আল কুরআন


সূরা হূদ (আয়াত: 76)

সূরা হূদ (আয়াত: 76)



হরকত ছাড়া:

يا إبراهيم أعرض عن هذا إنه قد جاء أمر ربك وإنهم آتيهم عذاب غير مردود ﴿٧٦﴾




হরকত সহ:

یٰۤـاِبْرٰهِیْمُ اَعْرِضْ عَنْ هٰذَا ۚ اِنَّهٗ قَدْ جَآءَ اَمْرُ رَبِّکَ ۚ وَ اِنَّهُمْ اٰتِیْهِمْ عَذَابٌ غَیْرُ مَرْدُوْدٍ ﴿۷۶﴾




উচ্চারণ: ইয়া-ইবরাহীমুআ‘রিদ‘আন হা-যা- ইন্নাহূকাদ জাআ আমরু রাব্বিকা ওয়া ইন্নাহুম আ-তীহিম ‘আযা-বুন গাইরু মারদূদ।




আল বায়ান: হে ইবরাহীম, তুমি এ থেকে বিরত হও। নিশ্চয় তোমার রবের সিদ্ধান্ত এসে গেছে এবং নিশ্চয় তাদের উপর আসবে আযাব, যা প্রতিহত হবার নয়।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৭৬. হে ইবরাহীম! আপনি এটা থেকে বিরত হোন(১); নিশ্চয় আপনার রবের বিধান এসে পড়েছে; আর নিশ্চয় তাদের প্রতি আসবে শাস্তি যা অনিবার্য।




তাইসীরুল ক্বুরআন: ‘হে ইবরাহীম! এথেকে তুমি নিবৃত্ত হও, তোমার প্রতিপালকের নির্দেশ এসে গেছে, তাদের প্রতি শাস্তি আসবেই যা রদ হবার নয়।




আহসানুল বায়ান: (৭৬) হে ইব্রাহীম! এ (তর্ক) হতে বিরত হও। তোমার প্রতিপালকের নির্দেশ এসে গেছে এবং তাদের উপর এমন এক শাস্তি আসছে যা কিছুতেই টলবার নয়। [1]



মুজিবুর রহমান: হে ইবরাহীম! এ কথা ছেড়ে দাও, তোমার রবের আদেশ এসে গেছে এবং তাদের উপর এমন এক শাস্তি আসছে যা কিছুতেই প্রতিহত করার নয়।



ফযলুর রহমান: হে ইবরাহীম! এ বিষয়টি ছেড়ে দাও। আসলে তোমার প্রভুর নির্দেশ এসে গেছে। ওদের জন্য এমন এক শাস্তি আসছে যা ফেরানো যাবে না।



মুহিউদ্দিন খান: ইব্রাহীম, এহেন ধারণা পরিহার কর; তোমার পালনকর্তার হুকুম এসে গেছে, এবং তাদের উপর সে আযাব অবশ্যই আপতিত হবে, যা কখনো প্রতিহত হবার নয়।



জহুরুল হক: হে ইব্রাহীম! এ থেকে ক্ষান্ত হও, নিঃসন্দেহ তোমাদের প্রভুর বিধান এসে পড়েছে, আর ওদের ক্ষেত্রে -- শাস্তি তাদের উপরে আসবেই, তা ফেরানো যাবে না।



Sahih International: [The angels said], "O Abraham, give up this [plea]. Indeed, the command of your Lord has come, and indeed, there will reach them a punishment that cannot be repelled."



