সূরা হূদ (আয়াত: 39)
হরকত ছাড়া:
فسوف تعلمون من يأتيه عذاب يخزيه ويحل عليه عذاب مقيم ﴿٣٩﴾
হরকত সহ:
فَسَوْفَ تَعْلَمُوْنَ ۙ مَنْ یَّاْتِیْهِ عَذَابٌ یُّخْزِیْهِ وَ یَحِلُّ عَلَیْهِ عَذَابٌ مُّقِیْمٌ ﴿۳۹﴾
উচ্চারণ: ফাছাওফা তা‘লামূনা মাইঁ ইয়া’তীহি ‘আযা-বুইঁ ইউখযীহি ওয়া ইয়াহিল্লু‘আলাইহি ‘আযা-বুম মুকীম।
আল বায়ান: অতএব, শীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে, কার উপর সে আযাব আসবে যা তাকে লাঞ্ছিত করবে এবং কার উপর আপতিত হবে স্থায়ী আযাব।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৯. অতঃপর তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে, কার উপর আসবে এমন শাস্তি যা তাকে লাঞ্ছিত করবে, আর তার উপর আপতিত হবে স্থায়ী শাস্তি।
তাইসীরুল ক্বুরআন: তোমরা (শীঘ্রই) জানতে পারবে কার উপর লাঞ্ছনাকর ‘আযাব আসে আর কার উপর আসে স্থায়ী ‘আযাব।
আহসানুল বায়ান: (৩৯) সুতরাং সত্বরই তোমরা জানতে পারবে যে, সে কোন্ ব্যক্তি যার উপর এমন শাস্তি আসবে, যা তাকে লাঞ্ছিত করে দেবে এবং তার উপর চিরস্থায়ী শাস্তি আপতিত হবে।’ [1]
মুজিবুর রহমান: সুতরাং সত্ত্বরই তোমরা জানতে পারবে যে, কোন ব্যক্তির উপর এমন আযাব আসার উপক্রম হয়েছে যা তাকে লাঞ্ছিত করবে এবং তার উপর চিরস্থায়ী আযাব নাযিল হবে।
ফযলুর রহমান: “তোমরা অচিরেই জানতে পারবে, কাদের ওপর লাঞ্ছনাকর শাস্তি আসে এবং কাদের ওপর স্থায়ী শাস্তি আপতিত হয়।”
মুহিউদ্দিন খান: অতঃপর অচিরেই জানতে পারবে-লাঞ্ছনাজনক আযাব কার উপর আসে এবং চিরস্থায়ী আযাব কার উপর অবতরণ করে।
জহুরুল হক: "সুতরাং অচিরেই তোমরা জানতে পারবে কার উপরে শাস্তি আসছে যা তাকে লাঞ্ছিত করে, আর কার উপরে নামছে স্থায়ী শাস্তি।
Sahih International: And you are going to know who will get a punishment that will disgrace him [on earth] and upon whom will descend an enduring punishment [in the Hereafter]."
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩৯. অতঃপর তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে, কার উপর আসবে এমন শাস্তি যা তাকে লাঞ্ছিত করবে, আর তার উপর আপতিত হবে স্থায়ী শাস্তি।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩৯) সুতরাং সত্বরই তোমরা জানতে পারবে যে, সে কোন্ ব্যক্তি যার উপর এমন শাস্তি আসবে, যা তাকে লাঞ্ছিত করে দেবে এবং তার উপর চিরস্থায়ী শাস্তি আপতিত হবে।’ [1]
তাফসীর:
[1] এর অর্থ হল, জাহান্নামের চিরস্থায়ী শাস্তি, যা তাদের জন্য পার্থিব আযাবের পর প্রস্তুত আছে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২৫-৪৯ নং আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়::
অত্র আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা নূহ
(عليه السلام)
ও তাঁর সম্প্রদায় সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। শুরুতেই তাঁর কথা নিয়ে আসার কারণ হল তিনি উলূল আযম নাবীদের প্রথম, তিনিই ছিলেন পৃথিবীতে প্রথম রাসূল। তাঁর পূর্বে আর কোন রাসূল প্রেরণ করা হয়নি, যাদেরকে প্রেরণ করা হয়েছিল তাঁরা নাবী ছিলেন। তিনি স্বজাতিকে ৯৫০ বছর তাওহীদের দাওয়াত প্রদান করেছেন। তাই তাঁর মাঝে নাবী ও আল্লাহ তা‘আলার পথে আহ্বানকারীদের জন্য রয়েছে শিক্ষা। কিভাবে দাওয়াত দিতে হবে, দাওয়াতী কাজেকী পরিমাণ ধৈর্য ধরতে হবে এসবের পূর্ণ উপমা তাঁর জীবনীতে রয়েছে। তাঁকে প্রেরণ করা হয়েছিল সতর্ককারীরূপে যেন তিনি মুশরিকদেরকে সতর্ক করেন যে, তারা যেন মূর্তিপূজা ছেড়ে দেয়। আর নূহ (عليه السلام) সর্ব প্রথম তাঁর সম্প্রদায়কে এই দাওয়াতই দিয়েছিলেন যে, তারা যেন এক আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করে, তাঁকে ভয় করে চলে এবং তাঁর (নূহ-এর) আনুগত্য করে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা সূরা নূহের শুরুর দিকে উল্লেখ করেছেন।
নূহ (عليه السلام)
বললেন, যদি তোমরা আমার প্রতি ঈমান আনয়ন না কর এবং মূর্তিপূজা ছেড়ে এক আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত না কর তবে আল্লাহ তা‘আলার শাস্তি থেকে রেহাই পাবে না।
