠিন, সূক্ষ্ম বা জটিলও ছিল না। কথা সবই সোজা ও পরিষ্কার ছিল। সেখানকার প্রচলিত ভাষায়ই কথা বলা হতো। তাহলে তারা কেন বুঝলো না? এর দুটি কারণ হতে পারে। এক. তাদের মানসিক কাঠামো এত বেশী বেঁকে গিয়েছিল যে, শু'আইব আলাইহিস সালামের সোজা সরল কথাবার্তা তার মধ্যে কোন প্রকারেই প্রবেশ করতে পারতো না। তাদের চিন্তাধারা থেকে ভিন্নতর কিছু শোনার কারণে তারা বলতে থাকে যে, এসব আবার কেমন ধারার কথা! তারা বলল যে, আমরা বুঝিনা। তারা এটা অপমানসূচক তাদের নবীকে বলেছিল। দুই. অথবা তারা সত্যি সত্যিই বুঝতে চেষ্টা করছিল না। তাদের বক্তব্য হলো, আপনি আমাদেরকে পুনরুত্থান, ও হাশর-নশরের মত গায়েবী বিষয় বলছেন, এমন কিছুর উপদেশ দিচ্ছেন যা আগে আমরা বুঝিনি। [কুরতুবী]
(২) একথা অবশ্য সামনে থাকা দরকার যে, এ আয়াতগুলো যখন নাযিল হয় তখন হুবহু একই রকম অবস্থা মক্কাতেও বিরাজ করছিল। সে সময় কুরাইশরাও একই ভাবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রক্ত পিপাসু হয়ে উঠেছিল। তারা তাঁর জীবননাশ করতে চাচ্ছিল। কিন্তু শুধু বনী হাশেম তাঁর পেছনে ছিল বলেই তাঁর গায়ে হাত দিতে ভয় পাচ্ছিল। কাজেই শু'আইব আলাইহিস সালাম ও তার কওমের এ ঘটনাকে যথাযথভাবে কুরাইশ ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে দিয়ে বর্ণনা করা হচ্ছে এবং সামনের দিকে শু'আইব আলাইহিস সালামের যে চরম শিক্ষণীয় জবাব উদ্ধৃত করা হয়েছে তার মধ্যে এ অর্থ লুকিয়ে রয়েছে যে, হে কুরাইশের লোকেরা! তোমাদের জন্যও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ থেকে এ একই জবাব দেয়া হলো।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৯১) তারা বলল, ‘হে শুআইব! তুমি যা বল, তার অনেক কথা আমাদের বুঝে আসে না[1] এবং আমরা অবশ্যই নিজেদের মধ্যে তোমাকে দুর্বল দেখছি।[2] তোমার স্বজনবর্গ না থাকলে আমরা তোমাকে পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলতাম।[3] আর তুমি আমাদের উপর পরাক্রমশালীও নও।’ [4]
তাফসীর:
[1] এই কথা তারা হয় ঠাট্টা-বিদ্রূপ স্বরূপ বলেছিল। কারণ প্রকৃতপক্ষে তাঁর কথা যে তারা বুঝতো না -তা নয়। সুতরাং এই অবস্থাতে এখানে বুঝতে না পারার কথা রূপকার্থে হবে। অথবা তাদের উদ্দেশ্য গায়েব সম্পর্কিত কথা বুঝতে না পারার ওজর প্রকাশ করা। যেমন মরণের পর পুনর্জীবন, হাশর, জান্নাত ও জাহান্নাম ইত্যাদি। এই হিসাবে বুঝতে না পারার কথা প্রকৃতার্থে ধরা হবে।
[2] এ দুর্বলতা শারীরিক দুর্বলতা ছিল, যেমন অনেকের মতে শুআইব (আঃ) চোখে কম দেখতেন অথবা তিনি শারীরিক দিক থেকে শীর্ণকায় ও পাতলা ছিলেন অথবা এই জন্য তাঁকে দুর্বল বলেছে যে, তিনি নিজে একা বিরোধীদের সাথে মুকাবিলা করার ক্ষমতা রাখতেন না।