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৭৬. হে ইবরাহীম! আপনি এটা থেকে বিরত হোন(১); নিশ্চয় আপনার রবের বিধান এসে পড়েছে; আর নিশ্চয় তাদের প্রতি আসবে শাস্তি যা অনিবার্য।


তাফসীর:

(১) অর্থাৎ লুতের কাওমের ব্যাপারে আপনার বিবাদ পরিত্যাগ করুন। [কুরতুবী] কারণ, তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেয়া হয়ে গেছে। [ইবন কাসীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৭৬) হে ইব্রাহীম! এ (তর্ক) হতে বিরত হও। তোমার প্রতিপালকের নির্দেশ এসে গেছে এবং তাদের উপর এমন এক শাস্তি আসছে যা কিছুতেই টলবার নয়। [1]


তাফসীর:

[1] ফিরিশতাগণ ইবরাহীম (আঃ)-কে বললেন, এখন এই তর্ক-বিতর্ক করে কোন লাভ নেই, তর্ক-বিতর্ক বাদ দিন! তাদের ধ্বংসের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার সেই আদেশ এসে গেছে, যা তাঁর নিকট তাদের জন্য নির্ধারিত ছিল এবং উক্ত আযাব এখন না কারো তর্ক-বিতর্কে বন্ধ হবে, আর না কারোর দু’আতে স্থগিত হবে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৬৯-৮৩ নং আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়::



উক্ত আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম (عليه السلام)-কে সন্তানের সুসংবাদ দান এবং লূত (عليه السلام) ও তাঁর সম্প্রদায়ের অপকর্ম সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।



আল্লাহ তা‘আলা ফেরেশতা প্রেরণ করলেন লূত (عليه السلام)-এর অবাধ্য সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার জন্য। ফেরেশতারা লূত (عليه السلام)-এর অবাধ্য জাতিকে ধ্বংস করার যাত্রা পথে ইবরাহীম (عليه السلام)-এর নিকট উঠে গেলেন তাঁকে সু-সংবাদ দেয়ার জন্য। এ সুসংবাদটা ছিল পুত্র ইসহাক ও ইয়াকুবের সুসংবাদ। যেমন অত্র সূরার ৭১ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে। ইবরাহীম (عليه السلام) জানতেন না এরা ফেরেশতা। তারা (ফেরেশতারা) ইবরাহীম (عليه السلام)-এর নিকট গিয়ে সালাম দিলেন এবং ইবরাহীম (عليه السلام)ও তাদের সালামের উত্তর দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ইবরাহীম (عليه السلام) তাদের জন্য একটি ভুনা করা বাছুর নিয়ে আসলেন। এতে বুঝা যায় ইবরাহীম (عليه السلام) বড়ই মেহমানপ্রিয় মানুষ ছিলেন। তিনি তাদেরকে মানুষ মনে করে এ আয়োজন করেছিলেন। যদি জানতেন এরা আল্লাহ তা‘আলার ফেরেশতা তাহলে তিনি এ ব্যবস্থা করতেন না। এখান থেকেও বুঝা যাচ্ছে নাবীরা গায়েব জানেন না। আরো বুঝা যায় মেহমানের যথাসম্ভব সম্মান করা উচিত। মেহমানের কদর করাকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদীসে ঈমানদারদের বৈশিষ্ট্য বলে উল্লেখ করেছেন। যখন ইবরাহীম (عليه السلام) খাবারের আয়োজন করার পর দেখলেন যে, তারা (ফেরেশতারা) সে দিকে হাত দিচ্ছে না অর্থাৎ সেখান থেকে তারা (ফেরেশতারা) খাচ্ছে না, তখন ইবরাহীম (عليه السلام) তাদেরকে ভয় পাচ্ছিলেন। বলা হয় তাদের নিকট এটা প্রসিদ্ধ ছিল যে, কারো বাড়িতে আগত মেহমান যদি মেহমানি গ্রহণ না করে তাহলে বুঝা যাবে যে, আগত মেহমান কোন ভাল উদ্দেশ্য নিয়ে আসেনি। সূরা যারিয়ার ২৬-২৭ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে তাদের নিকট খাবার দেয়ার পর যখন দেখছেন তারা খাচ্ছে না, তখন তিনি বললেন, আপনারা খাচ্ছেন না কেন? সূরা হিজরের ৫২ নং আয়াতে বলা হয়েছে আমরা আপনাদের আগমনে শংকিত। এমতাবস্থায় ফেরেশতারা ইবরাহীম (عليه السلام) কে অভয় দিয়ে বললেন: আপনি ভয় পাবেন না। আমরা আল্লাহ তা‘আলার ফেরেশতা, আমরা অভিশপ্ত সম্প্রদায় লূত (عليه السلام)-এর জাতিকে শাস্তি দেয়ার জন্য প্রেরিত হয়েছি। তখন সারা (আলাইহাস সালাম) তথায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি এই অভিশপ্ত জাতির ধ্বংসের কথা শুনে হাসলেন। কেউ কেউ বলেন, তাকে যে বৃদ্ধ বয়সে সন্তানের সু-সংবাদ দেয়া হয়েছে এজন্য তিনি হাসলেন।