তাঁর কথার জবাবে উঁচু শ্রেণি ও ক্ষমতাসীন নেতৃস্থানীয় (যেমন পরবর্তী নাবীদের ক্ষেত্রে উচ্চ শ্রেণি ও ক্ষমতাসীন নেতৃস্থানীয় কাফিররা বলেছিল) কাফির নেতারা বলল যে, তুমি এক আল্লাহ তা‘আলার দিকে আমাদেরকে আহ্বান করছ, নিজেকে নাবী দাবী করছ অথচ তুমি তো আমাদের মতই একজন মানুষ, আর আমাদের মধ্যে যারা নিম্ন শ্রেণির লোক তারা ব্যতীত আর কেউ তোমার অনুসরণ করবে না। এটাই ছিল তাদের নিকট সবচেয়ে অবাক হওয়ার বিষয় যে, একজন সাধারণ লোক যার কোন ধন-সম্পদ নেই, যার কোন রাজত্ব নেই সে কী করে নাবী হতে পারে? নাবী হবেন কোন ফেরেশতা বা তিনি একজন উচ্চ বংশের অধিকারী হবেন বা তার অনেক সম্পদ থাকবে। (যেমন অত্র সূরার ১২ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে) আর এটাই ছিল তাদের ঈমান আনয়নের পথে প্রধান বাধা। তাই তারা বলল: সমাজের নিম্নশ্রেণি ও দরিদ্র লোক ছাড়া কেউ তোমার অনুসরণ করবে না।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَكَذٰلِكَ مَآ أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ فِيْ قَرْيَةٍ مِّنْ نَّذِيْرٍ إِلَّا قَالَ مُتْرَفُوْهَآ لا إِنَّا وَجَدْنَآ اٰبَا۬ءَنَا عَلٰٓي أُمَّةٍ وَّإِنَّا عَلٰٓي اٰثٰرِهِمْ مُّقْتَدُوْنَ)
“অনুরূপভাবে তোমার পূর্বে কোন জনপদে যখনই কোন সতর্ককারী প্রেরণ করেছি তখন তার সমৃদ্ধশালী ব্যক্তিরা বলত: আমরা তো আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে পেয়েছি এক মতাদর্শের ওপর এবং আমরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করছি।” (সূরা যুখরুফ ৪৩:২৩)
কিন্তু বর্তমানে কিছু কিছু মুসলিমরা বিশ্বাস করতে চায় না যে, অন্যান্য নাবীদের মত আমাদের নাবীও মাটির তৈরি। অথচ মক্কার কাফিররাও বিশ্বাস করত আমাদের নাবী সাধারণ একজন মানুষ, আব্দুল্লাহর ঔরসে আমিনার গর্ভে জন্ম নিয়েছে। অথচ নাবীদের এটা একটা নিদর্শন বলা চলে যে, সাধারণ লোক নাবী হওয়া এবং সমাজের দুর্বল শ্রেণির লোকেরা তাঁর অনুসরণ করবে এবং সমৃদ্ধশালী লোকেরা তাঁকে অস্বীকার করবে। তখন তারা ঈমান আনল না; এবং তারা তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করল এবং বলল যে, আমরা তোমাদেরকে মিথ্যাবাদী মনে করি। আর তারা বলে,
(قَالُوْآ أَنُؤْمِنُ لَكَ وَاتَّبَعَكَ الْأَرْذَلُوْنَ)
“তারা বলল: ‘আমরা কি তোমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করব অথচ নিম্ন শ্রেণির লোকেরা তোমার অনুসরণ করছে?’’ (সূরা শুয়ারা ২৬:১১১)
যুগে যুগে নাবীদের অনুসরণ করেছে সমাজের দরিদ্র ও নিম্ন শ্রেণির লোকেরা, সমাজের প্রভাবশালী ও নেতৃত্বস্থানীয়রা নাবীদের দাওয়াত বর্জন করেছে এবং তাদেরকে নিয়ে উপহাস করেছে। রোমের বাদশাহ হিরাকল আবূ সুফিয়ানকে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে জিজ্ঞেসকালে বলল: সমাজের সম্মানিত সবল লোকেরা তাঁর অনুসরণ করে না দুর্বল শ্রেণির লোকেরা? আবূ সুফিয়ান বলল: দুর্বল শ্রেণির লোকেরা। এ কথা শুনে হিরাকল বলল: রাসূলদের অনুসারী এরূপ লোকেরাই হয়ে থাকে। (সহীহ বুখারী হা: ৭, সহীহ মুসলিম হা: ১৭৭৩)
তাদের কথার জবাবে নূহ (عليه السلام) বললেন: যদি আমি আমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকি এবং তিনি আমাকে নিজ রহমত (নবুওয়াত) দান করেন, আর তোমরা যদি তা বিশ্বাস না কর তাহলে তোমাদের অন্তরে তা গেঁথে দেয়া বা তোমাদেরকে দীনের অনুসারী বানানো সম্ভব নয়। আর আমি যতই তোমাদের উপকার করতে চাই না কেন যদি তোমরা উপদেশ গ্রহণ না কর এবং আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে পথভ্রষ্টতা থেকে সঠিক পথে না নিয়ে আসেন তাহলে কোনই কাজে আসবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَلَا يَنْفَعُكُمْ نُصْحِيْٓ إِنْ أَرَدْتُّ أَنْ أَنْصَحَ لَكُمْ إِنْ كَانَ اللّٰهُ يُرِيْدُ أَنْ يُّغْوِيَكُمْ ط هُوَ رَبُّكُمْ)
‘‘আমি তোমাদেরকে উপদেশ দিতে চাইলেও আমার উপদেশ তোমাদের উপকারে আসবে না, যদি আল্লাহ তোমাদেরকে বিভ্রান্ত করতে চান। তিনিই তোমাদের প্রতিপালক।” (সূরা হূদ ১১:৩৪)
আর আমি আমার রবের দিকে দাওয়াতের বিনিময়ে তোমাদের কাছে কিছুই চাই না। হয়তো তোমরা বলতে পারো যে, নবুওয়াতের দাবী করার উদ্দেশ্য হল অর্থ উপার্জন করা। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মক্কার কাফিরদেরকেও একথা বলেছিলেন। (সূরা সাবা ৩৪:৪৭) আর যারা আমার প্রতি ঈমান এনেছে তাদেরকে আমি তোমাদের কথা অনুপাতে তাড়িয়ে দিতে পারি না। যদি আমি তাদেরকে তাড়িয়ে দেই তাহলে আল্লাহ তা‘আলা আমাকে যে শাস্তি দেবেন তা থেকে কে আমাকে রক্ষা করবে? অথচ আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে তাড়িয়ে দিতে নিষেধ করেছেন। মক্কার কাফিররা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে অনুরূপ দাবী করেছিল ফলে আল্লাহ তা‘আলা অবতীর্ণ করেছিলেন
