সূরা হূদ (আয়াত: 54)
হরকত ছাড়া:
إن نقول إلا اعتراك بعض آلهتنا بسوء قال إني أشهد الله واشهدوا أني بريء مما تشركون ﴿٥٤﴾
হরকত সহ:
اِنْ نَّقُوْلُ اِلَّا اعْتَرٰىکَ بَعْضُ اٰلِهَتِنَا بِسُوْٓءٍ ؕ قَالَ اِنِّیْۤ اُشْهِدُ اللّٰهَ وَ اشْهَدُوْۤا اَنِّیْ بَرِیْٓءٌ مِّمَّا تُشْرِکُوْنَ ﴿ۙ۵۴﴾
উচ্চারণ: ইন নাকূলুইল্লা‘তারা-কা বা‘দুআ-লিহাতিনা-বিছূইন কা-লা ইন্নীউশহিদুল্লা-হা ওয়াশহাদূ আন্নী বারীউম মিম্মা-তুশরিকূন।
আল বায়ান: ‘আমরা তো কেবল বলছি যে, ‘আমাদের কোন কোন উপাস্য তোমাকে অমঙ্গল দ্বারা আক্রান্ত করেছে’। সে বলল, ‘নিশ্চয় আমি আল্লাহকে সাক্ষী রাখছি আর তোমরা সাক্ষী থাক যে, আমি অবশ্যই তা থেকে মুক্ত যাকে তোমরা শরীক কর,
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৫৪. আমরা তো এটাই বলি, আমাদের উপাস্যদের মধ্যে কেউ তোমাকে অশুভ দ্বারা আবিষ্ট করেছে(১)। তিনি বললেন, নিশ্চয় আমি আল্লাহকে সাক্ষী করছি এবং তোমরাও সাক্ষী হও যে, নিশ্চয় আমি তা থেকে মুক্ত যাকে তোমরা শরীক কর।(২),
তাইসীরুল ক্বুরআন: আমরা এ কথাই বলি যে, তোমার উপর আমাদের কোন উপাস্যের অশুভ ছায়া পড়েছে।’ সে বলল, ‘আমি আল্লাহকে সাক্ষী রাখছি আর তোমরাও সাক্ষী হও যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাকে তাঁর শরীক কর তার সাথে আমি পুরোপুরি সম্পর্কহীন।
আহসানুল বায়ান: (৫৪) আমাদের কথা তো এই যে, আমাদের উপাস্যদের মধ্যে হতে কেউ তোমাকে মন্দ দ্বারা স্পর্শ করেছে।’[1] সে বলল, ‘আমি আল্লাহকে সাক্ষী করছি এবং তোমরাও সাক্ষী থাক, তোমরা যে অংশী করছ নিশ্চিতভাবে আমি তা হতে মুক্ত। [2]
মুজিবুর রহমান: আমাদের কথা এই যে, আমাদের উপাস্য দেবতাদের মধ্য হতে কেহ তোমাকে দুর্দশায় ফেলে দিয়েছে। সে বললঃ আমি আল্লাহকে সাক্ষী রাখছি এবং তোমরাও সাক্ষী থেক যে, আমি তা থেকে মুক্ত, তোমরা যে ইবাদাতে শরীক সাব্যস্ত করছ,
ফযলুর রহমান: “আমরা তো বলব, আমাদেরই কোন দেবতা তোমাকে কোন অশুভ প্রভাবে আবিষ্ট করেছে।” সে বলল, “আমি আল্লাহকে সাক্ষী রাখছি আর তোমরাও সাক্ষী থাক, ওসবের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই যাদেরকে তোমরা শরীক করো,
মুহিউদ্দিন খান: বরং আমরাও তো বলি যে, আমাদের কোন দেবতা তোমার উপরে শোচনীয় ভূত চাপিয়ে দিয়েছে। হুদ বললেন-আমি আল্লাহকে সাক্ষী করেছি আর তোমাও সাক্ষী থাক যে, আমার কোন সম্পর্ক নাই তাঁদের সাথে যাদের কে তোমরা শরিক করছ;
জহুরুল হক: "আমরা বলি নি এ ছাড়া অন্য কিছু যে আমাদের কোনো দেবতা তোমাতে ভর করেছেন খারাপ ভাবে।" তিনি বললেন -- "নিঃসন্দেহ আমি আল্লাহ্কে সাক্ষী করি, আর তোমরাও সাক্ষী থেকো যে আমি আলবাৎ সংস্রবহীন তাদের সঙ্গে যাদের তোমরা শরিক কর --