[3] বলা হয় যে, শুআইব (আঃ)-এর স্বগোত্র থেকে তাঁর কোন সমর্থক ছিল না, কিন্তু সে গোত্র যেহেতু কুফর ও শিরকের দিক থেকে তাঁর জাতির সাথে ছিল, ফলে একই ধর্মাবলম্বী হওয়ার কারণে সেই গোত্রের খেয়াল শুআ’ইব (আঃ)-এর সাথে কঠিন দুর্ব্যবহার করা এবং তাঁর ক্ষতি সাধন করাতে বাধা হয়ে ছিল।
[4] যেহেতু তোমার গোত্রের মর্যাদা আমাদের অন্তরে আছে, সেহেতু আমরা ক্ষমার চোখে দেখছি।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৮৪-৯৫ নং আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়::
এখানে শুয়াইব (عليه السلام) ও তাঁর সম্প্রদায়ের সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে, যাদের বসতি ছিল ফিলিস্তিনের মাদইয়ান শহরে। আল্লাহ তা‘আলা মাদইয়ানবাসীর প্রতি নাবী হিসেবে শুয়াইব (عليه السلام) কে প্রেরণ করলেন। তিনিও তাদেরকে প্রথমে পূর্ববর্তী নাবীদের মতই আল্লাহ তা‘আলার তাওহীদের দিকে আহ্বান করলেন এবং এক আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করার জন্য নির্দেশ দিলেন এবং অন্যান্য উপাস্যদেরকে বর্জন করতে বললেন। কারণ আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত সত্য কোন মা‘বূদ নেই। আর তাদেরকে নিষেধ করলেন তারা যেন ওজনে ও পরিমাপে কম না দেয়। তাদের খারাপ আমলের মধ্যে অন্যতম এটিও একটি ছিল। তাদের অভ্যাস ছিল যে, যখন তারা কারো নিকট থেকে কিছু ক্রয় করত তখন ওজনে বেশি নিত এবং যখন কারো নিকট বিক্রয় করত তখন মাপে কম দিত। অথচ আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে প্রচুর পরিমাণ ধন-সম্পদ দিয়েছেন। তখন শুয়াইব (عليه السلام) তাদের এই পাপ কাজের জন্য আল্লাহ তা‘আলার শাস্তির ভয় দেখালেন। بِخَيْرٍ বলতে আর্থিক সচ্ছলতাকে বুঝানো হয়েছে।
নাবীগণের দা‘ওয়াত দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত (১) আল্লাহ তা‘আলার হক আদায় করা; (২) বান্দার হক আদায় করা। শু‘আইব (عليه السلام) তাদেরকে যে বললেন তোমরা ন্যায়সঙ্গতভাবে মেপে দেবে ও ওজনকে পরিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করবে এবং লোকদেরকে তাদের প্রাপ্য বস্তু কম দেবে না এর দ্বারা মূলত বান্দার হক বুঝানো হয়েছে। সুতরাং এই কথার তা‘কীদস্বরূপ শু‘আইব (عليه السلام) তাঁর সম্প্রদায়কে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, তারা যেন ওজন ও মাপে কম না দেয় এবং মানুষদেরকে যেন তাদের প্রাপ্য বস্তু কম না দেয়। কেননা আল্লাহ তা‘আলার নিকট এটি একটি বড় ধরনের অপরাধ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَیْلٌ لِّلْمُطَفِّفِیْنَﭐﺫ الَّذِیْنَ اِذَا اکْتَالُوْا عَلَی النَّاسِ یَسْتَوْفُوْنَﭑﺘ وَاِذَا کَالُوْھُمْ اَوْ وَّزَنُوْھُمْ یُخْسِرُوْنَﭒﺚ)