(وَلَا تَطْرُدِ الَّذِيْنَ يَدْعُوْنَ رَبَّهُمْ بِالْغَدٰوةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيْدُوْنَ وَجْهَه۫)
“যারা তাদের প্রতিপালককে সকালে ও সন্ধ্যায় তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ডাকে তাদেরকে তুমি বিতাড়িত কর না।” (সূরা আনয়াম ৬:৫২)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِيْنَ يَدْعُوْنَ رَبَّهُمْ بِالْغَدٰوةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيْدُوْنَ وَجْهَه۫ وَلَا تَعْدُ عَيْنٰكَ عَنْهُمْ )
“তুমি নিজকে ধৈর্য সহকারে রাখবে তাদেরই সাথে যারা সকাল ও সন্ধ্যায় আহ্বান করে তাদের প্রতিপালককে তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে এবং তুমি পার্থিব জীবনের শোভা সৌন্দর্য কামনা করে তাদের হতে তোমার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিও না।” (সূরা কাহ্ফ ১৮:২৮) সুতরাং তাদেরকে পৃথক করে দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আর আমি তোমাদেরকে এ কথাও বলিনি যে, আমার নিকট আল্লাহ তা‘আলার ধন-ভাণ্ডার রয়েছে এবং এ কথাও বলি না, আমি গায়েব জানি আর আমি কোন ফেরেশতাও নই। সুতরাং তোমাদের কোন কিছু করার ক্ষমতাই আমার নেই। যাবতীয় ক্ষমতা আল্লাহ তা‘আলার হাতে। আমি শুধু তোমাদেরকে তাঁর দিকে আহ্বান করছি। তবে যারা ঈমান আনবে তারা এই ঈমান আনয়নের কারণে আখিরাতে জান্নাতের চির সুখ লাভ করবে। আল্লাহ তা‘আলা চাইলে তাদেরকে দুনিয়াতেও মর্যাদাবান করতে পারেন।
সুতরাং যারা তাদেরকে হেয়-প্রতিপন্ন করবে তারা আল্লাহ তা‘আলার নিকট পাপী বলে পরিগণিত হবে। আর তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন। এ বিষয়ে আমার কোন জ্ঞান নেই। তখন তারা নূহ (عليه السلام)-কে ধমক দিয়ে সে শাস্তি নিয়ে আসার জন্য বলল। অথচ এটা ছিল একটি অল্প জ্ঞানের পরিচয়। যদি তারা জ্ঞানী হত তাহলে বলত যে, তুমি যদি সত্যবাদী হও তাহলে আমাদের জন্যও দু‘আ কর যে, আমরা যেন সে দীনের অনুসারী হতে পারি। অথচ তারা জানে না যে, এ শাস্তির মালিক আল্লাহ তা‘আলা। আল্লাহ তা‘আলা যদি এই শাস্তি নিয়ে আসেন তাহলে তা থেকে রক্ষা পাওয়া ও হিদায়াত লাভ করা সম্ভব নয়। আর কোন নাবীর পক্ষে সম্ভব নয় কারো কল্যাণ করা বা হিদায়াত দান করা যদি না আল্লাহ তা‘আলা তাকে কল্যাণ দান করেন এবং তাকে হিদায়াত দান করেন।
আর যদি তারা এ কথা বলে যে, নূহ (عليه السلام) এটা নিজেই রচনা করেছে তাহলে তাদেরকে বলে দাও যে, যদি আমি এটা রচনা করি তবে এর জন্য আমার যে পাপ হবে তা আমার ওপরই বর্তাবে। আর যদি তোমরা আমার প্রতি মিথ্যা প্রতিপন্ন কর তাহলে তোমাদের পাপ তোমাদের ওপরই বর্তাবে। তখন আল্লাহ তা‘আলার শাস্তি থেকে কেউ রক্ষা পাবে না। আর আমি তোমাদের থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। কেউ বলেছেন, এ কথোপকথন নূহ (عليه السلام) ও তাঁর সম্প্রদায়য়ের মাঝে হয়েছিল, কেউ বলেছেন এটা পূর্বাপর থেকে বিচ্ছিন্ন একটি বাক্য, যা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও মক্কার মুশরিকদের মাঝে হয়েছিল।
যখন নূহ (عليه السلام) -এর সম্প্রদায় শাস্তির ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করল তখন আল্লাহ তা‘আলা ওয়াহী করলেন যে, যারা ঈমান আনার তারা ঈমান এনেছে, বাকি যারা ঈমান আনেনি তাদের জন্য মনক্ষুণত্ন হয়ো না। নূহ (عليه السلام) বদ দু‘আ করলেন যে, ‘হে আমার প্রভু! পৃথিবীতে বসবাসকারী একজন কাফিরকেও জীবিত রেখো না।
নূহ (عليه السلام)-এর কিশতী:
৩৭ নং আয়াত থেকে নূহ (عليه السلام)-এর প্লাবনের নাতিদীর্ঘ ঘটনা বিবৃত হয়েছে। কুরআন তার বাক্যরীতি অনুযায়ী কেবল প্রয়োজনীয় কথাগুলোই বলে দিয়েছে। বাদবাকী ব্যাখ্যা নিম্নরূপ:
নূহ (عليه السلام) কে যখন নৌকা তৈরি করতে নির্দেশ দেয়া হল তখন তিনি নৌকাও চিনতেন না, তৈরিও করতে জানতেন না। সেকারণেই আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিলেন, ‘তুমি আমার চোখের সামনে ও আমার ওয়াহী অনুযায়ী নৌকা নির্মাণ কর’ (بِأَعْيُنِنَا) ‘আমার চোখের সামনে’ অর্থাৎ নূহ (عليه السلام)-এর নৌকা তৈরি করা সম্পূর্ণ আল্লাহ তা‘আলার প্রত্যক্ষে হয়েছিল। এখানে আল্লাহ তা‘আলার ‘চক্ষু’ আছে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু কিরূপ কেমন ইত্যাদি কোন উদাহরণ ও সদৃশ ছাড়াই, যেমন আল্লাহ তা‘আলার সত্তার সাথে উপযোগী। এর প্রতি ঈমান রাখা আবশ্যক। অর্থাৎ নূহ (عليه السلام) নৌকা তৈরি করছেন আল্লাহ তা‘আলার চোখের সামনে, আল্লাহ তা‘আলা সব দেখছেন। এটাই ছিল পৃথিবীর প্রথম নৌযান, তারপর থেকে উন্নত হতে হতে বর্তমান এ পর্যন্ত এসেছে। তাঁর নৌকাটি কয় তলা বিশিষ্ট ছিল, কী কাঠের ছিল, কত গজ লম্বা ও চওড়া ছিল, এসব কথার কোন ভিত্তি নেই।
وَوَحْيِنَا ‘আমার ওয়াহী অনুযায়ী’ এর অর্থ হল আমি যেভাবে নির্দেশ দিয়েছি সেভাবে। তার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ইত্যাদি যেভাবে বলব সেভাবে তৈরি করবে। কোন কোন তাফসীরবিদ উক্ত স্থানে কিশতীর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ, তার তলা এবং তাতে কী ধরনের কাঠ ও অন্যান্য আসবাবপত্র লাগানো হয়েছে তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। এতে পরিস্কার বুঝা যাচ্ছে যে, উক্ত বিষয়টি কোন নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। তার পূর্ণ বিবরণ ও সঠিক জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার কাছে।
(الَّذِيْنَ ظَلَمُوْا) ‘যারা জুলুম করেছে’ এখানে জালিম বলতে কেউ কেউ নূহ (عليه السلام)-এর পুত্র এবং তাঁর স্ত্রীকে বুঝিয়েছেন। তারা মু’মিন ছিল না এবং তারা ডুবে মৃত্যুবরণকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। অনেকে এর দ্বারা ডুবে মরা পুরো জাতিকে বুঝিয়েছেন। উদ্দেশ্য হল তাদের জন্য অবকাশ বা অব্যাহতি চাইবে না। কারণ এখন তাদের ধ্বংসের সময় এসে গেছে। অথবা উদ্দেশ্য এই যে, তাদের ধ্বংসের জন্য তাড়াতাড়ি করবে না, নির্ধারিত সময়ে তারা ডুবে মারা যাবে। (ফাতহুল কাদীর) আর আল্লাহ তা‘আলা নূহ (عليه السلام)-কে কাফিরদের জন্য আল্লাহ তা‘আলার নিকট প্রার্থনা করতে নিষেধ করলেন। কারণ যাদের ধ্বংস হওয়ার তারা ধ্বংস হবেই।
নূহ (عليه السلام) যখন নৌকা নির্মাণ করছিলেন নদীবিহীন মরু এলাকায় বিনা কারণে নৌকা তৈরি করাকে পশুশ্রম ও নিছক পাগলামি বলে জাতির নেতারা নূহ (عليه السلام)-কে ঠাট্টা করতে লাগল এবং উপহাস করে বলত যে, নূহ নাবী থেকে ছুতোর হয়ে গেছে অথবা এ কথা বলত যে, নূহের কিশ্তী ডাঙ্গায় চলবে এ ধরনের বিভিন্ন উপহাসমূলক কথা-বার্তা বলত। নূহ (عليه السلام) বললেন: তোমরা আমাকে নিয়ে উপহাস করছ, অচিরেই জানতে পারবে কে উপহাসের পাত্র। যখন লাঞ্ছিত হবে এবং জাহান্নামের চিরস্থায়ী শাস্তিতে প্রবেশ করবে তখন প্রকৃত সত্য জানতে পারবে। দীর্ঘ দিন ধরে নৌকা তৈরি শেষ হওয়ার পরেই আল্লাহ তা‘আলার চূড়ান্ত ফায়সালা নেমে আসে এবং গযবের প্রাথমিক আলামত হিসেবে চুলা থেকে পানি বের হতে থাকে।
তান্নুর ও তুফান:
(التَّنُّوْرُ) তান্নুর অর্থ চুলা, অনেকে বলেছেন ‘আইনুল অরদাহ’ নামক বিশেষ স্থান এবং কেউ বলেছেন ভূ-পৃষ্ট। ইবনু কাসীর (রহঃ) শেষের মতটিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। অর্থাৎ ভূপৃষ্ঠের সকল স্থান থেকেই ঝরনার মত পানি উঠছিল এমনকি আগুনের চুলার নিচ থেকেও পানি উঠছিল। এ প্লাবনকে সূরা আনকাবূতের ১৪ নং আয়াতে তুফান বলা হয়েছে।
অর্থাৎ যখন আল্লাহ তা‘আলার আযাবের নির্দেশ চলে এল, সমস্ত ভূ-পৃষ্ঠ হতে পানি উৎগত হতে লাগল ওপর থেকেও মুষলধারে বৃষ্টি হতে লাগল, এর পূর্বে আল্লাহ তা‘আলা নূহ (عليه السلام)-কে বললেন যে, তিনি প্রত্যেক প্রাণী জোড়া তথা নর ও মাদী দু’টি করে তাঁর কিশতিতে যেন নিয়ে নেন যাতে বংশ বিস্তার করতে পারে এবং তাঁর পরিবারকেও তুলে নেন। তবে তোমার পরিবারের মধ্যে যাদের ডুবে মরে যাওয়া আল্লাহ তা‘আলার পূর্ব নির্ধারিত তাকদীরে ছিল তাদেরকে তুলে নিয়ো না। অর্থাৎ তোমার পরিবারের যারা ঈমান আনেনি যেমন কিনআন, নূহ (عليه السلام)-এর স্ত্রী ওয়াইলা, এরা উভয়ে কাফির ছিল। তাদেরকে নৌকায় তোলা হয়নি। যেমন পরের আয়াতগুলোতে বলা হয়েছে। (وَمَنْ اٰمَنَ) অর্থাৎ যারা ঈমান এনেছে তাদেরকেও নৌকাতে তুলে নাও। মূলত ঈমানদারদের সংখ্যা খুব কম ছিল। কেউ বলেছেন, কিশতিতে আরোহীর সংখ্যা ছিল সর্বমোট (নারী পুরষ মিলে) ৮০ জন। কেউ বলেছেন, তার থেকেও কম। এদের মধ্যে নূহ (عليه السلام)-এর তিন পুত্র সাম, হাম ইয়াফেস ও তাদের স্ত্রীগণও ছিলেন। কারণ তারা মুসলিম ছিলেন। এদের মধ্যে কিনআনের স্ত্রীও ছিলেন, কিনআন ছিল কাফির কিন্তু স্ত্রী ছিলেন মুসলিম। (ইবনু কাসীর)