Sahih International: We only say that some of our gods have possessed you with evil." He said, "Indeed, I call Allah to witness, and witness [yourselves] that I am free from whatever you associate with Allah
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৫৪. আমরা তো এটাই বলি, আমাদের উপাস্যদের মধ্যে কেউ তোমাকে অশুভ দ্বারা আবিষ্ট করেছে(১)। তিনি বললেন, নিশ্চয় আমি আল্লাহকে সাক্ষী করছি এবং তোমরাও সাক্ষী হও যে, নিশ্চয় আমি তা থেকে মুক্ত যাকে তোমরা শরীক কর।(২),
তাফসীর:
(১) হুদ আলাইহিস সালামের আহবানের জবাবে তার দেশবাসী মুর্খতা সুলভ উত্তর দিল যে, আপনি তো আমাদেরকে কোন মু'জিযা দেখালেন না। শুধু মুখের কথায় আমরা নিজেদের বাপ দাদার আমলের উপাস্য দেব-দেবীগুলোকে বর্জন করবো না এবং আপনার প্রতি ঈমানও আনব না। বরং সন্দেহ করছি যে আমাদের দেবতাদের নিন্দাবাদ করার কারণে আপনার মস্তিষ্ক বিকৃত হয়ে গেছে। তাই আপনি এমন অসংলগ্ন কথা বলেছেন। অর্থাৎ আপনি কোন দেবদেবী, বা কোন মহাপুরুষের আস্তানায় গিয়ে কিছু বেয়াদবী করেছেন, যার ফল এখন আপনি ভোগ করছেন। এতে বুঝা গেল যে, তারা এক ধরনের অজানা ভয় করছিল - যা এক ধরনের শির্ক। সুবহানাল্লাহ! কিভাবে তারা এতবড় একজন বিবেকবান মানুষকে বিবেকহীন বলে অপবাদ দিলো। যদি আল্লাহ বর্ণনা না করতেন তবে একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তির পক্ষে এ ধরনের নিঃস্বার্থ ও ভালো লোকের ব্যাপারে এ কথা বলা অত্যন্ত বেমানান।
কিন্তু হুদ আলাইহিস সালাম সম্পূর্ণভাবে নিজেকে এর থেকে বিমুক্ত ঘোষণা করেছেন এভাবে যে, এ ব্যাপারে আমার ভরসা আছে যে আমাকে কোন কিছু পেয়ে বসে নি। আমি আল্লাহকে সাক্ষী করছি আর তোমরাও সাক্ষী থেকে যে, আমি তোমাদের শরীকদের থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত [সা’দী] বর্তমানে অনেক মানুষ তাদের পীর বা কবরের মানত বন্ধ করলে বা তাদের কবর পুজার বিরোধিতা করলে কোন কারণে যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তখন এ ধরনের কথা বলে থাকে। তারা বলে যে, অমুক লোককে অমুক পীরের বদদো'আয় ধরেছে। অমুক কবরের শাপে অমুক ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে শির্ক। এটাকেই বলা হয়, ভয়ের মাধ্যমে শির্ক করা। এ ধরনের অজানা ভয়ই বর্তমানে অধিকাংশ শির্কের কারণ।
(২) অর্থাৎ তাদের কথার উত্তরে হুদ আলাইহিস সালাম নবীসুলভ নির্ভীক কন্ঠে জবাব দিলেন, তোমরা যদি আমার কথা না মান তবে শোন, আমি আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি আর তোমরাও সাক্ষী থাক যে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সব অলীক উপাস্যদের প্রতি আমি রুষ্ট ও বিমুখ। এখন তোমরা ও তোমাদের দেবতারা সবাই মিলে আমার অনিষ্ট সাধনের এবং