“মন্দ পরিণাম তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়, যারা লোকের নিকট হতে নেয়ার সময় পূর্ণ মাত্রায় গ্রহণ করে, এবং যখন তাদের জন্য মেপে অথবা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়।” (সূরা মুত্বাফ্ফিফীন ৮৩:১-৩)
আর তিনি তাদেরকে নিষেধ করলেন তারা যেন জমিনে ফাসাদ সৃষ্টি না করে। কারণ ওজন ও মাপে কম দিয়ে মানুষের হক নষ্ট করা ফাসাদ বা বিশৃঙ্খলার অন্তর্ভুক্ত, তাই তিনি তাদেরকে এ ধরনের ফাসাদ সৃষ্টি করতে নিষেধ করলেন।
(بَقِيَّتُ اللّٰهِ) ‘আল্লাহ প্রদত্ত অবশিষ্ট’ এর অর্থ হল সে মুনাফা যা ওজনে কোন প্রকার কম-বেশি না করে সঠিক মাপে ধার্মিকতার সাথে পণ্য দেয়ার পর অর্জন হয়ে থাকে। যেহেতু তা হালাল ও পবিত্র এবং তাতে বরকত রয়েছে, এ জন্য এ মুনাফাকে আল্লাহ তা‘আলার অবশিষ্ট সম্পদ বলে গণ্য করা হয়েছে। আর যদি আল্লাহ তা‘আলার প্রতি বিশ্বাসী না হয়ে তাঁর নির্দেশ ভঙ্গ করো তাহলে ওজনে যতই কম দাও না কেন তাতে কোন বরকত হবে না। এসব নির্দেশনা দিয়ে শু‘আইব (عليه السلام) বললেন: আমার দায়িত্ব শুধু তোমাদেরকে পৌঁছে দেয়া। মানা না মানা এটা তোমাদের দায়িত্ব, আমি তোমাদের ব্যাপারে কোন পাহারাদার নই। আর তোমাদেরকে বিরত রাখাও আমার পক্ষে সম্ভব নয় যদি তোমরা বিরত না হও।
শু‘আইব (عليه السلام)-এর এই কথার জবাবে তারা বলল; হে শুয়াইব! তোমার ইবাদত কি তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছে যে, আমরা আমাদের ঐ সমস্ত উপাস্যদেরকে ছেড়ে দেব যাদের উপাসনা আমাদের পূর্বপুরুষেরা করত অথবা আমরা আমাদের সম্পদ আমাদের ইচ্ছানুযায়ী ব্যবহার করতে পারব না। এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা থাকতে পারে না এবং তার কিছু অংশ নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী বের করব (অর্থাৎ সম্পদের যাকাত আদায় করা) তা হতে পারে না। সুতরাং এ ধরনের নিয়ম বাতিল।
কোন কোন মুফাসসির বলেছেন: সকল জাতির ধর্মেই যাকাত, ফিতরা এবং সাদকা ইত্যাদি আবশ্যক ছিল। সম্পদ উপার্জনের কিছু নিয়মাবলী ছিল। তাদের কথা শুনে শু‘আইব (عليه السلام) বললেন: যদি আমি আমার প্রভুর পক্ষ থেকে হকের ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত থাকি আর তিনি আমাকে উত্তম রিযিক দান করেন তবুও কি আমি তোমাদের কথা মত তোমাদেরকে যেদিকে আহ্বান করছি তার বিপরীত আমল করব। এটা হতে পারে না। আমি তো শুধু আমার সাধ্যমত তোমাদের কল্যাণ করারই ইচ্ছা পোষণ করি। আর তাও আল্লাহ তা‘আলার সাহায্য ব্যতীত সম্ভব নয়। সুতরাং আমি আমার প্রভুর ওপরই ভরসা করলাম। তিনি তাদেরকে আরো সতর্ক করলেন যে, হে আমার সম্প্রদায়! আমার বিরুদ্ধে তামরা এমন কাজ করে বস না যার ফলে তোমাদের ওপর পূর্ববর্তী জাতির মত শাস্তি নেমে আসে, যেমন শাস্তি এসেছিল নূহ, হূদ, সালেহ ও লূত (عليه السلام)-এর সম্প্রদায়ের ওপর। আর তোমরা লূত (عليه السلام)-এর সম্প্রদায় থেকে বেশি দূরেও নও। সুতরাং তোমরা তোমাদের পাপের কারণে আল্লাহ তা‘আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং তাঁরই দিকে ফিরে যাও।