অতঃপর নূহ (عليه السلام) আল্লাহ তা‘আলার নামে নৌকা ভাসিয়ে দিলেন এবং আল্লাহ তা‘আলার নামে আরোহন করলেন। উক্ত বাক্য দ্বারা ঈমানদারগণকে সান্ত্বনা ও সাহস দেয়া উদ্দেশ্য ছিল যে, নির্ভয়ে ও নিঃশঙ্ক চিত্তে কিশতিতে আরোহণ কর, আল্লাহ তা‘আলাই এই কিশতির সংরক্ষক, তা তাঁরই আদেশে চলবে ও তারই আদেশে থামবে। যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(فَاِذَا اسْتَوَیْتَ اَنْتَ وَمَنْ مَّعَکَ عَلَی الْفُلْکِ فَقُلِ الْحَمْدُ لِلہِ الَّذِیْ نَجّٰٿنَا مِنَ الْقَوْمِ الظّٰلِمِیْنَ وَقُلْ رَّبِّ اَنْزِلْنِیْ مُنْزَلًا مُّبٰرَکًا وَّاَنْتَ خَیْرُ الْمُنْزِلِیْنَ)
“যখন তুমি ও তোমার সঙ্গীরা নৌযানে আরোহন করবে তখন বল: ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই, যিনি আমাদেরকে রক্ষা করেছেন জালিম সম্প্রদায় হতে।’ আরও বল: ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এমনভাবে অবতরণ করাও যা হবে কল্যাণকর; আর তুমিই শ্রেষ্ঠ অবতরণকারী।’’ (সূরা মু’মিনুন ২৩:২৮-২৯)
কেউ কেউ নৌকাতে বা জলে আরোহনের সময়
(بِسْمِ اللّٰهِ مَجْر۪هَا وَمُرْسٰهَا ط إِنَّ رَبِّيْ لَغَفُوْرٌ رَّحِيْمٌ)
এ দু’আ পড়া মুস্তাহাব বলেছেন। কিন্তু
(سُبْحَانَ الَّذِيْ سَخَّرَ لَنَا هٰذَا وَمَا كُنَّا لَه۫ مُقْرِنِيْنَ - وَإِنَّآ إِلٰي رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُوْنَ)
এ দু‘আটি পড়া হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। (সহীহ মুসলিম হা: ১৩৪২)
নূহ (عليه السلام) এর কিশ্তী সকলকে নিয়ে পর্বত তুল্য ঢেউয়ের মধ্যে জাহাজ চলছিল। যে ঢেউয়ের মধ্যে এই কিশ্তি ডুবে যাওয়ারই কথা অথচ না ডুবে তাদেরকে নিয়ে ভেসে চলছিল। এটা ছিল আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(اِنَّا لَمَّا طَغَا الْمَا۬ئُ حَمَلْنٰکُمْ فِی الْجَارِیَةِﭚﺫلِنَجْعَلَھَا لَکُمْ تَذْکِرَةً وَّتَعِیَھَآ اُذُنٌ وَّاعِیَةٌﭛ)
“যখন জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল তখন আমি তোমাদেরকে জাহাজে আরোহণ করিয়েছিলাম। আমি এটা করেছিলাম তোমাদের উপদেশের জন্য এবং শ্রবণকারী কর্ণ যেন এটা স্মরণ রাখতে পারে।” (সূরা হা-ক্কাহ ৬৯:১১-১২)
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:
(وَحَمَلْنٰھُ عَلٰی ذَاتِ اَلْوَاحٍ وَّدُسُرٍﭜ تَجْرِیْ بِاَعْیُنِنَاﺆ جَزَا۬ئً لِّمَنْ کَانَ کُفِرَﭝ)
“তখন নূহকে আরোহণ করালাম কাঠ ও পেরেক নির্মিত এক নৌযানে, যা আমার চোখের সামনে চলল, এটা ছিল তার পুরস্কার যাকে অস্বীকার করা হয়েছিল।” (সূরা ক্বামার ৫৪:১৩-১৪)
তখন নূহ (عليه السلام) তাঁর পুত্রকে ডেকে মুসলিম হয়ে নৌকায় আরোহণ করতে বললেন এবং কাফিরদের সাথে থেকে নিমজ্জিতদের অন্তর্ভুক্ত হতে নিষেধ করলেন। কিন্তু সে অহংকারবশত নিষেধ অমান্য করল এবং বলল যে, পানি আসলে আমি পাহাড়ে উঠে যাব। তার বিশ্বাস ছিল পানি পাহাড় সমান হবে না, পাহাড় সমান পানি কি আর হয়? এসব কথা-বার্তা চলাকালে একটি তরঙ্গ এসে তাকে ডুবিয়ে দিল। আর সে নিমজ্জিত হয়ে গেল। যখন নূহ (عليه السلام)-এর সম্প্রদায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেল তখন আল্লাহ তা‘আলা জমিকে নির্দেশ দিলেন, তাঁর পানি চুষে নেয়ার জন্য এবং আকাশকে বললেন, সে যেন পানি বর্ষণ করা বন্ধ করে। আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশের সাথে সাথে তারা তা বাস্তবায়ন করল এবং সমস্ত পানি জমিন মুহূর্তের মধ্যে শেষ করে দিল। এক পর্যায়ে নূহ (عليه السلام)-এর নৌকা জুদী পর্বতের ওপর এসে থামল। কেউ বলেছেন, এ জুদি পাহাড় ইরাকে মাওসেল নামক শহরের নিকটে অবস্থিত।
ابْلَعِيْ অর্থ গিলে ফেলা, শব্দটি ব্যবহার হয় জীবের ক্ষেত্রে। কারণ তারা নিজের মুখের খাবার গিলে ফেলে। এখানে পানি শুষে নেয়াকে গিলে ফেলা বলাতে এ হিকমত পরিলক্ষিত হয় যে, পানি ধীরে ধীরে শুকায়নি; বরং আল্লাহ তা‘আলার আদেশে জমিন সমস্ত পানি একসাথে সেরূপ গিলে ফেলেছিল যেরূপ জন্তু খাবার গিলে ফেলে। (وَقُضِيَ الْأَمْرُ) অর্থাৎ কাফিরদেরকে ডুবিয়ে মারার যে নির্দেশ ছিল তা সম্পন্ন হয়ে গেছে।