ফেরেশতারা ইবরাহীম (عليه السلام)-এর স্ত্রী সারাকে পুত্র ইসহাক (عليه السلام)-এর সুসংবাদ দিলেন, এবং ইসহাকের ঘরে ইয়াকুব হবে এ সুসংবাদও দিলেন। তখন সারা (عليه السلام) বললেন যে, আমি এবং আমার স্বামী আমরা তো উভয়ে বৃদ্ধ হয়ে গেছি। এখন সন্তান প্রসব করা তো একটা আশ্চর্যজনক বিষয়। আর এটাতো অসম্ভব বিষয়; যা পৃথিবীর বুকে বিরল। সূরা যারিয়াতের ২৯ নং আয়াতে বলা হয়েছে সারা বলল: আমি বৃদ্ধা ও বন্ধ্যা। তাদের কথার জবাবে ফেরেশতারা বলল, আপনারা কি আল্লাহ তা‘আলার কাজের ব্যাপারে বিস্ময়বোধ করছেন। অথচ আল্লাহ তা‘আলার নিকট এটা কোনই কঠিন ব্যাপার নয়। তিনি শুধু বলেন, হও তাই হয়ে যায়। যেমন



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(إِنَّمَآ أَمْرُه۫ٓ إِذَآ أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَّقُوْلَ لَه۫ كُنْ فَيَكُوْنُ)



“বস্তুতঃ তাঁর সৃষ্টিকার্য এরূপ যে, যখন তিনি কোন কিছু সৃষ্টি করতে ইচ্ছা করেন, তখন তিনি তাকে বলেনঃ “হও”, অমনি তা হয়ে যায়।” (সূরা ইয়াসীন৩৬:৮২) সুতরাং আল্লাহ তা‘আলার কাজে আশ্চর্য হওয়ার কোনই কারণ নেই।



(أَهْلَ الْبَيْتِ) ইবরাহীম (عليه السلام)-এর স্ত্রীকে এখানে ফেরেশতারা আহলে বাইত বলে সম্বোধন করেছেন এবং তার জন্য বহুবচন শব্দ ব্যবহার করেছেন। যা প্রমাণ করে ১. স্ত্রী সর্বপ্রথম আহলে বাইতের অন্তর্ভ্ক্তু। ২. আহলে বাইতের জন্য বহুবচন পুংলিঙ্গ শব্দ ব্যবহার করা ঠিক। যেমন সূরা আহযাবের ৩৩ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পবিত্র স্ত্রীগণের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করেছেন।



মেহমানরূপে আগত ফেরেশ্তাদের পরিচয় পাওয়ার পর ইবরাহীম (عليه السلام)-এর ভয় কেটে গেল। ভয় কেটে যাওয়ার পর ফেরেশতাদের সাথে লূত (عليه السلام)-এর সম্প্রদায়ের ধ্বংস সম্পর্কে কথা কাটাকাটি করতে লাগলেন এবং বললেন যে, আপনারা যে সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার জন্য প্রেরিত হয়েছেন সেখানে তো আল্লাহ তা‘আলার প্রেরিত নাবী লূত (عليه السلام) রয়েছেন, এর উত্তরে ফেরেশতারা যা বললেন, যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(قَالَ إِنَّ فِيْهَا لُوْطًا ط قَالُوْا نَحْنُ أَعْلَمُ بِمَنْ فِيْهَا ز لَنُنَجِّيَنَّه۫ وَأَهْلَه۫ٓ إِلَّا امْرَأَتَه۫ ز كَانَتْ مِنَ الْغٰبِرِيْنَ)