শুআইব (عليه السلام)-এর এ কথার জবাবে তারা বলল, হে শুয়াইব! তুমি আমাদেরকে যেসব কথাবার্তা বল তা আমাদের বোধগম্য হচ্ছে না। সুতরাং তুমি এসব কথা বলা বন্ধ কর। আর তুমি তো আমাদের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল। যদি তোমার আত্মীয় স্বজন না থাকত তবে আমরা তোমাকে পাথর মেরে শেষ করে ফেলতাম। আমরা তোমার গোত্রের লোকদেরকে সম্মান করি, তাই কিছু বলছি না। অতএব তুমি তোমার এসব কথাবার্তা বলা থেকে বিরত হও। তাদের এ কথার জবাবে শু‘আইব (عليه السلام) বললেন, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আমাকে আমার স্বজনবর্গের কারণে ছেড়ে দিচ্ছ। কিন্তু যে আল্লাহ তা‘আলা আমাকে নবুওয়াতের মর্যাদা দান করেছেন, তাঁর সম্মান ও মর্যাদার কোন খেয়াল তোমাদের অন্তরে নেই এবং তাঁকে তোমরা পিছনে ফেলে রেখে দিয়েছে। এখানে শু‘আইব
(عليه السلام) أعز عليكم مني
আমার থেকে বেশি মর্যাদাবান, এর স্থানে
أعز عليكم من الله
আল্লাহ তা‘আলা থেকে বেশি মর্যাদাবান বলেছেন। এতে একথা বুঝাতে চেয়েছেন যে, নাবীর অসম্মান করা, প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা‘আলারই অসম্মান করা। কারণ নাবীগণ আল্লাহ তা‘আলারই প্রেরিত পুরুষ, আর এই পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে হকপন্থী উলামাদের অসম্মান করা আসলে আল্লাহ তা‘আলার দীনের অসম্মান করা ও তুচ্ছ জ্ঞান করা। মনে রেখ যে, তোমরা যা কর তা সবই আমার প্রতিপালকের আয়ত্তাধীন। তিনি যখন দেখলেন যে, তাঁর ওয়ায-নসীহতে তাদের কোন উপকার হচ্ছে না তখন তিনি আরো বললেন যে, তোমরা তোমাদের মত কাজ করতে থাক আমিও আমার কাজ করে যাই। অচিরেই জানতে পারবে কাদের ওপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি আসে এবং কারা মিথ্যাবাদী। সুতরাং তোমরা অপেক্ষা কর আর আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষমান রইলাম। তখন হঠাৎ এক বিকট আওয়াজ ধ্বনিতে তাদের অন্তর ফেটে গেল এবং তারা মৃত্যুবরণ করল। তার পর পরই শুরু হল ভূমিকম্প। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(فَأَخَذَتْهُمُ الرَّجْفَةُ فَأَصْبَحُوْا فِيْ دَارِهِمْ جٰثِمِيْنَ)
“সুতরাং তাদেরকে একটি প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প এসে গ্রাস করে নিলো, ফলে তাদের নিজেদের গৃহের মধ্যেই (মৃত অবস্থায় ) উপুড় (অধোমুখী) হয়ে পড়ে রইল।” (সূরা আ‘রাফ ৭:৯১)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
(فَكَذَّبُوْهُ فَأَخَذَتْهُمُ الرَّجْفَةُ فَأَصْبَحُوْا فِيْ دَارِهِمْ جٰثِمِيْنَ)