নূহ (عليه السلام) আল্লাহ তা‘আলার দরবারে তার ছেলের জন্য দু‘আ করছিলেন এই ভেবে যে, তিনি মনে করেছিলেন সম্ভবত সে মুসলিম হয়ে যাবে। অথবা পুত্রের প্রতি পিতার যে মায়া ও ভালবাসা তা দেখাতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন যে, হে আল্লাহ তা‘আলা! আমার পুত্র সে তো আমার পরিবারেরই অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা নিষেধ করলেন যে, না সে তোমার পরিবারের অন্তর্ভুক্ত নয়। আল্লাহ তা‘আলা এ কথা বলেছিলেন দ্বীনের দিক দিয়ে। অর্থাৎ কোন অমুসলিম কোন মুসলিম পরিবারের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না।
(إِنَّه۫ عَمَلٌ غَيْرُ صَالِحٍ)
অর্থাৎ তার আমল ঠিক নেই। সে ঈমান আনেনি এবং সৎকর্ম করেনি। এখান থেকে বুঝা যাচ্ছে ঈমান ও সৎআমল না থাকলে কেউ নাবী পরিবারের হলেও নাজাত পাবে না। অথচ কিছু ভণ্ড ফকির ও পীরেরা বলে সঠিক ঈমান ও আমলের কোন প্রয়োজন নেই। শয়তান সব জায়গায় সিজদা করে অপবিত্র করে ফেলেছে, কোথাও সিজদা করার জায়াগা নেই।
(مَا لَيْسَ لِيْ بِه۪ عِلْمٌ)
এ কথা দ্বারা বুঝা যাচ্ছে নাবী গায়েব জানেন না। কারণ তিনি গায়েব জানলে কাফির ছেলের জন্য আবেদন করতেন না। যাল ফলে আল্লাহ তা‘আলার কাছে ওজর পেশ করে ক্ষমা চাইলেন।
আল্লাহ তা‘আলা নূহ (عليه السلام) কে ক্ষমা করে দিলেন এবং বললেন, হে নূহ! তুমি শান্তিসহ দুনিয়াতে অবতরণ কর, এ অবতরণ কিশতি থেকে ছিল অথবা যে পাহাড়ে নৌকা থেমে ছিল সে পাহাড় থেকে ছিল। আল্লাহ তা‘আলা নূহ (عليه السلام) ও তাঁর সাথে যে জাতি ছিল তাদেরকে শান্তি ও বরকতের সাথে পৃথিবীতে জীবন-যাপন করার সুযোগ করলেন।
(وَأُمَمٌ سَنُمَتِّعُهُمْ)
এরা হল সেই কাফির জাতি যারা কিশতিতে পরিত্রাণপ্রাপ্তদের বংশ থেকে কিয়ামত পর্যন্ত আগমন করবে। উদ্দেশ্য হল সে কাফিরদেরকে পার্থিব জীবন যাত্রার জন্য আল্লাহ তা‘আলা ভোগ-সম্ভার দেবেন কিন্তু কিয়ামতের দিন তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সম্বোধন করে বলেন: এটাই ছিল নূহ (عليه السلام) ও তার জাতিদের ইতিহাস যা আমি তোমার প্রতি ওয়াহি করে জানিয়ে দিয়েছি। এসব সংবাদ তুমিও জানতে না এবং তোমার জাতিও জানত না। সুতরাং বুঝা যাচ্ছে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) গায়েব জানতে না, যদি জানতেন তাহলে ওয়াহী জানানোর কোন প্রয়োজন ছিল না।
তাই আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সম্প্রদায়ের লোকেরা যে কষ্ট দেয় ও কুটক্তি করে তাতে ধৈর্য ধারণ করার নির্দেশ দিচ্ছেন। কারণ আল্লাহ তা‘আলা সাহায্য করবেন এবং কল্যাণকর পরিণাম তোমার ও তোমার অনুসারীদের জন্যই। الْعَاقِبَةَ ইহকাল ও আখিরাতের উভয় জগতের শুভ পরিণামকে বুঝায়। সুতরাং তোমার পূর্বের নাবীদের ও তাদের অনুসারীদের যেমন সাহায্য করেছিলাম এবং তাদের যেমন শুভ পরিণতি হয়েছিল তোমার ও তোমার অনুসারীদের তা-ই হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(إِنَّا لَنَنْصُرُ رُسُلَنَا وَالَّذِيْنَ اٰمَنُوْا فِي الْحَيٰوةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ يَقُوْمُ الْأَشْهَادُ)
“নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদের ও মু’মিনদেরকে সাহায্য করব পার্থিব জীবনে ও যেদিন সাক্ষীগণ দণ্ডায়মান হবে।” (সূরা মু’মিন ৪০:৫১)
(وَلَقَدْ سَبَقَتْ کَلِمَتُنَا لِعِبَادِنَا الْمُرْسَلِیْنَﯺ اِنَّھُمْ لَھُمُ الْمَنْصُوْرُوْنَﯻﺕ وَاِنَّ جُنْدَنَا لَھُمُ الْغٰلِبُوْنَﯼ)
আমার রাসূল বান্দাদের সম্পর্কে আমার এ কথা আগেই নির্ধারিত হয়েছে যে, অবশ্যই তারা হবে সাহায্যপ্রাপ্ত। এবং আমার বাহিনী, অবশ্যই তারাই জয়ী হবে।” (সূরা সফফাত ৩৭:১৭১-১৭৩)
সুতরাং যারা ঈমান ও তাক্বওয়া অবলম্বন করে চলবে তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম পরিণতি। তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা সহযোগিতা করবেন।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. নূহ (عليه السلام) পৃথিবীতে প্রথম প্রেরিত রাসূল, তাঁর জাতিরাই সর্বপ্রথম সৎব্যক্তিদের নিয়ে বাড়াবাড়ি করার কারণে শির্কে লিপ্ত হয়।
২. নাবীদের অনুসরণ সাধারণত দরিদ্র শ্রেণির লোকেরাই করে এবং ধনীরা তাদের বিরুদ্ধাচরণ করে।
৩. অহংকার পতনের মূল, যেমন অহংকার করে সত্য না গ্রহণ করার কারণে নূহ (عليه السلام)-এর পুত্র কেন‘আনের পতন হয়েছে।