“ইবরাহীম বলল:‎ ‘এ জনপদে তো লূত রয়েছে।’ তারা বলল:‎ ‘সেথায় কারা আছে, তা আমরা ভাল করেই জানি, আমরা লূতকে ও তার পরিজনদেরকে অবশ্যই রক্ষা করব, তার স্ত্রীকে ছাড়া; সে তো পশ্চাতে অবস্থানকারীদের অন্তর্ভুক্ত।’’ (সূরা আনকাবুত ২৯:৩২)



ইবরাহীম (عليه السلام)-এর এরূপ কথা বলার কারণ ছিল যে, তিনি ছিলেন নরম হৃদয়ের অধিকারী যার ফলে তিনি কোন সম্প্রদায়ের ধ্বংসটা সহ্য করতে পারছিলেন না।



তখন ফেরেশতারা ইবরাহীম (عليه السلام)-এর কথা শুনে বললেন: এখন এসব কথা বলে কোন লাভ নেই। কারণ তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। সুতরাং তাদের ওপর এমন শাস্তি আসছে যে, সে শাস্তি ফিরাবার মত কেউ নেই। অতএব এখন আর তর্ক-বিতর্ক করে কোন লাভ নেই।



অতঃপর যখন ফেরেশতারা লূত (عليه السلام)-এর নিকট উপস্থিত হল তখন তিনি তাদেরকে নিয়ে খুবই চিন্তায় মগ্ন হলেন, আর তাঁর হৃদয় সঙ্কুচিত হয়ে গেল এবং বললেন যে, আজকের দিনটি বড়ই কঠিন। কারণ তাঁর সম্প্রদায় যখনই কোন সুন্দর-সুদর্শন যুবককে দেখত তখনই তারা তার সাথে অপকর্মে লিপ্ত হতে চাইত। আর এ ফেরেশতারা সুদর্শন যুবকের বেশ ধরে আগমন করেছেন। তিনিও জানতেন যে, আগত যুবকেরা মানুষ নয় বরং ফেরেশতা। যার ফলে তিনি তাদের ব্যাপারে চিন্তিত ছিলেন। অতঃপর যখন তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা (এসব সুদর্শন যুবকদের) ফেরেশতাদের আগমনের কথা জানতে পারল তখন তারা তাদের সাথে অপকর্ম করার জন্য আনন্দে আত্মহারা হয়ে দ্রুত ছুটে আসল। আর তাদেরকে সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য জোর করতে লাগল। যাতে তাদের (ফেরেশতা) সাথে তাদের মন্দ কামনা চরিতার্থ করতে পারে।



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَلَقَدْ رَاوَدُوْھُ عَنْ ضَیْفِھ۪ فَطَمَسْنَآ اَعْیُنَھُمْ فَذُوْقُوْا عَذَابِیْ وَنُذُرِ)



“তারা মেহমানদের জন্য লূতকে ফুসলিয়েছিল, তখন আমি তাদের চোখের দৃষ্টিশক্তি লোপ করে দিলাম (এবং বললামঃ) আস্বাদন কর আমার আযাব এবং সতর্কবাণীর পরিণাম!” (সূরা কমার ৫৪:৩৭) তখন লূত (عليه السلام) তাদের এ অবস্থা দেখে বললেন যে, যদি তোমাদের উদ্দেশ্য যৌন চাহিদা পূরণ করাই হয়ে থাকে তাহলে এই যে আমার মেয়েরা রয়েছে তাদেরকে নিয়ে যাও এবং বিবাহের মাধ্যমে তাদের সাথে যৌন চাহিদা পূরণ কর। এটাই তোমাদের জন্য সর্বাধিক কল্যাণকর হবে।