আমার উপর আক্রমনের চেষ্টা করে দেখ আমাকে বিন্দুমাত্র অবকাশ দিও না। এত বড় কথা আমি এজন্য বলছি যে আমি আল্লাহর তা'আলার উপর পূর্ণ আস্থা ও ভরসা রাখি; যিনি আমার এবং তোমাদের একমাত্র পালনকর্তা। নিশ্চয় আমার পালনকর্তা সরল পথে রয়েছেন। অথাৎ তিনি তাঁর যাবতীয় ফয়সালা, তাকদীর, তাঁর যাবতীয় শরীআত ও নির্দেশ, তাঁর সমস্ত প্রতিদান প্রদান, সওয়াব দান এবং শাস্তি প্রদানে ন্যায়, ইনসাফ, প্রজ্ঞা ও প্রশংসাপূর্ণ পথেই রয়েছেন। তার কোন কাজ তাকে প্রশংসাপূর্ণ সেই সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করে না। [সা’দী]
সমগ্র জাতির মোকাবেলায় দাঁড়িয়ে এমন নির্ভীক ঘোষণা ও তাদের দীর্ঘ দিনের লালিত ধর্মীয় ধ্যান ধারণায় আঘাত হানা সত্বেও এত বড় সাহসী ও শক্তিশালী জাতির মধ্যে কেউ তার একটি কেশও স্পর্শ করতে পারল না। আসলে এটা হুদ আলাইহিস সালামের একটি মু'জিযা। এর দ্বারা একে তো তাদের এ কথার জবাব দেয়া হয়েছে যে, আপনি কোন মু'জিযা প্রদর্শন করেননি। দ্বিতীয়তঃ তারা যে বলত তাদের কোন কোন দেব-দেবী আপনার মস্তিষ্ক বিকৃত করে দিয়েছে তাও বাতিল করা হল। কারণ দেব-দেবীর যদি কোন ক্ষমতা থাকত তবে এত বড় কথা বলার পর ওরা তাকে জীবিত রাখত না।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৫৪) আমাদের কথা তো এই যে, আমাদের উপাস্যদের মধ্যে হতে কেউ তোমাকে মন্দ দ্বারা স্পর্শ করেছে।’[1] সে বলল, ‘আমি আল্লাহকে সাক্ষী করছি এবং তোমরাও সাক্ষী থাক, তোমরা যে অংশী করছ নিশ্চিতভাবে আমি তা হতে মুক্ত। [2]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, তুমি যে আমাদের উপাস্যদের অপমান ও তাদের সাথে বেআদবী করছ এই কথা বলে যে, এরা কোন কিছু করতে সক্ষম নয়, মনে হচ্ছে আমাদের উপাস্যরাই তোমার এই বেআদবীর কারণে তোমার কিছু করে দিয়েছে এবং তাতে তোমার মন-মস্তিষ্ক খারাপ হয়ে গেছে। যেমন বর্তমানে নামধারী কিছু মুসলিমও এরূপ চিন্তা-ভাবনার শিকার হয়ে আছে। যখন তাদের বলা হয় যে, এই সকল মৃতব্যক্তি ও বুযুর্গদের কিছুই করার ক্ষমতা নেই। তখন তারা বলে যে, এটা তাঁদের শানে বেআদবী এবং বড় আশঙ্কা আছে যে, তাঁরা এরূপ বেআদবদেরকে বিপদগ্রস্ত করবেন! আল্লাহর কাছে এমন গাঁজারে গল্প ও মনগড়া মিথ্যা কথা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করি।
[2] অর্থাৎ, আমি সেই সমস্ত মূর্তি ও উপাস্য থেকে সম্পর্কহীন। আর তোমাদের যে বিশ্বাস যে, তারা আমার কিছু ক্ষতি করে দিয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। তাদের এ ক্ষমতাই নেই যে, তারা কারোর উপকার করে অথবা অপকার।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৫০-৬০ নং আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়::