৪. ঈমানদার ব্যক্তি যদি গরীবও হয় তবু সে ধনী কাফিরের চেয়ে সম্মানিত। কারণ আল্লাহ তা‘আলা বান্দার ধন-সম্পদ ও রূপ-সৌন্দর্যের লক্ষ্য করেন না বরং লক্ষ্য করেন বান্দার অন্তর ও আমল।
৫. প্রত্যেক মানুষ নিজে তার পাপের বোঝা বহন করবে। পিতা ছেলের বোঝা বহন করবে না, ছেলেও পিতার বোঝা বহন করবে না।
৬. প্রত্যেক জিনিস আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশে চলমান।
৭. আল্লাহ তা‘আলার চক্ষু রয়েছে, তার প্রমাণ পেলাম।
৮. কোন কাফির মুসলিমদের আত্মীয় ও পরিবারে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না।
৯. নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে ওয়াহীর মাধ্যমে পূর্ববর্তী নাবীদের অবাধ্য জাতির ধ্বংসের বিবরণ তুলে ধরে সতর্ক করছেন যে, যারাই নাবীদের অবাধ্য হবে তাদের পরিণতি এরূপ ভয়াবহ হবে।
১০. যুগে যুগে নাবী-রাসূলগণ সমাজের ক্ষমতাসীন ও কর্তৃত্বশীলদের দ্বারা অপমানিত, নির্যাতিত ও অকথ্য গালিগালাজের মুখোমুখি হয়েছেন। তা সত্ত্বেও দাওয়াতী কাজ বর্জন করেননি। সুতরাং আল্লাহ তা‘আলার পথে দায়ীদের এখানে শিক্ষা রয়েছে, সত্য পথের দায়ীদেরকে মিথ্যাবাদী বলবে, জেলে দিবে, গালিগালাজ করবে, তাই বলে দাওয়াতী কাজ ছেড়ে দেয়া যাবে না।
১১. দাওয়াতের প্রথম বিষয় হবে তাওহীদ, যেমন প্রত্যেক নাবী-রাসূল প্রথমেই তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৩৬-৩৯ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তাআ’লা খবর দিচ্ছেন যে, যখন নূহের (আঃ) কওম তাদের উপর আল্লাহর শান্তি আনয়নের জন্যে তাড়াহুড়া শুরু করলো তখন আল্লাহ তাআ’লা তাদের উপর বদ দুআ’ করতে হযরত নূহের (আঃ) কাছে ওয়াহী করলেন। তাই হযরত নূহ (আঃ) বললেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! কাফিরদের মধ্য হতে যমীনের উপর একজনকেও অবশিষ্ট রাখবেন না। হে আমার রব! আমি অপারগ হয়ে পড়েছি, সুতরাং আমাকে সাহায্য করুন।” তখন আল্লাহ তাআ’লা হযরত নূহের (আঃ) কাছে ওয়াহী পাঠালেনঃ যারা ঈমান এনেছে তারা ছাড়া তোমার কওম হতে আর কেউই ঈমান আনবে না, কাজেই তারা যা করছে তাতে মোটেই দুঃখ করো না। আর তুমি আমার তত্ত্বাবধানে ও আমার নির্দেশক্রমে নৌকা নির্মাণ কর এবং আমার কাছে এই যালিমদের সম্পর্কে কোন কথা বলো না, তাদের সকলকেই ডুবিয়ে দেয়া হবে। পূর্ববর্তী কোন কোন গুরুজনের মতে হযরত নূহকে (আঃ) নির্দেশ দেয়া হয় যে, তিনি যেন কাঠ কেটে তা শুকিয়ে নেন এবং ফেড়ে তক্তা তৈরি করেন। এতে একশ’ বছর কেটে যায়। তারপর পূর্ণরূপে নৌকাটি নির্মাণে আরো এক শ' বছর অতিবাহিত হয়। একটি উক্তি এ- ও রয়েছে যে, নৌকাটি নির্মাণ করতে চল্লিশ বছর লেগেছিল। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআ’লাই সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী।
ইমাম মুহাম্মদ ইবনু ইসহাক (রঃ) তাওরাতের উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণনা করেছেন যে, নৌকাটি সেগুন কাঠ দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল। ওর দৈর্ঘ্য ছিল আশি হাত এবং প্রস্ত ছিল পঞ্চাশ হাত। ভিতর ও বাইরে আলকাতরা মাখানো হয়েছিল। নৌকাটি যাতে পানি ফেড়ে চলতে পারে তাতে সেই ব্যবস্থাও রাখা হেয়ছিল। কাতাদা’’র (রঃ) উক্তি এই যে, নৌকাটির দৈর্ঘ্য ছিল তিনশ’ হাত। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ওর দৈর্ঘ্য ছিল বারো শ’ হাত এবং প্রস্ত ছিল ছ’শ’ হাত। উক্তি এটাও আছে যে, নৌকাটির দৈর্ঘ্য ছিল দু’হাজার হাত এবং প্রস্ত ছিল একশ’ হাত। এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআ’লারই রয়েছে।
নৌকাটির ভিতরের উচ্চতা ছিল ত্রিশ হাত। তাতে তিনটি তলা ছিল। প্রত্যেকটি তলা ছিল দশ হাত করে উঁচু। নীচের তলায় ছিল চতুষ্পদ জন্তু ও বন্য জানোয়ার। মধ্য তলায় মানুষ ছিল। আর উপরের তলায় ছিল পাখী। দরজা ছিল প্রশস্ত এবং উপর থেকে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ ছিল।