কোন কোন মুফাসসিরগণ বলেছেন: লূত (عليه السلام) আমার কন্যা বলতে সমগ্র মহিলাদেরকে বুঝিয়েছেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় কর আর আমাকে আমার মেহমানের সম্মুখে অপমানিত কর না। লূত (عليه السلام)-এর কথার উত্তরে তারা বলল যে, আমাদের মহিলাদের কোনই প্রয়োজন নেই আর আমাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আপনি ভাল করেই জানেন। তাদের এ কথা দ্বারা বুঝা যায় যে, বৈধ ও স্বাভাবিক নিয়মকে তারা অস্বীকার করে দিল এবং অস্বাভাবিক কর্ম ও নির্লজ্জতার ওপর অটল থাকল। তাদের এ পরিস্থিতি দেখে লূত (عليه السلام) আফসোস করে বললেন যে, যদি আমার তোমাদের ওপর কোন প্রভাব থাকত তাহলে আজ আমাকে মেহমানদের জন্য এই অস্থিরতার শিকার ও অপমানিত হতে হত না। বরং আমি তোমাদেরকে প্রতিহত করতাম।



ফেরেশতারা লূত (عليه السلام)-এর অস্থিরতা ও উৎকণ্ঠা এবং তাঁর সম্প্রদায়ের অবাধ্যতা স্বচক্ষে দেখার পর বলল: হে লূত (عليه السلام)! আপনি নিশ্চিত থাকুন। আমরা আল্লাহ তা‘আলার প্রেরিত ফেরেশতা তারা আমাদের কাছে আসবে তো দূরের কথা আপনার কাছেও পৌঁছতে পারবে না। আপনি রাত্রের কিছু অংশ বাকি থাকতে আপনার স্ত্রী ব্যতীত পরিবারের সকলকে নিয়ে এই এলাকা থেকে চলে যান। তবে শর্ত হল পিছনের দিকে ফিরে তাকাবেন না। এরূপ নির্দেশ সূরা হিজরের ৬৫ নং আয়াতের উল্লেখ রয়েছে। পিছনের দিকে তাকাতে নিষেধের কারণ হল কেউ আযাব প্রত্যক্ষ করতে চাইলে তাকেও আযাব গ্রাস করে নিত। প্রত্যুষকালেই এই গ্রামকে ধ্বংস করে দেয়া হবে। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ মোতাবেক সেই জনপদকে ভোরবেলায় উল্টিয়ে দেয়া হয় এবং তাদের ওপর ক্রমাগতভাবে পাথরের বৃষ্টি বর্ষণ করা হয় এবং তাদেরকে সমূলে ধ্বংস করে দেয়া হয়। এটাই ছিল লূত (عليه السلام)-এর সম্প্রদায়ের করুণ পরিণতি। লূত (عليه السلام)-এর জাতির বসতি ছিল জর্ডান ও ইসরাঈলের মধ্যবর্তী মৃতসাগরের নিকট, বাইবেলে যার নাম সুডুম। সুতরাং মক্কার এই সমস্ত কাফির-মুশরিকরাও তাদের থেকে দূরে নয়। তাদের অবস্থাও এরূপ হতে পারে। অতএব তারা যেন আগে থেকেই সাবধান হয়ে যায় এবং আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. নাবীরা গায়েব জানেন না। যদি জানতেন তাহলে ইবরাহীম (عليه السلام) ফেরেশতাদের জন্য ভূনা গোশত নিয়ে আসতেন না এবং লূত (عليه السلام)ও মেহমানদের জন্য চিন্তিত হতেন না।