এ আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা হূদ (عليه السلام) এবং তাঁর ‘আদ জাতি সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।
আল্লাহ তা‘আলা “আদ” জাতির প্রতি নাবী হিসেবে প্রেরণ করলেন “হূদ” (عليه السلام) কে। তিনিও অন্যান্য নাবী-রাসূলগণের মত তাঁর জাতিকে প্রথমেই তাওহীদের দা‘ওয়াত দিয়েছিলেন যে, তোমরা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন সত্য মা‘বূদ নেই। আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত যাদের উপাসনা করা হয় সে সকল উপাস্যরা বাতিল। সুতরাং তোমরা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলারই ইবাদত বন্দেগী কর, তাহলে তিনি ইচ্ছানুযায়ী সব কিছু দান করবেন। এমনকি তিনি তোমাদেরকে এমন জায়গা থেকে রিযিক দেবেন যা তোমরা কল্পনাও করতে পারবে না। তিনি তাদেরকে অন্যান্য নাবীদের মত আরো বললেন যে, আমি আমার দাওয়াতী কাজের জন্য তোমাদের নিকট কোন বিনিময় চাই না।
তারপরও তোমরা এই সহজ কথাটুকু কেন বুঝ না যে, যিনি তোমাদেরকে আল্লাহ তা‘আলার পথে আহ্বান করছেন অথচ এর বিনিময় হিসেবে কিছুই চাচ্ছেন না। মূলত আমি তোমাদের কল্যাণকামী।
(لَآ أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا)
নাবীদের দাওয়াতী কাজে কোন পারিশ্রমিক না নেয়ার কথা থেকে অনেকে বলে থাকেন যে, দাওয়াতী কাজ করে কোন পারিশ্রমিক না নেয়াই উত্তম। বরং এ কাজের প্রতিদান আল্লাহ তা‘আলার কাছে আশা করবে যেমন নাবীরা করেছিলেন।
অতঃপর হূদ (عليه السلام) জাতিকে অতীতের গুনাহর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা ও তাওবাহ করতে বললেন।
তাহলে আল্লাহ তা‘আলা আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। ফলে ফসল ফলবে, তোমাদের শক্তির সাথে আরো অনেক শক্তি বৃদ্ধি পাবে। এ কথা বলার কারণ হল তারা অনেক শক্তিশালী ছিল। যেমন নূহ (عليه السلام) তাঁর জাতিকেও বলেছিলেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوْا رَبَّکُمْﺤ اِنَّھ۫ کَانَ غَفَّارًاﭙﺫ یُّرْسِلِ السَّمَا۬ئَ عَلَیْکُمْ مِّدْرَارًاﭚﺫ وَّیُمْدِدْکُمْ بِاَمْوَالٍ وَّبَنِیْنَ وَیَجْعَلْ لَّکُمْ جَنّٰتٍ وَّیَجْعَلْ لَّکُمْ اَنْھٰرًاﭛﺚ)
“আমি বলেছি: তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা প্রার্থনা কর, তিনি তো অতিশয় ক্ষমাশীল; তিনি তোমাদের জন্য আকাশ হতে প্রচুর বৃষ্টিপাত করবেন, তিনি তোমাদেরকে সমৃদ্ধ করবেন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে এবং তোমাদের জন্য বাগানসমূহ সৃষ্টি করবেন ও প্রবাহিত করবেন নদী-নালা।” (সূরা নূহ ৭১:১০-১২)