“কিন্তু তারা তার প্রতি মিথ্যারোপ করল, অতঃপর তারা ভূমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হল; ফলে তারা নিজ গৃহে নতজানু অবস্থায় শেষ হয়ে গেল।” (সূরা আনকাবুত ২৯:৩৭)
এভাবেই তারা অভিশপ্ত অবস্থায় দুনিয়া থেকে বিদায় নিল এবং আল্লাহ তা‘আলার রহমত থেকে বঞ্চিত হল।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. ওজন ও পরিমাপে কম দেয়া যাবে না। কারণ এটি বড় ধরনের অপরাধ। আর এতে বরকত নষ্ট হয়ে যায়।
২. হক্ব পন্থী আলেমদেরকে অপমান বা তাদের সাথে বেয়াদবী করা যাবে না। কারণ তাদের সাথে বেয়াদবী করার অর্থই হল আল্লাহ তা‘আলার ধর্মকে তুচ্ছ মনে করা।
৩. সঠিক পথের দায়ীকে অনেক ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ করা হবে, তাই বলে দাওয়াতী মিশন ছেড়ে দেয়া যাবে না।
৪. আল্লাহ তা‘আলার হক ও বান্দার হক কোনটাই নষ্ট করার সুযোগ নেই। কারণ কিয়ামতের দিন এ ব্যাপারে জবাবদিহীতার সম্মুখীন হতে হবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৯০-৯১ নং আয়াতের তাফসীর
হযরত শুআ’ইবের (আঃ) কওম তাকে বললো: হে শুআ’ইব (আঃ)! তোমার অধিকাংশ কথা আমাদের বোধগম্য হয় না। আর তুমি নিজেও আমাদের মধ্যে অত্যন্ত দুর্বল। হযরত সাঈদ ইবনু জুবাইর (রঃ) এবং হযরত সাওরী (রঃ) বলেন যে, তাঁর দৃষ্টি শক্তি কম ছিল বলেই তাকে দুর্বল বলা হয়েছে। সাওরী (রঃ) বলেন যে, তাঁকে ‘খাতীবুল আমবিয়া’ (নবীদের ভাষণ দাতা) বলা হতো। কেননা, তাঁর ভাষণ ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার। সুদী (রঃ) বলেন যে, তিনি একাকী ছিলেন বলেই তাঁকে তারা তুচ্ছ জ্ঞান করে দুর্বল বলেছিল। কেননা, তাঁর আত্মীয় স্বজনরাই তার ধর্মের উপর ছিল না। তারা তাকে বলেনঃ “তোমার ভ্রাতৃত্বের প্রতি লক্ষ্য না করলে আমরা তোমাকে পাথর মেরে চূর্ণ বিচুর্ণ করে দিতাম। বা তোমাকে মন খুলে গালমন্দ দিতাম। আমাদের মধ্যে তোমার কোন মর্যাদা নেই। তাদের একথা শুনে তিনি তাদেরকে বলেনঃ “ভাই সব! আমার ভ্রাতৃত্ব ও আত্মীয়তার প্রতি লক্ষ্য করেই তোমরা আমাকে ছেড়ে দিচ্ছ, আল্লাহর জন্য নয়? তা হলে বুঝা যাচ্ছে যে, তোমাদের কাছে আত্মীয় সম্পর্ক আল্লাহ তাআ’লা অপেক্ষা বেশী গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহর নবীকে কষ্ট দেয়ার ব্যাপারে তোমরা তাঁকেই ভয় করছো না? বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, তোমরা আল্লাহর কিতাবকে পশ্চাতে নিক্ষেপ করছে! তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও আনুগত্যের প্রতি তোমাদের কোন খেয়ালই নেই। ভাল কথা, আল্লাহ তাআ’লা তোমাদের অবস্থা পূর্ণরূপে অবগত রয়েছেন। তিনিই তোমাদের পুরোপুরি বদলা দান করবেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।