২. পুরুষের সাথে পুরুষের যৌন চাহিদা নিবারণ করা হারাম।

৩. ইবরাহীম (عليه السلام)-এর আতিথেয়তা সম্পর্কে জানতে পারলাম আর এও জানতে পারলাম যে, তিনি ছিলেন কোমল হৃদয়ওয়ালা ব্যক্তি।

৪. লূত (عليه السلام)-এর জাতির পাপাচার ও তাদের ধ্বংসের কারণ সম্পর্কে জানতে পারলাম।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৭৪-৭৬ নং আয়াতের তাফসীর

আল্লাহ তাআ’লা খবর দিচ্ছেন যে, মেহমানদের খাদ্য না খাওয়ার কারণে হযরত ইবরাহীমের (আঃ) অন্তরে যে ভীতির সঞ্চার হয়েছিল; প্রকৃত অবস্থা প্রকাশিত হওয়ার পর তা দূরীভূত হয়ে গেল। অতঃপর তিনি তাঁর সন্তান লাভ করারও শুভ সংবাদ পেয়ে যান। আর এটাও তিনি জানতে পারেন যে, ফেরেশতারা হযরত লূতের (আঃ) কওমকে ধ্বংস করার জন্যে প্রেরিত হয়েছেন। সুতরাং তিনি ফেরেশতাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “যদি কোন গ্রামে তিন শত মুমিনমু’মিন বাস করে তবে কি সেই গ্রামকে ধ্বংস করা যাবে? উত্তরে হযরত জিবরাঈল (আঃ) এবং তাঁর সঙ্গীরা বলেনঃ “না।” হযরত ইবরাহীম (আঃ) আবার জিজ্ঞেস করেনঃ “যদি চল্লিশ জন মুমিনমু’মিন থাকে তবে ধ্বংস করা যাবে কি?” এবারও ‘না’ উত্তর আসে। তিনি পুনরায় প্রশ্ন করেনঃ “যদি ত্রিশ জন মুমিনমু’মিন থাকে?: জবাবে এবারও ‘না’ বলা হয়। এমনকি সংখ্যা কমাতে কমাতে পাঁচ জনের সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে ফেরেশতারা উত্তরে নাই বলেন। আবার একজন মুমিনমু’মিন থাকলে ঐ গ্রামকে ধ্বংস করা যাবে কি-না এ প্রশ্ন করা হলে ঐ ‘না’ উত্তরই আসে। তখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) ফেরেশতাদের জিজ্ঞেস করেনঃ “তা হলে ঐ গ্রামে হযরত লূতের (আঃ) বিদ্যমানতায় কি করে আপনারা ওটাকে ধ্বংস করবেন? জবাবে ফেরেশতারা বলেনঃ “ঐ গ্রামে হযরত লূত (আঃ) যে রয়েছেন তা আমাদের জানা আছে। তাঁকে এবং তাঁর পরিবারের লোককে আমরা ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করবো। কিন্তু তাঁর স্ত্রীকে শুধু রেহাই দেয়া হবে না।” ফেরেশতাদের এই কথায় হযরত ইবরাহীম (আঃ) মনে প্রশান্তি লাভ করেন এবং নীরব হয়ে যান।

আল্লাহ পাক বলেনঃ ‘সত্যিই ইবরাহীম (আঃ) ছিল বড় সহিষ্ণু, দয়ালু ও কোমল হৃদয়।' এ আয়াতের তাফসীর ইতিপূর্বে করা হয়েছে। এখানে মহান আল্লাহ স্বীয় নবীর উত্তম গুণাবলীর বর্ণনা দিয়েছেন। আল্লাহ তাআ’লা হযরত ইবরাহীমের (আঃ) উপরোক্ত আলোচনা ও সুপারিশের জবাবে তাঁকে বলেনঃ হে ইবরাহীম (আঃ)! তুমি এসব কথা ছেড়ে দাও। তোমার প্রতিপালকের নির্দেশ এসেই গেছে। এখন তাদের উপর শাস্তি চলে আসবে এবং এটা আর কিছুতেই টলবার নয়।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।