সুতরাং তোমরা আমার কথার বিরুদ্ধাচরণ করে মুখ ফিরিয়ে নিও না এবং কুফরীর ওপর অটল থেকো না। এ কথা শুনে হূদ (عليه السلام)-এর সম্প্রদায় দলীল-প্রমাণ পেশ করতে বলল এবং তাদের ধারণা ছিল যে, যেহেতু হূদ তাদের উপাস্যদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করছে সেহেতু সেই উপাস্যদের বদদু‘আ তাঁর ওপর পড়েছে এবং তাঁর মস্তিষ্ক নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে সে দলীল আনতে অক্ষম হবে। আর তারা বলল, কোন দলীল-প্রমাণ ব্যতীত আমরা তোমার কথায় আমাদের উপাস্যদেরকে পরিত্যাগ করতে পারি না। তাদের এ কথা শুনে হূদ (عليه السلام) তাদেরকে বললেন, যদি ব্যাপার এমনই হয়, তাহলে আমি আল্লাহ তা‘আলাকে সাক্ষী রাখছি আর তোমরা সাক্ষী থাক যে, আমি তোমাদের এই সমস্ত বাতিল মা‘বূদ থেকে মুক্ত।
বর্তমানেও এই ধরনের কিছু নামধারী মুসলিম রয়েছে যারা গাছ পূজা, মাযার পূজা, কবর পূজা করে। তাদেরকে এ থেকে বারণ করলে তারা বলে এটা উপাস্য ব্যক্তিদের সাথে বেয়াদবী। সুতরাং তারা এই সমস্ত বেআদবদের বিপদগ্রস্ত করেন। نعوذ بالله অথচ তাদের কোন কিছুই করার ক্ষমতা নেই।
তখন হূদ (عليه السلام) বললেন, যদি তোমরা আমার এ কথায় বিশ্বাসী না হও তবে তোমরা ও তোমাদের সকল মা‘বূদরা মিলে কিছু করে দেখাও। আর আমি আমার প্রতিপালক আল্লাহ তা‘আলার ওপরই ভরসা করলাম। যিনি সমস্ত ক্ষমতার মালিক। এরপরও যদি তোমরা বিশ্বাস না করে মুখ ফিরিয়ে নাও তবে মনে রেখ যে, আমার দায়িত্ব শুধু পৌঁছে দেয়া। আমি আমার কাজ সমাপ্ত করলাম, যদি তোমরা না মান তবে হয়ত আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের পরিবর্তে এখানে অন্য এক জাতিকে পাঠাবেন যারা তাঁর আনুগত্য করবে ও তাঁর উপাসনা করবে। ফলে তোমরা তাঁর কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। তখন হঠাৎ এক পর্যায়ে তাদের ওপর আল্লাহ তা‘আলার শাস্তি এসে পড়ল। সেখান থেকে আল্লাহ তা‘আলা হূদ (عليه السلام) এবং তার সাথে যারা ঈমান এনেছিল তাদেরকে রক্ষা করলেন তাঁর রহমত দ্বারা আর বাকিদেরকে আল্লাহ তা‘আলা কঠিন আযাব দিলেন এবং তাদেরকে ধ্বংস করে দিলেন। আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে যে শাস্তি দিয়েছিলেন সে সম্পর্কে বলেন:
(وَفِيْ عَادٍ إِذْ أَرْسَلْنَا عَلَيْهِمُ الرِّيْحَ الْعَقِيْمَ ج - مَا تَذَرُ مِنْ شَيْءٍ أَتَتْ عَلَيْهِ إِلَّا جَعَلَتْهُ كَالرَّمِيْمِ)
“এবং (নিদর্শন রয়েছে) ‘আদের ঘটনায়, যখন আমি তাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেছিলাম অকল্যাণকর বাতাস। তা যা কিছুর ওপর দিয়ে বয়ে গিয়েছিল তাকেই জরাজীর্ণ করে দিয়েছিল।” (সূরা যারিয়াত ৫১:৪১-৪২)
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:
(وَاَمَّا عَادٌ فَاُھْلِکُوْا بِرِیْحٍ صَرْصَرٍ عَاتِیَةٍﭕﺫسَخَّرَھَا عَلَیْھِمْ سَبْعَ لَیَالٍ وَّثَمٰنِیَةَ اَیَّامٍﺫ حُسُوْمًاﺫ فَتَرَی الْقَوْمَ فِیْھَا صَرْعٰیﺫ کَاَنَّھُمْ اَعْجَازُ نَخْلٍ خَاوِیَةٍﭖﺆ)