ইমাম আবু জাফর ইবনু জারীর (রঃ) হযরত আবুদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রঃ) হতে একটি ‘গারীব আসার’ (কোন কোন মুহাদ্দিস বলেছেন যে, তাবেয়ীদের হাদীসকে হাদীস না বলে ‘আসার’ বলা হয়। আর যে হাদীসটি কোন এক যুগে বা সর্বযুগে মাত্র একজন লোক বর্ণনা করেছেন ঐ হাদীসকে ‘গারীব’ হাদীস বলা হয়) বর্ণনা করেছেন যে, হাওয়ারীরা হযরত ঈসার (আঃ) নিকট আবেদন করেঃ “যদি আপনি আল্লাহ তাআ’লার নির্দেশক্রমে এমন একজন মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করতেন যে ব্যক্তি হযরত নূহের (আঃ) নৌকাটি দেখেছিল, তবে ঐ নৌকাটি সম্পর্কে আমরা জ্ঞান লাভ করতাম!” তাদের কথামত হযরত ঈসা (আঃ) তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে একটি টিলার উপর পৌঁছলেন এবং সেখানকার এক খণ্ড মাটি উঠালেন। অতঃপর তাদেরকে বললেনঃ “এটা কে তা তোমরা জান কি?” তারা উত্তরে বললঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভাল জানেন।” তিনি বললেন: “এটা হযরত নূহের (আঃ) পুত্র হা’মের পায়ের গোছা। তারপর তিনি স্বীয় লাঠি দ্বারা ওর উপর আঘাত করে বললেনঃ “আল্লাহর হুকুমে উঠে দাঁড়াও।” তৎক্ষণাৎ একজন বৃদ্ধলোক মাথা থেকে ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে দাঁড়িয়ে গেলেন। হযরত ঈসা (আঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেন ? “তুমি কি এরূপ বৃদ্ধ অবস্থাতেই মারা গিয়েছিলে?” লোকটি উত্তরে বললেনঃ “জ্বি, না। আমি যুবক অবস্থাতেই মারা গিয়েছিলাম। কিন্তু এখন আমার মনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে যে, কিয়ামাত বুঝি সংঘটিত হয়ে গেছে। তাই ভয়ে আমি বুড়ো হয়ে গেছি।” এরপর ঈসা (আঃ) তাঁকে বললেনঃ “আচ্ছা, হযরত নূহের (আঃ) নৌকা সম্পর্কে যা কিছু জান তা আমাদের নিকট বর্ণনা কর।” তিনি বললেনঃ “নৌকাটি ছিল বারোশ’ হাত লম্বা এবং ওর প্রস্থ ছিল ছ'শ’হাত। তাতে তিনটি তলা ছিল। প্রথমটিতে ছিল চতুষ্পদ জন্তু, দ্বিতীয়টিতে ছিল মানুষ এবং তৃতীয়টিতে ছিল পাখি। যখন চতুষ্পদ জন্তুগুলির গোবর ছড়িয়ে পড়লো তখন আল্লাহ তাআ'লা হযরত নূহের (আঃ) কাছে ওয়াহী পাঠালেনঃ “হাতীর লেজে নাড়া দাও।” তিনি নাড়া দেয়া মাত্রই তা থেকে নর ও মাদী শুকর বেরিয়ে আসলো এবং মলগুলি খেতে লাগলো। ইঁদুরগুলি নৌকার তক্তাগুলি কাটতে শুরু করলে আল্লাহ পাক তাঁর নিকট ওয়াহী প্রেরণ করলেনঃ “সিংহের দু'চোখের মধ্যভাগে আঘাত কর।” তিনি তাই করলে ওর নাকের ছিদ্র দিয়ে নর ও মাদী বিড়াল বেরিয়ে এসে এই ইদুরের দিকে অগ্রসর হলো।” হযরত ঈসা (আঃ) লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “শহরগুলি যে পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে তা হযরত নূহ (আঃ) কি করে জানতে পারলেন?” লোকটি উত্তরে বললেনঃ “তিনি সংবাদ নেয়ার জন্যে কাককে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু কাকটি গিয়ে একটি মৃত দেহের উপর বসে পড়ে (সুতরাং সে খবর নিয়ে আসতে খুবই বিলম্ব করে)। সুতরাং তিনি তার উপর বদ দুআ’ করেন যে, সে যেন সদা ভীত সন্ত্রস্ত থাকে। এ কারণেই সে মানুষের বাড়িতে ভালবাসা পায় না (বরং সদা ভীত সন্ত্রস্ত থাকে)। অতঃপর তিনি কবুতরকে পাঠিয়ে দেন। কবুতরটি ঠোঁটে করে যায়তুনের পাতা এবং পায়ে মাটি নিয়ে ফিরে আসে। ফলে তিনি জানতে পারেন যে, শহর ডুবে গেছে। তিনি কবুতরের গলায় গলাবন্ধ পরিয়ে দিলেন এবং তার জন্যে নিরাপত্তার ও প্রীতির দুআ’ করলেন। এ কারণেই সে বাড়িতে ভালবাসা পেয়ে থাকে।” হাওয়ারীরা বললো:“হে আল্লাহর রাসূল! এ লোকটিকে আমাদের সাথে নিয়ে চলুন।” তিনি আমাদের সাথে অবস্থান করবেন এবং আরো কিছু বর্ণনা করবেন। তিনি বললেনঃ “এ লোকটি কি ভাবে তোমাদের সাথে থাকতে পারে? তার তো রিয্ক অবশিষ্ট নেই। অতঃপর তিনি লোকটিকে লক্ষ্য করে বললেনঃ “তুমি যেমন ছিলে তেমনই হয়ে যাও।” সুতরাং তিনি তৎক্ষণাৎ মাটি হয়ে গেলেন।
হযরত নূহ (আঃ) নৌকাটি নির্মাণ কার্যে লেগে গেলেন। সুতরাং কাফিররা তাঁকে উপহাস করার একটা সূত্র খুঁজে পেলো। চলতে, ফিরতে, উঠতে, বসতে তারা তাকে ঠাট্টা করতে থাকলো। কেননা, তারা তাঁকে মিথ্যাবাদী মনে করতো। আর তিনি যে তাদেরকে শাস্তির ভয়। দেখিয়েছিলেন তা তারা মোটেই বিশ্বাস করেনি। তিনি তাদের বিদ্রুপের প্রতিবাদে শুধু এটুকুই বলেছিলেনঃ “আজ তোমরা আমাকে উপহাস করছে, কিন্তু জেনে রেখোঁরেখো যে, যেমন তোমরা আমাদেরকে উপহাস করছে তেমনই একদিন আমরাই তোমাদেরকে উপহাস করবো। সুতরাং তোমরা সত্বরই জানতে পারবে যে, কোন্ ব্যক্তি দুনিয়ায় আল্লাহর অপমানজনক শাস্তি প্রাপ্ত হয় এবং কার উপর চিরস্থায়ী শাস্তি এসে পড়ে যা কখনো দূর হবার নয়।”
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।