“আর ‘আদ সম্প্রদায়, তাদেরকে ধ্বংস করা হয়েছিল এক প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড় দ্বারা। যা তিনি তাদের ওপর প্রবাহিত করেছিলেন বিরামহীনভাবে সাত রাত ও আট দিন, তুমি (উপস্থিত থাকলে) সেই সম্প্রদায়কে দেখতে খেজুর কাণ্ডের ন্যায় সেখানে ছিন্ন ভিন্নভাবে পড়ে আছে।” (সূরা হা-ক্বাহ ৬৯:৬-৭)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
(إِنَّآ أَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ رِيْحًا صَرْصَرًا فِيْ يَوْمِ نَحْسٍ مُّسْتَمِرٍّ لا تَنْزِعُ النَّاسَ لا كَأَنَّهُمْ أَعْجَازُ نَخْلٍ مُّنْقَعِرٍ)
“আমি তাদের ওপর প্রেরণ করেছিলাম ক্রমাগত প্রবাহমান প্রচণ্ড গতিসম্পন্ন বায়ু, দুর্ভোগের দিনে, মানুষকে তা উৎখাত করেছিল উৎপাটিত খেজুর কাণ্ডের ন্যায়।” (সূরা ক্বামার ৫৪:১৯-২০)
(وَعَصَوْا رُسُلَه۫)
‘তাঁরা রাসূলদের অবাধ্য হল’ ‘আদ জাতির কাছে একজনই নাবী হূদ (عليه السلام)-কে প্রেরণ করা হয়েছিল। কিন্তু এখানে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, তারা তাঁর রাসূলদের অবাধ্য হল। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল একজন রাসূলকে অস্বীকার করা মানে সমস্ত রাসূলকে অস্বীকার করা। কারণ সমস্ত রাসূলের প্রতি ঈমান রাখা আবশ্যক। অথবা উদ্দেশ্য হল এ সম্প্রদায় তাদের কুফরী ও অস্বীকার করাতে এমন অতিরঞ্জন করে ফেলেছিল যে, হূদ (عليه السلام)-এর পরেও যদি আল্লাহ তা‘আলা তাদের মাঝে কোন নাবী প্রেরণ করেন তাহলে তারা সে সকল রাসূলকে অস্বীকার করবে। তাদের এরূপ কুফরী করার কারণে আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়াতেও লা’নত করলেন এবং আখিরাতেও তাদের ওপর লা’নত থাকবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. হূদ (عليه السلام)-এর জাতিরাও তাঁকে অমান্য করলে শাস্তি অবধারিত হয়ে যায়।
২. ক্ষমা প্রার্থনা করে আল্লাহ তা‘আলার সৎ বান্দা হতে পারলে দুনিয়ায় শান্তি বিরাজ করবে।
৩. হূদ (عليه السلام)-এর জাতিকে প্রচণ্ড ঝড়-ঝাঞ্ঝা দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে।
৪. বাপ-দাদার দোহাই দিয়ে সত্য প্রত্যাখ্যান করার পরিণাম ভাল নয়।
৫. পূর্ববর্তী এসব জাতির বিবরণ তুলে ধরার অন্যতম কারণ হল তাদের থেকে শিক্ষা নিয়ে সতর্ক হওয়া।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৫৩-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তাআ’লা সংবাদ দিচ্ছেন যে, হযরত হূদের (আঃ) কওম তাঁর উপদেশ শুনে তাঁকে বললো: “হে হূদ (আঃ)! তুমি যেই দিকে আমাদেরকে আহ্বান করছে তার তো কোন দলিল প্রমাণ আমাদের সামনে পেশ করছো না। আর আমরা এটা করতে পারি না যে, তোমার কথায় আমাদের মাবুদমা’বুদগুলির উপাসনা পরিত্যাগ করবো। আমরা এগুলি ছাড়বোও না এবং তোমাকে সত্যবাদী মেনে নিয়ে তোমার উপর ঈমানও আনবো না। বরং আমাদের তো ধারণা এই যে, যেহেতু তুমি আমাদেরকে আমাদের মাবুদমা’বুদগুলির উপাসনা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করছে এবং তাদের প্রতি দোষারোপ করছে, সেই হেতু তারা তোমার এই জ্বালাতন সহ্য করতে পারে নাই। তাই, তাদের কারো মার তোমার উপর পতিত হয়েছে। ফলে তোমার মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটেছে। তাদের এই কথা শুনে আল্লাহর নবী হযরত হূদ (আঃ) তাদেরকে বললেনঃ ‘যদি তাই হয় তবে জেনে রেখোঁরেখো যে, আমি শুধু তোমাদেরকেই নয়, বরং স্বয়ং আল্লাহ তাআ’লাকেও সাক্ষী রেখে ঘোষণা করছি যে, আল্লাহ ছাড়া যেসব মা'বুদের ইবাদত করা হচ্ছে আমি তাদের থেকে সম্পূর্ণরূপে বিমুখ ও মুক্ত। এখন শুধু তোমরা নও, বরং তোমাদের এই সব মিথ্যা ও বাজে মাবুদমা’বুদকেও ডেকে নাও এবং তোমরা সবাই মিলে যত পার আমার ক্ষতি সাধন কর। আর আমাকে মোটেই অবকাশ দিয়ো না এবং আমার প্রতি কোন সমবেদনাও প্রকাশ করো না। আমার ক্ষতি সাধন করার তোমাদের যতদূর ক্ষমতা থাকে তা প্রয়োগ করতে বিন্দুমাত্র ত্রুটি করো না। আমার ভরসা একমাত্র আল্লাহর উপর। যিনি আমার ও তোমাদের সকলেরই মালিক। তাঁর ইচ্ছা ছাড়া আমার ক্ষতি করার কারো সাধ্য নেই। এমন কেউ নেই যে, তাঁর হুকুম অমান্য করে তাঁর রাজ্য ও রাজত্ব হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। তিনি ন্যায় বিচারক। তিনি কখনো অত্যাচার করেন না। তিনি সরল ও সঠিক পথে রয়েছেন। বান্দাদের ঝুটি তাঁর হাতের মুঠের মধ্যে রয়েছে। সন্তানের উপর পিতামাতার যে দয়া রয়েছে, মুমিনমু’মিন বান্দার উপর আল্লাহর দয়া এর চেয়ে বহুগুণ বেশি রয়েছে। তিনি পরমদাতা ও দয়ালু। তাঁর দান ও দয়ার কোন শেষ নেই। এ কারণেই কতকগুলি লোক বিভ্রান্ত ও উদাসীন হয়ে পড়ে।'
হযরত হূদের (আঃ) এই কথাগুলির প্রতি লক্ষ্য করা যাক। তিনি আদি সম্প্রদায়ের জন্যে তাঁর এই উক্তির মধ্যে আল্লাহর একত্ববাদের বহু দলিল বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ আল্লাহ ছাড়া কেউ যখন লাভ ও ক্ষতির মালিক নয়, তিনি ছাড়া কারো কোন জিনিসের উপর যখন কোন অধিকার নেই, তখন একমাত্র তিনিই যে উপাসনার যোগ্য এটা প্রমাণিত হয়ে গেল। আর তোমরা তাকে ছাড়া যে সব মা'বুদের ইবাদত করছো সেই সবগুলি বাতিল সাব্যস্ত হলো। আল্লাহ তাআ’লা তাদের থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। আধিপত্য, ব্যবস্থাপনা, অধিকার এবং ইখতেয়ার একমাত্র তাঁরই। সবাই তাঁর কর্তৃত্বাধীন। তিনি ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।